আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব-৬৭+৬৮

0
5007

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৬৭
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

আলী আহমদ খান আজ ফজরের নামাজ পরে বাসায় এসে পরেছেন। সোফায় হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। সচরাচর নামাজ শেষে ঘন্টাখানেক হাটাহাটি করে তারপর বাসায় ফিরেন, তবে আজ শরীর খারাপ লাগছিল বলে হাঁটতে যান নি। আবির বাসায় ফিরে আব্বুর সাথে একটু কথা বলে নিজের রুমে চলে গেছে। আবিরের পা মোটামুটি ঠিক হলেও শরীর এখনও বেশ দূর্বল। এজন্য আলী আহমদ খান আবিরকে অফিসে যেতে দেন না। বাসায় থেকে যতটা সম্ভব কাজ করে, বাকি সব কাজ ইকবাল খানরায় সামলায়।
ইদানীং আবিরের ঘুম ভাঙার পর পরই মেঘের যত্ন শুরু হয়। পা ঠিক হওয়ার পর থেকে আবির নামাজ পড়তে মসজিদে যায়, নামাজ থেকে ফিরতেই টেবিলের উপর কফি সাথে ইউনিক কিছু নাস্তা সাজানো থাকে। মেঘ তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করেই রান্না করতে যায়, আবির আর নিজের জন্য অল্পসল্প নাস্তা রেডি করে নিজের রুমে লুকিয়ে রাখে, আবির নামাজে গেলে চুপিচুপি আবিরের রুমে নাস্তা রেখে নিজের রুমে চলে আসে। আবির সব বুঝতে পেরেও মেঘকে কিছু বলে না, অবশ্য কিছু বলতেও ইচ্ছে করে না। আবির তার কাদম্বিনীর অতিরিক্ত যত্নে দিনকে দিন মেঘের প্রতি এতটায় আসক্ত হয়ে পরছে যা কোনোভাবেই কাটাতে পারছে না, নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। আবির এক্সিডেন্ট করার পর থেকে আবিরের প্রতি মেঘের দায়িত্ববোধ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে,সেই সাথে বুদ্ধিও বেড়েছে। এখন আর আগের মতো বাসার মানুষদের সামনে পাগলামি করে না, আবির কিছু বললে একবারেই মেনে নেয়, মুখের উপর প্রশ্নও করে না। আবির প্রতিদিনের মতো আজও রুমে এসে টেবিলে নাস্তা রাখা দেখে নিঃশব্দে হাসলো। নাস্তা শেষ করে আবারও ঘুমিয়ে পরলো। মেঘও নিজের রুমে নাস্তা করে পড়তে বসেছে। নিচে আলী আহমদ খান সোফায় চোখ বন্ধ করে বসে আছেন, মালিহা খান কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছেন কোনো সমস্যা কি না! কিন্তু ওনি কিছুই বলেন নি। অনেকক্ষণ পর ইকবাল খান বাজার নিয়ে বাসায় ফিরেছেন, ভাইজানকে মনমরা হয়ে সোফায় এভাবে বসে থাকতে দেখে ইকবাল খানও সোফায় গিয়ে বসলেন, শান্ত স্বরে শুধালেন,
“ভাইজান, তুমি কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত? ”

“নাহ, তেমন কিছু না। ”

“মনে হচ্ছে কোনো কিছু নিয়ে টেনশন করছো, আমায় বলো৷ ”

“কি বলবো বল, আবিরের ছন্নছাড়া আচরণগুলো আমাকে খুব ভাবাচ্ছে৷ নিজের মতো ব্যবসা করতে চাইছিল, সেখানে আমি জোর করে ও কে আমাদের ব্যবসায় জড়িয়েছি। আদোতে ওর মনে কি চলছে তাও বুঝতে পারছি না। ভেবেছিলাম ওকে বিয়ে করাতে পারলে, দুশ্চিন্তাটা অনেকটা কমে যাবে কিন্তু ও বিয়েও করবে না বলে দিল ৷ একমাত্র ছেলে, এতবছর দূরে ছিল বাসায় ফেরার পর যেন দূরত্ব আরও বেড়ে গেছে। আবির কে কিছু বলতেও পারি না, বলার আগেই ওর মা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।”

ইকবাল খান মলিন হেসে বললেন,
” ভাইজান তুমি শুধু শুধু টেনশন করছো। দরকার হলে আমি আবিরের সাথে আবার কথা বলবো। ”

“আপাতত কিছু বলার প্রয়োজন নেই। কিছুদিন আবিরকে ওর মতো করেই থাকতে দে। দেখ ওর মতিগতি বদলায় কি না।”

ইকবাল খান মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ বসে রইলেন৷ দুই ভাইয়ের মুখে কোনো কথা নেই। ইকবাল খান গলা খেঁকিয়ে হঠাৎ উঠে বললেন,
“ভাইজান, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”

“হ্যাঁ, বল।”

“আফাকে কি তুমি সত্যিই মন থেকে মেনে নিয়েছো? নাকি মনের ভেতর এখনও ক্ষোভ রয়েই গেছে। ”

“মন থেকে না মানলে আমার বাড়িতে ঢুকার অনুমতি কোনোদিনও দিতাম না, এটা মাথায় রাখিস।”

“কিন্তু.. ”

“কিন্তু কি?”

“মাত্র দুই দিনের সাক্ষাতে আপুদের বাসায় দাওয়াত দিলে। এত সহজে সবটা মানিয়ে নিলে, বিষয়টা সত্যিই অবাক করেছে আমায়। ”

আলী আহমদ খান অনচ্ছ হেসে বললেন,
“তোদের চোখে বিষয়টা দুদিনের ঘটনা হলেও আমার কাছে এটা প্রায় ৮-১০ বছর যাবৎ চলমান একটা ঘটনা।”

“মানে..”

“মাহমুদার বিয়ের পর থেকে ১৫-২০ বছরের মতো আমি ওর নামটা সহ্যও করতে পারি নি। কত রাত ওদের উপর রাগ করে না খেয়ে ঘুমিয়েছি তার হিসেব নেই। আগে প্রতিবছর ঈদে বা অন্যান্য সময় বেড়ানোর জন্য প্রায় ই গ্রামে যেতাম, কিন্তু ঐ ঘটনার পর থেকে গ্রামে গেলে আমার পরিবারের নামে আজেবাজে কথা শুনতে হতো, তার জন্য বাধ্য হয়ে গ্রামের সাথে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। নিজের সাজানো সংসার কে বাঁচাতে বাধ্য হয়ে সব ছেড়েছিলাম,এমনকি ঈদেও বাড়িতে পা দেয় নি। সময় আর বয়সের সাথে সাথে অনেককিছু বদলাতে শুরু করে, কিন্তু আমি আমার নীতি থেকে সরতে পারি নি৷ হঠাৎ একদিন একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসে। কথা বলে জানতে পারি সে আমাদের গ্রামের মেম্বারের ছোটভাই মাইদুল । পড়াশোনা শেষে যশোরে চাকরির পোস্টিং হওয়ায় সেখানে যায়, ঐখানে মাহমুদাদের দেখে আমার ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে সে আমায় ফোন দিয়ে জানিয়েছে। আমি সেদিন আমার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি নি, ওর নামটা শুনে মুখের উপর কল কাটতে পারি নি৷ বোনের প্রতি দূর্বলতায় মাইদুলের বলা সব কথায় শুনেছিলাম। তারপর থেকে মাইদুল মাঝেমধ্যে কল দিয়ে মাহমুদাদের খোঁজখবর জানাতো, কখনো কখনো আমিও কল দিতাম। ওদের ঢাকা আসার খবরও আমি আগেই পেয়েছিলাম, এমনকি আমি মাহমুদা আর ওর মেয়ে আইরিনকে আমি আগেও ২-৩ বার দেখেছি।”

“এতদিন আমাদের কিছু জানাও নি কেনো?”

“কিভাবে জানাতাম? আর কি ই বা জানাতাম!”

“তুমি আফাকে সত্যি মাফ করেছো?”

” যেদিন শুনেছিলাম ওর হাসবেন্ড হার্ট অ্যাটাক করেছে সেদিনই আমি ওদের মাফ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু নিজের নীতি থেকে নড়তে পারি নি, মনের উপর যে শক্ত আবরণ টা পরেছিল সেটাকেও সরাতে পারি নি, নিজের জেদ আর আক্রোশে নিজেই বন্দি হয়েছিলাম। তারপর হঠাৎ যখন মাহমুদা আর জান্নাতকে দেখলাম আর মাহমুদা আমায় ভাইজান বলে ডাকলো, ওর ডাকে সেদিন মনে হয়েছিল আমার বুকের উপর থেকে ২৮ বছর যাবৎ জমা বিশালাকৃতির পাথর টা যেন মুহুর্তেই বিলুপ্ত হয়ে গেছিল। ইচ্ছে হয়েছিল ছোটবেলার মতোই সব ভুলে বোনকে কাছে টেনে নিতে, কিন্তু আমি পারি নি। আমার মন সায় দিলেও আমার হাত পা তাতে সায় দেয় নি। তারপর থেকে তোর ভাবি আর আবির, মোজাম্মেল আমাকে অনেক বুঝিয়েছে। তাই সবকিছু ভুলে ওদের ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাঁচবো আর কতদিন! রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করে ম*রেও শান্তি পেতাম না৷ ”

ইকবাল খান নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। কিছু বলার ভাষা নেই ওনার৷ বোনের প্রতি বড় দুই ভাইয়ের মতো ইকবাল খানের ভালোবাসাও প্রবল ছিল৷ মাহমুদা খান আর ইকবাল খান মোটামুটি সমবয়সী ছিল বিধায় দুজনের সম্পর্কটাও বেশ মজবুত ছিল। মাহমুদা খানের ছায়ায় বড় হওয়া ইকবাল খান হঠাৎ বোনকে হারিয়ে এলোমেলো হয়ে উঠেছিলেন। তার পরপর মাকে হারিয়েছিলেন। সবমিলিয়ে ইকবাল খানের জীবনটা বলতে গেলে অনেকটায় ছন্নছাড়া ছিল। এরপর থেকে বড় দুই ভাইয়ের শাসনেই বড় হয়েছেন। ভাইদের কথামতো ব্যবসার কাজে রাজশাহী থাকতে শুরু করেন আর সেখানে থাকা বাসার মালিকের মেয়ের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে যার পরিণতি হয়েছিল কোনোদিন রাজশাহী বিভাগে পা রাখতে না পারা। সংসারের মায়াজালে আটকে গিয়ে রাজশাহীর রমনীকে ভুলতে পারলেও বোনের প্রতি দূর্বলতা কাটাতে পারেন নি, ঢুকরে কেঁদেছেন বহুরাত।

সকালের খাবার খেয়ে তিনভাই অফিসে চলে গেছেন। মোজাম্মেল খান আবিরকে অফিসে যেতে বলেছিলেন কিন্তু আবির আজ ইচ্ছে করেই অফিসে যায় নি৷ আবির রুমে না থাকলে মেঘ আবিরের সব জিনিসপত্র ঘাটাঘাটি করতে পারে, সেই ভেবেই আবির কোথাও যায় নি। প্রায় ১১.৩০ নাগাদ মেঘ আবিরের রুমে আসছে। আবির রঙ সহ প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম আগেই আনিয়ে রেখেছিল৷ মেঘ মিষ্টি কন্ঠে শুধালো,

“এখন আর্ট করবো?”

“তোর যখন ইচ্ছে করতে পারিস৷ আমার কোনো সমস্যা নেই। ”

” আমার পছন্দের ডিজাইন এঁকে দিব?”

“অবশ্যই।”

মেঘ নেট থেকে দেখে কয়েকটা সুন্দর ডিজাইন আগেই বের করে রেখেছিল সেগুলোর একটায় এখন করতেছে । মেঘের পড়নে সুতি কাপড়ের থ্রিপিস,গলায় ওড়নাটা দু প্যাঁচ দিয়ে সামনের দিকে রেখেছে, ঘন,কালো, লম্বা চুলগুলো আজ আগে থেকেই সামলে এসেছে, চুলগুলো পেঁচিয়ে কাঁকড়া দিয়ে আঁটকে নিয়েছে। মেঘের ঘাড় উন্মুক্ত, ছোট ছোট চুল গুলো ঘাড়ে পড়ে আছে। আবির ল্যাপটপে কাজ করছে আর মাঝে মাঝে মেঘের দিকে তাকাচ্ছে। মেঘ সরাসরি না দেখলেও, আবিরের নজর সে ঠিকই বুঝতে পারছে। অস্বস্তিতে বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে গেছে, নাকের ডগায়, কপালে, থুতনির উপরে ঘাম জমে একাকার অবস্থা হয়ে গেছে। হঠাৎ আবিরের ফোনে কল বেজে উঠলো, আবির যথারীতি ফোন কানে নিয়ে বেড়িয়ে গেছে। আবির বের হতেই মেঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। আবির রুমে নেই দেখে মেঘ কাজের গতি বাড়াচ্ছে, তাড়াতাড়ি ডিজাইন শেষ করে পালাতে পারলেই বাঁচে। আচমকা মীম দরজায় দাঁড়িয়ে কাশতে শুরু করলো৷ মেঘ বুঝতে পেরেও পেছন ফিরে তাকালো না। মীম রুমে না ঢুকে দরজায় দাঁড়িয়ে কেশেই যাচ্ছে। মুহুর্তেই মেঘের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, মীমের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে হুঙ্কার দিল,

” আজকে আমায় জ্বালালে তোর খবরই আছে। ”

মেঘের ধমক খেয়ে মীমের ঠোঁট ভেঙে আসছে। মীম ব্যগ্র কন্ঠে বলল,
” সরি আপু৷ আমি তোমাকে জ্বালাতে আসি নি। শুধু দেখতে আসছিলাম কোন ডিজাইন টা করতেছো। ”

মেঘ শীতল কণ্ঠে বলল,
“ভেতরে এসে দেখে যা কোনটা করছি।”

সঙ্গে সঙ্গে মীমের মুখে হাসি ফুটলো, ছুটে গেল রুমের ভেতর৷ মীমের উত্তেজনা দেখে মেঘ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“দেখিস, রুমের কোনো জিনিস নষ্ট করিস না যেন।”

মীম সম্পূর্ণ রুমে চোখ বুলিয়ে আমুদে কন্ঠে বলল,
“ওমা, এখন থেকেই ভাইয়ার রুমের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছো?”

মেঘ মুচকি হেসে বলল,
” আমি দায়িত্ব নিবো না তো কে নিবে!”

মীম হেসে বলল,
“আমিও সেটায় বলি, মনি মুক্তা তো আর দায়িত্ব নিতে পারবে না৷ ”

মেঘ কপাল কুঁচকে ভারী কন্ঠে শুধালো,
“মনি মুক্তা কে?”

মীম হাসতে হাসতে বিছানার পাশে বসে পরেছে। মীমের হাসি দেখে মেঘের চোখ আরও সরু হয়ে গেছে, কপালে কয়েক স্তর ভাজ ফেলে তাকিয়ে আছে। মীম ঠোঁটে হাসি রেখে বলল,
” ধরো তোমার স…”

মেঘ চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“মীম….. ”

মীম দৌড়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেছে। মেঘ রাগে কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে পুনরায় কাজে মনোযোগ দিল। কিছুক্ষণ পর মীম আবার আসছে। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে মোলায়েম কন্ঠে ডাকলো,

” আপু…”

“আবার কি হয়ছে?”

“তোমাকে দেখতে আসছি।”

“কেন? আমার কি রূপ বের হয়ছে?”

” তোমার এই রূপের আগুনে ভাইয়া এমনিতেই পাগল হয়ে গেছে, এরচেয়ে বেশি রূপ যদি বের হয় তাহলে ভাইয়া আর সহ্য করতে পারবে না। ”

“মীম, তোর মুখটা বন্ধ রাখবি? ওনি যদি এসব কথা শুনতে পায় তোকে আর আমাকে দুটাকেই আধম*রা করে ফেলবে।”

“তোমার ওনি নিচে বসে বসে প্রেম করতাছে। এখন আসবে না। ”

“কার সাথে প্রেম করে?”

” হবে তোমার চেয়েও সুন্দরী কেউ। ”

মেঘ রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
“তুই যাবি এখান থেকে?”

মীম বিড়বিড় করতে করতে রুম থেকে বেড়িয়ে গেছে। মৃদু বাতাসে মেঘের সামনের দিকের ছোট চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে, চোখ মুখে ঝাপটে পরছে, মেঘের দুহাতে রঙ ভরে আছে, তাই ঠিক করতে পারছে না। মীমের সাথে কথা বলতে বলতে মেঘ হাতের কব্জি দিয়ে চুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করেছে কিন্তু পারছে না। বাধ্য হয়ে পুনরায় ডাকল,

” মীম…!”

ততক্ষণে মীম বেড়িয়ে গেছে। বেলকনিতে আবিরকে আসতে দেখে মীম দ্রুত পাশ কাটিয়ে রুমে চলে গেছে। মেঘ উচ্চ স্বরে মীমকে ডাকছে। মেঘ যে দেয়াল ডিজাইন করছে সেটা থেকে দরজা সম্পূর্ণ বিপরীতে অবস্থিত। রুমে হঠাৎ কারো অস্তিত্ব বুঝতে পেরে মেঘ বলিষ্ঠ কন্ঠে বলল,
“এতক্ষণ ধরে ডাকছি আসছিলি না কেন? আমার চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে যা।”

আবির বিছানার উপর ফোন রেখে মেঘের কাছে এগিয়ে গেল। মেঘের কাছাকাছি এসে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

“এদিকে ঘুর।”

আবিরের কন্ঠ শুনে মেঘ চমকে উঠে পেছনে ঘুরলো। মেঘ পেছনে ঘুরতেই আবিরের ঘনিষ্ঠতা অনুভব করল। আবির ঠিক মেঘের সম্মুখে দাঁড়ানো, মাঝখানে কেবল কয়েক ইঞ্চির গ্যাপ। আবিরের গা থেকে আসা তীব্র গন্ধে মেঘের মা*তাল হওয়ার অবস্থা। শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সামলাতে মেঘ ঢোক গিলে উষ্ণ কন্ঠে বলল,

” স সরি, আমি ভেবেছিলাম মীম আসছে।”

আবির নেশাক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

“কেন? আমি ঠিক করে দিতে পারি না?”

মেঘের হৃৎস্পন্দন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে, মস্তিষ্কের নিউরনে অনুরণন হচ্ছে, শ্বাসনালিতে তুফান, গলা শুকিয়ে কাঠ। উত্তর দেয়ার মতো অবস্থা নেই। জানালা দিয়ে আসা আনম্র পবনে মেঘের ছোট-বড় চুলগুলো দুলল বাতাসে , দু একটা চুল চোখে লাগতেই মেঘ চোখ বন্ধ করে ফেলল৷ চোখ বন্ধ রেখেই, মেঘ চুল সরানোর জন্য রঙে রাঙানো হাত তুললো, আবির সহসা মেঘের হাতের কব্জিতে ধরে থামিয়ে দিল। আবিরের স্পর্শে মেঘ আবারও চমকে উঠে। মেঘ হতভম্ব হয়ে তাকালো। কয়েক মুহুর্ত নিগূঢ় দৃষ্টিতে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো। মেঘের এক হাত আবিরের হাতে বন্দি, বাতাসের হাত থেকে চোখকে বাঁচাতে মেঘ এবার অন্য হাত তুলতে নিল, মেঘের আগে আবির ই নিজের অন্য হাত দিয়ে মেঘের কপালে দু আঙুল ছুঁইয়ে কপাল থেকে চুল সরিয়ে কানে গুজে দিতে লাগতো। আবিরের অনমনীয় হাতের স্পর্শে মেঘের ভেতরটা ছটফট করছে। আবেশে মেঘের দুচোখ বন্ধ হয়ে গেছে। আবির খুব যত্নসহকারে দুই-তিনবারে চুল সরানোর চেষ্টা করলো। মেঘ নিজেকে সামলে আচমকা চোখ মেললো, নিজের মনের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে উচ্চস্বরে বলল,

” ছাড়ুন আমায়। ”

আবির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ছাড়তেই যখন বলবি তবে এত আকৃষ্ট করিস কেনো আমায়?”

আবিরের কথা শুনে মেঘ বিপুল চোখে তাকালো। আবিরের বিশ্রান্ত চাহনিতে মেঘের অনুভূতির আকাশ জুড়ে প্রজাপতিরা ডানা মেলে উড়তে শুরু করেছে। মেঘের আদলে লেপ্টে আছে প্রমত্ততা৷ মনে অনুরাগের সুর বাজছে।মেঘের বয়ঃসন্ধির প্রথম প্রেম আবির ভাই। সেই আবির ভাইয়ের ঘনিষ্ঠতা উন্মাদ করে তুলছে মেঘকে৷ আবিরের বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বহুদিন আগেই মেঘের মনকে দূর্বল করেছিল, আবির ভাই নামক অসুখ বাসা বেঁধেছিল ছোট্ট মেঘের মনে। যে অসুখ সারানোর ঔষধ আজও আবিষ্কৃত হয় নি৷ আবির নিরেট দৃষ্টিতে মেঘকে দেখেই যাচ্ছে, মেঘও বৃহৎ আঁখিতে তাকিয়ে আছে আবিরের চোখের দিকে। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। মেঘ ঘোরের মধ্যে থেকেই অকস্মাৎ পেছনে চলে যাচ্ছে। দু থেকে তিন কদম পেছাতেই আবিরের হাতে থাকা মেঘের হাতটা টান পড়ে, ওমনি আবিরের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটে। দেয়াল ভর্তি ভেজা রঙ, মেঘ বেখেয়ালি ভাবে পেছাচ্ছে দেখে আবির মেঘের হাতের কব্জি ধরে টান দিতেই মেঘের ছোট্ট দেহ আবিরের পেট আর বুকের মাঝামাঝি অবস্থানে ধাক্কা লাগে। আচমকা আক্রমণে মেঘের গা কেঁপে উঠলো। মেঘের দৃষ্টি আবিরের বুকের দিকে। আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তপ্ত স্বরে বলল,

” কারো প্রণয়ের পরিণীতা হতে চাইলে তার অনুষঙ্গের নিগূঢ়তা সহ্য করার প্রবলতা থাকতে হবে। অনাড়ম্বরে কাঙ্ক্ষিত অভিলাষ অপূর্ণ থেকে যাবে৷ ”

মেঘ কোনোভাবেই ধাতস্থ হতে পারছে না। হতবিহ্বলতায় মেঘের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। মেঘের মনে একটা প্রশ্ন আচমকা আঘাত হানলো,
” ঐদিন রাতে কি আবির ভাই সজাগ ছিল? তবে কি আমার সব কথা শুনে ফেলেছেন?”

লজ্জায় মেঘের চিবুক নেমে গেছে, আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আবিরের হাতে বন্দি নিজের হাতটার দিকে৷ নিজেকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় নেই। দিশাহারা হয়ে আবিরের কাছ থেকে কিছুটা পিছিয়ে আসলো। আচমকা আবির মেঘের হাত ছেড়ে তড়িৎ বেগে মেঘের কোমল অনৃজু কোমড় আঁকড়ে ধরলো। ওমনি মেঘের মেরুদণ্ড সোজা হয়ে গেছে। আবির এক টানে মেঘকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে ফেললো। মেঘ প্রখর নেত্রে তাকালো আবিরের দিকে, চোখ দুটা রসগোল্লার মতো বড় হয়ে গেছে, নিঃশ্বাস গলায় আঁটকে গেছে। আবিরের সম্মোহনী দৃষ্টিতে মেঘের মন তুষারের ন্যায় জমে গেছে। প্রত্যাশিত ব্যক্তির অপ্রত্যাশিত স্পর্শ ভেঙেচুরে দিচ্ছে মেঘের পিঞ্জরে আবদ্ধ হৃদপিণ্ডকে। দীর্ঘসময় পর মেঘ সর্বশক্তি দিয়ে নিজের ভেতরের আবদ্ধ নিঃশ্বাস টা ছাড়লো। মেঘের ধাঁরালো চাউনির নিকট আবির আজ বারংবার ধৃত হচ্ছে তবুও মেঘের স্নিগ্ধ ধৃষ্টতা থেকে নজর সরাতে ব্যর্থ হচ্ছে। মেঘের শরীর মাত্রাতিরিক্ত ঘামতে শুরু করেছে। মুহুর্তেই সুতি জামা ভিজে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। মেঘের শরীরের তীব্র কম্পনে আবিরের হাতও কাঁপছে। ঘামের কারণে জামার উপর দিয়েই আবিরের হাতের পাঁচ আঙুল ভিজে গেছে। মেঘ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবির গভীর দৃষ্টিতে মেঘকে দেখছে আর ঠোঁট চেপে হাসছে। মেঘ ভুলে গেছে হাত ভর্তি রঙের কথা, মুখের ঘাম মুছতে হাত তুলতেই আবির অন্য হাত দিতে মেঘের হাত স্পর্শ করলো, মেঘের হাতে লেগে থাকা ঘন রঙে আবিরের হাত ভরে গেছে, মেঘের দৃষ্টি সেদিকে পড়তেই তাড়াতাড়ি হাত সরাতে চাইলো। ততক্ষণে আবিরের পাঁচ আঙ্গুলে মেঘের আঙুলগুলো বন্দি হয়ে গেছে। মেঘ সুদীর্ঘ সময় নিয়ে শ্বাস ছেড়ে আর্তনাদ করে বলতে নিলো,

“আমাকে ছা..”

আবির মেঘের হাত ছেড়ে এক আঙ্গুলে মেঘের ঠোঁট স্পর্শ করেছে। মেঘ সহসা নিশ্চুপ হয়ে গেছে, আবিরের আঙুলের রঙ মেঘের ঠোঁটে লেগে গেছে। মৃদু বাতাসে মেঘের চুলগুলো হালকা ভাবে উড়ছে। ভেতরের কম্পনে মেঘের সেদিকে খেয়াল নেই, আবির আলতো হাতে মেঘের চুলগুলো সরিয়ে দিচ্ছে। রঙের কারণে চুলগুলো একে একে রঙে আটকে গেছে, চুল সরাতে সরাতে আবিরের দৃষ্টি মেঘের গালে আঁটকালো। বাহির থেকে আসা আলোতে মেঘের গালটা অতিরিক্ত আদুরে দেখাচ্ছে, আবির নিজের মন আর হাত কোনেটাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। না চাইতেই রঙে রঙিন হাতে মেঘের গাল ছুঁয়ে দিল, কয়েক মুহুর্ত গালে হাত রেখে ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে গলার একপাশে ঘাড়ে হাত ছুঁড়ালো। ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে মেঘ নিরস্ত হয়ে গেছে, আবিরের কর্মকান্ডে মেঘের সব শক্তি বিলীন হয়ে গেছে। মেঘের গালে আবিরের পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে। আবির মেঘের ঘাড়ে হাত রেখে কিছুটা নিচু হয়ে অন্যপাশে মেঘের ঘাড়ের কাছে মুখ এগিয়ে নিল। আবিরের তপ্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে দিচ্ছে মেঘের মসৃণ গ্রীবা। মেঘ দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। আবিরের সুগভীর কন্ঠস্বর ভেসে উঠল,

” এটুকুতেই এই অবস্থা হলে কিভাবে কি হবে?”

আবিরের নেশাক্ত কন্ঠে বলা কথা মেঘের কর্ণপাত হলো না, আবিরের স্পর্শ আর নিঃশ্বাসেই মেঘ পাথর বনে গেছে। আবির আবেশিত কন্ঠে পুনরায় বলল,

” ম্যাম,নিজেকে সামলান, আমি কিন্তু আমাতে নেই। কোনো অনিষ্ট হলে আমি একা কুলষিত হবো না, আপনাকে নিয়েই হবো।”

আবিরের কথা মেঘের কানে ঢুকছে কি না কে জানে, মেঘ বরফের ন্যায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । আবির মেঘকে ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়িয়েছে৷ মেঘ তখনও পূর্বের জায়গায় দাঁড়ানো। দেখে বুঝায় যাচ্ছে, নিজের সেন্সে নেই। আচমকা মেঘ পেছাতে শুরু করে, দেয়ালে আটকানোর পূর্বেই আবির এগিয়ে এসে মেঘের চুলের খোঁপার ঠিক পেছনে দেয়ালে এক হাত রাখলো, যেন মেঘের চুলে রঙ না লাগে। অন্য হাতে দেয়াল ধরে নিজেকে আটকালো। মেঃ ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। হঠাৎ আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,

“আমি রুমে যাব।”

আবির মিটিমিটি হেসে শুধালো,
“শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?”

মেঘ চিবুক নামিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“হ্যাঁ!”

আবির মনে মনে বিড়বিড় করল,
“কিছু করলামই না, এতেই নাজেহাল অবস্থা। কিছু করলে তো আপনাকে খোঁজে ই পাওয়া যাবে না। এই আবার আপনি আবিরের প্রণয়িনী হতে চান!”

মেঘ শীতল কণ্ঠে বলল,
“সরুন আমি চলে যাব। রঙ পরে করে দিব।”

আবির মৃদুস্বরে বলল,
“আপনার ইচ্ছে। ”

আচমকা বেলকনি থেকে তানভির ডাকলো,
“ভাইয়া আসবো?”

মেঘ তানভিরের কন্ঠ শুনে থতমত খেয়ে উঠল। গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ৷ মেঘ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,

“ভাইয়া আসছে, সরুন প্লিজ।”

আবির ভ্রু কুঁচকে শক্ত কন্ঠে বলল,
“তোর ভাইকে কি আমি ভয় পাই নাকি?”

আবির তানভিরকে উদ্দেশ্য করে উচ্চ স্বরে বলল,
“নাহ। ব্যস্ত আছি। ”

“তুমি যেগুলো আনতে বলছিলে সেগুলো নিয়ে আসছি। ”

“তোর কাছে রাখ, পরে দেখে নিয়ে আসবো। ”

“আমি আবার বেড়িয়ে যাব৷ ফিরতে রাত হবে। তোমার রুমে রেখে যায় ”

আবির বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,
“উফফফ, রেখে যা।”

মেঘ উপায় না পেয়ে আবিরের প্রশস্ত বুকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করলো, ভয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। তানভির বিছানায় কিছু কাগজ আর ২-৩ টা বক্স রাখতে রাখতে বলল,

“তোমার..”

বলতেই মেঘকে অল্পবিস্তর চুপ করে গেল। কপাল গুটিয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে কান হাত দিয়ে বিড়বিড় করে “সরি” বলল। আবির চোখে ইশারা করতেই তৎক্ষনাৎ নিজের মাথায় চাপড় মারতে মারতে বেড়িয়ে যাচ্ছে, যেতে যেতে দরজা টাও চাপিয়ে রেখে গেছে। তানভির নিজের কপাল চাপড়ে বেলকনিতে হাঁটছে আর বলছে,

“ছিঃ তানভির, ছিঃ। তুই এত নির্লজ্জ কেন?”

#চলবে

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৬৮
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

তানভির বিড়বিড় করতে করতে নিজের রুম পর্যন্ত যেতেই ফোনে কল বেজে উঠল৷ তানভিরের বেস্ট ফ্রেন্ড সোহাগ কল দিচ্ছে৷ তানভির কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সোহাগ একদমে কতকি বলতে থাকলো। তানভির প্রখর তপ্ত স্বরে বলল,
” আমাকে এসব বলে কোনো লাভ নাই৷ আমি এখন আসতে পারবো না। এমপির সাথে একটা পোগ্রামে যেতে হবে। ”

“প্লিজ দোস্ত৷ একটু আয়! ”

“আরে ভাই আমার সময় নাই। ”

” শুন তানভির, আমাকে যতই ব্যস্ততা দেখাস সমস্যা নাই। কিন্তু তোর গার্লফ্রেন্ড এর জন্য অন্তত আয়।”

” একদম ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করবি না। তোর আমার মাঝখানে ও কে কেনো টানতেছিস?”

“কারণ আমার কথা তুই গুরুত্ব দিচ্ছিস না। প্লিজ তানভির, জাস্ট ৫ মিনিট লাগবে, আয় তুই। ”

তানভির ভারী কন্ঠে শুধালো,
“বন্যা কি এখনও ভার্সিটিতে? ”

“আমি তোর কাছে সকাল থেকে চিল্লাচিল্লি করছি, তুই আমাকে পাত্তা দিচ্ছিস না৷ বন্যার নাম শুনতেই কন্ঠস্বর পাল্টে গেছে। দাঁড়া, এখন থেকে তোকে ওর কসম দিয়ে সব কাজ করাবো।”

তানভির রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
” আর যাই করিস, কোনোদিন ওর নাম নিয়ে কসম কাটতে বলবি না। পরিবারের বাহিরে ও আমার একমাত্র দূর্বলতা। তাছাড়া কসম কাটা ঠিক না। ”

“আচ্ছা ঠিক আছে, কাটাবো না কসম। এখন বল আসবি ?”

“বন্যা যদি সত্যি ই ভার্সিটিতে থাকে তাহলে আসবো।”

“আরে আছে আছে। প্রয়োজনে আটকিয়ে রাখবো। তাও তুই আয়। আমার কাজ টা কিন্তু করে দিতে হবে। ”

” ভুলেও বন্যাকে কিছু বলতে যাইস না। আমি আসতেছি।”

তানভির দ্রুত বেড়িয়ে পরেছে। এদিকে মেঘ আবিরের আড়ালে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। তানভির চলে গেছে অনেকক্ষণ আগে, মেঘ আতঙ্কে এখনও চোখ খুলতে পারছে না। আবির ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে অপলক দৃষ্টিতে মেঘকে দেখছে। তিরতির করে কাঁপছে মেঘের ওষ্ঠদ্বয়, লজ্জা আর ভয়ে নাকের ডগা আর গাল পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে। নিস্তব্ধতা বুঝতে পেরে মেঘ ধীরে ধীরে চোখ মেলল ৷ সরাসরি চোখ পরল আবিরের চোখের দিকে। আবিরের নেশাক্ত দৃষ্টি দেখে মেঘ লজ্জায় মাথা নিচু করে ঘাড় কাত করে তানভিরকে দেখার চেষ্টা করলো। তানভিরকে রুমের কোথাও দেখতে না পেয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,

” ভাইয়া কোথায়?”

“চলে গেছে ”

“কেন?”

“সেটা আমি কিভাবে বলবো, তোর ভাইকে জিজ্ঞেস কর গিয়ে।”

হঠাৎ দেয়ালের দিকে আবিরের নজর পরে। যে হাতটা দিয়ে নিজেকে আঁটকেছিল সেই হাতে যে রঙ ছিল আবিরের সেটা খেয়াল ই ছিল না। মেঘের চুল বাঁচাতে গিয়ে উল্টো দেয়াল নষ্ট করে ফেলেছে। আবিরের সাথে সাথে মেঘ ও চোখ ঘুড়িয়ে তাকালো। দেয়ালে আবিরের হাত দেখে আর্তনাদ করে উঠল,
“এটা আপনি কি করলেন?”

“আমি ইচ্ছে করে করছি নাকি? তোর চুল বাঁচাতেই তো করেছি। ”

মেঘ একটু দূরে সরে দেয়ালটাকে দেখে পুনরায় গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” আমি এখানটায় এখন কিভাবে ডিজাইন করবো?”

আবির মেঘের হাতের কব্জিতে শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে রঙের বক্সে চুবিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালে ছাপ দিল। যেখানে আবির হাতটা রেখেছিল ঠিক সেখানেই। মেঘ আটকানোর খুব চেষ্টা করেছে কিন্তু আবিরের শক্তির সামনে মেঘ অতি নগন্য একটা মানুষ৷ আবিরের হাতের রঙ অনেকটা শক্ত হয়ে যাওয়ায় ঠিকমতো বুঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু মেঘের হাতের ছাপ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। ভালোভাবে খেয়াল করলে মেঘের ছোট্ট হাতকে ঘিরে আবিরের বড় হাতের অপ্রখর ছাপ টা ঠিকই চোখে পরে। মেঘ ক্ষুদ্ধ হয়ে বলল,

” আপনি এমন করলেন কেন?”

” কি ডিজাইন করবি ভেবে পাচ্ছিস না তাহলে কি করব?”

মেঘ শক্ত কন্ঠে বলল,
” আমি কিন্তু সম্পূর্ণ দেয়াল টায় নষ্ট করে ফেলবো।”

আবির মুচকি হেসে বলল,
” একদিনের জন্য রুম তোকে দিয়ে দিয়েছি, সাজাবি নাকি নষ্ট করবি পুরোটাই তোর উপর। আমি কিছুই বলবো না। ”

মেঘ শীতল কণ্ঠে বলে উঠল,
“মাঝখানে হাতে ছাপটার কারণে কি পঁচা লাগছে। আপনি এমনটা না করলেও পারতেন। ”

আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“তুই তোর কাজ শেষ কর, তারপর দেখিস কত সুন্দর লাগে। ”

মেঘ মুখ ভোঁতা করে ঠোঁট ভেঙে কাঁদো কাঁদো মুখ করে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির মুচকি হেসে দু আঙুলে মেঘের রাগে ফুলে উঠা নাকটা আলতোভাবে চেপে মোলায়েম কন্ঠে বলল,

” দেয়াল জুড়ে এত সুন্দর পেইন্টিং থাকবে আর তাতে ডিজাইনারের হাতের ছাপ থাকবে না তা কি করে হয়! ছাপ টার নিচে তোর নামটাও লিখে দিস। ”

“বাসার মানুষ দেখলে কি ভাববে!”

” বাসার মানুষ যখন জিজ্ঞেস করবে এই ডিজাইন কে করেছে? তখন আমি কি বলবো? শেওড়াপাড়ার পে*ত্নীটা ডিজাইন করে দিয়ে গেছে নাকি আমার কাল্পনিক বউটা এসে করেছে?”

মেঘ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে রাগী স্বরে বলল,
“কথায় কথায় বউ বউ করবেন না। আমি কিন্তু বড় আব্বুকে বলে দিব ”

“কি বলবি?”

“বলবো আপনি সারাদিন বউ বউ করেন, অথচ বিয়ের কথা বললে ভাব নেন। আপনাকে ডাক্তার দেখাতে হবে! ”

আবির নিঃশব্দে হেসে শুধালো,
“তুই কি আমায় ইন্ডাইরেক্টলি পাগল বললি? ”

“মুখের উপর কিভাবে বলবো! ”

“কিহ?”

আবির এক পা এক পা করে এগুচ্ছে, মেঘ পেছাতে পেছাতে চেঁচিয়ে উঠল,
“এমন করলে আমি কিন্তু চিৎকার করবো।”

“কর চিৎকার। কাকে ডাকবি ডাক, দেখি তোকে কে বাঁচায়। ”

মেঘ ভেঁজা কন্ঠে ডেকে উঠল,
” আম্মু বাঁচাও!”

আবির মেঘের মুখ চেপে ধরে ঠাট্টার স্বরে বলল,
“ছিঃ মেঘ! যেভাবে মামনিকে ডাকছিস, মামনি ভাববে আমি তোকে ধ*… ছিঃ ”

মেঘ বিস্ময়কর দৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির মেঘের মুখ ছেড়ে কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“সরি, তোকে আর ডিস্টার্ব করব না। তুই তোর কাজ শেষ কর। ”

আবির টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুম চলে গেছে৷ মেঘ আহাম্মকের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। আবির ভাই যে রাগ করেছে এটা ওনার কথাতেই বুঝা গেছে। মেঘ কি করবে তাই ভাবছে। আচমকা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে নজর পরতেই মেঘ সব ভুলে গেল। গালে আবিরের হাতের স্পর্শ, গলা আর ঘাড়েও আঙ্গুলের দাগ, নাক আর কপাল জুড়েও রঙ লেগে আছে। মেঘ লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভাবছে আর বার বার লজ্জায় ললিত হয়ে যাচ্ছে৷ মেঘ নিজের গালে হাত রেখে আবিরের স্পর্শ অনুভব করার চেষ্টা করছে ওমনি বুকের ভেতর কম্পন শুরু হয়ে গেছে । আচমকা মীম দরজায় দাঁড়াতেই মেঘ তাড়াহুড়ো করে দেয়ালের দিকে ঘুরে মাথায় ওড়না দিল যাতে রঙের দাগ মীম কোনোভাবেই না দেখে। মীম দৌড়ে এসে উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো,

“আপু তুমি আমায় দেখে কি লুকাইছো? দেখি এদিয়ে ঘুরে তো৷ ”

মেঘ দেয়ালে রঙ করতে করতে তপ্ত স্বরে বলল,
“ডিস্টার্ব করিস না৷ রুমে যা ”

“তুমি কি লুকাচ্ছো বলো, তাহলেই চলে যাব।”

মেঘ হুঙ্কার দিয়ে উঠল,
“আবির ভাই কিন্তু ওয়াশরুমে আছে। ডাকবো?”

মীম উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“ভাইয়া রুমে আগে বলবা না, আমি গেলাম। পরে এসে দেখবো তুমি কি লুকাইছো। ”

মেঘ কিছুক্ষণ ভেবে পুনরায় কাজ শুরু করল। আবির ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে ভেজা শরীরে টিশার্ট গায়ে দিয়ে ফোন নিয়ে চুপচাপ রুম থেকে বেড়িয়ে গেছে, মেঘের দিকে একবারের জন্যও তাকিয়ে দেখে নি। মেঘ অসহায় মুখ করে আবিরের যাওয়ার দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইলো। চোখেমুখে বিষন্নতা ভর করেছে, তবুও সবকিছু একপাশে রেখে কাজে মনোযোগ দিল। আবির নিচে নামতেই মীম ছুটে গেল মেঘকে দেখতে। ততক্ষণে মেঘ রঙ দিয়ে গালে আর গলায় থাকা আঙুলের ছাপ গুলো মুছে ফেলেছে।
মীম রুমে ঢুকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“তখন কি লুকাইছিলা?”

মেঘ স্বাভাবিক ভাবে ঘুরে মীমের গালে রঙের দু আঙুল ছুঁইয়ে বলল,
“তোর কাছ থেকে আমি কি লুকাবো বল?”

“আপু তোমার গালে এত রঙ কেন?”

“খেয়াল ছিল না, হুট করে গালে হাত দিয়ে ফেলছিলাম। ”

দুটা দেয়াল ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে মীম বলল,
“আপু, দুটা ডিজাইন ই অনেক সুন্দর হয়েছে। ভাইয়ার রুমটা অন্যরকম সুন্দর লাগছে। ”

মেঘ মৃদুস্বরে বলল,
“সত্যি সুন্দর হয়েছে?”

“১০০% সত্যি। ”

“ওনার কি পছন্দ হবে? কিছুই তো বললেন না”

“আমি বলছি ভাইয়ার পছন্দ হবেই হবে। তাছাড়া তুমি যা এঁকে দিবা ভাইয়া সেটার ই প্রশংসা করবে দেইখো। সেটা যদি ব্যাঙের ছাতা হয় তবুও বলবে অনেক সুন্দর হয়েছে। ”

মীম বিছানার উপর বসে পা ঝুলাচ্ছে আর মেঘের সাথে গল্প করছে। মেঘ আবিরের কথা মতো নিজের হাতের ছাপটার নিচে নিজের নাম লিখেছে তাছাড়া একসাইডে ‘সাজ্জাদুল খান আবির’ নাম লিখে ডিজাইন করে দিয়েছে। মীমকে কিছু জিনিস দিয়ে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে। বাকি গুলো নিয়ে মেঘ পেছন পেছন আসছে। এতক্ষণের মধ্যে আবির একবারও উপরে যায় নি৷ মীম নিচে আসতেই আবির প্রশ্ন করল,
” তোর বোনের কাজ শেষ হয়েছে? ”

“হ্যাঁ। অনেকক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে।”

আবির কোনো কথা না বলেই নিজের রুমে চলে গেছে। দুটা দেয়ালের ডিজাইনের কারণে রুমটাকে চেনায় যাচ্ছে না। আবিরের রুম টা খান বাড়ির সবগুলো রুমের থেকে বড়। এক সময় এই রুমে আলী আহমদ খান আর মালিহা খান থাকতেন। ওনাদের জন্য ই মূলত বানানো হয়েছিল পরবর্তীতে বিভিন্ন সমস্যার কারণে আলী আহমদ খানরা নিচে চলে আসেন। আর রুমটা আবিরের দখলে চলে গেছে। রুমটার ঠিক মাঝামাঝিতে দরজাটা অবস্থিত। ভেতরে একপাশে আবিরের ব্যবহার্য সব প্রয়োজনীয় সামগ্রী আর অন্য পাশে সব অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, ছোটবেলার সাইকেল থেকে শুরু করে, লাগেজ, ক্রিকেট, ফুটবল খেলার যাবতীয় জিনিসপত্র, পুরোনো একটা ওয়ারড্রব আরও অনেককিছু। ঐদিকের সব জিনিসপত্র বড় কাপড় দিয়ে ঢাকা। মালিহা খান বলেছিলেন পুরোনো জিনিসপত্র স্টোররুমে রেখে দিতে কিন্তু আবির সেগুলো সরাতে রাজি হয় নি। রুমে আর্ট করায় এখন এক পাশ অতিরিক্ত সুন্দর হয়ে গেছে আর অন্যপাশ অগোছালো। তবে আবিরের সেদিকে মনোযোগ নেই। আবির উদ্রিত নয়নে দেয়ালের দিকে চেয়ে আছে। একবার চোখ পরে নিজের নামের দিকে পুনরায় নজর আঁটকায় মেঘের হাতের ছাপে সেই সাথে লেখা ‘Megh’ নামটার উপর। অকস্মাৎ আবিরের মুখে হাসি ফুটে।

অন্যদিকে তানভির ভার্সিটির সামনে আসতেই সোহাগ আর শিমুলকে দেখতে পেল। ওরা তানভিরকে দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে আসলো। তানভির প্রশ্ন করল,
“বন্যা কোথায়?”

” চল,আমাদের কাজটা আগে শেষ করে আসি! ৫ মিনিটের কাজ। ”

“বন্যার সাথে আগে দেখা করবো তারপর তোদের ব্যাপারটা ভেবে দেখব।”

“দুটা মেয়ের সাথে ঐদিকে গেল। ”

তানভির ওদের দেখানো পথে বাইক স্টার্ট দিল। থামলো ঠিক বন্যাদের পেছনে। বন্যারা পেছন ফিরে তাকিয়েও দেখল না। তানভির ঘনঘন হর্ন দিতে লাগলো। একপ্রকার বিরক্ত হয়ে বন্যা পেছন ফিরতেই দেখলো তানভির বাইক থেকে নিরেট দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। বন্যা চেহারা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। তানভির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“এদিকে আসো।”

বন্যা বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে আসলো। তানভির প্রখর তপ্ত স্বরে বলল,
“ফোন দিলে ফোন রিসিভ করার প্রয়োজন মনে করো না। ইদানীং ফোন বন্ধ করে রেখেছো। সমস্যা কি?”

বন্যা স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
” আমার ফোন নষ্ট হয়ে গেছে, নতুন ফোন কিনতে হবে। আব্বু বলছে আগামী সপ্তাহে ফোন কিনে দিবেন।”
“ওহ৷ আর কোনো কারণ নেই তো?”
“আর কি কারণ থাকবে?”

“ভাইয়া যখন এক্সিডেন্ট করেছিল তখন তোমাকে রাগে উল্টাপাল্টা কথা বলেছিলাম তারজন্য দুঃখিত। ভাইয়ার র*ক্তা*ক্ত দেহ দেখে আমি তখন মানসিকভাবে ভেঙে পরেছিলাম। বুঝে না বুঝে তোমার সাথে রাগ দেখিয়েছি৷ ”

বন্যা মলিন হেসে বলল,
” কোনো ব্যাপার না। আমি কিছু মনে করি নি। আপনার জায়গায় আমি থাকলেও হয়তো এভাবেই রিয়েক্ট করতাম নয়তো আরও বেশি করতাম৷ ”

“I am really Sorry, Bonna.”

“এত ফরমালিটি করতে হবে না। আমি সত্যি ই কিছু মনে করি নি। আবির ভাইয়া এখন কেমন আছেন? মেঘ কেমন আছে?”

“দুজনেই আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে।”

বন্যা হঠাৎ ই ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে শুধালো,
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“হ্যাঁ অবশ্যই। ”
“আপনি মিনহাজ আর তামিমকে কি করছিলেন?”

“কেনো? কোনো সমস্যা? ”

“না না৷ ওরা অনেকদিন ভার্সিটিতে আসে নি। এখন আসলেও অনেক চুপচাপ হয়ে গেছে তাই বলছিলাম..! ”

“ওহ আচ্ছা। এসব কোনো বিষয় না। আমি বেশি কিছু করি নি। আমার জায়গায় ভাইয়া থাকলে ওদের আর কোনোদিন দেখতেও পারতা না। ”

তানভির একটু থেমে আবার প্রশ্ন করল,
“ওহ একটা কথা, ভার্সিটিতে কেউ তোমাকে ডিস্টার্ব করে?”

বন্যা মনে মনে আওড়াল,
“ডিস্টার্ব করলেও তো আপনাকে বলবো না।”

স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
” নাহ। ”

“যদি মনে করো আমাকে না বললে আমি কিছু জানতে পারবো না তাহলে এটা তোমার ভুল ধারণা, বরং তুমি নিজ থেকে জানালে তোমারই লাভ। ”

বন্যা কপাল গুটিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“এখন আসি। ”

“যেতে বলছি তোমায়?”

“আমার তাড়া আছে। ”

“কেন?কেউ অপেক্ষা করছে?”

“মানে..”

“কিছু না।”

“ভার্সিটিতে পরশুদিন পোগ্রাম আছে কষ্ট করে মেঘকে জানিয়ে দিয়েন৷ ”

“ঠিক আছে। এখন চলো”

“কোথায়?”

“তোমায় কিছু খাওয়ায়। ”

“আমি আজ কিছু খাবো না। অন্য কোনো দিন আমি আপনাদের খাওয়াবো।”

তানভির ভারী কন্ঠে বলল,
“সেসব পরে দেখা যাবে, এখন বাইকে বসো। একগ্লাস আঁখের জুস হলেও খেতে হবে। না হয় আমি ধরে নিব, তুমি আমার উপর রাগ করে আছো। ”

“আমি সত্যি রেগে নেই। বিশ্বাস করুন।”

“মানলাম & বিশ্বাসও করলাম, এখন চলো।”

বন্যা দাঁতে দাঁত চেপে বাইকে উঠে বসলো। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও তানভিরের সঙ্গে দু গ্লাস আঁখের জুস খেয়েছে। শুধুমাত্র মেঘের ভাই বলে বাধ্য হয়ে বন্যা তানভিরের সাথে কথা বলে, না হয় কোনোদিন বলতো না। মিনহাজ আর তামিমকে বন্যা দু একবার জিজ্ঞেস করেছিল, কি হয়েছিল বলতে কিন্তু ওরাও কিছু বলে না। বারবার কথা এড়িয়ে যায়, তারজন্য বন্যাও তেমন জোর করে না। তবে ভালো কিছু যে ঘটে নি, বন্যা ১০০% নিশ্চিত। আবিরের অসুস্থতার পর থেকে মেঘ মিনহাজদের কথা ভুলেও ভাবে নি। বন্যা কিছু বললেও তেমন পাত্তা দেয় না, এমনকি রেগুলার ভার্সিটিও আসে না। বাড়ির কেউ কিছু বললে, শরীর খারাপ, মন খারাপ বলে নানান বাহানা দেয় আর বাকি সব তানভির সামলায়। না বোনকে কিছু বলতে পারে আর না বাসায়৷ মেঘের চোখে তানভির সেরা ভাই হলেও বন্যার চোখে তানভির একজন রাজনীতিবিদ, দাপটী, ভি*লেন টাইপের ছেলে। এত বছর যাবৎ মেঘকে শাসন করা দেখে বন্যা তানভিরকে ভয় পেত, মিনহাজদের ঘটনার পর থেকে বন্যা আরও বেশি আতঙ্কে থাকে। দূরত্ব মেইনটেইন করে চলে। তানভির বন্যাকে রিক্সায় উঠিয়ে দিয়ে সোহাগ দের কাছে আসছে৷ সোহাগ ঠাট্টার স্বরে বলল,
“আগে আসতেই চাইছিলি না আর এখন….”

তানভির মুচকি হেসে বলল,
” কতদিন পর মেয়েটাকে দেখলাম।”

“আহা! কত আবেগ! ”

“কোথায় যাবি বলছিলি চল”

বিকেল থেকেই মেঘ আর মীম শপিং এ যাবে বলে পাগলামি করছে। তানভিরকে যেতে বলা হয়েছিল কিন্তু তানভির পোগ্রামে ব্যস্ত বলে যেতে পারবে না ৷ মেঘ আর মীম একা যেতে পাগলামি শুরু করেছে৷ ওদের হাউকাউ শুনে আবির নিচে আসছে। আবিরকে দেখেই দুই বোন চুপ করে গেছে৷ সদ্য ঘুম থেকে উঠে আসায় আবিরের চোখগুলো লাল টকটকে হয়ে আছে।
আবির অস্ফুট কন্ঠে শুধালো,
“কি হয়েছে তোদের?”

মেঘ, মীম কেউ কোনো কথা বলল না। আকলিমা খান বললেন,
“ওরা শপিং এ যেতে চাচ্ছে।”

“যেতে চাচ্ছে যাক, সমস্যা কি?”

“একা যেতে চাচ্ছে! ”

আবির কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“একা যেতে হবে কেন? তোমরা না গেলে আমি ওদের নিয়ে যাচ্ছি । ”

মেঘ আর মীম দুজনেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল,
“নাহ!”

রাগে আবিরের চোখমুখ লাল হয়ে গেছে। কপাল কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,
“সমস্যা কি তোদের?”

মেঘ মাথা নিচু করে উত্তর দিল,
“কোনো সমস্যা নাই”

“সমস্যা না থাকলে কাকিয়াদের নিয়ে শপিং এ যা৷ বেশি ত্যাড়ামি করবি না। ঠিক আছে?”

মেঘ একদৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে উপর নিচ মাথা নাড়লো। অনুমতি ছাড়া একা শপিং এ যাওয়া অসম্ভব বিষয় এটা তাদের অজানা নয়, তবুও চেষ্টা করে দেখছিল, যদি অনুমতি পেয়ে যায়। আবির আগের ভাবমূর্তি বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে, মেঘ আর মীম তাড়াহুড়ো করে নিজেদের রুমে চলে গেছে। হালিমা খান আর আকলিমা খানের সঙ্গে মীম আর মেঘ শপিং এ গেছে। মেঘ আর মীম সুযোগ বুঝে আবিরের জন্য ২-৩ টা সাদা টিশার্ট, আর দুজনের জন্য ৩ টা পাঞ্জাবি কিনে নিয়ে আসছে। মেঘরা বাসায় ফিরতেই তানভির ভার্সিটির পোগ্রামের কথা বলেছে৷ আবিরও সেখানেই উপস্থিত ছিল৷ মেঘ নিজের হাতের শপিং ব্যাগ গুলো লুকিয়ে নিজের রুমে নিয়ে গেছে৷ আবির বিষয়টা খেয়াল করেও কিছু বলে নি৷

আবির রাতে ঘুমানোর জন্য রুমে ঢুকে দরজা চাপাতেই রীতিমতো আশ্চর্য হয়ে গেছে। আবিরের দরজার আড়ালে মেঘের হাতের ছাপটা আগের মতো বেরঙিন নেই। মেঘ সেখানে নীল রঙের ছাপ দিয়েছে, এমনকি অন্য হাতের ছাপও দিয়েছে। পাশাপাশি মেঘের দু হাতের ছাপ দেখে আবির মুচকি হেসে বলল,

” পাগলি একটা। ”

পোগ্রামের দিন ঠিক সময় মতো মেঘ ভার্সিটিতে চলে আসছে৷ মেঘকে দেখে মিনহাজ আর তামিম এগিয়ে এসে শুধালো,
“কেমন আছিস? ”

মেঘ অন্যদিকে মুখ করে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ। ”

মেঘ ওদের পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। বন্যা আর মেঘ দুজনেই আজ গাউন ড্রেসের সঙ্গে হিজাব পড়ে আসছে। মেঘ আর বন্যা কিছুটা সামনে এগুতেই লিফাত নামের ছেলেটার সাথে দেখা। লিফাতের হাতে সিগারেট, বন্যা আর মেঘকে দেখেই থতমত খেল। সিগারেট পেছনে ফেলে শান্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করল,

“কেমন আছো তোমরা?”

বন্যা আর মেঘ দুজনেই কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে৷ বন্যা ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”

বন্যা মেঘের হাত ধরে বলল,
“চল এখান থেকে।!

মেঘ তখনও সরু নেত্রে লিফাতকে পরখ করছে। ছেলেটার মুখে রহস্যময় হাসি৷ লিফাত প্রশ্ন করল,

” কেউ কেমন আছো জিজ্ঞেস করলে প্রতিত্তোরে তাকেও জিজ্ঞেস করতে হয় এটাও কি জানো না?”

বন্যা শক্ত কন্ঠে জবাব দিল,
“নাহ। জানি না। ”

বন্যা মেঘকে টেনে নিয়ে চলে গেছে । মেঘ কপাল কুঁচকে শুধালো,
“এই ছেলে আবার কে?”

“রসায়ন ডিপার্টমেন্টের চতুর্থ বর্ষের এক বড় ভাই৷ ”

“তোর সাথে কথা বলতে আসছে কেন?”

“আল্লাহ জানেন। তুই তো ইদানীং তেমন ক্লাসে আসিস না, একদিন আমি ফোনে কথা বলছিলাম, তখন এই ছেলে ইচ্ছে করেই আমার কাছে গেছে। আমি হঠাৎ ঘুরাতে প্রায় ধাক্কা লেগেই গেছিল, কথা বার্তা নেই হুট করে আমাকে ধমকিয়ে চলে গেছে। এরপর থেকে দেখলেই কেমন করে হাসে, এটা সেটা জিজ্ঞেস করে৷ ইচ্ছে করে মা*থাটা ফা*টিয়ে দেয়। ”

“ভাইয়াকে বলবো?”

“না না না৷ তোর ভাই আরেক ডেঞ্জারাস পাবলিক। ঐদিন দেখা হয়ছিল পরেও জিজ্ঞেস করতেছিল, আমাকে কেউ ডিস্টার্ব করে কি না!”

“তুই কি বলছিস?”

“আমি না করছি।”

“কেনো?”

“তোর ভাই মিনহাজদের যে অবস্থা করছে, আমি আর কাউকে বিপদে ফেলতে চাই না।”

“তাহলে আবির ভাইকে বলি?”

“ভুলেও না। তোর এই গু*ন্ডাপা*ন্ডা ভাইদেরকে আমার ব্যাপারে কিছু বলবি না।”

“তুই গুন্ডাপান্ডা কাকে বলছিস? আমার আবির ভাই ভাই হিরো নট ভি*লেন ওকে?”

“আর তোর ভাই?”

“আমার ভাই ও হিরো৷ মিনহাজদের যদি মে*রেও থাকে, ভাইয়া কি শুধু শুধু মা*রছে নাকি? আমার কর্মকাণ্ডে তোর কি তখন আমাকে মা*রতে ইচ্ছে করে নি? বল করে নি?”

“করেছে। ”

“তুই আমার বেস্টফ্রেন্ড হয়েও আমার কাজে তুই আমার উপর বিরক্ত হয়ছিস৷ এমনকি আমি নিজেই আমার উপর বিরক্ত ছিলাম। সেখানে ভাইয়া না মিনহাজকে চিনে, আর না তামিমকে চিনে। আবির ভাই আর তানভির ভাইয়ার প্রাণ এক সুতোয় বাঁধা, ওদের একজনের কিছু হলে আরেকজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাঁচাবে। সেখানে সামান্য মা*ইর আর এমন কি!”

বন্যা উদাসীন কন্ঠে বলল,
“এখন চল, অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে ”

মেঘ আর বন্যা ভেতরে ঢুকলো। পেছন দিকে বসতে যাবে এমন সময় ওদের একজন ক্লাসমেট সামনে থেকে ডেকে বলল,
“মেঘ, তোরা এখানে আয়। তোদের জন্য সিট আছে।”

মেঘ আর বন্যা এগিয়ে গেল। পাশাপাশি দুটা সিটে মেঘ আর বন্যা বসলো৷ ওদের সামনের সারিতেই লিফাতের বন্ধুরা বসা, কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই লিফাত এসে বসলো। মেঘ আর বন্যা লিফাতকে দেখেই পেছনে চলে যাওয়ার জন্য ফিসফিস শুরু করল। লিফাত পেছনে ঘুরে উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
“আরে তোমরা এখানে, কোনো কিছু লাগলে শুধু একবার বলবা, সাথে সাথে এনে দিব। ”

বন্যা আর মেঘ দুজনেই রাগে ফুঁসছে। বন্যা কিছু বলতে যাবে তার আগেই কেউ একজন রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠল,

” তোর কলিজাটা আমার লাগবে, দে এখন ”

মেঘ আর বন্যা দুজনেই চমকে উঠে পাশ ফিরে তাকালো৷ লিফাত ও আঁতকে উঠে সেদিকে তাকালো। চোখ পর্যন্ত ঢেকে রাখা ক্যাপ টা সরাতেই তানভিরের মুখটা স্পষ্ট দেখা গেল। লিফাতের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তানভিরকে দেখে বন্যা আর মেঘ দু’জনেই ভয় পাচ্ছে। লিফাত বেশ কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে হঠাৎ ই হেসে ফেলল।

তানভির চোখ মুখ কুঁচকে পুনরায় বলল,

“কি হলো দিবি না? মেয়েদের প্রতি এত যত্ন, যা চাইবে সাথে সাথে এনে দিবি আর আমি সামান্য কলিজাটা চাইছি তুই সেটা দিতেই রাজি হচ্ছিস না! লিফাত, তোর থেকে এটা আশা করি নি।”

লিফাত হঠাৎ ই অস্বাভাবিকভাবে হাসতে শুরু করল, হাসতে হাসতে বলল,
” আরে ভাই তুমি? তোমার কি লাগবে বলো শুধু! দেখো তোমার ভাই তোমার জন্য কি করে!”

তানভিরের চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ। বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,
“আপাতত তোর কলিজাটা হলেই হবে৷ চাইলে তোর হার্টটাও দিতে পারিস, আমিও দেখি ঐখানে ঠিক কতজনকে জায়গা দিয়েছিস৷ ”

লিফাত মুখে হাসি রেখেই বলল, এই সর সর, আমাকে সাইড দে। লিফাত এগিয়ে আসতেই তানভির বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো । লিফাত তানভিরকে জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো,
“প্লিজ ভাই, এখানে অনেক জুনিয়র আছে। ওদের সামনে আমার মানসম্মান টা ডুবিয়ো না। প্লিজ।”

তানভির রাগান্বিত কন্ঠে গজগজ করতে করতে বলল,
“তোর হিসাবের খাতায় এখন অব্দি ১০০০ খানের মেয়ের নাম উঠেছে। আর কত?”

“সরি ভাই। তুমি এখানে কেন আসছো ওরা কি তোমার কিছু হয়? নাকি অন্য কারো জন্য আসছো?”

“যেই বন্যার পিছনে ঘুরঘুর করছিস সে একান্ত ই আমার, তার পাশের জন আমার একমাত্র বোন আর আবির ভাইয়ার পার্সোনাল সম্পত্তি। তুই ভুল জায়গায় হাত বাড়িয়েছিস লিফাত, তোকে কি করা উচিত নিজেই বল। ”

“সরি ভাইয়া। প্লিজ মাফ করে দাও। আমি জানতাম না ওরা তোমার কাছের লোক।”

“তোকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি লিফাত, ভবিষ্যতে কোনো মেয়ের দিকে কুনজর দিলে, সার্টিফিকেট নিয়ে বের হতে পারবি না বলে দিলাম। ”

“প্লিজ তানভির ভাই, এমনটা করো না। প্রয়োজনে আমি তোমার পায়ে ধরে মাফ চাইবো। আবির ভাইয়া কোথায় আছেন, আমি ওনার পায়ে ধরে মাফ চেয়ে নিবো। তবুও এমন কিছু করো না ভাই। ”

“ঠিক আছে৷ লাস্ট বারের মতো ছেড়ে দিচ্ছি। ”

লিফাত একগাল হেসে বলল,
“থ্যাংক ইউ ভাই। ”

তানভির ভারী কন্ঠে বলল,
“মনে থাকে যেন।”

“অবশ্যই। ”

লিফাত নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলো। পেছন ফেরা তো দূর ঘাড় পর্যন্ত কাত করছে না। তানভির মেঘ আর বন্যার জন্য কিছু খাবার আগেই কিনে নিয়ে আসছিল। সেগুলো দিয়ে ক্যাপ পড়তে পড়তে বলল,
“আমি আসছি।”

মেঘ হাসিমুখে বলল,
“অনুষ্ঠান দেখবা না?”

“আমি অনুষ্ঠান দেখতে আসি নি। যে কাজে আসছিলাম তা শেষ । অনুষ্ঠান শেষে বাসায় চলে যাস, উল্টাপাল্টা ঘুরিস না। ”

তানভির চলে গেছে। খুশিতে মেঘের চোখ চকচক করছে। বন্যার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে বলল,
“দেখেছিস, আমার ভাই সেরাদের সেরা। তুই না বললেও ঠিকই জেনে ফেলছে৷ ঐ ছেলে মাফ যে চাইছে দেখছিস! ”

বন্যা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে রাগী স্বরে বলল,
“তুই গিয়ে শুনছিলি? মাফ নাও চাইতে পারে ”

মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এই তুই কি আমার ভাইয়ের পাওয়ার নিয়ে সন্দেহ করছিস? আমি সিউর এই ছেলে ভাইয়ার কাছে মাফ চাইছে৷ বিশ্বাস না হলে ছেলেকে ডাক দে, যদি স্বাভাবিক ভাবে কথা বলে তাহলে বুঝবো ভাইয়া কিছু বলে নি। আর যদি কন্ঠস্বর বদলে যায় তাহলে বুঝবো ভাইয়া ঝাড়ছে৷ ”

বন্যা ভাবলেশহীন জবাব দিল,
“আমি পারব না। ”

মেঘ ভেঙচি কেটে বলল,
” না পারলে নাই, আমার ভাই যে হিরো তার প্রমাণ আমার দিতেই হবে। ”

মেঘ সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে ডাকলো,
“Excuse me vaiya.”

ছেলেটা পেছনে না তাকিয়েই ঢোক গিলে ধীর কন্ঠে জবাব দিল,
“জ্বি আপু, কিছু বলবেন? আমাদের জন্য কি কোনো সমস্যা হচ্ছে? আমরা কি পেছনে চলে যাব?”

মেঘ তাড়াহুড়ো করে বলল,
“না পেছনে যেতে হবে না। আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ”

মেঘ বন্যার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“দেখলি?”

এরমধ্যে রাজনীতিবিদদের আগমন ঘটলো। আশেপাশে বসা জুনিয়র রা সবাই দাঁড়িয়ে সালাম দিচ্ছে। মেঘ আর বন্যা স্বাভাবিক ভাবেই বসে রইলো। একজনের নজর মেঘদের দিকে পরতেই সামনের দুতিন জনকে ডেকে বলল, অকস্মাৎ ওরা থমকে গেল৷ ঘুরে এসে মেঘদের কাছে দাঁড়ালো। মেঘ আর বন্যা মনে মনে ভয় পাচ্ছে। ভাবছে, দাঁড়ায় নি বলে হয়তো ওনারা বকা দিতে আসছেন। তাদের মধ্যে একজন মেঘকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,

“আসসালামু আলাইকুম আপু।”

“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”

“তোমরা এত পেছনে বসছো কেনো? আসো সামনে এসে বসো।”

মেঘ আর বন্যা দুজনেই থতমত খেয়ে বলল,
“না ভাইয়া, আমরা এখানেই ঠিক আছি। ”

“তা বললে হবে না আপু। আবির ভাইয়াকে এত করে রিকুয়েষ্ট করার পরও ওনি আমাদের পোগ্রামে আসেন নি। অবশ্য তার জন্য আমরায় দায়ী৷ ভাইয়া বারবার বলেছিল ওনাকে নিয়ে যেন কোনোরকম প্ল্যান না করি৷ কিন্তু আমাদের মন তাতে সায় দেয় নি, ভাইয়ার জন্য স্পেশাল আয়োজন করেছিলাম। ভাইয়া কোনোভাবে খবর পেয়েছে তারপর আর পোগ্রামেই আসে নি। সেসব পুরোনো কথা বাদ দেয়, এখন তোমরা যেহেতু আজকের পোগ্রামে আসছো, আমাদের উচিত তোমাদের সর্বোচ্চ আপ্যায়ন করা। প্লিজ তোমরা সামনে এসে বসো, প্লিজ ”

৪-৫ একসঙ্গে রিকুয়েষ্ট করতে শুরু করেছে। ওনাদের এত রিকুয়েষ্ট করা দেখে মেঘ আর বন্যা ভীষণ লজ্জায় পরে গেছে। পুরো হলের মানুষ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে মেঘ আর বন্যার দিকে। যাদের দাপটে সবাই আতঙ্কে থেকে সেখানে তারা প্রথম বর্ষের দুই মেয়েকে এত রিকুয়েষ্ট করতেছে এটা সবার কল্পনার বাহিরে। মেঘ আর বন্যা বাধ্য হয়ে সামনে গিয়ে বসলো। এত সামনে বসে পোগ্রাম দেখতে মেঘ আর বন্যা দু’জনের ই অস্বস্তি লাগছে৷ উঠে যেতেও পারছে না, একটু নড়লেই দুএকজন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,
“আপু কোনো সমস্যা? কিছু লাগবে?”

তাই উঠে যেতেও পারছে না। পোগ্রামের বিরতিতে মেঘদের খাবার পর্যন্ত দিয়ে গেছে৷ তানভির নিজেও অনেক খাবার কিনে দিয়ে গেছিলো। মেঘ আর বন্যা শুধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে কিছুই খেতে পারছে না।

মেঘ বাধ্য হয়ে আবিরকে কল দিল। আবির অফিসে কাজ করছিল। গতকাল থেকেই অফিসে আসছে। অফিসে আসলেও এখনও বাইক চালানোর অনুমতি পায় নি আবির। দুদিন যাবৎ আলী আহমদ খান নিজের সাথেই আবিরকে অফিসে নিয়ে যান, আবিরও বাধ্য ছেলের মতো আব্বুর সঙ্গেই যায়। মেঘ কল দিতেই আবির মুচকি হেসে কল রিসিভ করল,

মেঘ সালাম দিলো। আবির সালামের উত্তর দিয়ে শুধালো,
” কি ব্যাপার? তাদের আপ্যায়নে অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছিস?”

মেঘ উদ্বেগপূর্ণ কন্ঠে জানতে চাইলো,
“আপনি কিভাবে জানেন?”

” তোর আশেপাশে কখন কি ঘটনা ঘটে সব আপডেট ই আমার কাছে থাকে। ”

“ওনারা কল দিয়েছিল?”

“আমায় না জানিয়ে তোকে কিছু বললে ওদের যে কি অবস্থা হবে এটা তুই না জানলেও ওরা খুব ভালো করে জানে৷ খাবার খাইছিস?”

“নাহ। ”

“খেয়ে নে। না হয় একটার পর একটা দিতেই থাকবে৷ ওদের অতিরিক্ত ভালোবাসায় অতিষ্ঠ হয়ে আমি যোগাযোগ কমিয়ে ফেলেছি। এতদিনে তোকে পেয়েছে, তোকে ঠিকঠাক আপ্যায়ন করতে না পারলে ওরা ঘুমিয়েও দুঃস্বপ্ন দেখবে। বুঝলি।”

মেঘ মৃদু হেসে বলল,
“আমাদের পোগ্রাম দেখতে ভালো লাগছে না, সামনে এনে বসাইছে সব বিরক্ত লাগছে। ”

“কিছুক্ষণ দেখে বেশি খারাপ লাগলে আমার কথা বলে বেড়িয়ে পরিস৷ ”

“আচ্ছা। আপনি আসবেন?”

“কেনো? অনুষ্ঠান দেখতে নাকি ওদের কর্মকান্ড দেখতে?”

“নাহ নাহ, এমনি। আসবেন কি না জিজ্ঞেস করছি।”

আবির মন খারাপ করে বলল,
“জানিস ই তো আব্বু আমাকে বাইক নিয়ে বের হতে দেয় না। আব্বুর গাড়ি আমি নিব না, আসলে রিক্সা নিয়ে আসতে হবে। আসবো?”

মেঘ খানিক ভাবল, এমনিতেই আবিরের শরীর দূর্বল, এ অবস্থায় যদি আবার কোনো এক্সিডেন্ট ঘটে সে ভয়ে মেঘ বলল,
“নাহ, আপনার আসতে হবে না। ”

“রাগ করছিস? আমি রিক্সা নিয়ে আসি, সমস্যা নেই। ”

“সত্যি রাগ করি নি। আপনি পুরোপুরি সুস্থ হলে অনেক ঘুরতে পারবো৷ এখন না হয় বড় আব্বুর লক্ষ্মী ছেলে হয়েই থাকুন ”

আবির নিঃশব্দে হেসে বলল,
” সাবধানে থাকিস আর কোনো সমস্যা হলে জানাইস। ”

মেঘ ঠাট্টার স্বরে বলল,
” জানাবো না। ”

“কেনো?”

“কারণ আমি জানি, আমার কোনো সমস্যা হওয়ার আগেই কেউ বা কারা, কোনো না কোনো ভাবে আমাকে প্রটেক্ট করবেই। ”

“এত কনফিডেন্ট?”

“Yes, Sir”

“Okay Mam. পাকনামি রেখে এখন খেয়ে নেন।”

“আচ্ছা। আপনি খেয়েছেন?”

“আব্বু আমাকে খাওয়ার উপরই রেখেছেন। ঘন্টায় ঘন্টায় খাবার পাঠাচ্ছেন। এখন মনে হচ্ছে অফিসে না এসে বাসায় থাকলেই ভালো হতো।”

” ঠিক আছে খান, রাখি তাহলে ”

“ওকে।”

মেঘ আবার ডাকলো,
“আবির ভাই….!”

“হুমমমমমমম”

“কিছু না৷ রাখছি।”

মেঘ কল কেটে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। বন্যা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। মেঘ ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,

” এখন কি আমার ভাইয়া আর আবির ভাইয়ের ক্ষমতা সম্পর্কে আইডিয়া হয়ছে?”

বন্যা অস্থির হয়ে বলল,
“সেসব হয়েছে, কিন্তু তুই আগে এটা বল,
তুই আর আবির ভাই কি রিলেশনে আছিস?”

“হ্যাঁ”

“সত্যি? ওনি কি তোকে প্রপোজ করে ফেলছেন?”

“প্রপোজ করেন নি। তবে আমি মনে মনে এক্সেপ্ট করে নিয়েছি। কেন বল তো?”

“তোদের এত সুন্দর কথোপকথন শুনে আমার নিজের ই শান্তি শান্তি লাগছে।”

মেঘ মুচকি হাসলো, সাথে বন্যাও।

#চলবে