গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ২৪
লেখিকা- সালমা চৌধুরী
মেঘ চলে যাওয়ার পর আবির পাশ থেকে ফোন নিয়ে মেঘকে হাইড করে ফে*সবুকে পোস্ট দিয়েছে,
“ভালবাসি তোকে সেই পুরনো অনুভবে,
এ মনের জগতে রাজকুমারী শুধু তুই। ”
কেটে গেল আবিরের নির্ঘুম রাত তবে এই রাত কষ্টে*র নয়, কাউকে মিস করার তী*ব্র অনুভূতি সারারাত ঘুমাতে দেয়নি আবির কে৷
শুক্রবার ১০ টার পর আবির ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে গেছে বাসা থেকে। ঘন্টাখানেক পর মেঘ সোফায় বসে টিভি দেখছিল। আবির সাদা রঙের শর্ট হাতার টি-শার্ট পড়েছে, শক্তপোক্ত বাহুতে টিশার্টের হাতাটা টাইট হয়ে আছে। চুল-দাঁড়ি ছোট করে কেটে, সুন্দর একটা হেয়ারস্টাইলও করেছেন। চোখে সানগ্লাস দিয়ে ড্যাশিং লুকে বাসায় ঢুকছে। মেঘের চোখ দরজার দিকে পরতেই আবির ভাইকে দেখে বিস্ময়কর চোখে তাকিয়ে অকস্মাৎ বলে উঠলো,
“Hai! Me Mar Jaunga”
আবির কাছাকাছি এসে সানগ্লাস খুলে মেঘের দিকে তাকিয়ে দু’বার ভ্রূ নাচালো, সঙ্গে সঙ্গে মেঘ ফিক করে উঠলো, হাসির দরুন মেঘের গালে থাকা বিউটি স্পট টা স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে। আবির দৃষ্টি সরিয়ে নিজের রুমে চলে গেছে।
আবির ভাইকে দেখার পর আর টিভি দেখতেও ইচ্ছে হচ্ছে না মেঘের। তারপরও কিছুক্ষণ টিভির দিকে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ পর উঠে রুমের দিকে যেতে নিলে আবারো আবির ভাইকে দেখতে পেলো, পেস্ট রঙের একটা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি দিয়ে নিজের রুম থেকে বের হচ্ছে নামাজে যাওয়ার জন্য।। মেঘ ঠায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো আবির ভাইয়ের পানে, দৃষ্টি যেনো সরছেই না।
আবির মেঘের কাছাকাছি এসে মেঘের চোখে দিকে তাকিয়ে থমথমে কন্ঠে শুধালো,
“এখন ভালো লাগছে তো?”
মেঘ উপর-নিচ মাথা নেড়ে, চিবুক নামিয়ে বিড়বিড় করে বললো,
“ফিদা”
মেঘ বিড়বিড় করে বললেও আবির শব্দটা স্পষ্ট শুনেছে , আবির মুচকি হেসে সহসা স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“আমার রুমে টেবিলের উপর তোর জন্য গিফট রাখা আছে। দেখিস পছন্দ হয় কি না! ”
আবির দীর্ঘ পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে বেড়িয়ে যাচ্ছে মেইনগেইট পেরিয়ে, অষ্টাদশী অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাজপুত্রের গমনপথে, অধরের কোণে মৃদু হাসিটা এখনও লেগেই আছে।
কয়েক মুহুর্ত পর আবিরের রুম থেকে নিজের জন্য রাখা গিফট টা নিয়ে নিজের রুমে চলে আসছে।
একটা ছোট বক্স সাথে একটা বড় বক্স। ছোট একটা চিরকুট ও আছে।
“সংকল্প, শক্তি, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে জীবনের প্রতিটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে৷ অনেক অনেক শুভকামনা রইলো তোর জন্য । অভিনন্দন, Dear Sparrow. ”
কয়েকবার চিরকুট টা পড়ে মেঘ শুধু Sparrow লেখাটার দিকে চেয়ে আছে। আবির ভাই যে স্পেশাল কোনো নামে মেঘকে সম্বোধন করেছেন তা দেখেই মেঘ খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেছে। ছোট বক্সের রেপিং সরাতেই চোখে পরলো লাল রঙের একটা সুন্দর বক্স, সচরাচর গোল্ডের জিনিসপত্রের ক্ষেত্রে এগুলো বেশি থাকে। বক্স খুলতেই চোখে পরলো সুন্দর ডিজাইনের একটা গোল্ডের ব্রেসলেট। মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে ব্রেসলেটের দিকে। মেঘের সকল অপূর্ণ ইচ্ছে আবির ভাই যেনো ধীরে ধীরে পূরণ করেই যাচ্ছে। iPhone, ল্যাপটপ, নুপুর, বাইকে ঘুরা থেকে শুরু করে ছোট বড় কত কত ইচ্ছে পূরণ করতেই যেনো মেঘের জীবনে আবির ভাইয়ের আগমন ঘটেছে। ব্রেসলেট হাতে দিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে, ফোন নিয়ে কয়েকটা ছবিও তুলেছে। তারপর বড় বক্সটা খুলতে দ্বিতীয় বারের মতো বড়সড় শ*কট খেলো। ১০ কালারের ২ সেট করে মোট ২০ ডজন কাঁচের রেশমি চুড়ি বক্সে জ্বলজ্বল করছে, সাথে অনেকগুলো আংটি।
মেঘ চুড়ির দিকে চেয়ে মনে মনে ভাবছে,
“যেই মানুষটা আমার সাথে ঠিকমতো কথায় বলেন না, উঠতে বসতে এত রা*গ দেখান, থা*প্পড় মা*রেন ওনি এসব কিছু আমার জন্য এনেছেন? যাকে এতদিন অনুভূতিহীন ভেবে আসছি ওনি আসলে এতটাও অনুভূতিহীন নয়। ”
মেঘ সব কালারের চুড়ি পড়ে পড়ে ছবি তুলেছে, গতকাল তানভির একটা ব্র্যান্ডের ঘড়ি দিয়েছিল, সেটা পরেও ছবি তুলেছে, সবগুলো হাতের ছবি একসাথে করে ফেসবুকে পোস্ট করেছে। পোস্ট করার সঙ্গে সঙ্গে বন্যাকে কল করেছে,
বন্যাও গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। গতকাল দুজনেই ব্যস্ত থাকার কারণে কথা বলতে পারে নি। বন্যা ফোন রিসিভ করেই বললো,
“এত গিফট তোরে কে দিলো রে?”
মেঘ স্ব শব্দে হেসে বললো,
” আমার স্বপ্নের নায়ক ”
বন্যা কপাল কুঁচকে বললো,
“আবার ফা*লতু ব্যাটারে নিয়ে স্বপ্ন দেখছিস?”‘
মেঘ ঠোঁট কামড়ে বললো,
“আমি কি করবো, আমার এত ভাল্লাগে কেন ওনারে!”
বন্যা স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“সেসব বাদ দে, চল বিকেলে দেখা করি। পাখি আর মায়াও বলছে বের হবে। অনেকদিন দেখা হয় না ওদের সাথে । রেজাল্টের খুশিতে একটু আড্ডাও দেয়া যাবে। আসবি?”
মেঘ একটু ভেবে বললো,
“ঠিক আছে। ”
আবির নামাজ থেকে এসে সকাল আর দুপুরের খাবার একবারে খেয়ে বেরিয়ে পরেছে। আবির বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই মেঘ নিচে নেমেছে, হালিমা খানকে জরিয়ে ধরে আহ্লাদী স্বরে বলছে,
“”আম্মু একটু ঘুরতে যাই….!””
হালিমা খান মেয়ের দিকে না তাকিয়েই বললেন,
“আমাকে বলছিস কেন? আমি অনুমতি দেয়ার কে? তোর ভাই রা আছে, বাপ-চাচা আছে, তাদের থেকে অনুমতি নিয়ে যা। ”
মেঘ হাসছে আর বলছে,
“তুমি বললেই হবে। আর কেউ তো বাসায় নেই। বন্যা,পাখি আর মায়া ও আসবে। যাই না প্লিজ!”
হালিমা খান চিন্তিত স্বরে বললেন,
” যাবি যা কিন্তু বেশিদূর যাস নে আর ড্রাইভারকে বল দিয়ে আসতে। ”
মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“গাড়ি নিয়ে বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে যেতে আমার ভালো লাগে না। আমি রিক্সা দিয়ে চলে যাবো।”
হালিমা খান কপাল কুঁচকে বলে উঠলেন,
“তুই ও তো তোর ভাইদের মতই হইতেছিস। গাড়িতে চলাচল করতে তোদের এত কি সমস্যা , বুঝি না। ”
মেঘ স্ব শব্দে হেসে নিজের রুমের দিকে ছুটে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যে রেডি হয়ে নিচে নামলো । মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে রিক্সা করে চলে গেলো গন্তব্যস্থলে। ওরা তিনজন আগেই চলে এসেছে। ইচ্ছেমতো ফুচকা খেয়ে, কাছেই একটা ফাঁকা মাঠে ৪ বান্ধবী বসেছে আড্ডা দিতে। পড়াশোনা, পরিবারের কথার শেষে প্রেমের টপিক উঠলো। পাখির বিয়ে ঠিকঠাক, এডমিশন টেস্টের পরেই খালাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে।। এদিকে মায়ারও বয়ফ্রেন্ড আছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে৷ তাই মায়া মনেপ্রাণে চেষ্টা করছে যেনো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতে পারে৷ ধীরে ধীরে আবির ভাইয়ের কথা উঠলো, মেঘ অবলীলায় আবির ভাইয়ের প্রতি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলো।
সবকিছু শুনে মায়া অকস্মাৎ বলে উঠলো,
“আমার কাছে একটা প্ল্যান আছে। ”
বাকি তিনজনই একসঙ্গে বলে উঠলো,
“কি প্ল্যান?”
মায়া বললো,
“আমাদের মধ্যে কারো ফোন থেকে তোর আবির ভাইয়ের নাম্বারে কল দে, একটু ঢং করে কথা বলবি দেখবি ওনার মনে কি আছে। যদি ওনি কাউকে পছন্দ করেন , তাহলে সেটাও প্রকাশ পাবে সাথে ওনার ক্যারেক্টার সম্পর্কেও ধারণা হয়ে যাবে। ”
মেঘ প্রথম দিকে রাজি না হলেও ওদের চাপে রাজি হলো৷ মায়ার নাম্বার থেকেই কল দিলো আবির ভাইয়ের নাম্বারে। আবির ভাই চট্টগ্রাম থাকাকালীন ই নাম্বার টা সেইভ করেছিলো মেঘ কিন্তু কোনোদিন কল দেয়ার সাহস করে নি। আজ মায়ার ফোনে আবির ভাইয়ের নাম্বার টা লেখার সময়ই মেঘের হাত কাঁপছিলো। ডায়াল করলো আবির ভাইয়ের নাম্বারে, ভয়ে মেঘের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। প্রথম বার রিসিভ হলো না। মায়া আর পাখি মেঘকে সাহস দিলো, বন্যা নিরব দর্শক । সে চায় মেঘ ভালো থাকুক, সেটা আবির ভাইয়ের সাথেই হোক বা অন্য কারো সাথে যে মেঘকে ভালো রাখবে। দ্বিতীয় বার কল দিয়েছে, কয়েকবার রিং হওয়ার পর রিসিভ হলো,
লাউডস্পিকার দিয়ে মেঘ রোমান্টিক মুডে ডাক দিলো,
“জা…..ন”
আবির কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“কে?”
মেঘ ঢুক গিলে আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
“আমি তোমার বউ। ”
আবির মুচকি হেসে উত্তর দিলো,
“হ্যাঁ জান বলো। ”
মেঘ দাঁতে দাঁত চেপে, বৃহৎ চোখে চাইলো বান্ধবীদের দিকে।
রাকিব ডেকে উঠলো,
“কিরে আবির কার সাথে কথা বলিস। ”
আবির উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
“আমার বউ কল দিছে, ডিস্টার্ব করিস না। ”
মেঘ সহ বাকি তিনজনই হা করে চেয়ে আছে। মায়া কল মিউট করে মেঘকে কানে কানে কি বলেছে,
আনমিউট করে মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“I miss you Jaan”
আবির নিঃশব্দে হেসে উত্তর দিলো,
“I miss you too jaan. কোথায় আছো বলো আমি এখনি আসছি৷ ”
আবিরের মুখে এমন কথা শুনে মেঘ তাজ্জব বনে গেলো, নিঃশ্বাস যেন গলায় আটকে যাচ্ছে। শরীর ঘামতে শুরু করেছে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। প্রেমিকা সুলভ মনে এক মুহুর্তেই আঁধার নেমেছে। চেনা নেই জানা নেই আননোন নাম্বারের কোনো মেয়ের সাথে আবির ভাই এভাবে কথা বলবেন সেটা মেঘ ভাবতেই পারছে না। মেঘ এক হাতে মাথা চেপে ধরেছে।
আবির পুনরায় প্রশ্ন করলো,
“কি হলো? কথা বের হচ্ছে না গলা দিয়ে?”
মায়া আর পাখির ঠ্যালায় মেঘ ধীর কন্ঠে শুধু বললো,
” কিছু না। ”
আবির এবার স্বভাব-সুলভ গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
” কোথায় বসে বাদড়ামি করা হচ্ছে শুনি ”
আবির ভাইয়ের প্রশ্নে মেঘ আরও বেশি আশ্চর্যান্বিত হলো। কয়েক মুহুর্ত নিরব থেকে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,
“মা… মানে?”
আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারী করে জবাব দিলো,
“বাসা থেকে একা বের হয়েছিস, একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলি না। এত বড় হয়ে গেছিস। ”
মেঘের চোখ কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসার অবস্থা হলো, শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, এভাবে আবির ভাইয়ের কাছে ধরা পরে যাবে এটা ভাবতেও পারে নি। লাউডস্পিকার অফ করে ফোন কানে ধরেছে।
মেঘকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে আবির নিরেট কন্ঠে বললো,
“যেখানে নিঃশ্বাসের শব্দে
আমি তোর অস্তি*ত্ব উপল*ব্ধি করতে পারি,
সেখানে তোর কন্ঠ আমি চিনবো না?
ভাবলি কিভাবে !”
মেঘ পাথরের ন্যায় বসে আছে। আবির ভাই কি বলছে তার কিছুই মাথায় ঢুকতে না। সে যে ধরা পরে গেছে এটা ভেবেই লজ্জায় ম*রে যেতে ইচ্ছে করছে। আবির ভাই কি না কি ভাববে, থা*প্পড় না দিয়ে বসেন আবার। থা*প্পড়ের কথা মনে পরতেই সঙ্গে সঙ্গে গালে হাত দিলো মেঘ।
আবির পুনরায় প্রশ্ন করলো,
“কোথায় আছিস?”
মেঘ তখনও গালে হাত দিয়ে নি*স্তব্ধ হয়েই বসে আছে। আবির রা*গান্বিত স্বরে বলে উঠলো,
“কি হলো? বল!”
মেঘের গলা কাঁপছে, কোনোরকমে জায়গার নামটা শুধু বললো।।
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে জানালো,
“আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আসছি। ”
বলেই কল টা কেটে দিলো৷
আবির ভাই কল কাটতেই অষ্টাদশী আকাশের পানে চেয়ে বড় করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
“আল্লাহ বাঁচাও আমায়। আর জীবনে এমন কান্ড করবো না। এবারের মতো বাঁচিয়ে নাও।”
বন্যা চিন্তিত স্বরে শুধালো,
“কি হয়ছে ব*কা দিছে?”
পাখি আর মায়াও অবুঝের মতো চেয়ে আছে। মেঘ এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে জানালো,
“কিছুক্ষণের মধ্যে আসবে। দোয়া কর যাতে মা*ইর না খায়। ”
এই কথা শুনে পাখি, মায়া আর বন্যাও তটস্থ হয়ে গেছে। সবাই চিন্তায় পরে গেছে । ফাজলামো করতে গিয়ে এভাবে সিরিয়াস হয়ে যাবে ভাবতে পারে নি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বাইক এসে থামলো রাস্তার পাশে। সেই নামাজের সময় পরা পাঞ্জাবি টা দেখেই মেঘ চিনতে পারলো।
মেঘ সেদিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ভয়ে ভয়ে বললো,
“আবির ভাই….. ”
বাকি তিনজনের নজর পরলো সেদিকে। আবির বাইক থেকে নেমে বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে হেলমেট খুলছে। বন্যা আবির ভাইকে আগে দেখলেও পাখি আর মায়া আগে দেখে নি।
মায়া উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
“ওনি কি আবির ভাই?”
বন্যা জবাব দিলো,
“হ্যাঁ”
মায়া পুনরায় বললো,
“আল্লাহ কি হ্যান্ডসাম! মাশাআল্লাহ। এত কিউট জানলে আমিই কথা বলতাম, পটিয়ে আমার করে নিতাম। ”
মেঘ রাগান্বিত স্বরে বলে উঠলো,
“আমার আবির ভাইয়ের দিকে কেউ ন*জর দিবি না বলে দিলাম। ”
কথাটা বলেই মায়ার ফোন নিয়ে সেখান থেকে আবির ভাইয়ের নাম্বার টা ডিলিট করে ফোন রেখে নিজের পার্টস নিয়ে রা*গে ফুঁসতে ফুঁসতে উঠে চলে গেছে। মেঘের এমন কান্ডে পাখি আর মায়া দুজনেই হাসছে। কিন্তু বন্যা স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছে মেঘের দিকে। আবির ভাইয়া কিভাবে রিয়েক্ট করবেন সেটা দেখতে ব্যস্ত বন্যা।
মেঘ আবিরের কাছাকাছি আসতেই আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেঘের দিকে চাইলো, ক্রো*ধিত মুখশ্রী দেখে আবির কপাল গুটালো, মেঘের সরু নাকের ডগা ফুলে উঠেছে, ঘামে চিকচিক করছে মুখ, সাথে লাল হয়ে আছে দু গাল। মেঘ কাছাকাছি আসতেই আবির ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,
” রা*গ উঠেছে কেন? আরও আড্ডা দিলে যাহ! আমি ওয়েট করছি। সমস্যা নেই। ”
মেঘ রা*গে ফুঁসতে ফুঁসতে উত্তর দিলো,
“আড্ডা দিবো না, চলে যাবো। ”
আবির চিন্তিত স্বরে বললো,
“কি হয়েছে? কে কি বলছে? ”
মেঘ মনে মনে বলছে,
“আপনার উপর কারো নজর আমি সহ্য করতে পারবো না। ”
আবির ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,
“চলে যাবি?”
মেঘ উপর-নিচ মাথা নাড়লো।
আবির নিজের হেলমেট টা মেঘকে নিজের হাতে পরিয়ে দিচ্ছে। মেঘ ভ্রু কুঁচকে আবির ভাইয়ের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলো,
“এটা তো আপনার হেলমেট, আমায় দিচ্ছেন যে!”
আবির ভারী কন্ঠে উত্তর দিলো,
“রাকিবের হেলমেট নিয়ে আসছি। আমি ঐটা পরবো। ”
এই দৃশ্য তিন বান্ধবী অবাক চোখে দেখছে। বন্যা এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আবির ভাইয়া রিয়েক্ট করেন নি সেই অনেক।।
পাখি হাসিমুখে বলছে,
“মেঘ ওনাকে পেলে সত্যিই অনেক হ্যাপি থাকবে। দোয়া করি মেঘ যেনো ওনাকে পেয়ে যায়। ”
মায়া ও সঙ্গে সঙ্গে তাল মেলাবো। কয়েক মুহুর্ত পর আবির বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেলো।। ওরা তিনজন ও যে যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
আবির মেঘকে একটা ভালোমানের হেলমেটের আউটলেটে নিয়ে গেছে। মেঘকে লেডিস হেলমেট পছন্দ করতে বলে আবির সাইডে বসে আছে। মেঘ ঘুরে ঘুরে দেখছে, অনেক ঘুরে ৩ টা হেলমেট নিয়ে হাজির হলো আবিরের সামনে।।
ছোট করে প্রশ্ন করলো,
“কোনটা নিবো?”
আবির তিনটা হেলমেট পাশে রেখে ভারী কন্ঠে বললো,
“আমার জন্য পছন্দ করে নিয়ে আয়৷ ”
মেঘ আহাম্মকের মতো চেয়ে আছে । নড়ছেও না জায়গা থেকে।
আবির কপাল কুঁচকে তাকালো, গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“কি বললাম আমি?”
মেঘ চুপচাপ চলে গেলো। অনেক খোঁজে দুটা নিয়ে আসছে। আবির সবগুলো হেলমেট ভালো ভাবে দেখে প্যাকিং করে দিতে বললো।।
মেঘ বিষ্ময় চোখে চেয়ে কোমল কন্ঠে বললো,
“এত হেলমেট নিয়ে কি করবেন! হেলমেট তো একটা হলেই হয়। ”
আবির চোখ রাঙিয়ে মেঘের দিকে চাইলো। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চিবুক নামালো গলায় । মনে পড়ে গেলো হিজাব কেনার ঘটনা। মনে মনে বলছে,
” কি মানুষ রে বাবা! আমি কনফিউজড হয়ে ওনার কাছে এনেছি আর ওনি পছন্দ না করে সবগুলোই নিয়ে নিলেন। আমি যদি জানতাম ওনি ৫ টায় নিয়ে নিবেন তাহলে আমি ২ টা হেমলেট ই বেছে নিয়ে আসতাম।”
হেলমেট কিনে বের হয়ে আবির ভারী কন্ঠে শুধালো,
“কাচ্চি খাবি?”
মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিলো,
“হাবিজাবি অনেক কিছু খেয়েছি এখন আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। ”
আবিরও আর কথা বাড়ালো না। মেঘকে বাসার সামনে নামিয়ে নিজের মতো চলে গেছে। মেঘ হেলমেট গুলো আবির ভাইয়ের রুমে রেখে নিজের রুমে এসে রেস্ট নিয়ে পড়তে বসেছে৷
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
বেশকিছুদিন চলে গেছে। মেঘের পড়াশোনার চাপ বেড়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন ছাড়ছে, ভর্তি পরীক্ষা ঘনিয়ে আসছে। পড়াশোনার ব্যস্ততার মাঝেও রোজ নিয়ম করে আবির ভাই অফিসে যাওয়ার সময় এবং রাতে ফেরার সময় বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দেখে। আবিরও অফিসের কাজে ব্য*স্ত হয়ে পরেছে। চারদিক সামলাতে যথারীতি হিমসিম খাচ্ছে।
একদিন মেঘের কাচ্চি খেতে খুব ইচ্ছে করছে। তানভির ভাইয়া নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত তাই ফোন দিতে সাহস হচ্ছে না। মীমের কাছে গিয়ে বলাতে, মীম সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,
“ভাইয়া কে বলো নিয়ে আসতে। ”
মেঘ ঢুক গিলে বললো,
“আমি বলতে পারবো না। তুই কল দিয়ে বল। ”
মীম ভয়ে ভয়ে জানালো,
“আমি বলবো?”
মীম টেলিফোন থেকে আবিরকে কল দিলো। আবির রিসিভ করতেই মীম বললো,
“আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া। ”
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিলো,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। কিছু বলবি?”
মীম অকস্মাৎ বলে উঠলো,
“আপুর কাচ্চি খেতে ইচ্ছে করছে। ”
মেঘ রাগে মীমের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে বলছে,
“তুই আমার কথা বললি কেন ?”
আবির কন্ঠ ভারী করে প্রশ্ন করলো,
“মেঘ কোথায়? ”
মীম মৃদু হেসে বললো,
“এখানেই আছে।”
আবির রাগান্বিত কন্ঠে বললো ,
“ওর কি ফোন নেই? নাকি ও কথা বলতে পারে না? তোকে দিয়ে বলাতে হয় কেন?”
ধ*মক শুনে মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে দু হাতে কান চেপে ধরলো যাতে আবির ভাইয়ের বাকি কথা শুনতে না পারে।
আবির গম্ভীর কন্ঠে পুনরায় বলে উঠলো,
“ওর কাছে ফোন দে। ”
মীম ভীত স্বরে বললো,
“আপু চোখ-কান বন্ধ করে বসে আছে। ”
আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রা*গ হজম করে বললো,
“ওর কান থেকে হাত সরিয়ে, ফোন টা ওরে দে।”
মীম যথারীতি তাই করলো। মেঘ ভয়ে ভয়ে ফোন কানের কাছে নিলো। কিছু বলার আগেই আবির ঠান্ডা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কাচ্চি কি এখনই আনতে হবে নাকি ঘন্টাখানেক পর নিয়ে আসলে হবে?”
মেঘ বিস্ময় চোখে তাকালো মীমের দিকে, ভেবেছিল না জানি কত ব*কা খাবে কিন্তু ঘটলো পুরো উল্টো । মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিলো,
“পরে আনলেও হবে। ”
ঘন্টাদুয়েক পর মেঘ রুমে বসে ইয়ারফোন দিয়ে গান শুনছিলো। এরমধ্যে আবির বাসায় এসেছে। গানের সাউন্ডে বাইকের শব্দও শুনেনি মেঘ।
আবির মীমকে দু প্যাকেট দিয়ে বাকি একটা কাচ্চির প্যাকেট নিয়ে মেঘের রুমে গেলো। হঠাৎ আবির ভাইকে দেখে মেঘ ভূ*ত দেখার মতো চমকে উঠে কান থেকে ইয়ারফোন খুলে ফেললো। আবির কাচ্চির প্যাকেট মেঘকে দিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো,
“তোর ফোনটা দে। ”
(চলবে)
গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ২৫
লেখিকা- সালমা চৌধুরী
মেঘ ভ*য়ে ভ*য়ে ফোন এগিয়ে দিলো আবিরের দিকে। ফোন হাতে নিতেই আবিরের চোখে পরলো ফোনে গান বাজতেছে,
“কি নে*শা ছড়ালে!
কি মায়ায় জড়ালে”
আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকিয়ে পুনরায় ফোনে মনোযোগ দিলো। কয়েক মুহুর্ত পর অষ্টাদশীর ফোনে ছবিসহ নিজের নাম (Amar Abir❤️……………… Vai)
দেখে হুট করেই বিষম খেয়ে উঠলো আবির। কাশতে কাশতে বিছানার পাশে বসে পরেছে।
মেঘ আঁতকে উঠে শুধালো,
“কি হয়ছে আবির ভাই? ”
মেঘ সঙ্গে সঙ্গে পানি ঢেলে গ্লাস এগিয়ে দিয়ে,আবির ভাইয়ের মাথায় ফুঁ দিচ্ছে। আবির কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে গ্লাসের সবটুকু পানি খেয়ে শেষ করলো। মেঘের ফোন বিছানায় রেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। গ্লাস মেঘকে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক পলক তাকালো অষ্টাদশীর মুখের পানে, এমন কান্ডে হাসবে নাকি রা*গ করবে সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না আবির।
কিছুক্ষণ বসে, উঠে যাওয়ার সময় গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“আমার নাম্বার তো তোর ফোনে আছেই। তাহলে মামনিকে দিয়ে,মীমকে দিয়ে কেনো কল দেয়াতে হয়? তুই কল দিতে পারিস না?”
মেঘ জিহ্বায় কামড় দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
দু পা এগিয়ে আবির পুনরায় থমকে দাঁড়ালো, ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে রাশভারি কন্ঠে বললো,
“ভ*ন্ডামি বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দে।”
কথা টা বলে এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় নি। বেরিয়ে পরেছে রুম থেকে।
মেঘ বিড়বিড় করে বলছে,
“স*র্বনা*শ! নাম্বার সেইভ করা দেখে বিষম খেলেন ওনি?”
মেঘ তাড়াতাড়ি বসে নাম্বার টা বের করলো। একবার ভাবলো নাম টা পাল্টাবে পরক্ষণেই মনে হলো,
“যা দেখার তো দেখেই ফেলছে, এখন আর পাল্টালে কি হবে? ”
মেঘ ছবিটা দেখে হাসছে আর আর বলছে,
“আহারে! কবে যে নামের পিছন থেকে Vai টা সরাতে পারবো!”
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
কিছুদিন পর আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খান অফিসে কাজের ফাঁকে গল্প করছিলেন। গল্প না ঠিক, দু ভাই নিজেদের সুখ- দুঃখের কথা শেয়ার করছিলেন। মোজাম্মেল খান আর আলী আহমদ খান ছোট থেকেই বন্ধুর মতো। এখন যেমনটা তানভির আর আবিরের সম্পর্ক ।
মোজাম্মেল খানকে চিন্তিত দেখে আলী আহমদ খান প্রশ্ন করলেন,
“কিরে কি হয়েছে তোর? শরীর খারাপ নাকি?”
মোজাম্মেল খান চিন্তিত স্বরে বললেন,
“মেঘকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি, ভাইজান। ”
আলী আহমদ খান গম্ভীর কন্ঠে শুধালেন,
“মেঘ মা কে নিয়ে আবার তোর কিসের চিন্তা? কত লক্ষী একটা মেয়ে। ”
মোজাম্মেল খান তপ্ত স্বরে বললেন,
“সামনে ভার্সিটি পরীক্ষা, মেডিকেল পরীক্ষা। তানভির টা তো ঠিকমতো পড়লোই না, এখন সব আশা ভরসা তো মেঘকে নিয়েই। ”
আলী আহমদ খান ভাইকে সাহস দিয়ে বললেন,
“আরে চিন্তা করিস না। ইনশাআল্লাহ চান্স হয়ে যাবে না হলে কত কত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আছে ঐগুলোতে পড়াবো।৷ সমস্যা কি?”
মোজাম্মেল খান মন খারাপ করে বললেন,
“আমি তো চাই মেয়েটা মেডিকেলে পড়ুক।”
আলী আহমদ খান হাসিমুখে উত্তর দিলেন,
” ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। দিনশেষে ওরা মানুষ হলেই হলো। আমার আর কোনো চিন্তা নেই। ”
মোজাম্মেল খান এবার একটু ঠাট্টার স্বরে বলে উঠলেন,
“হ্যাঁ, তোমার আর চিন্তা কি! তোমার ছেলে তো পড়াশোনা শেষ করে, তোমার কথা মতো ব্যবসায় জড়িয়ে গেছে। তোমার তো খুশি লাগবেই। ”
আলী আহমদ খান ভাইয়ের কথায় স্ব শব্দে হেসে উঠলেন, হাসতে হাসতে বললেন,
“আমার ছেলে আমার কথা মেনে অফিসে আসছে এটা দেখছিস৷ সাথে নিজের মর্জিমাফিক কোম্পানি শুরু করেছে, বাইক কিনলো, রাত বিরাতে বাড়ি ফিরে, নিজের মতো চলে এগুলো নিয়ে তো কিছু বললি না। সেসব কথা বাদ দে, আমার ছেলে আর তোর ছেলে বলতে কিছু নেই। আমরা যেমন মিলেমিশে আছি। আমি চাই আমাদের সন্তানরাও সারাজীবন মিলেমিশে থাকুক।”
মোজাম্মেল খান হাসিমুখে উত্তর দিলেন,
“দোয়া করি তাই যেনো হয়। ”
এরকমে আবির দরজায় দাঁড়িয়ে বললো,
“আসবো?”
আলী আহমদ খান তাকিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ আসো। তোমাকে কতদিন বলেছি, আমার রুমে আসতে অনুমতি নিতে হবে না। ”
আবির ভারী কন্ঠে উত্তর দিলো,
“আপনারা কথা বলছিলেন, হুট করে ঢুকে পড়া টা ভালো দেখাবে না তাই ভেতরে ঢুকি নি। ”
মোজাম্মেল খান বললেন,
“আমাদের সব কথা তো তোমাদের কে নিয়েই। তোমরা ভালো থাকো এটায় তো চাই। ”
চাচ্চুর দিকে চেয়ে আবির মুচকি হাসলো।
তারপর আব্বুর দিকে একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বলল,
“সময় করে ফাইল টা একটু দেখে নিয়েন, প্লিজ। ”
আবির যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে আলী আহমদ খান ডেকে উঠলেন,
“শুন।”
আলী আহমদ খান ছেলের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বললেন,
“দুই অফিস সামলাতে কি খুব কষ্ট হচ্ছে? ”
আবির মৃদু হেসে উত্তর দিলো,
“না, সমস্যা নেই। কষ্ট না করলে আপনাদের মতো সাকসেসফুল কিভাবে হবো! ”
আলী আহমদ খান নিঃশব্দে হেসে বললেন,
“সব বাদ দিয়ে কাজ করলে তো হবে না। নিজের যত্ন নিতে হবে তো। অফিস তো শেষ ই বাসায় যাবে না?”
আবির ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“৫-১০ মিনিট পর বেড়িয়ে যাবো। ”
আবির বাবার কেবিন থেকে বের হয়ে নিজের কেবিনে চলে গেছে।। মোজাম্মেল খান আর আলী আহমদ খান ফাইল চেক করে রেখে বেড়িয়েছে বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে আসতে আসতে, আলী আহমদ খান হঠাৎ ই শাহরিয়ারকে দেখে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে উচ্চস্বরে ডাকলেন,
“এই, শাহরিয়ার! ”
শাহরিয়ার কাছেই একটা দোকানে কি কিনতেছিলো। আলী আহমদ খানকে দেখে এগিয়ে এসে সালাম দিয়েছে।
আলী আহমদ খান সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
“কেমন আছো তুমি?”
শাহরিয়ার হাসিমুখে উত্তর দিলেন,
“জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনারা কেমন আছেন?”
দু ভাই সমস্বরে বলে উঠলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। ”
আলী আহমদ খান স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,
“তুমি যে অসুস্থ ছিলা সুস্থ হয়েছো?”
শাহরিয়ার মনে মনে বিড়বিড় করে বললো,
“ছেলে মে*রে হাসপাতালে পাঠাইছে আর এখন বাপে খবর নিচ্ছে। ভালোই। ”
আলী আহমদ খান পুনরায় বলে উঠলেন,
“তুমি যদি বলতে আমাদের বাসা দূরে হয়ে যায় তোমার জন্য । আমি পেমেন্ট বাড়াতাম। কিন্তু তুমি তো কিছু জানালেও না। ”
শাহরিয়ার শুধু বলেছে,
“না মানে…”
ওমনি চোখ পরেছে অফিস গেইটের সামনে দাঁড়ানো আবিরের দিকে। চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে শাহরিয়ারের দিকে।
মোজাম্মেল খান গম্ভীর স্বরে বললেন,
“কি হলো?”
শাহরিয়ার ঢুক গিয়ে ধীর কন্ঠে জানালো,
“অসুস্থ ছিলাম তাই জানাতে পারি নি। এটা কি আপনাদের অফিস আংকেল?”
আলী আহমদ খান হাসিমুখে উত্তর দিলেন,
“হ্যাঁ। আসো ভেতরে আসো। চা – কফি খেয়ে যাও। ”
শাহরিয়ার মাথা নেড়ে না করলো আর মনে মনে বললো,
“আগে জানলে এই রাস্তায় আসতাম ই না। আবার অফিসে বসে চা- কফি খাবো। আর মা*ইর খেতে চাই না । ”
শাহরিয়ার চোখ তুলে চাইতেই দ্বিতীয় বার চোখাচোখি হলো আবিরের সাথে৷ আবির রা*গে কটমট করছে। শাহরিয়ার তাকাতেই আঙুল দিয়ে ইশারা করলো, চলে যেতে।
শাহরিয়ার বাধ্য ছেলের মতো বিদায় নিয়ে সেখান থেকে কেটে পরলো।
আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খান ঘুরতেই আবির হেলমেট পড়তে ব্যস্ত হলো । মোজাম্মেল খান আবিরকে দেখে বলে উঠলেন,
” ছেলেটাকে মেঘের জন্য টিউটর ঠিক করা হয়ছিলো। তুমি আসার পরেই তো পড়াতে গিয়েছিল। চিনতে পারো নি?”
আবির গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিলো,
“কি জানি, খেয়াল নেই । ”
আলী আহমদ খান ভাইয়ের দিকে চেয়ে জানালেন,
“ছেলেটা পড়াবে বললে ত পেমেন্ট বেশি দিয়ে হলেও রাখতাম। বলতে তো পারতো। ”
আবির ভারী গলায়, কপাল কুঁচকে বললো,
“ছেলে যদি পড়াতে না চায় তাহলে জোর করার কি দরকার তাছাড়া নতুন টিউটর তো শুনলাম ভালোই পড়াচ্ছে। ”
আলী আহমদ খান বললেন,
“একদিন এসে ছেলেটা আর বাসায় গেলো না, কল দিয়ে জানালোও না, ২-৩ দিন পর আমি কল দেয়ার পর বললো অসুস্থ আর পড়াবে না।। আজ সামনে পেয়েছি জিজ্ঞেস করলাম আরকি। ”
আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে জবাব দিলো,
“ছেলের পড়ানোর ইচ্ছে ছিল না তাই হয়তো জানায় নি। আপনারা এখন তাকে এত প্রশ্ন করছেন এতে সে বিরক্তও হতে পারে। ”
আলী আহমদ খান শ্বাস ছেড়ে বললেন,
“তাও ঠিক। কথা তো আজ বললাম ই। আর তো কথা বলার দরকার নেই। ”
আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খান গাড়িতে উঠে বাসার উদ্দেশ্যে চলে গেছে। আবির নিজের অফিস থেকে ঘুরে ঘন্টাখানেক এর মধ্যে বাসায় এসেছে। আবিরের বাইকের শব্দে মেঘ বেলকনিতে ছুটে গেছে। অনেকদিন ছাদে যাওয়া হয় না। মেঘ মনে মনে ভাবছিলো আবির ভাই আসলে চাবি নিয়ে ছাদে যাবে। মেঘ নিজের রুম থেকে বের হয়ে আবির ভাইয়ের দিকে দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, পলক পরছে না একটিবার। আবির মেঘের কাছে এসে একবার তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি নামালো, পকেট থেকে একটা কিটকেট চকলেট বের করে মেঘকে দিলো।
মেঘ চকলেট নিয়ে মাথা নুইয়ে মুচকি হাসলো। নিজেকে স্পেশাল কেউ মনে হচ্ছে। আবির চলে যাচ্ছে তৎক্ষনাৎ মেঘের মনে পরে গেলো চাবির কথা।।
মেঘ তটস্থ হয়ে ডাকে,
“আবির ভাই….!”
আবির রুমের দিকে যেতে যেতেই উত্তর দেয়,
“”হুমমমমম…!””
মেঘ একগাল হেসে বলে,
“ছাদে যাবো। চাবিটা কি দেয়া যাবে?”
আবির গুরুভার কন্ঠে বলল,
“নিয়ে যা এসে। ”
মেঘ দ্রুত নিজের রুমে গিয়ে চকলেট টা লুকিয়ে রেখে মোবাইল নিয়ে বের হয়েছে। আদি চকলেট হোক আর চিপস যা পায় সব ই খেয়ে ফেলে। এজন্য মীম আর মেঘ প্রিয় জিনিস বা খাবার গুলো লুকিয়ে রাখে যাতে আদি নিতে না পারে।
মেঘ চাবি নিয়ে তালা খুলে ছাদে চলে গেছে। বিকেলের রোদে গাছে থাকা ফুল গুলো জ্বলজ্বল করছে। ইদানীং প্রতি রাতেই বৃষ্টি হয় কিন্তু দিনের বেলা তার রেশমাত্র থাকে না। মেঘ কয়েকটা গাছের পাতা আর অবাঞ্ছিত ডালপালা কেটে হাত ধৌয়ে ছাদে হাঁটছিলো। ১০-১৫ মিনিট পর আবির একটা সেন্টু গেঞ্জি আর লুঙ্গি পড়ে ছাদে আসছে। আচমকা আবির ভাইকে দেখে কিছুটা ভ*য় পেয়েছে। তবে দেশে ফেরার পর এই প্রথমবার আবির ভাইকে লুঙ্গি পরা দেখে মেঘ দাঁত কেলিয়ে হেসে উঠলো। হাসি যেনো থামছেই না বরং হাসির তী*ব্রতা ত্রমশ বেড়েই যাচ্ছে ।আরির কপাল কুঁচকে তাকালো।
আবিরের চাউনীতে মেঘ চিবুক নামিয়ে মুখে হাত চেপে হেসেই যাচ্ছে। আবির কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“এভাবে হাসছিস কেন?”
মেঘের সরল স্বীকারোক্তি,
“আপনাকে দেখে হাসি পাচ্ছে। ”
আবির বিরক্তি হয়ে বললো,
“এভাবে হাসছিস যে, তোর তাঁনারা ধরবো নে। ”
অকস্মাৎ মেঘের মুখ বন্ধ হয়ে গেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখছে। মেঘের কান্ড দেখে আবির মুচকি হেসে ছাদের কর্ণারে সিঙ্গেল সোফায় গিয়ে বসে পরেছে।
সূর্যের আলো ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চুল বেঁধে মাথায় ঘোমটা টেনে ধীর পায়ে আবির ভাইয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরেছে। আবির ফোনে কথা বলছে আর মেঘ ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে আবির ভাইকে দেখছে।
প্রথম দেখে হাসলেও এখন মেঘের ভালোই লাগছে।। শক্তপোক্ত উন্মুক্ত বাহু দেখেই মনে হচ্ছে জিম করে এমন বডি বানিয়েছেন। প্রশস্ত বুকের লোমগুলো হালকা হালকা দেখা যাচ্ছে । আবির ভাইকে এভাবে দেখে মেঘের বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে যাচ্ছে। আবির ভাইয়ের হাতে মেহেদী দেয়া থাকলেই এখন নতুন জামাই লাগতো। এটা ভাবতেই মেঘের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেছে । আবির ভাইয়ের শ্যামবর্ণের মুখশ্রী সর্বক্ষণ মেঘের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খায়। চোখ বন্ধ করলেও সেই তামাটে চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠে।
মেঘ বিড়বিড় করে বললো,
“ডুবে ডুবে ভালোবাসি,
আপনি না বাসলেও
আমি বাসি। ”
মেঘ চুপিচুপি আবির ভাইয়ের ২-৩ টা ছবিও তুলে নিয়েছে। আবির কল কেটে মেঘের দিকে চেয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? রুমে যাহ। ”
মেঘ আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
“একটু থাকি না, প্লিজ। ”
আবির আর কিছুই বললো না। আহ্লাদী কন্ঠে মেঘ কিছু বললে আবির কখনোই না করতে পারে না। এই সেই ললনা যার সামান্যতম আবদারও আবির ফেলতে পারে না। আবিরের সমস্ত পৃথিবী একদিকে আর অন্যদিকে তার Sparrow. আবির চোখ বন্ধ করে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে।
বেশখানিকটা সময় মেঘ আবির ভাইকে সরু নেত্রে নিরীক্ষণ করে ধীর কন্ঠে ডাকলো,
“আবির ভাই…..!”
আবির চোখ বন্ধ করেই জবাব দিলো,
“হুমমমমম..!”
মেঘ উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“আপনার কি মন খারাপ?”
আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে উত্তর দিলো,
“কই না তো। ”
মেঘ কিছু বলতে যাবে তার আগেই আবির বলে উঠলো,
“আজান পরবে কিছুক্ষণের মধ্যে, তোর একটু থাকার ইচ্ছে মিটলে রুমে যা। ”
মেঘ বাধ্য মেয়ের মতো চুপচাপ রুমে চলে গেছে।
আবির মনে মনে বলছে,
” আমি তো তোর সাথে জীবনের প্রতিটা সূর্যোদয়- সূর্যাস্ত দেখতে চাই। তারজন্য অনেক ঝড়ঝাপটা পেরোতে হবে। যাই হয়ে যাক, একদিন তোকে আমার করে নিবোই ইনশাআল্লাহ। ”
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
হঠাৎ এক বৃহস্পতিবারে মেঘ আর বন্যা কোচিং থেকে বের হতেই দেখতে পেলো আবির ভাই বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। মেঘকে বের হতে দেখে আবির কিছুটা এগিয়ে আসলো। আবির বন্যার দিকে চাইতেই চোখাচোখি হলো দুজনের ।
বন্যা হাসিমুখে বললো,
“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া । কেমন আছেন?”
আবির স্বভাবসুলভ গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিলো,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো?”
বন্যা উত্তর দিলো,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। ”
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
” তুমি ই তো বন্যা। ”
বন্যা বলে,
” জ্বী ভাইয়া। ”
বন্যা পুনরায় বলে উঠলো,
“আমি আসছি ভাইয়া। ভালো থাকবেন। আসছি মেঘ ”
কথাগুলো বলে বন্যা কোনোরকমে পালালো এখান থেকে।
আবির মেঘের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে শুধালো,
“তোর বান্ধবীও দেখা যায় তোর ই মতো। ”
মেঘ আহাম্মকের মতো চেয়ে প্রশ্ন করলো,
“কেমন?”
আবির ঠাট্টার স্বরে বললো,
“তাড় ছিঁ*ড়া। ”
মেঘ ভ্রু কুঁচকে বললো,
“মোটেই না। ”
মেঘ ভেঙচি কেটে গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।
আবির স্ব শব্দে হেসে বললো,
“চড়ুই পাখিকে গাল ফুলালে পেঁচার মতো লাগে।”
মেঘ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আবির ভাইয়ের দিকে চাইলো। কিন্তু আবির ভাইয়ের মুখের অকৃত্রিম হাসি দেখে নিজের রা*গ টা ধরে রাখতে পারলো না।৷মেঘ নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কয়েক সেকেন্ড অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে সহসা মেঘের ওষ্ঠ ছড়িয়ে আসে। মেঘ মনে মনে বললো,
“আপনার এই হাসিতে আমি বেসামাল হয়ে যাবো।”
আবির বাইকের কাছে গিয়ে হেলমেট পরে নিলো। মেঘ কাছে যেতেই মেঘের জন্য কিছুদিন আগে কেনা একটা হেলমেট নিয়ে মেঘকে পড়াতে গেলে,
মেঘ বলে,
” আমি পড়তে পারবো। ”
আবির গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“আমি পরিয়ে দিলে সমস্যা? ”
মেঘের বুকের ভেতর তোলপাড় চলছে এটা সে আবির ভাইকে কিভাবে বুঝাবে। আবির ভাই কাছে আসলে ওনার শরীর থেকে আসা তী*ব্র ঘ্রা*ণ মেঘের মস্তিষ্কের নিউরন পর্যন্ত নাড়িয়ে দেয়। মেঘের বক্ষস্পন্দন জোড়ালো হয়। নিজেকে সামলানোর সব শক্তি ক্রমে ক্রমে বিলীন হয়ে যায়।
আবির নিজেই হেলমেট পরিয়ে দিয়ে বাইকে বসলো। মেঘের দিকে চাইতেই মেঘ ঘুরে গিয়ে বাইকে বসলো । আবির বাইক টান দিতেই, হুমড়ি খেয়ে পরলো আবিরের পিঠে । নিজেকে সামলে সঙ্গে সঙ্গে দু হাতে আবির ভাইয়ের কাঁধ চেপে ধরলো।
আবির উচ্চস্বরে বললো,
“আর একদিন ও তোকে ধরতে বলবো না। পরে গেলে ফেলেই চলে যাবো। ”
মেঘ চুপচাপ আশপাশে দেখছে। কতকত কাপল ফুটপাত দিয়ে একসাথে হাঁটছে। কেউ কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে, কেউ বা শাড়ি পাঞ্জাবি পরে হাটছে আর কতক মানুষ বাইকে, রিক্সাতে ঘুরছে। তাদের দেখে মেঘের মনে প্রেমানুভূতি জাগ্রত হয়। খুব ইচ্ছে করছিলো আবির ভাইকে পিছন থেকে জরিয়ে ধরার কিন্তু সাহস হয় নি। সব দ্বিধা দ্ব*ন্দ্ব সরিয়ে অকস্মাৎ আবিরের পিঠে মাথা রাখলো মেঘ।
আবির সঙ্গে সঙ্গে বাইকের গতি কমিয়ে, মৃদু হেসে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করলো। মেঘ তা বুঝতে পেরে সহসা মুখ তুলে স্বাভাবিক হয়ে বসলো।
আবিরের মুখের হাসিটা কয়েক সেকেন্ডে বিলীন হয়ে গেলো।
কিছুক্ষণের মধ্যে একটা বাইকের শোরুমের সামনে এসে থামলো। মেঘ উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“আমরা এখানে কেনো আসছি?”
আবির নিরেট কন্ঠে বললো,
” তোর ভাইয়ের জন্য বাইক কিনতে আসছি। ”
মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো,
“সত্যি? ”
আবির মেঘকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে বললো,
” পছন্দ কর। ”
মেঘের উত্তেজনা নিমিষেই মিলিয়ে গেলো, আস্তে করে বললো,
“আমি তো বাইক চিনি না। আর আমার পছন্দ ভাইয়ার কি ভালো লাগবে?”
আবির শক্ত কন্ঠে বললো,
“তানভিরের নির্দিষ্ট কোনো পছন্দ নেই। তাছাড়া তুই ওকে গিফট করবি এতে পছন্দ না হওয়ার কি আছে। তুই কালোর মধ্যে কয়েকটা পছন্দ কর। আমি তো আছিই। ”
মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে বললো,
“আমি গিফট করবো মানে?”
আবির কপাল কুঁচকে বললো,
“এত মানে বুঝতে হবে না। ”
আবির ঘুরে ঘুরে বাইকের ডিটেইলস বলছে আর মেঘ পছন্দ করছে। সবশেষে দুটা বাইক নিয়ে কনফিউজড।
মেঘ আবির ভাইয়ের দিকে চেয়ে ভণিতা ছাড়াই বলে উঠলো,
“দয়া করে দু’টা নেয়ার চিন্তা করবেন না। প্লিজ। ”
আবির মেঘের মুখোমুখি হয়ে ছোট করে বললো,
“আমার টা রেখে এই দুটা নিয়ে নেই?”
মেঘ চিৎকার দিয়ে উঠলো,
“নাহ…। আপনার টা আমার অনেক পছন্দ । ”
আবির মৃদু হেসে সাইডে গিয়ে বসলো। মেঘকে বললো তানভিরকে কল দেয়ার জন্য। আবিরের কথামতো মেঘ কল দিয়ে সেই সেই কথাগুলোই বলেছে যা আবির শিখিয়ে দিয়েছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তানভির চলে আসছে। মেঘ তানভিরের হাতে দুটা চিরকুট দিয়ে বললো,
“যেকোনো একটা তুলো। ”
তানভির বনুর কথামতো তাই করলো।
সহসা মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
“সারপ্রাইজ৷ এটা তোমার গিফট। আবির ভাইয়ের তরফ থেকে । ”
আবির পাশ ফিরে মেঘের দিকে চেয়ে বললো,
“আমাদের দুজনের পক্ষ থেকে, টাকা আমার পছন্দ ওর। ”
তানভির আবিরকে জরিয়ে ধরে বললো,
“Thank you so much Vaiya. ”
মেঘকেও ধন্যবাদ দিলো।
বাইকের সব কাজ শেষ করে শোরুম থেকে বের হয়েই মেঘ বললো,
“ভাইয়া ট্রিট দিবা না?”
তানভির হাসিমুখে বললো,
“অবশ্যই দিবো। ১ মিনিট ওয়েট কর বনু। ”
আবিরকে সাইডে নিয়ে তানভির কানে কানে বললো,
“ভাইয়া, হেল্প করো প্লিজ। ”
আবির কপাল কুঁচকে বললো,
“কি হেল্প?”
তানভির বিড়বিড় করে বললো,
“তোমার মতো আমিও আমার ওনাকে প্রথমে বাইকে বসাতে চাই। ”
আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে তপ্ত স্বরে শুধালো,
” আমি কারে প্রথমে বাইকে উঠাইছি?”
তানভির ঠাট্টার স্বরে বললো,
“আমার সামনে ঢং করো না ভাইয়া। আমায় বাইকে উঠাতে হবে বলে একা একা বাইক কিনে নিয়ে গেছো। মীম, আদিকে বাইকে ঘুরাবা দূরের কথা আমায় বাইক ছুঁতে ই দাও নি। বনুরে নিয়ে সর্বপ্রথম বাইকে ঘুরছো। বনুরে নিয়ে ঘুরার কয়েকদিন পরে আমারে তোমার বাইকে প্রথম উঠতে দিছো। কি ভাবছো? আমি জানি না? তুমি যেদিন প্রথম বনুরে নিয়া ঘুরছো সেদিন ই আমার বন্ধু আমায় বলছে। ”
আবির নিঃশব্দে হেসে বলছে,
“আস্তে বল, ও শুনে ফেলবে। ”
তানভির আকুল স্বরে বললো,
“তাহলে আমার ব্যবস্থা করে দাও প্লিজ।”
আবির গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিলো,
“তোর ওনাকে তো আনতেই চাইছিলাম কিন্তু ওনাকে বলার আগেই ছুটে পালাইছে।”
তানভির সুস্থির ভঙ্গিতে বললো,
“প্লিজ ভাইয়া…!”
আবির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো,
“তুই ও তো তোর বোনের মতোই হইছিস। ঠিক আছে, দেখছি। ”
(চলবে)