গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ৩৮
লেখিকা- সালমা চৌধুরী
তানভিরের সাথে বেশকিছুটা সময় কথা বলে আবির নিচে আসছে৷ মেঘ সোফায় বসে টিভি দেখতেছে। ড্রয়িং রুমে আর কেউ নেই। আবির মেঘকে দেখেও না দেখার মতো করে রান্নাঘরে চলে গেছে। নিজের জন্য কড়া করে এক কাপ কফি করেছে৷ কফির কাপটা হাতে নিয়ে আবির সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে ৷ মেঘ কপাল কুঁচকে এক দৃষ্টিতে আবির ভাইকে দেখছে৷ আবিরের মনের ভেতরের দুশ্চিন্তাগুলো চেহারায় ভেসে উঠছে। অষ্টাদশী আবিরের তামাটে চেহারা দেখে বুঝার চেষ্টা করছে, আবির ভাইয়ের কি হয়েছে। মেঘ একবার ভাবছে জিজ্ঞেস করবে, কিন্তু সাহস ও হচ্ছে না৷ আবির সিঁড়ি পর্যন্ত যেতেই মালিহা খান নিজের রুম থেকে বের হতে হতে আবিরকে ডাকলেন।
আবির সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে পরেছে। মালিহা খান সোফায় এসে বসলেন, আবিরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোর সাথে কথা আছে। ”
আবির নির্বিকার কন্ঠে বলল,
“আম্মু, তুমি যে বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছো, সেই বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই না বলেই রাজশাহী থেকে ফেরার পর থেকে তোমার সাথে দূরত্ব রেখে চলছি। ”
“কথা বলতে চাই না বললেই কি সবকিছু এড়িয়ে যেতে পারবি? তোর কি বিয়ের বয়স হয় নি? বিয়ে কি করবি না?”
আবির তপ্ত স্বরে জানাল,
” বিয়ে করার সময় হলে নিজেই তোমাদের বলবো। ”
মালিহা খান শুষ্ককন্ঠে বলে উঠলেন,
” আমি আমার ছেলের এই রূপ দেখব বলে ছেলেকে বিদেশে পাঠায় নি। তোকে এতো মনমরা দেখতে আমার ভালো লাগে না। আমি চাই তুই বিয়ে কর। ”
একটু থেমে পুনরায় বললেন,
“জান্নাত মেয়েটাকে আমার খুব ভালো লাগছিল।এতদিন মেঘের টিউটর ছিল, এখন তো আর সে আমাদের বাসায় পড়ায় না। মেয়েটার খোঁজ নিতে তো সমস্যা নেই। ”
আবির নিশ্চুপ। মেঘ হা হয়ে তাকিয়ে আছে বড় আম্মুর মুখের পানে।মেঘের চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। কিভাবে বলবে জান্নাত আপুর যে বিয়ে হয়ে গেছে, তাও আবার আসিফ ভাইয়ার সঙ্গে। মেঘ সহসা আবিরের মুখের পানে তাকালো।
মালিহা খান মেঘের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোর কাছে জান্নাতের নাম্বার আছে ?”
মেঘ বলে,
“জান্নাত আপুর… ”
মেঘের কথার মাঝে আবির বলে উঠে,
“ওর কাছে নাম্বার থাকবে কোথা থেকে।তুমি কি শুরু করছো আম্মু। মেয়েটা পড়াতে আসছিল, পড়াইছে, আলহামদুলিল্লাহ মেঘ চান্স পাইছে। মেয়েটাকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতে চাইছো, গিফট দিতে চাইছো সব ইচ্ছে ই পূরণ করা হলো। এরপরও এই বিষয় নিয়ে কথা কেন উঠে?”
মেঘ আহাম্মকের মতো আবিরের দিকে চেয়ে আছে। বলে দিলেই হয়, জান্নাত আপুর বিয়ে হয়ে গেছে। আবির মেঘের দিকে চোখ রাঙিয়ে ইশারা করল, যাতে কিছু না বলে।
আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পুনরায় বলল,
“সামনে মাইশা আপুর বিয়ে তুমি বরং সেদিকে মনোযোগ দাও৷ আর বিয়ে বাড়িতে গিয়ে কোনোভাবে আমার বিয়ের কথা তুললে, আমি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে বাড়ি থেকে চলে আসবো৷ কথাটা মাথায় রেখো।”
মেইনগেইট থেকে ভেতরে দু কদম এগিয়ে আলী আহমদ খান উচ্চস্বরে বললেন,
“হয়ছে টা কি? মা ছেলের মধ্যে কি নিয়ে মনোমালিন্য চলছে?”
আবির মায়ের দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“আব্বুকে কিছু বলবা না কিন্তু। ”
বাবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“কিছু না ৷ ”
আবির চলে গেছে। বড় আব্বুকে দেখে মেঘ ও টিভি বন্ধ করে চলে যাচ্ছে। আলী আহমদ খান সোফায় বসতে বসতে মালিহা খানকে শুধালেন,
“কি হয়ছে?”
মালিহা খান মনমরা হয়ে উত্তর দিলেন,
“কি আর হবে! বিয়ের কথা বলছিলাম এজন্য রাগারাগি করছে৷ ”
আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে বললেন,
“তুমি ছেলেরে আর কিছু বইলো না । মাথাটা একটু ঠান্ডা হোক আমিই কথা বলবো।”
মালিহা খান শীতল কন্ঠে জানালেন,
“ঠিক আছে।”
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★
আজ মাইশার গায়ে হলুদ। মালিহা খান আর আলী আহমদ খান গতকাল ই বিয়ে বাড়িতে চলে গেছেন। মালিহা খান মাইশাদের বড় ফুপ্পি তাই ওনার দায়িত্বও একটু বেশি। আরও আগেই যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অসুস্থতার কারণে আলী আহমদ খান স্ত্রীকে একা ছাড়তে রাজি নন। ডাক্তার দেখিয়ে গতকাল ওনি নিজেই নিয়ে গেছেন। তানভির ব্যতিত বাকিরা আজ বিয়ে বাড়িতে যাবে। আগে থেকেই বলা,আবির ইকবাল খানের গাড়ি নিয়ে যাবে। মামনি, কাকিয়া, মেঘ,মীম আর আদিকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আবিরের।
মোজাম্মেল খান আর ইকবাল খান অফিস করে বিকেলের দিকে রওনা দিবেন। সকাল থেকে সাকিব আবিরকে কলের পর কল দিয়েই যাচ্ছে। যেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হয়। সকালের নাস্তা করে ইকবাল খান আর মোজাম্মেল খান অফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরেছেন। বাকিরা রেডি হচ্ছে।
গায়ে হলুদের পাঞ্জাবি, শাড়ি নেয়ার দায়িত্ব ছিল আবিরের। নিজের কিছু জামাকাপড় সহ, সব ব্যাগ গাড়ির ডিকিতে রাখতে গিয়ে হঠাৎ কিছু একটা মনে করে বাড়ির ভেতরে ঢুকছে আবির৷ মীম,আদি, মামনিরা ততক্ষণে রেডি হয়ে মেঘকে ডাকতে ডাকতে বেরিয়ে পড়ছেন।
কাকিয়া আবিরকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আবার কোথায় যাচ্ছিস?”
উত্তরে আবির জানাল,
“ওয়ালেট টা রুমে ফেলে আসছি। তোমরা গাড়িতে বসো আমি এখনি আসছি।”
হালিমা খান পুনরায় ডেকে বললেন,
“মেঘ রেডি হলো কি না একটু দেখিস তো। ”
আবির ” আচ্ছা ” বলে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত পায়ে উঠে রুম থেকে ওয়ালেট আর একটা জ্যাকেট নিয়ে বের হয়েছে। জ্যাকেট টা পড়ে ওয়ালেটটা চেক করতে করতে মেঘের দরজা পর্যন্ত এসে ডাকলো,
“আর কতক্ষণ লাগবে তোর?”
আবিরের কন্ঠ শুনে মেঘ চমকে উঠে। ত্রস্ত ঘুরে দাঁড়ালো সে। সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে জ্যাকেট টেনে গায়ে জরিয়ে নিয়েছে। মেঘের হুড়োহুড়ি কর্মকাণ্ডে আবির মেঘের দিকে তাকালো। মেঘের গায়ে এমনভাবে জ্যাকেট জড়ানো দেখে আবির কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির দৃষ্টিতে তাকায়। মেঘ চিবুক নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেঘ কালো রঙের একটা গাউন পড়েছে, সাথে আবিরের গিফট করা একটা গর্জিয়াছ হিজাবও পরেছে। মেঘকে দেখতে এত মায়াবী আর মোহময় লাগছে যে আবির দৃষ্টি সরাতে পারছে না। মেঘকে আপাদমস্তক দেখে আবির মেঘের আঁতকে উঠার কারণ টা বুঝার চেষ্টা করল। যদিও কিছু বুঝতে পারে নি তবুও আবির চোখ নামিয়ে “Sorry” বলে রুম থেকে বের হতে যাচ্ছিলো।
মেঘ অস্বস্তি কাটিয়ে ডাকল,
“আবির ভাই! ”
আবির দরজার বাহির থেকে উত্তর দিল,
“হুমমমমমমম।”
“মীমকে একটু ডেকে দিবেন, প্লিজ। ”
আবির বেলকনি থেকে ড্রয়িংরুমে একবার তাকালো। কোথাও কেউ নেই। আবির উচ্চস্বরে জানালো,
“সবাই বের হয়ে গেছে, মীমও গাড়ির কাছে চলে গেছে। কোনো সমস্যা? আমি কি কোনোভাবে হেল্প করতে পারবো? ”
মেঘ কি করবে বুঝতে পারছে না। মীমকে বেশ কয়েকবার ডেকেছে। আদি আর মীম হৈ-হুল্লোড় করে বেড়িয়ে গেছে তাই মেঘের ডাক মীম আর শুনে নি। আবির ভাইকে বলবে কি না বুঝে উঠতে পারছে না। মেঘকে নিস্তব্ধ থাকতে দেখে আবির পুনরায় মেঘের রুমে ঢুকেছে।
আবির রুমে ঢুকতেই মেঘ আঁতকে উঠল। বৃহৎ চোখে তাকালো। আবির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“কি হয়েছে? ”
মেঘ চিবুক নামিয়ে নিল।মেঘ এখনও জ্যাকেট জরিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। অষ্টাদশীর অশান্ত মন কেমন করে কাঁপছে। কথা আঁটকে আসছে, মাথা নিচু করে অনেক কষ্টে বলল,
“জামার চেইন টা লাগাতে পারছি না। ”
আবির স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মেঘের কাছে এগিয়ে এলো। আবিরের আগানোতে অষ্টাদশীর হৃৎস্পন্দনের মাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। আবির মেঘের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
“ঐদিকে ঘুর। ”
মেঘ না চাইতেও আবিরের দিকে পিঠ করে দাঁড়ালো। জ্যাকেট টা ধরে রাখার শক্তিটুকু পাচ্ছে না। আবির জ্যাকেটে হাত দিতেই মেঘ জ্যাকেট ছেড়ে দিয়েছে। পড়ে যেতে নিলে আবির তাড়াতাড়ি জ্যাকেট টা ধরে বিছানার উপর রাখল৷ হিজাব দিয়ে সম্পূর্ণ পিঠ ঘুরা। আবির অতি সন্তর্পণে পিঠ থেকে হিজাব টা সরায়, সহসা অষ্টাদশীর উজ্জ্বল বর্ণের পিঠ উন্মুক্ত হয়। না চাইতেও আবিরের নজর পরে সেই অচ্ছদ পৃষ্ঠে যেখানে পাশাপাশি দুইটা কৃষ্ণবর্ণের বিউটিস্পট ঝলমল করছে। আবির ঢোক গিলে দৃষ্টি সরিয়ে নিল, আবিরের বক্ষপিঞ্জরে আবদ্ধ হৃদপিণ্ডটা দিগবিদিক ছুটছে। যেন পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসবে এখনি । আবিরের সর্বাঙ্গ ঘামতে শুরু করেছে । আবিরের হাত কাঁপছে। অন্য দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে জিপারের স্লাইডারে ছুঁতে গেলে উষ্ণ হস্তের তিন আঙ্গুল মেঘের উন্মুক্ত পিঠ স্পর্শ করে। আবির আর মেঘ দুজনের গাত্র এবার একসঙ্গে কম্পিত হলো। আবিরের স্পর্শে অষ্টাদশীর অঙ্গে অব্যক্ত শিহরণ জাগছে। দেহের প্রতিটা শিরা-উপশিরায় তুফান শুরু হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে শরীরের প্রতিটা লোম দাঁড়িয়ে পরেছে।মেঘ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে, তবে তার দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি ত্রমশ কমে আসছে। আবির তাড়াহুড়ো করে স্লাইডার টেনে উপরে উঠিয়ে দ্রুত পায়ে রুম থেকে বের হয়ে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে পড়নের জ্যাকেট টা খুলে ফেলল। মনে হচ্ছে সারাশরীর থেকে গরম বাতাস বের হচ্ছে। চোখের সামনে বার বার প্রেয়সীর উন্মুক্ত পৃষ্ঠ ভেসে উঠছে৷ নিচে এসে চেয়ার টেনে বসে, এক নিঃশ্বাসে এক গ্লাস পানি শেষ করল ৷ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল। পকেটে থাকা ফোনটা অবিরত ভাইব্রেশন হচ্ছে । ফোন বের করে কল রিসিভ করল, সাকিব কল দিয়েছে। কথা বলতে বলতে মেইন গেইট পেরিয়েছে।
মামনি আর কাকিয়া গাড়িয়ে বসে আছেন। মীম আর আদি ছুটোছুটি করছে। কে সামনে বসবে সেটা নিয়েই দুই ভাইবোন বিবাদ করছে। আবির কে বের হতে দেখেই দুজন শান্ত হয়ে গেছে। অন্যদিকে আবিরের প্রস্তানের পরপরই অষ্টাদশী ধপ করে বিছানায় বসে পরেছে। উন্মুক্ত পৃষ্ঠে আবির ভাইয়ের স্পর্শ অনুভব করতেই বার বার শিহরিত হচ্ছে মেঘের গাত্র। যাও ভেবেছিল জ্যাকেট টা পরবে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে গ্রীষ্মের প্রখর রোদে পু্ড়ছে তার দেহ৷
কিছুক্ষণের মধ্যে নিচে নামলো মেঘ। আবির গেইটে তালা ঝুলিয়ে গাড়ির কাছে আসতেই শুনতে পেল তিন ভাইবোনের কথোপকথন। তিনজন ই সামনে বসার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে । আবির সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ড্রাইভিং সীটে বসে পরলো।
আকলিমা খান গাড়ির ভেতর থেকে ডাকলেন,
“কিরে, তোরা কি গাড়িতে উঠবি?”
মেঘ বাকিদের উদ্দেশ্যে বলছে,
“শুন, আবির ভাই যেই রা*গি, গাড়িতে বসে ঘাড় ঘুরালেই দিবে মা*ইর। তোরা কেউ সামনে বস। আমি বরং পিছনেই বসবো।”
মেঘের কথা শুনে মীম আর আদি দুজন দুজনের দিকে তাকালো। আদি দৌড়ে এসে মায়ের পাশে বসে পরেছে। আদির পিছন পিছন মীমও ছুটে এসে বলছে,
“আমিও আম্মুর সাথে যাব। ”
মেঘ মনমরা হয়ে বলল,
“কি আর করার, তাহলে তো আমাকেই সামনে বসতে হবে।”
উপরে উপরে মনমরা ভাব দেখালেও মনের ভেতরে তার রাজ্য জয়ের খুশি।
আদি একগাল হেসে বলল,
“মেঘাপু তুমি ই বরং সামনে বসো।”
মেঘ যে মনে মনে তাই চাইছিল এটা তো আর তারা জানে না। আবির ভাই গাড়ি চালাবে আর মেঘ পিছনে বসবে তা হতেই পারে না। গতকাল রাত থেকেই প্ল্যান করে রেখেছে যেভাবেই হোক তাকে সামনে বসতেই হবে৷ মেঘ মিটিমিটি হেসে গাড়িতে উঠেছে। আবির এতক্ষণ বেখেয়ালি থাকলেও পুরো ঘটনায় সে মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। গাড়ির জানালা দিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মুচকি হাসল। আবির চাইলেই সবার মধ্যে মেঘকে সামনে বসতে বলতে পারতো না। মেঘ যে নিজে থেকে আবিরের পাশে বসার চেষ্টা করেছে এতেই আবিরের মন প্রশান্তিতে ভরে গেছে।
দিনকে দিন মেঘের করা পাগলামি গুলো আবিরকে তার প্রেয়সীর প্রতি আরও বেশি আসক্ত করে তুলছে।
★(scsalma90)
খান বাড়ির রাজপুত্র আর রাজকন্যারা ঢাকা থেকে ত্রিশালের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। আবিরের মামার বাড়ি ময়মনসিংহ বিভাগের ত্রিশালে। যানজট পেরিয়ে আসতে অনেকটায় সময় লেগে যায়। আবির পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। মেঘ একবার রাস্তার দিকে দেখছে, মাঝে মাঝে আড়চোখে আবিরকেও দেখছে। আবিরের দিকে যতবার তাকায়, ততবারই বাসার ঘটনার কথা মনে পরে যায়। প্রতিবারই অষ্টাদশী লজ্জায় নুইয়ে পড়ে। আকলিমা খান আর হালিমা খান সাংসারিক আলোচনা করতে ব্যস্ত। গাজীপুর চৌরাস্তা পেরিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর আবির গাড়ির কাঁচ নামিয়ে দিয়েছে। শীতল পরিবেশ, রাস্তার পাশে বিশাল আকৃতির গাছ। মেঘ একমনে তাকিয়ে সেসব দৃশ্য দেখছে, আর আপনমনে কতকি ভাবছে৷ অষ্টাদশীর অশান্ত মনে ছুটোছুটি করছে কতশত প্রেমময় বার্তা। আচমকা আবির রাস্তার পাশে গাড়ি থাকাতে মেঘ সহ বাকিরাও চমকে উঠে৷ আবির মামনি আর কাকিয়ার উদ্দেশ্যে বলে,
“তোমরা একটু বসো। আমি আসছি৷ ”
৫ মিনিটের মধ্যে একটা শপিং ব্যাগ আর কিছু খাবার নিয়ে গাড়িতে উঠেছে৷ খাবার গুলো মীমদের দিয়ে শপিং ব্যাগ টা মেঘকে দিয়ে বলল,
“এটা রাখ৷ পরে নিবো।”
দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আবিরের মামা বাড়িতে পৌছালো। তিন মামার বাড়ি পাশাপাশি। বড় মামার বাড়ি দুতলা বিল্ডিং৷ বিয়ে বাড়িত গেইট অনেক দূর থেকেই সবার চোখে পরেছে । গেইটের কাছে অনেকেই অপেক্ষা করছে। মীমদের নামতে দেখে বরণডালা নিয়ে মালা ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে।
মেঘ বের হতে যাবে এমন সময় আবির মেঘের হাত টেনে এক হাজার টাকার নোট মেঘের হাতে দিয়ে আস্তে করে বলল,
“বরণ করলে এটা দিয়ে দিস। ”
মেঘকে কেউ যেন কোনোভাবে কিছু বলতে না পারে, তাই আবির আগে থেকেই চোখ কান খোলা রাখার চেষ্টা করছে৷
আবিরের সামনে মালা বরণডালা ধরতেই আবির বিরক্তির স্বরে বলল,
“আমার এসব পছন্দ না। বরণ করলে ওদের কর।”
আবির বরণডালায় টাকা দিয়ে, মালা কে পাশ কাটিয়ে বাড়িতে ঢুকে পরেছে। মালা যথারীতি হাসিমুখে বাকিদের বরণ করল। আবির একটু ভেতরে আসতেই সাকিব দৌড়ে এসে আবিরকে জরিয়ে ধরে বলল,
“কেমন আছো ভাইয়া?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুই কেমন আছিস?”
“আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো। কত বছর পর তুমি আমাদের বাড়িতে আসছো৷ ভালো তো থাকতেই হবে।”
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো,
“বাকিরা কোথায়?”
“আছে। চলো।”
ততক্ষণে মেঘরাও বাড়িতে ঢুকে পরেছে। আবির বারান্দায় পা রাখতে রাখতে সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিল। সালামের উত্তর দিয়ে একেক জন একেক প্রশ্ন করছে। তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক মহিলা বলে উঠলেন,
“এইডা বাবু না? কত বড় হইয়া গেছে। মাশাআল্লাহ। বাবুরে চেনার তো কোনে উপায় ই নাই। ”
উঠান থেকে মেঘ কথাটা শুনেই ফিক করে হেসে দিল। আবির ভাইয়ের মত সুপুরুষ দেহী, এত লম্বা-চওড়া মানুষকে কেউ বাবু বলে সম্বোধন করছে এটা শুনেই হাসি পাচ্ছে। তারপরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধালো,
“বাবু কে আম্মু?”
হালিমা খান বললেন,
“আবিরকে ওর নানাবাড়ির মানুষ ছোটবেলা বাবু বলে ডাকতো। ওনি তোর বড় আম্মুর চাচি হোন।”
আবির মৃদু হেসে শুধালো,
“নানু কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালা আছি ভাই। তুমি ভালা আছো নি?”
“আলহামদুলিল্লাহ। ”
বেশকিছুটা সময় আলাপচারিতা চলল। আবির মাইশার সঙ্গে দেখা করতে ভেতরে চলে গেছে। মাইশার রুমের সামনে এসে ডাকল,
“আপু আসবো?”
মাইশা আবিরকে দেখেই মিষ্টি করে হাসলো। বিছানা থেকে নেমে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছিস ভাই আমার! কত বছর পর তোকে দেখছি। ”
আবিরের ওষ্ঠদ্বয় প্রশস্ত হলো, উত্তরে আবিরও বলল,
” তোমাকেও। আচ্ছা আপু, এই বিয়েতে তুমি খুশি তো?”
“আলহামদুলিল্লাহ। আব্বু আম্মু খুশি থাকলে আমিও খুশি। শুধু একটায় ইচ্ছে, যার কাছে বিয়ে দিচ্ছে সে মানুষটা যেন ভালো হয়। ”
“চিন্তা করো না। মানুষ হিসেবে ভাইয়া খুব ভালো। আমি খোঁজ নিয়েছি। তাছাড়া ওনার সাথে আমার দেখাও হয়েছে। ইনশাআল্লাহ তুমি সুখী হবে।”
“তুই দেখা করছিলি?”
এরমধ্যে মীম, মেঘ আর আদিও মাইশা আপুকে দেখতে আসছে। মাইশা বরাবর ই চাপা স্বভাবের একটা মানুষ। কখনো কারো বাড়িতে বেড়াতেও যায় না। তবে ফোনে প্রায় ই সবার সাথে কথা হয়। তাছাড়া মালিহা খান বেড়াতে আসলে ওনার মুখে বাসার সবার কথায় শুনে। সেভাবেই চিনে সকলকে।
আবির ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
“কেনো? ভাইয়া কি তোমায় বলে নি?”
” কথা বলি না তো। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর একদিন কথা হয়ছিল। আমার কথা বলতে খুব অস্বস্তি লাগে। ওনি মাঝে মাঝেই কল দেন কিন্তু আমি রিসিভ করি না। ”
আবির শপিং ব্যাগ আর নিজের পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে মাইশা আপুর হাতে দিয়ে বলল,
“তুমি কথা বলো না বলে তোমার জামাই মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে আমাকে দিয়ে পাঠাইছে৷ এটা পড়ে ওনাকে কল দিতে বলছে। ”
মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো,
“রাস্তার ঐ লোকটা কি আপুর বর ছিল?”
আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে উপরনিচ মাথা নাড়লো। মেঘ মুচকি হেসে বলল,
“মাশাআল্লাহ, আপু ভাইয়া কিন্তু কিউট আছে৷ ”
মাইশা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাইশা কিছু বলার আগেই আবির মেঘকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর কন্ঠে বলে,
” হইছে তোর আর পাকনামি করতে হবে না। আপুর হাসব্যান্ড আপু বুঝবে। তোরা যা এখন । ”
মেঘ,মীম আর আদি রুম থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আবির পা বাড়াতেই মাইশা আবিরের হাতে চিমটি কেটে আস্তে করে বলল,
“আমার জামাই রে কিউট বলছে তাতে তোর এত জ্বলে কেন! কাহিনী কি? কি চলে? ”
তখনই রুমে মালার আগমন হলো। আবির মালাকে দেখে থমথমে কন্ঠে জবাব দিল,
” কিছু না৷ ”
মালা বলল,
“ভাইয়া কেমন আছো? ”
“ভালো।”
আবির মাইশার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে। আবির সাকিবের সঙ্গে থাকবে। তাই গাড়ি থেকে ব্যাগ নামিয়ে সাকিবের রুমে গেল। সাকিব আর মালারাও সম্পর্কে চাচাতো ভাই-বোন। মেঘ, মীম, দিশা, স্মৃতি ওরা চারজন এক রুমে থাকবে বলে ঠিক করেছে। দিশা মালার আপন ছোট বোন। স্মৃতি সাকিবের ছোট বোন। খাওয়াদাওয়া করে বিকেলের দিকে চার কাজিন মিলে পুরো বাড়ি ঘুরে দেখছিল। বিয়ে বাড়ি মানেই হৈ-চৈ। বিকেল হতে হতে আত্মীয় স্বজনদের ভিড় জমতে শুরু হয়েছে। মেঘ, মীম আগেও কয়েকবার এসেছিল তবে সেসব ছোটবেলার ঘটনা। এখন আর কিছুই মনে নেই তাদের। আবিরদের তিন মামার বাড়ি পাশাপাশি হওয়ায় তিনটা উঠান মিলে বাড়ির সামনে বিশাল মাঠের ন্যায় জায়গা। একপাশে খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আরেক পাশে গায়ে হলুদের স্টেজ করা হচ্ছে। সাকিব, মিলন, আবির এমনকি আদিও স্টেজ সাজানোতে ব্যস্ত। মেঘ আবিরকে দেখেই থমকে দাঁড়ালো। পা বাড়ালো সেদিকে । স্মৃতি পেছন থেকে ডাকল,
“মেঘাপু কোথায় যাচ্ছো?”
“স্টেজ সাজানো দেখতে। ”
“ঘুরবা না?”
“তোমরা ঘুরে আসো। আমি যাব না। ”
মেঘ আর কোথায় যাবে । তার আবেগের কেন্দ্রবিন্দু তো আবির ভাই৷ আবির ভাইকে দেখাতে যতটা শান্তি, সেই শান্তি আর কোথাও নেই। তাই মেঘ স্টেজের দিকে এগিয়ে আসলো।
সাকিব মেঘকে দেখে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছো, মেঘবতী? ”
“আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
মেঘের কন্ঠ শুনে আবির পেছন ফিরে মেঘকে দেখলো। চুল গুলো বেঁধে, মাথায় ওড়না দিয়ে রেখেছে। আবির
লাইটিং সেট করতে করতে শুধালো,
“খাইছিস কিছু?”
“জ্বি৷”
সাকিব মেঘকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাইয়া কিন্তু এখনও খায় নি। তুমি ভাইয়ার খোঁজ নিলে না কেন?”
আবির দাঁতে দাঁত চেপে সাকিবের দিকে তাকিয়ে বলে,
“বেশি কথা বললে তোর শরীরে তার পেঁচিয়ে দিব।”
মেঘ শীতল কন্ঠে বলল,
“আমি তো জানতাম না। ”
আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল,
” আমি খাইছি। সাকিব এমনেই মজা করছে। ”
আবির, সাকিবেরা কাজ করছে। মেঘ চেয়ারে বসে বসে তাদের কাজ করা দেখছে। কিছুক্ষণ পর স্মৃতি, দিশা আর মীমও চলে আসছে। সবাই চেয়ারে বসে গল্প করছে অথচ মেঘের নজর আবিরের দিকে। আশেপাশে কে কি বলছে সেসবে কোনো মনোযোগ নেই তার। স্টেজ সাজানো প্রায় শেষের দিকে, তখন মালা একটা প্লেটে অনেক রকমের পিঠা নিয়ে আসছে। আবিরকে ডেকে বলছে,
“আবির ভাইয়া, তোমার জন্য পিঠা নিয়ে আসছি।”
মালার কথায় আবির কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া দেখালো না। ফিরে তাকালোও না। অথচ মেঘের ছ্যাত করে রাগ উঠে গেছে। মনে পরে গেছে,বাসায় আবির ভাইয়ের উপর ঢলে পড়তে যাচ্ছিল এই মালা আপু। আবির ভাইয়ের প্রতি তখন তীব্র ভালোবাসা অনুভব করতে না পারলেও সেদিন ঠিকই কেঁদেছিল সে। তবে এখন তো সে আবিরকে ভালোবাসে। আবির ভাই ভালোবাসুক বা না বাসুক, অষ্টাদশী মনে প্রাণে আবিরকে ভালোবাসে। আবিরের আশেপাশে সে কাউকে সহ্য করতে পারবে না। মেঘ ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছে।
মালা পুনরায় বলল,
“পিঠা গুলো খেয়ে নেও ভাইয়া। ”
আবির পেছনে না ফিরেই বলল,
“আমি খাব না পিঠা, ওদের দে। ”
হাত দিয়ে মেঘদেরকে ইশারা করল। আবিরের কথাটা মালার পছন্দ হয় নি। অকস্মাৎ সাকিব বলল,
“৩ দিন যাবৎ এত কাজ করতেছি। আমাকেও তো একটা পিঠা সাধতে পারিস।”
মালা সাকিবের উপর নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে,
“তুই কি বাড়ির মেহমান যে তোকে আলাদা করে পিঠা দিতে হবে”
সাকিব মন খারাপ করে বলল,
“আজ মেহমান হতে পারি নি বলে কেউ দাম ই দেয় না। ”
মালা আর কথা বাড়ালো না। মেঘের হাতে পিঠাগুলো দিয়ে চলে গেছে। পিঠাগুলো সে আবিরের জন্য আলাদা করে এনেছিল। নকশি পিঠার সবগুলোই লাভ আকৃতির। পিঠাগুলোর দিকে নজর পড়তেই দ্বিতীয় দফায় রাগ উঠে গেল মেঘের। মীম আর স্মৃতির দিকে পিঠাগুলো দিয়ে বলল,
“তোরা খা, আমি খাব না। ”
আবির সাকিবের দিকে তাকাতেই সাকিব জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে মেঘবতী ? পিঠা খাবে না কেন তুমি? আমাদের বাড়ির পিঠাগুলো কি অপরাধ করেছে যে তুমি তাদের ছুঁয়েও দেখছো না। ”
মেঘ গম্ভীর মুখ করে উত্তর দিল,
“পিঠা খাবো তবে এগুলো না। ”
সাকিব বলে,
“এই মিলন, মেঘবতীর জন্য পিঠা নিয়ে আয়। যত জাতের পিঠা ঘরে আছে সবগুলো নিয়ে আসবি। ”
মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি এখন খাবো না পিঠা। ”
মিলন সেসবে পাত্তা দেয় নি, কিছুক্ষণের মধ্যে ই বড় প্লেট দিয়ে অনেক প্রকারের পিঠা এনে মেঘকে দিয়েছে। মেঘ না চাইতেও ২-১ টা পিঠা খেয়েছে। আবির লাইটিং এর কাজ শেষ করে মেঘের পাশের চেয়ারে বসেছে।
মেঘ আবিরের দিকে প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নেন পিঠা খান। ”
আবির দুহাত সামনে এগিয়ে বুঝালো হাতে ময়লা, খাবে কি করে। মেঘ ভণিতা ছাড়াই বলল,
“হাত ধৌয়ে আসুন। ”
আবির রাশভারি কন্ঠে বলে,
“কষ্ট লাগছে৷”
মেঘ মুচকি হেসে আস্তে করে বলল,
“খাইয়ে দিব আমি?”
“দিলে খারাপ হয় না।”
মেঘ কথাটা মজা করে বলেছিল। আবির ভাই যে এভাবে রাজি হয়ে যাবে এটা ভাবে নি। আবিরের পছন্দমতো কয়েকটা পিঠা খাইয়ে দিয়েছে। হঠাৎ আবিরের চোখে পরে, বড় মামার সঙ্গে আবিরের আব্বু বাড়িতে আসতেছেন। আবির মেঘকে বলে,
” আর খাবো না, তুই খা। ”
আবির তৎক্ষনাৎ চেয়ার থেকে উঠে স্টেজে চলে গেছে। স্টেজের বাকি কাজ করছে। আবির ভাইয়ের অকস্মাৎ পরিবর্তন দেখে মেঘ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। মনে মনে ভাবছে,
“এই বেটার সমস্যা কি, মাঝে মাঝে মনে হয় ওনার মতো রোমান্টিক মানুষ এই পৃথিবীতে আর একটাও নেই, আবার মাঝে মাঝে মনে হয় ওনার মতো পাষাণ আর একটাও নেই। ওনি এমন কেন!”
আলী আহমদ খান মীম আর মেঘকে দেখে হাসিমুখে প্রশ্ন করলেন,
“তোমরা কখন আসছো?”
বড় আব্বুর কন্ঠস্বরে মেঘের ধ্যান ভাঙ্গে। মীম স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,
“দুপুরের দিকে আসছি বড় আব্বু।”
আবিরের বড় মামা শুধালেন,
খাওয়াদাওয়া করছো? নাকি শুধু পিঠায় খেতে দিছে তোমাদের? ”
মেঘ আলগোছে হেসে উত্তর দিল,
“আমরা এসেই ভাত খেয়েছি। এখন আবার পিঠা খাচ্ছি। ”
মামা পুনরায় বললেন,
“বাড়িটাকে নিজের বাড়ি মনে করবে। যা ইচ্ছে হবে নিজের হাতে নিয়ে খাবে। সেটা গাছের কোনো ফল ই হোক অথবা ঘরের কোনো খাবার। ”
মীম আর মেঘ একসঙ্গে বলল,
“আচ্ছা বড় মামা। ”
হঠাৎ করেই বাড়ির পরিবেশ বদলে গেছে। হৈ-হুল্লোড় যেন তিনগুণ বেড়ে গেছে। মাইশার শ্বশুর বাড়ি থেকে বেশ কয়েকজন গায়ে হলুদের শাড়ি,মেহেদী আরও কি কি নিয়ে আসতেছে । আবির আগন্তুকদেরকে কয়েক মুহুর্ত পর্যবেক্ষণ করলো। ৪-৫ টা অল্পবয়স্ক মেয়ে সাথে ৫-৭ টা ছেলে। মালা গেইটের সামনে গিয়ে তাদের বরণ করছে। স্মৃতি আর দিশাও গেইটের কাছে চলে গেছে। মীম যেতে নিলেই আবির ধমক দেয়। আবিরের ধমকে মীমের সঙ্গে সঙ্গে মেঘ ও কেঁপে উঠেছে ।
আবির মেঘ আর মীমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
” তোরা এখন রুমে যা। মেহমান যাওয়ার আগপর্যন্ত, তোদের এক বোনের ছায়াও যদি আমি দেখি তাহলে খবর আছে বলে রাখলাম। ”
মেঘ মাথা নিচু করে বলল,
“আপুকে হলুদ লাগাবো না?”
আবির বিরক্তির স্বরে বলল,
“রাতে লাগাইস। এখন যা। ”
মেঘ আর মীম দুজনেই মাথা নিচু করে একে অপরকে অভিযোগ জানাতে জানাতে রুমে চলে গেছে। এতদিন তানভির ভাইয়া এমন করেছে। মীম আর মেঘ দুজনকেই অতিরিক্ত শাসনে রেখেছে৷ এবার তানভির আসে নি তাই ভেবেছিল একটু আনন্দ করবে। সব আনন্দে আবির ভাই পানি ঢেলে দিল।
সন্ধ্যার পরপরই মেহমান চলে গেছে। মাইশা আপু মীম আর মেঘকে খোঁজে না পেয়ে দিশাকে দিয়ে ডেকে পাঠাইছে। মাইশা আপুর ৪ জন বান্ধবী এসেছে। মালা আপুর ও ৩ টা বান্ধবী এসেছে। এছাড়াও খালাতো, মামাতো বোনেরা তো আছেই। সন্ধ্যার পর থেকে বাড়িতে শাড়ি পরার ধুম পরেছে। মীম আর মেঘ বিছানার এক পাশে বসে সবার সাজগোছ দেখছে। মাইশা আপু বারবার দুজনকে শাড়ি পড়তে বলছে। মীম শাড়ি দুচোখে সহ্য করতে পারে না। কিন্তু সবার শাড়ি পড়া দেখে মেঘের খুব ইচ্ছে করছে শাড়ি পড়তে। তবে আজ পর্যন্ত কখনও শাড়ি পড়ে নি সে, তাই শাড়ি সামলাতে পারবে না ভেবে ভয় পাচ্ছে। মাইশা আপুর এক বান্ধবীকে দেখে হঠাৎ মেঘের রাকিবের গার্লফ্রেন্ড এর কথা মনে পরে গেল। জান্নাত আপুর বিয়েতে কত সুন্দর করে সেজে আসছিল। রাকিব ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড কে দেখে সেদিন মেঘেরও শাড়ি পড়তে ইচ্ছে হয়েছিল। তবে আজ আর সাহস পাচ্ছে না৷
আচমকা মাইশা আপু মেঘের দিকে তাকিয়ে জোড় গলায় বললেন,
“মেঘ তুমি কিন্তু শাড়ি পড়বে। একদম না শুনবো না। পড়বে মানে পড়বেই।”
“আপু আমি তো কখনো শাড়ি পড়ি নি৷”
“তোমার যেভাবে সুবিধা হবে সেভাবেই পড়ানো হবে৷ তুমি চিন্তা করো না।”
মীমের এসব শাড়ি পরা দেখতে দেখতে আর ভালো লাগছে না। মেঘ শাড়ি পড়বে শুনে মন খারাপ করে রুম থেকে বেড়িয়ে গেছে। মেঘ ও রেডি হতে ওয়াশরুমে গেছে৷ মাইশা আপু মিটিমিটি হাসছে।
মাইশা আপুর বেস্টফ্রেন্ড জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে প্রশ্ন করল,
“কিরে হাসছিস কেন?”
মাইশা আশেপাশে দেখে বান্ধবীর কানের কাছে বিড়বিড় করে বলল,
“আবিরের কথা বলছিলাম না তোকে, ওর চাচাতো বোন মেঘ। আমি সিউর আবির মেঘকে পছন্দ করে, কিন্তু কিছু বলতে পারছে না। মেঘকে শাড়ি পড়াচ্ছি যাতে আবিরের রিয়েকশন বুঝতে পারি, বুঝলি। ”
(চলবে)
গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ৩৯
লেখিকা- সালমা চৌধুরী
মাইশার শ্বশুর বাড়ির লোকজন চলে গেছে অনেকক্ষণ হলো। তবুও মেঘ, মীমের পাত্তা নেই। আবির আদিকে দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছে অথচ মেঘ আর মীম এখনও নামছে না। হঠাৎ আবিরের মনে হলো, মেঘের জন্য সে আলাদা করে গায়ে হলুদের ড্রেস নিয়ে আসছিল, যেটা আবিরের ব্যাগেই আছে৷ আবির সাকিবদের ঘরে গিয়ে ড্রেসটা বের করে দেখছে। গায়ে হলুদ উপলক্ষে সবার জন্য রানী গোলাপি রঙের শাড়ি-পাঞ্জাবি আনা হয়েছে। কালার পছন্দ করার দায়িত্ব আবিরের ছিল, তাই হলুদ রঙ বাদ দিয়ে অন্য রঙকেই প্রাধান্য দিয়েছে সে ৷ শাড়ি- পাঞ্জাবি কেনার দিন ই মেঘের জন্য একটা ড্রেস কিনেছিল। কিন্তু বাসায় আসার পর সেই জামা দেখে মন ভরছিল না। তাই গতকাল রাতে মার্কেটে গিয়ে অনেক খোঁজে মেঘের জন্য পছন্দমতো রানী গোলাপি রঙের একটা ড্রেস নিয়ে আসছে। ড্রেসটা পড়লে তার Sparrow কে কেমন লাগবে সেটায় ভাবছে। কিছু একটা ভেবেই নিজের মাথায় গাট্টা মেরে আনমনে হেসে ফেলল । ড্রেসটা শপিং এ ভরে মালাদের ঘরের সামনে উঠান পর্যন্ত আসতেই মালিহা খান ডাকলেন,
“এসে থেকে কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছিস? ভাবি বললো আসার পর নাকি অল্প ভাত খাইছিলি ৷ তোর কি খিদে পায় না? পিঠা দিব তোকে? নাকি ভাত খাবি?”
“এখন কিছু খাবো না, আম্মু। বিকেলে পিঠা খাইছি। খুদা লাগলে খাব। তুমি টেনশন করো না। ”
আবির মায়ের সাথে কথা বলে যেই না ঘরে ঢুকতে যাবে। তখনই সামনে মালা হাজির হলো। আবিরের কন্ঠ শুনেই নিজের রুম থেকে বেড়িয়ে এসেছে। মালা উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো,
“ভাইয়া, তোমার কি কিছু লাগবে? আমায় বলো আমি এখনি দিচ্ছি। ”
আবিরের হাতে শপিং ব্যাগ দেখে পুনরায় প্রশ্ন করল,
“শপিং ব্যাগে কি?”
আবির রাগান্বিত কন্ঠে উত্তর দিল,
“সে যায় থাকুক, তোর ভাবতে হবে না। আর আমার কিছু লাগলে আমি নিজেই নিতে পারবো। তুই নিজের চরকায় তেল দে। ”
আবিরের রাগান্বিত কন্ঠ শুনে মালা মাথা নিচু করে মনে মনে বলল,
“আমার ই তো ভাবতে হবে। আমি যে তোমাকে ভালো..”
আবির ধমক দিল,
“রাস্তা থেকে সরে দাঁড়া। ”
মালা তড়িঘড়ি করে সরে দাঁড়ালো। আবিরকে যেতে দেখে মালাও নিজের রুমে সাজতে চলে গেছে।
আবির বারান্দা পেরিয়ে দুতলায় যাওয়ার জন্য কয়েক সিঁড়ি উঠতেই, আচমকা আলতা রাঙা একটা পা চোখে পরলো৷ পায়ের মালিক দুতলা থেকে নামছিল, সিঁড়িতে এক পা রেখেই যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। আবির স্বাভাবিক ভাবে চোখ তুলে তাকাতেই আশ্চর্য বনে গেল। চোখ পড়ে এক মায়াবিনীর দিকে, সহসা মুগ্ধ আঁখিতে তাকায়। সেই মায়াবিনী যেন মায়ার জাল বিছিয়ে রেখেছে, আবিরের মতো হাজারো সুপুরুষ যুবক তার এই রূপে ঝলসে যাবে। বাঙালি স্টাইলে রানী গোলাপি রঙের শাড়ি পরিহিতা মায়াবিনীর কোমড় ছাড়ানো চুলগুলো অতিশয় ধীর গতিতে উড়ছে। মুখে হালকা মেকাপ, চোখে আইলানারের সঙ্গে গাঢ় করে কাজলও লাগানো, ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক ৷ গলায় হালকা গহনা তার সঙ্গে কোমড়ের বিছা ৷ আবির কিংকর্তব্যবিমূঢ়, বিষ্ময় চোখে মায়াবিনীকে আপাদমস্তক দেখলো। বাকরুদ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সেই আঁখি জোড়ায় । মায়াবিনীর দিকে তাকিয়ে, উপরের সিঁড়িতে পা রাখতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়তে নিলে সঙ্গে সঙ্গে হ্যান্ডরেলে ধরে কোনোরকমে নিজেকে সামলালো।
আবিরকে হোঁচট খেতে দেখে মায়াবিনী কয়েক সিঁড়ি নেমে আতঙ্কিত কন্ঠে শুধালো,
“কি হয়েছে আপনার?”
মায়াবিনীকে কাছে আসতে দেখে আবির তৎক্ষনাৎ ২/৩ সিঁড়ি নিচে নেমে, নেশাক্ত কন্ঠে বিড়বিড় করে কি যেন বলল,
মায়াবিনী শুধু শেষে বলা “উফফ” টায় বুঝতে পেরেছে। মায়াবিনী চিন্তিত স্বরে শুধালো,
“আপনি ঠিক আছেন তো?”
আবির উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“তুই কি ঠিক থাকতে দিচ্ছিস ?”
আবিরের প্রশ্ন শুনে মায়াবিনী অপলক দৃষ্টিতে তাকালো৷ চোখে মুখে উজ্জ্বলতা ফুটে উঠেছে। উত্তেজিত কন্ঠে পুনরায় প্রশ্ন করল,
“শাড়িতে কেমন লাগছে আমায়?”
আবির পুনরায় তাকালো, ক্লান্তিহীন অমত্ত চেয়ে রইলো কিছুটা সময়। মেঘ তীর্যক চোখে চেয়ে আছে, মুখে তার মিষ্টি হাসি৷ আবিরের ঘোর যেন কিছুতেই কাটছে না। দৃষ্টি তার সরছেই না। মনে হচ্ছে, মায়াবিনীকে দেখার ব্যাকুলতা এই জনমে আর শেষ হবে না। মৃত্যু ব্যতীত মায়াবিনীর মায়ার জাল থেকে বের হতে পারবে না সে ৷
মেঘ পুনরায় প্রশ্ন করল,
“কেমন লাগছে বললেন না!”
মেঘের কথায় আবিরের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটে, আবেশিত কন্ঠে বলল,
” মায়াবিনী ”
আবির ভাইয়ের মুখে মায়াবিনী শব্দ শুনে অষ্টাদশী লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেল। ব্লাশ দেয়া কপোল আরও বেশি রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। ডিসেম্বরের তীব্র শীতেও অষ্টাদশীর নাক ঘামে চিকচিক করছে। প্রিয় মানুষের মুখে নিজের প্রশংসা শুনে অষ্টাদশীর কলেবরে অন্যরকম শিহরণ জাগছে।
এতক্ষণ আবির ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, এখন লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারছে না।
আবির গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“হাতটা দেখি। ”
আবির নিজের হাত বাড়ালো, মেঘ ডান হাত একটু এগুতেই আবির মেঘের হাত ধরে, এক সিঁড়ি উপরে উঠে মেঘের ডান হাতের কনিষ্ঠা আঙুল মুখের কাছে নিল। মেঘের কনিষ্ঠা আঙ্গুল ব্যতিত বাকি আঙুলগুলো স্থান পেল আবিরের গালে। আবিরের গালে থাকা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি স্পর্শ করতেই অষ্টাদশীর বুকের ভেতর উতালপাতাল ঢেউ শুরু হয়ে গেছে। আবির মেঘের কনিষ্ঠা আঙুলে আস্তে করে কামড় দিল৷ ওমনি অষ্টাদশী কেঁপে উঠলো। মেঘের অস্বস্তি বুঝতে পেরে আবির হাত ছেড়ে কিছুটা দূরে দাঁড়ালো।
আবির স্বভাবসুলভ ভারী কন্ঠে বলল,
” আমায় সুন্দর লাগছিল বলে তুই একদিন নজর কাটিয়েছিলি, আজ আমি কাটালাম। ”
মেঘ নিস্তব্ধ, নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । আবির নিজেকে সামলে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
” মানুষ মা*রার প্ল্যান টা কার?”
“মানে?”
” তুই তো কোনোদিন শাড়ি পড়িস নি, আজ হঠাৎ শাড়ি পরার কারণ কি?”
মেঘ আমতা আমতা করে বলল,
“মাইশা আপু জোর করলো শাড়ি পড়ার জন্য। আপু আর আপুর বান্ধবী মিলেই আমায় সাজিয়ে দিয়েছে। ”
“তাই তো বলি…”
“কি?”
“কিছু না। পড়েছিস ভাল কথা কিন্তু তোর জন্য শাড়ি আনা হয় নি। এইযে তোর ড্রেস, শাড়ি টা পাল্টে ড্রেস টা পড়ে নিচে আসবি। ”
মেঘ শপিং ব্যাগ টা হাতে নিয়ে একটু দেখল, তারপর মন খারাপ করে বলল,
” আনা হয় নি মানে শাড়িটা তো মাইশা আপুই আমায় দিয়েছে৷ ওখানে তো অনেক শাড়ি ছিল৷ ”
“এত বেশি বুঝিস কেন? শাড়ি বেশি থাকলেই কি পড়তে হবে?”
একটু থেমে পুনরায় বলল,
” তুই এভাবে স্টেজে গেলে মাইশা আপুর বদলে, সবাই তোকেই হলুদ লাগাতে আসবে। তার থেকেও বড় বিষয়, বিয়ে বাড়িতে এত এত মানুষ, কত বাজে মেন্টালিটির ছেলে আছে, কখন কোন ছেলে কি বলে ফেলবে, তখন তো গাল ফুলাইয়া কান্না শুরু করে দিবি৷ আমি তানভির না, যে সর্বক্ষণ তোকে চোখে চোখে রাখবো, কোনো সমস্যা হলে ঠান্ডা মাথায় সমাধান করবো। বাই এনি চান্স কোনো ছেলে উল্টাপাল্টা কিছু বললে,তখন আমার হাত উঠে যাবে।আমি বিয়ে খেতে আসছি, মা*রপিট করতে নয়৷ তুই কি চাস, তোর জন্য আমি বিয়ে বাড়িতেও মা*রপিট করি?”
মেঘ ডানে-বামে মাথা নেড়ে উচ্চস্বরে বলল,
“নাহ”
আবির মোলায়েম কন্ঠে বলল,
” যদি বিয়ে বাড়িতে কোনোরকম ঝামেলা না চাস, তাহলে এসব মেকাপ তুলে, ড্রেসটা পড়ে সিম্পলি নিচে আসবি। আর যদি মনে হয়, সবাই শাড়ি পড়েছে তাই তোকেও শাড়িই পড়তে হবে তাহলে এভাবেই যেতে পারিস৷ চয়েজ ইজ ইউর’স৷ ”
মেঘ আর কিছু বলল না ৷ শপিং ব্যাগটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। মন খারাপ হওয়ার বদলে অষ্টাদশীর চোখে-মুখে প্রখর উজ্জ্বলতা । আবির ভাইয়ের বলা “মায়াবিনী” শব্দটা বার বার কানে বাজছে৷ আবির ভাই যে তাকে নিয়ে চিন্তা করে, এটা ভাবতেই মেঘের হৃদয়ে প্রশান্তির হওয়া বয়ে গেল।
আবিরের দৃষ্টি মেঘেতে নিবদ্ধ, অকস্মাৎ বুকে হাত রাখল। মস্তিষ্কের নিউরনে অবিরাম বাজছে,
“তোর রূপে এই আবির বিধ্বস্ত। ”
মানসিক টানাপোড়েনে ভুগছে সে৷ অশান্ত মনকে শান্ত করার কোনো শব্দ খোঁজে পাচ্ছে না। হৃদয়ে গান বাজছে,
“Yeh dil pagal bana baitha
Isey ab tu hi samjha de
Dikhe tujhme meri duniya
Meri duniya tu banja re”
যতক্ষণ অষ্টাদশীকে দেখা যাচ্ছিল, আবির ততক্ষণ দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। অষ্টাদশী আড়াল হতেই আবির ধপ করে সিঁড়িতে বসে পড়েছে, হাত দিয়ে চোখ-মুখ ডেকছে । বক্ষপিঞ্জরে উতালপাতাল ঢেউ৷
তখনই সাকিব আসছে৷ আবিরকে সিঁড়িতে বসে থাকতে দেখে চিন্তিত স্বরে শুধালো,
“কি হয়ছে ভাইয়া? এখানে বসে আছো কেন?”
আবির চোখ-মুখ থেকে হাত সরিয়ে সাকিবের দিকে তাকিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“সাকিবরে আমি শেষ। ”
সাকিব আবিরের কাছাকাছি এসে শুধালো,
” কি হয়ছে বলবা তো ”
“যত দিন যাচ্ছে, আমি ওর প্রতি তত বেশি আসক্ত হয়ে যাচ্ছি। মায়াবিনীর মায়া কাটানোর ক্ষমতা যে আমার নেই।”
“মায়া কাটানোর দরকার কি? তুমি তো মেঘবতীকেই ভালোবাসো। বিয়ে করে নাও, তাহলে এই মায়ার বাঁধন আরও বেশি শক্ত হবে৷ তোমাদের দুজনকে পাশাপাশি দেখলে আমার কি যে ভাল লাগে ”
সাকিব মাথা চুলকে শুধালো,
“ভাইয়া, তুমি না বলছিলা দেশে আসার ৩ মাসের মধ্যে বিয়ে করবা। এখন তো ৬ মাস হয়ে যাচ্ছে। বিয়ে করছো না কেন?”
বিয়ের কথা শুনতেই আবিরের চোখে-মুখে বিষন্নতা ছেয়ে গেছে। মামা-মামিরা ব্যতীত আবিরের ফুপ্পির ঘটনা আর কেউ জানে না৷ আবিরও নিজে থেকে সাকিবকে কিছু বলে নি৷ আবির সিঁড়ি থেকে উঠে যেতে যেতে বলল,
” পরিস্থিতি বলতে একটা শব্দ আছে৷ জানিস তো? আমি এখন পরিস্থিতির অধস্তনে বন্দি। পরিস্থিতি যেদিকে নিয়ে যাবে আমি সেদিকে যেতে বাধ্য। ”
সাকিব কিছুই বুঝলো না। আবিরকে প্রশ্ন করার আগেই আবির সেই জায়গা ত্যাগ করল। আশপাশে না তাকিয়ে সোজা সাকিবের রুমে চলে গেল। রুমে ঢুকেই বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। বক্ষে তার তীব্র কম্পন, পৃথিবীর সবার চোখে অদম্য, গুরুগম্ভীর আর শক্তপোক্ত ব্যক্তিটা আজ এক মায়াবিনীর রূপে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এত বছর বুকের ভেতর চেপে রাখা অনুভূতিরা যেন খাঁচা ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে। অষ্টাদশী কি করে বুঝবে, তাকে এই রূপে দেখে আবিরের হৃদয়ে কতটা তোলপাড় চলছে।
২০ মিনিট কেটে গেল। আবিরের এক হাত মাথার নিচে অপর হাত বুকের বা পাশে। আচমকা চোখ মেলে তাকায়, ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি। বিছানার পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিল। গ্যালারিতে ঢুকেই প্রথম ছবিটাতে চাপ দিল। ওমনি মেঘের শাড়ি পরা একটা ছবি ভেসে উঠেছে। মেঘের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছুক্ষণ আগেই ২ টা ছবি তুলেছিল আবির। সেখান থেকেই একটা ছবি সুদীর্ঘ মনোযোগ দিয়ে দেখছে। কাজল কালো চোখ, লজ্জায় লালিত মুখমণ্ডল, ওষ্ঠদ্বয়ে মায়াবী হাসি আবিরের অশান্ত মন জানান দিচ্ছে,
“মায়াবিনীর মায়াজালে আবিরের মৃত্যু নিশ্চিত। ”
আবির ফেসবুকে ঢুকে নিজের টাইমলাইনে একটা পোস্ট করে,
“মনের বিরুদ্ধে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে যুদ্ধে শহীদ হওয়া বোধহয় অধিকতর শান্তিপূর্ণ। ”
নিচে ছোট করে লিখেছে ” Best Surprise ever 🖤”
আবির পুনরায় মেঘের শাড়ি পরা ছবিটা বের করেছে৷ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। অকস্মাৎ ফোনের যান্ত্রিক আওয়াজ বেজে উঠলো৷ তানভির কল করেছে। আবির রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কন্ঠ ভেসে এলো,
“ভাইয়া, তুমি ঠিক আছো ? বনু ঠিক আছে তো? ”
আবির মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“তোর বোন বোধহয় সিদ্ধান্ত নিয়েই নিছে, আমায় না মে*রে থামবে না।
“কেন? কি হয়ছে? বনু কিছু করছে? রাগে বকা দাও নি তো আবার! ”
“তোর বোন এমন রূপে আমার সামনে আসছে, ধমক দেয়া বহু দূর, আমি তো…….. ”
“তুমি তো কি? বনু কেমন রূপে আসছে?”
“তুই না আমার সম্বন্ধি হোস, ছোট বোনের প্রেমালাপ শুনতে চাস, লজ্জা লাগে না তোর। ”
“আচ্ছা সরি। তোমরা ঠিকঠাক থাকলেই হলো। তোমাদের দুজনকে একসাথে পাঠিয়ে এখন টেনশনে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তোমার স্ট্যাটাস দেখে আরও বেশি ভয় লাগছিল। তাই তাড়াতাড়ি কল দিলাম। কিছুক্ষণ আগে মাইশা আপু কল দিয়েছিল আমায়। যাই নি বলে রাগারাগি করছে। আমি বলছি সকাল সকাল চলে আসবো। ”
“আচ্ছা। সাবধানে থাকিস । আর আসার সময় আমার বাইকটা নিয়ে আসিস। ”
“আচ্ছা। ”
“রাখছি। ”
“ভাইয়া শুনো”
“হ্যাঁ বল।”
“বনুর সাথে রাগ দেখিও না প্লিজ। ”
“এখন রাগ দেখানোর অবস্থায় আমি নেই। তোর বোনকে নিয়ে পালাইয়া না যায়, এই টেনশনে আছি৷ রাখছি ”
আবির কল কেটে ওয়াশরুম থেকে হাতমুখ ধৌয়ে আসছে। তানভির আহাম্মকের মতো বসে আছে, বনু কি করছে, ভাইয়ার কি হয়ছে, কি বললো সব যেনো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আবির ভাইয়া পরিবারের জন্য এত দৃঢ় সংকল্প নিয়ে, হুট করে পালিয়ে যাওয়ার কথায় বা কেন বলছে। ভাইকে কল দিলেও লাভ নাই। মাঝে মাঝে তানভির ভাবে, ভাইয়ার সম্বন্ধি না হয়ে শালা হলেই ভালো হতো। মজার ছলেও অন্ততপক্ষে ভাই কিছু বলতো। যাতে ভাইয়ের মনোভাব বুঝতে পারতো সে। আবির কিছুক্ষণের মধ্যে রেডি হয়ে বের হয়ছে, রানী গোলাপী রঙের পাঞ্জাবি পরায় আজ আবিরকে অন্যরকম সুন্দর লাগছে। সাদা, কালো আর ধূসররঙের ভিড়ে উজ্জ্বল বর্ণটা আবিরকে বেশ মানিয়েছে। প্যান্ডেলে ঢুকতে গিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো, মেঘ কোথাও নেই। মীম, দিশা আরও কয়েকজন মিলে গল্প করছে।
আবির মীমকে ডেকে জিজ্ঞেস করল,
“মেঘ কোথায়?”
মীম ও আশেপাশে তাকাচ্ছে, ধীর কন্ঠে বলল,
“আপুকে তো দেখছিলাম নিচে আসছিল, এখন তো দেখছি না।রুমে গিয়ে দেখে আসবো ভাইয়া ?”
“তোর যেতে হবে না। ”
আবির দুপা এগুলোতেই সাকিব ছুটে আসছে। আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,
“ভাইয়া এতক্ষণে আসছো তুমি। তোমার মেঘবতী তো সেজেগুজে নিচে আসছিল, ঐনে মালা আর ওর দুই বান্ধবী কথা বলছিল। কি কথা বলছে তো শুনি নাই কিন্তু দেখলাম মেঘবতী মুখ গোমড়া করে উপরে চলে যাচ্ছে। তখন আব্বু, চাচ্চু আমায় ডেকে নিয়ে গেছে, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস আনার দরকার ছিল। তাড়াহুড়োতে রুম পর্যন্ত যেতে পারছিলাম না, ফোনটাও রুমে চার্জে রেখে আসছি তাই জানাতেও পারছিলাম না। কাজ শেষে দৌড়ে আসছি..”
আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“যে ভ*য়টা পাচ্ছিলাম….”
আবির ঝড়ের গতিতে মেঘদের রুমে গেছে। রুমে কেউ নেই, বিছানার উপর শাড়ি, কসমেটিকস এলেমেলো পরে আছে। আবির আশেপাশের ২-৩ টা রুম চেক করল। কোথাও কেউ নেই। হঠাৎ সিঁড়ির দিকে নজর পরতেই ছুটলো সেদিকে৷ ছাদ জুড়ে ঝলমল করছে লাল নীল আর সবুজ রঙের আলো, তার একপাশে মেঘ দাঁড়িয়ে আছে । হাতে একটা গাছের ঢাল যেটা দিয়ে ছাদের রেলিং এ অবিরত আঘাত করছে।
মেঘ ড্রেস পড়ে নিচে নামতেই চোখ পরে মালা আপু আর তাদের বান্ধবীদের দিকে। তারা কোনো বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন। মেঘ সেসবে পাত্তা না দিয়ে দু পা এগুতেই কানে আসে,
” আবির ভাইয়ার সাথে আমার দুবছর যাবৎ ফোনে কথা হয়, প্রায় ই ভিডিও কলে কথা হয়,আমি যে ওনাকে ভালোবাসি এই কথাটা এখনও বলি নি। আজকে সুযোগ পেলে ভাইয়াকে বলে ফেলব। তোরা আমায় বুদ্ধি দে, কিভাবে বললে ওনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাবেন। ”
কথাগুলো কানে আসতেই মেঘ স্তব্ধ হয়ে গেছে। দাঁতে দাঁত চেপে ধরল। ক্রোধে কপালের শিরাগুলো দৃশ্যমান হয়ে গেছে। মেঘের চোখ-মুখ রক্তাভ হয়ে ওঠেছে। দাঁত কিড়মিড় করছে। আবির ভাই মালা আপুর সাথে কথা বলে, এই কথাটা অষ্টাদশীর মনে চরমভাবে আঘাত করেছে। রাগে গজগজিয়ে ছাদে চলে আসছে। রাগ টা আসলে কার উপর উঠেছে সেটা নিজেও বুঝতে পারছে না। মালা আপুর আচরণ ভালো লাগে নি এজন্য মালা আপুকে আগে থেকেই সহ্য করতে পারে না। অথচ আবির ভাই..! ভাবতেই বক্ষস্পন্দন থমকে গেল। রাগে ফুঁসতে আর ভাবছে,
” এতগুলো বছরে একটাবারও আপনি আমার সঙ্গে কথা বলেন নি, এখন জোর করতে পারলে তখন কেন জোর করে আমার সাথে কথা বললেন না। যদি কথা না ই বলবেন, তাহলে মালা আপুর সাথে কেন কথা বলেছেন। তাহলে কি আপনি….!”
এটুকু ভেবেই থেমে গেল৷ ক্রোধ যেন কমছেই না বরং বাড়ছে। পাশে একটা গাছ থেকে একটা ঢাল ভেঙে সেটা দিয়ে রেলিং এ আঘাত করেই নিজের ক্রোধ কমানোর চেষ্টা করছে।
আবির বিদ্যুৎ বেগে ছুটে এসে মেঘের হাত চেপে ধরল৷ হাত থেকে ঢাল টা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলল। আবির সরু নেত্রে খেয়াল করল অষ্টাদশীর চোখ-মুখ। লাইটের আলোতে বারবার পরিবর্তন হচ্ছে চেহারার বর্ণ। মেঘের চোখে-মুখে তীব্র ক্ষিপ্রতা। আবিরের উপস্থিতি বুঝতে পেরে রাগ যেন তিনগুণ বেড়ে গেছে। আবিরের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কোথাও কেটেছে কি না, আবির সেটা দেখার চেষ্টা করছে। অথচ মেঘ নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে হাত সরানোর চেষ্টা করছে। মেঘের এমন কান্ডে আবির অগ্নি চোখে তাকিয়েছে৷ ধমক দিতে গিয়েও থেমে গেল, ঢোক গিলে নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করল। মেঘের অন্য হাতটা টেনে নিল। মেঘের দু’হাত একসঙ্গে রেখে কব্জি বরাবর চেপে ধরে তপ্ত স্বরে বলল,
“এখন দেখব কিভাবে নিজের হাত ছাড়াস ”
মেঘ রাগে কটমট করে বলল,
“ছাড়ুন আমায়৷ ”
“না ছাড়লে কি করবি?”
রাগে কটমট করছে মেঘ প্রশ্ন করল,
“কোন অধিকারে আমায় ছুঁয়েছেন? ”
মেঘ রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে কথাটা বলল।
আবির নিরেট কন্ঠে উত্তর দিল,
” আমায় অধিকারবোধ শেখাতে আসিস না। তোকে ছোঁয়ার জন্য যদি অধিকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়, আমি সেই অধিকারনামায় স্বাক্ষর করে হলেও তোকে ছুঁবো।”
রাগের মাথায় আবিরের কথাগুলো মেঘ শুনলো কিনা কে জানে৷ অতিরিক্ত ক্রোধে মেঘের মাথা ঘুরছে, তবুও শান্ত হওয়ার নাম নেই৷ মেঘ রাগান্বিত কন্ঠে পুনরায় চেঁচিয়ে উঠল,
“আমায় ছাড়ুন বলছি৷ ”
“ছাড়ার জন্য তো ধরি নি, ছাড়িয়ে নিতে পারলে নে। ”
মেঘ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আমি কিন্তু চিৎকার করব।”
আবির এবার স্ব শব্দে হাসলো। মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে বলল,
“হাসছেন কেন? আমি কিন্তু সত্যি সত্যি চিৎকার করবো।”
আবির তপ্ত স্বরে প্রশ্ন করল,
“তুই যে অগাচণ্ডী সেটা কি জানিস?”
“মানে…”
“এইযে চিৎকার করবি বললি, চিৎকার তুই করতেই পারিস, কিন্তু সবাই আসলে বলবি টা কি শুনি? আমি তোর হাত ধরেছি এটায় নালিশ করবি? তোর কি মনে হয়, তোর এই নালিশের ভয়ে আমি তোর হাত ছেড়ে দিব? জীবনেও না। বরং তুই নালিশ করলে আমার সুবিধায় হবে। দে চিৎকার। ”
আবিরের কথাগুলো শুনে মেঘ হঠাৎ ই আবিরের দিকে কেমন করে তাকালো। এতক্ষণ নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আবিরের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির ঝলক দেখে অষ্টাদশীর রাগ কিছুটা কমে এসেছে। তবে এখনও পুরোপুরি শান্ত হতে পারে নি। আবিরের মুখের পানে দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি নামাতেই চোখ পরে রানী গোলাপী পাঞ্জাবিতে। সঙ্গে সঙ্গে অষ্টাদশীর অভিব্যক্তি পাল্টাতে শুরু করলো। আবির ভাইকে এভাবে দেখে যেন চোখ ফেরাতে পারছে না। আচমকা ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। নিজের ভেতরের সমস্ত রাগ ঝেড়ে ফেলতে চাইলো। এই মানুষটার সাথে আর যাই হোক রাগ করা অষ্টাদশীর পক্ষে অসম্ভব বিষয়।
আবির গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করল,
“তোর কি হয়েছে আমি জানি না, জানতেও চাই না। আমি কিছু কথা বলবো তুই চুপচাপ সেগুলো শুনবি।”
আবিরের কথায় মেঘের দৃষ্টি সরল, মাথা নিচু করে দাঁড়ালো। আবির বলে,
“মনে কর, তুই একটা ড্রেস কিনতে একটা দোকানে গেছিস, অনেক খোঁজার পর একটা ড্রেস তোর খুব পছন্দ হয়েছে। যেই ড্রেসটা নিতে যাবি তখনি অন্য একজন এসে তোর পছন্দের ড্রেসটা নিয়ে দেখতে লাগল । তারও ড্রেসটা খুব পছন্দ হয়েছে। তখন তুই কি করবি ড্রেসটা হাসিমুখে তাকে দিয়ে দিবি? নাকি শক্ত গলায় বলবি, এই ড্রেসটা আমি নিব। যদি অভিমান করে তোর পছন্দের জিনিস গুলো মানুষকে দিতে থাকিস, পরে একটা সময় দেখবি তোর আশেপাশে প্রিয় জিনিস বলতে কিচ্ছু নেই। ”
মেঘ মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনলো। আবির মেঘের হাত ছেড়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“আমাদের আশেপাশে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যেগুলো দেখেও না দেখার মতো করে চলতে হয়। যদি আমরা সেগুলোকে পাত্তা দেয়, তাহলে আমাদের জীবন ধ্বংস। অনিশ্চিত জীবনে যতদিন বাঁচবি, ততদিন নিজেকে নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবি। আমি নিচে যাচ্ছি, ১০ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসবি। ”
আবির দীর্ঘ পা ফেলে সিঁড়ির কাছে গিয়ে আবার পেছন ফিরে তাকালো, উচ্চস্বরে বলল,
“My Dear Sparrow,
সবকিছু চাইলেই পেয়ে যাবেন, এমনটা নাও হতে পারে৷ প্রয়োজনে কিছু জিনিস আদায় করে নিতে হয়।”
আবির চলে গেছে। মেঘ ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় ঘুরছে আবির ভাইয়ের বলা শেষ কথাটা৷ “প্রয়োজনে কিছু জিনিস আদায় করে নিতে হয়।” মেঘের রাগ, অভিমান, মন খারাপের কারণগুলো এক মুহুর্তেই পালিয়েছে। আবির ভাই যেন অষ্টাদশীকে ইন্ডাইরেক্টলি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, “আবির ভাইয়ের ভালোবাসা আদায় করে নিতে হবে৷ ” সহসা মেঘের ঠোঁটে হাসি ফুটেছে। এই হাসিতে কোনো খাদ নেই। মনের ভেতর নেই কোনো অভিযোগ।
মেঘ দ্রুত রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে, অন্তহীন পায়ে ছুটতে ছুটতে নিচে নামলো। মেঘের ছুটোছুটি দেখে হালিমা খান বিরক্ত হয়ে বললেন,
“এভাবে দৌড়াচ্ছিস কেন, পরে ব্যথা পেলে কি হবে?”
মেঘ এক গাল হেসে উত্তর দিল,
“আমার কিচ্ছু হবে না। ”
দৌড়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। আঁখি জোড়া কাউকে খোঁজছে। হঠাৎ চোখ পরে প্যান্ডেলের দিকে। একটা ব্রেঞ্চে আবির ভাই বসে আছে।পেছনের সাইড দেখা যাচ্ছে, মেঘ চুলগুলো দেখেই চিনতে পেরেছে। আবিরের পাশে সাকিবকে দেখে সিউর হয়েছে। সাকিব এদিকেই তাকিয়ে ছিল।
সাকিব আবিরের কানের কাছে বিড়বিড় করে বলল,
“ভাইয়া, তোমার প্রেয়সী আসছে কিন্তু সাথে শত্রুপক্ষের আগমন হচ্ছে। বি কেয়ারফুল। ”
সাকিব আবিরের পাশ থেকে উঠে আবিরের বিপরীতে একটা চেয়ার টেনে বসল। মেঘ আবিরের কাছাকাছি আসতেই চোখে পরল, মালা একটা ট্রে নিয়ে মেঘের আগে আবিরের সামনে হাজির হলো। কিছু খাবার আর এক গ্লাস শরবত। আবিরের কাছে এসে মালা মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“ভাইয়া, তোমাকে কতক্ষণ যাবৎ খোঁজতেছিলাম। তুমি তো দুপুরের পর আর কিছু খাও নি। তাই খাবার নিয়ে আসছি। ”
মালার আহ্লাদী কন্ঠে আবিরের মেজাজ খারাপ হলো। তবুও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। আবির প্রখর তপ্ত স্বরে জানাল,
“আমি এখন খাবো না। নিয়ে যা। ”
মেঘের রাগ ক্রমে ক্রমে বেড়েই চলেছে। গাল ফুলিয়ে আবিরের থেকে কিছুটা দূরে আবিরের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। সামনে থেকে আবিরকে দেখছে। অথচ আবির কারো দিকেই তাকাচ্ছে না।
মালা পুনরায় বলল,
“খাবার টা খেয়ে নাও প্লিজ।”
আবির রাগান্বিত কন্ঠে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মেঘ আবিরের কাছাকাছি দাঁড়ালো। ঝোঁকে আবিরের মুখোমুখি হলো। মেঘকে কাছে আসতে দেখে আবির একটু পিছিয়ে গেল। মেঘ আচমকা আবিরের বুকের উপরের বোতাম টা লাগাতে লাগাতে বলল,
“পাঞ্জাবি তো পরেছেন ঠিকই, বোতাম গুলোও ঠিকমতো লাগাতে পারেন নি। ”
বোতাম লাগিয়ে তাকালো মাথায়, এক মুহুর্তের ব্যবধানে চুলে হাত দিল। দুহাতে চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল,
“ইশশ, চুলগুলোও এলোমেলো করে ফেলেছেন। আমি না থাকলে যে আপনার কি হবে, এটায় ভেবে পায় না।”
আবির অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে মেঘকে দেখছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে নিম্নাষ্ঠ কামড়ে ধরল। চোখে মুখের বিস্ময় যেন সরছেই না। মেঘ যে এমন কান্ড করবে, এটা আবির কল্পনাতেও ভাবতে পারে নি। মেঘের কান্ডে স্তব্ধ হয়ে গেছে আবির। মেঘ চুল ঠিক করে এক পা পিছিয়ে আবিরকে ভালোভাবে পরখ করে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“এইতো এখন ভালো লাগছে৷ মাশাআল্লাহ। ”
কথাটা বলেই ধপ করে আবিরের পাশে বসে পরল। সাকিব চেয়ারে বসে এতক্ষণ বিপুল চোখে সব ঘটনা দেখছিল। ছেলেটা মুখ চেপে হেসেই যাচ্ছে। সবার মুখে হাসি থাকলেও। মালা রাগে ফুঁসছে। মেঘকে আবিরের বোন ব্যতিত কিছু ভাবে নি সে। তবে এখন মেঘের আচরণ দেখে মালার সহ্য হচ্ছে না৷
মেঘ মালার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“আপু, আবির ভাই এ সময় কিছু খায় না। কিছু লাগলে আমি এনে দিব নে। তুমি বরং তোমার বান্ধবীদের সময় দাও। ”
মালা রাগে কটমট করে চলে যাচ্ছিল। সাকিব পেছন থেকে ডাকল,
“মালা, খাবার টা বরং আমায় দিয়ে যা। আমি খেয়ে তোর জন্য দোয়া করবো। ”
মালা হুঙ্কার দিয়ে উঠল,
“তোর দোয়া আমার লাগতো না। ”
আবির মেঘের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আজ সকাল থেকে যা যা ঘটছে তারপর আবির আর কোনোভাবেই নিজেকে সংযত রাখতে পারছে না। মালা চলে যাওয়ায় মেঘও আবিরের দিকে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই আবির ভ্রু নাচালো। মেঘ নিঃশব্দে হাসলো। কাজল কালো চোখ সাথে অকৃত্রিম হাসিতে আবির ঘায়েল হয়ে গেছে। নেশাক্ত কন্ঠে শুধালো,
“এটা কি ছিল?”
মেঘ হাসিমুখে উত্তর দিল,
“আপনি বুঝবেন না৷ ”
আবির ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই সাকিব বলে উঠল,
“ভাইয়া, শুধু হাতে পায়ে লম্বা হলেই হয় না। বুদ্ধির ও প্রয়োজন আছে। তোমার উচিত মেঘবতীর থেকে কিছু বুদ্ধি ধার নেয়া৷ ”
আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে থেকেই মুচকি হেসে জানাল,
“আমিও তাই ভাবছি। এখন থেকে যখন ই বুদ্ধির প্রয়োজন হবে, তখন ই ওর কাছে যাবো।”
মেঘ আবিরের মুখের পানে চেয়ে ভেঙচি কেটে উঠে চলে গেছে । আবির নিঃশব্দে হাসছে আর অষ্টাদশীর প্রস্থান দেখছে। আবিররা যেখানে বসেছে তার পেছনে কিছুটা দূরে গায়ে হলুদের স্টেজ৷ মীম, দিশা আরও কয়েকটা মেয়ে সেখানেই বসে আছে। মীমকে দেখে মেঘও সেখানে গিয়ে মীমের পাশে বসেছে।
সাকিব চেয়ার থেকে উঠে এসে আবিরের পাশে বসতে বসতে মোবাইল এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নাও তোমার ভিডিও আর ছবি। ঠিক আছে কি না দেখো।”
আবির টেনে টেনে সবগুলো দেখছে। মেঘের ভেঙচি থেকে শুরু করে আরও অনেক ছবি তুলে ফেলছে। ১ টা ছবিতে দু’জন দু’জনের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা ভিডিও করেছে। ভিডিওটা তে বোতাম লাগানো, চুল ঠিক করার দৃশ্য।
সাকিব আস্তে করে বলল,
” ভাইয়া আমার কিন্তু খুব রাগ উঠতেছে। ”
আবির ফোনটা পকেটে রেখে বলল,
” কেন? ”
আবির ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল মেঘ সবার সঙ্গে কথা বলছে আর হাসছে। সাকিবের কাঁধে মাথা রেখে আবির মেঘকে দেখছে। সাকিব ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
” তোমাদের লুকোচুরি প্রেম আর কতদিন চলবে? ”
“জানি না।”
“এইযে কিছু বলতে পারো না তোমার খারাপ লাগে না?”
“খারাপ তো লাগেই। ওর জন্য কত নির্ঘুম রাত কাটে আমার। ও যদি জানতো! নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকালবেলা ওর মায়াবী আঁখি জোড়া দেখলে মনে হয় আরও শত শত রাত নির্ঘুম কাটাতে পারবো।”
সাকিব মজা করে বলল,
“আহারে ভালোবাসা। ”
(চলবে)