#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৫৪
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_
আলী আহমদ খানকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানালেন সিরিয়াস কোনো সমস্যা নেই, অতিরিক্ত উৎকন্ঠায় প্রেশার বেড়েছে। প্রেশার স্বাভাবিক করার জন্য একটা ইনজেকশন আর স্যালাইন করা হয়েছে। আবির আলী আহমদ খানের বেডের পাশেই বসে আছে। ঘন্টাদুয়েক পর আবিরের আব্বু কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছেন। ভোর ৪ টার দিকে ওনাকে বাসায় আনা হয়েছে। বাসার পরিস্থিতি বেশ শান্ত। আবির আগেই ফোন করে জানিয়েছিলো তেমন কোনো সমস্যা নেই। হালিমা খান, আকলিমা খান সোফায় বসে আছেন, মীম, আদি ঘুমে, মালিহা খান ঘুমাচ্ছেন, মেঘ ওনার চুলে তেল দিয়ে ম্যাসেজ করে দিচ্ছে৷ রুমে ঢুকতে গিয়ে সে দৃশ্য দেখে আবিরের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুঁটলো। আলী আহমদ খান বিছানায় শুয়ে নিরুদ্যম কন্ঠে বললেন,
“আবির, তোমার সাথে আমার কথা আছে।”
আবির খুব ভালোকরেই বুঝতে পারছে তার আব্বু কোন বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন৷ কিন্তু এই অবস্থায় কথা বলা একদম ঠিক হবে না। তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে নেয়া তে বড়সড় কোনো সমস্যা হয় নি৷ আর একটু দেরি হলে হার্ট অ্যাটাক অথবা স্ট্রোক পর্যন্ত হতে পারতো। আবির অক্রূর স্বরে জানালো,
” আপনার এখন ঘুমানো দরকার। কথা পরেও শুনা যাবে।”
আলী আহমদ খানের ভেরতটা ছটফট করছে। খুব অস্বস্তিতে ভুগছেন। আকুল কন্ঠে বললেন,
“খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। শুনো”
আবির কিছুটা নিচু হয়ে আলী আহমদ খানের হাতটা শক্ত করে ধরে আব্বুর চোখে চোখ রেখে অক্লিষ্ট কন্ঠে বলল,
“আমি বললাম তো শুনবো। কিন্তু এখন না। আপনি ঠান্ডা মাথায় ঘুমান, আমি এখানেই আছি। আপনার যখন ঘুম ভাঙবে আমি তখনই শুনবো। ”
আবির একটা চেয়ার এনে বিছানার পাশে বসে আব্বুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে মেঘ বিছানার অপর পাশে বসে বড় আম্মুর মাথায় ম্যাসেজ করে দিচ্ছে। মালিহা খানকে ঘুমের ঔষধ খাওয়ানো হয়েছে তাই কিছুই টের পান নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আলী আহমদ খান ঘুমিয়ে পরেছেন। আবির তখনও মাথায় কাছেই বসে আছে৷ আচমকা আবিরের নজর পরে মেঘের দিকে৷ ছোট ছোট দুটা হাতে কত সুন্দর ভাবে চুলে ম্যাসেজ করে দিচ্ছে! আবিরের দৃষ্টি স্থির হলো, বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে হিসেবে বাবা মাকে দেখে রাখার দায়িত্ব আবিরের৷ আবিরের জীবনসঙ্গী হিসেবে মেঘ নিজেও যত্নের সহিত আবিরের আম্মুকে ঘুম পাড়াচ্ছে৷ না চাইতেও আবিরের ঠোঁটে হাসি ফুটলো। মেঘের এদিকে মনোযোগ নেই। বড় আব্বু ঘুমাচ্ছে দেখে সেও আর সেদিকে তাকাচ্ছে না। আবির হাসি আড়াল করে শ্লথগতিতে বলল,
“তুই ঘুমাতে যা। আমি আছি, সমস্যা নেই।”
” আমার ঘুম পাই নি, ঘুম পেলে না হয় চলে যাব।”
“সকাল হতে চললো৷ তোর ঘুমানো উচিত। ”
মেঘ ধীরেসুস্থে বলল,
“ঘুমানো তো আপনারও উচিত। এত রাত পর্যন্ত সোফায় শুয়ে ছিলেন, রুমে গিয়ে আদো ঘুমিয়েছেন কি না কে জানে! আপনার চোখ লাল হয়ে আছে। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে ঘুম প্রয়োজন। কই আপনি তো ঘুমাতে যাচ্ছেন না!”
আবির নিরবে হেসে সাবলীল ভঙ্গিতে বলল,
“বাহ! এত সূক্ষ্ম নজরদারি কবে থেকে শুরু করলি?”
মেঘ বিড়বিড় করে বলল,
“আপনি দেশে ফেরার পর থেকেই”
আবিরের ফোন ভাইব্রেট হচ্ছে। পকেট থেকে ফোন বের করতেই দেখলো ফুপ্পি কল দিচ্ছে। আবির যেই উঠতে যাবে খেয়াল হলো আলী আহমদ খান আবিরের হাতে ধরে রেখেছেন। আবির হাতের দিকে তাকালো, আব্বুর হাত ছাড়িয়ে বের হওয়ার সাধ্যি তার নেই। তাই মেঘের দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে তপ্ত স্বরে বলল,
“সাবধানে কথা বলিস”
মেঘ ফোন হাতে নিতেই স্ক্রিনে ফুপ্পি লেখা দেখে তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। আবিরের আব্বুকে হাসপাতালে নেয়ার সময় আবিরের ফুপ্পি আবিরকে কল দিয়েছিলেন কিন্তু আবির রিসিভ করতে পারে নি। হাসপাতালে যাওয়ার পর তানভিরকে কল দেয়ায় তানভির আব্বু, কাকামনির আড়ালে গিয়ে শুধু জানিয়েছিল,” বড় আব্বু অসুস্থ। হাসপাতালে আনা হয়েছে।” এরপর আর কথা হয় নি৷ তানভির বাসায় এসে ফোন চার্জে দিয়ে শুতেই ঘুমিয়ে পরেছে, মেঘ ফোন রুমে ফেলে নিচে আসছিলো আর রুমে যায় নি। অবশেষে বাধ্য হয়েই আবিরকে কল দিয়েছেন৷ মেঘ রুম থেকে বের হতে হতে কল রিসিভ করল, ফুপ্পি আর্তনাদ করে বললেন,
“ভাইজান এখন কেমন আছে বাবা?”
মেঘ নরম স্বরে বলল,
” বড় আব্বু মোটামুটি সুস্থ আছেন। বাসায় নিয়ে আসছে৷ এখন ঘুমাচ্ছেন। তুমি টেনশন করো না, ফুপ্পি।”
“মেঘ?”
“হ্যাঁ ফুপ্পি৷”
“আবির কোথায়?”
“আবির ভাই বড় আব্বুর কাছে বসে আছে৷ তাই আমাকে ফোন দিয়েছেন।”
“বাসার সবাই ঠিক আছে তো?”
“আলহামদুলিল্লাহ ঠিক আছেন৷ বড় আব্বু বাসায় আসার পর সবাই বড় আব্বুকে দেখে ঘুমাতে গেছেন।”
“তোর আব্বু কেমন আছে?”
“আব্বুর কথা কি বলবো! সেই যে চুপ করেছেন এখন পর্যন্ত কারো সাথে কথা বলছেন না। আম্মুর সঙ্গেও কথা বলছেন না। তুমি চিন্তা করো না ফুপ্পি, নিজের যত্ন নিও, এখন ঘুমিয়ে পরো।”
“আচ্ছা তোরাও সাবধানে থাকিস। সম্ভব হলে আবিরের একটু যত্ন নিস৷ ছেলেটা মাত্রাতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে। ”
“আমার কথা শুনবে নাকি, এক ধমক দিয়ে ১০ হাত দূরে ফেলে দিবে। ”
মাহমুদা খান মৃদু হেসে বললেন,
“তুই বুঝাইয়া বলিস। ”
“আচ্ছা। বলবো। এখন রাখছি, আল্লাহ হাফেজ। ”
“আল্লাহ হাফেজ।”
মেঘ কথা শেষ করে আবিরের কাছে ফোন নিয়ে গেল। আবির ফোন নিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
” ঘুমাতে যা।”
মেঘ মাথা নিচু করে ধীর কন্ঠে বলল,
“আমি থাকি এখানে!”
আবির কপাল কুঁচকে তাকালো, মেঘ চোখ তুলতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। আবির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” রাত জেগে শরীর খারাপ করার কোনো প্রয়োজন নেই। রুমে যা। ”
মেঘ আবিরের পানে চেয়েই গাল ফুলিয়ে ওষ্ঠ উল্টালো। বড় আব্বু, বড় আম্মুকে রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না, চোখে ঘুমও নেই তাছাড়া এখানে থাকলে আবির ভাইয়ের কাছাকাছি থাকতে পারতো৷ অভিমান জমেছে মনের কোণে। আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারী করে বলল,
” কথা বললে একটু মানিস। প্লিজ!”
মেঘ আর কিছু বললো না। আবির ভাইয়ের শান্ত অথচ শক্ত কন্ঠের কথাতে আবেগ, অনুভূতি, তীব্র অধিকারবোধ লুকিয়ে আছে তা বুঝতে পেরেই মেঘ চুপচাপ রুমে চলে গেছে। হাতমুখ ধৌয়ে ওজু করে নামাজ পরে একেবারে শুয়েছে। কিন্তু চোখে বিন্দুমাত্র ঘুম নেই। গতকালের ঘটনাগুলো বার বার মাথায় ঘুরছে। গোমড়া মুখো আবির ভাইয়ের পরিবর্তনটা আজ মেঘের মনে বার বার খোঁচা দিচ্ছে। আবির দেশে আসার পর মেঘের সঙ্গে তেমন কথায় বলতো না, বললেও চোখে মুখে সবসময় রাগ, ক্রোধ থাকতো, হুটহাট ধমক দিয়ে বসতো। অথচ ধীরে ধীরে আবির কেমন যেন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এখন আর আগের মতো রাগ দেখায় না, মেঘের উপর শুধুশুধু চেঁচায় না, কিছু জিজ্ঞেস করলে শীতল কণ্ঠে উত্তর দেয়৷ আর যত্ন তো কয়েকগুণ বেড়েছে। আবিরকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই মেঘ ঘুমিয়ে পরেছে৷
প্রায় ৮ টা নাগাদ মালিহা খান সজাগ হয়েছেন। আবির তখনও চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। মালিহা খান শুয়া থেকে তাড়াতাড়ি উঠে বসলেন। উদ্বিগ্ন কন্ঠে আবিরকে প্রশ্ন করলেন,
“তোর আব্বুকে নিয়ে কখন বাসায় আসছিস? ডাকিস নি কেনো আমায়?”
“৪ টার দিকে আসছি। তুমি ঘুমাচ্ছিলে তাই ডাকি নি।”
“তোর আব্বু ঠিক আছে তো?”
“আলহামদুলিল্লাহ। একদম সুস্থ আছে। শুধু প্রেশার টা একটু বাড়তি। আজেবাজে চিন্তাভাবনা বাদ দিতে বলছেন ”
মালিহা খান করুণ দৃষ্টিতে আবিরের মুখের পানে তাকিয়ে আছে তারপর মোলায়েম কন্ঠে শুধালেন,
“সারারাত ঘুমাস নি?”
“নাহ”
“রুমে গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নে৷ আমি আছি তোর আব্বুর কাছে৷ ”
” সমস্যা নেই৷ আব্বু উঠুক পরে যাব। ”
মালিহা খান তেমন জোর করলেন না। বাবার অসুস্থতায় ছেলে পাশে থাক এটা সব মায়েরাই চাইবে৷ মালিহা খান ওঠে ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন৷ ততক্ষণে সকালের নাস্তা প্রায় রেডি হয়ে গেছে। বাড়িতে একজন হেল্পিং হ্যান্ড আছেন যিনি প্রায় ১৫ বছর যাবৎ এই বাড়িতেই থাকেন৷ ওনার নাম খোদেজা। ওনার হাসবেন্ড এই বাড়ির দারোয়ান, বাড়ির দেখাশোনা ওনারা দুজন মিলেই করেন। ওনাদের ২ জন মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়েটা এবার ক্লাস ৬ এ পড়ে৷ তাদের খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে, মেয়ের পড়াশোনার খরচ সহ সব দায়িত্বই আবিরের আব্বুর। আবিরদের মেইন গেইটের পাশেই ওনাদের থাকার জন্য দুটা রুম করে দিয়েছেন। ওনি সব কাটা-বাছা করে দেন৷ কিন্তু রান্না বেশিরভাগ সময় মালিহা খান নিজেই করেন। মালিহা খানের রান্না ছাড়া আবিরের আব্বু খেতে পারেন না। অসুস্থতার কারণে সব রান্না করতে না পারলেও আলী আহমদ খানের জন্য অল্পস্বল্প রান্না মালিহা খান ই করেন। এখন বেশিরভাগ রান্না হালিমা খান করেন। রান্না করাটা হালিমা খানের শখ। নতুন নতুন রেসিপি বানানো, বাড়ির সবাইকে তা খাওয়াতে ওনার বেশ ভালো লাগে। অন্যদিকে আকলিমা খান রান্না পারেন না বললেই চলে। মালিহা খান বা হালিমা খান রান্না করলে ওনি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেন মাঝে মাঝে লবণ চেক করেন। বড় দুই বউ অসুস্থ থাকলে বাধ্য হয়ে খোদেজা আফার সহযোগিতায় রান্না করেন তবে তা খাওয়ার যোগ্য হবে কি না সে বিষয়ে সবসময় চিন্তিত থাকেন। আবির আসার পর আরেকজন হেল্পিং হ্যান্ড এনেছে। ওনি ২-৩ ঘন্টার জন্য এসে ঝাড়ামোছা, কাপড় ধৌয়া সাথে অন্যান্য কিছু কাজ করে দিয়ে যান।
আজ মালিহা খান, হালিমা খান দুজনেই উঠতে দেরি করেছেন । তাই আকলিমা খান আর খোদেজা আফা মিলে নাস্তা রেডি করেছেন। মালিহা খান রান্নাঘরে এসে আবিরের জন্য হালকা নাস্তা নিয়ে রুমে চলে গেছেন। আম্মুর কর্মকাণ্ডে আবির বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোমাকে নাস্তা আনতে কে বলছে? ভালো না লাগলে শুয়ে ঘুমাও।”
“তোর আব্বুর জন্য রান্না করতে হবে।”
” এই অবস্থায় রান্না করতে যাবে?”
“ওরা সব রেডি করে রেখেছে, শুধু রান্নাটা করবো ”
আবির রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“যা খুশি করো৷ তোমাদের কাউকে কথা মানাতে পারলাম না! ”
আবির দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মালিহা খান খানিক হেসে বেড়িয়ে গেলেন৷ মালিহা খান ড্রয়িং রুম পর্যন্ত যেতেই মেঘ নেমে আসলো। মালিহা খানের আগে রান্নাঘরে ছুটে গেলো। সবাই আলী আহমদ খানের রান্নার বিষয়েই কথা বলছিলো। মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
“বড় আব্বুর জন্য আজ আমি রান্না করবো। ”
আকলিমা খান হেসে বললেন,
“মেঘ, তুই রান্না কবে শিখলি৷ ”
“আজকে শিখবো৷ তারপর রান্না করবো!”
মালিহা খান তটস্থ হয়ে বললেন,
“না রে মা৷ তোর রান্না করতে হবে না। তোর বড় আব্বু এমনিতেই অসুস্থ। রান্না ভালো না হলে খেতে পারবে না।”
“রান্না একবারে ভালো না হলে প্রয়োজনে ৫ বার করবো। তবুও আমিই রান্না করবো। তুমি শুধু বসে বসে আমায় দিক নির্দেশনা দিবে৷ ”
“মা রে পাগলামি করিস না। ”
মেঘ শক্ত কন্ঠে বলা শুরু করল,
“ডিসিশন ফাইনাল। রান্না আমিই করবো। আমি এই বিষয়ে আর কোনো কথা শুনতে চাই না। তোমরা সবাই রান্নাঘর থেকে যাও। ডাইনিং থেকে নির্দেশনা দিলেই চলবে।”
বড় আব্বু, আব্বু, আবির ভাই যেভাবে নিজের মর্জি চালান মেঘও আজ ঠিক সেভাবেই বলেছে। মালিহা খান সহ বাকিরাও আশ্চর্য নয়নে মেঘকে দেখছে। সামান্য নুডলস করতে গেলে যে মেয়ে ১০ বার আম্মু, বড় আম্মু অথবা কাকিয়াকে ডাকতে থাকে সে আজ রান্নার জন্য সবাইকে রান্নাঘর থেকে বের করে দিচ্ছে। ভাবা যায়! মালিহা খান ডাইনিং এ বসেই মেঘকে নির্দেশনা দিচ্ছে মেঘ সে অনুযায়ী রান্না করছে। ১ বারের জায়গায় ১০ বার লবণ চেক করছে, তরকারি হয়েছে কি না সেটাও বুঝতে পারছে না৷ আবার কাউকে কাছেও আসতে দিচ্ছে না। মালিহা খানের কথা মতো বড় আব্বুর জন্য দুটা তরকারি রান্না করেছে। রান্না শেষে ছুটে গেলো বড় আব্বুর রুমে বড় আব্বু উঠেছে কি না দেখার জন্য। ৩ দিনের অনিদ্রায় আবিরের চোখ ঘুমে টানছিল তাই চেয়ারে হেলান দিয়েই ঘুমিয়ে পরেছিলো। মেঘের নুপুরের শব্দে সহসা ঘুম ভেঙে গেছে। ক্ষুদ্র পরিসরে তাকাতেই চোখে পরলো মেঘের নাজেহাল অবস্থা। গ্যাসের তাপে ঘেমে একাকার হয়ে গেছে, যে মেয়ে আজ পর্যন্ত টানা ১০ মিনিট চুলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে নি সে আজ প্রায় ১-১.৩০ ঘন্টা যাবৎ রান্না করেছে। চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। আবির সূক্ষ্ম নেত্রে মেঘকে দেখে মৃদুগামী কন্ঠে বলল,
“তোর এই অবস্থা কেন?”
মেঘ উত্তর না দিয়ে উল্টে প্রশ্ন করল,
“বড় আব্বু এখনও উঠে নি?”
“নাহ।”
“আচ্ছা ”
মেঘ চলে যাচ্ছে। আবির পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠে আবারও প্রশ্ন করল,
“আমি কি জিজ্ঞেস করছি?”
“এমনি।”
বলেই মেঘ চলে গেছে। আবিরের দুশ্চিন্তার কমতি নেই। আব্বু,আম্মু, মেঘ, ফুপ্পি প্রত্যেকের চিন্তা এক আবিরের মাথায় সেই সঙ্গে নিজের ব্যবসা, আব্বুর ব্যবসা, তানভিরের চিন্তা তো আছেই। একা একজনের পক্ষে কতদিন সামলানো সম্ভব!
৯ টার দিকে আলী আহমদ খানের ঘুম ভাঙে। সজাগ হয়ে আবিরের দিকে ঘুম ঘুম চোখে তাকাতেই আবির কোমল কন্ঠে প্রশ্ন করল,
” এখন কেমন লাগছে?”
“কিছুটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। তুমি ঘুমাও নি?”
আবির মলিন হাসলো। আব্বুকে ধরে বিছানা থেকে উঠিয়ে ওয়াশরুম পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। আলী আহমদ খান অনেকটায় সুস্থ। একায় চলতে পারবেন তবুও আবির রিস্ক নিতে চাই না। আলী আহমদ খান ফ্রেশ হয়ে বিছানায় এসে বসতেই আবির প্রেশার মাপার যন্ত্র নিয়ে আসলো৷ প্রেশার এখন আগের থেকে অনেকটায় স্বাভাবিক হয়েছে।
আলী আহমদ খান গুরুভার কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,
“তানভির কোথায়? ওঠেনি এখনও?”
“বলতে পারছি না৷ দেখতে হবে। ”
“তানভিরকে ডাকো। তোমাদের দু’ভাইয়ের সাথে আমার কথা আছে ”
আবির ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আগে খাবার খেয়ে ঔষধ খাবেন তারপর কথা শুনবো।”
আলী আহমদ খান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“তুমি আমার কথা গুরুত্ব দিচ্ছো না, আবির!”
আবির ঠোঁটে হালকা হাসি রেখে বলল,
“আপনার সুস্থতার থেকে আশা করি কথাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ না। আপনি সুস্থ থাকলে একটা কেনো লক্ষকোটি কথা বলতে পারবেন।”
আলী আহমদ খান নিশ্চুপ। আবির রুম থেকেই উচ্চস্বরে বলল,
“আম্মু, আব্বুর জন্য খাবার পাঠাও। ”
একটু পরই মেঘ খাবার নিয়ে রুমে ঢুকলো। আবির কপাল গুটিয়ে চেয়ে আছে। মেঘ ভাতের প্লেট রেখে আবারও ছুটলো একে একে সব নিয়ে আসছে। মালিহা খান রুমে এসে বিছানার পাশে বসে আবিরের আব্বুর সাথে কথা বলছে। এই সুযোগে আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাঁচালো। মেঘ শুধু মুচকি হাসলো। আবিরের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। মালিহা খান এবার খাবারের প্লেট এগিয়ে দিয়ে উদ্দীপ্ত স্বরে বলল,
“নিন খেয়ে বলুন, রান্না কেমন হয়েছে”
আলী আহমদ খান অল্প খেয়ে কপাল খানিকটা কুঁচকালো। সে দৃশ্য দেখে ভয়ে মেঘের বুক কেঁপে উঠেছে৷ স্বয়ং আবির ভাই এখানে উপস্থিত, রান্না খারাপ হলে আজ খবরই আছে। আলী আহমদ খান আর একটু খেয়ে হাসিমুখে বললেন,
“আজকের রান্নার স্বাদ অন্যরকম৷ এ রান্না তো তোমার না৷ কে রান্না করেছে?”
মালিহা খান চোখের ইশারায় মেঘকে দেখালো। আলী আহমদ খান অবাক চোখে মেঘের দিকে তাকালো৷ আলী আহমদ খানের থেকেও কয়েকগুণ বেশি অবাক হয়েছে আবির। বিপুল চোখে তাকিয়ে আছে মেঘের দিকে। মেঘ লজ্জায় মাথা নিচু করে রেখেছে৷ আলী আহমদ খান খেতে খেতে মেঘের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তা শুনে মেঘ লজ্জায় লাজুকলতায় ন্যায় নুইয়ে পড়ছে৷ আবিরের বৃহৎ আঁখি যুগল মেঘেতে স্থির হয়ে আছে। মেঘ রান্না করেছে এটা আবিরের কাছে অবিশ্বাস্য ঘটনা। সহসা আবিরের মনে দুশ্চিন্তা হানা দিলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেঘকে আপাদমস্তক পরখ করতে লাগলো। রান্না করতে গিয়ে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না তাই দেখে নিলো। আবিরের হৃদয় খুঁড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেড়িয়ে আসলো। মনের ভেতর কিসের একটা ভালোলাগা কাজ করছে। প্রতিনিয়ত মেঘের বিষ্ময়কর কর্মকাণ্ডে আবির অভিভূত হয়ে যাচ্ছে। মেঘের দায়িত্ববোধ, চলাফেরাতে আমূল পরিবর্তন, আচরণ কথাবার্তাতেও আকাশপাতাল পার্থক্য। ছটফটে, অল্পবয়স্ক মেয়েটা কদিনেই কেমন যেন দায়িত্বশীল মেয়ে হয়ে উঠেছে৷ কথায় পূর্ণ ম্যাচিউরিটি, হুটহাট রেগে যায় না, রাগলেও তা নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে যাচ্ছে। আবিরের আব্বু আম্মুর প্রতি যত্ন দেখে আবির নবরূপে অষ্টাদশীর প্রেমে পড়ছে। আবির ভাবতেও পারে নি তার ছোট্ট চড়ুইপাখি এত দ্রুত বদলে যাবে। প্রেমিকা সুলভ আচরণের মেয়েটা দিনকে দিনকে বৌয়ের ন্যায় আচরণ করছে। অষ্টাদশীর উষ্ণ আত্ততায় আবিরের বক্ষ অনুষঙ্গে আন্দোলিত হয়। আলী আহমদ খানের খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। আবির গলা খাঁকারি দিয়ে মেঘকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তানভির উঠেছে কি না দেখে আয়, উঠলে বলিস রুমে আসতে। ”
মেঘ ‘আচ্ছা’ বলে চলে গেছে। এরমধ্যে মোজাম্মেল খান রুমে আসছে। ভোর বেলা এবার দরজা পর্যন্ত এসেছিল। বড় ভাই ভাবির রুম, তাই ভেতরে আসে নি। দরজার বাহির থেকেই আবিরের সঙ্গে কথা বলে চলে গেছিলো। মোজাম্মেল খান আসতেই আলী আহমদ খান শান্ত স্বরে বললেন,
” আয়, ভেতরে এসে বস। ”
এরিমধ্যে তানভির আসলো। খাবার শেষ হতেই মেঘ প্লেট নিয়ে চলে গেছে। আবির আব্বুকে ওষুধ এগিয়ে দিয়ে পুনরায় চেয়ারে বসেছে। তানভির আবিরের পেছনে দাঁড়ানো, মালিহা খান আলী আহমদ খানের পাশেই বসা। মোজাম্মেল খান বিছানা থেকে কিছুটা দূরে চেয়ার নিয়ে বসেছেন৷ মেঘ দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ কেমন যেন স্তব্ধ। আলী আহমদ খান হঠাৎ ই দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে তপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“গতকাল রমনা পার্কে মহিলাকে দেখেছিলে তোমরা?”
আবির তানভির দুজনেই একসঙ্গে উপর নিচ মাথা নাড়লো। আবির মৃদুস্বরে বললো,
“জ্বি”
আলী আহমদ খান ঢোক গিলে অনুষ্ণ স্বরে বললেন,
” ওনি তোমাদের ফুপ্পি হয়। আমাদের একমাত্র বোন।”
আবির আর তানভির দুজনেই নিরুদ্বেগ। কেউ কোনো কথা বলছে না। দরজার পাশে মেঘও নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে৷ আলী আহমদ খান একে একে সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বললেন৷ তানভির, আবির আগে ফুপ্পির দিক থেকে ফুপ্পির সব ঘটনা শুনেছে আর আজ আলী আহমদ খানের মুখ থেকে সব শুনেছে। তারা আগে থেকেই ঘটনা জানে এরকম কোনো রিয়াকশন ই দেখায় নি। আবার কোনো প্রকার এক্সাইটমেন্টও প্রকাশ করে নি। আলী আহমদ খান ও মোজাম্মেল খান বোনের প্রতি নিজের আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করেছে। আলী আহমদ খান সবশেষে একটা কথায় বলেছেন,
” এই খানবাড়ি আমার অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে। সে শুধু আমার বোনকে নেয় নি, আমার পরিবারের সুখ শান্তি কেড়ে নিয়েছে। আমি তাকে কোনোদিনও ক্ষমা করব না।”
আবির ভারী কন্ঠে শুধালো,
” ২৮ বছরেও আপনার পরিবার পরিপূর্ণ হয় নি? আমরা কি তবে আপনার শান্তির কারণ নয়?”
আবিরের মুখে এমন কথা শুনে সকলেই আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে৷ আবির এমন কথা বলার ছেলেই না৷ আলী আহমদ খান হেসে বললেন,
“তা কেনো হবে! এখন তোমরায় আমার সব। তোমাদেরকে ঘিরেই আমার সব আশা ভরসা।”
“তাহলে এত বছর আগের ক্ষোভ এখনও কেনো পুষে রেখেছেন? আর আমাদেরকে কেনই বা বলছেন? সেই ক্ষোভ আমাদের মধ্যেও ঢুকাতে চাচ্ছেন?”
আলী আহমদ খান নিরুপায় হয়ে তাকিয়ে আছে৷ কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। এত বছর পর বোনকে দেখাতে নিজের আবেগ, অনুভূতি, রাগ,ক্ষোভ সব যেন একসাথে মিশে গেছে। মোজাম্মেল খান ধীর কন্ঠে বললেন,
“তোমাদের একজন ফুপ্পি আছে তা তোমাদের জানা দরকার সেজন্য জানানো হয়েছে। ”
আবির মৃদু হেসে বলল,
” আপনারা যদি নিজের ক্রোধ কমাতে না পারেন, আর ওনাকে এই বাড়ির চৌকাঠ পেরুতেই না দেন তবে আমাদের ফুপ্পি আছে কি নেই সেই কথা জেনে আমাদের কি কাজ?”
তানভির সন্দিহান চোখে চেয়ে প্রশ্ন করল,
“ফুপ্পি কে এই বাড়িতে আনা যায় না?”
“সেটা সময় বলে দিবে। ”
আরও কিছুক্ষণ চললো এই কথোপকথন। আবির বাবা চাচাকে ইচ্ছেকৃত খোঁচা দিয়ে কথা বলছে। যেন ওনাদের ভেতরের রাগ, ক্ষোভ কমে আসে। আবির রা ওনাদের সাপোর্ট করলে সেই রাগ কমার বদলে উল্টো বেড়ে যাবে। কথা শেষ করে আবির নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পরেছে। তিনদিনের ক্লান্তিতে চোখে ঘুম আঁচড়ে পরছে। অফিসে যাওয়ার বিন্দুমাত্র শক্তি নেই৷ রাকিবকে জানিয়ে দিয়েছে। সেই যে সকাল দিকে ঘুমিয়েছিল সেই ঘুম ভেঙেছে সন্ধ্যার আগে আগে। হাতমুখ ধৌয়ে তাড়াতাড়ি নিচে আসছে৷ সারাদিন ঘুমের কারণে আব্বুর খোঁজ নিতে পারে নি। রুমে ঢুকতে গিয়েই দেখলো আলী আহমদ খান বিছানায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। মেঘ পাশের চেয়ারে বসে বড় আব্বুকে পত্রিকা পড়ে শুনাচ্ছে৷ আবির তা দেখে রীতিমতো ভীমড়ি খেলো। মেঘের প্রতি দূর্বলতা ক্রমশ বাড়ছে। আবির ধীর গতিতে রুমে ঢুকে আব্বুর পায়ের কাছে বসলো। আস্তে করে ডাকল,
“আব্বু”
আলী আহমদ খান চোখ মেলে তাকালেন সঙ্গে সঙ্গে মেঘের পত্রিকা পড়াও বন্ধ হয়ে গেছে। আবির ধীরস্থির ভাবে জিজ্ঞেস করল,
” এখন শরীর কেমন?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
” ঔষধ ?”
আলী আহমদ খান মেঘের দিকে তাকিয়ে বললেন,
” আমার মা ই খাইয়ে দিয়েছে। সারাদিন ধরেই এখানে বসে আছে, রুমেই যাচ্ছে না। ”
আবির কপাল কুঁচকে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
” তোর ম্যাচিউরি আমায় প্রতিনিয়ত উন্মাদ করে তুলছে। এত ম্যাচিউর হয়ে যাচ্ছিস কেন তুই? সম্পূর্ণাঙ্গ বউ তো আমি চাই নি। আমার উগ্র, বদমেজাজি, উশৃংখল বউটাকে কি তবে হারিয়ে ফেলছি?”
(চলবে)