#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৫২
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_
আবিরের বেসামাল অবস্থা দেখে তানভির মৃদু হেসে ঠাট্টার স্বরে মেঘকে বলল,
” ভয় পাইস না, ভাইয়ার মনে আরশোলা কামড় দিছে এজন্য অস্থির লাগছে সবকিছু। ঠিক হতে একটু সময় লাগবে।”
মীম আর আদি দু’জনে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো,
“গাড়িতে আরশোলা আছে? কই আরশোলা, আল্লাহ বাঁচাও!”
ওদের নাচানাচিতে তানভির গাড়ি সাইড করে পেছন ফিরে তাকালো। তেজঃপূর্ণ গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
” আমি কি একবারও বলছি গাড়িতে আরশোলা আছে?”
আদি আর্তনাদ করে বলল,
“তুমি না বললা, ভাইয়াকে আরশোলা কামড় দিছে!”
তানভির উদাস ভঙ্গিতে বলল,
“ভাইয়াকে কখন, কোথায় আরশোলা কামড়াইছে কে জানে। তোরা চুপচাপ বস। গাড়িতে আরশোলা নেই তারপরও লাফালাফি করলে আরশোলার বাড়িতে ফেলে দিয়ে আসবো। ”
আবির তখনও চোখ বন্ধ করেই বসে ছিল।তানভির এবার আবিরের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বিড়বিড় করে শুধালো,
“ভাইয়া, ব্যথা কি বেশিই লাগছে? হাসপাতালে নিতে হবে?”
আবির সহসা চোখ খুললো। আড়চোখে তানভিরের দিকে তাকালো। কিন্তু কোনো রিয়াকশন দেখালো না। তানভির তখনও হেসেই যাচ্ছে। তানভির পুনরায় ডাকল,
আবির শুধু ভ্রু নাচালো। তানভির ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে বলল,
” চোখ বন্ধ করে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ো। আর বলো,
‘All is well’ দেখবা একটু শান্তি লাগছে। ”
আবির ভ্রু গুটিয়ে তাকালো, তানভিরের হাসি দেখে আবিরও খানিক হাসলো। তারপর তপ্ত স্বরে বলল,
“মজা নিচ্ছিস?”
তানভির স্ব শব্দে হেসে উত্তর দিল,
“একদম ই না।”
আবির ভারী কন্ঠে বলল,
“দিন আমারও আসবে। তখন বুঝাবো কত ধানে কত চাল। চুপচাপ গাড়ি স্টার্ট দে”
তানভিরও আর কিছু বললো না। ঠোঁটের কোণে হাসি রেখেই গাড়ি স্টার্ট দিল। মাইশা আপুর বিয়েতে মেঘকে শাড়ি পড়া দেখে আবির সারারাত ঘুমাতে পারে নি। সাকিব তানভির কে সবই বলেছে। তখনকার অবস্থা তানভির স্বচক্ষে না দেখতে পারলেও এখনের অবস্থা ঠিকই দেখতে পারছে। গাড়িতে এসি চলছে তারপরও আবির ঘামছে। স্থির থাকতে পারছে না, একবার টিস্যু দিয়ে চোখ- মুখ মুছছে, সানগ্লাস খুলে সামনে রাখছে আবার চোখে দিচ্ছে , এই ফোন বের করছে আবার পানি খাচ্ছে।
বুকের বা পাশে অবস্থিত হৃদপিণ্ডটা অবিরত কাঁপছে। কথায় আছে শাড়িতেই নারী৷ যে অষ্টাদশী জামা পরে পিচ্চি মেয়ের মতো সারা বাড়ি ছুটাছুটি করতো সে আজ শাড়ি পড়ে পরিপূর্ণ নারী রূপে আবিরের সামনে আসছে৷ মায়াবিনী তো জানে না, তার মায়ার জালে আবিরের মনটা বন্দি হয়ে আছে বহুবছর ধরে। নারীরূপী মায়াবিনীকে অনন্তকাল দেখার স্বাদ জাগছে আবিরের অন্তরে। ইচ্ছে তো অনেক কিছুই করছে, মায়াবিনীর দুগাল স্পর্শ করে চোখে চোখ রেখে মায়াবিনীর সমুদ্রের ন্যায় গভীর দুচোখে চিরকালের জন্য ডুবে যেতে। কপালে আলতোভাবে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াতে, হৃদয়ে জমানো নিবরধি ভালোবাসার একখণ্ডে মায়াবিনীর উদ্বেলিত মনটাকে শান্ত করতে। মায়াবিনীর চোখে চোখ রেখে সাত সমুদ্র পাড়ি দিতে, নীল আকাশ, অগণিত পাখি আর সমুদ্রের সুবিশাল জলরাশিকে সাক্ষী রেখে বলতে,
“আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে।”
আবির সিটের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছে। দৃষ্টি তার গাড়ির মিররে। পেছনের সিটে বসা অষ্টাদশীকে আপনমনে দেখেই চলেছে। হঠাৎ ই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির ঝলক দেখা গেল। কেন হাসলো কে জানে।এদিকে মেঘ শাড়ি ঠিক করায় ব্যস্ত। প্রথমবার এভাবে শাড়ি পরেছে, বার বার মনে হচ্ছে এদিকে ওদিকে খুলে যাচ্ছে তাই সেসব চেক করায় ব্যস্ত। স্বাভাবিক হয়ে বসতেই মিররে চোখ পড়ে, আবিরের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিয়েছে। সহসা মেঘ ভ্রু কুচকায়, এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেছে সবকিছু। মাথাভর্তি হাজারও ভাবনার মধ্যে একটা ভাবনা হৃদয়ে আঘাত করে,
“আবির ভাই কি আমায় দেখছেন?”
মেঘ সঙ্গে সঙ্গে আবারও মিররে তাকায়। ততক্ষণে আবির চোখে সানগ্লাস পড়ে ফেলছে তা দেখে মেঘের কুঁচকানো ভ্রুযুগল আরও কুঁচকে আসে, সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে থাকে বেশখানিকক্ষণ। মনে মনে ভাবছে,
“ঐ একজোড়া চোখ কি আমায় দেখে থমকে গিয়েছিল? শুধু কি দৃষ্টিই আঁটকে গেছিল নাকি দৃষ্টির সঙ্গে অন্তরতম অঁচলও? ”
ভাবতেই মেঘের ওষ্ঠদ্বয় প্রশস্ত হলো। হৃদয়ে জমানো অনূভুতিরা চোখে উপচে পড়ছে। আবির ভাই তাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছে ভেবেই মেঘের মন প্রজাপতির মতো উঁড়ে বেড়াচ্ছে। মেঘ নিজেকে আওড়ালো,
“ওনার কোমলপ্রাণ চাহনি কি কিছু বলতে চাইছিল? তবে কি আবির ভাইয়ের মনেও আমার জন্য অনুভূতি জন্মাচ্ছে?”
বাকিটা পথ মেঘ আবিরের চিন্তাতেই মগ্ন থেকেছে। শ্যামবর্ণের এক পুরুষের প্রেমে মেঘ মাতোয়ারা হয়ে গেছে। আবিরের যত্ন, রাগ, তীব্র অধিকারবোধ, স্নিগ্ধতা মিশ্রিত চাহনি অষ্টাদশীর মনেরপাড়ায় বারংবার বিপর্যয় ঘটায়। মেঘের প্রাণোচ্ছল জীবনে আবিরের আবির্ভাব টা ঠিক যেন ধূমকেতুর মতো। কয়েকমাসেই অষ্টাদশীর কোমল মন আবির ভাইকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। মেঘের জীবনে বাবা আর ভাইয়ের পর আবির ই একমাত্র ছেলে যার সংস্পর্শে নিজেকে নিরাপদ মনে হয়। যার দৃষ্টি, স্পর্শ কোথাও অশ্লীলতার ছোঁয়া অনুভব করে নি। তারজন্যই বোধহয় আবির খুব দ্রুত অষ্টাদশীর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। সেই থেকে অষ্টাদশীর মস্তিস্কজোরে আবিরের সঙ্গ পাওয়ার অদম্য প্রয়াস সর্বক্ষণ বিচরণ করে। আচমকা গাড়ি থামানোতে মেঘের সুদীর্ঘ ভাবনার অবসান ঘটে। চিরিয়াখানা দেখেই আদি সবার আগে গাড়ি থেকে নেমে পরে।ইকবাল খান আগেও কয়েকবার মেঘদের নিয়ে চিরিয়াখানায় এসেছিলো। তাই আদির এই জায়গা খুব পরিচিত। চিরিয়াখানায় ঘুরতে ঘুরতে আদির খুদা লেগে গেছে৷ আদির সঙ্গে মীমও জানালো, তারও খুদা লাগছে। কিন্তু মেঘের সেসবে মনোযোগ নেই৷ তার মন মস্তিষ্ক জুড়ে শুধুই আবির ভাই ঘুরপাক খাচ্ছে। এরমধ্যে বেশ কয়েকবার চোখাচোখি হয়েছে দুজনের। মেঘের আগে আবিরই চোখ নামিয়ে নেয়৷ চিরিয়াখানা থেকে বের হতেই তানভির ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“ভাইয়া, তুমি বনুকে নিয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাও আমি সবার জন্য খাবার নিয়ে আসছি।”
মীম আর আদিও তানভিরের কাছেই রয়ে গেছে। আবির দুটা টিকেট কেটে মেঘকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। এ যেন গাছের সাম্রাজ্যে ঢুকে পরেছে। চারপাশে শুধু সবুজ আর সবুজ। প্রায় ৮৪ হেক্টর জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই উদ্ভিদের সাম্রাজ্য। মেঘ আবিরের পিছুপিছু হাঁটছে আর চারপাশের পরিবেশ দেখছে। হঠাৎ কি মনে করে মেঘ হাঁটার গতি বাড়িয়ে আবিরের পাশাপাশি এগিয়ে গেল।৷ আবিরের সাথে তাল মেলানোর চেষ্টা করছে। আবির যেখানে পা ফেলছে, সমান দূরত্বে মেঘও পা রাখার চেষ্টা করছে। আবিরের হাঁটার গতি বেশি হওয়ায় মেঘ শাড়ি পড়ে ঠিক কুলাতে পারছিল না। আবির আড়চোখে চেয়ে মেঘের পাগলামি দেখে মুচকি হাসলো। পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে হাঁটার গতি কমিয়ে আনলো। দুইজোড়া পা এখন সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবিতে আবির,তার সঙ্গে বাসন্তী রঙের শাড়িতে মেঘকে বেশ মানিয়েছে৷ লম্বাটে আবিরের পাশে মেঘকে আজ খুব একটা পিচ্চি লাগছে না। শাড়ি সঙ্গে হিল জুতাতে বেশ বড়ই লাগছে মেঘকে।
তানভির কল দেয়ায় আবিরের গতি কিছুটা কমে গেছে। মেঘ সামনে চলে গেছে। পাশ দিয়েই ৩-৪ টা ছেলে যাচ্ছিলো তাদের মধ্যে একজন ঠাট্টার স্বরে বলে উঠল,
“কিরে মামা! আজকাল পরীরা আসমান থেকে নেমে বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঘুরতে আসতাছে নাকি?”
দ্বিতীয় জন বলল,
“হ রে মামা, আমারও তাই মনে হচ্ছে। চুলগুলো দেখছিস? জোস না?”
“আসলেই জোস। এমন একটা মেয়ে যদি আমার গার্লফ্রেন্ড হতো”
আচমকা ছেলেগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। মেঘ আবিরের দিকে তাকাতেই দেখলো আবির ফোন চাপছে। মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও ছেলেগুলোর দিকে তাকালো৷ ততক্ষণে ছেলেগুলো মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে৷ মেঘ আবিরের অভিমুখে চেয়ে আছে।
আবির ফোন থেকে চোখ তুলতেই মেঘের চোখে চোখ পরে। আবির ভ্রু নাচাতেই মেঘ কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“আপনি ছেলেগুলোকে কিছুই বললেন না কেন?”
” আজ কিছু বলার মুড নেই।”
মেঘ উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“এত পরিবর্তন কিভাবে সম্ভব? ”
আবির ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসলো। মৃদুস্বরে বলল,
” ফাল্গুনের প্রথম দিন আমি আমাকে সময় দিতে এসেছি। এসব ছেলেদের সাথে কথা বাড়িয়ে নিজের অবস্থান নষ্ট করতে চাই না ”
“তাই বলে কিছুই বললেন না?”
“তুই কি চাস এখন ছেলেগুলোকে ধরে পি*টায়? তাহলে তোর শান্তি লাগব?”
মেঘ গাল ফুলিয়ে বলল,
“জানি না”
মেঘের মনে অভিমান জমেছে। একদিন এক ছেলে মেঘের হাত ধরেছিল বলে আবির অফিস থেকে এসে মাঝরাস্তায় ছেলেটাকে মে*রেছিল। আর আজ ছেলেগুলো বাজে কমেন্টস করেছে তাতেও আবির কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। মেঘের মনে আবারও দুশ্চিন্তা ঢুকে গেছে। আবির ভাইয়ের এই পরিবর্তন মানতে পারছে না মেঘ। ছেলেগুলোকে একটা ধমক দিলেও মেঘ মানসিক শান্তি পেতো। আবিরের পিছুপিছু হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূর চলে গেছে। অকস্মাৎ মেঘের নজর পরে সামনে গাছের নিচে একটা কাপল বসে আছে৷ মেঘ আবিরের মনোভাব বুঝার জন্য ঐদিকে দেখিয়ে বলল,
” জায়গাটা অনেক সুন্দর, তাই না?”
মেঘের দৃষ্টি অনুসরণ করে আবিরও সেদিকে তাকিয়েছে। কাপল টা কে দেখে আড়চোখে মেঘের দিকে তাকালো, মেঘ খুব মনোযোগ সহকারে কাপলটাকে দেখছে। আবির গলা খাঁকারি দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“হ্যাঁ, অনেক সুন্দর। ”
মেঘ একটু ভারী কন্ঠে বলল,
“ঐদিকে না, এদিকে দেখতে বলছি। ”
মেঘ ইন্ডাইরেক্টলি আবিরকে কাপল টাকে দেখতে বলছে। আবির বুঝেও না বুঝার মতো ভান করছে আর মিটিমিটি হাসছে। আবির এবার কাপলটার দিকে তাকালো৷ খানিক বাদে প্রশ্ন করল,
“তুই তো বোটানির স্টুডেন্ট। ওরা যে গাছটার নিচে বসে আছে ঐ গাছটার বৈজ্ঞানিক নাম কি বল? ”
মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছে। এ কেমন মানুষ, বুঝাচ্ছে কি আর ব্যাটায় বুঝতেছে কি! মনে প্রেম- ভালোবাসা নাই ঠিক আছে, তাই বলে ঘুরতে এসেও পড়াশোনা? এটা কেমন কথা!
আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করল,
“কি হলো? জানিস না?”
জানবো না কেন। এটার বৈজ্ঞানিক নাম Meghalemophyta ceratoabiropteris
আবির হা করে তাকিয়ে আছে।মেঘের মাথায় আস্তে করে গাট্টা দিয়ে আবির বলল,
“এটা Terminalia arjuna, কি পড়াশোনা করিস এটাও জানিস না।”
আরেকটা গাছের দিকে দেখিয়ে পুনরায় বলল,
“এই গাছটার নাম বল”
মেঘ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে রাগী স্বরে বলল,
“বোটানিতে পড়ি বলে যেখানেই যাই সেখানেই শুধু বৈজ্ঞানিক নাম ধরতে হবে? আমি কি এখানে পড়তে আসছি? ”
“তাহলে কেনো আসছিস?”
“বেড়াতে আসছি।”
“বেড়াতে আসছিস বেড়া। এদিক সেদিক নজর আঁটকায় কেন?”
আবির ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হলেও বুঝিয়ে দিয়েছে, ঐ কাপলটাকে দেখা আবিরের ভালো লাগে নি। মেঘ ভেংচি কেটে যেতে যেতে বলল,
“সুন্দর জিনিসে নজর তো পরবেই”
আবির সেদিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
” আমার চোখে যেমন তুই ব্যতীত সব মেয়েই কুৎসিত তেমন কাপল হিসেবে আমি আর আমার Sparrow ব্যতীত সবাই অসুন্দর। আমি চাই সবাই আমাদের দেখুক, আমি কেন অন্যদের দেখবো!”
কথা গুলো বলেই আবির ঠোঁট বাঁকালো। দ্রুত পায়ে মেঘের কাছাকাছি এগিয়ে আসলো। আবারো পাশাপাশি হাঁটছে দুজন। আবির একটু পর পর আড়চোখে মেঘকে দেখছে। সামনে যেতেই তানভিরদের সঙ্গে দেখা হলো। আবির তানভিরকে দেখেই শান্ত স্বরে বলল,
“ভাবছিলাম তোর বোনের মাথাটা ঠিক আছে। এখন দেখি ও আরও বড় তাড়ছিঁড়া ”
“কেনো? কি হয়ছে?”
” নির্দ্বিধায় বৈজ্ঞানিক নাম বানিয়ে বলে, পা*গলের লক্ষণ।”
“এটা তো ভালো কথা। আমার বোনের কত ট্যালেন্ট দেখছো?”
আবির হেসে বলল,
“তোর বোনের ট্যালেন্ট দেখে আমি শিহরিত ”
আবির আর তানভির দুজনেই স্ব শব্দে হাসছে। মেঘ মীমের হাত ধরে ঘুরছে৷ সুন্দর জায়গা দেখে ছবি তুলছে। আদি ওদের সামনে হাঁটছে আর খাচ্ছে। ঘন্টাদুয়েক ঘুরা শেষে গেইট থেকে বের হয়ে কিছুটা সামনে আসতেই তিনটা ছেলে ছুটে আসে। মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“I am Sorry Apu. তখন আমাদের ঐভাবে কমেন্টস করা একেবারেই উচিত হয় নি। প্লিজ আপু, কিছু মনে করবেন না। সরি প্লিজ। আর কখনো আপনাকে বা অন্য কোনো মেয়েকে এভাবে বলবো না। মাফ করে দিন প্লিজ।”
মেঘ আবিরের দিকে তাকালো কিন্তু আবির নিরুদ্বেগ। আবিরের বেপরোয়া ভাব দেখে মেঘ কপাল গুটালো, তাকালো তানভিরের দিকে৷ তানভির আগে থেকেই সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে আছে। কি হয়েছে বা কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না সে!
মেঘ নম্র স্বরে জানালো,
“ঠিক আছে। আপনারা এখন যান”
ছেলেগুলো পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“আপু, মাফ করেছেন ?”
“হ্যাঁ করেছি।”
ছেলেগুলো চলে গেছে। তানভির আবিরকে ইশারায় জিজ্ঞেস করল, “সমস্যা কি?” আবিরও ইশারাতেই বুঝালো, “তেমন কিছু না”
মেঘ সন্দেহের দৃষ্টিতে আবিরকে দেখছে৷ আবির মেঘের দিকে না তাকিয়ে তানভিরকে বলল,
“তুই ওদের নিয়ে ঘুরে আয় ৷ আমি মেঘকে নিয়ে এক জায়গায় যাব”
তানভির ভ্রু উঁচিয়ে চোখ বড় করে তাকালো। আবিরের নিরেট দৃষ্টি দেখেই তানভির এগিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসলো। মীম আর আদিকে নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। মেঘ তখনও আবিরের দিকেই তাকিয়ে আছে আবির এবার সরাসরি মেঘের মুখের দিকে তাকালো। মেঘের কপালে কয়েক স্তর ভাজ, ভ্রু কুঁচকানো, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, নাকের ডগা ক্রমশ ফুলছে, গাল ফুলিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ছে। আবির গলার স্বর কিছুটা উঁচু করে বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমার কি লজ্জা লাগে না?”
মেঘ শ্বাস ছেড়ে ধীর কন্ঠে শুধালো,
” ছেলেগুলো আমায় সরি বলল কেন?”
“আমি কি জানি!”
মেঘের রাগ চোখেমুখে ভেসে উঠছে। রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“আপনি সত্যিই কিছু জানেন না?”
আবির নিচের ঠোঁট কামড়ে এক আঙুলে মেঘের নাকের ডগায় আলতোভাবে স্পর্শ করে বলল,
“যাই বল, রাগলে তোকে সেই লাগে, পুরায় অ*গ্নিকন্যা। সারাক্ষণ এভাবে ঘুরবি তাহলে কোনো ছেলে বাজে কমেন্টসও করবে না তারপর তাদের এসে সরিও বলতে হবে না। ”
আবির এগিয়ে গিয়ে একটা রিক্সা ঠিক করলো। হাতের ইশারায় মেঘকে ডাকলো। আবির রিক্সা থেকে হাত বাড়ালো, মেঘ একহাতে শাড়ির কুঁচি ধরে অন্যহাতে আবিরের হাত শক্ত করে ধরে রিক্সাতে উঠে বসলো। আবির মেঘের দিকে ঝুঁকে শাড়ির আঁচল টেনে মেঘের মাথায় দিয়ে দিয়েছে যেন বাতাসে চুল এলোমেলো না হয়। মেঘ অবাক চোখে সেই দৃশ্য দেখছে। রিক্সা চলতে শুরু করেছে, আবির খানিকক্ষণ পরপর ই মেঘের দিকে ঝুঁকে দেখে কোনোকিছু গাড়ির চাকায় আঁটকায় কি না! আবির যতবার কাছে আসে আবিরের গায়ের গন্ধে মেঘের ছোট্ট দেহ ততবারই কম্পিত হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা ফুলের দোকান দেখে আবির রিক্সা থামিয়ে সেখান থেকে তাজা ফুলের মাথার মুকুট কিনেছে। সাথে দুহাতের জন্য তাজা ফুলের ব্রেসলেট। আশেপাশে ফুলের সুগন্ধ ছড়াচ্ছে৷ আবির নিজের হাতেই মেঘকে সেসব পড়িয়ে দিয়েছে। মেঘ আজ নির্বাক। কথা বলতে একদমই ইচ্ছে করছে না। আবির ভাইয়ের সঙ্গে এক রিক্সাতে পাশাপাশি বসে আছে এতেই তার খুশির সীমা নেই। তারউপর আবিরের যত্নে বারংবার অভিভূত হচ্ছে, নতুন করে নতুন ভাবে প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করছে। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে কোনো কিছুই জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে নেই তার৷ আর একটু সামনে গিয়ে মিষ্টি র দোকান থেকে মিষ্টি কিনেছে। মেঘ তখনও নির্বাক ছিল৷ আবির ভাই আজ যেখানে নিয়ে যাবে অষ্টাদশী সেখানেই যাবে, কোনো প্রশ্ন করবে না। যেই কথা সেই কাজ রিক্সা থেকে নেমে একটু হেঁটে একটা বাসায় ঢুকলো। মেঘ কিছুটা দূরে দাঁড়ানো। কলিং বেল চাপতেই কিছুক্ষণের মধ্যে দরজা খুলে দিল।
আবির হাসিমুখে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম ”
মাইশা আপু একগাল হেসে উত্তর দিল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। এতদিকে বোনের কথা মনে পরলো?”
আবির মুখে হাসি রেখে ঠাট্টার স্বরে বলল,
” আমার মতো ব্যস্ত মানুষ আর একটাও পাবে না”
“আহাগো! কি কাজে ব্যস্ত তা আমার জানা আছে।”
আবির মাইশার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।”
মাইশা উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“কি সারপ্রাইজ? ”
আবির কন্ঠস্বর উঁচু করে ডাকল,
“এইযে ম্যাম, আসুন”
মেঘ গুটিগুটি পায়ে দরজা পর্যন্ত আসতেই মেঘকে দেখে মাইশা দু হাতে নিজের দুগালে হাত রাখলো। মেঘকে আপাদমস্তক দেখে দরজার বাহিরে এসে মেঘকে জরিয়ে ধরে। মেঘও মাইশা আপুকে দেখে অবাক হয়ে গেছে। আপুর বিয়ের পর আজই আপুকে দেখছে৷ আবির অবশ্য আগেও এসেছে। বাসাও আবির ই ঠিক করে দিয়েছিল। মেঘ জিজ্ঞেস করে,
“ভাইয়া কোথায়?”
“ও বের হয়ছে। চলে আসবে এখনি। তোমরা ভেতরে এসে বসো।”
মেঘ ঘুরে ফিরে বাসাটা দেখছে। আবির ঠান্ডা কন্ঠে মাইশাকে বলল,
“আমি কিন্তু আমার কথা রেখেছি, শাড়ি পড়িয়ে তোমার সামনে এনেছি।”
মাইশা আবিরকে বিড়বিড় করে বলল,
” তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। কিন্তু প্রেমিকা না আমি তাকে তোর বউ হিসেবে দেখতে চাই৷ ভালোবাসার অভাবে আমার ভাইয়ের মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে৷ আহারে!”
আবির ঠোঁট ফুলিয়ে অভিযোগের স্বরে বলল,
” তুমিই একমাত্র বুঝছো।”
মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আর কেউ তো বুঝেই না”
মাইশা হাসতে হাসতে বলল,
“দাঁড়া বলে দিচ্ছি!”
“এই নাহ! আপু প্লিজ, বলো না”
ততক্ষণে মেঘ এসে সোফায় বসতে বসতে বলল,
“কি হয়েছে আপু?”
মাইশা মুখে হাসি রেখেই বলল,
“মেঘ তোমাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে। মাশাআল্লাহ। সাবধানে থেকো। তোমাকে দেখে কারোর হার্ট অ্যাটাক না হয়ে যায়! তোমরা বসো আমি নাস্তা নিয়ে আসি৷ ”
একটু পর মাইশা আপুর হাসবেন্ড বাসায় আসছেন। কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে, নাস্তা করে আবির মেঘকে নিয়ে বের হবে। মাইশা মেইনগেইট পর্যন্ত এগিয়ে এসে উচ্চস্বরে বলল,
“আবির মেঘের শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিক করে দে।”
মেঘ আর আবির দুজনেই অবাক চোখে মাইশার দিকে তাকালো। মাইশা স্বাভাবিক কন্ঠে পুনরায় বলল,
“কি হলো? ঠিক করে দে!”
মাইশার কথামতো আবির হাঁটু গেড়ে বসে আস্তেধীরে কুঁচিগুলো ঠিক করে দিচ্ছে। মেঘ বিপুল চোখে তাকিয়ে সে দৃশ্য দেখছে, হাত পা কাঁপছে মেঘের। আবির দাঁড়াতেই মাইশা আবিরকে ডাকল। আবির কাছে যেতেই মাইশা হেসে বলল,
” শুধু ভালোবাসলেই হবে না ভাই, যত্নশীল হতে হবে।”
আবির মুচকি হেসে বলল,
“বিয়ে টা করতে দাও৷ যত্ন কি,কাকে বলে, খত প্রকার বিস্তারিত দেখতে পারবা৷ আসছি”
আবির মেঘকে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
অন্যদিকে তানভির, মীম আর আদিকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বন্যাদের বাসার এদিকে আসছে। আবিরের চোখে প্রেমানুভূতি দেখে তানভিরেরও খুব ইচ্ছে করছিল বন্যাকে দেখতে৷ কিন্তু হুটহাট বন্যাকে কল দেয়া টা নিজের কাছেই খারাপ লাগে। ছোট বোনের বান্ধবীকে কল দিয়ে কি বলবে, সেটা বোনের কান পর্যন্ত কিভাবে পৌছাবে তা ভেবেই কল করার সাহস পায় না। তানভির ধীর গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে, আর আশেপাশে তাকাচ্ছে৷ আঁখি জোড়া অনবরত তাকেই খোঁজছে। মীম শুধালো,
“ভাইয়া আমরা এদিকে কেন আসছি? আমাদের বাসা তো এদিকে না!”
“ঘুরতে আসছি৷ চুপচাপ বসে থাক”
কিছুটা এগিয়ে যেতেই হঠাৎ চোখে পরলো হলুদ সেলোয়ার-কামিজ পড়নে একজনের দিকে, মাথায় সাদা ওড়না, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, আপন মনে ঝালমুড়ি খাচ্ছে। সিউর হওয়ার জন্য একটু এগিয়ে গেল। গাড়ি থামাতো বন্যার কাছাকাছি এসে । গাড়ির হর্নের শব্দে বন্যা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই তানভিরের হৃদয়ে ছু*রির ন্যায় কিছু ঢুকার মতো অনুভূতি হলো৷ বন্যার দুচোখে গাঢ় করে কাগজ দেয়া, বাসন্তী রঙের জামা আর সাদা ওড়নাতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে বন্যাকে৷ তানভিরের দৃষ্টি সরছেই না। ভেতর থেকে মীম বন্যাকে দেখে বলে উঠল,
“ভাই, দেখো বন্যা আপু।”
এতে তানভিরের হুঁশ ফিরে। মীম আর আদি যে তানভিরের সাথে ছিল এটা তানভিরের মনেই ছিল না।
তানভির শান্ত স্বরে বলল,
“তোরা বস। আমি আসছি।”
তানভির বের হয়ে একটু সামনে এগিয়ে গেল, বন্যা মৃদু হেসে প্রশ্ন করল,
“আপনি এখানে?”
“এমনিতেই আসলাম ”
বন্যা নিজের হাতের ঝালমুড়ির দিকে তাকিয়ে আবারও তানভিরকে দেখে আস্তে করে বলল,
“ঝালমুড়ি খাবেন?”
“নাহ। খাও তুমি।”
কয়েক মুহুর্তের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে তানভির শুধালো,
“বাসা থেকে এত দূর ঝালমুড়ি খেতে আসছো?”
বন্যা এবার একটু শব্দ করেই হাসলো।এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে বলল,
“নাহ। ঘুরতে বের হয়ছিলাম। আপু আর ভাই একটু সামনে গেছে। তাই আমি ঝালমুড়ি খাচ্ছিলাম।”
বন্যা ঘাড় ঘুরাতেই ঠোঁট জোড়া আরও প্রশস্ত হলো। স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“ঐতো আপুরা চলে আসছে।”
ওনারা আসতেই। বন্যা বোনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। যদিও তানভির আগে একবার বন্যাদের বাসায় গিয়েছিল কিন্তু তখন বড় আপুর সঙ্গে দেখা হয় নি। তানভির কিছুটা থতমত খেয়েছে তবুও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। তানভির সহজ স্বরে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম আপু, কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আমি মেঘের বড় ভাই।”
“চিনতে পারছি। আপনার কথা অনেক শুনি। আপনি নাকি খুব রাগী!”
তানভিরের মুখের হাসি মুহুর্তেই গায়েব হয়ে গেছে। কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। বন্যার আপু পুনরায় প্রশ্ন করলেন,
“তা আমাদের এদিকে কি মনে করে? ঘুরতে নাকি এমনিতেই?”
তানভির ঢোক গিলে শান্ত কন্ঠে বলল,
“ভাই বোনদের নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েছিলাম। ভাবলাম এদিকেও ঘুরে যায়।”
বন্যা উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“মেঘ আসছে?”
তানভির মৃদু হেসে বলল,
“না বনু আসে নি। মীম আর আদি গাড়িতে আছে।”
বন্যা তটস্ত হয়ে বলল,
“আগে বললেন না কেন? আপু, তোমরা কথা বলো, আমি দেখা করে আসি”
বন্যার বড় বোন হাসিমুখে বলল,
“ভাই বোনদের নিয়ে আসছেন রাস্তায় কত ঘুরবেন, বাসায় চলুন।”
“না আপু। অন্য কোনদিন আসবো।”
বন্যা, মীম আর আদির সঙ্গে গল্প করেছে৷ ঝালমুড়ি কিনে দিয়েছে। তাদের থেকে বিদায় নিয়ে তানভির বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। বাসার গলি পর্যন্ত এসে গাড়ি থামালো। ততক্ষণে আবির মেঘকে নিয়ে চলে আসছে। তানভির গলিতেই ওদের নামিয়ে দিয়েছে। তিনভাই বোন গল্প করতে করতে যাচ্ছে। আবির ভাই মেঘকে মাথার মুকুট কিনে দিয়েছে, সেটা দেখেই মীম মেঘের কাছে আবদার করছে তাকেও যেন এনে দেয়। তারপর বন্যার সঙ্গে দেখা হয়েছে সেই কথাও বলছে।
বাসায় ফিরে কিছুক্ষণ পর ই তানভির বন্যার নাম্বারে কল দিল৷ আজ প্রথম বারেই কল রিসিভ হলো। তানভির গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“কি করতেছো?”
“তেমন কিছু না। কেন?”
“হাত কাটছো কিভাবে?”
বন্যা আঁতকে উঠে নিজের হাতের দিকে তাকায়। তানভির সন্ধ্যার দিকেই হাতের অবস্থা দেখেছে। আপু চলে আসায় হাতের কথাটা জিজ্ঞেস করতে পারে নি। বন্যা জ্বিভ দিয়ে নিচের ঠোঁট ভিজিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“দা লেগে কেটে গেছিল”
তানভির রাগী স্বরে বলল,
“দা লেগে হাত কিভাবে কাটে? কাজ করার সময় মনোযোগ কোথায় থাকে?”
বন্যা মৃদু হেসে বলল,
“বেশি কাটে নি”
“তা তো ব্যান্ডেজ দেখেই বুঝেছি। ঔষধ খেয়ো ঠিক মতো৷ রাখছি ”
এদিকে মেঘ ঘন্টাখানেক পর আবিরের জন্য এক কাপ কফি নিয়ে আস্তে আস্তে আবিরের রুমে ঢুকেছে। আবির চোখ বন্ধ করে বিছানার পাশে হেলান দিয়ে বসে আছে। মেঘ খুব সন্তর্পণে কাপটা টেবিলের উপর রাখল। কয়েক সেকেন্ড আবিরকে দেখল। বলতে চাইলো,কফিটা খাওয়ার জন্য, কিন্তু কেন জানি গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। মেঘ চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে নিলে আবির সুস্থির কন্ঠে ডাকল,
“মেঘ”
ওমনি মেঘের পদযূগল স্তব্ধ হয়ে গেছে। পা বাড়াতে চেয়েও বাড়াতে পারছে না, মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছে না। আবির অত্যন্ত ধীর কন্ঠে বলল,
“মাথায় খুব ব্যথা করছে। কিছু মনে না করলে একটু টিপে দিবি৷ প্লিজ”
আবিরের কন্ঠ অনেক ভার। কথাগুলোও অনেক কষ্টে বলেছে। মেঘ ঢোক গিলে আস্তে করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“আপনার জন্য কফি নিয়ে আসছিলাম৷”
“এই ব্যথা কফিতে কমবার নয়”
মেঘ এগিয়ে এসে আবিরের মাথার পেছনে দাঁড়িয়ে আলতোভাবে চুলে স্পর্শ করে। আবির চোখ বন্ধ করে বসে আছে। একবারের জন্য তাকিয়েও দেখছে না। আবিরের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মেঘ ডাকল,
“আবির ভাই”
“হুমমমমমমম”
“আপনার কি হয়েছে? কি নিয়ে এত টেনশন করছেন?”
“ভাবছি আগামীকাল ফুপ্পির সাথে বাসার মানুষদের দেখা করাবো। কিন্তু কিভাবে কি করবো কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। বাসার মানুষদের রাজি করানোর উপায় পাচ্ছি না। তাই খুব টেনশন হচ্ছে ”
মেঘ খানিক ভেবে বলল,
“আমি কি কোনোভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?”
“নাহ। তোকে আমি কোনোকিছুতে জড়াতে চাই না। তোর কিছু করতে হবে না।”
“কেন? ফুপ্পি কি আপনার একার নাকি৷ ফুপ্পিকে বাসায় ফেরানোর দায়িত্ব একা আপনার না৷ এ দায়িত্ব আমারও। আমার মাথায় একটা প্ল্যান আছে৷ বলি?”
“বল”
মেঘ আবিরের কানের কাছে বিড়বিড় করে সব প্ল্যান জানালো। তা শুনে আবির তপ্ত স্বরে বলল,
” আমি বললাম তো, তোকে আমি এই ঘটনায় জড়াতে চাই না। কেন বুঝতে চাইছিস না?”
“কিছু হবে না আমার। আপনিই তো বলেন আমি এই বাড়ির রাজকন্যা। রাজকন্যার কথা কে অমান্য করবে শুনি?”
আবির মলিন হাসলো। পুনরায় গম্ভীর কন্ঠে বলল,
” তোকে কিছু বলতে হবে না। ”
“আমি বড় আব্বু আর আব্বুকে রাজি করাতে পারবো। আপনি এত ভয় পাবেন না। ”
আবির প্রখর তপ্ত স্বরে জানালো,
” রাজকন্যার উপর অনাঙ্ক্ষিত আক্রমণ বা সামান্যতম আঁচড়ও আমি সহ্য করতে পারব না। ”
“রাজকন্যার কিছুই হবে না জনাব। আমি এখনি রাজি করিয়ে আসছি ”
“এই শুন”
“পরে শুনবো, রাজকন্যা এখন গুরু দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছে। ”
(চলবে)
#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৫৩ (ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল)
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_
আবির আবারও মেঘকে ডাকে ততক্ষণে মেঘ রুম থেকে বেড়িয়ে পরেছে। মাথা ব্যথা, ভয়, মেঘের চিন্তায় আবিরের মনটা খুঁতখুঁত করছে, অস্থির লাগছে। আবির যে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে মেঘকে সর্বক্ষণ আগলে রাখে তা কি অষ্টাদশী জানে? মেঘকে অতি সামান্য কারণেও কেউ ধমক দিলে আবিরের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়। এ অবস্থায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না বলে মেঘকে আগে থেকেই সাবধানে রাখে। মেঘের সাড়াশব্দ নেই, আবির বুঝতে পারে মেঘকে থামানো সম্ভব না। গত দু’রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে, প্রচন্ড মাথা ব্যথা স্বত্তেও আবির উঠে বেলকনিতে আসলো। ততক্ষণে মেঘ নিচে চলে গেছে। সোফায় বসে আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খান কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন। আবির উপর থেকে স্থির দৃষ্টিতে বাবা,চাচা আর মেঘকে দেখছে। ভেতরটা ভয়ে কাঁপছে। আবির ছোট থাকাকালীন আলী আহমদ খান কয়েকবার আবিরকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন তারপর থেকে আজ অবধি পরিবার নিয়ে কোথাও যান না তিনি। মেঘ, মীমরা কোথাও ঘুরতে যেতে চাইলে ইকবাল খান নিয়ে যান। কখনো বাড়ির তিন বউ একসঙ্গে শপিং এ যান, কখনো তিন ভাই একসঙ্গে অফিসে বা অন্য কোথাও যান, আবার কখনো খান বাড়ি ৩ রাজপুত্র আর ২ রাজকন্যা একসঙ্গে ঘুরতে যায়৷ কিন্তু সকলে একসঙ্গে আজ পর্যন্ত কোথাও যায় নি। ফুপ্পির জন্য মেঘ আজ রিস্ক নিয়ে আব্বু, বড় আব্বুকে রাজি করাতে নিচে আসছে। কিভাবে কি বলবে বুঝতে না পেরে রান্নাঘরে ছুটে গেল। রান্নাঘরে মালিহা খান চা করতেছিলেন। মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
“বড় আম্মু, দাও আজ চা আমি করবো৷ ”
“তুই পারবি না মা, হাত পুড়ায়া ফেলবি।”
” মোটেই না। তোমরা সবাই আমাকে এত ছোট মনে করো কেন? আমি কত বড় হয়ে গেছি দেখছো না!”
“তুই বড় হয়ে গেছিস?”
“অবশ্যই হইছি। আগামী মাসে ১৯ বছরে পা দিতে যাচ্ছি।”
“মাশাআল্লাহ৷ বিয়ের বয়স তো হয়েই গেছে, জামাই দেখতে হবে তাহলে”
মেঘ লজ্জায় বড় আম্মুর আঁচল দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল৷ মনে মনে বলল,
” জামাই ফিক্সড, এখন তোমার ছেলের হাতে সব৷ তোমার ছেলে যত তাড়াতাড়ি রাজি হবে তত তাড়াতাড়ি আমি তোমার ছেলের বউ হবো। আহা কি শান্তি! ”
মালিহা খান ধীর হস্তে মেঘের মুখ থেকে আঁচল সরিয়ে খানিক হেসে বললেন,
” বিয়ের নাম শুনেই এত লজ্জা?”
মেঘ লাজুক হাসলো৷ মেঘের এই লজ্জার কারণ যে অন্যকিছু এটা মালিহা খানকে বুঝতে দিল না৷ কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে দুকাপ চা নিয়ে চলে গেল। মেঘের হাতে চায়ের কাপ দেখে দু ভাই ই নড়েচড়ে বসলেন। মোজাম্মেল খান চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে শান্ত স্বরে শুধালেন,
“আম্মু, তুমি চা আনতে গেলে কেন?”
” এমনিতেই৷ ”
আলী আহমদ খান প্রখর নেত্রে মেঘকে দেখে বললেন,
“মুখ দেখে মনে হচ্ছে বড়সড় আবদার আছে। কি লাগবে বলো মা”
মেঘ হাসিমুখে উত্তর দিল,
“কিছুই লাগবে না বড় আব্বু”
মোজাম্মেল খান পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমরা নাকি আজ ঘুরতে গিয়েছিলে? কোথায় গিয়েছিলে? ”
“চিরিয়াখানা আর বোটানিক্যাল গার্ডেনে।”
“ঘুরাঘুরি করে মন ভালো হয়েছে?”
মেঘ চোখ বন্ধ করে ঢোক গিলল৷ মনে সাহস জুগিয়ে বলল,
“ভালো লাগে নি বরং মনটা আরও বেশি খারাপ হয়ে গেছে। ”
“কেন?”
ভয়ে মেঘের বুক কাঁপছে। আব্বু বা বড় আব্বু ধমক না দিয়ে বসেন। দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে মেঘ বলে উঠল,
” সবাই সবার আব্বু-আম্মু সহ পুরো পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছিল। তারা কত আনন্দ করছিল, তাদের দেখতেও ভাল লাগছিল। আমার বোধশক্তি হওয়ার পর থেকে আমি কোনোদিন দেখি নি আমাদের বাসায় সবাই একসঙ্গে কোথায় ঘুরতে গিয়েছে! আমি চাই আগামীকাল আমাদের বাসার সবাই একসঙ্গে ঘুরতে যাব। এটা আমার অভিযোগ সেই সঙ্গে আবদারও ”
আলী আহমদ খান ধীর কন্ঠে বললেন,
“তোমার আম্মু, বড় আম্মু, কাকিয়া কে নিয়ে যেও আর আমি ইকবালকে বলবো নে, সেও তোমাদের সঙ্গে যাবে।”
মেঘ অভিমানী কন্ঠে জানালো,
“আমি বলেছি সবাই মানে খান বাড়ির প্রত্যেকে। সেখানে আপনারা দু’জনও পড়েন।”
মোজাম্মেল খান ভারী কন্ঠে বললেন,
“আমাদের কাজ আছে। বাকিদের নিয়ে যেও ”
“আগামীকাল বিশ্ব ভালোবাসা দিবস আমি খোঁজ নিয়েছি অফিস ছুটি। প্লিজ আব্বু, প্লিজ বড় আব্বু চলুন না”
“না মামনি। তোমরা ঘুরে আসো। টাকা দিয়ে দিব নে, খাওয়াদাওয়া করে কেনাকাটা করে আইসো।”
মেঘ এবার কিছুটা ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
” থাক টাকা লাগবে না। আপনাদেরও কোথাও যেতে হবে না৷ আমি কত আশা নিয়ে আসছিলাম, সবাই একসঙ্গে ঘুরতে যাব, কত ভালো লাগবে৷ সত্যি বলতে আপনারা আমায় ভালোই বাসেন না। শুধু মুখেই বলেন। ”
“এভাবে বলছো কেন মা! আচ্ছা ঠিক আছে তোমার আব্বুও সাথে যাবে। তবুও মন খারাপ করো না”
মেঘ অত্যন্ত গুরুতর কন্ঠে বলল,
“বললাম তো কাউকে যেতে হতে না। আপনারা আপনাদের ব্যবসা, কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকুন। আমাদের ভালোবাসার প্রয়োজন নেই। এরপর থেকে আমাকেও লক্ষ্মী মেয়ে বলে সম্বোধন করবেন না। আপনাদেরকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। আপনারা আপনাদের কাজ করুন। ”
মেঘ চলে যেতে নিলে আলী আহমদ খান ডাকলেন৷ শান্ত স্বরে মেঘকে বুঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু মেঘ নিজের জেদ থেকে নড়বেই না। একপর্যায়ে মেঘ বলে বসলো, আগামীকাল ঘুরতে না গেলে বাড়ির কারো সঙ্গে কথা বলবে না মেঘ। আলী আহমদ খান বেশকিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভাবলেন। ছোট থেকেই বোনকে অনেক আদরে বড় করেছিলেন আলী আহমদ খান এবং মোজাম্মেল খান। বোনের কোনো আবদার কখনও অপূর্ণ রাখেন নি। খরচের টাকা বাঁচিয়ে বোনের জন্য গিফট নিয়ে আসতেন, প্রতি সপ্তাহেই চার ভাইবোন মিলে ঘুরতে যেতেন। ইকবাল খান সবার ছোট থাকা সত্ত্বেও আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খানের বোনের প্রতিই ভালোবাসা বেশি ছিল। কিন্তু বোন এমন কান্ড ঘটানোর ফলে ভাইবোনের শারীরিক,মানসিক দুভাবেই বিচ্ছেদ ঘটেছে। পরিবারকে সময় দেয়া বিশেষ করে ঘুরতে নিয়ে যাওয়াটা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছেন৷ দু-একবার গেলেও মাথায় শুধু বোনের স্মৃতি ঘুরতো৷ তারজন্য পরিবারের দায়িত্ব ছেড়ে ব্যবসার হাল শক্ত করে ধরেছেন। বড় ভাইয়ের দেখাদেখি মোজাম্মেল খানও ধীরে ধীরে একই পথের পথিক হয়ে গেছেন। সেই সঙ্গে পরিবারের পুরো দায়িত্ব পরেছে ইকবাল খানের উপর। বাসার বাজার থেকে শুরু করে কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেয়া, ডাক্তার দেখানো, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ দায়িত্বই ইকবাল খানের৷ অনেক ভেবেচিন্তে অবশেষে আলী আহমদ খান জানালেন, তিনিও আগামীকাল যাবেন। এবার মেঘের খুশি দেখে কে! মেঘ ছুটে গিয়ে আম্মু, বড় আম্মুকে ডেকে নিয়ে আসছে, আকলিমা খান মীম, আদিকে পড়াচ্ছিলেন তাদেরকেও ডেকে নিয়ে আসছে৷ এরমধ্যে আবির নিচে নামছে। মেঘ আবিরের দিকে তাকিয়ে টানা দু’বার ভ্রু নাঁচালো। আবিরও নিঃশব্দে হাসলো। চোখের ইশারাতেই মেঘের প্রশংসা করল। আবির নামতেই মোজাম্মেল খান জিজ্ঞেস করলেন,
“আগামীকাল কি তুমি ফ্রী আছো?”
“কিছু কাজ আছে। কেন চাচ্চু?”
“মেঘ একদম পাগল করে ফেলতেছে আগামীকাল নাকি ভালোবাসা দিবস। সেই উপলক্ষে বাসার সবাইকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। তুমি কি সময় দিতে পারবে?”
আবির উদাসীন কন্ঠে বলল,
“সবাই গেলে আমার তো সময় দিতেই হবে। কাজ না হয় পরেই করলাম।
আবিরের ভাবের কথা শুনে মেঘ কপাল কুঁচকে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। দিনরাত এক করে ফুপ্পিকে নিয়ে ভাবা মানুষটা ফু্প্পির সাথে সবার দেখা করানোর চিন্তায় আধমরা হয়ে যাচ্ছিলো। অথচ আব্বুর সামনে এসে কি সুন্দর করে বলছেন ওনার নাকি কাজ আছে। কি এমন কাজ টা ওনার! এরমধ্যে ইকবাল খান বাসায় আসছেন৷ তানভিরকেও জানানো হয়েছে। কোথায় যাওয়া হবে, কখন যাবে সব সিদ্ধান্ত শেষে যে যার মতো চলে গেছে। আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান দুজন আবারও কাগজপত্র দেখছেন৷ ইকবাল খান, আকলিমা খান, মীম, আদি সকলে রুমে চলে গেছেন। আবির খেতে বসছে৷ আবিরকে দেখে মেঘও আবিরের বিপরীতে গিয়ে বসলো। ডাইনিং টেবিলে আর কেউ নেই। হালিমা খান খাবার রেডি করছেন৷ মেঘ আবিরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“আপনার আগামীকাল কি এমন কাজ শুনি?”
“কোনো কাজ নেই। কেনো?”
একটু আগে যে বললেন, “ব্যস্ত, কাজ আছে”
আবির ওষ্ঠদ্বয় কিছুটা প্রশস্ত করে বলল,
” কখনো কখনো পরিস্থিতি বুঝে মুখেমুখে হলেও ব্যস্ততা দেখাতে হয়। সবাই এক্সাইটেড হয়ে গেলে সমস্যা আছে।”
মেঘ মাথা চুলকে বলল,
“আপনি কি ভাবেন আর কি করেন আপনিই জানেন”
আবিরের প্রশস্ত ওষ্ঠ আরও বেশি প্রশস্ত হলো। আবির তপ্ত স্বরে বলল,
“Thank you my dear Sparrow.”
“My pleasure”
আজ সকাল থেকে বাড়িতে হৈচৈ। মীম, মেঘ, আদি তিনজনই খুব এক্সাইটেড। গতকাল হুট করে আবির শাড়ি নিয়ে আসছিলো৷ তাই সাজার তেমন সময় পায় নি৷ আজ মেঘ সকাল সকাল চুলে শ্যাম্পু করে অনেকটা সময় নিয়ে শাওয়ার নিয়েছে। ভেজা চুল ছেড়ে সারা বাড়ি ঘুরছে৷ সবাই রেডি হয়ে যাচ্ছে। কি ড্রেস পরবে, মেঘ এখনও সিদ্ধান্ত ই নিতে পারছে না। ভালোবাসা দিবসে আবিরের সঙ্গে মিলিয়ে জামা পরবে এটা আগে থেকেই ভেবে রেখেছিল৷ কিন্তু সারাদিন যাবৎ আবিরের কোনো হদিস নেই। সেই সকালে বেড়িয়েছে এখনও আসছে না৷ সবার বলাবলিতে মেঘ রেডি হতে চলে গেছে। মেঘ লাল রঙের একটা গাউন পড়েছে। চুলগুলো বেঁনি করে সামনের দিকে রেখেছে। একহাতে ঘড়ি আরেকহাতে আবিরের দেয়া কাঁচের চুড়ি থেকে একসেট লাল রঙের চুড়ি পড়েছে। আজ কানে বড় দুল দিয়েছে, ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক, চোখে আইলাইনারের সাথে হালকা করে দেয়া কাজল। আগে মেঘ গাঢ় করে কাজল দিতো। কিন্তু আবিরের ভয়ে এখন কাজল দেয়া ছেড়েই দিয়েছে৷ হঠাৎ হঠাৎ হালকা করে একটু দেয়। মেঘ রেডি হয়ে সোফায় বসে ফোন চাপতেছিল। এরমধ্যে আবির বাসায় আসছে। আড়চোখে মেঘকে খানিক দেখেই দ্রুত রুমে চলে গেল। ২০ মিনিটের মধ্যেই শাওয়ার নিয়ে একেবারে রেডি হয়ে নেমে পরেছে। আজকেও পাঞ্জাবি পরেছে। আবিরের পাঞ্জাবিটা বেশ কয়েকটা রঙের কম্বিনেশনে তৈরি৷ তবে সেটাতে লাল রঙ একটু বেশিই ভাসছে। মেঘের ইচ্ছে পূরণ হয়েছে দেখেই মাথা নিচু করে মুচকি হাসলো৷ আবির বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। পেছন পেছন মেঘও ছুটলো। মেঘকে ছুটতে দেখে আবির থমকে দাঁড়ালো৷ মেঘ কাছে আসতেই শান্ত স্বরে বলল,”
“ওখানে একদম শান্ত থাকবি। ফুপ্পিকে তুই চিনিস না৷ আর আজকের জন্য জান্নাত আপুকেও চিনিস না। ওদের দেখে উত্তেজিত হয়ে জড়িয়ে ধরতে যাবি না৷ মনে থাকবে?”
“আচ্ছা ঠিক আছে।কিন্তু আপনি সকাল থেকে কোথায় ছিলেন?”
“ফুপ্পি দুশ্চিন্তা করতে করতে অসুস্থ হয়ে পরছিল। আইরিন কল দিয়ে কান্নাকাটি করতেছিল তাই বাসায় গেছিলাম।”
মেঘ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“আমার ফুপ্পির জন্য খুব টেনশন হচ্ছে। ”
“আর আমার আব্বুর জন্য বেশি টেনশন হচ্ছে। আচ্ছা যাই হোক৷ তুই মুড অফ করে থাকিস না৷ বাসার সকলের সঙ্গে ঘুরার ইচ্ছে পূরণ হচ্ছে সেটাতেই ফোকাস কর। ”
মেঘ কথা না বাড়িয়ে সোজা গাড়িতে বসলো। একটু পর মীম, আদি সহ সকলেই চলে আসছে। বাসার আশেপাশে সুন্দর নিরিবিলি জায়গা ঘুরে হালকা নাস্তা করে পরিশেষে রমনা পার্কে আসলো। আবির আর তানভির এমন ভাব নিচ্ছে যে বাবা, চাচার কথা ছাড়া তারা কোনোদিকে যায় না। রমনা পার্কে যাবে কি না সেই অনুমতিও বাবার থেকে নিয়েছে আবির। শান্ত পরিবেশে হাঁটছে সকলে। মেঘের কথা মাথায় রেখে আলী আহমদ খান নিজেই মীম,মেঘদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন, এটা সেটা গল্প বলছেন। সামনের দিকে তিন ভাই, মীম, আদি,মেঘ, তারপর তিন বউ সবশেষে আবির আর তানভির। ফুপ্পির কথা জানতে মেঘ ইচ্ছে করেই সামনে থেকে পিছনে আসছে৷ কিন্তু পরিস্থিতি বেশ ঠান্ডা৷ আবির, তানভির কোনো কথা বলছে না। আবির ফোনে কাকে যেন মেসেজ পাঠাচ্ছে। তানভির, আবির কারো কাছে পাত্তা না পেয়ে মেঘ চলে যেতে নিলে আবির আচমকা মেঘের হাতের কব্জিতে শক্ত করে ধরে। মেঘ পেছন ফিরতেই আবির চোখে ইশারা করলো, সামনে না আগানোর জন্য। সামনে সবার হাঁটা হঠাৎ ই থেমে গেছে। মেঘ এবার ঘাড় ফিরিয়ে তানভিরকে দেখার চেষ্টা করল। তানভির কিছুই দেখেনি ভাব করে মেঘকে ক্রস করে সামনে গিয়ে মেঘকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে। আবির মেঘের হাত ধরে রাখছে এই দৃশ্য যেন কারো নজরে না পরে তারজন্যই আড়াল করে দাঁড়িয়েছে৷ মালিহা খান জান্নাতকে দেখেই এগিয়ে গেছেন। বাকিরা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।
মালিয়া খান উত্তেজিত কন্ঠে বললেন,
“আরে জান্নাত, কেমন আছো?”
জান্নাত একগাল হেসে উত্তর দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন আন্টি? আপনারা সবাই বুঝি ঘুরতে আসছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। মেঘের আবদার আজকের স্পেশাল দিনে সবাইকে নিয়ে ঘুরবে তারজন্য আসলাম।”
জান্নাত এবার আলী আহমদ খানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম আংকেল, কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ। তুমি ভালো আছো তো?”
“জ্বি আলহামদুলিল্লাহ। ”
হালিমা খান স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালেন,
“তা জান্নাত, তুমি কি একা আসছো?”
জান্নাত হাসিমুখে বললো,
“নাহ”
বলে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে গাছের নিচে বসা মহিলার দিকে তাকালো। মালিহা খান কিছুটা পিছিয়ে আলী আহমদ খানের কাছাকাছি এসে আস্তে করে বললেন,
“ওনি মনে হয় জান্নাতের আম্মু। আপনাকে যে বলছিলাম কিছু তো বললেন না। আজকে তাহলে আমাদের বাসায় দাওয়াত দিব নে। আপনি কি বলেন?”
“ঠিক আছে। তোমার যেহেতু এত ইচ্ছে, দিও দাওয়াত। আমার কোনো সমস্যা নেই”
মালিহা খানের মুখে উজ্জ্বলতা ঝলঝল করছে৷ উত্তেজিত কন্ঠে জান্নাতকে প্রশ্ন করলেন,
“ওনি তোমার আম্মু না? ডাকো একটু কথা বলি।”
জান্নাত ঘাড় ঘুরিয়ে ডাকলো,
“আম্মু এদিকে আসো।”
ঠোঁটে হাসি রেখেই জান্নাত মালিহা খানকে বলল,
“ওনি আমার শাশুড়ি আম্মু।”
সহসা স্তব্ধ হয়ে গেছে সবকিছু। মালিহা খান অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে জান্নাতের দিকে৷ জান্নাতের কথা শুনে আলী আহমদ খানও কপাল কুঁচকালেন। মালিহা খান প্রায় প্রায়ই আবিরের জন্য জান্নাতের কথা বলেন, কিন্তু আলী আহমদ খান তেমন সাড়া দেন নি বলে এতদিন কিছুই বলতে পারেন নি৷ অথচ সেই মেয়ে বিবাহিত। ওনাদের সাথে সাথে বাকিরাও অবাক চোখে তাকিয়ে আছে৷ মালিহা খান এতটায় শকট যে কিছুই বলতে পারছেন না। এদিকে আবির মেঘের হাত ধরেই রেখেছে যাতে মেঘ কোনোভাবেই সামনে না যায়৷ তানভির মেঘের সামনে দাঁড়ানো তাই মেঘ জান্নাত আপুর কথা শুনলেও আপুকে দেখতে পারছে না৷ মেঘ ঘাড় কাত করে জান্নাতকে দেখার চেষ্টা করছে। আকলিমা খান খানিক ভেবে প্রশ্ন করলেন,
“তোমার বিয়ে কবে হয়ছে?”
“অক্টোবরের ১২ তারিখ আন্টি। ”
মালিহা খান এবার দ্বিতীয় বারের মতো আশ্চর্য হলেন। আজ ফেব্রুয়ারি ১৪ মানে ৪ মাসের উপরে হয়ছে জান্নাতের বিয়ে হয়েছে। অথচ ওনি তাকে ছেলের বউ বানাতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন।
হালিমা খান বললেন,
“আমাদের বললে না তো”
“আসলে আন্টি হুট করেই বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়েছিল আর ঐরকম পোগ্রামও করা হয় নি। তারজন্য আর বলা হয় নি।”
“তা তোমার হাসবেন্ড কি করে?”
“জবের জন্য আপাতত দেশের বাহিরে আছেন। দোয়া করবেন আমাদের জন্য। ”
“ফি আমানিল্লাহ। স্বামী সংসার নিয়ে সুখে থাকো।”
মালিহা খানের চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। জান্নাতকে দেখে যতটা উত্তেজিত ছিল এখন ঠিক ততটায় নিরুদ্বেগ। কোমল দৃষ্টিতে জান্নাতের দিকে তাকিয়ে আছে।
জান্নাত পুনরায় একটু উঁচু স্বরে ডাকলো,
“কি হলো আম্মু? আসো”
এবার মহিলা উঠলেন। মাথায় ওড়না দেয়া, মাথা নিচু করে এগিয়ে এসে ভরাট, শীতল কণ্ঠে বললেন,
“আসসালামু আলাইকুম। ”
আস্তে করে সকলেই সালামের উত্তর দিয়ে তাকালেন সেই মহিলার দিকে। মহিলা মুখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো আলী আহমদ খানের সাথে, পাশে তাকাতেই মোজাম্মেল খান। প্রকৃতি যেন থমকে গেছে, মুহুর্তেই নিস্তব্ধতায় ছেড়ে গেছে সবকিছু। মাহমুদা খানের দৃষ্টি একে একে সকলকে দেখছে। মালিহা খান, ইকবাল খান, পেছনে হালিমা খান আর আকলিমা খানকেও একপলক দেখে নিলেন। আবিরের হাতে থাকা মেঘের ছোট্ট হাতটা থরথর করে কাঁপছে। ভয়ে বুকের ভেতর হৃদপিণ্ড ছুটছে এদিকসেদিক। হাত- পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। ২৮ বছর পর মুখোমুখি হয়েছে ভাই বোন৷ কি হতে চলেছে ভেবেই মেঘের শরীর ঘামতে শুরু করেছে। আবির দু কদম এগিয়ে মেঘের পাশে দাঁড়ালো। মেঘের হাত ছাড়তেই মেঘ ব্যালেন্স হারিয়ে পরতে নিলে আবির তৎক্ষনাৎ ডানহাত দিয়ে মেঘের কনুই এর উপর চেপে ধরলো।মেঘ আড়চোখে আবিরের দিকে তাকাতেই আবির মলিন হেসে প্রখর তপ্ত স্বরে বলল,
” হেই, রিলাক্স। কিচ্ছু হয় নি!”
মেঘ শীতল চোখে আবিরের মুখের পানে তাকিয়ে আছে। কপালের ঘাম বেয়ে বেয়ে নিচে পরছে। দুশ্চিন্তায় দুধের ন্যায় মুখবিবর রক্তাভ হয়ে গেছে। মেঘ অল্পতেই ইমোশনাল হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামলানোর আগেই ভেঙে পরে৷ আবির পকেট থেকে রুমাল বের করে আলতোভাবে মেঘের কপাল,নাক,থুতনি মুছতে মুছতে বলল,
” এই পাগল, এত টেনশন কিসের তোর? আমি আছি তো নাকি?”
আবির মেঘের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ধীর কন্ঠে বুঝাচ্ছে। মেঘও শান্ত মেয়ের মতো আবিরের কথা শুনছে।
এদিকে মাহমুহা খানের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সকলেই। ২৮ বছর পর কাউকে হুট করে দেখলে কখনোই চেনা সম্ভব না। বেশকিছুক্ষণ পর ইকবাল খান শ্বাস ছেড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“আফা!”
মীম, আদি একবার আব্বুর মুখের দিকে তাকাচ্ছে, আবার মহিলাকে দেখছে আবার ঘাড় ফিরিয়ে বাকিদেরও দেখছে। হালিমা খান আর আকলিমা খান মাহমুদা খানকে বাস্তবে দেখে নি দু একবার শুধু ছবিই দেখেছিল তাই তেমন চিনে না। মোজাম্মেল খান ভারী কন্ঠে বললেন,
“তুই…!”
মালিহা খান এখনও নিশ্চুপ। জান্নাতের বিষয়টাতেই এখনও স্বাভাবিক হতে পারছেন না। তারউপর এত বছর পর ননদের সাথে দেখা৷ সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে ওনার৷ এদিকে আলী আহমদ খানও পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছেন। মীম আর আদি দু’জনে বেশকিছুক্ষণ মুখ চাওয়াচাওয়ি করে অবশেষে আব্বুকে প্রশ্ন করল,
“আব্বু, ওনি কে?”
ইকবাল খান উত্তর দিতে পারছেন না। নিজের সন্তানের সামনে বোনকে কি বলে পরিচয় দিবেন সেটাও বুঝতে পারছেন না। ইকবাল খান অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে মোজাম্মেল খানের দিকে। মীম একবার প্রশ্ন করে থেমে গেলেও আদি বার বার প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। কেউ কোনো উত্তর দিচ্ছে না।
দীর্ঘ সময়ের নিরবতা ভেঙে মাহমুদা খান জিজ্ঞেস করলেন,
“কেমন আছো ভাইজান?”
একমাত্র বোনের মুখে ভাইজান ডাক শুনে আলী আহমদ খানের বুকটা কেঁপে উঠল। ঢোক গিলে অনুষ্ণ স্বরে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ।”
স্নিগ্ধ শীতল পরিবেশ। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ ব্যতীত আর কোনে শব্দ নেই। কেউ কোনো কথা বলছে না। আবার জায়গা থেকে নড়ছেও না। আদি কিছুক্ষণ থেমে থেমে আবার প্রশ্ন করে, মাহমুদা খানের পরিচয় জানতে চায় কিন্তু কেউ বলে না। জান্নাত সশরীরে এতক্ষণ উপস্থিত থাকলেও তার মনোযোগ ছিল ফোনে। আসিফ কল দেয়ায় ফোন নিয়ে একটু দূরে চলে গিয়েছিল। কথা শেষ করে এগিয়ে আসতে আসতে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“আম্মুু কথা শেষ হয় নি? চলো বাসায় যায়”
মাহমুদা খানের কান্না গলায় আঁটকে আছে। এত বছর পর ভাইদের স্ব চক্ষে দেখছেন, ঠিকমতো কথাও বলতে পারছেন না। মাহমুদা খান শীতল কণ্ঠে বললেন,
“আসছি ভাইজান। ”
মাহমুদা খান জান্নাতের পাশে হেঁটে যাচ্ছেন। প্রত্যেকেই সেদিকে তাকিয়ে আছে। প্রতিটা সদস্যদের ভেতর খুঁড়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসছে। আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান সহ সকলেই আজ কঠিন সত্যের মুখোমুখি হয়েছে। সন্তানদের প্রশ্নের উত্তরে না পারছে সত্যি বলতে আর না পারছে এড়িয়ে যেতে।
মেঘ আবিরের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো। আবির নিঃশব্দে ডান ভ্রু উঠাতেই মেঘ বিড়বিড় করে বলল,
“ফুপ্পি চলে গেল কেন?”
“আমিই বলছি চলে যেতে।”
“কেন?”
” আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা ২৮ বছর যাবৎ চাপা পরে কঠিন পাথরের রূপ নিয়েছে। সেই পাথর ৫-১০ মিনিটে গলবে না। তার জন্য পর্যাপ্ত সময় লাগবে। ”
স্তব্ধ পরিবেশ স্তব্ধ রেখেই সকলে বাসায় ফিরে আসছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। বাসায় আজ রান্না নেই, খাওয়াদাওয়া নেই। মীম, আদিও আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরেছে। তিন বউ রান্নাঘরে দাঁড়িয়েই ঘন্টাখানেক আলোচনা করেছে৷ তিনভাইয়ের মনে কি চলছে কে জানে৷ তিন জনই তিনজনের রুমে বসে আছে৷ কি ভাবছে কে জানে!
তানভির বাসায় ফিরে আবার বেড়িয়েছে। টুকিটাকি কাজ ছিল সেগুলো শেষ করে বন্যাদের এলাকায় আসছে। কিন্তু বন্যার কোনো হদিস নেই৷ আজকের স্পেশাল দিনে বন্যার দেখা পাবে না ভাবতেই ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। সন্ধ্যার পর হয়ে গেছে, বন্যার বের হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু তানভিরের মন যেতেও চাইছে না৷ প্রায় ১ ঘন্টা অপেক্ষার পর তানভির বন্যাকে কল দিল, বন্যা কল রিসিভ করতেই তানভির বলল,
“এই মেয়ে, কোথায় আছো?”
তানভিরের ধমকের স্বরে বলা কথাতে বন্যা না চাইতেও কেঁপে উঠে। সদ্য ঘুম থেকে উঠা মেয়েটা নরম স্বরে উত্তর দিল,
“বাসায়। কেন?”
“আমি তোমাদের বাসার গলির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তাড়াতাড়ি আসো”
“মানে?”
“আসতে বলছি, আসো”
বলেই তানভির কল কেটে দিয়েছে। বন্যা শোয়া থেকে উঠে বসে। ফোনের নাম্বার টা আবারও চেক করে। সত্যি সত্যি তানভির ভাই, কিন্তু ওনি হঠাৎ এখানে এসে কল কেন দিবেন এটায় ভেবে পাচ্ছে না বন্যা। চোখে মুখে অল্প একটু পানি ছিটিয়ে টাওয়েল দিয়ে মুছলো কি না ছুটে গেল নিচে। সদ্য ঘুম থেকে উঠায় চুলের অবস্থাও নাজেহাল। কিন্তু আঁচড়ানোর সময় নেই। নিচে বন্যার ভাই টিভি দেখছিল। বন্যাকে ছুটতে দেখে শুধায়,
“ছোট্টআপু পাগলের মতো কোথায় যাচ্ছিস?”
“সামনেই৷ ”
“কি হয়ছে আমায় বল”
“কিছু হয় নি। তুই টিভি দেখ”
বলেই বন্যা দৌড়ে বেড়িয়ে গেছে। গলির ঠিক সামনেই তানভির দাঁড়িয়ে আছে। তানভিরকে দেখামাত্রই দৌড়ের গতি কমে গেছে৷ ধীর গতিতে এগিয়ে গেল। গলায় ওড়না প্যাঁচানো। চুল অগোছালো, মুখ মলিন হয়ে আছে৷ তানভির কপাল গুটিয়ে সূক্ষ্ম নেত্রে বন্যাকে নিরীক্ষণ করলো। বন্যা কিছু বলার আগেই তানভির ভারী কন্ঠে বলল,
“সন্ধ্যাবেলা চুল ছেড়ে বের হয়ছো কেন? আর চুলের এ দশা কেন? মাথায় ওড়না দাও। ”
বন্যা ওড়না মাথায় দিতে দিতে নিরুদ্বেগ কন্ঠে জবাব দিল,
“ঘুমাইছিলাম”
“অসময়ে ঘুমাও কেন? সন্ধ্যা বেলা ঘুমাতে নেই তুমি জানো না?”
“জানি। ঘুম পাচ্ছিলো তাই”
“হাতের কি অবস্থা দেখি”
বন্যা আস্তে করে হাত বাড়ালো। ব্যান্ডেজ খুলে ফেলছে। তানভির বন্যার হাতে ধরে ফোনের আলো দিয়ে ভালোভাবে হাতটা দেখলো। তারপর ধীর স্বরে বলল,
“দেখেশুনে কাজ করতে পারো না”
কিছু ঔষধ বন্যার হাতে দিয়ে বলল,
“এই ঔষধ গুলো ঠিকমতো খেয়ে। তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে। গতকালই নিয়ে আসতাম কিন্তু জরুরি কাজে বের হয়ছিলাম আর এত রাতে বের হতে পারবে না তাই আসি নি।”
“আমি ঔষধ খাচ্ছি ”
“আজ থেকে এগুলো খাবা, আন্দাজি আনি নি, ডাক্তারের সাথে কথা বলেই নিয়ে আসছি। এটুকু বিশ্বাস রাখতে পারো।”
“বিশ্বাসের কথা আসছে কোথা থেকে। আমি বলছিলাম”
“আর কিছু বলতে হবে না। খাবার গুলো খেয়ে নিও। নাও”
“এতকিছু কেন আনছেন? এসবের কোনো দরকার ছিল না।”
“তাহলে কি দরকার বলো, এনে দিয়ে যাচ্ছি। ”
“আল্লাহ! কিছুই দরকার নাই আমার। মেঘ কোথায়?”
“বাসায়।”
“কল দিলে কল ধরে না৷ একটু বলে দিবেন প্লিজ”
“বনু একটু টেনশনে আছে। টেনশন ফ্রী হলে নিজেই কল দিবে।”
বন্যা চিন্তিত কন্ঠে শুধালো,
“কি হয়েছে?”
“তেমন কিছু না। বাসায় একটু সমস্যা চলতেছে। জানোই তো, বনু অল্পতেই হাইপার হয়ে যায়। এই আর কি”
বন্যার মাথায় আবির ভাইয়ার কথায় ঘুরছে৷ বাসার আর কোনো সমস্যাও কথা বন্যার মাথার আসছে না। তবে কি আবির ভাইয়ার সঙ্গে সমস্যা হয়ছে। বন্যা উদ্বিগ্ন কন্ঠে আবারও প্রশ্ন করল,
“বাসায় কি সমস্যা হয়ছে বলা যাবে? প্লিজ”
“বনুকে জিজ্ঞেস কইরো বনুই বলবে। সন্ধ্যার পর এতক্ষণ বাহিরে থাকা ঠিক না। বাসায় চলে যাও।”
“জ্বি আচ্ছা৷ ধন্যবাদ। ”
বন্যা গলি দিয়ে চলে যাচ্ছে লাইটের আলোতে তানভির স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে সেই দৃশ্য দেখছে৷
এদিকে বাসার হিমশীতল পরিবেশ দেখে মেঘের খুব চিন্তা হচ্ছে।মেঘ বাসায় ফিরে ফুপ্পির সঙ্গে কথা বলেছে। বেশিকিছু সময় যাবৎ আবির সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। ড্রয়িং রুমে আর কেউ নেই। মেঘ বেলকনি থেকে আবিরকে দেখেই নিচে আসলো। আবিরের চোখ বন্ধ দেখে মেঘ মৃদুভাবে ডাকল,
“আবির ভাই”
আবির চোখ মেলে আড়চোখে তাকালো। কিছুই বলল না। মেঘ আবারও বলল,
“এখানে বসে আছেন কেন? রুমে যান”
“রুমে যেতে ভয় লাগতেছে। আব্বুর নিস্তব্ধতা আমায় খুব ভাবাচ্ছে। আর কারোর টা জানি না তবে আব্বুর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে। ”
“বড় আম্মুও খুব কষ্ট পাইছে। জান্নাত আপুর বিষয়টা আগে জানিয়ে দিলেই হতো।”
“আম্মুর কষ্ট পাওয়াটা আহামরি কিছু না। আমি বার বার বারণ করা স্বত্তেও আমার বউ ভাবতে হয় কেন? কয়েকবার বলার পরও যেহেতু মানে নি তাই আমি আর কিছু বলি নি৷ বউ ভাবতে থাকুক, আমার না হউক আসিফ ভাইয়ার বউ তো। আমি যেটা চাইছিলাম ওটা হয় নি৷ ”
“কি চাইছিলেন?”
“তানভিরকে দিয়ে জান্নাতকে আনাইছি। তানভির আর জান্নাতের বয়স কাছাকাছি। আমি ভাবছি আম্মু বা মামনি করলে, তানভিরকে নিয়ে সন্দেহ করবে৷ আর আমি ঐটাকে কাজে লাগাবো। উল্টো আমি ফেঁসে গেছি। আম্মু ডিরেক্ট আমার বউ বানানোর চিন্তা করে ফেলছে ”
“তারমানে এসব আপনাদের প্ল্যান?”
“হ্যাঁ। সবটায় পরিকল্পিত।”
“আগে যে বলছেন, আমার জন্য জান্নাত আপুকে আনছিলেন?”
“তোর জন্যই তো আনছি৷ ফুপ্পি কি তোর না? চান্স কি তুই পাস নি? তাহলে কার জন্য করছি এসব?”
মেঘ নিশ্চুপ। আবির পুনরায় বলল,
“তোর জন্য যদি শুধু শিক্ষক লাগতো তবে এই শহরে ভালো শিক্ষকের অভাব ছিল না। তারা তোকে দায়িত্ব নিয়ে পড়িয়ে চান্স ও পাওয়াতো। কিন্তু ফুপ্পির সাথে কিভাবে সম্পর্ক ঠিক করব তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। একমাত্র উপায় ছিল জান্নাত। জান্নাত তোকে পড়ালে আর তুই চান্স পেলে বাসার মানুষের জান্নাতের প্রতি পজিটিভ চিন্তা আসবে। তখন ধীরে ধীরে ফুপ্পির সংস্পর্শে আসা যাবে৷ আরেকটা হচ্ছে বউ বানানোর চিন্তা৷ ঐটা আসলে শুরুতে ছিল না। তানভিরকে দিয়ে আনাইছিলাম কারণ আমি দেশে ছিলাম না। দেশে ফিরে আমি টিচার কিভাবে পাবো। তাছাড়া জান্নাত যে রাকিবের বোন এটা জানলে সবাই সিউর ধরে নিতো আমার জান্নাতের সাথে সম্পর্ক৷ এজন্যই মূলত তানভিরকে দিয়ে আনানো৷ কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলো না৷ ”
মেঘ কপাল চুলকে বিড়বিড় করে বলে,
“আপনি খুব চালাক, মাগনা হি*ট*লা*র বলি না আপনাকে। ”
“চালাক আর হতে পারলাম কোথায়। নিয়তির বেড়াজালে বন্দি হয়ে আছি আমি । ”
“কি হয়েছে?”
“কিছু না। রুমে গিয়ে রেস্ট নে”
মেঘ রুমে এসে টেবিলের উপর মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। ২০-২৫ মিনিট পর আবির দরজায় আসলো, ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“আসবো?”
মেঘ মাথা তুলতেই দেখল আবির। মৃদু হেসে বলল,
“আসুন।”
আবির হাতে নুডলসের বাটি নিয়ে রুমে ঢুকলো। মেঘের টেবিলে নুডলসের বাটি রেখে বলল,
“রাতে রান্না করে নি। এটা খেয়ে নে”
“নুডুলস আপনি রান্না করছেন?”
“হ্যাঁ”
“আপনি নুডলসও রান্না করতে পারেন?”
“জ্বি ম্যাডাম”
“আর কি কি পারেন?”
“কি খেতে চান বলুন শুধু।”
“বাব্বাহ! এত কনফিডেন্স”
“হুমমমমমমমমম”
মেঘ মায়াবী দৃষ্টিতে আবিরকে দেখছে৷ আবিরের কন্ঠে এই হুমমমমমমম শুনলে অষ্টাদশীর কোমল হৃদয়ে ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। মাত্র রান্না করে আসায় আবির শরীর কিছুটা ঘেমে গেছে। ঘামে ভেজা কপালে চুল লেপ্টে আছে, নাকের ডগায় ঘাম চিকচিক করছে, দাঁড়ি গুলোতে চোখ পড়তেই অষ্টাদশী ঢোক গিলল। সম্পূর্ণ আবিরই অষ্টাদশীর প্রিয় তবে আবিরের দাঁড়ি অষ্টাদশীর ইমোশন৷ দাঁড়িতে নজর পড়তেই ছুঁতে ইচ্ছে করে আর কোনোভাবে স্পর্শ করলেও গা শিউরে ওঠে। আবিরের দাঁড়ি দেখতে দেখতে আবিরের গালে কিস করার ঘটনা মনে পরে গেল৷ ওমনি মেঘ লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল৷ আবির মৃদুস্বরে শুধালো,
“কি হয়েছে? কোনো সমস্যা? ”
মেঘ মনে মনে আওড়াল,
“আপনি মানুষটা আগাগোড়ায় সমস্যা। মায়ার চাদরে আবদ্ধ করে দিককে দিন আমার প্রগাঢ় মনকে অনুগ্র করে তুলছেন।”
“কি ভাবছিস?”
“তেমন কিছু না”
“বল শুনি”
“বলব?”
“বল”
“ধমক দিবেন না তো?”
“নাহ। ধমক দিব না৷ তোর মনে যা যা অজ্ঞাত কথা আছে বল। সব শুনবো আমি।”
“আমি….”
বলতেই মেঘের ফোনে কল বেজে উঠলো। মেঘ ফোন হাতে নিতেই দেখলো মিনহাজের কল। আবিরের চোখে মিনহাজ নাম পরা মাত্রই আবিরের রগে রগে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে গেছে। রাগে শরীর গরম হতে শুরু করেছে। চোখ রক্তাভ হয়ে গেছে। মেঘ কল কেটে দিয়েছে, তারপরও আবার কল দিয়েছে। আবির ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রাগ কমানোর চেষ্টা করছে। আজকের স্পেশাল দিনে আবির মেঘকে একটুও সময় দিতে পারে নি ৷ তাই ভেবেছিল আজ মেঘের মনের সুপ্ত অনুভূতি জানবে। যতটা সম্ভব মেঘকে আশ্বস্ত করবে। কিন্তু মিনহাজ কল দিয়ে সব ধ্বংস করে দিয়েছে। মিনহাজের ২য় কল রিসিভ করল মেঘ। মিনহাজ আধোআধো কন্ঠে বলল,
“বেবি, Happy Valentine’s Day”
কথা কানে ঢুকা মাত্র আবিরের কান দিয়ে গরম বাতাস বের হতে শুরু করেছে। ক্রোধে এক হাতে কপালের দুপাশ চেপে ধরেছে। বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না। বসা থেকে উঠে দীর্ঘ কদম ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেছে।
মেঘ আবিরের প্রস্থানের শব্দ শুনেই ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো। রাগে গজগজ করতে করতে মিনহাজকে বলল,
“হারামী, রাখ তোর ভ্যালেন্টাইন৷ আমার ভ্যালেন্টাইনের ১৮ টা বাজায় দিছস৷ আমায় বেবি বলবি না বানর। তুই জীবনেও ভালো হবি না। কল কেটে দেয়ার পরও বার বার কেন কল দিচ্ছিস। আমার কপাল টায় খারাপ। দূর ভাল্লাগে না। বাই”
মেঘ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কল কেটে দিয়েছে। আবির ভাই যখনই মেঘের কাছাকাছি আসে, একটু শান্তশিষ্ট ভাবে কথা বলে তখনই কেউ না কেউ বাঁধা দেয়, মেঘের মেজাজ চরমে। বন্যা ফোন দিচ্ছে৷ কল কেটে রাগে ফোন বন্ধ করে রেখে দিয়েছে। এদিকে আবিরের আক্রোশ ক্রমে ক্রমে বাড়ছে। নিজের প্রতি বড্ড রাগ হচ্ছে। আজ মনে হচ্ছে মিনহাজ আর তামিমকে প্রথম দিনই ওয়ার্নিং দেয়ার দরকার ছিল। তানভির আর রাকিব এতবার বলার পরও আবির সায় দেয় নি, প্রতিনিয়ত এদের আচরণে নিজেই অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে।
আবির আজ পর্যন্ত মেঘকে ভালোবেসে বেবি ডাকতে পারলো না, কোথাকার কোন ছেলে বেবি বলে সম্বোধন করছে। আবির বারান্দার গ্রিলে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে৷ ক্ষণে ক্ষণে রক্ত টগবগ করে উঠছে৷ ঘন্টাখানেক পর আবির আবারও নিচে আসছে। রাত ১২ টা নাগাদ সোফাতেই শুয়ে ছিল। ১২ টার পর রুমে গিয়ে ঘুমিয়েছে ৷ একঘন্টাও হয় নি নিচে চিল্লা চিল্লির শব্দে আবির তাড়াহুড়ো করে ছুটে আসে ৷ মেঘ, তানভির, ইকবাল খান, মোজাম্মেল খান সকলেই সজাগ হয়ে গেছেন। আবিরের আব্বুর শরীর খারাপ লাগছে। মাথা কেমন করছে৷ শরীর ঘামতেছে। ইকবাল খান আর মোজাম্মেল খান তড়িঘড়ি করে গাড়ি বের করতে চলে গেছেন। এদিকে মালিহা খানের কান্না বাকি দুজনেও থামাতে পারছেন না৷ হাসপাতালে যেতে চাচ্ছেন৷ আবির বুঝিয়ে শুনিয়ে মাকে রেখে গেছে। আবির আর তানভির আলী আহমদ খান কে বের করেছে। এদিকে মেঘকে অঝরে কাঁদছে, বড় আব্বুর সঙ্গে ও কে নিতেই হবে। ঘরে মায়ের কান্না থামাতে পারছে না। এদিকে মেঘ মেইন গেইট পেরিয়ে বাহিরে এসে কেঁদেই যাচ্ছে। রাত প্রায় দুটা বাজতেছে। আবির কয়েকবার মেঘকে ভেতরে যেতে বলেছে কিন্তু মেঘ জায়গা থেকে নড়ছেও না। বাধ্য হয়ে আবির এসে মেঘের দু চোখ মুছে৷ দুগালে হাত রেখে গুরুতর কন্ঠে বলল,
“কান্না করিস না, প্লিজ। আব্বুর কিছু হয়নি৷ মনে হচ্ছে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় প্রেশার বেড়েছে৷ তোরা সবাই যদি এভাবে কান্না করিস আমি কিভাবে সবকিছু সামলাবো বল? তুই আম্মুর কাছে যা, প্লিজ৷ আম্মুকে শান্ত করে ঔষধ খাইয়ে দিস। আর আম্মুর কাছেই থাকিস। ”
মেঘ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“ঠিক আছে”
(চলবে)