গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ৩৬
লেখিকা- সালমা চৌধুরী
মেঘের চিৎকারের শব্দে আবিরের হৃদয় কেঁপে উঠেছে।সহসা ফোন ফেলে ছুটে যায় রান্নাঘরে। গরম তেল ছিটকে পরেছে মেঘের হাতে,পায়ে। এত রাতে বাসার মানুষ সজাগ হলে ঝামেলা হবে ভেবে চি*ৎকার দিয়েই নিজের মুখ চেপে ধরেছে। ফ্লোরে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেঘ। আবির চুলা বন্ধ করে, ঝড়ের বেগে টুথপেষ্ট নিয়ে আসছে। হাঁটু গেড়ে বসে আলতো করে হাতে আর পায়ে পেস্ট লাগিয়ে দিচ্ছে। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই আবিরের শরীর ঘেমে একাকার অবস্থা। রক্তাভ দুচোখ মেঘের হাতে পায়ে নিবদ্ধ। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা অবিরাম কাঁপছে। মেঘের হাতে পায়ে পেস্ট লাগিয়ে ফুঁ দিয়ে দিচ্ছে। মেঘ কেঁদেই যাচ্ছে, তবে এই ক্রন্দন শব্দহীন।
আবির ভ্রু কুঁচকে, নিজের ভেতরে থাকা সবটুকু আক্রোশ কন্ঠে ঢেলে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমায় না জ্বালালে কি তোর শান্তি হয় না?”
আবির ভাইয়ের রাগান্বিত কন্ঠ শুনে মেঘ জলসিক্ত চোখে আবিরের মুখের পানে তাকায়। চোখ পড়ে রক্তাভ দুচোখে , এই চোখে অসহায়ত্ব স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে। আবিরের নিঃশ্বাসের মাত্রা তীব্র, কপালে বিদ্যমান ঘামের বিন্দুগুলো চিকচিক করছে।
আচমকা আবির মেঘকে কোলে তুলে নেয়, ওমনি মেঘের চক্ষু চড়কগাছ। এক মুহুর্তেই কান্না থেমে গেছে, অবাক চোখে তাকিয়ে আছে আবিরের মুখের পানে। আবির কোনোদিকে না তাকিয়ে মেঘকে নিয়ে সোফায় বসিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,
“এখনও জ্বলতেছে?”
মেঘ এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে “না” করল।
আবির মেঘের হাতে- পায়ে ফুঁ দিতে দিতে হঠাৎ অত্যন্ত নমনীয় স্বরে বলে উঠল,
” কথা বললে কেন কথা শুনিস না, তেলটা যদি আর একটু বেশি পরতো কি তখন কি হতো বল !”
মেঘ অপলক দৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির ভাইয়ের বলা কথাটা মেঘের কলিজায় লাগছে৷ আবির ভাইয়ের এত কোমল কন্ঠ কোনোদিন শুনেনি সে। মেঘের অপলক দৃষ্টিতে আবিরের অদ্ভুত ঘোর কাজ করছে। কোনোমতে চোখ নামিয়ে শুধালো,
“রাতে খাইছিস?”
মেঘ আস্তে করে বলল,
“না”
আবিরের মেজাজ খারাপ হলো, কপাল কুঁচকে মেঘের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“এত রাত হয়ে গেছে, খাস নি কেন?”
মেঘ যে উপন্যাস পড়তে পড়তে ১১ টা বাজিয়ে ফেলেছে, তারপর থেকে আবির ভাইয়ের অপেক্ষাতে আছে। এ কথা আবির ভাইকে কিভাবে বলবে সে!
মেঘের হাত আর পায়ের দিকে একবার দেখে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“এখানে চুপচাপ বসে থাক, আসছি আমি। ”
কিছুক্ষণের মধ্যে আবির আরেকটা ডিম ভেজে ভাত নিয়ে আসছে। মেঘ নির্বাক চোখে চেয়ে আছে। হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি শুরু হয়ে যাচ্ছে। আবির ভাই খাবার নিয়ে আসছে। আবির ভাই কি খাইয়ে দিবেন! এসব ভেবেই অস্থির হয়ে যাচ্ছে।
জ্বরের ঘোরে প্রথমবার মেঘকে আবিরের খাইয়ে দেয়ার অনুভূতি ঠিকমতো বুঝতে না পারলেও আজ সে অনুভব করতে পারছে। খুব যত্নসহকারে মেঘকে খাইয়ে দিচ্ছে আবির, পানির গ্লাসটাতে পর্যন্ত ছুঁতে দিচ্ছে না৷ খাওয়া শেষে মেঘের হাত আর পা পরিষ্কার করে ফ্রিজ থেকে দই বের করে দিয়েছে। এরমধ্যে কম করে হলেও ১০০ বার প্রশ্ন করে ফেলছে,
জ্বলছে কি না, ব্যথা করছে কি না, মেঘের থেকেও আবির যেন কয়েক গুণ বেশি দুশ্চিন্তায় আছে।
আবিরের আতঙ্কিত কন্ঠস্বর শুনে মেঘ বারবার অবাক চোখে তাকাচ্ছে। আবির ভাইয়ের এই আচরণ কি ভাইয়ের প্রতি বোনের ভালোবাসা? নাকি অন্য কিছু! অন্য কিছু ভেবেও বারবার আটকে যাচ্ছে, মনে পড়ে যাচ্ছে ফুপ্পিকে নিয়ে আবির ভাইয়ের বলা কথাগুলো। মেঘকে কোলে নিয়ে রুম পর্যন্ত দিয়ে আসছে।
৩ দিন হয়ে গেছে মেঘের হাতে পায়ে তেল পরেছে । ভাগ্য ভালো ছিল বলে মেঘের হাতে ফোসকা পরে নি, তবে দাগ হয়ে আছে। এই দাগ মুছতে বেশকিছুদিন লাগবে।
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
সময় চলমান। মেঘ আর বন্যা দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছে। ক্লাসও শুরু হয়ে গেছে। মায়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েও ভর্তি হয় নি। তার পছন্দমতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। পাখি এখনও ভর্তি হয় নি।
বন্যা আর মেঘের নতুন তিনজন বান্ধবী হয়েছে। লিজা, সাদিয়া আর মিষ্টি। আর দুজন ছেলে বন্ধুও হয়েছে। মিনহাজ আর তামিম। মিনহাজের সাথে বন্ধুত্বটা খুব অদ্ভুতভাবে হয়েছে।
প্রথমদিন মেঘ আর বন্যা আশপাশ দেখতে দেখতে ডিপার্টমেন্টে হাঁটছিল। এক ছেলে একটা রুম থেকে দৌড়ে বের হচ্ছিলো। মেঘ আর বন্যা অন্যমনস্ক থাকায় বিষয় টা খেয়াল করে নি। ছেলেটা কাছাকাছি আসতেই মেঘ দ্রুত সরতে গিয়ে হাতে ব্যথা পেয়েছিল৷
অথচ ছেলেটা মেঘ আর বন্যাকে দেখে দৌড় থামিয়ে উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠে,
” দেখে চলতে পারো না! কোন ইয়ার? ”
বন্যা আস্তে করে বলে,
“প্রথম বর্ষ।”
ছেলেটা বিরক্তির স্বরে “ওহ” বলে চলে যায়।
বন্যা আর মেঘ দুজনেই আহাম্মকের মতো চেয়ে থাকে। ছেলের হাবভাবে মনে হয়েছিলো সিনিয়র কোনো ভাইয়া ৷ তারপর যখন দেখলো এই ছেলে ওদের সাথেই পড়ে তখন দুই বান্ধবী তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছিল। এরপর থেকে ছেলে বেশ কয়েকবার মেঘ আর বন্যার সঙ্গে কথা বলতে আসছে। প্রথমদিনের দুষ্টামির জন্য প্রতিদিন কম করে হলেও ১০ বার করে মাফ চাই। বন্যা আর মেঘকে এখন “আপু” বলে ডাকে। সেই মিনহাজের সাথে ভর্তির দিন থেকে তামিমের পরিচয়। আস্তে আস্তে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে । মিনহাজের মাধ্যমে বন্যা আর মেঘের সঙ্গেও তামিমের খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।
★★★★
আজ শুক্রবার, বাড়িতে মীম, আদি আর মেঘের হৈচৈ চলছে। আবির সকাল সকাল উঠে নাস্তা করে বেশখানিকটা সময় ধরে ভাই বোনদের দুষ্টামি দেখছে।
দুপুরের পরপর আবিরের বড় মামা আসছেন। ওনার বড় মেয়ে মাইশাকে ছেলে পক্ষ দেখতে আসবে তাই ওনি সবাইকে দাওয়াত দিতে আসছেন। যদি পছন্দ হয় তাহলে বিয়ের দিনতারিখ ঠিক হয়ে যাবে।
আলী আহমদ খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
“আমি এখন যেতে পারবো না , আপনি বরং আবিরের মা কে নিয়ে যান। বিয়ে ঠিক হোক, বিয়ের সময় সবাই যাব। ইনশাআল্লাহ। ”
বড় মামা আবিরের দিকে তাকাতেই আবির বলে উঠল,
” বড়মামা,আমায় যেতে বলো না প্লিজ। আমার অনেক কাজ আছে। তুমি আসছো যেহেতু আম্মুকে আজই নিয়ে যাও এতে কোনো সমস্যা নেই৷ তবুও আমায় যেতে বলো না। ”
বড় মামা একটু রেগে বললেন,
“এখন তোদের সমস্যা শুনছি কিন্তু বিয়ের সময় আমি কারো কোনো সমস্যা শুনতে চাই না। আমার মেয়ের বিয়েতে সবাইকে উপস্থিত থাকতে হবে। ”
আবির ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“যদি চাও সবাই মাইশা আপুর বিয়েতে উপস্থিত থাকুক তাহলে আগামী মাসের মাঝামাঝি তে তারিখ দিও। বাকিটা তোমাদের ইচ্ছে। ”
এই বলে আবির চলে গেছে। আগামী মাসে মীম আদির বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হবে, তারপর বিয়ে হলে সবাই যেতে পারবে। এজন্যই আবির বিয়ের তারিখ আগামী মাসের মাঝামাঝি দিতে বলেছে।
★★★★
কয়েকদিন পর সকাল বেলা খাবার টেবিলে সবাই একসাথে খাবার খাচ্ছিল।
আলী আহমদ খান হঠাৎ ই বলে উঠলেন,
“আবির, তোর কি কিছুদিন সময় হবে?”
আবির বাবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“কেনো?”
আলী আহমদ খান বললেন,
” তোকে রাজশাহী যেতে হতো!”
আবির ভাই রাজশাহী যাবে শুনেই মেঘ আঁতকে উঠে। ঘুম থেকে উঠে আর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে আবির ভাইকে দেখা মেঘের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। আবির ভাইকে রাজশাহী যেতে হবে শুনে অষ্টাদশীর মন সহসা খারাপ হয়ে গেছে। আবির কিছু বলার আগেই পাশ থেকে ইকবাল খান ওঠে বেসিনের দিকে চলে গেছেন।
আবির একবার বেসিনের দিকে দেখে পরক্ষণেই মেঘের দিকে এক পলক তাকালো। মেঘ মাথা নিচু করে বসে আছে। আবির ভারী কন্ঠে বলল,
“ঠিক আছে। কবে যেতে হবে? ”
মোজাম্মেল খান বললেন,
“আগামীকাল গেলে ভালো হবে। ”
কেউ আর কোনো কথা বলছে না, তানভির কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেছে। আবির খাবার শেষ করে অফিসের জন্য বেরিয়ে পরেছে।
বিকেলের দিকে মেঘের ঘুম ভাঙে, ফ্রেশ হয়ে বেলকনিতে দাঁড়াতেই দেখল নিচে আবির ভাইয়ের বাইক রাখা। তারমানে আবির ভাই বাসায়, মেঘ রুম থেকে বেড়িয়ে আবিরের রুমের দরজায় পা রাখতে রাখতে ডাকল,
“আবির ভাই! ”
পর্দা সরাতেই চোখে পরলো রাকিব ভাইয়া সহ আরও ৩-৪ টা ছেলে। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে দরজা থেকে সরে গেছে। মেঘ ওড়না মাথায় দিতে ব্যস্ত।
আবির দরজা পর্যন্ত এসে বলল,
“কি হয়েছে, বল!”
মেঘ মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“ছাদে যাব৷ চাবিটা কি দেয়া যাবে? ”
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিল,
“তুই দাঁড়া। আমি নিয়ে আসছি!”
রুমে ঢুকতেই রাকিব বলে উঠল,
“বাহ! আবির, বাহ! এখন থেকেই বউ কে”
এতটুকু বলতেই আবির রাকিবের মুখ চেপে ধরে বিড়বিড় করে বলল,
“মুখটা বন্ধ রাখ, ও বাহিরে আছে, শুনতে পাবে । ”
উচ্চস্বরে রাসেল, লিমন, মোবারক আর শিশির বলে উঠল,
“……..ও……..”
আবির রাকিবকে ছেড়ে ছাদের চাবি মেঘকে দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
” ১ ঘন্টার মধ্যে নিচে আসবি। ”
মেঘ “আচ্ছা” বলে যেতে নিয়ে আবার থমকে দাঁড়ালো। আবির তখনও দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। মেঘকে দাঁড়াতে দেখে প্রশ্ন করল,
“আবার কি হলো?”
মেঘ আস্তে করে বলল,
” রাকিব ভাইয়া বাসায় আসছে, ভালোমন্দ খবর নেয়া দরকার না? ”
আবির কপাল কুঁচকে তাকালো, ধীরস্থির কন্ঠে বলল,
“এখানে রাকিব ছাড়াও আরও কয়েকজন আছে। সবার সাথে কথা বলার আপাতত কোনো প্রয়োজন নেই। আর তোর পক্ষ থেকে আমি রাকিবের খবর নিব নে। যা এখন৷ ”
ঘরে ঢুকতেই সবাই একসাথে বলে উঠল,
“এখনই এই অবস্থা আবির! ”
আবির বিরক্তির স্বরে বলল,
“কি অবস্থা? ”
“এখনই ও বলে সম্বোধন করিস। বিয়ের পর কি বলবি?”
আবির ঠাট্টার স্বরে বলল,
“ওগো, হে গো, জান, কলিজা,ফুসফুস , ময়না, টিয়া, টুনটুনি কতকিছুই আছে।”
শিশির বলে উঠল,
“ফাজলামো বাদ দিয়ে বিয়ে টা তাড়াতাড়ি কর। আমরা তোর প্রণয়ের শুভ পরিণত দেখতে চাই। ”
আবিরের মুখের হাসি মুহুর্তেই গায়েব হয়ে গেছে। ধপ করে বিছানার পাশে বসে গুরুভার কন্ঠে বলল,
” যদি পারতাম সেই কবেই ওরে আমার রানী বানিয়ে ফেলতাম। পারছি না তো!”
রাসেল স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“সেসব বাদ দে৷ তোর এখন রাজশাহী যাওয়ার কি দরকার বলতো! এই সপ্তাহে আমাদের মিটিং হওয়ার কথা ছিল। তুই চলে গেলে কিভাবে হবে?”
আবির বলল,
“আমায় যেতে হবে। মিটিং পরে করব। ”
লিমন সচেতন কন্ঠে শুধাল,
“তোর ইকবাল চাচ্চুকে পাঠালেই হয়। এমনিতেও ওনিই তো বেশিরভাগ দায়িত্ব সামলান। ”
আবির ভারী কন্ঠে বলল
“ওনি সিলেট আর চট্টগ্রামের সব দায়িত্ব সামলান। ওনার রাজশাহী যাওয়া বারণ। ”
“কেন?” লিমন প্রশ্ন করল।
আবির বলা শুরু করল,
“অনেক বছর আগের ঘটনা, যখন রাজশাহীতে প্রথমবার কোম্পানির কাজ শুরু হয়েছিল, তখন বেশ কয়েক বছর কাকামনি রাজশাহীতে ছিলেন। ঐখানে যেই বাসাতে ছিলেন। ঐ বাসার মালিকের মেয়েকে কাকামনির ভালো লাগতে শুরু করে। মালিকের মেয়েরও কাকামনিকে ভালো লাগে। ধীরে ধীরে ওনাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিছুদিনের মধ্যে মালিকের পরিবার বিষয়টা জানতে পারে৷ তাদের দিক থেকে আপত্তি ছিল না। বিয়েও করিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কাকামনি চেয়েছিল পরিবার নিয়ে গিয়ে বউ উঠিয়ে আনবে৷ সেই যে রাজশাহী থেকে বাসায় আসছিল আব্বু আর চাচ্চুকে নিতে৷ ঐ দিনের পর থেকে আজও রাজশাহীতে পা দিতে পারেন নি। বিয়ে তো করতে পারেই নি, রাজশাহী পর্যন্ত যেতে পারেন না। জোর করে আব্বু চাচ্চুর পছন্দে কুমিল্লা থেকে কাকিয়াকে বিয়ে করিয়ে এনেছেন। মনের বিরুদ্ধে গিয়েও সংসারে মনোযোগ দিতে হয়েছিল। সংসারে মনোযোগ আনার পেছনে পুরো ক্রেডিট কাকিয়ার। ওনি অনেক ভালো মানুষ, ওনি কাকামনির পাশে বন্ধুর মতো ছিলেন। এখন পর্যন্ত রাজশাহীর বেশিরভাগ কাজ চাচ্চু করেন, এই প্রথম আমি যাব। ”
শিশির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“তোর কি হবে রে আবির!”
আবির মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“সিদ্ধান্ত তো কবেই নিয়ে নিয়েছি, মেঘকে পেলে বাঁ*চবো, আর না হয় _”
রাসেল প্রশ্ন করল,
“তোর বাবা আর চাচার সমস্যা কি?”
আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“সমাজ। ওনারা সমাজের চোখে ভালো থাকতে আপন মানুষদের মনকে হাজার বার খু*ন করতে পারেন।”
অফিসিয়াল কিছু বিষয় নিয়ে বেশকিছুক্ষণ আলোচনা চলল। এরমধ্যে মেঘ এসে চাবি দিয়ে গেছে। সন্ধার দিকে রাকিব রা চলে গেছে। রাকিবদের গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফেরার পথে মেঘের দরজার সামনে আবির দাঁড়িয়ে পরলো।
দরজা ধাক্কা দিয়ে তাকাতেই চোখে পরলো, মেঘ টেবিলের উপর মাথা নিচু করে বসে আছে। আবির মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“আসবো?”
মেঘ মাথা তুলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছে। অশ্রুসিক্ত লোচনে তাকালো, ওমনি গাল বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়তে শুরু করে । আবিরকে দেখে মেঘ আবার মাথা নিচু করে ফেলেছে। আবির এগিয়ে এসে মেঘের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল,
“চা খাবি নাকি কফি? ”
এমন প্রশ্ন শুনে পুনরায় মুখ তুলে আবিরের মুখের পানে তাকালো। এইযে সে কান্না করছে। কই একটু সান্ত্বনা দিবে, তা না ।
মেঘ মনে মনে ভাবছে,
“কখন কি বলতে হয় এই বে*টা কি কিছুই জানে না!” মেঘের বৃহৎ অক্ষি যুগল আবিরের চোখে নিবদ্ধ। গাল বেয়ে এখনও নোনাজল গড়িয়ে পরছে। আবিরের ওষ্ঠদ্বয় কিছুটা প্রশস্ত হলো, কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“এইযে কান্না করছিস, একটু পর ই তো মাথা ব্যথা শুরু হবে। তুই নিজের চিন্তা না ই করতে পারিস। আমার তো করতে হবে। ”
মেঘ সিক্ত আঁখিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“আপনার চিন্তা করতে হবে কেন?”
আবির একটু ভেবে বলল,
“কাঁদতে কাঁদতে যদি চোখে অন্ধকার দেখিস, তখন সবাই তোকে কা*নি বলবে। তানভিরের কত কষ্ট ই না হবে, যখন সবাই ওকে কা*নির ভাই বলবে। ”
আবির স্ব শব্দে হাসছে। আর মেঘ নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে।
আবির হাসি থামিয়ে বলল,
“চা খাবি নাকি কফি খাবি এটা বল। তারপর কান্না করিস। ”
মেঘ কপাল গুটিয়ে বলল,
“কফি ”
আবির মুচকি হেসে বলল,
“গুড গার্ল। এবার কান্না শুরু কর। আমি আসার আগ পর্যন্ত কাঁদবি, এক সেকেন্ডের জন্য থামবি না। রেডি ”
মেঘ আহাম্মকের মতো চেয়ে আছে। আবির হাসতে হাসতে রুম থেকে বেরিয়ে গেছে ।
(চলবে)
গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ৩৭
লেখিকা- সালমা চৌধুরী
কিছুক্ষণের মধ্যেই আবির দু কাপ কফি নিয়ে আসছে। কফির কাপ দুটা টেবিলের উপর রেখে পকেট থেকে একটা গাদাঁ ফুল বের করে মেঘের কানে গুঁজে দিল। আবিরের কর্মকাণ্ড দেখে মেঘ অভিভূতের ন্যায় চেয়ে আছে। নিষ্পলক দৃষ্টি তার। আবির ভাই নিজের হাতে কানে ফুল গুঁজে দিচ্ছে এটা অনুভব করতেই মেঘের হৃদপিণ্ড দ্বিকবিদিক ছুটাছুটি শুরু করে দিয়েছে। আবিরের প্রতি অষ্টাদশী এতটায় আসক্ত হয়ে গেছে যে দিবারাত্রি শুধু আবির ভাইকে নিয়েই স্বপ্ন দেখে। তাই কোনটা বাস্তব আর কোনটা কল্পনা সেটায় মাঝে মাঝে গুলিয়ে ফেলে।
আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
“মাশাআল্লাহ, আমার ফুল ছেঁড়াটা সার্থক হলো।”
মেঘ জানালার গ্লাসের দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখল, এলোমেলো কালো চুলে মধ্যে হলুদ রঙের ফুলটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। পরক্ষণে নিজের চোখ-মুখের দিকে নজর পরতেই গ্লাস থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। কান্নার তোপে মুখমণ্ডল লাল হয়ে গেছে, নিজের বিষন্ন মুখশ্রী দেখতে কারোর ই ভালো লাগে না।
আবির ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“কফিটা খা। ”
আবির কফির কাপ হাতে নিয়ে বিছানার পাশে বসেছে। কফির কাপে দু চুমুক দিয়ে রাশভারি কন্ঠে বলে উঠল,
” নিজেকে এতটা উৎপীড়িত ভাবিস না, মুখ লুকিয়ে কান্না তারাই করে যাদের নিজের প্রতি কোনো আস্তা নেই। ”
মেঘের নিস্তব্ধতা দেখে আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পুনরায় বলল,
“তুই যত কাঁদবি, মানুষ তোকে আরও বেশি কাঁদাতে চাইবে। কিছু মানুষের কাজ ই হলো অন্যের দূর্বল জায়গাতে আঘাত করা৷ ভার্সিটিতে পড়ছিস, নতুন বন্ধু হচ্ছে। আর যাই করিস, কখনও নিজের দূর্বলতা কারো কাছে প্রকাশ করবি না। ”
মেঘ মনোযোগ দিয়ে কফি খাচ্ছে আর আবিরের কথা শুনছে।
আবির ভাইয়ের প্রতি অষ্টাদশীর নিষিদ্ধ প্রেমানুভূতি এতটায় প্রখর হতে শুরু করেছে, যা প্রকাশ করতেও সাহস পাচ্ছে না, প্রকাশ না করেও থাকতে পারছে না। যতবার ই ভাবে আবির ভাইকে নিজের মনের কথা বলবে, ততবার ই ফুপ্পির কথা মনে পরে যায়। ফুপ্পির কথা মনে হলেই শুধু কান্না পায়৷ আবির ভাই রাজশাহী চলে যাবে শুনে এমনিতেই মন খারাপ ছিল। তারমধ্যে সন্ধ্যাবেলা জান্নাত আপু কল দিয়েছে, জান্নাত আপুর ফোন দিয়েই ফুপ্পির সাথে কথা বলেছে। ফুপ্পির কান্না শুনে মেঘও কান্না শুরু করে দিয়েছে।
বার বার শুধু মনে হয়, এই বাড়ির মানুষগুলো এত নিষ্ঠুর কেন! আব্বু- বড় আব্বু কিভাবে পারছেন বোনকে রেখে এতগুলো বছর কাটাতে! ওনাদের কলিজা কি একটাবারের জন্যও কেঁপে উঠে না? তানভির ভাইয়াও তো মেঘের সাথে এতবছর যাবৎ এমনটায় করে আসছেন। যদি জানতে পারে মেঘ আবির কে ভালোবাসে, তাহলে আব্বু-বড় আব্বুর মতো দুইভাই নিশ্চিত এমন আচরণ ই করবে! এসব ভেবেই মেঘ কাঁদছিল।
মেঘ আস্তে করে বলল,
“জান্নাত আপু কল দিয়েছিল।”
আবির ঠান্ডা কন্ঠে জবাব দিল,
“আমি জানি, ফুপ্পির সঙ্গে তোর কথা হয়েছে এটাও জানি। ”
মেঘ শীতল কন্ঠে শুধালো,
” ফুপ্পি কি আমাদের বাসায় আসবেন না? ফুপ্পির জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। ”
কথাটা বলেই মেঘ আবারও কান্না শুরু করে দিয়েছে।
আবির অত্যন্ত ধীর কন্ঠে বলে উঠল,
“তুই একমাসেই এত অধৈর্য হয়ে যাচ্ছিস, অথচ ফুপ্পি ২৮ বছর যাবৎ এই কষ্ট সহ্য করেই বেঁচে আছেন। ফুপ্পি কিছু বললে তুই যদি সঙ্গে সঙ্গে কান্না শুরু করিস, তখন তো ফুপ্পি আরও বেশি ভেঙে পরবেন। নিজেকে আগে শক্ত কর। ফুপ্পির সাথে খুব শীঘ্রই সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করবো।”
একটু থেমে আবার বলল,
“ফুপ্পির সাথে কথা বললে একটু সাবধানে বলিস, বাড়ির কেউ যেন কোনোভাবে কিছু বুঝতে না পারে। ”
মেঘ শীতল কন্ঠে জবাব দিল,
“আচ্ছা। ”
আবির আরও কিছুটা সময় নিয়ে মেঘকে বুঝানোর চেষ্টা করল। তারপর নিজের রুমে চলে আসছে।
★(scsalma90)
আবির নিজের রুমে ব্যাগ গুছাচ্ছিল। হঠাৎ তানভির দরজা থেকে ডাকল,
“ভাইয়া, আসবো!”
“আয়!”
তানভির কয়েক কদম এগিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়ালো। আবির শার্ট ভাজ করতে করতে প্রশ্ন করল,
” কিছু বলবি?”
“হ্যাঁ”
“বল”
” বনুরা ইদানীং মিনহাজ আর তামিম নামের দুটা ছেলের সঙ্গে কথা বলে, ওরা একই ডিপার্টমেন্টে পড়ে। তুমি কি এই বিষয়ে কিছু জানো?”
আবির ধীর কন্ঠে উত্তর দিল,
“জানি৷ ”
“তাহলে কিছু বলছো না কেন?”
আবির নিশ্চুপ। তানভির পুনরায় বলল,
“আমি ছেলে দুটার খোঁজ নিয়েছি। তুমি বললে আমি বনু বা ঐ ছেলেগুলোর সঙ্গে কথা বলি?”
আবির এখনও নিশ্চুপ। সে ব্যাগ গুছানোতে ব্যস্ত। তানভির আবারও বলল,
” ভাইয়া, আমি কি ওদের ওয়ার্নিং দিব?”
আবির ভারী কন্ঠে বলল,
“কোনো প্রয়োজন নেই৷ ”
“কেন?”
“এমনি। যদি পারিস আমি ফেরার আগ পর্যন্ত একটু খেয়াল রাখিস। ”
“তা তো রাখবোই৷ কিন্তু ”
“তুই যা এখন। ”
তানভির রুম থেকে বেরিয়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে রাকিব কে কল দিয়ে সব জানিয়েছে। ১০ মিনিটের মধ্যে রাকিব আবিরকে কল দিয়েছে।
আবির কল রিসিভ করেই গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“তুই ও কি একই বিষয়ে কথা বলতে ফোন দিছিস?”
রাকিব চিন্তিত কন্ঠে শুধালো,
“তোর সমস্যা কি?”
আবির বিরক্তির স্বরে জানাল,
“সমস্যা নেই৷ ”
“তুই কি বিষয় টা কে গুরুত্ব দিচ্ছিস না? ওয়ার্নিং দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। তুই শুধু বল ওয়ার্নিং দিব কি না! বিষয়টা আমি বা তানভির ই সামলাতে পারবো। ”
আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলল,
“ওয়ার্নিং দেয়ার হলে আমি প্রথম দিন ই দিতাম৷ এতদিন অপেক্ষা করতাম না। ”
“কিছু বলছিস না কেন, তুই কি মেঘের প্রতি ….. ”
রাকিবের কথা শেষ করার আগেই আবির রাগান্বিত কন্ঠে চিৎকার দিয়ে উঠলো,
“থাম! মেঘকে ছাড়া আমি আমার অস্তিত্ব কল্পনা করতে পারব না। ওকে নিয়ে আমি কোনোপ্রকার নেগেটিভ কথা শুনতে চাই না। ”
“তাহলে বিষয়টাকে গুরুত্ব কেন দিচ্ছিস না?”
“আমি মেঘকে চাই, আমৃত্যু আমি ওকে ই চাইব। মেঘ ব্যতীত এই আবিরের হৃদয় স্পর্শ করার সাধ্যি পৃথিবীর কারোর নেই।কিন্তু আমি চাইলেই তো হবে না। মেঘকেও তো বুঝতে হবে, ওর মনে আমার জন্য সমপরিমাণ ভালোবাসা আছে কি না! এই আবির কি মাহদিবা খান মেঘের হৃদয়ে তোলপাড় চালাতে সক্ষম কি না! এটা তাকে ই বুঝতে হবে। ”
একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার বলে উঠল,
“কতদিন আর সবকিছু থেকে ওকে আঁটকে রাখব। এখন ভার্সিটিতে পড়ছে, চারপাশে কত চাকচিক্যময় পরিবেশ। সবকিছুর ভিড়ে ওর মন যদি আমায় খোঁজে নেয়, তবেই না আমার ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে!”
রাকিব রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“তোর এই পাগলামির পরিণাম খুব ভয়ানক হবে। মিলিয়ে নিস। এখনও সময় আছে, তুই শুধু একবার বল৷”
আবির কন্ঠ তিনগুণ ভারী করে বলা শুরু করল,
“জীবনটা তো এমনিতেই তছনছ হয়ে গেছে। ভয়ানক পরিণামের আর কি ই বা বাকি আছে! তুই বিশ্বাস কর রাকিব, ওরে কাঁদতে দেখলে আমার কলিজা কেঁপে উঠে। মনে হয়, আমার হৃদপিণ্ড টা কে কেউ অবিরত ছু*রি দিয়ে আ*ঘাত করছে। আর যখন বুঝতে পারি এই কান্নার কারণ টা আমি, তখন নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হয়। এই জীবন তো আমি চাই নি রাকিব। ওকে কাঁদাবো বলে তো ভালোবাসি নি! তবে কেন আমার সাথেই এমনটা হলো। ”
রাকিব কথা খোঁজে পাচ্ছে না, আমতা আমতা করে বলল,
“থাক চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ। ”
আবির আর কোনো কথা বলে নি। ফোন কেটে দিয়েছে। ভোর বেলা রওনা দিতে হবে। ব্যাগ গুছিয়ে ঘুমিয়ে পরেছে।
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
আবির রাজশাহীতে গেছে তিনদিন হলো। আজকে মালিহা খান ভাইয়ের বাড়ি থেকে ঘুরে আসছেন৷ মাইশার বিয়ে আগামী মাসের মাঝামাঝিতে ঠিক করা হয়েছে। ততদিনে মীম আর আদির পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবে।
মীম আর আদি র সামনে পরীক্ষা বলে লেখাপড়া একটু বেশি করতে হচ্ছে। আকলিমা খান ছেলে মেয়েকে পড়ানোতে ব্যস্ত। মেঘ শুয়ে বসে আর টিভি দেখে দিন কাটায়। সন্ধ্যার পর মেঘ টিভিতে প্রোগ্রাম দেখছিল,
মালিহা খান মেঘের পাশের সোফায় বসে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোর ভাইয়ের সাথে কি আজকে কথা হয়ছে?”
মেঘ টিভির থেকে মনোযোগ সরিয়ে বড় আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কোন ভাই?”
মালিহা খান ভণিতা ছাড়াই বললেন,
“আবিরের সাথে কি আজকে কি কথা হয়ছে? ”
মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে উত্তর দিল,
“আমার সঙ্গে তো কথা হয় নি, সকালে আম্মুর সাথে কথা হয়ছিল।”
মালিহা খান কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“তোরা ভাই-বোনেরা এমন কেন? আমার ভাইয়েরা বিয়ের এতবছর পরেও প্রতিদিন কেউ না কেউ ফোন দিয়ে, আমার খোঁজ খবর নেয়। আর তোরা এখন ই কথাবার্তা বলিস না।তোদের বিয়ে দিলে শ্বশুর বাড়ি থেকে তো জীবনেও ভাইদের খবর নিবি না। ”
বিয়ের কথা শুনেই মেঘের মন খারাপ হয়ে গেছে৷ বাবা-মা, বড় আম্মু, কাকিয়া, ভাই-বোনদের ছেড়ে যেতে হবে ভেবে এতবছর বিয়ের কথা শুনলেই মেঘের রাগ উঠে যেতো। এখন সবার সঙ্গে আরও একজন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আবির ভাইয়ের প্রতি তার অসীম ভালোবাসার পরিণাম কি হবে! আবির ভাই ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে ভাবতেই পারে না সে।
মালিহা খান আদেশের স্বরে বললেন,
“আবির কে একটা কল দে তো! আমি সকাল ১১ টায় কল দিলাম, বিকেলেও দিলাম কিন্তু তোর ভাই তো কল ধরছে না। কল দিয়ে দেখ তো ধরে কি না!”
মেঘ পাশ থেকে ফোন নিয়ে আবিরের নাম্বারে ডায়াল করল। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ই রিসিভ হলো। মেঘ তৎক্ষনাৎ বড় আম্মুর দিকে ফোন এগিয়ে দিল।
আবির “তি..” বলতেই মালিহা খান বলে উঠলেন,
“সারাদিন কই ছিলি? সকালেও কল দিলাম, বিকালেও কল দিলাম! ”
আবির বিস্ময় সমেত তাকিয়ে ভারী কন্ঠে বলে,
“আম্মু!”
মালিহা খান পুনরায় বললেন,
“কোথায় আছিস?”
আবির ঢোক গিলে তপ্ত স্বরে বলল,
“ভুলে ফোন রেখে অফিসে চলে গেছিলাম। মাত্রই রুমে আসছি। ”
আবিরের আম্মু মুখ গোমড়া করে বললেন,
” ফোন যে রেখে গেছিলি, সেটা কি জানানোর দরকার ছিল না? আমি চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হয়ে যাচ্ছিলাম। ”
আবির ঠান্ডা কন্ঠে উত্তর দিল,
“আম্মু তোমাকে তো বলেছি, আমার জন্য এত চিন্তা করো না। তুমি কখন আসছো সেটা বলো।”
“আসছি দুপুরের পরে। মাইশার বিয়ে ঠিক হয়ছে৷ আগামী মাসে। শুন, তোর মামা সহ বাড়ির সবাই কম করে হলেও ১০০ বার করে বলে দিছে যেন তুই বিয়েতে যাস৷ ”
“সেসব নিয়ে ভাবার সময় আছে। তোমার শরীরের কি অবস্থা? ”
“আলহামদুলিল্লাহ, সুস্থ আছি ৷ তুই কেমন আছিস বাবা ? কবে আসবি? ”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি৷ কবে আসবো এখনও বলতে পারছি না। কেন?”
“তুই আসলেই বলবো। ”
“আচ্ছা। মেঘ কোথায়?”
“এখানেই আছে।”
“ফোনটা ওকে দাও তো!”
নে, তোর ভাই কথা বলবে। এই বলে ফোনটা মালিহা খান মেঘের দিকে এগিয়ে দিল। মেঘ কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা নিল। আবির ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে গেলে এখনও অস্বস্তিতে ভোগে মেয়েটা। মেঘ ফোন হাতে নেয়ায় মালিহা খান উঠে রান্নাঘরের দিকে চলে গেছেন। মেঘ ফোন কানে ধরে শীতল কন্ঠে সালাম দিল।
আবির সালামের উত্তর দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“তুই যে কাজগুলো করিস এগুলো কি বুঝে করিস?”
মেঘ ভয়ে ভয়ে শুধালো,
“কি?”
“তুই যে হুট করে আম্মুর কাছে ফোন দিয়ে দিলি। আমি তো তুই ভেবে কথা বলছিলাম। যদি কিছু বলে ফেলতাম।”
“কি বলে ফেলতেন ”
“সে যায় বলি, এমন কাজ আর কখনও করবি না। ফোন কাউকে দেয়ার আগে বলে তারপর দিবি। মনে থাকবে?”
“হ্যাঁ। ”
“আগেও কি কল দিছিলি?”
মেঘ আস্তে করে বলল,
“না। ”
“তা দিবি কেন, আমি বাড়িতে না থাকলে তো তোর ঈদ লেগে যায়। নিজের মতো চলতে পারিস, সবকিছু করতে পারিস। ”
মেঘ বিড়বিড় করে বলল,
“আপনাকে কল দিতে ভয় লাগে!”
কথাটা শুনামাত্র আবিরের মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে, কপাল গুটিয়ে অত্যন্ত পুরু কন্ঠে বলল,
” খুব ভালো, আমার মাথা ব্যথা করছে ৷ রাখছি।”
মেঘ আর কিছুই বলতে পারলো না। আবির কল কেটে দিয়েছে। অষ্টাদশী মন খারাপ করতে চেয়েও করতে পারলো না। তিনদিন পর আবির ভাইয়ের সাথে একটু হলেও কথা হয়েছে, এতেই মন টা হালকা হয়ে গেছে। তবে আবির ভাইয়ের মাথা ব্যথা শুনে চিন্তাও লাগছে।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছে আবির ভাইকে কল দিবে কি না! ভাবতে ভাবতে ডায়াল করল আবিরের নাম্বারে। অষ্টাদশীর বুকে ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেছে। বার বার মনে হচ্ছে শ্বাস আটকে আসছে, শুয়া থেকে উঠে বসেছে।
আবির ফোন রিসিভ করেই বলল,
“Sorry”
“কেন?”
“সন্ধ্যার আচরণের জন্য। ”
মেঘের অক্ষি যুগল কোটর ছেড়ে বাহিরে আসতে চাইছে। আবির ভাই তাকে সরি বলছে৷ এটাও কি সম্ভব!
মেঘ কোমল কন্ঠে শুধাল,
“আপনার মাথা ব্যথা কি কমেছে? ”
আবির ঠাট্টার স্বরে বলল,
“যদি বলি কমেছে তাহলে কি কথা বলবি না ?”
মেঘ ভণিতা ছাড়াই বলে উঠল,
“বলবো। ”
আবির মৃদু হেসে বলল,
“তারমানে কথা বলতে ফোন দিছিস?”
মেঘ আমতা আমতা করে উত্তর দিল,
“নাহ”
আবির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“তাহলে ফোন কেন দিছিস?”
মেঘ মন খারাপ করে বলল,
“জানি না। ”
আবির স্ব শব্দে হেসে বলে,
“হায় আল্লাহ! এত কনফিউজড! ”
হাসি থামিয়ে আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলে উঠল,
“চিন্তা করিস না। খাবার খেয়ে ঔষধ খাইছিলাম এখন মাথা ব্যথা কমেছে। তুই কি করিস?”
“আমি বসে আছি। ”
“খাইছিস?”
“হ্যাঁ”
“ক্লাসে গেছিলি?”
“জ্বি”
মেঘ মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“আবির ভাই! ”
সেই সুপরিচিত কন্ঠে আবির বলে,
“হুমমমমমমম”
মেঘ চোখ বন্ধ করে সেই শব্দ টা অনুভব করার চেষ্টা করল।তারপর ঢোক গিলে নিজেকে সংযত করে প্রশ্ন করল,
“আপনি বাসায় আসবেন কবে?”
আবির নিজের চুল ঠিক করতে করতে বলল,
“বাসার কেউ তো আমার কথা মনে করেই না। তাই ভাবছি এখানেই থেকে যাবো।”
আবিরের কথায় মেঘের অভিমান হলো। মেঘ বিছানা থেকে নেমে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। নিচে রাখা আবিরের বাইকটা দেখে মুচকি হেসে বলল,
” আচ্ছা, সাবধানে থাকবেন। দোয়া করি ভালো থাকুন৷ রাখছি। ”
আবির উচ্চস্বরে বলে উঠল,
“এই,Wait ”
মেঘ মৃদু হেসে শুধালো,
“কিছু বলবেন?”
আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিল,
“কাজ শেষ করতে পারলে পরশু চলে আসবো, ইনশাআল্লাহ। ”
মেঘ ভাব নিয়ে প্রশ্ন করল,
“কোনো ঐখানে থাকবেন না?”
আবির দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে উত্তর দিল,
“সেটা সময় বলে দিবে। ”
মেঘ মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“আমি মজা করছিলাম। সাবধানে থাকবেন। এখন রাখছি। ”
” আচ্ছা। তুই ও সাবধানে থাকিস। ”
মেঘ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ফোনে আবিরের ছবি দেখায় ব্যস্ত। প্রতিটা ছবিতেই আবির ভাইকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। এত সুদর্শন কোনো পুরুষ হতে পারে, এটা আবির ভাইকে না দেখলে মেঘের বিশ্বাস ই হতো না। আবির ভাইয়ের বলা প্রতিটা কথায় অষ্টাদশীর হৃদয়ে দোলা দিচ্ছে। এই কয়েকমাসে আবির ভাই অষ্টাদশীর পুরো পৃথিবী দখল করে ফেলেছে।এতগুলো ছবি দেখলো কিন্তু একটা ছবিতেও হাসির ছিটেফোঁটা নেই। অথচ ঐ মানুষটা নিজেও জানে না, ওনার হাসিটা অষ্টাদশীর অতীব প্রিয়।
মেঘের মাঝেমাঝে মনে হয়, ফুপ্পির মতো আমার জীবনটাও যদি এমন হয়৷ পরক্ষনেই ভাবে, “ফুফার মতো আবির ভাই কি কোনোদিন ভালোবাসবেন আমায় ? ”
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
আজ সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। আবির ভাই আসবে বলে মেঘ দুপুর থেকে বেলকনিতে অপেক্ষা করছে। অথচ আবির ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই। বার বার ফোন হাতে নিচ্ছে কিন্তু কল দেয়ার সাহস হচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর মীম রুমে আসছে।
মীম- আপু, কি করো?
মেঘ বেলকনি থেকে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
“এমনি দাঁড়ায় ছিলাম৷ তোর হাতে ঐটা কি? ”
মীম- আপু জানো আমার এক বান্ধবী এটা দিয়েছে। সুন্দর না?
মেঘ হ্যান্ড প্রিন্ট করা ট্রিশার্ট টা হাতে নিয়ে দেখলো।
মেঘ- অনেক সুন্দর হয়েছে। তোর বান্ধবী করেছে?
মীম- না,আমার বান্ধবীর বড় বোন ৷ অনলাইন থেকে শিখে নাকি করছে। আপু চলো না আমরাও শিখি!
মেঘ- তোর শিখতে হবে না। সামনে তোর পরীক্ষা না, আমি শিখে তোকে একটা জামা ডিজাইন করে দিব নে।
মীম- আপু সত্যি?
মেঘ একগাল হেসে উত্তর দিল,
“সত্যি সত্যি সত্যি। খুশি?”
মীম মেঘকে জরিয়ে ধরে বলল,
“অনেক খুশি। ”
মীম মেঘের রুম থেকে বের হতেই আবিরের সাথে দেখা।
মীম হাসিমুখে প্রশ্ন করল,
“ভাইয়া, কেমন আছেন?”
ভাইয়া শব্দ শুনেই মেঘের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। মেঘ দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুই কেমন আছিস?”
“ভালো।”
“নিচে তোদরে জন্য খাবার রেখে আসছি। যা”
মীম চলে গেছে৷ মেঘের হাতে মীমের দেয়া টিশার্ট টা৷ ডিজাইন দেখার জন্য রাখছিল। আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে পরপর দুইবার ভ্রু নাঁচালো।
সহসা মেঘের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। আবির মেঘকে আপাদমস্তক দেখে কপাল কুঁচকে বলল,
“হাতে ওটা কি?”
মেঘ টিশার্ট টা খুলে দেখালো, আর বলল এটা মীমের বান্ধবী মীমকে দিয়েছে।
আবির কপাল কুঁচকে পুনরায় শুধালো,
“তো এটা তোর কাছে কেন?”
মেঘ আস্তে করে বলল,
“আমি হ্যান্ড প্রিন্টিং শিখবো।”
আবির দ্বিগুণ ভারী কন্ঠে শুধালো,
“কোথা থেকে? ”
মেঘ চট করে উত্তর দিল,
“অনলাইনে ”
কথাটা শুনে আবির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“আচ্ছা শিখিস। যা যা লাগে বলিস আমায়। এনে দিব নে। ”
পকেট থেকে দুটা কিটকেট চকলেট বের করে মেঘকে দিয়ে নিজের রুমে চলে গেছে। মেঘ দরজায় দাঁড়িয়ে আবিরের হাঁটার দিকে তাকিয়ে আছে।
পেইজঃ Salma Chowdhury -সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
২ দিন পর আবিরের মামাতো বোন মাইশার বিয়ে। আবিরের মামা দিনে কয়েকবার করে ফোন দিচ্ছেন। বাসায় এসেও সবাইকে বলে গেছেন।
আবির সন্ধ্যার দিকে ছাদের এক পাশে বসে আছে। তানভির পিছন থেকে ডাকল,
“ভাইয়া। ”
আবির পিছনে না তাকিয়েই উত্তর দিল,
“এদিকে আয়। ”
তানভির আবিরের কাছে আসতে আসতে ভারী কন্ঠে বলল,
” আগে থেকেই বলা ছিল, এখন থেকে তোমার বউ তুমি সামলাবে। নিজের বউ নিজে নিয়ে যাও বিয়েতে, আমায় যেতে বলো না। ”
আবির- তুই বিয়েতে যাবি না?
তানভির – আমি কিভাবে যাবো বলো, সামনে সভাপতি নির্বাচন। এই অবস্থায় আমার পক্ষে তিন-চার দিনের জন্য বিয়েতে যাওয়া অসম্ভব। তুমি যাও সমস্যা নেই। আমি বিয়ের দিন যাব।
আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“আমার তো যেতে সমস্যা ছিল না। কিন্তু”
“কিন্তু কি?”
“মালা র জন্য একটু টেনশন হচ্ছে। গত দুই বছর যাবৎ মেয়েটা আমায় অতিরিক্ত জ্বালাইতেছে। দিনে-রাতে শুধু মেসেজ আর কল দেয়। সব ঝামেলার মূলে আমার বাসার মানুষ। মালা ফোন কিনছে ভালো কথা, আম্মুর আমার নাম্বারটা কেন দিতে হলো । প্রথমবার ভালোভাবে কথা বলছি, সম্পর্কে মামাতো বোন আমিও ঐভাবেই কথা বলছি। এরপর থেকে প্রায় ই কল দেয়, কয়েকবার নরমাললি কল রিসিভ করেছি, আমি মামা-মামির সাথে কথা বলি আর ঐ মেয়ে দেখি কেমন করে তাকায় থাকে। যখন তখন ফোন দেয়, কি উল্টাপাল্টা কথা বলে। ধমক দিলে মামা বা মামির হাতে ফোন ধরিয়ে দেয়। মামা-মামিকে তো কিছু বলতে পারি না। না পারছিলাম নাম্বার ব্লক করতে, না পারছিলাম ভালো ভাবে কথা বলতে। এখন তো বিয়ের জন্য ঐ বাড়িতে যেতে হবে। ঐ মেয়ের আচরণ দেখে তোর বোন না আবার হাইপার হয়ে যায়, এই চিন্তায় ভালো লাগছে না। ”
“এত কাহিনী তো আমায় বলো নি!”
“অসহ্যকর বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেও আমার অসহ্য লাগে। ”
তানভির একটু ভেবে বলল,
” ভাইয়া ভেবো না, তোমার একটা থাপ্পড় খাইলেই সব ঠিক হয়ে যাবে৷”
আবির বিরক্তির স্বরে জানাল,
“বাসায় যেদিন আসছিল ঐদিন ই থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে হয়ছিল৷ তোর বোন ব্যতীত আমি স্ব ইচ্ছায় কোনো মেয়েকে ছুঁতে চাই না বলে ঐ মেয়ে এখনও আমার থাপ্পড় খায় নি। ”
“এখন কি করবা?”
আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“যদি মালার কারণে মেঘের চোখ থেকে এক ফোঁটা পানিও পরে, মালার খবর আছে। আমি ভুলে যাবো সে আমার বোন হয়৷ ”
তানভির ভীত স্বরে বলে,
“ভাইয়া,তোমার রাগটা কন্ট্রোলে রাইখো প্লিজ। বনুরে মালার থেকে দূরে দূরে রাইখো। আর পারলে বনুরে একটু সময় দিও৷ ”
(চলবে)