গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ৪৮
লেখিকা- সালমা চৌধুরী
মেঘ নিজের গাল আবিরের কপালে চেপে ধরেছে ঠিকই কিন্তু হৃদয়ের তোলপাড় কোনোক্রমেই সামলাতে পারছে না। আবিরের গা থেকে আসা তীব্র, ঝাঁঝালো গন্ধ মেঘের নাক দিয়ে ঢুকে সোজা স্নায়ুতন্ত্রকে কম্পিত করছে। মেঘের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে, ঘন ঘন শ্বাস ছাড়ছে যা আবিরের নাকে মুখে পরছে৷ নিজেকে সংযত করতে না পেরে মেঘ তৎক্ষনাৎ উঠে বসেছে। বুকটা অসহনীয় পর্যায়ে কম্পিত হচ্ছে। ফিনফিন করে কাঁপছে ঠোঁট। হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে আবিরের জ্বর কমছে না বরং ক্রমে ক্রমে বেড়েই চলেছে। মেঘ যে নিচে গিয়ে বড় আম্মুকে ডাকবে এই সুযোগ টাও পাচ্ছে না। মেঘের ফোন রুমে রেখে আসছিল৷ আবিরের ফোনের লক খুলতে পারছে না। আবিরের জ্বর বাড়তেছে দেখে দুরুদুরু কাঁপছে বুক, চোখেমুখে চিন্তার ছাপ।
আবিরের অকস্মাৎ কান্ডে মেঘের নিঃশ্বাস আঁটকে গেছে। স্তব্ধ হয়ে গেছে, আঁখি জোড়া প্রশস্ত হয়ে গেছে, এই বুঝি কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসবে। নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে হৃৎস্পন্দনও থেমে গেছে।
জ্বরের ঘোরে আবির বালিশ থেকে সরে মেঘের উরুতে শুয়েছে। এক হাতে মেঘের কোমড় আঁকড়ে ধরেছে। আবিরের মুখ ঠিক মেঘের উদরের সঙ্গে মিশে আছে। আবিরের উষ্ণ শ্বাস জামা ভেদ করে মেঘের নমনীয় উদর স্পর্শ করছে। এতেই মেঘ পাথর বনে গেছে। অনেকটা সময় নিঃশ্বাস আঁটকে ছিল, শেষ পর্যায়ে ভেতরে আটকানো নিঃশ্বাসটা খুব জোরে ছাড়ে। বক্ষপিঞ্জরে আবদ্ধ পাখিটা এই বুঝি উঁড়ে যাচ্ছে। আবিরের একেকটা নিঃশ্বাস মেঘের উদর স্পর্শ করছে আর মেঘের ছোট্ট দেহ প্রতিবার কম্পিত হচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত পুরুষের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে মেঘ পুরো হতভম্ব হয়ে গেছে। কিছু সময়ের ব্যবধানে শ্বাসনালীতে তুফান শুরু হয়ে গেছে। গলা শুকিয়ে কাট, বার বার ঢোক গিলছে। অবিরত কাঁপছে দুহাত। আবির জ্বরের ঘোরে মেঘকে আরও শক্ত করে জরিয়ে ধরেছে। এমন কল্পনাতীত কান্ডে মেঘের হৃৎস্পন্দনের মাত্রা বেড়ে আকাশ ছোঁয়ার পথে। জানালা দিয়ে আসা কনকনে ঠান্ডা বাতাস মেঘের কানে ঢুকছে, বাতাসেরা যেন মেঘের কানে কানে বলছে,
” তুই তো আবির ভাইয়ের প্রণয়ের অনলে পুড়তেই চাস৷ তবে কিসের এত অভিশঙ্কা?”
মেঘের শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। আবিরের গায়ের জ্বরের তাপে মেঘের পেট পুরো গরম হয়ে গেছে। জ্বরের ঘোরে আবির আবোলতাবোল বলা শুরু করেছে। দীর্ঘ সময় পর মেঘ নিজের কাপাঁ কাঁপা হাতে আবিরের মাথায় আলতোভাবে স্পর্শ করেছে। গলা খাঁকারি দিয়ে কোমল কন্ঠে ডাকল,
“আবির ভাই ”
আবির উত্তর দেয়ার অবস্থাতে নেই ৷ ঘোরের মধ্যে কি সব বলেই যাচ্ছে। মেঘ কান পেতে শুনছে। বুঝতে চেষ্টা করছে আবির কি বলছে৷ সব কথা বুঝতে না পারলেও শেষটুকু শুধু বুঝতে পেরেছে,
“আমি মা*রা গেলে তুই কাঁদিস না, প্লিজ”
আবিরের এমন কথা শুনে মেঘ আবিরের মাথা দু হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠে,
“এমন কথা বলবেন না প্লিজ। কিছু হবে না আপনার। ঠিক হয়ে যাবেন৷ আপনার কিচ্ছু হতে দিব না আমি। ”
বেশ খানিকক্ষণ পর মেঘ আবিরকে রেখে দৌড়ে নিচে নামলো। ততক্ষণে বাড়ির সবাই শুয়ে পরেছে। শীতের রাত তাই সবাই একটু তাড়াতাড়ি ই শুয়ে পরে। বড় আম্মুকে ডাকতে গিয়েও থেমে গেল। বড় আম্মুও অসুস্থ, আবির ভাইয়ের এ অবস্থা দেখলে বড় আম্মুর শরীর আরও খারাপ হবে এই ভেবে আর ডাকে নি। ছুটে গেল তানভিরের রুমে। তানভিরও বাসায় নেই। মেঘ নিজের রুম থেকে ঔষধ আর ফোনটা নিয়ে তানভিরকে কল করতে করতে আবিরের রুমে গেল। তানভিরকে আবিরের অবস্থা জানিয়ে তাড়াতাড়ি আসতে বলেছে৷ অনেকক্ষণ ডাকার পর আবিরের একটু হুঁশ আসছে। মেঘ কোনোরকমে আবিরকে উঠিয়ে ঔষধ খাইয়ে দিয়েছে। আবির চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে মেঘ আবিরের কপালে জলপট্টি দিয়ে দিচ্ছে। আবির বেশখানিকটা সময় নিস্তেজ হয়ে পরে রইলো৷ জ্বর মাথায় উঠে গেছে। মেঘ জলপট্টি দিচ্ছে আর সরাচ্ছে, কপালের তাপে কয়েক মুহুর্তেই পট্টি গরম হয়ে যায়। তাই বার বার পাল্টাতে হচ্ছে৷ প্রায় ১ ঘন্টা পর আবির হঠাৎ ই চোখ মেলল। জ্বর কিছুটা কমেছে তাই হুঁশ ফিরেছে। সরাসরি মেঘের চোখের দিকে তাকালো।শরীরের উত্তাপে চোখ লাল হয়ে গেছে। মেঘ জলপট্টি দিতে দিতে শুধালো,
“শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?”
আবির মলিন হাসলো। মেঘ পুনরায় প্রশ্ন করল,
“কি হয়েছে?”
“কিছু না। আর পট্টি দিতে হবে না। অনেক রাত হয়ছে ঘুমাতে যা। ”
“আপনি চুপ করে থাকুন, প্লিজ।”
আবিরের হাসি ঠোঁট থেকে সরছেই না। বরং ধীরে ধীরে প্রশস্ত হচ্ছে আবিরের ওষ্ঠদ্বয়। মনে মনে মেঘকে নিয়ে রঙিন স্বপ্নের দুনিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে। মেঘ এমনভাবে আবিরের যত্ন নিচ্ছে “ঠিক যেন ঘরের বউ”। আবির জ্বরের ঘোরেও মেঘের চিন্তায় বিভোর হয়ে আছে। আবিরের নেশাক্ত দৃষ্টি দেখে মেঘ জিজ্ঞেস করল,
” আপনি কি কিছু বলতে চাচ্ছেন?”
জ্বরের কারণে আঁটকে আঁটকে বলে,
“বলতে তো চাই”
“বলুন।”
“না থাক। কিছু না”
“বলুন।”
“বাদ দে। জলপট্টি দিতে হবে না । একটু শান্ত হয়ে বস। হাত নাড়াচাড়া করছিস পরে হাত ব্যথা করবে৷ ”
মেঘ গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“আমার হাত ব্যথার চিন্তা আপনাকে করতে হবে না। নিজের হাত নিয়ে ভাবুন।”
“আমার হাত ঠিক হয়ে যাবে৷ ”
মেঘ হঠাৎ ই মায়াবী দৃষ্টিতে আবিরের চোখের দিকে তাকিয়েছে। মেঘের দুচোখ ছলছল করছে। বুকে চাপা পড়া কষ্টে ভেতরটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। আবিরের নজরও ঠিক মেঘের চোখ বরাবর। অষ্টাদশীর মায়াবী দৃষ্টি আবিরের বুকে ধ্রিম ধ্রিম কম্পনের কারণ। অনুভূতি লুকাতে অক্ষম, জ্বরের কারণে আবিরের হৃদয়ের ব্যকুলতা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। মেঘ আবিরের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে কোমল কন্ঠে বলল,
“আপনি এমন কেন করেন? ”
আবির ক্ষীণ হেসে প্রশ্ন করে,
“কেমন করি?”
” নিজেকে এত আঘাত করেন কেন? সকালে এভাবে হাত না কাটলে তো এখন জ্বরটা উঠতো না।”
” রাগ কন্ট্রোল করতে পারি না, এতে আমার কি দোষ”
“এত বড় ছেলে হয়েও রাগ কন্ট্রোল করতে পারেন না আবার আমায় জেদ কমাতে বলেন।”
“তোর জেদটা কমালেই আমার রাগ কমে যাবে।”
“কিভাবে?”
“তা তো এখন বলবো না। জ্বর তো এখন কমেছে। তুই বরং রুমে চলে যা।”
“তাড়িয়ে দিচ্ছেন কেন?”
“তাড়াচ্ছি না। শীতের রাত এমনিতেই ঠান্ডা অনেক। তারমধ্যে এত রাতে তুই আমার রুমে…”
“আজব তো।৷ এত রাতে কি আমি শুধু শুধু আপনার রুমে আসছি নাকি। ভাইয়া বলছিল বলেই আসছি৷ আর আমি না আসলে তো জানতামও না যে আপনি জ্বরে পরে আছেন। ঔষধ পর্যন্ত খান নি। ঔষধ টা খেয়েছেন বলেই জ্বরটা একটু কমেছে। তাছাড়া আমি তো নিচে গিয়েছিলাম। বড় আম্মু,আম্মু সবাই ঘুমে ছিল তাই ডাকি নি। ভাইয়াকে কল দিয়ে বলছি, ভাইয়া আসতেছে। বাসায় কেউ অসুস্থ হলে কি দেখাও যাবে না?”
“আচ্ছা বাবা সরি। আর কিছুই বলব না তোকে।”
“কিছু বলতে হবে না৷ কি খাবেন সেটা বলুন। খাবার নিয়ে আসি৷ ”
“কিছু খাব না। মাথায় প্রচন্ড ব্যথা করছে, তুই শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দে তাহলেই হবে। ”
মেঘ আলতো হাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, একসময় আবির ভাইয়ের চুলে হাত দেয়ার কত ইচ্ছে ছিল, কতই না বাহানা খুঁজেছে কিন্তু সাহস করে ছুঁতে পারতো না। আজ আবির ভাই নিজেই সেই অধিকার দিয়েছেন। মেঘ আবিরের মলিন চেহারায় তাকিয়ে ঈষৎ হাসলো। আবিরের চোখ বন্ধ। মেঘ এক দৃষ্টিতে আবিরের মুখের পানে চেয়ে আছে। এই শ্যামবর্ণের পুরুষ যে অষ্টাদশীর মনের রাজ্যের একমাত্র রাজকুমার। যাকে নিয়ে রোজ রাতে স্বপ্নের দেশে পারি জমায়, কল্পনায় ঘুরে বেড়ায় দেশ থেকে দেশান্তরে। অষ্টাদশীর মনিকোঠায় একমাত্র আবির ভাইয়ের বসবাস। তখনই তানভির রুমে ঢুকে। আবির ঘুমাচ্ছে, মেঘ আবিরের মুখের পানে চেয়ে মাথায় হাত বুলাচ্ছিল। তানভির হুট করে রুমে প্রবেশ করে এই দৃশ্য দেখে হকচকিয়ে উঠলো। রুম থেকে বেড়িয়ে যাবে নাকি ঢুকবে বুঝতে পারছে না। তানভির আস্তে করে গলা খাঁকারি দিতেই মেঘ আঁতকে উঠে। আবিরের থেকে কিছুটা দূরে সরে বসে।
তানভির কাছাকাছি এসে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়ার জ্বর কি কমছে?”
মেঘ ছোট করে বলল,
“অনেকটা কমেছে। ”
তানভির আবিরের কপালে আর গলায় হাত রেখে জ্বরের মাত্রা বুঝার চেষ্টা করল। তারপর স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“তুই আর কিছুক্ষণ বস। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
“আচ্ছা। ”
তানভির রুম থেকে বের হতে হতে মুচকি হাসলো। সে এটায় চাইছিল। সকাল থেকে সারাদিন আবিরকে বুঝিয়ে মাথা ঠান্ডা করেছে। মিনহাজের প্রতি যতটা না ক্ষোভ তার থেকেও বেশি রাগ উঠেছিল মেঘের প্রতি। আবির যেখানে আব্বু, আম্মু, চাচা-চাচিদের সামনে নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করে, মেঘ সেখানে হুট করে সবার সামনে বাড়ি ছাড়ার কথা বলে ফেলছে। আবির মন-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছে সম্পর্ক ঠিক করতে অন্যদিকে মেঘ কিছু মানুষের উষ্কানিতে সেটা ভাঙতে চাইছে । এজন্যই মূলত আবিরের রাগ কন্ট্রোলের বাহিরে চলে গেছে আর আব্বু চাচ্চুর সামনে যা তা বলে ফেলছে। আবির নিজেও ভেবে পাচ্ছে না আব্বু- চাচ্চু এই ঘটনাটা কিভাবে নিয়েছে বা এর পরিণাম কি হতে চলেছে। মেঘের ভুল আর অন্যায় গুলো তানভির খুব সুন্দর করে ঢাকার চেষ্টা করেছে। আবিরের মাথা ঠান্ডা করতে তানভির শেষ পর্যন্ত হুমকিও দিয়েছে,
“যদি মেঘের সঙ্গে ঠিকঠাক মতো কথা না বলে তাহলে সে নিজে মেঘকে নিয়ে হোস্টেলে দিয়ে আসবে৷ ”
একপ্রকার বাধ্য হয়েই আবির শর্ত মেনে নিয়েছে। শত রাগের পরও মেঘকে না দেখে আবির থাকতে পারবে না। গত ৭ বছর অনেক কষ্টে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে৷ আর সম্ভব না। এখন কয়েক ঘন্টা মেঘকে না দেখলেই ছটফট করতে থাকে। বাসায় থাকলে কারণে অকারণে বার বার নিচে আসে যেন মেঘকে একপলক দেখতে পারে।
তানভির রুমে চলে গেছে। মেঘ খানিকটা সময় মাথা নিচু করে বসে রইলো। নির্লজ্জের মতো আবির ভাইকে দেখছিল এটা ভাইয়া দেখে ফেলছে ভেবেই লজ্জায় মুখ তুলতে পারছে না। আবির ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরতেই বালিশের উপর রাখা মেঘের হাত আবিরের গাল স্পর্শ করে। আবিরের গালের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির স্পর্শে মেঘের গাত্রে শিহরণ জাগে। শিরা-উপশিরায় তুফান শুরু হয়ে গেছে। হুটহাট আবির ভাইয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ মেঘের হৃদয়ে প্রেমানুভূতি জাগ্রত করে। হাত সরিয়ে মুগ্ধ আঁখিতে তাকিয়ে রইলো আবিরের অন্যপাশের গালে। আবির কখনো ক্লিন সেইভ করে না। ছোট করে কেটে রাখে দাঁড়ি৷ সপ্তাহ খানেক আগেই হয়তো কাটিয়েছিল এখন কিছুটা বড় হয়েছে। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি সহ গালটা মেঘকে টানছে। আবির ভাইয়ের প্রতি তীব্র প্রেমানুভূতি, মুগ্ধতায় পরিপূর্ণ গাল মেঘের হৃদয়ের সমস্ত প্রাচীর ভেঙে দিচ্ছে। ইহজগতে আবির ভাইয়ের গাল ব্যতীত আপাতত আর কোনোদিকে তাকাতে পারছে না। মেঘ আস্তে করে আবির কে ডাকল, কিন্তু সারা নেই। সকালের ঘটনায় শরীর থেকে অনেকটা রক্ত বেড়িয়ে গেছে। তাছাড়া কিছুদিনের দৌড়াদৌড়িতে আবিরের শরীরও বেশ দূর্বল৷ ঠিকমতো খায় না, নিজের যত্ন নেয় না, তারউপর জ্বর, সব মিলিয়ে ক্লান্তিতে বার বার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তাছাড়া প্রেয়সীর সঙ্গ পেয়ে আবিরের হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে গেছে। মেঘ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ায় আবিরের মনে হচ্ছিল, “ইহজগতে আর কিছুই প্রয়োজন নেই তার। এভাবেই তার Sparrow কে নিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দিবে সে। ”
আবিরের সারা শব্দ না পেয়ে মেঘ দ্বিতীয় & তৃতীয় বার ডাকে৷ কিন্তু আবির গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। মেঘ ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে, আবিরের গালে টুক করে কিস করেই রুম থেকে ছুটে পালায়৷ বেলকনিতে যেতেই আর একটুর জন্য তানভিরের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে যাচ্ছিলো। তানভির সামনে থেকে সরে কিছুটা তপ্ত স্বরে প্রশ্ন করল,
“এভাবে ছুটছিস কেন? কি হয়েছে? ”
“কিছু না” বলেই মেঘ নিজের রুমে চলে গেছে। তানভির আবিরের রুমে ঢুকতেই দেখে আবির গালে হাত দিয়ে হা করে তাকিয়ে আছে। তানভিরকে ঢুকতে দেখেই আবির তৎক্ষনাৎ হাত সরিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে । তানভির ঠাট্টার স্বরে বলল,
” আমি কি অসময়ে চলে আসলাম?”
আবির নিঃশব্দে হেসে লেপের নিচে মুখ লুকিয়েছে। তানভির হাসতে হাসতে বলল,
“নববধূও এত লজ্জা পাবে না তুমি যতটা লজ্জা পাচ্ছো! সমস্যা নেই। আমি কিছু বুঝি নাই। চিল”
আবির লেপের নিচ থেকে মুখ তুলে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
” তুই বুঝলেই বা কি! আমি কি অবৈধ কিছু করছি নাকি?”
“নাহ! একদম ই না।”
তানভির একটু থেমে সিরিয়াস মুডে বলল,
“থ্যাংকস ভাইয়া। বিশ্বাস করো, তোমাদের দুজনকে হাসিখুশি দেখলে আমার সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়। সবসময় এভাবেই থেকো প্লিজ।”
“ভাইরে এভাবে থাকলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কষ্ট হয়ে যাবে। তোর বোনের যন্ত্রণায় আমি কোনো একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলব।”
” তোমার প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। তারপরও কোনো অঘটন ঘটলে সমস্যা নেই। আমি সামলে নিব।”
তানভির খানিকক্ষণ চুপ থেকে পুনরায় বলে,
” হাতের কি অবস্থা? ব্যথা আছে?”
“আছে। একটু কম।”
“তুমি জানো,তোমার নিজের দোষেই আজ তোমার এই অবস্থা ”
“আমি আবার কি করলাম?”
“তোমার কিছুদিনের আচরণে এমনিতেই বনুর মেজাজ বিগড়ে ছিল তারমধ্যে তুমি বিবাহিত এ কথা কেন বলতে গেছিলা? তারউপর তুমি নাকি এক বাচ্চার বাপ! এসব বলছিলা কেন? এজন্যই জিদে হোস্টেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিছিলো।”
“আমি কি করব। ঐদিন ফোন টা রেখে জাস্ট একটু রুমে গেছি আর আসছি। এরমধ্যে তোর বোন আমার ফোন চেক করে ফেলছে। মালাকে পাঠানো ম্যাসেজ দেখছে। কতটুকু পড়তে পারছে জানি না। তাছাড়া ওয়ালপেপারে যে তোর বোনের সঙ্গে ছবি দেয়া ঐ ছবিও নিশ্চয় দেখছে। কতটুকু কি দেখছে তা বুঝার জন্যই বউ আর বাচ্চার কথা বলছি। তোর বোনের রিয়েকশন দেখে বুঝছি ওয়ালপেপার টা সে ভালোভাবে খেয়াল করে নি। কিন্তু পরদিন তুই আর আমি যখন সোফায় বসে ছিলাম তখন তোর বোন সিঁড়ি থেকে আবারও আমার ফোনের ওয়ালপেপার টা দেখছে। বউ বাচ্চার ব্যাপার টা বিশ্বাস করুক আর না করুক ওয়ালপেপার দেখছে মানে ওরে আর কোনোভাবেই কিছু বিশ্বাস করাতে পারব না। তাই বাধ্য হয়ে আমার ছবি দিয়ে আরেকটা ছবি ইডিট করাইতে হয়ছে। ঐ ছবিটা ওয়ালপেপার দিয়েছি। যাতে তোর বোন ভুল না বুঝে। ভাগ্য ভালো দূর থেকে তোর বোন ওয়ালপেপার টা ঠিকঠাক মতো দেখে নি। না হয় সিউর বুঝে যেত এটা ইডিট করা ছবি। ”
তানভির হাসতে হাসতে আবিরের উপর গড়িয়ে পরছে। তানভিরের অট্ট হাসি দেখে আবিরের ভ্রু যুগল কুঁচকে আসে। কন্ঠ খাদে নামিয়ে হুঙ্কার দেয়,
“পাগলের মতো হাসছিস কেন?”
তানভিরের হাসি থামছেই না, হাসতে হাসতে কোনো মতনে বলল,
“আমার বোনকে এত ভয় পাও?”
“ভয় তো পেতেই হবে একমাত্র বউ বলে কথা। ও মানে কি না জানি না! আমি তো ও কে আমার বউ মানি। আমার মতে, পৃথিবীর ৯০% বিবাহিত পুরুষ ই তাদের বউকে ভয় পায়। পৃথিবীর বুকে রাজ করা পুরুষটাও তার বউ এর সামনে নাথিং। এর একটায় কারণ, বউয়ের প্রতি প্রবল ভালোবাসা। আর বাকি যে ১০% পুরুষ আছে তারা বউকে ভালোই বাসে না৷ পছন্দ তো একজনকে করিস ই, দেখবি রাজনৈতিক ক্ষমতা, দাপট তার সামনে কিছুই না।”
তানভিরের হাসি থেমে গেছে। সত্যিই তাই! বন্যার প্রতি যবে থেকে ইমোশন কাজ করে তবে থেকে নিজেকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে তানভির। কেন করছে সে নিজেও জানে না।
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★★
দু’দিন কেটে গেছে। মেঘ এই দুদিন ক্লাসে যায় নি। কারো সাথে যোগাযোগও করে নি। মিনহাজ কম করে হলেও ৫০ বার কল করেছে। সাদিয়া, মিষ্টি, তামিমও কল করেছে কিন্তু মেঘ কারো ফোন ধরে নি। রাগ তার নিজের প্রতিই, ওদের উস্কানিতে নিজের গলে যাওয়া একদম ই উচিত হয় নি। আজ ভার্সিটিতে আসছে। অনেকদিন পর বন্যাও আজ ক্লাসে আসছে। বন্যাকে দেখেই মেঘ জড়িয়ে ধরেছে। ক্লাস শেষ হতেই সকলে এক জায়গায় জড়ো হয়েছে।
মিনহাজ – কিরে, এতগুলো কল দিলাম ধরিস নি কেন?
মিষ্টি – তোকে কতগুলো কল, মেসেজ দিলাম কোথায় নিখোঁজ হয়ে গেছিলি।
মেঘ- কোথাও না৷
বন্যা- কিরে কি হয়ছে? কোনো সমস্যা?
মেঘ- আমার জীবনটায় সমস্যায় ভরপুর।
বন্যা – হয়ছে কি বল তো
মেঘ- আমি ভাবছিলাম হোস্টেলে সিট নিব। ওরা সবাই বলতেছিল হোস্টেলে আসলে ভালো হবে। তাই ফরম নিয়ে গেছিলাম। ফরম পূরণ করে পরদিন আব্বু আর বড় আব্বুকে বলেছি, ওনারা কিছু বলার আগেই আবির ভাই ফরম ছিঁড়ে, চিল্লাচিল্লি শুরু করছেন, এমনকি আমার পা ভাঙার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন। বড় আব্বু আবির ভাইকে ধমক দিয়েছে। ঐ রাগে রুমে গিয়ে ড্রেসিং টেবিল ভেঙে হাত কেটে একাকার অবস্থা করে ফেলছে। ৩ দিন ধরে হাত ব্যথা আর জ্বরে ভুগতেছে। আজ দেখছি এ অবস্থাতেই অফিসে যাচ্ছে।
মিষ্টি, সাদিয়া, মিনহাজ, তামিম, বন্যা সকলেই পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনলো। বন্যা আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,
” তোর বইন বিরাট সাহস হয়ছে। তুই জানিস ছোট থেকে তোরে কিভাবে বড় করছে। প্রয়োজন ছাড়া এক পা এদিক সেদিক যেতে পারিস নি। তুই ভাবলি কিভাবে যে তোকে হোস্টেলে আসার অনুমতি দিবে। আর তুই অনুমতি চাইতেই বা গেলি কোন সাহসে? তোরে মে*রে আধমরা করে নি সেই কপাল। তুই আমায় একটাবার কল দিতি৷ আমি ডিরেক্ট নিষেধ করতাম তোকে। ”
মেঘ – আমি কিভাবে জানবো এমন কিছু হবে। আবির ভাইয়ের উপর রাগ করেই তো চলে আসতে চাইছিলাম।
মিষ্টি রাগান্বিত কন্ঠে বলা শুরু করল,
“তুই হোস্টেলে আসলে এই ব্যাটার কি সমস্যা? ব্যাটা বিয়ে করতে পারে, বাচ্চা থাকতে পারে আর তুই সামান্য হোস্টেলে আসবি এতেই এত হাঙ্গামা। আসলে পুরুষ জাত টায় খা*রাপ। আমি তোর জায়গায় থাকলে না বলেই চলে আসলাম।”
মিনহাজ- দেখ মিষ্টি সব ছেলে কিন্তু খারাপ হয় না। দেখিস না আমি কত নিষ্পাপ !
তামিম- আমিও৷
বন্যা- কি বলছিস তুই এসব? আবির ভাই বিবাহিত? বাচ্চা আছে? এসব কি শুনছি মেঘ?
মেঘ- ওনি সেদিন বলছিলেন ওনি বিবাহিত, বাচ্চা আছে৷ তারপর জানছি আমার সাথে ফাজলামো করছে।
মিষ্টি – আজকে ফাজলামো করে বলতেছে, দুদিন পর দেখবি সত্যি সত্যি বউ নিয়া বাসায় চলে আসছে। পরে চিল্লাবি না বলে রাখলাম।
সাদিয়া – এই মিষ্টি চুপ করবি৷ তোর ব্রেকআপ হয়ছে বলে কি তুই সারা দুনিয়ার মানুষের ব্রেকাপ করিয়ে বেড়াবি নাকি?
মিষ্টি- আমি চাই না আমার ফ্রেন্ডরা কেউ ফালতু ছেলের জন্য নিজের জীবন বরবাদ করুক।
মেঘ- আবির ভাই মোটেই ফালতু ছেলে না। বাদ দে। আমার আবির ভাইকে নিয়ে তোরা কেউ কিছু বলবি না। আমার আবির ভাই ভালো হলেও আমার, খারাপ হলেও আমার। হইছে?
মিষ্টি – ব্যাটা বিয়ে করে ফেলছে শুনে সেদিন তুই ই কান্নাকাটি শুরু করছিলি। মনে নাই? এখন আমাদের দোষ?
বন্যা- ও দিনে ১০০ বার আবির ভাইয়ের জন্য কান্না করে, ১০০ বার হাসে। তাই বলে তোরা ওকে আরও উস্কাবি? আমি দুদিনের জন্য বেড়াতে গেছি কি না, আমার বেবিটার ব্রেইন ওয়াশ করা শুরু করে দিছিস!
মিনহাজ- আমরা তো চাই তোর বেবিটা হাসিখুশিতে থাকুক৷ তোর বেবির খেয়াল রাখার দায়িত্ব তো আমাদের ও৷
বন্যা- দেখলাম তো কেমন খেয়াল রাখছিস৷ ফাঁসাইয়া দিয়া নিজেরা তো বিরাট শান্তিতে আছিস। যা ঝড় গেছে তো আমার বেবিটার উপর দিয়ে গেছে।।
মেঘ- আবির ভাই বলছে, যারা আমাকে উস্কাইছে তাদের সবকটাকে আধমরা করে নিজের বাড়ি পাঠাবে।
বন্যা- একদম ঠিক আছে। এদের মা*রা ই উচিত।
তামিম- বন্যা, তুই এভাবে বলতে পারলি?
বন্যা- তুই আমার সঙ্গে কথায় বলিস না। বদমাশ পোলা।
মিনহাজ- মনে হয় তোর আবির ভাইয়ের থ্রেটে আমরা ভয় পাইছি। বলিস আসতে, দেখব নে তোর ভাইয়ের কত পাওয়ার আর আমার ভাই ব্রাদার্সদের কত পাওয়ার।
বন্যা হাসতে হাসতে বলল,
“এই গর্জন টা আবির ভাইয়া বা তানভির ভাইয়ার মুখোমুখি হওয়ার পর যেন থাকে। চল মেঘ”
মেঘকে নিয়ে বন্যা চলে গেছে। মেঘ বন্যাকে সব ঘটনা খুলে বলেছে৷ বন্যা শুধু একটা কথায় বার বার বলছে,
“তুই আমাকে একটা বার জানাতে পারতি। তুই জানিস, তুই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের কলিজার টুকরা তারপরও এমন কান্ড কেন ঘটালি। আবির ভাই না চিল্লালে তোর ভাই, আব্বু বা বড় আব্বু নিশ্চয় রাগ দেখাতো। ”
মেঘ নিজের প্রতি নিজেই বিরক্ত। বন্যাও আর বেশি কিছু বলে নি। মেঘকে বিদায় দিয়ে নিজেও বাসায় চলে গেছে।
এদিকে আবির আজ সকাল সকাল অফিসে আসছে। হাত এখনও পুরোপুরি ঠিক হয় নি। কিন্তু একটা বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে আজ গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। গত তিনবছরের অর্ডারের সমতূল্য এই একটা অর্ডার৷ সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আবির দের কোম্পানি দেশের সেরা পাঁচটা কোম্পানির মধ্যে একটা হবে। তাই হাতের দূরাবস্থা নিয়েও আবির অফিসে আসছে। টানা দেড় ঘন্টা মিটিং চলল আবির নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। মিটিং শেষে ওনারা ডিল কনফার্ম না করেই চলে গেছেন৷ বলেছে পরবর্তীতে কল দিয়ে জানাবে। তাই সকলেই একটু টেনশনে আছে। আবির আব্বুর থেকে বিদায় নিতে গেলে আলী আহমদ খান আবিরকে ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,
” শুনো আবির, নিজের রাগ যদি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারো। তবে জীবনে সফল হতে পারবে না।”
আবির মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে৷ সে খুব ভালোভাবেই জানে, ঐদিনের বাড়িত ঘটনার ক্ষোভ প্রকাশ করবেন আলী আহমদ খান। চুপচাপ সহ্য করা ছাড়া কিছুই করার নেই তার।আলী আহমদ খান পুনরায় বললেন,
“বাহিরে যায় করো না কেন, বাসায় অন্ততপক্ষে ঠান্ডা থাকার চেষ্টা করবা। ভুলে যেয়ো না তুমি বাড়ির বড় ছেলে৷ তোমার উপর বাকিরা নির্ভর। তানভির মতো মেঘ, মীম, আদি তিনজনকে আগলে রাখার দায়িত্বও তোমার। কোনো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চেচামেচি করলে, রাগ দেখালে তোমার উপর থেকে তাদের ভরসা উঠে যাবে। তোমার তাদের সাথে সফ্টলি মিশতে হবে৷ যাতে ওরা ভুল পথে পা বাড়ালেও তোমাকে তা জানাতে দ্বিধাবোধ না করে। তারপর তুমি বিষয়টা দেখবে, ঠিক মনে হলে ঠিক আর ভুল মনে হলে ভাই বোনদের বুঝিয়ে সেটা থেকে সরিয়ে আনবে৷ কিন্তু চিৎকার করে, রাগ দেখিয়ে ওদের সাথে কখনও দূরত্ব বাড়িয়ো না। আমি যে ভুল করেছি আমি চাই না একই ভুল তুমিও করো। আমার পরে খান বাড়িত পুরো দায়িত্ব তোমার। তাই তোমাকে যেমন শক্ত তেমন কোমল হতে হবে। আশা করি বুঝতে পেরেছো। এখন যেতে পারো।। ”
“জ্বি আচ্ছা” বলে আবির অফিস থেকে বেড়িয়ে পরেছে। হাতের দূরাবস্থার জন্য বাইক নিতে পারে নি। রিক্সা করে নিজের অফিস হয়ে বাসায় আসছে।
সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরেই আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান হাতে মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ইকবাল খান সিলেটে আছেন। বাড়িতে ঢুকেই সবাইকে ডাক শুরু করলেন।মেঘ, মীম,আদি, তানভির, আবির সহ সকলেই নিচে আসছে।
আলী আহমদ খান হাস্যোজ্জল মুখে বললেন,
“Congratulation My Boy. Order Confirmed. I am proud of you.”
আবিরও হাসিমুখে “Thank you ” জানালো।
সকলেই বেশ খুশি। সবাইকে মিষ্টি দেয়া হলো। আলী আহমদ খান নিজে আবিরকে মিষ্টি খাইয়ে দিয়েছেন। সবশেষে আলী আহমদ খান আবিরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আজকের এই খুশির কারণ একমাত্র তুমি। এত অল্প সময়ের মধ্যে তুমি কাজে এত মনোযোগী হয়েছো তারজন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এটা তোমার জন্য অনেক বড় সফলতা । জীবনের সর্বোচ্চ সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে যাও।”
আবির মৃদু হেসে বলল,
“দোয়া করবেন আমার জন্য। ”
মোজাম্মেল খান বললেন,
“ফি আমানিল্লাহ। দোয়া করি যেন সবসময় সবজায়গায় তুমি সফল হতে পারো।”
আলী আহমদ খান শুধালেন,
“আজকের এই খুশির দিনে, তোমার কি চাই বলো। যা চাইবে তাই পাবে।”
আবির ঢোক গিলে হাসার চেষ্টা করল, খানিকক্ষণ নিরব থেকে বললো,
“আমার এখন কিচ্ছু চাই না,তবে একদিন চাইবো। এমন কিছু চাইবো যা দেয়ার জন্য আপনাদের এতবছরের নিয়ম-নীতি পর্যন্ত ভাঙতে হতে পারে। আশা করবো সেদিনের জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকবেন।”
কথা শেষ করেই আবির নিজের রুমে চলে গেছে। মেঘ আহাম্মকের মতো চেয়ে আছে। আবির ভাইয়ের কথা কিছুই মাথায় ঢুকে নি। কেউ কিছু দিতে চাইছে, নিয়ে নিলেই তো ঝামেলা শেষ। প্যাঁচ লাগাতে হয় কেন৷ মেঘ এটায় ভেবে পায় না। আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খানও মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। আবিরের মা, মেঘের মা আর মীমের মাও নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছেন।
মীম মেঘকে প্রশ্ন করল,
“আপু তোমায় যদি বলতো, যা চাও তাই পাবা। তাহলে তুমি কি চাইতা?”
মেঘ মনে মনে বলল,
“আবির ভাইকে চাইতাম। আবির ভাইয়ের সম্পূর্ণ হৃদয় জুড়ে আমার অস্তিত্ব চাইতাম। আমি আবির ভাইয়ের পৃথিবী হতে চাইতাম”
মীম পুনরায় ডাকে,
“আপু বলো না, কি চাইতা?”
“জানি না”
বলে মেঘ নিজের রুমে চলে যাচ্ছে। মীম তারপরও মেঘের পিছন পিছন ছুটছে। তানভির এতক্ষণ যাবৎ নিরব ভূমিকা পালন করছিল৷ চলে যাবে কি না সেটাও বুঝতে পারছে না। মেঘ – মীম চলে যাওয়ায় নজর পরে তানভিরের দিকে। মোজাম্মেল খান স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,
” তোমার ভাইয়ের এখন কিছু লাগবে না বলে গেল। তোমার কি কিছু লাগবে?”
তানভির এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে না করল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মনে মনে বিড়বিড় করে বলে,
” বউ লাগবে। দিবেন এনে? ভাইয়ারও বউ ই লাগবে ”
পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)
★★★★★
দু-তিনদিন পর বিকেলে আবির তানভির কেউ বাসায় নেই। মেঘ আর মীম টিভি দেখতেছিল। মালিহা খান আর আকলিমা খান রান্না ঘরে নাস্তা বানাচ্ছিলেন। তখনই জান্নাত বাসায় আসে। গেইট থেকে বলে,
“ভেতরে আসতে পারি?”
মেঘ,মীম সহ রান্নাঘরে থাকা দুই কর্তীর নজর পরে মেইন গেইটের দিকে। মেঘ জান্নাত আপুকে দেখে আশ্চর্য নয়নে তাকায়। তৎক্ষনাৎ সোফার উপর দিয়ে লাফিয়ে ছুটে গিয়ে জান্নাতকে জড়িয়ে ধরে। জান্নাতও মেঘকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে,
“কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো। তুমি কেমন আছো ভাবি?”
জান্নাত হাসিমুখে উত্তর দেয়,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। এখানে ভাবি বলো না, যে কেউ শুনে ফেলবে।। ”
মেঘ আস্তে করে শুধায়,
“ফুপ্পি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ। ”
মালিহা খান রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে বললেন,
“আরে জান্নাত যে। এতদিন পর আমাদের কথা মনে পড়ল?”
“এদিকে কাজ নেই তাই তেমন আসা হয় না। আজ একটু কাজ ছিল এজন্য ভাবলাম আপনাদের সাথে দেখা করে যায়। ”
“খুব ভালো করেছো। ভিতরে আসো। এই মেঘ ভিতরে নিয়ে যা। এখানেই দাঁড় করিয়ে রেখেছিস ”
জান্নাত সোফায় বসলো। জান্নাতকে দেখে মীম টিভি বন্ধ করে রান্না ঘরে চলে গেছে। মেঘ জান্নাতের পাশে বসে ফিসফিস করে সব প্রশ্ন করছে,
আসিফ ভাইয়া কবে আসবে, কেমন আছে, বাকিরা কেমন আছে থেকে শুরু করে এটা সেটা জিজ্ঞেস করেই যাচ্ছে৷ জান্নাত আস্তেধীরে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।
মেঘ হঠাৎ ই প্রশ্ন করল,
“আপু তুমি যে বিবাহিত এটা বলবা না?”
“না”
“কেনো?”
” আবির ভাইয়া বারণ করেছেন। ”
“আবির ভাই জানে তুমি বাসায় আসবে?”
“আবির ভাইয়া ই আমায় পাঠিয়েছেন। ওনি আর তানভির এখন আমার শ্বশুর বাড়িতে। ”
“ওনারা হঠাৎ ফুপ্পির বাসায় কেন?”
“ওনারা প্রতি সপ্তাহেই আমার শাশুড়িকে দেখতে যায়। ”
মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে বলে,
“কিহ? আমায় একদিনও নিয়ে যায় না কেন?”
“আমরা সবাই ই তোমার কথা বলি৷ তোমাকে নেয় না বলে আম্মু প্রতিবার আবির ভাইয়াকে রীতিমতো ধমকায়।”
“দেখেছো তারপরও আমায় নিয়ে যান না। আজকে আসুক বাড়িতে। ”
এরমধ্যে মালিহা খান নাস্তা নিয়ে আসছেন। পাশের সোফায় বসে জান্নাত কে ভালোভাবে পরখ করছেন। ওনার সেই অনেকদিনের ইচ্ছে জান্নাতকে ছেলের বউ বানাবেন৷ আলী আহমদ খানকে বলেওছেন। ওনি তেমন সারাশব্দ করছেন না৷ ওনি আবিরকে একটু সময় দিতে চাচ্ছেন ব্যবসায় ঠিকমতো মনোযোগ দিলেই বিয়ে করাবেন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জান্নাতের নাস্তা খাওয়ার এক ফাঁকে আলী আহমদ খান বাসায় ঢুকলেন। জান্নাতের সাথে টুকিটাকি কথা বলে নিজের রুমে চলে গেছেন৷ জান্নাতও খানিকক্ষণ বসে মেঘের রুমে ঘুরে আড্ডা দিয়ে বেড়িয়ে গেছে।
আবির আর তানভির রাতে খেয়ে বাসায় ফিরেছে। ফুপ্পির বাসায় গেলে কখনও না খাইয়ে ছাড়েন না৷ আবির ফেরার কিছুক্ষণ পরেই মেঘ আবিরের রুমে হাজির হলো। আবির ভ্রু জোড়া নাচিয়ে প্রশ্ন করল,
“কিছু বলবি?”
মেঘ কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে বলল,
“আমার ভাগ কোথায়?”
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কিসের ভাগ?”
“ভালোবাসার”
আবির ঢোক গিলে ছোট করে বলল,
“মানে”
“ফুপ্পির ভালোবাসার ভাগ দেন ”
“কাছে আয় দিচ্ছি ”
মেঘ দু কদম এগিয়ে গেল,
আবির হাত বাড়িতে মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
“ফুপ্পির হাতে আমি শুধু গাট্টায় খাই৷ তার ভাগই দিলাম। আর খাবারের ভাগ চাইলে এরপর থেকে নিয়ে আসব। ”
(চলবে)
গল্প- আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে
পর্ব- ৪৯
লেখিকা- সালমা চৌধুরী
মেঘ ঠোঁট উল্টে বলল,
“ইসসস, এত জোরে কেউ গাট্টা দেয়? মাথাটা ব্যথা হয়ে গেছে। ”
আবির কোমল কন্ঠে বলে,
” তুই ভালোবাসার ভাগ চাইছিস। কম করে কিভাবে দেয় বল!”
“গাট্টামারা ভালোবাসা আমি চাই নি৷ ”
আবির হঠাৎ ই মেঘের দিকে কেমন করে চাইল, উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“তো কেমন ভালোবাসা চাইছিস?”
মেঘ দরদ মাখা কন্ঠে বলল,
” আপনাদের মতো আমিও ফুপ্পির সাথে দেখা করতে চাই, গল্প করতে চাই, ফুপ্পির যত্ন পেতে চাই। ”
“ওহ আচ্ছা। আমি ভাবলাম অন্য কিছু। ”
মেঘ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“অন্য কিছু মানে?”
“কিছু না৷ এখন ফুপ্পির বাসায় তোকে নিয়ে যাওয়া যাবে না৷ তোকে নিয়ে আমি বা তানভির যে কেউ বের হলেই হাজার টা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তারথেকে কিছুদিন শান্ত থাক৷ আমি দেখছি কি করা যায়৷”
মেঘ আস্তে করে শুধালো,
“জান্নাত আপুকে আসতে বলছিলেন কেন?”
“দরকার আছে৷ আচ্ছা বল তো, জান্নাতের সঙ্গে আম্মুর কথা হয়ছিল? আম্মুর রিয়েকশন কি?”
“কথা হয় নি আবার! বড় আম্মু পাশের সোফায় বসে খুব সুন্দর মতনে আপুর সঙ্গে কথা বলছেন। বড় আম্মু তো অনেকদিন যাবৎ জান্নাত আপুকে আপনার বউ বানাতে চাচ্ছেন । আপনারা কেন বলছেন না যে আপুর বিয়ে হয়ে গেছে?”
“এটা বলে দিলে তো মজাটায় শেষ।”
“মানে”
“জানতে পারবি খুব শীঘ্রই। আর হ্যাঁ মুখ ফস্কে জান্নাতের বিয়ের কথা বলে দিস না যেন।”
“আমি এত বেক্কল না৷ ”
আবির হেসে বলল,
“I know that you are the smartest girl in the world.
মেঘ ফিক করে হেসে ফেলল। আবির ভাইয়ের মুখে নিজের প্রশংসা শুনে ভিষণ লজ্জা পেয়েছে। লজ্জায় মাথা নিচু করে নিজের রুমে চলে গেছে।
★★★★★
সময় ধাবমান। জানুয়ারি পেরিয়ে ফেব্রুয়ারিতে পা দিয়েছে। তীব্র ঠান্ডা অনেকটা কমে এসেছে। মেঘদের ক্লাস শেষ হয়েছে সবেমাত্র পাঁচ মিনিট হলো। বন্যা আর মেঘ গল্প করতে করতে দুজনে হাত ধরে হাঁটছে। তামিম দৌড়ে এসে বন্যার পিছনে দাঁড়িয়ে বন্যাকে ডাকে,
“এই বন্যা ”
বন্যা শুনেও না শুনার মতো হাঁটতে থাকে৷ তামিম এবার বন্যা আর মেঘের সামনে এসে দাঁড়ায়। বন্যা, মেঘ দুজনেই থমকে দাঁড়ালো। মেঘ তামিমের মুখের পানে তাকালেও বন্যা তাকায় নি, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
তামিম অভিযোগের স্বরে বলল,
“বন্যা, তুই আমার সাথে ঠিকমতো কথা বলিস না কেন?”
“কারণ টা কি তোর অজানা?”
“এতদিন হয়ে গেছে এখনও ঐ বিষয় নিয়ে পরে আছিস। চলতে চলতে কারো প্রতি ইমোশন আসতেই পারে, তোর প্রতিও আসছিল তাই আমি তোকে আমার মনের কথা বলছিলাম। তুইও তোর মতামত জানিয়েছিস এবং আমি তা মেনে নিয়েছি। তুই না করছিস এরপর কি আমি তোকে কোনো প্রশ্ন করছি বা জোরাজোরি করছি? তুই রিজেক্ট করছিস বলে এই না যে আমি মরে যাব। কিন্তু তার প্রভাব বন্ধুত্বের উপর কেন পড়বে বলতো! তারপরও আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। প্লিজ বন্ধুত্বের সম্পর্কের সুবাদে হলেও আমায় ক্ষমা করে দে।”
বন্যা কিছুটা ভারী কন্ঠে বলল,
“আচ্ছা”
এরমধ্যে মিনহাজ ও এগিয়ে আসল। তিনজনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কিরে, তোরা এখনও এখানে ”
তামিম প্রশ্ন করে,
“তুই কোথায় গেছিলি?”
“নেতারা আসছে। ওনাদের সামনে মাস্টার্স পরীক্ষা। ভার্সিটি থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার সুবাদে ওনারা একটা পোগ্রাম করবে শুনলাম। ভার্সিটির পাশাপাশি ঢাকার সুনামধন্য কলেজের স্যাররা, বড় বড় অবস্থানে থাকা ব্যক্তি বর্গরাও সেই পোগ্রামে আমন্ত্রিত থাকবে৷”
বন্যা বলল,
“ভালো কিন্তু তুই ঐখানে কি করতে গেছিলি?”
“এমনিতেই। নেতাদের সাথে দেখা করতে গেছিলাম। ওনাদের সাথে পরিচয় থাকা ভালো। রাজনৈতিক পাওয়ার থাকবে, যেকোনো সমস্যায় সাহায্য পাওয়া যাবে। তাছাড়া সাধারণ সম্পাদক আমার রুমমেট। মেঘ বলছিল না, ওর আবির ভাই নাকি আমাদের আধমরা করে বাড়ি পাঠাবে। আর কিছুদিন ওয়েট কর দেখবি আমার কত পাওয়ার হয় !”
বন্যা মেঘের দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“দেখছিস মেঘ, তোর আবির ভাইয়ের ভয়ে নেতাদের পিছু নিচ্ছে।”
পুনরায় মিনহাজকে উদ্দেশ্য করে বলল,
” নিজের নাই দুই আনা ক্ষমতা আবার ভাব দেখায় ষোল আনার। সেদিন যেভাবে বলছিলি ভাই ব্রাদার্সের পাওয়ার দেখাবি, তখন তো ভাবছিলাম তোদের এলাকার ভাইদের কথা বলছিস। ”
মেঘ মৃদু হেসে বলল,
“এজন্যই বলি আমার আবির ভাই সবার সেরা। তোদের মতো ৮-১০ জনকে পে*টানো আমার আবির ভাইয়ের কাছে জাস্ট ৫ মিনিটের ব্যাপার। ওনার কাউকে প্রয়োজন নেই, একায় ১৯৯ জনের সমান। ”
তামিম উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“১৯৯ জনের সমান কিভাবে হয়? হলে ১০০ জনের সমান হবে।”
” আমার আবির ভাই একটু ব্যতিক্রম তাই ১৯৯ জনের সমান।”
“এটা কেমন লজিক? ”
“এটা আমার লজিক তোরা বুঝবি না। ”
মিনহাজ তপ্ত স্বরে বলল,
“শুন, কথায় কথায় আমার আবির ভাই, আমার আবির ভাই করিস না। কানে খুব লাগে”
“তোর কানে লাগে এটা তোর কানের সমস্যা। তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখা গিয়ে। আমি আমার আবির ভাই ই বলবো। আমার আবির ভাই, আমার আবির ভাই, আমার আবির ভাই। ”
মিনহাজের মেজাজ খারাপ হচ্ছে। তবুও শান্ত থাকার চেষ্টা করছে। মিনহাজ রাগে অন্যদিকে তাকিয়েছে। অকস্মাৎ মেঘদের দিকে চেয়ে বলল,
“এই সাইড দে, ভাই রা আসতেছে। ”
বন্যা, মেঘ, তামিম সাইড হয়ে দাঁড়িয়ে। প্রায় ১৫-২০ জন ছেলে হেঁটে আসছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জুনিয়রদের সালাম দেখেই তাদের অবস্থান বুঝা যাচ্ছে। মেঘদের কাছে আসতেই মিনহাজ সুন্দর করে সালাম দিল,
সামনের দিকের গম্ভীর চেহারার একজন চোখ দিয়ে একটু ইশারা করল৷ সালাম গ্রহণ করেছে এটায় বুঝালো। ওনারা পাশ কেটে যেতেই মেঘ বলল,
“কিরে তোর ভাই তো সালামের উত্তর টাও দিল না।”
মিনহাজ বিরক্তিভরা কন্ঠে বলল,
“ওনার কি এত মানুষের সালামের উত্তর দেয়ার সময় আছে নাকি৷”
২ মিনিট পরেই কিছুটা দূর থেকে হৈ হুল্লোড়ের শব্দ ভেসে আসছে। মেঘরা পিছন ফিরে তাকাতেই দেখে ছেলেগুলো কাকে ঘিরে কথাবার্তা বলতেছে। কাকে ঘিরে আছে তা দেখা যাচ্ছে না। কৌতুহল বশতই মেঘ, বন্যা, মিনহাজ, তামিম সবাই সেদিকে তাকিয়ে আছে। কয়েকজন একটু সরতেই বাইকটা সাইড করে হেলমেট খুলল।
মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো,
“আবির ভাই। ”
বাইকটা দেখেই পরিচিত লাগছিল। কিন্তু সিউর ছিল না। হেলমেট খুলতেই মেঘের চোখ কপালে উঠে গেছে। বিস্ময় চোখে তাকিয়ে আছে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা পিটপিট করছে। মেঘ ভার্সিটিতে ভর্তির পর থেকে আবির মেঘকে নিতে বা দিতে আসলে মেইনগেইটের কাছেই নামিয়ে দেয়। কখনও ভিতরে আসে না। আজ ই প্রথম আবির ভিতরে আসছে। মেঘের সাথে সাথে মিনহাজ, তামিম, বন্যাও বেশ অবাক হয়েছে আবির বাইক থেকে নামতেই সভাপতি, সহ সভাপতি, যুগ্ম সম্পাদক, আহ্বায়ক, সাধারণ সম্পাদক একে একে সবাই আবিরকে জরিয়ে ধরছে। আবিরও স্নেহে সহিত সবাইকে জড়িয়ে ধরছে। মেঘ, বন্যা সহ বাকিরাও কিছুটা এগিয়ে গেল। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। মেঘ বার বার চোখ কচলে তাকাচ্ছে। আবির ভাইয়ের ভার্সিটিতে কেউ পরিচিত আছে, এটা মেঘ জানতোই না। তাও আবার রাজনৈতিক ছেলেপেলের সাথে৷ রাগী, গুরুগম্ভীর স্বভাবের ছেলেটা হাসিমুখে বলল,
“Thanks Vaiya, তুমি আমাদের কথা মেনে এত ব্যস্ততার মধ্যেও আসছো এটায় অনেক। আমরা তো ভাবছিলাম তুমি হয়তো আসবেই না।”
” তোরা যে এত বছর পরও আমায় স্মরণ করেছিস সেই অনেক বড় ব্যাপার। ”
“তোমাকে কি ভুলা সম্ভব? কলেজের হিরো ছিলা তুমি৷ স্যারদের চোখের মনি সেই সাথে পুরো কলেজের মেয়েদের ক্রাশ বয়। ”
শেষ লাইনটা কানে যেতেই মেঘ সাপের মতো ফোঁস করে ওঠলো ৷ সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকায় আবিরের দিকে। আবির ভাইয়ের আশেপাশে ২-১ টা মেয়ের নামই সহ্য করতে পারে না৷ সেই আবির ভাই নাকি কলেজের সব মেয়ের ক্রাশ ছিল। আল্লাহ জানেন কত মেয়ে প্রেমের প্রপোজাল দিয়েছেন আর কত মেয়ের সাথে প্রেম করে বেড়িয়েছেন। মেঘ নিজের কপাল চাপড়ে বিড়বিড় করে বলল,
” মেঘরে তুই শেষ, হাজারো মেয়ের ক্রাশ ওনি, সেখানে তুই কে? তোর দিকে কোনো ছেলে ফিরেও তাকায় না, ক্রাশ তো বহুদূরের বিষয়। তুই আবার আবির ভাইকে চাস। ছিঃ লজ্জা লাগে না ? আবির ভাই যে বোন হওয়ার সুবাদে তোর সাথে দু-একটা কথা বলে সেই তোর কপাল।”
বন্যা মেঘের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
” কি বিড়বিড় করছিস? ”
মেঘের চোয়াল অকস্মাৎ ঝুলে পরল। মনের ঘর মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেছে ৷ শক্ত কন্ঠে বলল,
“কিছু না”
আবির ছেলেটার হাতে চাপড় মেরে বলে,
” বাজে কথা বাদ দে। হঠাৎ আমায় স্মরণ করার কারণ কি?”
আরেকজন বলে উঠলো,
” তুমি আমাদের স্পেশাল গেস্ট তাই স্মরণ করেছি। অবশ্য তোমায় মালা দিয়ে বরণ করা উচিত ছিল। আচ্ছা সমস্যা নেই, পোগ্রামের দিন অবশ্যই মালা দিব।”
আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“এই থাম থাম, আমায় বরণ করবি মানে? আমি কে?”
“তুমি আমাদের শ্রদ্ধেয় বড় ভাই। যার জন্য আমরা আজ এই অবস্থানে। ”
“আমার জন্য না । বরং তোরা নিজের অবস্থান নিজেরা তৈরি করেছিস৷ ”
” যখন পথভ্রষ্ট হয়ে গেছিলাম তখন রাস্তা তো তুমি দেখিয়ে দিয়েছিলে।”
“আচ্ছা বুঝলাম৷ কিন্তু পোগ্রাম টা কিসের?”
“ভার্সিটিতে লাস্ট একটা পোগ্রাম করতে চাচ্ছি।”
“প্রোগ্রাম করবি কর। আমার কি কাজ? আমি তো ভার্সিটির কেউ না, পড়িও নি এখানে”
“পড়ো নি তাতে কি? বাহিরে পড়তে না গেলে তুমি এই ভার্সিটির ই স্টুডেন্ট থাকতা৷ এখন কথা হলো, ভার্সিটির পাশাপাশি, আমরা আমাদের কলেজের স্যার- ম্যামদের ইনভাইট করতে চাচ্ছি। আর ইনভাইট তুমি করবা। তাছাড়া তোমাদের মতো সাকসেসফুল কিছু ব্যক্তিবর্গদের ও ইনভাইট করা হবে। তোমরা তোমাদের সুদর্শন চেহারা দেখিয়ে জুনিয়রদের সঠিক পথ দেখাবা। ”
“প্রথমত আমি কোনো সাকসেসফুল ব্যক্তি না। দ্বিতীয়ত আমি এই ভার্সিটির স্টুডেন্ট না। তৃতীয়ত তোদের প্রোগ্রামে আমি স্যারদের ইনভাইট করার কে?”
“প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বুঝি না। তুমি আমার ভাই এটায় একমাত্র কথা। ভাই তো নাকি?”
“হ্যাঁ ভাই। তো?”
“তুমি তো আমাদের অবস্থা দেখেই গেছিলা। স্যাররা একপ্রকার বের করে দিচ্ছিল কলেজ থেকে। সেদিন তুমি স্যারদের রিকুয়েষ্ট না করলে আমাদের যে কি অবস্থা হতো আল্লাহ ভালো জানেন। তুমি চলে যাওয়ার পর আমরা যতদিন কলেজে ছিলাম, এমন একটা দিন যায় নি যে স্যাররা আমাদের সামনে আসলে তোমার নাম নেয় নি। তুমি না বললে আমাদের বের করে দিত, আরও কত কথা। সেসব এখন অতীত। তোমার কথামতো পড়াশোনা করে আমাদের ১২ টা বন্ধুর মধ্যে ৯ জন ই DU তে ভর্তি হয়েছি। বাকিরাও ভালো অবস্থানে আছে। তোমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি কিন্তু তুমি নেটওয়ার্কের বাহিরে ছিলা। কিছুদিন আগে হঠাৎ একদিন তোমাকে একটা মেয়ের সঙ্গে দেখলাম। ডাকার সুযোগ ছিল না। অনেক খোঁজাখু্ঁজি নিয়ে জানতে পারছি তুমি তানভিরের ভাই। তারপর তানভিরের থেকে ফেসবুক আইডি নিলাম। আমার বা আমাদের জীবনের গল্পে তুমি অন্যরকম ভূমিকা পালন করেছো যার ঋণ কোনোদিন দিয়ে শেষ করতে পারব না। তাই তোমার পোগ্রামে আসতেই হবে।”
“বাবা গো! তোরা যেভাবে আমার প্রশংসা করছিস, আমার বাপেও আজ পর্যন্ত এত প্রশংসা করে নি।”
“তুমি যে কি চিজ, তোমার বাপে হয়তো বুঝেই নাই ”
আবির মৃদু হাসলো। আরেকজন বলে উঠল,
” ভাইয়া জানো, একই শহরে থেকেও গত পাঁচ বছর যাবৎ কোনোদিন কলেজে পা দেয় নি। স্যারদের দেখে মুখ লুকিয়ে চলছি৷ এখন তো ভার্সিটি লাইফ শেষ। দুদিন পর কে কোথায় থাকবো তা জানা নেই। তাই পোগ্রাম টা করতে চাচ্ছিলাম। ভার্সিটির স্যারদের সঙ্গে কথা বলেছি। ওনাদের আপত্তি নেই৷ এখন তুমি আমাদের সাথে যাবে, আমাদের পক্ষ থেকে কলেজের স্যারদের একটু বলবা। আমরা বললে যদি না আসে, তুমি বললে নিশ্চয়ই রাজি হবেন। ”
আবির রুষ্ট স্বরে বলল,
“সবই করে দিব প্রয়েজনে পোগ্রামেও আসবো কিন্তু গেস্ট হিসেবে নয়। সাধারণ মানুষ আর তোদের ভাই হিসেবে। যদি কোনোপ্রকার মালা দিয়ে বরণ, আমায় নিয়ে ৫০০ শব্দের ভাষণ শুরু করিস। তবে একেকটাকে স্টেজে ফেলে পেটা*বো বলে রাখবাম।”
“তাই বলে আমাদের জীবনের গল্পের নায়কের প্রশংসা করব না?”
“না করবি না। আমি শুধু তোদের পথ দেখিয়েছি। বাকি সব তোরা করেছিস। তোদের সাকসেস তোদের এতে আমার কোনো হাত নেই। তোরা যে আমার কথা মনে রেখেছিস এতেই শুকরিয়া। এমনও মানুষ আছে যাদের জন্য জীবন দিয়ে দিলেও তারা সেসব ভুলে যায়। দোয়া করি জীবনে সাকসেসফুল হ।”
“দেখো তো! তোমায় রাস্তায় দাঁড় করিয়েই জীবন ইতিহাস শুরু করে দিয়েছি৷ চলো ভেতরে চলো।”
“ভেতরে আর যাব না। কথা তো হলোই। আমার নাম্বার রাখ। কবে কলেজে যাবি জানাইস। অফিসে কাজ ফেলে আসছি ”
“একদিন কাজ একটু কম করলে কিছু হবে না। কতবছর পর তোমাকে পেয়েছি। আড্ডা না দিয়ে ছাড়ছি না। চলো চলো।”
আবির ঘুরতেই মেঘদের দেখতে পায়। কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল ওরা। আবির পেছন ফিরে থাকায় আগে দেখতে পায় নি। মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে। ওদের সব কথোপকথন ই মেঘ মনোযোগ সহকারে শুনেছে। বুঝতে বাকি নেই ওদের পড়াশোনাতে আবির ভাইয়ের অবদান অনেকখানি। তবে সেই ছেলেগুলোর কি হয়েছিল তা শুনার বেশ আগ্রহ জাগছে মেঘের মনে। আবির কিছুটা এগিয়ে এসে মেঘের মুখোমুখি দাঁড়ালো। ছোট করে শুধালো,
“ক্লাস শেষ?”
আবিরের কন্ঠে মেঘ হকচকিয়ে তাকাল, মনোযোগ ছিল অন্য কোথাও। উপর নিচ মাথা নেড়ে বলল,
“শেষ৷ কিন্তু আপনি এখানে কেন?”
মেঘ সব কথা শুনেও না শোনার মতো প্রশ্ন টা করেছে। আবির চোখের ইশারায় ছেলেগুলোকে দেখিয়ে বলল,
“ওদের সঙ্গে দেখা করতে আসছিলাম।”
ছেলেগুলো এগিয়ে গেছে, আবিরকে না পেয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই মেঘকে দেখল। দু কদম এগিয়ে এসে বলল, “ওনাকেই দেখেছিলাম তোমার সাথে। ওনি কে ভাইয়া? তোমার..”
আবির তার আগেই বলল,
“আমার কাজিন। তোরা যা আমি আসছি। ”
ছেলেগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। আবির মেঘকে উদ্দেশ্য করে গলায় তেজ এনে বলল,
“আড্ডা দেয়া শেষ হলে বাসায় যা। গাড়ি অপেক্ষা করছে।”
মিনহাজ আর তামিমকে দেখেও না দেখার মতো করে চলে যাচ্ছে। মেঘ পিছন থেকে ডেকে বলল,
” আমি আপনার সঙ্গে যাব। ”
অনেকদিন হলো আবিরের বাইকে ওঠে না। রাগারাগি, মান অভিমানে ঠিকমতো কথায় বলে নি বাইকে উঠা তো দূরের বিষয়। আজ মেঘের খুব ইচ্ছে করছে আবির ভাইয়ের সাথে বাইকে ঘুরবে। তাছাড়া ফুপ্পির জন্যও মনটা ছটফট করতেছে। সে প্ল্যান করেছে ফুপ্পিকে দেখে একেবারে বাসায় ফিরবে। আবির দু আঙুলে ইশারা দিতেই মেঘ আবিরের কাছে এগিয়ে গেল।
আবির প্রখর তপ্ত স্বরে বলল,
“আমি না আসলে কি করতি?”
মিনহাজ আর তামিমের প্রতি ক্রোধ চেপে রাখতে পারছে না । ওদের দিকে তাকালেই অঘটন ঘটতে পারে তাই তাকাচ্ছে না।
মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিল,
“আপনি না আসলে গাড়িতে যেতাম। আপনি এসেছেন তাই বাইকে যাব।”
“আমি তোকে নিতে আসি নি। অন্য কাজে আসছি ”
মেঘ জেদ দেখিয়ে বলল,
“আমি এতকিছু জানি না। আপনি আমায় নিয়ে যাবেন এটায় শেষ কথা। ”
মেঘের জেদের কাছে আবিরের সুপ্ত ক্রোধ হার মানতে বাধ্য হয়েছে। আবির ক্ষীণ হাসলো। মেঘ জেদ দেখিয়ে কথা বললে, ওর নাক ফোলে যায়, গাল দুটা লাল টকটকে হয়ে যায়। দুধে আলতা চেহারায় রক্ত বর্ণের ছাপ ভেসে ওঠে, গলার দুপাশের দুটা রগ ফুলে ওঠে । মেঘকে এভাবে দেখলে আবিরের উদ্বেলিত হৃদয়ের কম্পন তীব্র হয়ে ওঠে। কল্পনার জগতে পাড়ি দিতে ইচ্ছে করে। রক্তাভ দুগালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বরাবরের মতোই সে অসহায়। নিজের অনুভূতি লুকাতে হয় প্রতিবার। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।”
“ব্যাপার না। অপেক্ষা করবো,
বিড়বিড় করে বলল, সারাজীবন”
আবির দু কদম এগিয়ে পিছন ফিরে আবার তাকালো। কিন্তু কিছু বললো না। এখানে তামিম, মিনহাজ আছে যাদের সহ্য হয় না। আবার মেঘকে নিয়ে ভেতরে যাবে সেখানেও প্রায় ২০-৩০ টা ছেলে আছে। কে কোন নজরে মেঘকে দেখবে এই চিন্তায় মেঘকে কিছু বলল না।
আবির চলে যেতেই বন্যা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে মিনহাজ আর তামিমের দিকে তাকালো। মিনহাজ আর তামিম দুজনেই স্তব্ধ হয়ে আছে। চোখের সামনে এতক্ষণ যা ঘটলো কিছুই বিশ্বাসযোগ্য না। নিজের চোখ, নিজের কান কোনোকিছুকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। কোথায় ভেবেছিল ভার্সিটির নেতাদের ক্ষমতা দেখিয়ে মেঘদের সামনে একটু ভাব নিয়ে চলবে। বড়সড় একটা বাঁশ খেলো। খেলো তো খেলো একদম মেঘদের সামনে। মেয়েরা মুখে প্রকাশ করুক বা না করুক, বেশিরভাগ মেয়েরায় দাপটি ছেলেদের পছন্দ করে। কেউ কিছু বললে ছেলেটা যেন মুখ লুকিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান না নেয়। মেয়েটার সম্মান বাঁচাতে ছেলেটা যেন প্রতিবাদ করতে পারে। প্রতিনিয়ত আবিরের এত প্রশংসা শুনে মিনহাজ ও ভেবেছিল রাজনীতি করবে, নেতাদের পরিচিতি লাভ করে মেঘের মন জয় করে নিবে। কিন্তু আবির ক্ষণে ক্ষণে তার সব প্ল্যান ভেস্তে দিচ্ছে।
বন্যা ওদের অসহায় মুখের পানে চেয়ে থেকে হঠাৎ ই হাসি শুরু করেছে। হাসতে হাসতে মেঘের উপর হেলে পড়ছে। বন্যার স্বতঃস্ফূর্ত হাসি দেখে মেঘও হাসলো। বন্যা কেন হাসছে এটা কারোর ই অজানা নয়। ২ মিনিট, ৫ মিনিট, ১০ মিনিট হয়ে গেছে বন্যা হেসেই যাচ্ছে। হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা হয়ে গেছে তবুও বন্যার হাসি থামছে না।। মিনহাজ সহ্য করতে না পেরে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“হইছে বইন থাম। এর বেশি হাসলে ম*ইরা যাইবি। ”
বন্যা হাসতে হাসতে বলল,
“তোর শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক বড় ভাইদের আমার সালাম দিস। সালামের পরে বলিস, তুই যে আবির ভাইয়াকে মা*রার হুমকি দিয়েছিস। আবির ভাইয়ার প্রতি তাদের যেই ভালোবাসা দেখলাম, আশা করি তারাই তোকে যোগ্য সম্মানী দিয়ে দিবে। ”
মিনহাজ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আমি হুম*কি দিলাম কখন?”
“তোর ভাই ব্রাদার্সের পাওয়ার দেখাবি বলছিলি, মনে নেই? এত মন ভুলা তুই?”
“আচ্ছা বাদ দে।”
“এখন বাদ দিচ্ছি। কিন্তু ভবিষ্যতে এসব আকাশচুম্বী কথাবার্তা বললে তোর শ্রদ্ধেয় ভাইদের বলে দিব।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। ”
মেঘ এতক্ষণ যাবৎ ই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। ইদানীং নিজের সাহস দেখে মাঝে মাঝে নিজেই অবাক হয়ে যায়। আবির ভাইয়ের মুখের উপর জেদ দেখালো, যদি আবির ভাই ভার্সিটির সবার সামনে থা*প্পড় মা*রতো, তবে কি হতো! ভাবতেই ভয়ে কেঁপে উঠছে। সবার সামনে থা*প্পড় খেলে মুখ দেখানোর অবস্থা থাকত না। আবির কিছুক্ষণের মধ্যেই বেড়িয়ে আসছে মেঘ বাসায় চলে গেলে হয়তো বেশিক্ষণ আড্ডা দিত কিন্তু মেঘকে বাহিরে রেখে গেছে তাই মাথায় চিন্তা কাজ করছে৷ এজন্য তাড়াতাড়ি চলে আসছে। মেঘকে ডাকতেই মেঘ এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আংকেল কি চলে গেছেন?”
“হ্যাঁ৷ তুই না বললি বাইকে যাবি! তাই তো আংকেলকে চলে যেতে বলছি । কেন?”
“আপনার তো অফিস আছে। আমায় নিয়ে গেলে সময় নষ্ট হবে তাই বলছিলাম আমি গাড়িতে চলে যেতাম।”
“এটা আগে মনে হয় নি? তোর ভাইয়ের মতো রাগ উঠলে তোরও মাথা ঠিক থাকে না। তখন কিছু বুঝার অবস্থাতেও থাকিস না। ব্যাপার না, চল। ”
“আমি রিক্সা দিয়ে বাসায় চলে যায়?”
“মেজাজ খারাপ করিস না। চল বলছি।”
মেঘ ভয়ে ভয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ফুপ্পির বাসায় নিয়ে যাবে না আগেই বলছে এখন আবার ফুপ্পির কথা বললে নিশ্চিত মা-ইর খাবে। আবির একটা রিক্সা ঠিক করে বন্যাকে যাওয়ার জন্য ইশারা করল। তারপর মেঘকে নিয়ে চলে গেছে। বাইক চলছে, মেঘ স্ট্যাচুর মত বসে আছে। কোনো কথা বলছে না। আবির স্ট্রিট ফুড দেখে কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে খাবে কি না। মেঘ শুধু না করেই যাচ্ছে। অবশেষে একটা ফুচকার দোকান দেখে বাইক থামালো। আবির শীতল কন্ঠে বলল,
“মাথাটা বোধহয় এখনও ঠান্ডা হয় নি। ফুচকা খেলে নিশ্চয় মাথাটা ঠান্ডা হবে।”
মেঘ মাথা নিচু করে বলল,
“আমি ফুচকা খাব না।”
“আমি মনে হয় ভুল শুনলাম”
মেঘ ঠান্ডা অথচ শক্ত কন্ঠে বলল,
“আপনি ঠিকই শুনেছেন। আমি ফুচকা খাব না।”
আবির হেসে বলল তাকা আমার দিকে, মেঘ ধীর গতিতে চোখ তুললো। তাকালো আবিরের চোখের দিকে,আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,
“ম্যাম,আপনি সত্যি সত্যি ফুচকা খাবেন না?”
আবিরের হাবভাব দেখে মেঘ না চাইতেও হেসে ফেলল। সে আবিরের ভয়ে ফুচকা খাবে না বলছিল, কিন্তু আবির তাকে বার বার উস্কাচ্ছে। মেঘ আবিরের মুখের পানে চেয়ে মনে মনে ভাবছে,
” আপনার মধ্যে কি এমন স্পেশাল গুণ আছে যা ক্ষনিকের ব্যবধানে রাগকে ভয়ে আবার ভয়কে জয়ে পরিণত করতে সক্ষম।”
আবির ভ্রু নাচাতেই মেঘ মৃদু হাসলো। ফুচকা অর্ডার দিয়ে বসে আছে। আবির মেঘকে দেখছে আবার আশেপাশে তাকাচ্ছে। আবির হঠাৎ ই মুচকি হেসে বলল,
“তোকে আজ অনেক বেশি কিউট লাগছে”
মেঘ চোখ গোলগোল করে তাকালো। গলায় শ্বাস আঁটকে গেছে। ঠিক শুনছে নাকি ভুল! আবির ভাই মেঘকে কিউট বলেছে। ভাবা যায়! মেঘ লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে তবুও স্বাভাবিক থাকার খুব চেষ্টা করছে। আবির পুনরায় বলল,
“নীল রঙটা তোকে খুব মানাচ্ছে৷ আগে বোধহয় কখনো নীল রঙের জামাতে দেখি নি।”
মেঘ এবার আরও বেশি লজ্জা পেয়েছে। চোখ দ্বিগুণ নামিয়ে নিয়েছে। আবির স্থির দৃষ্টিতে মেঘকে দেখছে৷ পলক ও ফেলছে না। তা বুঝতে পেরে মেঘ আরও তাকাতে পারছে না। গাল আর নাকের ডগা আবারও লাল হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে লাল রঙের ব্লাশ লাগিয়েছে। মেঘ ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে, সামান্য কিউট বলাতে যে কেউ এত লজ্জা পেতে পারে, এটা মেঘকে না দেখলে বুঝায় যেত না। মেঘ বার বার নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে কিন্তু চোখ তুলতেই পারছে না। ওষ্ঠদ্বয় কাঁপছে তিরতির করে। মেঘের অবস্থা বুঝতে পেরে আবির দৃষ্টি স্বাভাবিক করে পুনরায় বলল,
“ফুপ্পিকে দেখতে যাবি?”
মেঘ এবার আশ্চর্য নয়নে তাকালো। তার মনের কথা আবির ভাই কিভাবে বুঝলো। মেঘের লজ্জায় রাঙা মুখ দেখে আবির ঢোক গিলল। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মনে মনে বলল,
” উফফফফ, আমার শান্ত মনটাকে উল্টেপাল্টে দিতে তোর লজ্জায় লালিত মুখটায় যথেষ্ট। তোকে এভাবে দেখলে বউ বউ ফিল পাই। কবে তোকে আমার করে পাবো? অপেক্ষার প্রহর যে ফুরায় না। ”
মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
“আপনি কিভাবে বুঝলেন আমি ফুপ্পির সাথে দেখা করতে চাই?”
“তুই ই তো বলছিলি।”
“আমি সেই কবে বলছিলাম।তা কি এখনও মনে আছে?”
“তুই কবে কি বলিস সবই আমার মাথায় থাকে। শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকি।”
“সবার কথায় আপনার মাথায় থাকে?”
“সবার কথা মানে?”
“যে যা বলে সবকিছু মনে থাকে?”
“না প্রয়োজনের বাহিরে সবকিছুই ভুলে যায়”
মেঘ হুট করে বলে উঠল,
“আপনার গার্লফ্রেন্ড কয়টা?”
মেঘের এমন প্রশ্নে আবির হকচকিয়ে উঠলো। থতমত খেয়ে বলল,
“মানে?”
“গার্লফ্রেন্ড চিনেন না? মেয়ে বন্ধু বা প্রেমিকা। ”
“তা বুঝলাম। কিন্তু হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?”
“শুনলাম কলেজের সব মেয়ের ক্রাশ ছিলেন। তাই আর কি”
আবির নিঃশব্দে হাসলো। মেঘের মনে হিংসা কাজ করছে এটা আবির বেশ বুঝতে পারছে। আবির জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“আছে হাজার খানেক”
মেঘ চেঁচিয়ে উঠল,
“What!”
আবির দু’হাতে ইশারা দিয়ে বলল,
“Cool”
“ফাজলামো করেন আমার সাথে? সত্যি করে বলুন কয়জন? ”
“না বলা যাবে না। তুই সবাইকে বলে দিবি।”
“সত্যি বলব না।বলুন”
“গার্লফ্রেন্ড নেই তবে একটা গোলাপি কালার বউ আছে। ”
মেঘ ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো। ভ্রু কুঁচকে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
” থাকেন আপনার গোলাপি কালার বউ নিয়ে। দরকার হলে লাল, নীল, হলুদ বউ নিয়ে থাকুন। ”
মেঘ উঠতে নিলে আবির মেঘের হাত চেপে ধরে বসালো। তপ্ত স্বরে বলল,
“আমার লাল, নীলের প্রয়োজন নেই। গোলাপিটায় যথেষ্ট।”
“ফাইজলামি বন্ধ করুন। মেজাজ খারাপ হচ্ছে”
“কি আমার মেজাজ গো, তাও আবার একটু পর পর খারাপ হয়। আচ্ছা ঠিক আছে বন্ধ করলাম। তুই ও আমায় এমন প্রশ্ন আর করবি না। ”
“করলাম না এমন প্রশ্ন। ”
ফুচকা খেয়ে শেষ করে আবিরের সঙ্গে ফুপ্পির বাসায় আসছে। ফুপ্পি মেঘকে দেখে ভীষণ খুশি হয়েছেন। সেই সঙ্গে বাসার সকলেই খুশি হয়েছে। আবির মেঘকে দূরে সরিয়ে রাখে বলে আবিরকে সবাই সবসময় বকা দেয়। ফুপ্পি তো বকেন, উল্টাপাল্টা কথা বললে মাঝে মাঝে গাট্টাও দেন৷ মেঘ ফুপ্পিকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিয়ছে। মেঘের কান্না দেখে ফুপ্পিও কাদঁছেন। মেয়ে মানুষের মায়া একটু বেশিই থাকে। ফুপ্পির কথা মেঘ যেদিন শুনেছে তার পর থেকে প্রতিরাতেই ফু্প্পির কথা মনে করে মন খারাপ করে, কখনও কখনও কান্নাও করে। মাঝে মাঝে ভাবে আব্বু, বড় আব্বু রাতে কিভাবে ঘুমান! ওনাদের কি বোনের কথা মনে হয় না?
মেঘদের কান্না দেখে আবির ভারী কন্ঠে বলল,
” তোমাদের চোখের পানিতেই দুদিন পর পর রাস্তাঘাটে পানি জমে যায়। কান্নাকাটি করো বলেই মেঘকে নিয়ে আসি না। আজকেও যদি কাঁদো তাহলে আর কখনেই নিয়ে আসব না।”
দুজনের কান্নায় কমে এসেছে। আইরিন মজার ছলে বলল,
“ওদের কান্নায় যদি রাস্তায় পানি ওঠে, তোমার কান্নার কারণে নিশ্চয় বাংলাদেশে বন্যা হয়”
আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“হ্যাঁ। সামনের বন্যায় তোকে ভাসাইয়া দিব নে।”
“ইহহ। আমি সাঁতার পারি।”
“তাহলে তো আরও ভালো। সাঁতার কেটে শ্বশুর বাড়িতে যাবি আবার বাপের বাড়িতে আসবি।”
“কিসের শ্বশুর বাড়ি, কার শ্বশুর বাড়ি?”
আবির ফুপ্পিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ফুপ্পি তোমার মেয়ের জন্য ছেলে দেখা শুরু করছি।এই বর্ষার আগেই বিয়ে দিয়ে দিব।”
আইরিন আর্তনাদ করে উঠে,
“নাহ, কিসের বিয়ে? নিজের বিয়ের খবর নাই আমার পিছনে লাগছো! তুমি আগে বিয়ে করো। ”
আবির ঠাট্টার স্বরে বলল,
“আমি খবর পাইছি তুই জান্নাতকে খুব জ্বালাস। আমার বউকে জ্বালাবি না তার কি গ্যারেন্টি আছে? এজন্য তোকে বিয়ে দিয়ে তারপর ই বিয়ে করব।”
আইরিন জান্নাতকে জিজ্ঞেস করল,
“ভাবি সত্যি করে বলো, আমি তোমাকে জ্বালায়?”
জান্নাত এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে, হেসে উত্তর দিল,
“কখনোই না।”
আইরিন মেঘকে শুধালো,
“মেঘ আপু আমি কি তোমাকে জ্বালায়? ”
আবির মাথা নিচু করে জ্বিভে কামড় দিয়ে বসে আছে। এই মেয়েটা নিশ্চিত ফাঁসাবে।
মেঘ স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিল,
“কই না তো। তুমি তো অনেক লক্ষ্মী মেয়ে”
এবার আইরিন আবিরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
“দেখছো আমি কাউকেই জ্বালায় না।”
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আবির বলল,
“সেসব পরে দেখা যাবে। ফুপ্পি খুব খুদা লাগছে। দুপুরে খায় নি৷ খেতে দাও ”
জান্নাত বলল,
“আপনারা ফ্রেশ হোন। আমি এখনি খাবার দিচ্ছি।”
১-২ ঘন্টা গল্প করে মেঘকে নিয়ে বাসায় ফিরছে । রাস্তায় যেতে যেতে মেঘ হঠাৎ ই আবিরকে ডাকল,
” আবির ভাই”
“হুমমমমম ”
“আমাদের ভার্সিটির ছেলেগুলো কি আপনার কলেজের? ”
“হ্যাঁ। এক ব্যাচ জুনিয়র ছিল ”
“ওরা আপনার এত প্রশংসা করছিল কেন। আপনি কি করছিলেন?”
“তুই কি সব শুনে ফেলছিস?”
“জ্বি”
“কলেজে থাকাকালীন একটু ঝামেলা হয়ছিল তখন স্যারদের কে রিকুয়েষ্ট করছিলাম। এই আর কি।”
“কি ঝামেলা সেটায় তো জানতে চাচ্ছি!”
“জানতেই হবে?”
“জ্বি”
“ওরা কলেজে ভর্তির পর কিছুদিন নিয়মকানুন মেনে চলছে, রেজাল্ট ও ভালো করছিল কিন্তু ৬ মাস পর থেকে কোথাকার কোন ছেলেদের সঙ্গে মিশে নে*শা করে একেকটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছিলো। পড়াশোনার অবস্থা নেই, নিয়ম মানে না, স্যারদের সাথে উগ্র আচরণ,পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ করছে। সব মিলিয়ে স্যাররা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সবকটার বাবা মাকে এনে অপমান করে কলেজ থেকে বহিষ্কার করে দিবে। আমি কয়েকজনের মাধ্যমে জানতে পারছি, ২-৩ জন বাদে সবগুলোর পারিবারিক অবস্থা খুব খারাপ। বাবা- মা অনেক কষ্ট করে টাকা ইনকাম করে ঢাকা শহরে ছেলেকে পড়াতে পাঠাইছে। আর এগুলো সঙ্গ দোষে নিজের জীবন ধ্বংস করছে। জানার পর নিজেরই কষ্ট লাগতেছিল। তারপর ওদের সঙ্গে কিছুদিন বসেছি। ওদের সবার গল্প শুনেছি, বুঝিয়েছি। তখন আমার ক্ষুদ্র মাথায় যা মনে হয়েছিল তাই করেছি আর কি । যখন দেখলাম ওরা আমার কথা একটু একটু মানতে শুরু করেছে তখন স্যারদের রিকুয়েষ্ট করলাম যেন পরবর্তী পরীক্ষা পর্যন্ত ওদের সময় দেয়। স্যারদের খুব আদরের স্টুডেন্ট ছিলাম বলে হয়তো স্যাররা মেনে নিয়েছেন৷ ৩য় সেমিস্টারে মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করেছে। তারপর আমিও চলে গেছি ওদেরও খবর নেয়া হয় নি। ”
“বাহ!”
“কি?”
“আপনি খুব ভালো”
“ধন্যবাদ ম্যাম।”
আবির মেঘকে বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে আবারও অফিসে চলে গেছে।
আজ ৭ ফেব্রুয়ারি। ভার্সিটিতে যেতেই নজর পরে অনেকেই গোলাপ হাতে ঘুরছে৷ কেউ কেউ বন্ধুদের দিচ্ছে, আবার বান্ধবীকে দিচ্ছে। মেঘ, বন্যা এসব ডে কখনো পালন করে না। মনেও থাকে না কবে কি ডে। হঠাৎ মিনহাজ একটা গোলাপ এনে মেঘকে দিয়ে বলল,
“Happy Rose Day”
বন্যার দিকে তাকিয়ে বলল,
“একটায় ফুল পাইছি রে৷ না হয় তোকেও দিতাম। এখন তোর বেবিকেই দেই। ”
মেঘ আশেপাশে তাকালো। হঠাৎ ই মাথায় ভূত চেপেছে। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“আমি তোর থেকে গোলাপ নিব না, শুধু আবির ভাইয়ের থেকে নিব। বন্যাকে দিয়ে দে”
মিনহাজ বন্যাকে দিল, কিন্তু বন্যাও নেয় নি। বরং উল্টো বলল,”তোদের থেকে ফুল নিতেও ভয় করে৷ কার মনে কি চলে তোরাই জানস”
মেঘ আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসছে। ছাদ থেকে একটা লাল টকটকে গোলাপ এনে, সাথে একটা চিরকুট লিখে আবিরের রুমে রেখে আসছে।
আবির সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরে দেখল টেবিলের গোলাপ আর চিরকুট রাখা। এগিয়ে গেল টেবিলের কাছে। চিরকুট হাতে নিতেই দেখল,
চিরকুটে লেখা,
“আপনি মানুষটা রক্তিম গোলাপের মতন,
যার কাঁটার আঘাতে শতশত বার ক্ষতবিক্ষত হয়েও, তার মুগ্ধতার পিছনেই ছুটছি।”
Happy Rose Day Abir Vai
আবির ফুলটা হাতে নিয়ে আলতোভাবে ঠোঁট ছোঁয়ালো। মুচকি হেসে বলল,
” আমার জীবনেও তুই রক্তিম গোলাপের মতন,
যাকে দেখলেই হৃদয়ে তোলপাড় চলে, প্রেমানুভূতি জেগে উঠে বার বার। খুব ইচ্ছে করে, গোলাপের প্রতিটা পাপড়ির ভাঁজে তোর আমার প্রণয়ের নিশান এঁকে দেয়। ফুলের রানী গোলাপের মতো তোকেও আবিরের মহারানী বানিয়ে রাখি৷ ”
(চলবে)