আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব-৬১+৬২

0
5571

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৬১
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

যাকে ঘিরে মেঘ লক্ষাধিক স্বপ্নের পাহাড় বুনেছে সেই আবির ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে সারারাত কাটিয়েছে এটা ভেবেই মেঘের দু’চোখ আনন্দে ছলছল করছে। বুকের ভেতর অজানা অনুভূতি জেগে উঠছে। আবিরের হাতের দিকে তাকিয়ে মেঘের মন অধিকতর পুলকিত হচ্ছে। মেঘ আড়চোখে নিগূঢ় দৃষ্টিতে আবিরের সুষুপ্ত ধৃষ্টতায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, চোখ সরানো বা পলক ফেলার কথা বেমালুম ভুলে গেল। অজান্তেই কাদম্বিনীর ঠোঁটে লেগে আছে ললিত হাসি। মেঘের স্বাভাবিক চেহারা মুহুর্তের মধ্যেই লজ্জায় লাল হয়ে গেছে, ক্ষণে ক্ষণে আবিরের অভিমুখে চেয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলছে, দুর্ভেদ্য আবেশে মেঘের চোখ টানছে। মনের বিরুদ্ধে নিজেকে অক্লিষ্ট রাখার নিরবধি চেষ্টা চালাচ্ছে। আচমকা মেঘের নিঃশ্বাস থমকে গেছে মনের কোণে একটা গূঢ় প্রশ্ন উদ্গত হলো। মেঘ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল,
” আবির ভাইয়ের জ্ঞান কখন ফিরেছে? আর ওনি কি সজ্ঞানে আমায় ধরেছেন নাকি ঘুমের ঘোরে?”

মেঘ শুকনো ঢোক গিলল। হুর হুর করে বুক কাঁপছে সাথে লজ্জায় রাঙা হয়ে আছে কাদম্বিনীর উজ্জ্বল চেহারা। এভাবে আর থাকা সম্ভব হচ্ছে না। মেঘের হৃদপিণ্ডের কম্পনে আবির যেকোনো সময় সজাগ হয়ে যেতে পারে তাই মেঘ ঘুরে কাঁপা কাঁপা হাতে আবিরের হাত টা সরিয়ে কোনোরকমে উঠলো। চুল ঠিক করে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে মাথায় ওড়না দিতে দিতে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিল। হাতে ফোন নেই, নেই কোনো ঘড়ি, কত বেলা হয়েছে তা বুঝার উপায়ও নেই। মেঘের দরজা খোলার শব্দে তানভির হকচকিয়ে উঠল। এসে ধীর কন্ঠে শুধালো,
“ভাইয়ার জ্ঞান ফিরেছে?”

মেঘ শান্ত স্বরে বলল,
“মনে হয় ফিরেছে। এখন ঘুমাচ্ছেন। ”

ভাই বোনের কথোপকথন শুনে রাকিবের ঘুম ভেঙে গেছে। তড়িঘড়ি করে উঠে উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন করল,

“আবির উঠেছে?”

মেঘ এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে বলল, “নাহ”।

মেঘ সাইড হয়ে দাঁড়াতেই রাকিব আর তানভির রুমে ঢুকলো। ওদের হালকা পাতলা কথাতে আবিরের ঘুম ভেঙে গেছে। আবির চোখ পিটপিট করে একে একে তানভির, রাকিব আর মেঘের দিকে তাকালো। সম্পূর্ণ রুমে একবার চোখ বুলিয়ে আবির পুনরায় তানভির আর রাকিবের দিকে তাকিয়েছে। রাকিব ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর মুখ করে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির এক মুহুর্ত চেয়ে থেকে অকস্মাৎ মলিন হাসলো। আবিরের হাসি দেখে রাকিবের মেজাজ গরম হচ্ছে।ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে রাকিব মেঘকে উদ্দেশ্য করে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“মেঘ তুমি একটু বাহিরে যাও তো। ”

মেঘ সরু নেত্রে রাকিবকে দেখে সাথে সাথে তানভিরের দিকে তাকালো। তানভির চোখ দিয়ে ইশারা করতেই মেঘ চুপচাপ রুম থেকে বেড়িয়ে গেছে। রাকিব রাগী স্বরে বলল,
“তানভির দরজা টা বন্ধ কর”

রাকিবের কথা মতো তানভির তাই করল৷ রাকিব আশেপাশে তাকিয়ে হঠাৎ ই এগিয়ে গিয়ে রুমের এক কর্ণার থেকে একটা পাইপ মাথার উপর তুলে দ্রুত আসতে নিলে,
আবির চেঁচিয়ে উঠে,
“এইইইই!”

তানভির রাকিবের দিকে তাকিয়ে সহসা ছুটে গিয়ে পেট বরাবর শক্ত করে ধরে বলল,
“কি করছো তুমি!”

রাকিব রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“ওর যে হাত আর পা টা ঠিক আছে ঐটাও ভেঙে ফেলবো। মরার যখন এত শখ তাহলে ভালো করেই মা*রি। ”

তানভির ধীর কন্ঠে রাকিবকে বলল,
“থাক বাদ দাও। এমনিতেই ভাইয়ার অবস্থা খারাপ। ”

রাকিব পাইপ হাতে নিয়ে আবিরের কাছে আসতে আসতে রাগে কটকট করে বলল,
” তোর ফা*টা মাথা আরও ফা*টিয়ে দিব?”

আবিরের ঠোঁটে এখনও হাসি লেগেই আছে। আবির মৃদু স্বরে বলল,
” তোর ইচ্ছে হলে দে ফাটিয়ে।”

রাকিব গম্ভীর মুখ করো বলল,
“আবির! তোর সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। তুই কিভাবে পারলি এমন কাজ করতে?”

আবির ভ্রু গুটিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আমি ইচ্ছে করে করছি নাকি!”

রাকিব পুনরায় বলল,
” মেঘ কি বলছে না বলছে তুই এতেই চটে গিয়ে মর-তে চলে গেলি? তুই কি ভাবছিলি, তুই মরে গেলেই সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে? আমাদের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতি ত! মেঘ বললেই হলো! প্রয়োজনে মেঘকে বিয়ের আসর থেকে উঠিয়ে এনে হলেও তোর সাথে বিয়ে দিব। আর কোন ছেলেকে সামান্য পছন্দ করে বলাতে তুই এমন কান্ড করে বসলি! মেঘের মনে যত যেই থাকুক সবগুলোকে মে*রে সেখানে তোর বসতি স্থাপন না করলে আমিও রাকিব না।”

আবির মুচকি হেসে বলল,
” আমার মেঘ আমার ছিল, আমার আছে আর আমৃত্যু আমার ই থাকবে। ও কোনো ছেলেকে পছন্দ করা তো দূর, কোনো ছেলের দিকে ভালোভাবে তাকিয়েই দেখে না। ওর মন মস্তিষ্ক জুড়ে এই আবির ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষের অস্তিত্ব নেই। আর কোনোদিন কেউ আমার কাদম্বিনীর প্রিয় পুরুষ হতে পারবেও না। এই কনফিডেন্স আমার আছে। ”

“তাহলে মিনহাজের থেকে ফুল নিল যে?”

“ফুল নিতে দেখছিস?”

“নাহ। কিন্তু”

“ছবি যা দেখছিস সবগুলোতে মিনহাজ ওকে ফুল অফার করছে। কিন্তু আমার মেঘ সেই ফুল ছুঁয়েও দেখে নি। ”

“তারপরও ঐ ছেলের সাহস কিভাবে হলো এভাবে মেঘকে ফুল দেয়ার?”

“এটা ওদের প্ল্যান ছিল। ওরা ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করার প্ল্যান করেছিল যাতে সেটা আমার চোখে পরে। কিন্তু আমি ওখানে চলে যাওয়াতে ওরা থতমত খেয়ে ফেলছে। ”

“তুই এসব কিভাবে জানিস? মেঘ বলছে?”

“আমি আগে থেকেই সব জানি তাছাড়া মেঘও কিছুটা বলছে। ”

“হারা*মী, তুই যদি আগে থেকেই সব জানতিস তাহলে এক্সিডেন্ট করতে গেছিলি কেন?”

আবির গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
” আমি মেঘকে বেশি কিছুই বলতাম না৷ বরং ওদের সাথে আড্ডা দিয়ে আমি ওকে নিয়ে চলে আসতাম৷ কিন্তু ঐ ছেলের এক্সট্রা কেয়ার দেখে সঙ্গে সঙ্গে পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেছিল। না বুঝেই হুট করে প্রশ্ন করে বসি, মেঘ সেই ছেলেকে পছন্দ করে কি না! আমার ১০০% এর জায়গায় ১০০০% কনফিডেন্স ছিল মেঘ না বলবে। অন্তত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ও কোনোদিন মিথ্যা বলতে পারবে না। কিন্তু ও যখন আমার চোখে চোখ রেখে হ্যাঁ বললো তখন এক মুহুর্তের জন্য মনে হচ্ছিলো আকাশটা বোধহয় আমার মাথায় ভেঙে পরেছে। আমি দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পাচ্ছিলাম না। আমি আগে থেকেই জানি এসব কিছু ওদের প্ল্যান, ওরা আমার মুখ থেকে কিছু শুনতে চাচ্ছে কিন্তু ওর “হ্যাঁ” শুনার পর নিজের উপর উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম। যখন বুঝতে পেরেছি এখানে থাকাটা রিস্ক তখন ই আমি সেখান থেকে চলে গেছি।”

“একটু শান্ত থাকলেই মাথাটা ঠিক হয়ে যেত। তাহলে এভাবে এক্সিডেন্ট করতে হতো না! ”

“আরে বাবা, আমি ইচ্ছেকৃত এক্সিডেন্ট করি নি। আমি যেখানে জানি ও আমার, সেখানে এক্সিডেন্ট করে ম*রতে বসা বোকামি ছাড়া কিছুই না। ”

“তো করলি কিভাবে?”

“ফাঁকা রাস্তা, মন খারাপ তাই আমি মোটামুটি ভালো স্প্রীডেই বাইক চালাচ্ছিলাম। প্রায় জনমানবশূন্য এক জায়গায় হুট করে এক পাগল বাইকের সামনে চলে আসছে। পাগলের অবস্থা তো জানিস ই, রাস্তার মাঝখানে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছে। যখন বুঝতে পারছি পাশ কেটে যাওয়া কষ্টকর হবে ততক্ষণে প্রায় কাছাকাছি চলে গেছি, পাগলের আলামত দেখতে দেখতে স্প্রীড ব্রেকার খেয়াল ই করি নি আচমকা ব্রেক করাতে স্প্রীড ব্রেকারে ধাক্কা লাগছে। এমনিতেই মাথা ভর্তি দুশ্চিন্তা, ধাক্কা খাওয়ায় বাইক কন্ট্রোল করার কথা ভুলেই গেছিলাম। এরপর কি হয়ছে জানি না।”

তানভির তপ্ত স্বরে বলল,
“বড় আব্বু কাল বেশি কিছু বলে নি। আজকে তোমার খবর ই আছে।”

আবির মলিন হেসে হঠাৎ ই সূক্ষ্ণ নেত্রে তানভিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“তুই ওদের কিছু করিস নি তো?”

রাকিব হেসে বলল,
“বেশি কিছু করে নি। জাস্ট ২ দফায় হালকার উপর ঝাপসা আপ্যায়ন করেছে আর কি!”

আবির সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে পুনরায় শুধালো,
“রাকিব যা বলছে সত্যি? কি করছিস তুই?”

তানভির চোখ নামিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
” যা করার তাই করেছি। তোমার তাদের নিয়ে ভাবতে হবে না।”

“এখন কোথায় আছে?”

“আছে কোনো এক জায়গায়৷ ”

“তুই বন্যার সামনে মে-রেছিস?”

“হ্যাঁ!”

“তোরে আমি কি বুঝাইলাম তানভির! আর তুই এটা কি করলি?”

“আমি এত মেপে চলতে পারবো না ভাইয়া৷ । ঐটা পাবলিক প্লেইস না হলে আর রাকিব ভাইয়ারা আমায় না আটকালে গতকাল ঐখানেই ঐ ছেলেকে খু**ন করতাম। ”

আবির শান্ত স্বরে বলল,
” যুদ্ধ হয় সমানে সমানে। ওরা যতই লাফালাফি করুক না কেন, তোর, আমার কাছে ওরা এখনও অনেক ছোট। ”

তানভির ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ছোট হয়ে বড়দের মতো আচরণ করেছে তাই আমিও আমার রূপ দেখিয়েছি। ”

“তোর আচরণে বন্যার তোর প্রতি বিদ্বেষ না চলে আসে!”

“আসলে আসুক। আমার জীবনে আমার ভাই-বোনের সামনে বাকি সবকিছু গুরুত্বহীন। সে যদি এতটায় ম্যাচিউর হয় তাহলে আশা করি অবশ্যই বুঝবে।”

আবির টুকটাকি কথা বলে হঠাৎ ই গুরুতর কন্ঠে বলল,
” আমার জান টা বাহিরে একা আছে। তানভির দেখ তো, আমার ময়নাপাখি টা কি করছে!”

রাকিব মৃদু হেসে বলল,
“এত পিরিত দেখাতে হবে না। তোর বাসর করার ইচ্ছে ছিল আমাদের জানাতি। সম্পূর্ণ অফিস সাজিয়ে, প্রকাণ্ড আয়োজন করে তোদের বাসরের ব্যবস্থা করতাম।”

আবিরের চোখ উজ্জ্বলতায় ঝলমল করছে, মুখে লাজুক হাসি। তানভির নিঃশব্দে হেসে পা বাড়াতেই রাকিব সহসা উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো,
“বাই দ্য ওয়ে, বাসর রাত কেমন কাটলো আবির?”

আবির ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে উদাসীন কন্ঠে বলল,
“ফুলের সুভাস ছাড়া বাসর রাতের সৌন্দর্য ফিকে মনে হচ্ছিলো। ফুল দিয়ে সাজাতে পারলি না ?”

রাকিব আবারও চেচিয়ে উঠল,
“বাঁশ কই রে। বাঁশটা আন কেউ। ”

তানভির মেঘকে ডেকে নিয়ে আসছে। মেঘ নাকের ডগা পর্যন্ত ওড়না টেনে রেখেছে৷ মেঘ রুমে আসতেই আবির আড়চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে । কিন্তু মেঘের দৃষ্টি নিচের দিকে। ঘুরে এসে কোনোরকমে আবিরের পায়ের কাছে মাথা নিচু করে বসলো। তানভির আর রাকিব নাস্তা আনতে বেড়িয়ে গেছে। রুমে শুধু আবির আর মেঘ। আবির এক দৃষ্টিতে মেঘকে দেখছে। পাতলা ওড়নার আড়ালে মেঘের কুন্ঠ অভিমুখে আবির নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। তৎক্ষনাৎ রুমে আলী আহমদ খান সহ মালিহা খান এবং হালিমা খান ঢুকলেন। আলী আহমদ খান রাগী স্বরে বললেন,

“জ্ঞান ফিরেছে তাহলে”

আবির খানিক হাসলো আর কিছুই বলল না। আলী আহমদ খান গুরুতর কন্ঠে শুধালেন,
“তুমি কি ঠিক করেই নিয়েছো, তোমার আম্মু আর আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবে না?”

আবির কন্ঠ খাদে নামিয়ে শান্ত স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
“আপনাদের শান্তির জন্য প্রয়োজনে নিজের মনকে পু*ড়িয়ে ছারখার করে দিব।”

আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে শুধালেন,
“তানভির কোথায়?”

“নাস্তা আনতে গেছে। ”

আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,
“তোমাদের মতো বয়সে বিজনেস করে একা হাতে সংসার সামলিয়েছি। আর তোমরা? আজকে তুমি এক্সিডেন্ট করে পরে আছো, দুদিন পর তানভির এক্সিডেন্ট করবে। এই বয়সে এসেও তোমাদের জন্যই টেনশন করতে হবে নাকি?”

আবির মৃদু হেসে ভারী কন্ঠে বলল,
“এই তানভির, তুই কিন্তু কোনোভাবেই এক্সিডেন্ট করিস না। ”

তানভির “আচ্ছা” বলতেই আলী আহমদ খান পেছন ফিরে তাকালেন। তানভির রুটি কলা আরও অন্যান্য খাবার নিয়ে আসছে। মালিহা খান শীতল কণ্ঠে আবিরকে বললেন,
” সাবধানে গাড়ি চালাতে পারিস না? ”

হালিমা খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
” খাবার নিয়ে আসছি। আগে খাবার খেয়ে নে।”

মেঘ নিরব দর্শকের মতো মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে। মালিহা খান আবিরের হাত মুখ ধৌয়ে দিয়েছেন। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে দেখে গেছেন। ডাক্তার চলে যাওয়ার পর মালিহা খান নিজের হাতে আবিরকে খাইয়ে দিতে লাগলেন।তানভির, রাকিব ও খাচ্ছে। হালিমা খান স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালেন,
“মেঘ তুই খাবি না?”

“খিদা নেই। পরে খাবো।”

আবির তানভিরের দিকে তাকিয়ে ইশারা দিতেই তানভির বসা থেকে উঠে এসে স্বাভাবিক কন্ঠে মেঘকে বলল,
“হা কর”

মেঘ বলে,
“খাবো না আমি।”

“হা করতে বলছি। ”

মেঘ মাথা তুলে অল্প করে হা করলো। তানভির মেঘকে খাইয়ে নিজেও খেয়ে নিয়েছে। খাওয়া শেষ হওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে জান্নাত আর আবিরের ফুপ্পি রুমে ঢুকলো। ওনাদের দেখে সবাই আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে। আলী আহমদ খান বোনের দিকে এক পলক তাকিয়ে ভারী কন্ঠে বললেন,

“তুই এখানে? তোদের কে খবর দিয়েছে?”

জান্নাত ধীর কন্ঠে বলল,
“আসসালামু ওয়ালাইকুম। আমার ভাইয়া আমাদের খবর দিয়েছেন।”

মাহমুদা খান কোনো কথা বললেন না । ভেতরে এসে আবিরের দিকে তাকিয়ে তপ্ত স্বরে বললেন,
“এখন শরীর কেমন?”

আবির আড়চোখে মেঘের দিকে তাকালো সহসা স্বাভাবিক কন্ঠে জবাব দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। ”

আলী আহমদ খান গম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন,
“তোমার ভাইয়া কে?”

জান্নাত রাকিবের দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে বলল,
“রাকিব ভাইয়া। ”

মালিহা খান বিস্ময় সমেত একবার রাকিবকে দেখল আবার জান্নাত কে। হুবহু চেহারার মিল না থাকলেও দুজনের চোখ দেখতে একই রকম। মালিহা খান কন্ঠ ভারী করো প্রশ্ন করলেন,
“তুমি রাকিবের কেমন বোন?”

“আপন বোন।”

আলী আহমদ খান রাকিবের দিকে তাকিয়ে প্রখর তপ্ত স্বরে শুধালেন,
“জান্নাত তোমার বোন?”

“জ্বি আংকেল। আমার একমাত্র বোন।”

হালিমা খান আর মালিহা খান শুধু মুখ চাওয়া চাওয়ি করছেন। মালিহা খান প্রশ্ন করলেন,
” তুমি রাকিবের বোন সে কথা আগে বলো নি কেন?”

“কখনো তেমন প্রয়োজন হয় নি সেজন্য আর বলা হয় নি। ”

“আবির কে চিনতা না?”

“জ্বি। মোটামুটি চিনতাম। ”

আলী আহমদ খান জান্নাতকে প্রশ্ন করলেন,
“কিন্তু তোমাকে তো তানভির বাসায় আনছিল৷ তানভিরকে তুমি কিভাবে চিনো?”

“তানভির ভাইয়ার সাথে একটা পোগ্রামে দেখা হয়ছিল।। পরিচয় দেয়ায় চিনতে পারছি। তখন কথায় কথায় ওনি মেঘের কথা বলছেন। মেঘের জন্য টিচার খোঁজছিলেন। তখন ভাবলাম মেঘকে আমিই পড়ায়, সেভাবেই মেঘকে পড়ানো শুরু। ”

হালিমা খান , মালিহা খান ও আলী আহমদ খানের একের পর এক প্রশ্নের প্রতিত্তোরে জান্নাত প্রতিবার ই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। কোনো প্রকার মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সাবলীল ভঙ্গিতে সকল উত্তর দিয়েছেন৷

আলী আহমদ খান অফিসে চলে যাবেন। সবার থেকে বিদায় নিয়ে দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার থমকে দাঁড়িয়েছেন। মাহমুদা খানের দিকে তাকিয়ে ভারী কন্ঠে বললেন,

“বাসায় আসিস।”

জান্নাত আলী আহমদ খানের দিকে তাকাতেই আলী আহমদ খান মৃদু হেসে বললেন,
“তোমার শ্বাশুড়িকে নিয়ে আমাদের বাসায় এসো।”

“জ্বি আচ্ছা। ”

#চলবে

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৬২
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

হাসপাতালের বেডে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে আবির। গতকাল এক্সিডেন্টের পর থেকে তানভিরের কাছেই আবিরের ফোন ছিল। তানভির আবিরের মাথার পাশে ফোনটা রেখে বেড়িয়ে গেছে। রাকিব ও চলে গেছে, বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। তানভির পার্টি অফিসের সামনে আসতেই দেখল, ভেতরে কয়েকজন কোনো বিষয় নিয়ে তর্কাতর্কি করছে। তানভির দ্রুত ভেতরে গেল। আজ থেকে ১৫ দিন আগে সংগঠিত এক পোগ্রামের ছোট খাটো ভুল ভ্রান্তি নিয়ে ২-৪ জন কথা বলছিল। সেটা এক পর্যায়ে তর্কে রূপ নিয়েছে। তানভির প্রথমে শান্ত থেকে থামানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু কারো থামার নাম নেই। অল্প বয়সে সবার রক্ত ই গরম থাকে। কারো মুখ থেকে সামান্য তম কথাও কেউ সহ্য করতে পারে না। বেসামাল পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তানভির উচ্চস্বরে ধমক দিতেই সকলে নিরব হয়ে গেছে। সময়টা যেন থমকে গেছে। সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। আবিরের বলা কথাগুলো মনে করে, তানভির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সাবলীলভাবে বুঝানোর চেষ্টা করলো। সবাইকে থামিয়ে তানভির নিজের চেয়ারে মাথা চেপে ধরে বসে আছে৷
গতকাল থেকে তানভিরের মেজাজ এমনিতেই খুব গরম, মেঘের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ, আবিরের এক্সিডেন্ট, মিনহাজ আর তামিমের প্রতি তীব্র আক্রোশে তানভিরের মেজাজ তুঙ্গে। তানভিরের নিজের বোনের প্রতি যতটা না ক্ষোভ ছিল তার চেয়ে বেশি রাগ হয়েছিল বন্যাকে সেখানে উপস্থিত থাকতে দেখে। বন্যার ম্যাচিউরিটি তানভিরকে বরাবরই মুগ্ধ করে। মেয়েটা কখনোই উশৃংখল আচরণ করে না, করলেও সেটা নির্দিষ্ট গন্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে। যেমন – মেঘদের সাথে থাকলে বন্যা ওদের মতোই দুষ্টামি, ফাজলামো করে। আবার বাড়িতে থাকাকালীন ছোট ভাইয়ের সাথে খুনসুটিতে মেতে থাকে অথচ স্যার-ম্যাম, তানভির, আবির কিংবা বড়দের সামনে একদম শান্তশিষ্ট ভাবে কথা বলে। বন্যার কথা আর আচরণ কোথাও কোনো প্রকার অভদ্রতার ছোঁয়া নেই। মেয়েটার রাগ বুঝারও কোনো উপায় নেই। গতকালের ঘটনায় বন্যার উপস্থিতি দেখে তানভির নিজেকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। আবির আর তানভির দুজনের দৃষ্টিতেই বন্যা মেঘের তুলনায় অনেকটায় পরিণত। কাউকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করলে, খুব করে কিছু আশা করে না পেলে তখন বুকের ভেতর যে আঘাত টা লাগে সেটা এত সহজে মুছে না। তানভিরের ক্ষেত্রেও এমনটায় হয়েছে। বন্যার প্রতি তানভিরের অন্ধ বিশ্বাস ছিল, বন্যা মেঘের সাথে থাকলে মেঘ কখনো ভুল বা অন্যায় কিছু করবে না। সেই বিশ্বাসটা বন্যা নষ্ট করে দিয়েছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে রাতে বন্যার উপর নিজের রাগ ঝেড়েছে। যদিও পরে সবটায় জেনেছে কিন্তু তখন কল দেয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। বন্যাকে ফোন দিবে ভাবতেই, পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট হতে শুরু করল। পকেট থেকে ফোন বের করতেই বন্যার নাম টা ভেসে উঠল। ওমনি তানভিরের ওষ্ঠপুট প্রশস্ত হলো। মাথা যন্ত্রণা, মনের অশান্তি যেন মুহুর্তেই গায়েব হয়ে গেছে। ফোন রিসিভ করে তানভির মোলায়েম কন্ঠে বলল,

“আসসালামু আলাইকুম ”

বন্যা ভয়ে ভয়ে বলল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আবির ভাইয়া কেমন আছেন? ”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। শুধু হাতে পায়ে আর মাথায় ব্যান্ডেজ করা তবে বিন্দাস আছে। ”
“Sorry”
“ওমা, সরি বলছো কেন?”
“এমনি। ভাইয়া কি এখনও হাসপাতালে? ”
“হ্যাঁ কালকে সম্ভবত বাসায় নিয়ে যেতে পারবো।”
“মেঘ কোথায় ?”
“হাসপাতালেই আছে। ”
“আপনি কোথায়?”
“আমি পার্টি অফিসে আসছি। তুমি কি করতেছো?”
“ভার্সিটিতে আসছি৷ মেঘ কি আজ বাসায় যাবে না? ও মনে হয় বাসায় ফোন রেখে আসছে। কথা বলতে পারছি না। ”

“আমি হাসপাতালে গিয়ে বনুকে ফোন দিব নে। তখন কথা বলে নিও। ”

“আচ্ছা। আর একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? ”

“তোমার বন্ধুদের কথা বাদ দিয়ে যা ইচ্ছে জিজ্ঞেস করতে পারো। ”

বন্যার মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। গতরাতেই তানভির নিষেধ করেছিল । কিন্তু ভার্সিটিতে এসে দুই বন্ধুকে না পেয়ে বন্যার মনটা খুঁত খুঁত করছে। তাই তানভিরকে জিজ্ঞেস করবে ভেবেছিল, অথচ তানভির আগে থেকেই সাবধান করে ফেলছে৷

বন্যা ধীর কন্ঠে বলল,
” আচ্ছা রাখি এখন।”

“কি যেন জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলে?”

“কিছু না। ভালো থাকবেন।”

তানভির মুচকি হেসে বলল,
“তুমিও ভালো থেকো। আর কোনো সমস্যা হলে জানিয়ো৷”

বন্যা কল কাটতে কাটতেই ঘুরতে নিলে আচমকা এক ছেলের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে যাচ্ছিলো। ছেলেটা দ্রুত সরে গিয়ে ভারী কন্ঠে বলল,
“এইযে খুকি, কানা নাকি? দেখে চলতে পারো না? ”

বন্যা ফোন কানে নিয়েই চোখ তুলে তাকালো। ছেলেটা বেশ ফর্সা, বন্যার তুলনায় হাইট অনেকটায় বেশি, চোখে সাদা গ্লাস, চুল গুলো গুছানো, পড়নে শার্ট তার উপর অ্যাপ্রন। বন্যা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকালো। ছেলেটা বিপুল চোখে বন্যার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। তানভির ফোনের ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,
” কে ধমক দিয়েছে?”

বন্যা ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
“চিনি না। রাখছি এখন।”

ছেলেটা কয়েক মুহুর্ত স্থির থেকে বন্যার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চলে যাচ্ছে। বন্যাও সূক্ষ্ম নেত্রে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটার চাল চলনের হঠাৎ পরিবর্তন দেখে বন্যার মনে খটকা লাগছে৷ তাছাড়া বন্যা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান দিয়ে সচরাচর কেউ হাঁটাচলাও করে না৷ তবে ঐ ছেলে কেন এদিকে আসবে। ছেলেটাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে ক্লাসের দিক থেকে সিনিয়র হবে, কিন্তু আগে কখনো এই ছেলেকে দেখেছে কি না সেটা মনে করতে পারছে না৷ ছেলেটা অনেকটা দূরে চলে গেছে, বন্যা আবারও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। বন্যার হঠাৎ ই মিনহাজের সাথে প্রথম দেখার ঘটনা মনে পরে গেছে। মিনহাজ ইচ্ছেকৃত ধাক্কা দিতে এসে নিজেই যেমন ভাব নিয়েছিল, তেমনি এই ছেলেও নিজে অন্য রাস্তায় এসে আবার ধমক দিয়ে বসলো। বন্যার এখন নিজের উপর বড্ড রাগ হচ্ছে। একটু আগে বিষয়টা খেয়াল করলে ছেলেটাকে অন্ততপক্ষে দুটা কথা বলতে পারতো। তানভির পুনরায় কল করছে। বন্যা কল রিসিভ করা মাত্রই তানভির আতঙ্কিত কন্ঠে শুধাল,
“কি হয়েছে? কে কি বলছে?”
” তেমন কিছু না।”
“সত্যি কথা বলো! আসবো আমি?”
“আরে না। সত্যি কিছু হয় নি। আপনার আসতে হবে না। ”
“Are you sure?”
“Yes. ”

“ঠিক আছে। ক্লাস শেষ করে বাসায় চলে যেও। ”
“জ্বি আচ্ছা। রাখছি৷”

বন্যা কল কেটে আবারও তাকালো, ততক্ষণে ছেলেটা কোথায় যেন চলে গেছে। এরমধ্যে লিজা আর মিষ্টি এসে বন্যার মাথায় গাট্টা মেরে উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন করল,

“কিরে তুইও কি লিফাত ভাইয়ার প্রেমে পরছিস?”

বন্যা কপাল কুঁচকে রাশভারী কন্ঠে শুধালো,
“লিফাত ভাইয়া আবার কে?”

লিজা হেসে উত্তর দিল,
” এইযে একটু আগে যার সাথে কথা বলছিলি, যার দিকে এইমাত্রও তাকিয়ে ছিলি তিনি হচ্ছেন লিফাত ভাইয়া। ৪র্থ বর্ষের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট বয়। ওনি যে কত মেয়ের ক্রাশ তার কোনো হিসেব নেই! এমনকি আমারও ক্রাশ। তা কি কথা বলছিলি রে?”

বন্যা রেগে বলল,
“কোনো কথায় বলি নি। তোর ক্রাশের সাথে কথা বলতে আমার বয়েই গেছে। আর একটা কথা, তোর ক্রাশের ক্যারেক্টারে সমস্যা আছে, বুঝলি!”

লিজা দাঁতে দাঁত চেপে কটকট করে বলল,
“তুই আমার ক্রাশকে নিয়ে একদম বাজে কথা বলবি না। ”

“বলতে চাই ও না। এমনকি তোদের সাথেও কথা বলতে চাই না। বাই”

বন্যা ক্লাসে চলে গেছে। বন্যার পিছু পিছু মিষ্টি আর লিজাও ছুটছে।এদিকে আলী আহমদ খান চলে যাওয়ার পর আরও ২-৩ ঘন্টা মাহমুদা খান হাসপাতালে ছিলেন, আবিরকে যতটা সম্ভব বুঝিয়েছেন। মালিহা খান আজ কম বেশি কথা বলেছেন, হালিমা খানের সাথেও পরিচিত হয়েছেন। প্রায় ১ টার দিকে ওনারা বাসার উদ্দেশ্যে চলে গেছেন। মালিহা খান আর হালিমা খান দুজনেই বাসায় যাওয়ার জন্য বলেছেন কিন্তু প্রতিত্তোরে মাহমুদা খান কিছুই বলেন নি। এত বছরের দূরত্বের পর হুট করে ঐ বাড়িতে চলে যাওয়া ওনার কাছেও স্বাভাবিক বিষয় না। এই বাড়ির সাথে জড়ানো আবেগগুলো কেমন যেন শক্ত পাথরে মুড়িয়ে আছে। সেই পাথর না গললে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে উঠা অসম্ভব ব্যাপার। আলী আহমদ খান মুখরক্ষার খাতিরে বোনকে বাসায় যেতে বললেও দুই ভাবি খুব আন্তরিকতার সহিত বাসায় যাওয়ার জন্য বলেছেন। দুপুরের পর পর ই ইকবাল খান, আকলিমা খান, মীম, আদি হাসপাতালে আসছে৷ আবিরের অসুস্থতার কথা তানভির বলতে চাই নি, তবে ইকবাল খান বার বার জোর করায় বাধ্য হয়ে বলেছেন। বলতে দেরি হলেও তাদের রওনা দিতে দেরি হয় নি। মীম আর আদি সারা রাস্তা কেঁদে কেঁদে এসেছে। আবিরের সাথে মীম খুব কম কথা বলে, হুটহাট দেখা না হলে মীম ইচ্ছেকৃত সামনেও পরে না। তবে ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি নেই তার। অন্যদিকে আদির আবদার করার একমাত্র জায়গায় আবির। বাহিরে থাকাকালীন ও ভিডিও কল দিয়ে প্রতিনিয়ত বলতো, ভাইয়া এটা নিয়ে এসো, ওটা নিয়ে এসো, কবে আসবা! এখনও তাই করে। হাসপাতালে এসে আবিরের অবস্থা দেখে দুই ভাই বোন ই থ মেরে গেছে। মাথায়, হাতে, পায়ে ব্যান্ডেজ দেখে আঁতকে উঠল। এমন অবস্থায় বাস্তবে কাউকে দেখেনি তারা, এই প্রথমবার আবিরকে দেখছে। আকলিমা খান ও অনেক বেশি আতঙ্কিত হয়েছেন, আবিরকে দেখেই আর্তনাদ শুরু করেছেন। ইকবাল খান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কিছুই বলতে পারছেন না। ওনার চোখে ভেসে উঠেছে বহু বছর আগে আলী আহমদ খানের এক্সিডেন্টের পরের দৃশ্য। তখন আলী আহমদ খান এক্সিডেন্ট করে প্রায় ৬ মাস বিছানায় ছিলেন। একই রূপে নিজের ভাইপো কে কখনো দেখতে হবে এটা ইকবাল খান কখনো কল্পনাও করেন নি। ইকবাল খান তাড়াতাড়ি আবিরের রিপোর্ট চেক করতে লাগলেন, হাত পায়ের অবস্থা বুঝার জন্য। মাথায় চাপ বেশি খেলেও হাতে আর পায়ে খুব বেশি সমস্যা নেই। ২১ দিন বেডরেস্টে থাকলে আশা করা যায় ঠিক হয়ে যাবে।

দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যে হতে চললো। দুপুরে সবাই অল্পস্বল্প খেয়েছে কিন্তু মেঘ কিছুই খায় নি। সেই যে আবিরের পায়ের কাছে বসেছিল সারাদিন যাবৎ সেখানেই বসে আছে। দু’হাতে দুই হাঁটু আঁকড়ে ধরে হাঁটুর উপর কাত করে মাথা রেখে অমত্ত আঁখিতে আবিরের অভিমুখে চেয়ে আছে। নাক অব্দি ওড়না টানা, আঁখি যুগল স্থির, প্রয়োজনের বাহিরে একবারের জন্যও পলক ফেলছে না৷ কখনো কখনো চোখের কার্নিশ দিয়ে অনর্গল গড়িয়ে পড়ছে নোনাজল। অতি সন্তর্পণে চোখের পানি মুছে আবারও চেয়ে আছে আবিরের দিকে। সারাদিনে “খাব না” ব্যতীত মেঘের মুখ থেকে আর কোনো কথা বের হয় নি। সকাল থেকেই আবির ক্ষণে ক্ষণে মেঘকে দেখছে কিন্তু আজ তার কিছু বলার সামর্থ্য নেই। আম্মু, মামনির সামনে মেঘকে যে দুটা কথা বলবে সেই পরিস্থিতিও নেই। কেউ আবিরের পাশ থেকে উঠে যাচ্ছেও না।

বিকেলে হালিমা খান , আকলিমা খানদের সাথে সাথে বাসায় গিয়ে রাতের জন্য রান্না করে সন্ধ্যায় আবারও হাসপাতালে আসছেন, ইকবাল খান সাথে আসছেন। আলী আহমদ খান ও অফিস থেকে সরাসরি হাসপাতালে আসছেন। মালিহা খান আর মেঘ দু’জনেই সারাদিন হাসপাতালে ছিল। আবির ঘুমাচ্ছে দেখে কেউ ডাকে নি৷ হালিমা খান এসে থেকে মেঘকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন। আলী আহমদ খান নিজেও ২ বার খাওয়ার কথা বলেছেন কিন্তু মেঘ নিশ্চুপ বসে আছে। বাধ্য হয়ে হালিমা খান তানভিরের নাম্বারে কল দিয়েছে। তানভির কল রিসিভ করতেই হামিলা খান বিরক্তি ভরা কন্ঠে বললেন,
“কোথায় তুই?”

তানভির উত্তর দেয়ার আগেই হালিমা খান পুনরায় বলে উঠলেন,
“যেখানেই থাকিস হাসপাতালে এসে তোর বোনকে খাইয়ে রেখে যা। আমি তোর বোনের সাথে আর পারব না!”

“আচ্ছা আসতেছি। তুমি কিন্তু বনুর সাথে রাগারাগি করো না।”

“তোর আর তোর বাপের আদরে মেয়েটা দিন দিন আরও বেশি জেদি হইতেছে। ”

“আমি এখনি আসতেছি”

২০ মিনিটের মধ্যে তানভির হাসপাতালে আসছে। মেঘ তখনও গুটিশুটি মেরে বসে আছে। তানভির ঢুকতেই মেঘ নড়েচড়ে বসল। তানভির ভারী কন্ঠে বলল,
“খাচ্ছিস না কেন?”
“খিদে নেই। ”
“বললেই হলো”

তানভির প্লেটে খাবার বেড়ে মেঘের সামনে ধরতেই মেঘ খাব না বলে তানভিরের দিকে তাকালো। তানভিরের অগ্নি দৃষ্টি দেখে মেঘ কিছু বলার সাহস পেল না৷ চুপচাপ খাওয়া শুরু করল। তানভিরও মেঘের সামনে চেয়ার নিয়ে বসে আছে। তানভির চাইলেও মেঘকে কিছু বলতে পারছে না, আবার না বলেও থাকতে পারছে না। কারণ মেঘের এরকম আচরণ বাসার মানুষের চোখে সন্দেহের সৃষ্টি করবে। সবাই যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল এই ফাঁকে তানভির দু একবার মেঘকে বাসায় যাওয়ার কথা বলেছে, ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়েওছে কিন্তু মেঘ মাথা দিয়ে না করেই যাচ্ছে। তানভির যখন বুঝতে পেরেছে মেঘকে রাজি করানো সম্ভব না তখন বাধ্য হয়ে মালিহা খানকেও থাকতে বলেছে। মেঘ, মালিহা খান আর তানভির ছাড়া বাকিরা বাসায় চলে গেছে। রাকিব অফিস শেষে হাসপাতালে আসছে তবে মালিহা খান উপস্থিত থাকায় কেউ কোনোপ্রকার উল্টাপাল্টা কথা বলছে না। তানভির আর রাকিব কিছুক্ষণ বসে তারপর বেড়িয়ে গেছে। অনেকক্ষণ পর তানভির ২ কাপ চা নিয়ে রুমে আসছে। এককাপ মালিহা খান আরেক কাপ মেঘকে দিয়ে তানভির নিজের ফোনটা মেঘকে এগিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
” তোর বান্ধবীর সাথে একটু কথা বলিস”

মেঘ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে গতকালের ঘটনা গুলো ভাবছে আর মনে মনে নিজেকে বকা দিচ্ছে। গতকাল হাসপাতালে আসার পর থেকে মেঘের মস্তিষ্কে আবির ভাই ব্যতীত আর কেউ নেই। দু এক বার বন্যার কথা মনে হলেও ফোন বাসায় ফেলে আসায় কল দিতে পারছিল না। মেঘ চা শেষ করে রুম থেকে বেরিয়ে বন্যাকে কল দিয়েছে।
মেঘ- আসসালামু আলাইকুম।
বন্যা- ওয়ালাইকুম আসসালাম। কিরে কেমন আছিস? শুনলাম আবির ভাইয়া এক্সিডেন্ট করছেন, এখন কেমন আছেন?

মেঘের গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। বন্যা শান্ত স্বরে বলল,
“এই মেঘ, কাঁদছিস কেন?”

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আজ আমার জন্য আবির ভাইয়ের এই অবস্থা হয়েছে। আমি কেন এমন করলাম! আমি এত বোকা কেন, বন্যা? ”

বন্যা মোলায়েম কন্ঠে বলে উঠল,
“তুই বোকা না তোর মনটা খুব অস্থির। থাক কাঁদিস না। ভাইয়া এখন কেমন আছেন বল”

“ডাক্তার ২১ দিন বেডরেস্টে থাকতে বলছেন। ২১ দিন পর আবার টেস্ট করলে বুঝা যাবে ঠিক হয়েছে কি না। ”
“কালকে নাকি বাসায় নিয়ে যাবে?”
“হ্যাঁ। কিন্তু.. ”
“কিন্তু কি?”
” ওনি গতকাল থেকে আমার সাথে কোনো কথা বলছেন না। হঠাৎ চোখে চোখ পরলেও সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নেন৷ আমি কি করবো এখন”

“ওনার রাগ করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এক ছেলের সাথে খেলছিলি বলে ক্লাস ৫ এ থাকাকালীন যে লোক তোর গালে থাপ্পড় মারতে পারেন সেখানে তুই এক ছেলেকে ভালোবাসিস বলার পর কিভাবে ভাবিস পরিস্থিতি শান্ত থাকবে।”

“ওনি আমায় থাপ্পড় মারলেও আমি এতটা কষ্ট পেতাম না। যতটা কষ্ট এখন হচ্ছে। নিজের উপর আর মিনহাজদের উপর এত রাগ হচ্ছে… ”

“এখন অন্ততপক্ষে শান্ত থাকিস প্লিজ, আর কোনো ভুল করিস না। তোর ভাই মিনহাজদের যা করার করে ফেলছে। ”

“মানে?”

“গতকাল থেকে মিনহাজদের কোনো খোঁজ নেই, ফোন বন্ধ, আজ ক্লাসেও আসে নি। তোর ভাই বলছে ৩ দিন পর নাকি ওদের খোঁজ পাবো। আমাকে এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে নিষেধ করেছেন। ”

“কি বলছিস এসব!”

“ঠিকই বলছি। তুই ভুলেও এই প্রসঙ্গে কিছু বলিস না।গতকাল থেকে তোদের টেনশনে আমি ঘুমাতে পারছিলাম না। ”

মেঘ আর বন্যা প্রায় ৩০-৪০ মিনিট কথা বলার পর ফোন রেখে তানভিরকে ফোন দিয়ে আসছে। কোনোরকমে রাত কাটিয়ে সকাল থেকেই আবিরকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় লেগেছে। ডাক্তার চেকাপ করে রিলিজ দেয়া মাত্রই বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে৷ এ অবস্থায় সিঁড়ি দিয়ে উঠা নামা করতে সমস্যা হবে বিধায় আবিরের জন্য নিচের একটা গেস্ট রুম গুছানো হয়েছে। আপাতত কিছুদিন এখানেই থাকবে, পা ঠিক হলে উপরে চলে যাবে। মেঘও নিজের রুমে চলে গেছে। আবিরের দিকে যতবার তাকায় ততবারই মেঘের নিজের প্রতি ঘৃণা হয়। মেঘ বাসায় ফিরে সেই যে রুমে ঢুকেছে সন্ধ্যার পর হয়ে গেছে অথচ মেঘ একবারের জন্যও নিচে আসছে না। আদি ২-৩ বার দরজা পর্যন্ত গিয়ে মেঘকে ডেকে এসেছে, কিন্তু মেঘ আসে না। বাধ্য হয়ে মীম মেঘের রুমে গেল৷ দরজার সামনে থেকে “আপু” বলে ডাকতে ডাকতে ভেতরে ঢুকলো। মেঘ টেবিলের উপর দু’হাতে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে। চুল এলোমেলো থাকার কারণে মেঘের মুখ দেখার অবস্থা নেই। মীম কাছে এসে ডাকল,

“আপু!”

মীম কয়েক মুহুর্ত পরই বুঝতো পারল মেঘ ফুঁপাচ্ছে। মীম যথাসাধ্য মেঘের চুলগুলো ঠিক করতে করতে মলিন স্বরে বলল,

“আপু তোমার কি হয়েছে? কাঁদতেছো কেন?”

মেঘের কান্নার তীব্রতা বাড়ছে। আরও বেশি ফুঁপাচ্ছে, মীম আতঙ্কিত কন্ঠে মেঘকে ডাকতে লাগলো। মেঘ অনেকক্ষণ পর মুখ তুলে তাকালো। কান্নার তোপে মেঘের মুখ লাল টকটকে হয়ে গেছে। চোখ বেয়ে অনর্গল পানি পরছে। বাঁধহীন এই জলের ধারার কোনো অন্ত নেই। মীম অবুঝ মেয়ের মতো চেয়ে আছে, প্রশ্ন করার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। মেঘ আচমকা মীমকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। মীমের মন ব্যাকুল হয়ে আছে, অনেকক্ষণ পর মৃদুস্বরে শুধালো,

“আপু কাঁদছো কেন? কি হয়েছে তোমার? প্লিজ বলো আমাকে ”

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে বলা শুরু করল,
” আমি আবির ভাইকে অনেক ভালোবাসি৷ আমার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি। ওনার অস্তিত্ব ব্যতীত আমি আমার সত্তা কল্পনা করতে পারি না। আমার সামান্য ভুলের কারণে আজ আবির ভাইয়ের এই অবস্থা।আমি নিজকে ক্ষমা করতে পারবো না রে। ”

বিস্ময়ে মীমের চোখ তিনগুণ বড় হয়ে গেছে। মীম আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
“তুমি আবির ভাইয়াকে ভালোবাসো?”

“হুমমমমমমম।”

“কবে থেকে?”

“দেশে আসার পর থেকেই।”

মীম আর্তনাদ করে উঠল,
“তুমি আমাকে এতদিনে বলতেছো!”

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি এখন কি করব? ওনার সামনে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না। ”

“কেন? তুমি কি ভাইয়ার মাথা ফাটাইছো নাকি?”
“আমার জন্যই ওনি এক্সিডেন্ট করেছেন।”
” হ্যাঁ বলছে তোমায়! ভাইয়ার কপালে এক্সিডেন্ট লেখা ছিল তাই করেছেন। চলো তো!”
“নাহ। আমি যাব না। ”

মীম দুহাতে মেঘের চোখের পানি মুছে শক্ত কন্ঠে বলল,
“চলো আমার সঙ্গে। আমিও একটু দেখি ভাইয়ার সাথে তোমায় কেমন মানায়!”

মেঘ সিক্ত আঁখিতে তাকিয়ে মলিন হাসলো। মীম টানতে টানতে মেঘকে নিয়ে যাচ্ছে। মীমের টানের কারণে মেঘের আধখোলা চুল সম্পূর্ণ খুলে গেছে। আদুরে রূপ কেমন যেন ফ্যাকাশে দেখা যাচ্ছে । মীম মেঘের হাত ধরে টানতে টানতে সিঁড়ি এসেই চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
“আপু একটা প্রশ্ন করি?”

মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“কি?”

“তোমার আর আবির ভাইয়ার বিয়ে হলে আমি তোমাকে কি ডাকবো? আর আবির ভাইয়াকেই বা কি.. ”

কথা সম্পূর্ণ করার আগেই মেঘ একহাতে মীমের মুখ চেপে ধরে রাগী স্বরে বলল,

“ভুলেও যদি বাসার কারো সামনে এ ধরনের কথা বলিস না, খু*ন করে ফেলবে আমায়।”

“কেন?”
“পরে বলবো।”

“আচ্ছা ঠিক আছে।”

মীম আর মেঘ আবিরকে দেখার জন্য ড্রয়িংরুম পেরিয়ে গেস্টরুমে আসছে। দরজায় দাঁড়িয়ে মীম হালকা করে কাশি দিল৷ আবির তখন পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ফোন দেখছিল, ফোনের স্ক্রিন জুড়ে আবিরের কাদম্বিনীর এক উজ্জ্বল ধৃষ্টতার বিচরণ । মুখে তার মিষ্টি হাসি, ডাগর ডাগর আঁখি জোড়া তাতে গাঢ় করে কাজল রেখা টানা, আবির নেশাক্ত দৃষ্টিতে সেই ছবিটা দেখছিল। ছবির মালিক বহুবছর আগেই আবিরের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। অকস্মাৎ শব্দ হওয়ায় আবিরের ধ্যান ভেঙ্গেছে। মুহুর্তেই ফোন রেখে চোখ তুলে তাকালো। সরাসরি নজর পরে মীমের দিকে, সূক্ষ্ম নেত্রে তাকাতেই মীমের পেছনে মেঘকে দেখতে পেল।

মীম দরজা থেকে বলল,
“ভেতরে আসবো, ভাইয়া?”

“আয়”

মীম মেঘকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো৷ মেঘ চিবুক গলায় নামিয়ে রেখেছে। মীম টুকটাক কথা বলেছে কিন্তু মেঘ মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে আছে। মেঘের নিরবতা আবিরেরও সহ্য হচ্ছে না তাই বাধ্য হয়ে মীমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আম্মুকে বল আমায় খাবার দিতে ।”

মীম “আচ্ছা” বলে মেঘের হাত ছেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেছে। আবির কয়েক মুহুর্ত মেঘের দিকে তাকিয়ে রইলো, কতক্ষণ যাবৎ মেঘকে দেখছে তার হিসেব নেই। হঠাৎ রাশভারি কন্ঠে বলল,

” সারাদিন শেষে এতক্ষণে আমার কথা মনে পরলো?”

মেঘ মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে আছে। থরথর করে হাতপা কাঁপছে। আবির বারবার সূক্ষ্ণ নেত্রে মেঘের দিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎ মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,

“কি হয়েছে তোর?”

মেঘ কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,
“I am Sorry Abir Vai”

“সরি কেন?”

“আপনার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী!”

আবির চোখ ঘুরিয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে ঠাট্টার স্বরে বলল,
” কেন? তুই পেত্নী সেজে আমাকে ধাক্কা মারছিলি নাকি?”

আবিরের এমন কথা শুনে মেঘ সহসা চোখ তুলে তাকালো। আবিরের মুখে হাসি দেখে মেঘ কপাল কুঁচকে আহাম্মকের মতো চেয়ে আছে। আবির মৃদু হেসে বলল,
“এখানে বস এসে”

মেঘ চুপচাপ এসে বসলো। কিছুক্ষণ নিরব থেকে মেঘ আবারও কান্না শুরু করে দিয়েছে, মেঘের কান্না দেখে আবির থতমত খেয়ে গেছে। তড়িঘড়ি করে বলল,

” এইইইই, আর কত কাঁদবি! দুদিন যাবৎ কেঁদেই যাচ্ছিস। এবার অন্তত থাম প্লিজ।”

মেঘের কান্না থামার কোনো লক্ষণ না দেখে আবির গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
“এভাবে কেঁদে কি প্রমাণ করতে চাস?”
“মানে?”
” আমি তোকে মারি, তোকে কাঁদায় এসবই প্রমাণ করতে চাস? ”
“নাহ।”

“তাহলে এভাবে কাঁদছিস কেন? আমি কি মরে গেছি?”

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে আবিরের মুখ চেপে ধরে হুঙ্কার দিয়ে উঠল,
” আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি, ম*রার কথা কখনো মুখে নিবেন না।”

আবির আলতো ভাবে মুখে রাখা মেঘের হাতের উপর হাত রেখে হাতটা কিছুটা সরিয়ে ঠোঁটে হাসি রেখে বলল,

” আর তুই যে এভাবে কাঁদছিস সে বেলায়?”

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে আবারও বলতে শুরু করল,
” আমি ভুল করেছি, আমায় মাফ করে দেন প্লিজ, আমি আর কখনও এমন কাজ করব না। মিনহাজদের সঙ্গে আর কখনো কথা বলবো না, কারো সাথেই মিশবো না। ”

আবির রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
” ভুল তুই না বরং আমি করেছি। আমার সেদিন বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করা উচিত ছিল।”

মেঘ চিৎকার করে উঠল,
“মানে?”

” আমার উচিত ছিল সামনে দাঁড়িয়ে মিনহাজের প্রপোজ করার স্টাইলটা দেখা। তাকে সাপোর্ট করা। আমার আসলে ঐ ভাবে রিয়েক্ট করা ঠিক হয় নি। সরি। আমি সুস্থ হলে তাকে বলিস আবার তোকে প্রপোজ করতে।”

“জীবনেও না। আমি আর কথায় বলবো না। আর আপনি প্লিজ আজেবাজে কথা বলবেন না।”

“আজবাজে কথা কি বললাম?”

“কিছু না।”

এমনসময় মীম খাবার নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। আবিরের হাতে মেঘের হাত দেখে মীম জোড়ে গলা খাঁকারি দিয়ে,

“আমি কি আসতে পারি?”

আবির তড়িঘড়ি করে মেঘের হাত ছেড়ে দিল, মেঘও কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে। মীম খাবার টেবিলে রেখে যেতে যেতে ঠাট্টার স্বরে বলল,

“আমি এখন চলে যাচ্ছি, পরে আবার আসবো কিন্তু। ”

মেঘ টেবিল থেকে প্লেট নিয়ে আবিরের দিকে এগিয়ে ধরল। খাইয়ে দিবে নাকি আবির ভাই নিজে নিজে খেতে পারবেন এ নিয়ে কনফিউশানে পরে গেছে।
আবির ভ্রু কুঁচকে ভারী কন্ঠে বলল,
” খাইয়ে দে।”

মেঘ ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে শুধালো,
“আমি খাইয়ে দিব ?”

” আশেপাশে কি আমার বউকে দেখতে পাচ্ছিস? পেলে আমার বউকে প্লেটটা দে, সে ই না হয় খাইয়ে দিবে। ”

মেঘ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে রাগী স্বরে বলল,
“হয়েছে। বউকে খোঁজতে পারব না। সারাদিন বউ বউ করলে আমি বড় আব্বুর কাছে বিচার দিব।”

“কি বিচার দিবি?”

“বলবো আপনি পাগল হয়ে গেছেন।”

“বলিস, আমিও বলবো। ”

“কি বলবেন?”

“তোকে যে রাস্তাঘাটে মানুষ প্রপোজ করে বেড়ায় সেটায় বলবো।”

“আমাকে প্রপোজ করে নি, আর যদি করেও তাতে আপনার কি! আপনার মতো না তো! আপনি যে গোপনে বউ বাচ্চা রেখেছেন! ”

“তারমানে আমার বউ, বাচ্চা আছে এটা তুই মেনে নিচ্ছিস?”

“নাহ। জীবনেও মানবো না। ”

আবির হেসে বলল,
” এখন কি খাওয়াবেন?”

“হুমমমমম।”

মেঘ আবিরকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে আবির ফুপ্পির বিষয় নিয়ে টুকিটাকি কথা বলেছে। এখন বাসায় আনলে ঠিক হবে কি না, কিভাবে আনবে সেসব বিষয়েই কথা বলেছে। মেঘের খাওয়ানো শেষে চলে যেতে নিলে মীম আবারও ছুটে আসছে। মিটিমিটি হেসে বলল,
“এত তাড়াতাড়ি খাওয়ানো শেষ?”

মেঘ মীমের মাথায় গাট্টা মেরে রাগী স্বরে বলল,
“রুমে চল, তোর ঠোঁট দুটা সেলাই করতে হবে।”

মীম হেসে আবিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাইয়া এখন ঘুমাও তুমি। আমরা চলে যাচ্ছি।”

মেঘরা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আলী আহমদ খান আবিরকে দেখতে রুমে আসছেন, সাথে মালিহা খানও এসেছেন। আবির আলী আহমদ খানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আব্বু একটা কথা বলব?”

“বলো”

” আপনি কি ফুপ্পিকে বাসায় আনতে চাচ্ছেন?”

“আমি আসতে বলেছি, তার ইচ্ছে হলে আসবে।”

“এভাবে বললে ফুপ্পি কোনোদিনও আসবে না। ভুলে যাবেন না ওনি আপনার ই বোন। আপনি যদি সত্যি চান ফুপ্পি বাসায় আসুক, তাহলে ফোন দিয়ে ভালোভাবে দাওয়াত দেন। ফুপ্পিদের বাসার সবাইকে নিয়ে আসতে বলুন। আর যদি না চান তবে ভবিষ্যতে মুখ রক্ষার্থে কখনো দাওয়াত দিবেন না, প্লিজ। ”

#চলবে