আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব-৪২+৪৩

0
3892

গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ৪২
লেখিকা- সালমা চৌধুরী

যে মেয়ে ঠিকমতো মেহেদী ধরতে পারে না, সে মেয়ে আজ এত কষ্ট করে মেহেদী দিয়ে আবিরের নাম লিখেছে৷ কোথায় আবির একটু খুশি হবে তা না রাগে নামটায় মুছে দিল। আবিরের কার্যকলাপে মেঘের গালসহ পুরো মুখ লাল হয়ে গেছে। নিরুদ্যম ক্রোধে আবিরের চোখ জ্বলছে। মেঘ জড়বস্তুর ন্যায় স্তব্ধ হয়ে আছে,ওষ্ঠদ্বয় অবিরাম কাঁপছে। আবির ক্রোধান্বিত কন্ঠে বলল,

“সবকিছুর একটা লিমিট থাকা দরকার। তুই কি ভাবছিস, তুই যা ইচ্ছে করবি আর কেউ তোকে কিচ্ছু বলবে না? কোন সাহসে আমার নাম লিখেছিস?”

একদমে কথাগুলো বলে দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো। চোখ ফেটে যেন আগুন বের হচ্ছে। আবিরের অগ্নিদৃষ্টি দেখে মেঘের বুক ফুঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো। আবির ভাইয়ের এই রূপ আর কখনও দেখে নি সে। ভয়ে বুক কাঁপছে। অক্ষিপট ভিজে আসছে। হঠাৎ হাতে ব্যথা অনুভব হওয়ার চিবুক নামিয়ে তাকালো হাতে৷ আবির মেঘের হাতটা এখনও শক্ত করে চেপে ধরে আছে। অতীব ব্যথা অনুভব হওয়া স্বত্তেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না৷ আবিরের অভিমুখে চেয়ে আছে, চোখ টলমল করছে সাথে হৃদয়ে জমছে এক আকাশ সম অভিমান। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম মানুষটার চোখে বিবশ হয়ে চেয়ে আছে। অকস্মাৎ পল্লব ঝাপ্টাতেই অষ্টাদশীর গাল বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। আবির কপাল গুজিয়ে প্রখর নেত্রে খেয়াল করল। প্রণয়ের নারীর চোখে পানি দেখে আবিরের মেজাজ দ্বিগুণ পরিমাণে খারাপ হলো। রাগে কটমট করে বলল,

“চুপ, একদম কাঁদবি না।এক ফোঁটা পানি মাটি স্পর্শ করতে দেরি হলেও, আমার হাত তোর গাল স্পর্শ করতে দেরি হবে না।”

ভয়ে মেঘের সর্বাঙ্গ কম্পিত হলো। ডানহাতে তাড়াতাড়ি করে চোখ মুছার চেষ্টা করল। গাল বেয়ে অনর্গল নোনাজল গড়িয়ে পরছে, চোখ মুছে কুলাতে পারছে না। ভেতর ফেটে কান্না আসছে তার। কোনোভাবেই সেই ক্রন্দন আটকাতে পারছে না৷ বুকের ভেতর জমা অভিমানগুলো ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

আবির চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলল,
” আমি জানি, আমার গতিবিধি তোর হৃদয়ে আঘাত করেছে। কিন্তু আমি নিরুপায়। বিশ্বাস কর, যেই হাত দিয়ে আজ নামটা মুছেছি, সেই হাত দিয়েই একদিন তোর হাতে আমার নাম লিখে দিব। শুধু মেহেদী দিয়ে নয় কাগজে-কলমে লিখিত থাকবে, সাজ্জাদুল খান আবির শুধুই মাহদিবা খান মেঘের। সেই নাম হবে চিরস্থায়ী। পৃথিবীর কেউ কোনোদিন সেই নাম মুছতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ। ”

অতিরিক্ত কান্নায় মেঘের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। শ্বাস ফেলতে পারছে না। ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে আর চোখ মুছছে৷ মেঘের এ অবস্থা দেখে আবির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“কি হলো?”

ধমকের শব্দে মেঘ হকচকিয়ে তাকালো। কান্নায় ভেজা চোখের পাপড়ি, লালবর্ণের কপোল আর লেপ্টে যাওয়া কাজল দেখে অষ্টাদশীকে জড়িয়ে ধরার প্রতিষেধ ইচ্ছে জাগছে আবিরের অন্তরে। হঠাৎ মেঘের চোখ পড়ে মালার দিকে। নতুন জামাইয়ের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছিলো। মালাকে দেখেই মেঘের পুরোনো ঘটনা মনে পরছে। ভেতরে জমা অভিমানরা অভিযোগ হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মেঘ কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল,

” প্রতিনিয়ত থাপ্পড়ের ভয় না দেখিয়ে, আপনি বরং আমায় একেবারে মে*রে ফেলুন। দুনিয়ার সবাই ধৌয়া তুলসি পাতা, একমাত্র আমি ব্যতিত। কারো দোষ আপনার চোখে পরে না শুধু আমারগুলোই চোখে পরে।”

আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“কি বলতে চাচ্ছিস?”

” অন্য কেউ ও তো হাতে নাম লিখেছে কই তাকে তো কিছু বললেন না!”

মেঘ এটুকু বলেই থেমে গেছে। আবির অবাক লোচনে মেঘকে দেখছে। পেছন ফিরে মালাকে একবার দেখে নিল। পুনরায় মেঘের দিকে চেয়ে ঢোক গিলে ভারী কন্ঠে বলল,
” সবমেয়ের উপর নজরদারি করার দায়িত্ব আমি নেই নি, আর যার তার উপর আবির অধিকারও খাটায়
না। তোর উপর আমার যতটা অধিকার আছে তা আর কারো উপর নেই৷ ”

মেঘ মালার দিকে তাকিয়ে থেকেই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“যেই অধিকারবোধের সবটুকু জুড়েই শুধু রাগ আর অসন্তোষ, প্রয়োজন নেই সেই অধিকার দেখানোর। ”

মেঘের মুখে বিষবাক্য শুনে আবির বিমোহিত নয়নে স্তিমিত মুখের পানে চেয়ে আছে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে হঠাৎ ই মেঘের হাত ছেড়ে দিয়েছে। আবির হাত ছাড়তেই মেঘের হুঁশ ফেরে৷ মালার প্রতি তীব্র আক্রোশে কি না কি বলে ফেলছে সে নিজেও জানে না। এদিকে আবির প্রবল চেষ্টায় নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছিল কিন্তু মেঘের কথায় সেই রাগ দ্বিগুণ বেড়েছে। হাতে থাকা মেহেদী টা ছুঁড়ে ফেলে দিল। মেঘ আবিরকে দূর থেকে দেখেই তানবির ভয়ে তটস্থ হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ওদের কাছে আসে। তানভির কাছাকাছি এসে নরম স্বরে মেঘকে ডাকলো,
“বনু..!”

মেঘ সিক্ত চোখে তাকাতেই তানভিরের বুক কেঁপে উঠলো। প্রগাঢ় চোখে তাকালো আবিরের অভিমুখে। তানভিরের দৃষ্টিতে ব্যাকুলতা। বনু কেনো কাঁদছে তা জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে গেছে। আবির বাড়ি থেকেই বলে আসছিল, মেঘ কাঁদলে মালার খবর আছে! তবে কি কোনো অঘটন ঘটতে যাচ্ছে। হয়েছেই বা কি! তানভিরের উপস্থিতিতে মেঘ ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেছে। আবির ভাইয়ের নাম লিখেছে এটা তানভির জানতে পারলে কি হবে সেটা ভেবেই ভয়ে চোখ নামিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। আবির আড়চোখে চেয়ে মনে মনে বলল,
“প্রয়োজন নেই বললেই তো আমি তোকে ছেড়ে দিতে পারবো না। তুই যদি আমার রাগের কারণ ই না বুঝিস তবে আমার অর্ধাঙ্গিনী হবি কেমন করে!”

মেঘ একটু দূরে যেতেই তানভির উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“বনু কাঁদছে কেন ভাইয়া?”

আবির কিছু বলতে পারছে না, কথা আঁটকে আসছে তার। বার বার ঢোক গিলে ভিতরের কষ্ট লুকানোর চেষ্টা করছে। যেই মেঘের জন্য আবির নিজের জীবন দিতে রাজি সেই মেঘ আজ এত বড় কথা বলেছে। আবিরের অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে তানভির আবিরের বাহুতে ধরে ডাকল,
“ভাইয়া কি হয়ছে?”

আবির ঘাড় ঘুরিয়ে তানভিরের মুখের পানে চাইলো। আবিরের চোখের প্রতিটা শিরা-উপশিরা রক্তাভ হয়ে আছে। দৃষ্টিতে তীব্র আগুন নির্গত হচ্ছে। প্রখর তপ্ত স্বরে বলল,
“তোর বোন মেহেদী দিয়ে হাতে আমার নাম লিখছে!”

“কি সর্বনাশ! ”

“একটাবারের জন্য ভাবলোও না, বাসার কারো চোখে এই নাম পড়লে কি অবস্থা হতে পারতো! ও কে কিভাবে বুঝাবো এখন আমার পক্ষে ওর মাত্রাতিরিক্ত পাগলামিকে সাপোর্ট করা সম্ভব না। আমার মনের অবস্থা বলতে পারছি না কারণ এই বয়সে ও কে পারিবারিক ঝামেলায় কোনোভাবেই জড়াতে চাই না আমি।”

তানভির আবিরের কথাগুলো শুনে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“তুমি মাথা ঠান্ডা রাখো,প্লিজ ভাইয়া।”

” তোর বোনের জন্য কি পরিমাণ পীড়া আমি সহ্য করতেছি, এর একাংশ যদি তোর বোন বুঝতো!”

কথাগুলো বলেই আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। মেঘকে জেনে-বুঝে কখনও কষ্ট দিতে চাই না আবির। কিন্তু মাঝেমধ্যে বাধ্য হয়ে নিজের অনিচ্ছা স্বত্তেও মেঘকে শাসন করতে হয়। মীম বা আদিও যদি মেঘের হাতে আবিরের নাম দেখে সেই কথা আদির মা, মেঘের মা বা আবিরের মায়ের কান পর্যন্ত যেতে বেশি সময় লাগবে না। মা, কাকি জানা মানেই বাবাদের কানে পৌছাবে। বাসার মানুষ কিছু টের পেলে কি হবে এটায় ভেবেই, নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রেয়সীর হাতে জ্বলজ্বল করা নিজের নামটা মুছে যতটা কষ্ট মেঘকে দিয়েছে, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি কষ্ট আবির পাচ্ছে। তানভির কিছু বলতে চাচ্ছিলো হঠাৎ ই আলী আহমদ খান কিছুটা দূর থেকে ডাকলেন,
“আবির, কোনো সমস্যা? ”

আলী আহমদ খানের ডাকে আবির আর তানভির দুজনেই আঁতকে উঠেছে। আবির নিজেকে সামলে আস্তে করে গলা ঝেড়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“কিছু হয় নি আব্বু। ”

আবিরের রক্তিম আঁখি যুগল এখনও অপরিবর্তিত, চোখেমুখে লেপ্টে আছে তীব্র আক্রোশ। এ অবস্থায় আব্বুর মুখোমুখি হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব না, এজন্য কয়েক কদম এগিয়ে চোখ-মুখে পানি ছিটিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।

আলী আহমদ খান তানভিরের কাছাকাছি এসে শুধালেন,
“কি হয়েছে আবিরের?”

তানভির সোজাসাপ্টা উত্তর দিল,
“তেমন কিছু না বড় আব্বু৷ শরীরটা বোধহয় একটু খারাপ লাগছে। ”

আলী আহমদ খান আবিরকে এক পলক দেখে একটু উঁচু গলায় বললেন,
“প্রথমবারের মতো মেহমানদারি করছে খারাপ লাগাটায় তো স্বাভাবিক।”

আবির হাত দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে চলে যেতে নিলে আলী আহমদ খান পুনরায় বললেন,
“কোথায় যাচ্ছ?”
“খাওয়ানো শেষ হয় নি ”

আবিরের আব্বু স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
“খাবারের ঐখানে আর যেতে হবে না। তোমরা দুভাই বরং দেখে আসো নতুন জামাইয়ের ঠিকঠাক মতো আপ্যায়ন করা হচ্ছে কি না!”

“আচ্ছা” বলে বাধ্য ছেলের মতো আবির স্থান ত্যাগ করল৷ তানভিরও আবিরকে অনুসরণ করল। চোখে মুখে পানি দিয়েও রাগ কন্ট্রোল করতে ব্যর্থ হলো। যেতে যেতে দুই ভাইয়ের মধ্যে আরও কিছুক্ষণ বাকবিতন্ডা চলল। কি হচ্ছে আর কি হতে যাচ্ছে সেসব ভেবেই তানভির ঘাবড়ে যাচ্ছে, তারপরও ভাইকে বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। আবিরের ক্রোধের কাছে সবই বৃথা। স্টেজের কাছে যেতেই চোখ পরল মালার দিকে সাথে ৩-৪ জন কাজিন। মেঘের বলা কথাটা মনে পড়ে গেল,
“অন্য কেউ ও তো হাতে নাম লিখেছে কই তাকে তো কিছু বললেন না!”

আবির সূক্ষ্ম নেত্রে মালার হাতটা খেয়াল করছে। হঠাৎ ই চোখে পড়ে বড় করে লেখা A অক্ষরটায়। মেঘ যতটা জায়গা নিয়ে আবির নাম লিখেছে প্রায় ততটুকু জায়গা নিয়েই মালা অক্ষরটা লিখেছে। মালা আবিরকে দেখে লাজুক হাসলো। এতে আবিরের মেজাজ আরও বেশি খারাপ হলো। আবিরের দৃষ্টিতে তিক্ততা।
কোনো দিকে না তাকিয়ে চলে গেল। মেহমান খাওয়ানো প্রায় শেষ দিকে। সাকিবের রুম থেকে বেড়িয়ে উঠোনের মাঝখান থেকে আবির উচ্চস্বরে ডাকল,

“সাকিব!”

আবিরের রাগী কন্ঠ শুনে সাকিবের সঙ্গে সঙ্গে তিন মামাও অবাক চোখে তাকালেন৷ ছোট মামা সাকিবকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কি হয়ছে দেখ তো গিয়ে!”
“আচ্ছা”

সাকিব হাতদুটা কোনোমতে ধৌয়ে ছুটে আসল। আবির পাঞ্জাবি হাতা ভাজ করতে করতে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“মালা কে নিয়ে বাড়ির পেছনে আয়৷ ”

সাকিব আশপাশ তাকালো, তানভিরের চিন্তিত মুখবিবর আর আবিরের রাগান্বিত কন্ঠ শুনে বুঝতেই পারছে কিছু একটা হয়েছে। সাকিব মোলায়েম কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“এখনি?”

আবির নিস্তব্ধ কন্ঠে বলল,
“Right now ”

“Okay Vaiya ”

মেঘ রুমে আসার পর থেকে কেঁদেই যাচ্ছে। মালার উস্কানিতেই মেঘ এমন কান্ড করেছে, না হয় কখনো সে এমনটা করতো না। বিষয়টা নিয়ে যত ভাবছে তত বেশি কান্না পাচ্ছে। আবির ভাইয়ের আচরণের থেকেও নিজের উপর রাগ বেশি উঠতেছে। নাম লেখার সময় একবারের জন্যও বাসার কথা মনে হয় নি তার শুধু মালার প্রতিই জেদ কাজ করছিল। আবির ভাই রাগে নামটায় মুছে দিয়েছেন অথচ আব্বু আর বড় আব্বু দেখলে যে কি হতো! হয়তো বাড়িতে ঢুকতেই দিতেন না। আদো বাড়ির কেউ হাতের নাম দেখে ফেলল কি না এটা ভেবে ভয় ও পাচ্ছে। এই ঘটনার পর আবির ভাইয়ের সাথে কথা বলা তো দূর সামনে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা নেই মেঘের। নিজের করা অপকর্মের জন্য লজ্জা, আবিরের প্রতি সুপ্ত অভিমান, মালার প্রতি ক্ষোভ সবকিছু মিলে অষ্টাদশীর কোমল মনটাকে বিষিয়ে দিয়েছে। গতকাল থেকে আজ নাগাদ আবিরের সঙ্গে কত ভালো সময় কাটছিল, একটা ভুলের কারণে সবকিছু শেষ হয়ে গেল। আবিরের সামনে কিভাবে দাঁড়াবে এই ভেবেই আরও বেশি কান্না পাচ্ছে। বুকের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। নিঃসঙ্গতায় ছেয়ে গেছে মেঘের মন। অষ্টাদশীর মেঘাচ্ছন্ন মনের অস্ফুট বাসনা ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও যদি ভারী বর্ষণ হতো। বৃষ্টির মতোই মেঘের মনের সকল শঙ্কা, আক্রোশ, শোক সব ধুয়েমুছে যেত। আচমকা তানভির দরজা থেকে ডাকল,
“বনু, আসবো?”

মেঘ তাড়াতাড়ি করে চোখ মুছতে মুছতে উঠে বসল। স্তিমিত কন্ঠে বলল,
“আসো।”

তানভির নরম কন্ঠে বলল,
“মন খারাপ কেন?”
“এমনি। ”

উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে তানভির পুনরায় বলল,
” থাক আর কাঁদতে হবে না, তোকে এখনি বিয়ে দিচ্ছি না। ”

মেঘ অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। তানভির হাসছে। তানভিরের হাসি দেখে মেঘ মন খারাপ করে বলল,
“ভাইয়া তুমি এখন যাও।”

তানভির গলা খাঁকারি দিয়ে পুনরায় বলল,
” তোকে শাস্তি না দিয়ে তো যাব না। ”

ঠোঁট ভিজিয়ে চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করল,
“কিসের শাস্তি? ”
আতঙ্কে মেঘের বুক কেঁপে উঠলো। তবে কি আবির ভাই সব বলে দিয়েছেন? ভাইয়া তার ই শাস্তি দিতে এসেছেন৷ মেঘ চিবুক নেমে গলায় আটকালো। ভয়ে হাত-পা কাঁপছে। আজ কোনোভাবেই রক্ষা নেই।

তানভির হাসিমুখে উত্তর দিল,
“তুই যে শুধু ভাইয়ার সঙ্গে ছবি পোস্ট করলি, আমার সঙ্গে করলি না। কাজটা কি ঠিক করছিস?”

মেঘ নিশ্চুপ। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছে। মেঘকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আবারও বলল,
“এটার শাস্তিস্বরূপ তুই এখন ফ্রেশ হয়ে নিচে যাবি, আমার সঙ্গে ছবি তুলবি সেই ছবি পোস্ট করবি। ”

মেঘ প্রখর নেত্রে তানভিরকে দেখল। ভাইয়ার হাসিমুখ দেখে মেঘ না চাইতেও হাসলো। মেঘের মুখে হাসি দেখে তানভির স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। একদিকে আবিরের রাগ অন্যদিকে মেঘের কান্না, ভাই হিসেবে তানভিরের দুদিক ই সামলাতে হয়৷ তানভিরের কথা শুনে মেঘের মনের ভয় অনেকাংশে কেটে গেছে। সকাল বেলা ছবি পোস্ট করার সময় তানভিরের কথা মনে ছিল না মেঘের৷ কোনোকিছু না ভেবেই আবিরের সাথে ছবি পোস্ট করেছিল। সারাদিনে আর মোবাইল ধরা হয় নি। মেঘ নিচে নামতেই মীম আর আদি দুজনেই ছবি তুলার জন্য ছুটে আসছে। তানভির আগেই ওদেরকে বলে গেছিলো। তানভিরের সঙ্গে ছবি তোলার পরপর তানভির নিজেই সেখান থেকে একটা ছবি মেঘের ফে*সবু*ক আইডিতে পোস্ট করেছে। তারপর মীম, আদির সঙ্গে, নবদম্পতির সঙ্গে ছবি তুলেছে। মীম হঠাৎ ই মেঘের হাত ধরে প্রশ্ন করল,
“আপু মেহেদী দিয়ে হাতটা এভাবে নষ্ট করেছো কেন? ”

আদিও মেঘের হাতটা খেয়াল করে বলল,
“মেঘাপু তোমার হাতটা খুব পঁচা দেখাচ্ছে। ”

মেঘ মৃদু হাসলো। ভাই বোনদেরকে তো বলতে পারবে না আবির ভাইয়ের নাম লেখার শাস্তিস্বরূপ আবির ভাই হাতটা নষ্ট করেছেন। মাইশা সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে তানভিরকে প্রশ্ন করল,
“আবির কোথায়?”
“ভাইয়া ফ্রেশ হতে গেছিল। আসতেছে।”
“ওহ আচ্ছা ”

আবির ভাই আসতেছে শুনেই মেঘের বক্ষস্থলে কম্পন শুরু হয়ে গেছে। পা কাঁপছে। আবির ভাইয়ের মুখোমুখি হবার জন্য অষ্টাদশীর বিন্দুমাত্র সাহস বেঁচে নেই। চলে যাওয়ার জন্য দু পা বাড়াতেই আবির উপস্থিত হলো৷ পাঞ্জাবি পাল্টে খয়েরী রঙের শার্ট সাথে কালো প্যান্ট ইন করে পরেছে, ভেজা চুলগুলো হাত দিয়েই সেট করেছে, সাথে বডিস্প্রের ঝাঁঝালো গন্ধ অষ্টাদশীর হৃদয় কেড়ে নিচ্ছে। যতই রাগ, অভিমান আর মনোমালিন্য থাকুক না কেন প্রিয়জনের উপস্থিতি ই যেন সব সমস্যার একমাত্র সমাধান। সব ভুলে মেঘ ব্যগ্রভাবে আবিরকে দেখছে, হৃদয়ে ঝড় চলছে। ঝড়ের আবাস বুঝতে পেরে আবির নিজের দৃষ্টি প্রতিরুদ্ধ করে পাশ কেটে স্টেজে চলে গেল। আবির আসায় নতুন করে আবারও ছবি তোলা হচ্ছে, পাঁচ ভাইবোন, মাইশা আর তার হাসব্যান্ডের সঙ্গে, সাকিব, মামারা, বাবা-চাচা মোটামুটি সবার সঙ্গেই ছবি তুলেছে। বেশকিছু ছবিতে মেঘ আবির পাশাপাশি থাকলেও কেউ কারো দিকে তাকায় নি। ছবি তোলা শেষ হতেই মেঘ হালিমা খানের সাথে বাড়ির ভেতরে চলে গেছে। ছোটবেলা থেকেই মেঘের অভ্যাস কারো প্রতি অভিমান হলে, সেটা প্রকাশ করতে না পারলে গম্ভীর হয়ে যায়। কারো সাথে বেশি কথা বলে না, মায়ের পিছনে ঘুরঘুর করে।

আচমকা বিয়ে বাড়ির অভিলাষ বদলে গেছে। চারদিকে কান্নার রব। কনেপক্ষের জন্য সবচেয়ে কষ্টকর মুহুর্ত হলো কনে বিদায়। গায়ে হলুদ, মেহেন্দি, বিয়ে পর্যন্ত সবার মধ্যে যতটা আমেজ থাকে, কনে বিদায়ে সবটায় অভিষঙ্গে মিশে যায়। জন্মের পর থেকে ২০-২৫ বছর এক বাড়িতে বেড়ে ওঠা মেয়েটাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয় এক অচেনা পরিবারে। বাবা-মা, ভাইবোনদের প্রতি এতবছরের ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতির বাঁধন ছিঁড়ে চিরতরে চলে যেতে হয়। বিয়ে নামক সামাজিক বন্ধনের কারণে বাবার-মায়ের আদরে বড় করা রাজকন্যারা বাবার বাড়ির মেহমান হয়ে যায়। শুরু হয় এক নতুন জীবন। যেই জীবনের প্রথম লড়াই টায় হলো অচেনা, অপরিচিত মানুষগুলোকে আপন করে নেয়া। বড় মামার বড় মেয়ে মাইশা তাই সবার খুব আদরের। বড় মামা, মামি, মাইশার বাধভাঙ্গা কান্না দেখে বিয়ে বাড়ির প্রতিটা মেহমান কাঁদছে৷ বোনকে জড়িয়ে ধরে বিরামহীন কাঁদছে মালা আর দিশা। দিশার থেকেও মালার কান্নার গভীরতা অনেক বেশি। দুই বোনের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। মাইশার বড় ভাই না থাকায় আবির,তানভির,সাকিব আরেকটা কাজিনকে মাইশার সাথে শ্বশুর বাড়ি যেতে হবে তবে তারা রাতেই চলে আসবে। মেয়েদের মধ্যে স্মৃতি আর দিশা যাচ্ছে মাইশার সঙ্গে। সবার থেকে বিদায় নিয়ে নবদম্পতি গাড়িতে উঠল। ফুল দিয়ে সজ্জিত এক সাদা রঙের প্রাইভেট কার ধীর গতিতে যাত্রা শুরু করেছে। গাড়ি চলছে ধীর গতিতে, মাইশা কেঁদেই যাচ্ছে, একপাশে দিশা অপর পাশে মাইশার হাসব্যান্ড। বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনদের কান্নার শব্দ, মাইশার বিদায়ের পর আত্মীয়দের ভিড় ঠেলে সেই যে মালা রুমে ঢুকেছে, রুম থেকে আর বের হয় নি। মেঘ বিকেল থেকেই মায়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে। মাইশা আপুর কান্না দেখে নিজের অজান্তেই মেঘের চোখ বেয়ে অনর্গল জল পরছিল, মায়ের আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আঁচল ভিজিয়ে ফেলেছে। আজ এত কাছে থেকে কনে বিদায় দেখে মেঘের নিজের প্রতি প্রচন্ড ভয় কাজ করছে। সে যে এত সামান্য কারণে কেঁদে একাকার অবস্থা করে, বিয়েতে কি অবস্থা হবে! তৎক্ষনাৎ মনে মনে বিড়বিড় করল,
“আবির ভাইকে বিয়ে করলে তো আমায় বিদায় ও দিবে না আর আমার কাঁদতেও হবে না। ”

কান্নায় ভেজা চোখ, গাল বেয়ে পড়া পানির দাগ তারসঙ্গে মুখে অকৃত্রিম মায়াবী হাসি৷একটা বয়স পর থেকে মেয়েটা সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে। তেমনি মাইশা আপুর বিদায় দেখে মেঘ নিজের চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেছে। তবে অকৃত্রিম, অকৃপণ হাসিটা বেশিসময়ের জন্য স্থির হতে পারে নি। আবির ভাইয়ের লেপ্টে দেয়া মেহেদীর দিকে নজর পরতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল৷ আনমনে বিড়বিড় করে বলল,

” আবির ভাইয়ের অনুভূতির রাজ্য জুড়ে কোন মহীয়সীর বসবাস! আমার হাত থেকে নাম মুছার কারণ কি শুধুই পরিবার নাকি অন্য কোনো রমণী ?”

সন্ধ্যার বেশ খানিকটা সময় পর বিয়ে বাড়ির পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। আবিরের মামারা, আবিরের বাবা-চাচ্চু, মাইশার মামা, খালু সবাই একসঙ্গে আড্ডা দিতে বসেছেন। যার যার ব্যবসা, চাকরি, সন্তান নিয়ে কথা বলতে বলতে আবিরের বিয়ে নিয়ে কথা উঠেছে। আলী আহমদ খানকে প্রশ্ন করায় তিনি স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিয়েছেন, ” ছেলে রাজি থাকলে আগামী বছর ই ছেলেকে বিয়ে করাবো। ” মীম, মেঘ, আদি মাইশার কাজিনদের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করেছে। মালা আপুকেও ডেকেছে কিন্তু মালা দরজায় খুলে নি। সবার ডাকাডাকিতে অনেকক্ষণ পর মালা রুম থেকে বেরিয়ে আসছে৷ মীমরা তখন রাতের খাবার খাচ্ছিলো৷ কাঁদতে কাঁদতে মালার চোখ-মুখ ফোলে গেছে, সারাদিন খায় নি, তাই জোর করেই খেতে বসানো হয়ছে৷ মালার প্রতি মেঘের বিতৃষ্ণা আর ক্ষোভ থাকলেও বোনের প্রতি বোনের ভালোবাসা দেখে মেঘের বড্ড মায়া হচ্ছে। মেঘ নিজে থেকেই মালার সঙ্গে বেশকয়েকবার কথা বলেছে। কিন্তু মালার আচরণে মনে হচ্ছে মেঘকে সে সহ্য ই করতে পারছে না তা বুঝতে পেরে মেঘ রুমে চলে গেছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছে৷
আবিররা ফিরেছে প্রায় ১০ টার দিকে, ততক্ষণে বিয়ে বাড়ির হৈ চৈ শেষ। শীতের সময় ১০ টা মানেই গভীর রাত। মামিরা ব্যতিত সকলেই শুয়ে পরেছে। আবিররা ফ্রেশ হয়ে উঠোনের শেষ প্রান্তে আগুন জ্বালিয়েছে। আবার কবে কাজিনরা একত্রিত হতে পারলে তা জানা নেই৷ দিনটাকে স্বরণীয় করে রাখতেই সমবয়সী সকলে গভীর রাতে আগুন পোহাচ্ছে আর সবার জীবনের গল্প বলছে ৷ ঘন্টাখানেক গল্প করার পর সাকিব তানভিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কিরে তানভির,তোর অন্তরের প্রদেশে যে এক ললনা বসতি স্থাপন করছে তা তো বললি না”

তানভির কন্ঠ খাদে নামিয়ে উত্তর দিল,
“তেমন কিছু না৷ ”

“তুই বলবি কি না বল”

“কি বলব?”

“তুই মেঘবতীর বান্ধবীকে কবে থেকে পছন্দ করিস?”

“কিছুদিন হবে। ”

সাকিব মাথা চুলকে শুধালো,
“আমি তো শুনেছিলাম তুই অনেক বছর যাবৎ বন্যাকে ফলো করিস। ”

তানভির ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল,
” এত বছর কি আমার জন্য ফলো করেছি নাকি। ভাইয়া ই তো বলছে বনুর কাছের বান্ধবীদের উপর নজরদারি করার জন্য । ”

আবির প্রখর নেত্রে তানভিরকে দেখে বলল,
“আমি না হয় নজরদারি করতে বলছিলাম। প্রেমে পড়তে তো বলি নাই৷ ”

সাকিব ভাব নিয়ে বলল,
“কথা সত্য।”

তানভির মন খারাপ করে উত্তর দিল,
“প্রেমে পড়েছি কি পড়ি নি সেটা তো আর সেই মেয়ে জানে না। আমি কখনো বলতেও যাব না তাহলেই তো হবে”

সাকিব আর আবির দুজনেই স্ব শব্দে হেসে উঠল। সাকিব হাসিমুখে বলল,
“এত সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছিস কেন? আমরা তো মজা করছি। তুই শুধু বল প্রেমে কবে পড়েছিস তাহলেই হবে।”

আবিরের হাসি দেখে তানভির এক বুক সাহস নিয়ে বলা শুরু করল,
“বনুদের বিদায় অনুষ্ঠানে বনুকে নিয়ে কলেজে গেছিলাম। ভাইয়া বারণ করেছিল বিধায় বনুকে শাড়ি পড়তে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু কলেজ গেইটে ওনাকে শাড়ি পড়া দেখে আমার মনোযোগ থমকে গেছিল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত মায়া কাজ করছিল। বনুর ফ্রেন্ড হিসেবে মেয়েটাকে ছোট থেকেই দেখে আসছি অথচ কখনও এমনটা মনে হয় নি। সেদিন তাকে দেখে মনে হয়েছিল, আজীবন ক্লান্তিহীন তাকিয়ে থাকলেও তাকে দেখার তৃপ্তি মিটবে না।”

আবির, সাকিব সহ বাকিরাও মুগ্ধ আঁখিতে তানভিরের দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখে তানভির ই লজ্জায় পড়ে গেছে।

সাকিব মৃদু হেসে সোজাসাপ্টা জবাব দিল,
“ওনাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ দেয়া উচিত যে তোকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে টেনে এনেছে। বিষাদ ছুঁতে চাওয়া তানভির পুনরায় কারো মোহমায়ায় জড়িয়েছে।”

আবির হিমশীতল কন্ঠে বলল,
” তুই ঠিক থাকলে বাকিটা আমি সামলে নিব। কিন্তু এবার যদি তোর মধ্যে উল্টাপাল্টা কিছু দেখি তাহলে তোর একদিন কি আমার যে কয়দিন লাগে। ”

তানভির ঘাড় বেঁকিয়ে সম্মতি দিল। মীমের ডাকে সকাল সকাল ঘুম ভাঙে মেঘের। মেঘ ঘুম ঘুম চোখে তাকাতেই মীম পুনরায় বলল,

“ভাইয়া তোমায় রেডি হতে বলছে।”

মেঘ ঘুমের ঘোরেই বলল,
“কেন?”

“তোমায় ঢাকা নিয়ে যাবে।”

“এখন?”

“হ্যাঁ৷ ভাইয়া রেডি হয়ে গেছে। তুমি তাড়াতাড়ি উঠো।”

মীমের কথা শুনে মেঘের ঘুম উধাও হয়ে গেছে।

(চলবে)

গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ৪৩
লেখিকা- সালমা চৌধুরী

এক লাফে শুয়া থেকে উঠে বসে মেঘ আশেপাশে তাকাচ্ছে, সদ্য ফোটা ভোরের আলোয় মেঘের কুহকী মুখমন্ডলে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। চোখ কচলাতে গিয়ে দৃষ্টি পরে হাতের দিকে, ক্ষণিকের ব্যবধানে ছোট্ট হৃদয়ে হানা দেয় রাজ্যের অভিমান।গতকাল সকাল টা কত মিষ্টি ছিল, আবিরের কন্ঠে ঘুম ভেঙেছিল। অথচ আজ! অষ্টাদশীর হৃদয়ে পুষা ভালোবাসার অনুভূতিগুলো অভিষঙ্গে রূপ নিয়েছে। মেঘ অভিমানী কন্ঠে বলে,

” ওনাকে বলে দিস, বাসায় ফিরলে সবার সঙ্গেই ফিরব। আমি এখন ঘুমাবো, আমায় আর ডাকবি না। ”

কথাটা বলেই মেঘ গায়ে লেপ জরিয়ে শুয়ে পরেছে৷ মীম বোনের কথা মতো নিচে গিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে। একে একে আম্মু, বড় আম্মু, কাকিয়া সবাই ডেকেছে কিন্তু মেঘের জেদের কাছে সকলেই হার মানতে বাধ্য হয়েছে। তানভির শীতল কণ্ঠে আবিরকে বলল,
“বনু যেহেতু এখন যেতে চাচ্ছে না, জোর করে নেয়ার চেয়ে পরে আমাদের সঙ্গে নিলে ভালো হতো না?”

আবির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” ও কে রেখে যাওয়ার রিস্ক আমি নিব না। ”

“আমি আছি তো। মালার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ই দিব না। চোখে চোখে রাখবো বনুকে। ”

“কিভাবে ভরসা করবো বল! নিজেকেই তো ভরসা করতে পারছি না। তোর বোন যেন কষ্ট না পায় তার জন্য যতটা সম্ভব সময় দিয়েছি, আশেপাশে থেকেছি, এমনকি ১২ বছর পর ওর জন্যই মেহেদী ছুঁয়েছি। এতকিছু করেও তোর বোনের মুখের হাসি ধরে রাখতে পারলাম না!”

“বনু এমনিতেই তোমার উপর রেগে আছে, ওর মনের বিরুদ্ধে জোর করে নিয়ে গেলে যদি আরও বেশি রেগে যায়!”

আবির নিশ্চুপ। মেঘকে নিয়ে দুশ্চিন্তা আবিরের মনেও ঘুরপাক খাচ্ছে। গতকাল মেঘের বলা কথায় আবির অনেক কষ্ট পেয়েছে, প্রচন্ড ঠান্তায় গভীর রাতে নদীর পাড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা একাকী বসে ছিল। হাত- পা জমে বরফ হওয়ার জোয়ার হয়েছে অথচ হৃদয়ের র*ক্তক্ষরণ থামানোর সামর্থ্য ছিল না। শেষরাতে বাড়ি ফিরে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়েই রেডি হয়েছে। বাবা, কাকা আর মামাদের গতকাল রাতেই জানিয়ে দিয়েছিল৷ আবির ঢাকা ফিরবে বলে সকাল সকাল নিশ্চিন্তে আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান আর বড় মামা ঘুরতে বেড়িয়েছেন। মেয়েকে উঠাতে ব্যর্থ হওয়ায় হালিমা খান তানভির আবিরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“এই মেয়ে মনে হয় না এখন আর উঠবে। আজকের ক্লাস না হয় মিস ই দিয়ে দিক।”

আবির রাশভারি কন্ঠে বলল,
” দু ঘন্টার জন্য ক্লাস মিস দেয়ার কোনো মানে হয় না। তোমরা আজ থাকলে আমি কিছুই বলতাম না।একটু পর তোমরা যদি যাও ই তাহলে এখন আমার সঙ্গে ক্লাসে যেতে সমস্যা টা কোথায়? ”

“তোর সাথে যেতে সমস্যা হবে কেন, ঠান্ডার মধ্যে উঠতে হয়তো আলসি লাগছে।”

“আমি দেখছি।” বলে আবির ঘরে ঢুকলো, মেঘের রুমের সামনে এসে চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল। আশেপাশে কেউ নেই। বিছানায় লেপ মুড়ি দিয়ে মেঘ গভীর ঘুমে মগ্ন। ধীর গতিতে রুমে ঢুকে বিছানার পাশে বসল। ঘুমন্ত মেঘের মুখের পানে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। সামনের দিকের ছোট চুলগুলো মেঘের গালে, কপালে এলোমেলো হয়ে আছে, তা দেখে আবিরের ভ্রুযুগল কুঁচকে আসে। চুলগুলোকে বড্ড হিংসে হচ্ছে তার৷ অতি সামান্য কারণেই আবিরের নাক ক্রোধে ফুঁসে ওঠেছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দুই হাতের কনুই এ ভর দিয়ে এগিয়ে গেল মেঘের কাছাকাছি। ফুঁ দিয়ে অগোছালো চুলগুলো সরানোর চেষ্টা করল। দু-একটা চুলের খোঁচায় মেঘ ঘুমের মধ্যেই বাম হাত দিয়ে বাকি চুল গুলো সরিয়ে কপালের উপর হাত রেখে পুনরায় ঘুমের রাজ্যে ডুব দিল। আবির মেঘের হাতের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে মেঘের হাত নিজের কাছে টেনে আলতোভাবে ওষ্ঠ ছোঁয়াল মেহেদী দিয়ে লেপ্টানো রঙের উপর। যার কারণে আবিরের প্রেয়সীকে কাঁদতে হয়েছিল। আবির মেঘের হাতে হাত রেখেই মোলায়েম কন্ঠে ডাকল,
“ম্যাম!”

মেঘের সাড়া নেই দেখে দ্বিতীয় বারের মতো হাতে অনুগ্র চুমু খেয়ে হাত ছেড়ে পুনরায় কিছুটা উচ্চস্বরে ডাকল,
“ম্যাম! ”

ঘুমন্ত কন্ঠের আওয়াজ ভেসে আসলো,
“হুমমমমমমম।”
মেঘের নেশাক্ত আওয়াজে আবিরের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ নিমিষেই থেমে গেছে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির ঝলক দেখা গেল। প্রেয়সীর ডাকের প্রতিত্তোরে সর্বদায় “হুমমমমমমম” বলা আবির আজ প্রেয়সীর মুখে এই শব্দ শুনে নে*শাগ্রস্ত হয়ে পরেছে। আনমনে বিড়বিড় করে বলল,
“উফফ! আপনার ঘুম ভাঙানোর সম্পূর্ণ দায়িত্বটা যে কবে নিতে পারবো!”

আবির গলা খাঁকারি দিয়ে একটু গম্ভীর কণ্ঠে ডাকল,
“এর বেশি লেইট হলে অফিস, ক্লাস কোনোটায় ধরতে পারবো না কিন্তু। ”

আবিরের কথা মেঘের কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই সহসা চোখ মেলল। চোখ পরল আবিরের গভীর নেত্রে। শ্যামবর্ণের পুরুষের কোমলপ্রাণ দৃষ্টি অকারণেই সেই পুরুষের প্রেমে পড়তে বাধ্য করে, হৃদপিণ্ডের চার প্রকোষ্ঠ জুড়ে অনুভূতিদের বিচরণ শুরু হয়েছে। আবিরের ছুরির ন্যায় চাউনী দেখে মেঘ পল্লব ঝাপ্টালো। দৃষ্টি সরিয়ে তাকালো অন্য দিকে। মনের পাড়ায় জমে থাকা অভিমানেরা ক্রোধে রূপান্তরিত হতে বেশি সময় লাগল না। রাগান্বিত কন্ঠে “আমি এখন যাব না” বলতেই আবির বাজখাঁই কন্ঠে বলল,

“তুই যাবি কি না সেই সিদ্ধান্ত শুনতে আসি নি। ২০ মিনিট সময় দিলাম তোকে। ২০ মিনিটের মধ্যে রেডি হবি। ”

মেঘের প্রবল জেদ আবিরের হুঙ্কারের সামনে নিস্তেজ হয়ে পরেছে। মেঘ মিনমিনে স্বরে বলার চেষ্টা করল,
“আমি বললাম….”

“১৯ মিনিট বাকি। ”

মেঘ সরু নেত্রে আবিরের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“ফালতু ব্যাটা”

আবির মেঘের চোখে চোখ রেখে বলল,
“১৮”

মেঘ বিড়বিড় করতে করতে তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে ঢুকতে গিয়ে, ছুটে এসে ব্যাগ থেকে ড্রেস বের করে পুনরায় ওয়াশরুমে ঢুকলো। আবির মুচকি হেসে পকেট থেকে ফোন বের করল। মেঘ ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে দেখে আবির বিছানায় হেলান দিয়ে ফোন চাপতেছে, মেঘ বের হতেই আড়চোখে একবার দেখে নিল। ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত-মুখ ধৌয়ায় মেঘের হাত-পা থেকে শুরু করে সারা শরীর অনবরত কাঁপছে। কাঁপা-কাঁপি দেখে আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“খুব বেশি ঠান্ডা লাগছে? বাইকে যেতে পারবি নাকি গাড়ি নিয়ে যেতে হবে?”

আবির ভাইয়ের যত্ন দেখে প্রতিটা ক্ষণে নতুন করে আবিরের প্রেমে পড়লেও আজ সবকিছু বিরক্ত লাগছে। বারবার শুধু মালা আপু আর নাম মুছার কথা মনে পড়ছে। আর মনে মনে বলছে,
” আবির ভাই শুধু আমাকেই শাস্তি দিলেন, অথচ মালা আপুকে কিচ্ছু বললেন না! এখন আমার যত্ন নিতে হবে না। ”

আবির আবারও শুধালো,
“কি হলো? গাড়ি বের করবো?”

“প্রয়োজন নেই৷”

মেঘের অভিমানী স্বর বুঝতে পেরে আবির আর কথা বাড়ায় নি। রেডি হতে বলে নিচে চলে আসছে। আবির মামী, নানু, কাজিনদের সঙ্গে কথা বলছে। মেঘ নিচে আসতেই মামীরা তাড়াতাড়ি করে পিঠা খেতে দিয়েছেন। এত সকালে রান্না হয় নি। না খেয়ে বের হলে বড় মামা রাগারাগি করবেন। আবির, সাকিব, তানভির ওরা ভোরবেলায় পিঠা খেয়েছিল। মেঘ অল্প খেয়ে সবার থেকে বিদায় নিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মালার রুমে ঢুকল। মালা শুয়ে শুয়ে ফোন চাপতেছিল, মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“আপু আসছি৷ ভালো থাকবেন। ”

মালা মেঘের দিকে কেমন করে চেয়ে আছে। মিনিটখানেক নিরব থেকে কঠিন স্বরে বলল,

“তুমিও ভালো থেকো৷ খুব বেশি ভালো থেকো।”

মেঘ হতভম্ব হয়ে মালার মুখের পানে তাকিয়ে আছে৷ মালা ভিতরের সবটুকু আক্রোশ নিয়ে কথাটা বলেছে। মাইশা আপু যতটা ঠান্ডা, মালা ঠিক ততটায় উগ্র। সেটা তার আচরণেই প্রকাশ পায়। ভারী জ্যাকেট, হেলমেট, হ্যান্ডগ্লাভস, বুট পড়ে, হাতের ব্যাগ টা মাঝখানে রেখে বসেছে। সকলকে বিদায় দিয়ে রওনা হলো ঢাকার উদ্দেশ্যে। সাকিব আর তানভির গত রাত থেকে আবিরকে বুঝাচ্ছে। মেঘের আচরণে যতই খারাপ লাগুক, আবির সহজে সেটা মেঘের সামনে প্রকাশ করবে না। কিন্তু সেই খারাপ লাগার মাত্রা বেড়ে গেলে সবটা ঝড় আবিরের উপর দিয়ে যাবে। রাগের বশে নিজের ক্ষতি করে ফেলবে এই ভয়ে আছে দুজন। বাইক চলছে নিজস্ব গতিতে, কিছুদূর গিয়ে আবির বাইক থামায়, নিজের ব্যাগ থেকে চাদর বের করে মেঘের গায়ে জড়িয়ে দিয়েছে, কিছুদূর এগিয়ে চায়ের স্টল থেকে চা খেয়েছে, ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে কম করে হলেও দশবার বাইক থামিয়েছে। সচরাচর বাইক চালানোর সময় আবির এত ব্রেক নেয় না, গন্তব্যে পৌঁছে তবেই থামে। কিন্তু আজ তার ব্যতিক্রম হচ্ছে। প্রেয়সীর অভিমান ভাঙানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে বারবার। এতটা পথ একসঙ্গে এসেছে, কতবার বাইক থামিয়ে এটা সেটা কিনেছে, চা খেয়েছে অথচ সম্পূর্ণ পথেই মেঘ নিশ্চুপ ছিল। ভুলকরেও একটাবারের জন্য চোখ তুলে তাকায় নি। ভার্সিটির গেইটের কাছেই বন্যা, লিজা,সাদিয়া,মিষ্টি, মিনহাজ, তামিম সকলে আড্ডা দিচ্ছিল। মেঘ তাদের দেখে আবিরকে বলল,
“এখানেই নামবো। ”

আবির যথারীতি ব্রেক কষলো। মেঘ নেমে হেলমেট খুলতেই তামিম আর লিজা একসঙ্গে বলল,
“ঐ তো মেঘ এসেছে। ”

বাকিরাও মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ ঘুরে ওদের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলো। কিন্তু এই হাসিতে নেই কোনো মুগ্ধতা। মেঘ কয়েক পা এগুতেই আবির পিছু ডাকল,
“ক্লাস শেষ হলে ওয়েট করিস।আমি নিতে আসবো। ”

বাইকে হেলমেট পড়া আবিরকে দেখে মিনহাজ ভ্রু কুঁচকে তামিমের দিকে তাকালো। দু’জন তাকাতাকি করল কিছুক্ষণ। তামিম বন্যাকে জিজ্ঞেস করল,
“বাইকার টা কে রে বন্যা?”

বন্যা মুচকি হেসে বলল,
“যার আশিকিতে মেঘ অত্যাসক্ত। ”

মিনহাজ, তামিম সহ সাদিয়া, মিষ্টি সকলেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল,
“What”

বন্যা ভ্রুক্ষেপহীন উত্তর দিল,
“এত অবাক হওয়ার কি আছে!”

মিনহাজ গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,
“কি হয় মেঘের?”

“চাচাতো ভাই। ”
“আপন?”
“হ্যাঁ”

ততক্ষণে মেঘ কাছাকাছি চলে আসছে। মেঘের গোমড়া মুখ দেখে সাদিয়া আহ্লাদী কন্ঠে শুধালো,

“কি হয়ছে আমার জানুটার? বয়ফ্রেন্ড চলে যাচ্ছে বলে মন খারাপ?”

লিজা, সাদিয়া, মিষ্টি তিনজনেই উচ্চস্বরে হাসছে। বন্যা মৃদু হাসছে। মেঘ বন্যার দিকে রাগী চেহারায় তাকিয়ে আছে। সাদিয়ারা হাসলেও হাসি নেই তামিম আর মিনহাজের মুখে। দুই বন্ধু বার বার চাওয়াচাওয়ি করতেছে। শুভেচ্ছা ক্লাসের দিন গেইটের সামনে প্রথমবার মেঘকে দেখেই মিনহাজের ভালো লেগেছিল। অফিসে কাজ থাকায় তাড়াহুড়ো করে অফিসে চলে গিয়েছিল বিধায় মেঘের সঙ্গে কথা বলতে পারে নি। কিছুক্ষণ পর মেঘ আর বন্যা যখন ক্লাস খোঁজতেছিল তখন মিনহাজ মেঘকে দেখে ইচ্ছেকৃত ধাক্কা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মেঘ সরে যাওয়ায় ধাক্কাটা লাগে নি। তারপর সিনিয়রের ভাব নেয়া, ফাজলামো করা, বন্ধুত্ব সবটায় ছিল মিনহাজের প্ল্যান। একবার বন্ধুত্ব হয়ে গেলে সময় সুযোগ বুঝে প্রপোজ করবে এই আশাতেই দিন গুনছিল। কিন্তু মেঘ অন্য পুরুষে আসক্ত শুনে মিনহাজের মাথায় আকাশ ভেঙে পরেছে। শীতের সকালেও মিনহাজের শরীর বেয়ে ঘাম ছুটছে। অস্বস্তি লাগছে। শুকনো গলায় ঢোক গিলল।

মেঘ ঘড়িতে টাইম দেখে সবার উদ্দেশ্যে রাগী স্বরে বলল,
“তোরা কি ক্লাসে যাবি নাকি আমি একায় চলে যাব?”

“যাব” বলে ওরা ক্লাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। মিনহাজ ধীর পায়ে হাঁটছে আর তামিমকে উদ্দেশ্য করে বলছে,

“আমি যে মেঘকে ভালোবেসে ফেলেছি তার কি হবে?”

“টেনশন করিস না। চল ক্লাস শেষ করে আসি। তারপর মেঘকে নিয়ে বসবো। মেঘের সাথে ঐ ছেলের প্রেমের সম্পর্ক আছে নাকি শুধু ভালোলাগা সবটায় জেনে নিব।”

বন্যা সামনে থেকে ব্যস্ত গলায় বলল,
“কিরে, তোরা ক্লাস করবি না?”

তামিম উচ্চস্বরে বলল,
“এখনি আসছি।”

মিনহাজ হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে তামিমের দিকে তাকালো, তামিম নিরুদ্বেগ দৃষ্টিতে চেয়ে প্রশ্ন করল,
“কি হয়েছে?”

“তোর যদি বন্যাকে ভালো লেগে থাকে। তাহলে প্রপোজ করে ফেল। মেঘের মতো বন্যার জীবনে কেউ থাকলে পরে কান্না করিস না। ”

ক্লাস শেষ করে বের হতে না হতেই মিনহাজ বলল,
“চল, তোদের আজকে ফুচকা খাওয়াবো।”

মিষ্টি প্রশ্ন করল,
হঠাৎ? কাহিনী কি? প্রেমে টেমে পরছিস নাকি?”

“তোরা আমার বান্ধবী, তোদের খাওয়াতে কারণ লাগে নাকি?”

লিজা হাসতে হাসতে বলল,
“বান্ধবী বলেই আজ পর্যন্ত একটা চকলেটও কপালে জুটে নি। ”

“খাবি কি না বল!”

“অবশ্যই খাবো, চল। ”

মিনহাজ মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চল। ”

মেঘ আস্তে করে বলল,
” তোরা যাহ, আমার ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে না৷ ”

“ফুচকা না খেলে অন্য কিছু খাবি তবুও চল, প্লিজ। ”
“আমি যাব না বললাম তো। ”

লিজা, সাদিয়া, মিষ্টি আর তামিমের জোরাজোরিতে মেঘ আর বন্যা দু’জনেই রাজি হয়েছে। মিনহাজদের পরিচিত এক ফুচকার দোকানে সবার পছন্দমতো খাবার অর্ডার দিয়ে, চা খেতে খেতে গল্প করছে।

তামিম মেঘকে প্রশ্ন করল,
“ঐ ছেলেটা কি সত্যি ই তোর বয়ফ্রেন্ড? ”

মেঘ গম্ভীর গলায় জবাব দিল,
“না, দূর্ভাগ্যবশত ওনি আমার চাচাতো ভাই।”

বন্যা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে মেঘকে শুধালো,
“কালকে পর্যন্ত তো ওনার জন্য দেওয়ানা ছিলি, ডে তে ছবি আপলোড করলি। আজ হঠাৎ কি হলো?”

“কিছু না৷”

মিনহাজ ভারী গলায় প্রশ্ন করল,
“তোদের কি রিলেশন চলে?”

“নাহ। ”
“তাহলে?”

মেঘ রাগে গজগজ করে বলল,
“একতরফা ভালোবাসা বুঝিস? আমি ওনাকে পছন্দ করি কিন্তু ওনি করেন না। এটুকুই। এর বেশি প্রশ্ন করবি না। ”

তামিম আর মিনহাজ চাওয়াচাওয়ি করে বলল,
“আচ্ছা। তোরা বস আমরা খাবার নিয়ে আসি।”

বন্যা এক দৃষ্টিতে মেঘকে দেখেই যাচ্ছে। একবারের জন্য পলক ফেলছে না। মেঘ চিবুক নামিয়ে বসে আছে। ছটফটে স্বভাবের মেয়েটা আজ এত শান্ত হয়ে বসে আছে। বন্যার একদম ভালো লাগছে না। মেঘকে আপাদমস্তক দেখল, হাতের মেহেদী ক্লাসেও দেখেছিল কিন্তু কিছু বলে নি। মেঘ কথা বলছে না দেখে মেঘের হাতের মেহেদী ডিজাইন দেখতে দেখতে বলল,
“এত সুন্দর করে মেহেদী কে দিয়ে দিল?”

“আবির ভাই। ”

বন্যা চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,
” কি! এটা কিভাবে সম্ভব! সত্যি?”

“হ্যাঁ সত্যি। ”

“আবির ভাইয়া মেহেদী দিয়ে দিয়েছেন তারপরও তোর মন খারাপ? ”

মেঘ পুনরায় চিবুক নামালো। বন্যা হাত উল্টাতেই হাতের তালুর লেপ্টানো রঙ চোখে পরল, স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“মাঝখানটা এভাবে নষ্ট করেছিস কেন?”
“আমি করি নি। ”
“কে করছে?”
“আবির ভাই। ”
“ওমা কেন?”
“ওনার নাম লিখেছিলাম তাই। ”

মেঘের কথা শুনে বন্যা স্তব্ধ হয়ে আছে। কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। নির্বিকার হয়ে বসে আছে। মেঘের অবস্থা দেখে বুঝায় যাচ্ছে, কিছু বললেই কেঁদে ভাসাবে। বন্যা আশেপাশে মাথা ঘুরালো। লিজারা একটু দূরে বসে তিনজন গল্প করছে। তামিম আর মিনহাজও দূরে। বন্যা অত্যন্ত যত্ন সহকারে মেঘের হাতে হাত বুলাতে বুলাতে নমনীয় কন্ঠে শুধালো,
” নাম লিখেছিলি কেন?”

মেঘ অভিমানী কন্ঠে বলা শুরু করল,
“আবির ভাইয়ের মামাতো বোন মালা, ওনি অনেকদিন যাবৎ আবির ভাইকে পছন্দ করেন। আবির ভাই দেশে ফেরার পরপর একদিন আমাদের বাসায়ও আসছিলেন। তখন থেকেই ওনার ভাব ভালো লাগে নি। ওনাদের বাড়িতে যাওয়ার পর থেকেই আবির ভাইয়ের পিছে ঘুরঘুর করছিল, আমার সাথেও খারাপ ব্যবহার করেছে। শেষ পর্যন্ত ওনার হাতে “A” লিখে আমায় দেখাচ্ছিল। সেই রাগে আমিও আমার হাতে “Abir” লিখেছিলাম। সেটা আবির ভাই দেখে এমনটা করেছেন। অথচ মালা আপুকে কিছুই বললেন না। ”

বিরহের অনলে পুড়ছে মেয়েটা। বেস্ট ফ্রেন্ডকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা পর্যন্ত খোঁজে পাচ্ছে না। স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে বিড়বিড় করে বলল,
” ওনি কি কোনোভাবে ঐ মেয়েকে পছন্দ করেন?”
“জানি না। ”

তামিমরা খাবার নিয়ে চলে আসছে। মেঘের চোখ টলমল করছে। তামিম খাবার দিতে দিতে বলল,
“কিরে কি হয়ছে তোর? কাঁদছিস কেন?”

সাদিয়া, মিষ্টি সকলেই এবার মেঘকে লক্ষ্য করছে। মেঘের মতো প্রাণোচ্ছল মেয়ের চোখে পানি, এটা কেউ ই মানতে পারছে না। একের পর এক প্রশ্ন করছে, বন্যা সবার উদ্দেশ্যে গুরুতর কন্ঠে বলল,
“কিছু হয় নি। এমনিতেই। খা তোরা। ”

মিনহাজ,তামিম মেঘ আর বন্যার মুখোমুখি বসেছে। মিনহাজ খাচ্ছে, খানিকক্ষণ পর পর মেঘকে দেখছে। মেঘ চিবুক নামিয়ে বসে চটপটি খাচ্ছে। খাওয়া শেষে বাটি রাখতে গিয়ে চোখ পরে রাস্তার পাশে বাইকের দিকে। রক্তাভ আঁখিতে চোখ পরায় অকস্মাৎ কেঁপে উঠল। ব্যাগ থেকে ফোন বের করতে করতে এগিয়ে গেল বাইকের দিকে। ফোনের স্ক্রিনে তিনটা মিসডকল ভেসে আছে। তিনটা কল ই আবির করেছিল। ক্লাসে ঢুকলে মেঘ সবসময় ফোন সাইলেন্ট করে রাখে, ক্লাস শেষে ভাইব্রেশন মুড অন করে দেয়। আজ ক্লাস শেষে খেতে চলে আসায় ফোন হাতেই নেয় নি। আবিরের কাছাকাছি এসে কাঁপা গলায় বলল,
“ফোন সাইলেন্ট ছিল।”

আবির অন্য দিকে মুখ করে বিরক্ত হয়ে বলল,
“১০ মিনিট ওয়েট করার ধৈর্য হয় নি! আড্ডা দেয়ায় এত ইচ্ছে ছিল, আমায় জানালেই হতো। অফিসের কাজ ফেলে কাউকে বিরক্ত করতে আসতাম না। ”

মেঘ ড্যাবড্যাব করে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না, তবুও ঘাড় কাথ করে মেঘ আবিরের মুখ দেখার চেষ্টা করছে। সকাল বেলা হেলমেট না খুলায় কেউ আবিরকে দেখতে পারে নি। এখন হেলমেট খুলায় মিনহাজ, তামিম সহ মেয়েগুলোও দাঁড়িয়ে আবিরকে দেখার চেষ্টা করছে । আবির একটা রিক্সা ডেকে ভাড়া দিয়ে বন্যাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“এই মেয়ে, বাসায় যাও। ”

বন্যা না করতে যাবে, তখনই চোখাচোখি হয় আবিরের সঙ্গে। কপালে ভাঁজ সাথে আবিরের রাগান্বিত চাহনি দেখে না করার সাহস হয় নি। ভদ্র মেয়ের মতো রিক্সায় উঠে পরে। বন্যা যাওয়ার পর আবির মিনহাজ আর তামিমকে এক পলক দেখে বাইক স্টার্ট দেয়। বাড়ির মানুষজন অনেকক্ষণ আগেই চলে এসেছে। আবির তানভিরের সঙ্গে কথা বলে এক মুহুর্তও দাঁড়ালো না। বাসা থেকে বেড়িয়ে রওনা দিল অফিসের উদ্দেশ্যে। পাঁচমিনিটের মধ্যে তানভিরও বেরিয়ে পরেছে। সপ্তাহ খানেক পর নির্বাচন, যার জন্য তানভির দীর্ঘদিন যাবৎ অপেক্ষা করছে। মেঘ ফ্রেশ হয়ে সেই যে ঘুমিয়েছে মীমের ডাকে উঠেছে প্রায় সন্ধ্যে বেলায়। ফ্রেশ হয়ে দুবোন ছাদের গাছগুলোকে দেখতে গেছে। কিছু গাছের আগাছা পরিষ্কার করে গাছগুলোতে পানি দিয়ে আজানের সঙ্গে সঙ্গে রুমে চলে এসেছে।

পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)

★★★★

বছর শেষ হতে চলল, একবছরের সকল হিসেব মেলাতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে আবির। তারমধ্যে তানভিরের নির্বাচনের প্রেশার। সে রিস্ক নিয়ে তানভিরকে রাজনীতিতে পাঠিয়েছে, তানভির ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায় পরবে আবিরের উপর তার থেকেও বড় বিষয় হলো তানভিরকে ঠিক রাখতে কষ্ট হয়ে যাবে। এদিকে মেঘের আচরণ ভালো লাগছে না। মেয়েটা ইদানীং অনেক বেশি ঠান্ডা হয়ে গেছে। হঠাৎ করেই যেন ম্যাচিউরিট ভর করেছে মেঘের উপরে। কথায় কোনো চঞ্চলতা নেই, খাবার সময় ছাড়া নিচে সচরাচর নামতেই দেখা যায় না। ভার্সিটি,ঘুম আর গাছের যত্ন নিয়েই দিন কাটিয়ে দেয়। সন্ধ্যার পর থেকে পড়াশোনা করে বাকিটা সময় অনলাইনে হ্যান্ডপ্রিন্টিং এর কাজ শেখে। খুব বেশি মন খারাপ থাকলে মাকে জরিয়ে ধরে শুয়ে থাকে। আবিরের সঙ্গে সকালে খাবার টেবিল ব্যতিত দেখায় হয় না। আবিরও বাসায় ঠিকমতো সময় দিতে পারে না। সারাদিন দুই অফিস সামলে সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে জিমে যায়। জিম থেকে ফিরতে প্রায় ১২ টা বেজে যায়। রেগুলার চলছে এই রুটিন।

ভার্সিটির বন্ধুরা কেউ মেঘের ফ্রেন্ডলিস্টে এড ছিল না। স্কুল, কলেজের ফ্রেন্ডরায় শুধু এড ছিল। মিনহাজ আর তামিম বলতে বলতে এড করেছে ওদেরকে। সাথে সাদিয়া, মিষ্টি ওদেরকেও এড করেছে। এক বিকেলে মেঘ আর মীম দুবোন ছাদের গাছে পানি দিতে দিতে গল্প করছিল হঠাৎ ই মীম বলল,
“আপু, একটা কথা তোমায় বলা হয় নি!”

মেঘ সন্দিহান হয়ে প্রশ্ন করল,
“কি কথা?”

“মালা আপুর হাতে না মেহেদী দিয়ে নাম লেখা দেখেছিলাম।”

অকস্মাৎ মেঘের মন খারাপ হয়ে গেছে। কিছুদিন যাবৎ সবকিছু এড়িয়ে চলছে যেন স্বাভাবিক হতে পারে। হাতের মেহেদীও ওঠতে শুরু করেছিল। মীম পুনরায় মনে করিয়ে দিল। মীম পুনরায় বলল,
“কি নাম ছিল জানো আপু?”

মেঘ “A” অক্ষর দেখেছিল। কোনো নাম ছিল না। কিন্তু মীম নাম কোথায় পেল। তবে কি পরে আবির ভাইয়ের নাম লিখেছিল! মেঘ আনমনে এসব ভেবে প্রশ্ন করল,

“কি নাম?”

“Ashik”

মেঘ চমকে উঠে প্রশ্ন করল,
“আশিক? তুই ঠিক দেখেছিস?”

“হ্যাঁ। আমি একদম ঠিক দেখেছি। বিয়ের দিন রাতে দেখেছি। তোমাকে বলতে গিয়ে দেখি তুমি ঘুমিয়ে পরেছো। তারপর দিশাকে জিজ্ঞেস করছি, আশিক কে? তখন দিশা বলছে মালা আপুর এক্স বয়ফ্রেন্ডের নাম আশিক। ”

“এক্স বয়ফ্রেন্ড?”

“দিশা তো তাই বললো। ”

মেঘ গভীর চিন্তায় পরে গেছে। মালা আপুর বান্ধবীদের সঙ্গে বলা কথা আর ওনার আচরণে স্পষ্ট বুঝা গেছে ওনি আবির ভাইকে পছন্দ করেন। সকালবেলা হাতে শুধু “A” অক্ষরটায় ছিল, খুব উৎসাহ নিয়েই দেখাচ্ছিলেন। রাতে সেই অক্ষর Ashik কিভাবে হলো? কেউ কি হাতে কখনো এক্স এর নাম লিখে? তবে কি অন্য কেউ ওনার হাতে নাম লেখিয়ে দিয়েছে। কে সে? আবির ভাই নয় তো!
মেঘের হৃদয়ের শক্ত খোলস ভেদ করে অকৃত্রিম হাসি ফুটে ওঠেছে। তাড়াতাড়ি গাছে পানি দিয়ে রুমে চলে গেছে। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আবিরের জন্য অপেক্ষা করছে। আবির সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই মেঘ রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসলো ঠোঁট লেগে আছে মায়াবী হাসি। আবির ভ্রু কুঁচকালো। মেঘ হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল,
“আবির ভাই..!”

আবির কোনোপ্রকার ভাবাবেগ প্রকাশ না করে কিছুটা তপ্ত স্বরে বলল,
“কিছু বলবেন?”

মেঘের হাসিমুখ মুহুর্তেই অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। আবিরের এমন উত্তর আশা করে নি সে। মুখ গোমড়া করে বলল,

“আমি যা বলতে চাই তা শুনার ধৈর্য আপনার হবে না। বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। ”

দুপা পিছিয়ে রুমে ঢুকেই মেঘ দরজা আঁটকে দিয়েছে। আবির অভিভূতের ন্যায় বন্ধ দরজার পানে চেয়ে আছে।

(চলবে)