গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ৩৪
লেখিকা- সালমা চৌধুরী
মেঘ তাড়াহুড়ো করে আইসক্রিম শেষ করেছে। দুঃশ্চিন্তায় আইসক্রিম টাও শান্তিমত খেতে পারে নি৷ একদৃষ্টিতে আবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আবিরের দৃষ্টি অন্য কোথাও। আবির নিরবধি আকাশের পানে চেয়ে আছে, রাস্তার পাশে থাকা লাইটের আলোতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, আবিরের চোখমুখের উজ্জ্বলতা বিলীন হয়ে গেছে। বিকেলে আসার সময় যতটা উৎফুল্ল আবির ভাইকে মেঘ দেখেছিল, এই আবির ভাই যেন অন্য কেউ, চোখে মুখে চিন্তার ছাপ ৷ মেঘ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
আবির শোণিত কন্ঠে বলে উঠল,
” এই পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলো মা। সেই মায়ের লা*শ দেখার বা ছোঁয়ার অধিকার যদি কোনো সন্তানের না থাকে তাহলে সেই সন্তান পৃথিবীতে বেঁচে থেকেও মৃত।”
মেঘের ভ্রু কুঁচকালো। আবির ভাই কি বলছে, কি বুঝাতে চাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। আবির অসীম দূরত্ব থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে ভরাট কন্ঠে বলল,
“যে মানুষটাকে দেখে এসেছিল, তিনি আর কেউ নয় তোর, আমার, আমাদের সবার একমাত্র ফুপ্পি ”
এই কথা শুনামাত্র মেঘের রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হওয়ার অবস্থা হয়ে গেছে, মেঘ চিৎকার দিয়ে উঠল,
” কি? ”
আবির সরু নেত্রে তাকিয়ে আছে। মেঘের চোখ যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। চোখে মুখে অবিশ্বাসের ছাপ। এই কথা কখনোই বিশ্বাসযোগ্য নয়৷ জন্মের পর থেকে মেঘ জেনে এসেছে তাদের বাবা-চাচা তিনজন। ১৮ বছর পর হঠাৎ করে ফুপ্পি আসবে কোথা থেকে! আচমকা এমন কথা শুনলে বিশ্বাস করবে না এটায় স্বাভাবিক।
আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,
” আমি জানি তুই বিষয়টা এত সহজে মানতে পারবি না কিন্তু কিছু সত্যি কঠিন হলেও মানতে হবে। ”
মেঘের দম বন্ধ হয়ে আসছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, গলা দিয়ে কোনো কথায় বের হচ্ছে না৷ এতক্ষণ যাবৎ কত প্রশ্ন ই মাথায় ঘুরছিল এক মুহুর্তেই যেন সব প্রশ্ন উধাও হয়ে গেছে।
মেঘ আতঙ্কিত কন্ঠে শুধালো,
“আপনি কি আমার সাথে মজা করতেছেন? প্লিজ সত্যি করে বলুন ওনি কে? ”
আবির কপাল কুঁচকে ভারী কন্ঠে বলল,
” তোর সাথে কি আমার মজার সম্পর্ক? আর সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আমি মজা কেন করব? ওনার নাম মাহমুদা খান আমিনা। নাম শুনে কি মনে হচ্ছে তোর? ”
মেঘ এখনও অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতেই তাকিয়ে আছে। ঢোক গিলে ভারী কন্ঠে বলল,
” আপন ফুপ্পি?”
আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলল,
“হ্যাঁ! আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খানের একমাত্র ছোটবোন এবং ইকবাল খানের একমাত্র বড় বোন। ”
মেঘের দু’কান দিয়ে হিজাবের উপর দিয়েই গরম বাতাস বের হতে শুরু করেছে। নিঃশ্বাস আঁটকে আসছে বারবার ৷ আবির ভাই তো মজা করার মানুষ না। আর ওনার চোখমুখ দেখে মনেও হচ্ছে না যে ওনি মজা করছেন। আর বিয়েতে ঐ মহিলার আচরণও বুঝিয়ে দিচ্ছিলো ওনার সাথে গভীর কোনো সম্পর্ক আছে৷ তাহলে কি ওনি সত্যি সত্যি ফুপ্পি হোন ! এত বড় কথাটা কোনোদিন ও শুনলো না । কিন্তু কেন?
মেঘ ভাবনাচিন্তা করে প্রশ্ন করল,
“এত বছরে কোনোদিন তো ওনাকে আমাদের বাসায় যেতে দেখি নি। আব্বুদের আপন বোন হলে বাসায় যান না কেন?”
আবির মৃদু হাসল, ভরাট কন্ঠে বলল,
“ওনাকে বাসায় যেতে দেখবি কিভাবে! তোর জন্মের প্রায় ১০ বছর আগে ওনি খান বাড়ি ছেড়েছেন। ২৭ বছর হবে ঐ বাড়িতে পা পড়ে নি ওনার। ”
মেঘ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“কেন? কি হয়ছিল?”
আবির শান্ত কন্ঠে বলা শুরু করল,
ফুপ্পি যখন ভার্সিটিতে পড়াশোনা করতো তখন ফুপ্পির একজনের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। পুরো ঘটনা আমি জানি না, তবে বাসায় বিষয় টা জানাজানি হয়ে গেছিল। তখন আমার আম্মু নতুন বউ, বছরখানেক হবে আম্মুর বিয়ে হয়ছে। তোর আম্মুর তখনও বিয়েই হয় নি। ফুপ্পির এই ঘটনা জানার পর আব্বু আর চাচ্চু ফুপ্পিকে মে*রে,একটা রুমে ৩ মাস দরজা বন্ধ করে আটকে রাখছিল। তখন দাদু বেঁচে ছিলেন,তবে অসুস্থ ছিলেন, কথাও বলতে পারতেন না। আম্মু দাদুর যত্ন করতো আবার, ফুপ্পির দেখাশোনাও করত। ফুপ্পি আম্মুর হাতে পায়ে ধরে অনেক কান্নাকাটি করেছে , কিন্তু আম্মুর কিছুই করার ছিল না। ৩ মাস ফুপ্পির উপর দুই ভাই অত্যাচার করেছে যেনো ঐ ছেলেকে ভুলে যায়। এক পর্যায়ে ফুপ্পি খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয়, ধীরে ধীরে অনেক বেশি অসুস্থ হয়ে পরছিল। চিকিৎসা করে ফুপ্পিকে কিছুটা সুস্থ করার পর, ফুপ্পি বাড়ি থেকে চলে গেছিল। ভাইদের অত্যাচারে সেই যে বাড়ি ছাড়ছিল আর কোনোদিন বাড়িতে ঢুকতে পারে নি। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে ফুফা কে বিয়ে করে বছরখানেক ঢাকাতেই ছিল। চিঠির মাধ্যমে আম্মুর সাথে কয়েকবার যোগাযোগ ও করেছিল। ফুপ্পি বাড়ি ছাড়ার ১ বছরের মাথায় দাদু মারা গেছেন। ভাগ্যক্রমে তখন মেজো মামা আমাদের বাসায় ছিল। ঢাকা চাকরির পরীক্ষা দিতে আসছিল। আম্মু মেজো মামাকে ফুপ্পির বাসার ঠিকানা দিয়ে দাদুর মৃত্যুর খবর পাঠাইছিল৷ এই কথা আব্বুরা কেউ জানতো না। ফুপ্পি, ফুফা দু’জনেই আসছিল দাদুকে দেখতে, তখন আসিফ ভাইয়া ফুপ্পির পেটে ছিল। খান বাড়ির চৌকাঠে পা রাখতেই আব্বুর চোখ পরে দরজায়। চিৎকার দিয়ে, এক সেকেন্ডেই দাদুর লা*শ চাদর দিয়ে ঢেকে রান্নাঘর থেকে দা নিয়া বের হইছিলো। যদি ফুপ্পি চৌকাঠ পার হওয়ার চেষ্টা করে তাহলে খু*ন করে ফেলবে। বাড়ি ভরা মানুষ থাকায় আব্বুকে আর চাচ্চুকে সবাই আটকিয়ে রাখছিলো। না হয় সেদিন খু*নাখু*নি হয়ে যেত। কত কত মুরব্বিরা উপস্থিত ছিল কিন্তু আব্বুর মাথা সেদিন কেউ ঠান্ডা করতে পারে নি। দাদুর লা*শ ছোঁয়া তো দূর, ফুপ্পিকে লা*শ দেখতে পর্যন্ত দেয় নি। লা*শ দাফন করে বাড়িতে পা রেখে প্রথম প্রশ্ন টায় করেছিলেন,
“আমিনারে খবর দিছে কে ?”
মায়ের মৃত্যুর শোকের থেকেও সেদিন হাজার গুণ বেশি তীব্র ছিল ওনার রা*গ । কোনোভাবে জানতে পারছে আম্মু খবর পাঠাইছে, সেইদিন সেই অবস্থাতেই আম্মুকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। অথচ ফুপ্পি ওনার ই মায়ের পেটের বোন। সেই বোনকে খবর দেয়ার শাস্তিস্বরূপ আম্মুকে ২ মাস নানা বাড়িতে থাকতে হয়েছিল। একদম সংসার ভাঙার পর্যায়ে চলে গেছিলো৷ তখনকার সময়ে সংসার ভাঙা আম্মুর পক্ষে বা নানা বাড়ির মানুষের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। তারপর নানা, বড় মামা, আত্মীয় স্বজনরা অনেক বুঝিয়ে ২ মাস পরে আম্মুকে বাসায় নিয়ে আসছে। আব্বুর শর্ত একটায় ছিল আর কোনোদিন ফুপ্পির সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না। নিজের সংসার বাঁচাতে বাধ্য হয়ে সেই শর্ত মেনে নিয়েছিল আম্মু। মেজো মামা ফুপ্পির বাসায় গিয়ে সব ঘটনা বলে আসছিল৷ সেইদিন থেকে আজ পর্যন্ত ফুপ্পির সাথে বাসার কারো যোগাযোগ নেই। ”
মেঘ এতক্ষণ যাবৎ বিস্ময়কর দৃষ্টিতে আবিরের মুখে পানে তাকিয়ে ছিল৷ নিজের বাড়িতে এতবড় রহস্য লুকিয়ে আছে অথচ সে কিছুই জানে না।
আবির গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
” তুই আমায় পা*ষাণ, হি*টলার বলিস। অথচ আমার থেকেও বড় মাপের হি*টলা*র এতবছর যাবৎ খান বাড়িতে রাজত্ব করে আসছেন। যাদের কথার উপর কারো কথা চলে না, যাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারে না। ফুপ্পি নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করার অপরাধে মায়ের লা*শ দেখার অধিকার টা পর্যন্ত হারিয়েছেন। ২৮ বছর যাবৎ বাবার বাড়ি পা রাখতে পারেন না। কতটা নিষ্ঠুর হলে মানুষ এমন কাজ করতে পারে!”
মেঘ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রশ্ন করল,
“আপনি ফুপ্পিকে কিভাবে চিনেন?”
আবির শ্বাস ছেড়ে পুনরায় বলা শুরু করল,
” আমি ওনার সম্পর্কে জানতাম না। ছোটবেলা একবার আম্মু পুরাতন জিনিস পত্র বের করছিলেন, তখন একটা অ্যালবাম বের হয়ছিল। আমি অ্যালবাম টা খুলে দেখছিলাম। আম্মু আব্বুর বিয়ের ছবি থেকে শুরু করে দাদা-দাদুর, চাচ্চুর মোটামুটি অনেকের ছবিই ছিল। যেহেতু ছোট ছিলাম, আগ্রহ নিয়ে ছবিগুলো দেখছিলাম৷ আর সবাইকে চেনার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ কয়েকটা ছবি চোখে পরে। ছবিগুলো দেখে চিনতে পারছিলাম না বলে আম্মুকে জিজ্ঞেস করছিলাম, আম্মু কিছু বলার আগেই আব্বু রুমে চলে আসছিল। আব্বু আমার হাত থেকে অ্যালবাম নিয়ে আমায় পড়তে বসতে বলেন। আমিও চুপচাপ পড়তে চলে গেছিলাম এই বিষয়ে আর ভাবি নি। তার কয়েক বছর পর, দেশ ছাড়ার আগে আব্বু আম্মুর কিছু কাগজ পত্রের দরকার ছিল৷ আমি তখন আব্বুর ফাইলে কাগজ খুঁজছিলাম। তখন একটা ফাইল চোখে পরে। ঐ ফাইলে সার্টিফিকেট, ছবি আরও কিছু কাগজপত্র ছিল। মাহমুদা খান আমিনা নামটা আমি প্রথমবার সেখানেই দেখছিলাম৷ বাবা মায়ের নামের জায়গায় দাদা-দাদুর নাম লেখা ছিল। ছবিগুলো দেখে ছোটবেলায় অ্যালবামে দেখা ছবিগুলোর কথা মনে হয়ছিল। আমি সেখান থেকে একটা ছবি নিয়ে গেছিলাম। আম্মুকে একবার জিজ্ঞেস ও করেছিলাম, কিন্তু আম্মু বলছেন আম্মু কিছু জানে না আর এই বিষয়ে যেনো আর কোনোদিন কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করি। তখন কিছুদিন আমার মাথায় বিষয়টা ঘুরছিল। পরে ভাবছি হয়তো মারা গেছেন তাই আম্মু জানে না বা জিজ্ঞেস করতে না করেছেন। বিষয়টা সেখানেই ভুলে গেছিলাম। কিন্তু ছবিটা যে আমার কাগজপত্রের সাথে চলে গেছিল এটা আমি জানতাম না। ঐখানে গিয়ে ছবিটা দেখে ফেলতেও ইচ্ছে করছিল না তাই আব্বু আম্মুর ছবির সঙ্গে রেখে দিছিলাম৷ তবে কোনোদিন এই বিষয় নিয়ে ভাবি নাই। ”
কথাগুলো শেষ করে আবির একটু থামলো। মেঘ জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে থেকে আস্তে করে বলল,
“তারপর! ”
“গতবছরের শেষ দিকে জান্নাত আর আসিফ ভাইয়াকে নিয়ে একটু ঝা*মেলা হয়ছিল। তখন রাকিব আমাকে আসিফ ভাইয়ার ফে*সবুক আইডি পাঠাইছিল। ঐখানে কভার ফটোতে একটা ছবি ছিল। কেন জানি আমার ছবিতে থাকা মহিলাটাকে খুব পরিচিত মনে হয়তেছিল। আমি রাকিবকে বলে আসিফ ভাইয়ার বায়োডাটা সংগ্রহ করি। ঐখানে আমি দ্বিতীয় বারের মতো নাম দেখি- মাহমুদা খান আমিনা। সেদিন প্রথমবারের মতো আমি বড়সড় ধাক্কা খাইছিলাম। আমি সবকিছু খোঁজে সেই পুরোনো ছবিটা বের করে বার বার ফে*সবুকের ছবির সাথে মিলিয়ে ছিলাম৷ অস্থিরতায় সেদিন প্রায় ম*রতে বসেছিলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না৷ বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো যে আমার একজন ফুপ্পি আছে তাও আবার জীবিত। সেদিন পরিস্থিতি সামলানোর বিন্দুমাত্র শক্তি ছিল না আমার। সেই রাতেই তানভির আর রাকিবকে আসিফ ভাইয়ার বাসায় পাঠাইছি। আমি ফুপ্পির সাথে সেদিন প্রথমবারের মতো ফোনে কথা বলছিলাম। নাম পরিচয় বলার পর ওনার সে*কি কা*ন্না, তানভিরকে আঁকড়ে ধরে অনেক কেঁদেছিল। ফুপ্পির ২৮ বছর চেপে রাখা সব কষ্ট কান্নায় পরিণত হয়েছিল । তারপর বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে ওনার সাথে। বারবার জিজ্ঞেস করেছি ঘটনা বলতে কিন্তু বলেন নি । বলছেন আমি দেশে ফিরলে বলবে। দেশে ফেরার কয়েকদিনের মধ্যেই আমি, তানভির আর রাকিব ওনাদের বাসায় গেছিলাম। সেখানে গিয়েই সব ঘটনা শুনেছি”
মেঘ আগের তুলনায় কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। মেঘ পুনরায় প্রশ্ন করল,
“জান্নাত আপুর কি ঝামেলা হয়ছিল?”
আবির এতক্ষণ গম্ভীর থাকলেও এবার একটু হাসার চেষ্টা করল। ধীর কন্ঠে শুধাল,
“তেমন কিছু না”
মেঘ আস্তে করে বলল,
“প্লিজ বলুন। ”
আবির না পারতেও বলল,
“ফুপ্পিরা এতবছর যশোর ছিল। গতবছর ভাইয়ার চাকরি হওয়ায় স্ব পরিবারে ঢাকা আসছে। কোনো এক অনুষ্ঠানে ভাইয়া জান্নাতকে দেখেছে। ভাইয়ার জান্নাতকে ভালো লাগছে। কোনোভাবে খবর নিয়েছে জান্নাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সেই থেকে প্রায় প্রায় ই ভার্সিটির আশেপাশে, জান্নাতকে ফলো করতো। কিন্তু কোনোদিন কথা বলে নি। ৬ মাস শুধু দূর থেকে ফলো ই করেছে। একদিন সাহস নিয়ে কথা বলতে আসছিল। যদিও কথা বলতে পারে নি। কিন্তু সেটা রাকিবের কান পর্যন্ত পৌছে গেছিলো।
রাকিব ২-৩ দিন খেয়াল করে বিষয়টা আমায় জানাইছিল। রাকিবের ভাইয়াকে পে*টানোর চিন্তাভাবনা ছিল। আমাকে জানানোর পর আমি বলছিলাম, ছেলেটার একটু খোঁজ নিতে, যদি সমস্যা মনে হয় তাহলে পে*টাতে। রাকিব খোঁজ নিয়ে জানতে পারছে ভালো জব করে, অফিসের সবার সাথে নম্র ভদ্র আচরণ করে৷ সেখান থেকেই ফে*সবুক আইডি সংগ্রহ করে আমায় দিছিলো। যাকে পেটা*নোর প্ল্যান ছিল, সে আমার ভাই হয়ে গেলো। যখন জানতে পারছে ভাইয়া জান্নাতকে পছন্দ করে, তখন রাকিব আর বাঁধা দেয় নি। তবে রাকিবের একটায় কথা ছিল আমি দেশে না ফিরলে, আর ফুপ্পির পুরো ঘটনা না জানলে সে জান্নাতের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিবে না।
ধীরে ধীরে জান্নাত আর ভাইয়ার মধ্যে মোটামুটি ভালো সম্পর্ক হয়ছে। আমি দেশে ফিরলাম। ভেবেছিলাম দেশে ফিরেই ওদের বিয়ে দিব। কিন্তু দেশে আসার পর তোর কোচিং, টিউশন থেকে খবর নিয়ে দেখলাম তোর পড়াশোনার না*জেহাল অবস্থা। এভাবে পড়লে চান্স পাবি না। তোর পড়াশোনা গুছিয়ে দেয়ার জন্য একজন মানুষ দরকার ছিল। তখন জান্নাতের কথা মাথায় আসে আর জান্নাত কে আনি। জান্নাতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার যেহেতু রাকিবের, আর রাকিব আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তাই বিয়ের আলোচনা হওয়ার আগেই ব*ন্ধ করে দিয়েছিলাম।
কিন্তু অফিসিয়াল কাজে ভাইয়াকে ছয়মাসের জন্য দেশের বাহিরে যেতে হবে। ভাইয়া চাইতেছিল বিয়ে করে বউ নিয়া কয়েকমাস ঘুরে তারপর যাবে। কিন্তু তোর এডমিশন টেস্টের থেকে আমার কাছে তাদের বিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমি রাজি হয় না বলে ভাইয়া ঘুরাঘুরির প্ল্যান বাদ দিয়ে বলেছে শুধু বিয়েটা করবে৷ বিয়ের পর তোকে যত ইচ্ছে পড়াতে।
কিন্তু আমার কথা হলো, একবার বিয়ে হলো মানে জান্নাতের মাথায় সংসারের চিন্তা ঢুকবে। তখন তোর প্রতি তার দায়িত্ব কমে যাবে। এটা তো আমি কখনোই হতে দিব না।
ভাইয়া যখন বুঝতে পারছে আমায় মানাতে পারবে না তখন জান্নাতকে বুঝানো শুরু করছে। কিন্তু জান্নাত তো আমায় বা রাকিবকে সবই বলে দেয়। জান্নাতের মাথা যাতে না খেতে পারে, সেজন্য ২-১ মাস যাবৎ জান্নাতের সঙ্গে ভাইয়ার যোগাযোগ বন্ধ রেখেছি। রাকিব নতুন সীম কিনে দিছে জান্নাতকে।যেদিন রাতে তুই আমায় কল দিছিলি, সেদিন আমি,রাকিব আর তানভির ফুপ্পিদের বাসায় ই ছিলাম। বিয়ের কথাবার্তা বলতে গেছিলাম। তুই চান্স পেলেই বিয়ে হবে এরকম টায় শর্ত ছিল। কিন্তু রাতে ফেরার পর তোর খাতা ভর্তি হাবিজাবি লেখা দেখে আমার মাথায় র*ক্ত উঠে গেছিল।
যার জন্য আমি এত মানুষের বিরুদ্ধে লড়তেছি সে কিনা পড়াশোনা টাকে গুরুত্ব ই দিচ্ছে না। সেই রা*গে সেদিন খাতা পুড়িয়েছিলাম। যাতে তুই পড়াশোনায় মনোযোগ দেস। যাদের সামনে বার বার গর্ব করে বলেছি আমার মেঘ চান্স পাবেই। চান্স না পেলে, আমি তাদের মুখোমুখি হতে পারতাম না। তারা মুখে কিছু বলুক বা না বলুক, মনে মনে হলেও বলতো,
এতকিছু করেও তো মেঘ চান্স পেলো না। এই কথাটা পৃথিবীর কোনো মানুষ যাতে বলতে না পারে সেইজন্য আমি তোকে সারাক্ষণ পড়ার কথা বলতাম।
আলহামদুলিল্লাহ৷ তোর চেষ্টা, আমার ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। আল্লাহ আমার আশা পূরণ করেছেন আর তোকেও অসংখ্য ধন্যবাদ। ”
মেঘের গলায় আটকে থাকা নিঃশ্বাস টা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেড়িয়ে আসলো। মেঘের আড়ালে মেঘকে নিয়ে কত কত ঘটনা ঘটেছে। আবির ভাইয়ের গত চারমাসের করা আচরণগুলো বারবার মনে হচ্ছিল।
(চলবে)
গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ৩৫
লেখিকা- সালমা চৌধুরী
আবির রাশভারি কন্ঠে আবার বলে উঠল,
“সবাই জানে খান বংশের বড় ছেলে আমি। চাচাতো ভাই বোনদের মধ্যে আমি বড় হলেও, সত্যিকার অর্থে আসিফ ভাইয়া আমাদের মধ্যে সবার বড় আর আমি দ্বিতীয়। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বা আমি সফল হতে পারবো কি না জানি না, তবে আমি আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব ফুপ্পির সাথে আমাদের বাসার সম্পর্ক ঠিকঠাক করার।”
একটু থেমে আবির আবার বলল,
“জানিস মেঘ, এই দুজন মানুষের জন্য আমাদের বাড়ির প্রতিটা মানুষ ভেতর থেকে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে গেছে। তাদের রা*গ, আর অনাদেয় কর্মকান্ডের ফলাফল ভোগ করতে হয় বাকি সদস্যদের। ফুপ্পির মতো কাকামনির জীবনের সুখ শান্তিও কেড়ে নিয়েছে এই মানুষগুলো। কাকামনি ঠান্ডা মেজাজের মানুষ হওয়ায় আর শুধুমাত্র ভাই বলে হয়তো এখনও সম্পর্ক ঠিক আছে। নাহয় ফুপ্পির মতো অবস্থা কাকামনিরও হতো। কাকামনি সবার সামনে প্রাণোচ্ছল থাকে ঠিকই কিন্তু ওনার ভেতরটায় সবচেয়ে বেশি বিধ্বস্ত। ফুপ্পিতো তো তবুও ভালোবাসার মানুষকে পেয়েছেন, কাকামনি তো তাও পেলেন না। ”
মেঘের মস্তিষ্ক জোড়ে বিচরণ করছে লক্ষাধিক প্রশ্ন কিন্তু সেসব প্রশ্নের উত্তরে শুধু বাবা-চাচার নাম ই উঠে আসবে। কাকামনির জীবনের ইতিহাস শুনারও ইচ্ছে নেই, তাই এই বিষয়ে প্রশ্ন করল না। নিজের আব্বু আর বড় আব্বু এতটা পা*ষাণ এটা ভাবতেই মেঘের কষ্ট হচ্ছে। মেঘ বিভোর হয়ে স্মৃতি মনে করায় ব্যস্ত। আবির ভাই ফেরার পর থেকে যা যা ঘটেছে সব মনে করার চেষ্টা করছে। হঠাৎ মাথায় আসলো, আবির ভাই যে বার বার বাবা-চাচার মুখের উপর কথা বলেন৷ ওনারা যদি আবির ভাইকে…এটুকু ভেবেই মেঘ থেমে গেল। চিন্তিত স্বরে বলল,
” আপনি আব্বু বা বড় আব্বুর মুখের উপর আর কথা বলবেন না প্লিজ।”
নিজের প্রতি প্রেয়সীর দুশ্চিন্তা দেখে আবির আনমনে হেসে উঠল, স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“আমি যদি কথা না বলি তাহলে ওনারা ওনাদের মর্জি মতো সবকিছু করবেন। ওনাদের সকল ইচ্ছে পূরণ করা আমার পক্ষে সম্ভব না৷ আমি কারো প্রিয় হয়ে থাকতে চাই না। আমি তাই করব যা আমার করতে ইচ্ছে করবে। ”
মেঘের শীতল চাউনি দেখে আবির ভারী কন্ঠে বলে উঠল,
“তোকে আগেও বলেছি এখন আবার বলছি, কখনো কারো মন রাখার চেষ্টা করবি না। ঠিক সেই কাজ টায় করবি যেটা তোর মন করতে চাইবে। বিষয় ছোট হোক বা বড় আগে নিজের মনকে প্রায়োরিটি দিবি। আর ফুপ্পির বিষয়টা ভুলেও কাউকে বলবি না, বাড়িতে কাউকে এই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করবি না। তোকে জানানো দরকার ছিল তাই জানিয়েছি। আজকের পর থেকে বুঝে শুনে পা*গলামি করবি। কারণ আমি চাই না তোর পা*গলা*মিকে সিরিয়াসলি নিয়ে কেউ তোর মনে আ*ঘাত করুক৷ ”
কথা শেষ করে মেঘকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে আবির। মেঘের মনে আজ কোনো অনুভূতি নেই। এইযে এতদিন জান্নাত আপুকে নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করল৷ সেই জান্নাত আপু সম্পর্কে তার ভাবি হয়ে গেছে। বাড়ির রহস্য না জানলে, আজ মেঘ আবিরকে নিজের মনের কথা বলেই দিত। কিন্তু তার বাড়ির মানুষ যে ভালোবাসার জা*তশ*ত্রু। তারা তো কোনোদিন মানবে না। আবির ভাইয়ের প্রতি যে সে অসম্ভব দূর্বল। আবির ভাইকে এই জীবনে কি আদোঃ পাবে?
আবির বাইক চালাচ্ছে আর মনে মনে ভাবছে,
“আমার জীবনটা কেন এমন হলো! তোর প্রবল অভিমান আমায় দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। ৬ বছর যাবৎ আমি নিজের উপলব্ধি জমিয়েছি। সেই সুদীর্ঘ অভিসন্ধি বাস্তবায়নের সুযোগ টাও পেলাম না আমি। ভেবেছিলাম দেশে ফিরে তোর কাছে আমার চিত্তের অব্যক্ত প্রণয় প্রকাশ করব। এত বছরে তোকে ঘিরে কত লক্ষাধিক স্বপ্ন দেখেছি, সেই সব স্বপ্নের কথা জাহির করব। গত ৬ বছর শুধু একটায় পরিকল্পনা করেছি, কিভাবে তোকে আমাতে আসক্ত করব। তিনমাসের মধ্যে তোকে আমার বউ করে নিবো এই দৃঢ় সংকল্পে নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম । কিন্তু একটা ঘটনা, আমায় চূ*র্ণবি*চূর্ণ করে দিয়েছে। গত ১ বছর যাবৎ আমি নিজের সঙ্গে ল*ড়াই করছি। তোকে উপেক্ষা করার বিন্দুমাত্র শক্তি যে আমার ছিল না৷
দেশে ফিরে প্রথমবার তোর লালিত মুখমণ্ডল আর মায়াবী আঁখি দেখে এক মুহুর্তের জন্য নিজেকে উ*ন্মাদ মনে হয়েছিল। ইচ্ছে হয়েছিল, খান বাড়ির সব নিয়মনীতির বি*নাশ করে হলেও তোকে আমার করে নেই।
কিন্তু আমি পারি নি। আজও আমি তোকে ভালোবাসি বলতে পারছি না। তুই পরিবার ছাড়তে পারবি না আর আমি তোকে! নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা ছাড়া আমি আর কোনো পথ খোঁজে পাচ্ছি না। তোকে পাওয়ায় জন্য যতটুকু যোগ্যতা অর্জন করা দরকার আমি ঠিক ততটুকুই যোগ্য হবো। তারপরও আমার তোকেই লাগবে। আমার তোকে পাওয়ার ইচ্ছে যতটা প্রবল, তোর মনেও আমাকে পাওয়ার সেই শাণিত ইচ্ছে জাগতে হবে। পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, তোর আমার প্রতি প্রগাঢ় আস্থা থাকতে হবে। তুই আমার হলে, আমি পুরো দুনিয়ার সঙ্গে লড়তে পারব। কিন্তু তোকে না পেলে আমার প্রণয়ের পরিণতি হবে মৃ*ত্যু।”
বাসার সেই মোড়ে মেঘকে নামিয়ে আবির ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“যা বলেছি তা মাথায় রাখিস৷ সামনে তানভির আছে,ওর সঙ্গে বাসায় যাবি। বাসায় কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তোর কিছু বলার প্রয়োজন নেই। যা বলার তানভির বলবে। জান্নাতের বিয়ের কথা কাউকে বলিস না। আর অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে নিজের শরীর খারাপ করিস না। ফুপ্পির সাথে সম্পর্কটা আমি ঠিকঠাক করার চেষ্টা করবো, তুই সাবধানে থাকিস। ”
তানভির বাসার কাছেই মেঘের জন্য অপেক্ষা করছিল। মেঘকে নিয়ে বাসায় ঢুকেছে ।ড্রয়িং রুমে দুই ভাই বসে আছেন। মেঘ আর তানভির কে দেখেই মোজাম্মেল খান প্রশ্ন করলেন,
“কোথায় গেছিলা?”
মেঘ তানভিরের মুখের দিকে তাকাতেই,
তানভির বলল,
“তুই রুমে যা।”
ভাইয়ের কথামতো মেঘ রুমে চলে গেছে। ওরা দুই ভাই মেঘকে এমনভাবে আগলে রাখে যেন বাড়ির কেউ কিছু বলতে না পারে। বড় রা কিছু বললে কষ্ট বেশি পাবে কিন্তু তানভির যেহেতু ছোট থেকেই শাসন করে তাই ভাইয়ের শাসন মেঘের এখন সয়ে গেছে। তানভির যা যা কথা বলার, তা বলে রুমে চলে গেছে। মেঘ ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পরছে। বিকেল থেকে এত এত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়ছে যেগুলো মাথায় স্থির হতেও একটু সময় লাগবে। মেঘের আবেগ, অনূভুতি সব বিলীন হয়ে গেছে। আবির ভাইয়ের বলা প্রতিটা কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে । একটা কথা বার বার মনে হচ্ছে,
“এই বাড়ির প্রতিটা মানুষ ভেতর থেকে দুমড়েমুচড়ে ভেঙে গেছে। ”
ফুপ্পির বিষয় জানার পর মেঘের হৃদয়টা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। চারমাসের প্রেমানুভূতি প্রকাশ করার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। আবির ভাইয়ের প্রতি যে আকাশ সম প্রলয়লীলা , সবই ফিকে হয়ে গেছে। ফুপ্পি আর কাকামনির মনে কত ই না কষ্ট। এসব ভেবে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছে নিজেও জানে না। আবিরের জন্য অপেক্ষা করার শক্তিটুকুও আজ ছিল না।
আবির মেঘকে নামিয়ে দিয়ে আবার বিয়ের প্রোগ্রামে গেছে৷ রাকিবের বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে এসময় আবিরকে রাকিবের পাশে থাকা খুব বেশি প্রয়োজন। রাকিবের একমাত্র বোন জান্নাত৷ রাকিবের আর একটা ছোট ভাইও আছে। তবে বোনের প্রতি ভাইদের ভালোবাসা একটু বেশিই তীব্র হয়৷
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
সপ্তাহখানেক হয়ে গেছে। কিন্তু মেঘের মাথা থেকে ফুপ্পির ঘটনা কোনোভাবেই যাচ্ছে না। যতবার আব্বুকে আর বড় আব্বুকে দেখে ততবারই মনে হয় ওনারা হি*টলা*রের থেকেও নিকৃষ্ট। এতদিন আবির ভাইকে হি*টলা*র বলায় নিজেই অনুতপ্ত হচ্ছে। এখন আর মেঘ আগের মতো আবিরকে জ্বালায় না, আবিরের রুমে যায় না, অনুভূতি প্রকাশের চেষ্টাও করে না। আব্বু আর বড় আব্বুকে দেখলে যতটা রা*গ হয়, আবির ভাইকে দেখলে ঠিক ততটায় কষ্ট হয়।
আজ তানভির প্রোগ্রামে ব্যস্ত। হঠাৎ ফোনে কল বাজতেছে। ফোন বের করে অবাক চোখে তাকায়। বন্যা কল দিচ্ছে। প্রোগ্রাম থেকে বের হয়ে এক পাশে গিয়ে ফোন রিসিভ করল।
বন্যা- আসসালামু আলাইকুম।
তানভির- ওয়ালাইকুম আসসালাম।
বন্যা- ভাইয়া, আপনি কি বাসায়?
তানভির- ভাইয়া ডাকতে কতবার না করেছি তোমায়!
বন্যা-সরি, আর ভাইয়া বলবো না। মেঘের কি কিছু হয়েছে? আমি কল দিলে রিসিভ করে না। হঠাৎ রিসিভ করলেও ঠিকমতো কথা বলে না।
তানভির- বনু একটু মানসিক চাপে আছে। কিছুদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।
বন্যা- কি হয়েছে?
বন্যা মনে মনে ভাবছে, আল্লাহ জানে আবির ভাইকে নিয়ে কোনো ঝামেলা ই হলো কি না!
তানভির – তেমন কিছু না। তোমার কি খুব দরকার? কিছু বলার থাকলে আমায় বলতে পারো আমি বনুকে জানিয়ে দিব নে।
বন্যা আমতা আমতা করে বলল,
“ঐরকম কিছু না। কথা হইতেছে না তাই চিন্তা হচ্ছিল। এজন্য আপনাকে কল দিলাম।”
তানভির ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,
“আর কোনো কারণ নেই?”
বন্যা আস্তে করে বলল,
” না মানে, আছে!”
তানভির ধীর কন্ঠে বলল,
“বলো”
বন্যা ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করল,
“আজকে কি আপনার একটু সময় হবে? ”
তানভির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“কেনো?”
বন্যা একটু থেমে বলল,
“আপনার সাথে কি দেখা করা যাবে? আপনি মেঘকে নিয়ে আসলে ভালো হতো। যদি আপনার সময় হয় আর কি!”
তানভির জানাল,
“বনুর মনের অবস্থা খুব একটা ভালো না। তারপরও আমি জিজ্ঞেস করব নে। বনু না আসলে কি আমি আসতে পারবো? নাকি দেখা করতে হলে বনুকে নিয়ে আসতেই হবে?”
বন্যা কিছু বলছে না দেখে তানভির আবার বলল,
“আমি বিকেলে কল দিব তোমায়। রাখছি এখন। ”
তানভির ফোন রেখে আবিরকে কল দিল। আবিরের কড়া নিষেধ মেঘকে এখন কোথাও নেয়া যাবে না। মেঘের মন মেঘকেই ঠিক করতে হবে৷ সব বিষয়ে আবির বা তানভির মেঘকে সাহায্য করতে পারবে না। তানভির কি করবে বুঝতে পারছে না। মেঘকে জিজ্ঞেস না করলে বা মেঘের মতামত না নিলে, পরবর্তীতে বন্যা বিষয়টা জানলে তানভিরকে ভুল বুঝবে। আবার মেঘ যদি ঘুরতে যেতে রাজি হয়ে যায় তাহলে আবির তো তানভিরকে মে*রেই ফেলবে।
দু-টানা কাটিয়ে শেষমেশ মেঘকে কল করল তানভির, মেঘ তখন উপন্যাস পড়ায় ব্যস্ত। বাসায় শুয়ে বসে থেকে আর ভালো লাগছিল না৷ ফোন চাপতে গেলে আবির ভাইয়ের আইডি আসে সামনে।আবির ভাইকে দেখলেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে৷ পড়াশোনার চাপ নেই৷ বাড়ির কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না। চুপচাপ শুয়ে বসে থাকলে বার বার শুধু ফুপ্পির কথা মনে পরে। এসবকিছু কাটাতে আবির ভাইয়ের দেয়া উপন্যাসের বই গুলো পড়া শুরু করেছে। বেশির ভাগ সময় উপন্যাস ই পড়ে৷ উপন্যাস পড়ার আরেকটা অন্যতম কারণ হলো নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখা।
তানভির ২-৩ বার জিজ্ঞেস করেছে ঘুরতে যাবে কি না! কিন্তু মেঘের ঘুরতে যাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই। বোন রাজি না হওয়াতে তানভিরের জন্য ভালোই হয়েছে। আবিরের কাছে ব*কা খেতে হয় নি। কিন্তু বন্যা দেখা করবে কি না কে জানে!
বিকেলের দিকে প্রোগ্রাম শেষ করে তানভির বন্যাদের বাসার গলি পর্যন্ত গিয়ে বন্যাকে কল দিল।
বন্যা কিছুক্ষণের মধ্যে রেডি হয়ে একটা শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে আসলো৷ তানভিরের সাথে একা ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না বলেই মেঘকে আনতে বলছিল। কিন্তু মেঘ এলো না অথচ তানভির এসে দাঁড়িয়ে আছে। তাই বাধ্য হয়ে বন্যা বেরিয়েছে৷ ঘন্টাখানেক তানভিরের সাথে বাইকে ঘুরেছে, কিন্তু একবারের জন্যও তানভিরকে স্পর্শ করেনি। সন্ধ্যার দিকে রেস্টুরেন্টে বসে আছে বন্যা আর তানভির। বন্যা আশেপাশে একবার তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করল, তারপর হাতের শপিং ব্যাগটা তানভিরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এগুলো আপনার জন্য। ”
তানভির বিস্ময় সমেত তাকিয়ে বলল,
“আমার জন্য! ”
বন্যা উপর নিচ মাথা নাড়লো।
“কিন্তু কেন?”
“আপনি দুবার আমায় ট্রিট দিয়েছেন, গিফটও দিয়েছেন। আমারও তো উচিত চান্স পাওয়ার খুশিতে আপনাকে কিছু দেয়া।”
তানভির শপিং ব্যাগ টা নিজের কাছে এগিয়ে নিল। রেপিং এ মোড়ানো একটা বক্স খুলতেই চোখে পরলো একটা কালো চেইনের ঘড়ি। অনেক সুন্দর ডিজাইনের, মোটামুটি দামিও। তানভির ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ঘড়িটা দেখে বলল,
“ঘড়িটা অনেক সুন্দর কিন্তু আমি তো ঘড়ি পড়ি না!”
বন্যা আস্তে করে বলল,
“ছেলেদের হাতে ঘড়ি থাকলে ভালো লাগে, তাই নিয়েছি। আপনি ঘড়ি পড়েন কি না তা তো আমি জানতাম না!”
“ব্যাপার না। পছন্দ করে এনেছো তার জন্য ধন্যবাদ। ”
এই বলে তানভির ঘড়িটা হাতে দিল। শপিং ব্যাগে আরেকটা সুন্দর ওয়ালেট। ওয়ালেট আর ঘড়ির বক্স শপিং ব্যাগে রেখে খাওয়াদাওয়া করে বন্যাকে বাসার কাছে পৌঁছে দিয়ে তানভির বাসায় আসছে৷ আবির ড্রয়িংরুমে বসে কফি খাইতেছিল।
তানভিরের হাতে ঘড়ি দেখে কপাল কুঁচকে ঠাট্টা স্বরে বলল,
” কারো জন্য কেউ একজন তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কত কাজ ই না করছে! অবশ্য এসব দেখতে ভালোই লাগছে। ”
তানভির ঘড়ি পরা হাতটা নিজের পিছনে লুকিয়ে, মন খারাপ করে বলল,
“মজা করছো !”
আবির স্ব শব্দে হেসে উঠল৷ তানভির গাল ফুলিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে৷ আবির সোফায় বসে সেদিকে তাকিয়ে হেসেই যাচ্ছে।
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
বেশকিছুদিন কেটে গেলো। খাবার টেবিলে দেখা হয় মেঘ আবিরের। মেঘ দু একবার আবির ভাইয়ের দিকে তাকায়, চোখাচোখি হলেই চোখ নামিয়ে নেয় মেঘ।
আবির সকালে খেয়ে অফিসে চলে যায়, মীম আর আদিও স্কুলে চলে যায়, মেঘ বাসায় একা একা থাকে। প্রতিদিন বিকেলে ছাদে যায়, গাছগুলোর দেখাশোনা করে। বাকি সারাদিন আবির ভাইয়ের দেয়া উপন্যাসের বই পড়ে। ২ টা উপন্যাস শেষ করে ফেলেছে। তৃতীয় উপন্যাসটা যত পড়ছে মেঘের মনের ভেতর প্রেমানুভূতি তত সক্রিয় হতে শুরু করেছে। ফিকে হয়ে যাওয়া অনুভূতিরা আবারও জাগ্রত হচ্ছে। আবির ভাইয়ের প্রতি ধারালো ভালোবাসার টানে ২৮ বছরের গত হয়ে যাওয়া ইতিহাসকে পেছনে ফেলে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
“”হয়তো আবির ভাইকে পাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে, নয়তো সারাজীবন আবির ভাইকে এক তরফা ভালোবেসে যাবে। তবুও মুখ লুকিয়ে, আবির ভাইকে এড়িয়ে চলবে না। “”
রাত ১১ টার দিকে মেঘের ৩য় উপন্যাস পড়া শেষ হয়েছে৷ সেই থেকে আবির ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। গত কিছুদিন যাবৎ আবির ভাইয়ের বাড়িতে আসা যাওয়াতে মেঘের বিশেষ কোনো নজর ছিল না৷ বাইকের শব্দ শুনেও বেলকনিতে যেতে ইচ্ছে হয় নি তার৷ আজ এতদিন পর মেঘ আবির ভাইয়ের জন্য বেলকনিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। অথচ আবির ভাই ফিরছে না। আবির ইদানীং অফিস থেকে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ঘন্টাখানেক পর আবার বের হয়৷ ফিরতে ফিরতে রাত ১২ টা বেজে যায়। যেহেতু মেঘ আবিরের সাথে কথা বলে না, আবিরের জন্য অপেক্ষা করে না তাই আবিরও নিজের মতোই চলাচল করে।
১২ টার দিকে আবির বাসায় ফিরেছে। আবিরকে দেখেই মেঘ বেলকনি থেকে মিষ্টি করে হাসলো। এতদিন পর আজ মেঘের মুখে একটু হাসি ফুটেছে। আবির বাইক থেকে সেই দৃশ্য দেখল কি না কে জানে!আবির নিজের রুমে ফ্রেশ হতে চলে গেছে।
মেঘ চুপিচুপি ড্রয়িং রুমে আসছে। এত রাতে কেউ ই সজাগ নেই৷ টেবিলের উপর আবিরের জন্য খাবার ঢেকে রাখা হয়েছে৷ মেঘ খাবারগুলো দেখছে। এরমধ্যে আবির নিচে নামলো। মেঘের থেকে কয়েক পা পিছনে দাঁড়িয়ে ডাকল,
” কি করছিস এখানে ”
আবিরের কন্ঠ শুনে, আতঙ্কে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মেঘ।
মেঘ আবিরের চোখাচোখি হতেই আবির একটানা দুবার ভ্রু নাচালো। মেঘ নিঃশব্দে হেঁসে উঠলো। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর প্রেয়সীর মুখে হাসি দেখে আবিরের মন এক মুহুর্তেই শান্ত হয়ে গেছে। আবির চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সুস্থির করার চেষ্টা করল।
মেঘ মাথা নিচু করে বলল,
“আপনি এগুলো দিয়ে কিভাবে খাবেন। আপনাকে একটা ডিম ভেজে দেয়?”
মেঘের এমন কথায় আবির চোখ মেলে তাকালো, ভারী কন্ঠে জবাব দিল,
“কোনো প্রয়োজন নেই। আমি খেতে পারবো।”
আবির ভারী কন্ঠে বললেও মেঘের সেসবে মাথা ব্যথা নেই। কারণ তার মাথায় উপন্যাসের প্রেমালাপ ঘুরপাক খাচ্ছে। সে আবার বলল,
” আপনি তো বলেছিলেন পরীক্ষার পর রান্নাঘরে যেতে পারবো। পরীক্ষা তো শেষ। এখনও কি যেতে পারবো না?”
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“তোর কি ডিমভাজা খেতে ইচ্ছে করছে? আমি করে নিয়ে আসবো?”
মেঘ ডানে-বামে মাথা নেড়ে বলল,
“আমি ভাজবো।”
আবির গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“তুই ডিম ভাজতে পারিস?”
মেঘ দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
“আম্মুরা ডিম ভাজার সময় আমি দেখেছি।”
আবির পুনরায় বলল,
” তোর ভাজতে হবে না। তুই বস আমি ডিম ভেজে নিয়ে আসছি৷ ”
মেঘ শক্ত কন্ঠে বলল,
“না, আমি আনবো।”
আবির ধমক দিতে গিয়েও থেমে গেল। মেয়েটা এতদিন পর আবিরের সঙ্গে কথা বলতে আসছে। ধম*ক দিলে মনে কষ্ট পারে। তাই ধমক দিতে পারছে না৷ আবার ডিম ভাজতে পাঠাতেও সাহস পাচ্ছে না৷
আবির দু পা এগিয়ে থমকে দাঁড়ালো। সেখান থেকে ঘুরে এসে চেয়ার টেনে বসল। পকেট থেকে ফোন বের করে কিছু একটা চেক করছিল। একবার রান্নাঘরে তাকাচ্ছে একবার ফোনে৷
দুবার ডেকে বলেছে,
“তুই কি পারবি নাকি আমি আসবো!”
মেঘ দুবার ই উচ্চস্বরে বলেছে,
“পারব”
কিন্তু আবিরের কলিজা কাঁপছে। প্রথমবার মেঘ রান্না করতে গেছে। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে যদি হাত কে*টে ফেলে! কয়েকবার রান্নাঘরে দেখে যেই না ফোনের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মেঘ চিৎকার দিয়ে উঠেছে।
(চলবে)