আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব-৬৯+৭০

0
5800

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৬৯
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

চৈত্রের উত্তপ্ত আবহে নগর যেন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। শহর জুড়ে বৃষ্টির জন্য হাহাকার৷ আরোপিত শীতলতার আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত আবির, তবুও গাত্র ঘেমে নাজেহাল অবস্থা। পূর্বের তুলবায় কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বেড়েছে। একফোঁটা বৃষ্টির আশায় সবাই অসহায়ের মতো আকাশের পানে চেয়ে আছে। অসহ্য গরমের জন্য আজ অফিস একটু তাড়াতাড়ি ই ছুটি হয়েছে। আবিরকে ফুপ্পি সকাল থেকে অনেকবার কল দিচ্ছিলো, আবির সুস্থ হয়েছে শুনে বার বার যেতে বলছিল কিন্তু আলী আহমদ খান আবিরকে কোনোমতেই যেতে দিবেন না, অন্ততপক্ষে এই ভর দুপুরে তো নয় ই। এমনকি বিকেলেও যেতে দেন নি। আবিরও বাবার মুখের উপর কিছু বলে নি। আবির বাসায় ফেরার পর থেকেই দেখছে মেঘ আর মীম মামনিদের পেছন পেছন ঘুরঘুর করছে। মামনিরা বারবার বারণ করছে দেখে আবির এগিয়ে গিয়ে শুধালো,
” কি হয়েছে তোদের? ”

মীম চট করে বলল,
“ফুপ্পি কল দিয়েছিল, আমাদেরকে বাসায় যেতে বলেছেন কিন্তু আম্মুরা যেতে দিচ্ছে না।”

আবিরের কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ পড়েছে। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“ফুপ্পি সকাল থেকে আমাকেও বার বার কল দিচ্ছেন, কোনো সমস্যা ই হলো কি না!”

আবির ফের জিজ্ঞেস করল,
“মামনি, তোমাদের কিছু বলেছে?”

“তেমন কিছু বলে নি। শুধু বলছেন তোরা যেন রাতে ওখানে খাওয়াদাওয়া করিস। ”

“তোমাদের কিছু বলে নি?”

“আমাদের শুক্রবারের দাওয়াত দিয়েছে। আবার বললো আসিফ আর আরিফকে পাঠিয়ে দাওয়াত দিবে। তোর আব্বুকেও কল দিয়ে বলবে বললো।”

আবির স্বাভাবিক ভাবে বলল,
“আমি ভেবেছিলাম শুধু আমাকেই কল দিচ্ছে। সকালে বলছি বিকালে আসতে পারি! কিন্তু গরমের জন্য আব্বু যেতে দেন নি, জোর করে বাসায় নিয়ে আসছে। ”

” রাতে ঝড় হতে পারে ভেবে, তোর চাচ্চুও ওদের পাঠাতে না করলো। এদিকে আফা বার বার কল দিয়েই যাচ্ছে। তানভিরও কল দিয়ে বলল ওদের পাঠাতে, তানভির নাকি কাজ শেষ করে ফুপ্পির বাসায় যাবে। ”

“আচ্ছা, আমি ফুপ্পির সাথে কথা বলছি।শুক্রবারে সবাই গেলে আজ তাহলে কারো যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ”

“সেই বরং ভালো। তুই কথা বলে দেখ।”

আবির ফোন হাতে নিয়ে চলে যাচ্ছে, মেঘ কপাল গুটিয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির একটু দূরে যেতেই মেঘ দ্রুত আবিরের কাছে গিয়ে হাতে চিমটি কাটলো। আবির তাকাতেই মেঘ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে তাকালো, মেঘের চোখের পাপড়ি ঘনঘন কাঁপছে, হালিমা খান, আকলিমা খান আর মীম তিনজনের নজরই মেঘের দিকে। মেঘ তড়িঘড়ি করে আবিরের থেকে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো। মেঘ চোখ মুখ গুটিয়ে কিছু একটা বুঝাতে চাচ্ছে। মেঘের ইশারায় বুঝানো কথা আবিরের বোধগম্য হলো না। পরপর দুবার ভ্রু নাচিয়ে নিঃশব্দে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল। মেঘ চাপা স্বরে বিড়বিড় করে বলল,

“আজ আইরিনের জন্মদিন৷ সে বায়না ধরেছে আজ আমাদের নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াবে।তারজন্য ফুপ্পি বার বার কল দিচ্ছেন।”

আবির মৃদু স্বরে প্রশ্ন করল,
“তোকে কে বলছে?”

“জান্নাত আপু।”

“আচ্ছা দেখছি,কি করা যায়।”

আবির আলী আহমদ খানের রুমে চলে গেছে। মেঘকে ডেকে আকলিমা খান জিজ্ঞেস করলেন,
“আবিরকে কি বলছিস ?”

মেঘ হাসিমুখে বলল,
” দেখো কাকিয়া, ফুপ্পিরা সবাই আমাদের বাসায় আসছে, খাওয়াদাওয়া করেছে, সারাদিন সময় দিয়েছে। প্রথমবার ফুপ্পি আমাদের যেতে বলছেন, আমাদের কি যাওয়া উচিত না বলো?”

“অবশ্যই উচিত। কিন্তু তোর আব্বু যে না করে গেল।”

“আবির ভাই বড় আব্বুর সাথে কথা বলতে গেছেন। দেখবা বড় আব্বু রাজি হয়ে গেছে। তখন আব্বু আর কিছুই বলতে পারবে না। ”

আকলিমা খান হেসে বললেন,
“তোদের মাথায় সারাক্ষণ শুধু দুষ্টু বুদ্ধি ঘুরে তাই না!”

মেঘ আর মীম দুজনেই হাসছে। এরমধ্যে আবির বেড়িয়ে এসে বলল,
” হাসাহাসি রেখে এখন রেডি হতে যা, কিছুক্ষণের মধ্যেই বের হতে হবে৷ ”

হালিমা খান প্রশ্ন করলেন,
“আবির, তুই কি বাসা চিনিস?”

আচমকা এমন প্রশ্নে আবির থতমত খেল, নিরবে ঢোক গিলল৷ মেঘ শান্ত স্বরে বলল,
“আজকাল বাড়িঘর চিনতে হয় না, বুঝছো আম্মু। ফোন নাম্বার আছে, গুগল ম্যাপ আছে কোনো না কোনোভাবে চলে যাওয়া যাবে। ”

হালিমা খান আর কিছু বললেন না। মেঘ, মীম আর আদি কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“চল চল রেডি হতে হবে। ”

আদি আমতা আমতা করে বলল,
“আমি আম্মুকে ছাড়া যাব না৷ তোমরা যাও৷ ”

মেঘ কপাল গুটিয়ে বলল,
” তুই কবে বড় হবি! মীম চল আমরায় যায়। ”

আবিরের সহজ স্বীকারোক্তি,
“তোরা রেডি হয়ে আমাকে ডাকিস।”

“ঠিক আছে । ”

মেঘ আর মীম দুজনেই রুমে চলে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ই মেঘ রেডি হয়ে গেছে, যথারীতি আবিরকে আর মীম দরজা থেকে ডেকে নিচে চলে আসছে। আবিরও রেডি হয়ে নিচে আসছে। মীম এখনও নামছে না দেখে মেঘ আবিরের ভয়ে চিল্লিয়ে উঠল,
“এই মীম, তাড়াতাড়ি আয়। ”

মীম রুম থেকে বেড়িয়ে আসছে। পড়নে বাসার জামা দেখে মেঘ রাগী কন্ঠে বলল,
“এতক্ষণেও হয় নি তোর!”

আবির ভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“এখনও রেডি হস নি কেন?”

মীম মাথা নিচু করে বলল,
“তোমরা যাও, আমি যাব না। ”

আবির প্রশ্ন করল,
“যাবি না কেন?আমরা অপেক্ষা করছি, যা রেডি হয়ে আয়। ”

মীম চাপা স্বরে জানাল,
“আমার যেতে ইচ্ছে করছে না, আমি যাব না।”

আকলিমা খান রাগে কটকট করে বললেন,
“এতক্ষণ তো যাওয়ার জন্য দুই বোন বাড়ি মাথায় তুলে ফেলছিলি, এখন কি হলো?”

আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“তুই কিছু বলছিস?”

মেঘ থমথমে কন্ঠে বলল,
“নাহ, আমি কিছুই বলি নি।”

মেঘ মীমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এই মীম, কি হয়ছে তোর, চল না যাই৷ অনেক মজা হবে। ”
“আপু তোমরা যাও, প্লিজ৷ আমার ভালো লাগছে না।”
আকলিমা খান কিছুটা রেগে বললেন,
” থাক, ওরে আর তেল মারতে হবে না। তোরাই বরং যা৷ ”
আবির গাড়ির চাবি মামনিকে দিয়ে বলল,
“দুজন গেলে গাড়ি নেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই৷ চাবিটা রেখে দিও। ”

“আবির গাড়ি নিয়ে যাহ। তোর আব্বু বা চাচ্চু শুনলে রাগ করবে।”

আবির গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল,
” ফুপ্পিদের বাসা পর্যন্ত গাড়ি নাও যেতে পারে।”

আবির বেড়িয়ে গেছে। মেঘ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিজেও ছুটলো। মীম মুচকি হেসে দরজার পানে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“তোমাদের দু’জনের মাঝে আমি কাবাব মে হাড্ডি হতে চাই না৷ ”

আবির রিক্সা ডেকে নিজে উঠে পরপর হাত বাড়িয়ে মেঘকে উঠালো৷ মেঘ ঘাড় ফিরিয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে, দৃষ্টি তার নিরেট। পাশাপাশি বসাতে আবিরের হাতের সাথে বার বার ধাক্কা লাগছিল, অজান্তেই মেঘের বুকের বাম পাশে ব্যথা অনুভব হলো। আবিরের সংস্পর্শ পেয়ে মেঘের মন কল্পনায় ভাসতে শুরু করেছে৷ আবির তাকাতেই সরাসরি মেঘের চোখে নজর পরল, মেঘের গভীর চাউনি, রাস্তার পাশের কৃত্রিম আলোতে আবিরের কাদম্বিনীকে অতীব মায়াবী লাগছে৷ আবির টেনেহিঁচড়ে দৃষ্টি সরালো। এই চোখে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে আবির নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, অন্য জগতে পাড়ি জমাতে ইচ্ছে করে। প্রায় অনেকটা পথ অতিক্রম করে ফেলেছে, অথচ মেঘ ঘোরেই আঁটকে আছে। অবশেষে আবির গলা খাঁকারি দিয়ে ধীর কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“আইরিনের জন্য কি নিবো?”

আবিরের কন্ঠ শুনে মেঘ চমকে উঠে, রিক্সার গতি আর নিজেকে একসঙ্গে সামাল দিতে না পেরে নড়ে ওঠে৷ আবির তৎক্ষনাৎ বামহাতে মেঘের কাঁধে হাত রেখে স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করে,
“ঠিক আছিস?”
“হ্যাঁ”
“আইরিনের জন্য কি নিবো?”
” আপনার যা ইচ্ছে নিন।”
” আমি আন্দাজি কি নিবো? মেয়েদের পছন্দ অপছন্দ সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নেই। তারজন্য ই তো তোর মতামত জানতে চাইছি৷ ”

মেঘ আড়চোখে আবিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
” আপনি আমার মতামত জানতে চাচ্ছেন? ”

“বাব্বাহ! মতামত জানতে চেয়ে অন্যায় করে ফেললাম নাকি?”

“হ্যাঁ, করেছেন। অনেক বড় অন্যায় করেছেন। বাই দ্য ওয়ে, আপনি মেয়েদের পছন্দ- অপছন্দ জানেন না তাহলে আমাকে সুন্দর সুন্দর গিফট দেন কিভাবে?”

“তুই সবকিছু নিজের সঙ্গে তুলনা করিস কেন বুঝলাম না! তোকে কিছু দিতে গেলে আমার একবারের জন্যও ভাবতে হয় না। আমি কনফিডেন্টলি বলতে পারি, আমার দেয়া ২০ টাকার একটা গোলাপ কিংবা ২০ হাজার টাকা দামের কোনো গিফট দুটায় তোর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাকিদের ক্ষেত্রে আমি তা পারবো না। ”

মেঘ বিপুল চোখে তাকিয়ে মনে মনে আওড়াল,
“এই কনফিডেন্স টা নিয়ে আমায় প্রপোজ করতে পারেন না? আপনি তো জানেন আমি হ্যাঁ ই বলবো তাহলে কেনো করেন না প্রপোজ? ”

আবির মেঘের গাঢ় কালো পল্লবে চোখ রেখে বলল,
” এভাবে তাকাইস না মেঘ, তছনছ হয়ে যাবো।”

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল, আবির ভাই নামক অসুখ টা ইদানীং মেঘকে আষ্টেপৃষ্টে ধরেছে। আবিরের বলা কথা, আচরণ সবেতেই অন্যরকম মাধুর্যতা মিশ্রিত। ধীরে ধীরে মেঘও বুঝতে পারছে আবির ভাই তার জীবনে বিশালাকৃতির গাছের ন্যায় ভূমিকা পালন করছে, গাছের শেকড় আর ঢাল পালার মতোই মেঘকে সকলপ্রকার অশুভ অঁচল থেকে আগলে রাখছে। আইরিনের জন্য গিফট কিনে যথাসময়ে বাসায় উপস্থিত হয়েছে, ততক্ষণে তানভিরও চলে আসছে। আড্ডা, খাওয়াদাওয়া শেষে প্রায় অনেক রাত করে ফুপ্পির বাসা থেকে বেড়িয়েছে। ততক্ষণে আকাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেছে, মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, সাথে মেঘের গর্জন। মেঘ উৎফুল্ল মেজাজে সামনে হাঁটছে। তানভির বাসা থেকে বেড়িয়ে তপ্ত স্বরে বলল,
“ভাইয়া, অনেক রাত হয়ে গেছে তুমি বরং বনুকে নিয়ে বাইক দিয়ে চলে যাও। ”

“বাসা থেকে অনুমতি নিয়ে প্রথমবারের মতো ও কে নিয়ে রাতের বেলা বেড়িয়েছি, এত তাড়াতাড়ি বাসায় চলে গেলে কিভাবে হবে! তাছাড়া আব্বু আমায় বাইক চালানোর অনুমতি দেন নি, হাজার হোক আমি আব্বুর বাধ্য সন্তান! আব্বুর অনুমতি ব্যতীত বাইক চালাতে পারি না। ”

“দিনের অবস্থা ভালো না৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে। তারপর ভিজে যেতে হবে। ”

“ভিজলাম সমস্যা কি? জ্বর হলে না হয় দুজনের ই হলো। ”

তানভির রাগী স্বরে বলল,
“একবার জ্বরে ভোগে শিক্ষা হয় নি তোমাদের? ”

আবির নাক কুঁচকে বলল,
“তখন কি একসাথে ভিজছিলাম নাকি? তাছাড়া মাঝে মাঝে বৃষ্টি বিলাস করা ভালো, এতে ভালোবাসা বাড়ে। বুঝছিস?”

” হ্যাঁ, তোমার প্রেম বিষয়ক আজগুবি লজিক খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারছি। ”

আবির এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“তুই কিন্তু একা বাসায় যাইস না।”

তানভির চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“হ্যাঁ,হ্যাঁ তোমাদের জন্য আমি এখন গাছতলায় বসে থাকি আর শুধু শুধু বৃষ্টিতে ভিজি। নাকি?”

আবির ঘাড় ঘুরিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“ভাইও তোর, বোনও তোর তাই দায়িত্বটাও তোর ই। ”

আবির হাসতে হাসতে সামনে চলে গেছে। তানভির না চাইতেই মৃদু হাসলো। আবিরের যখন যা ইচ্ছে হয় তাই করে। এটা তানভিরের থেকে আর কেউ ই ভালো জানে না। আবিরের সব পাগলামির একমাত্র সাক্ষী তানভির। আবিরের বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে হচ্ছে মানে এখন তাকে ভিজতেই হবে। তানভির বাইক স্টার্ট দিয়ে ওদের পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে আবারও বলল,
“তাড়াতাড়ি চলে এসো।”

মেঘ আশেপাশে তাকাচ্ছে আর গুটিগুটি পায়ে হাঁটছে। কিছুক্ষণ রাস্তাটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে হঠাৎ প্রশ্ন করল,
“এই রাস্তা দিয়ে গাড়ি নিয়ে ঢুকায় যেত, তাহলে আনেন নি কেন গাড়ি?”

“কেন আনি নি তার উত্তর এখন তোকে দিতে পারবো না। সময় হলে নিজেই বুঝতে পারবি৷ ”

মেঘ বলার মতো কথা খোঁজে পাচ্ছে না বলে চুপচাপ হাঁটছে। আবিরও নিশ্চুপ হাঁটছে । কোলাহলশূন্য নির্জন পথ, রাস্তা গুটিকয়েক বাইক আপন গতিতে ছুটছে। ফুপ্পিদের বাসার গলি থেকে বেড়িয়ে অনেকটা এগিয়ে মেঘ হঠাৎ ই আকুল কন্ঠে শুধালো,
” আমরা বাসায় যাব কিভাবে?”

“বাসায় না গেলে হবে না? ”

মেঘ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে আবিরের দিকে চেয়ে আছে। এমনিতেই অনেক রাত হয়ে গেছে। কোথায় তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়ার ব্যবস্থা করবেন তা না উল্টো মজা করছেন। ধীরে ধীরে বৃষ্টি পড়তে শুরু হয়েছে। মেঘের গর্জনের শব্দ আর বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা দেখে মেঘ ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছে। দিনের বেলা বৃষ্টি তার খুব বেশি পছন্দ হলেও রাতের বেলা বিদ্যুৎ চমকালেই মেঘের কলিজা শুকিয়ে যায়৷ আতঙ্কে মেঘের হাঁটার গতি কমে গেছে, বার বার আকাশের পানে তাকাচ্ছে আর আর আস্তে আস্তে হাঁটছে। আবির বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ মেঘের হাবভাব পর্যবেক্ষণ করে শুধালো,
“কোনো সমস্যা? ”

মেঘ কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“আপনি গাড়িটা নিয়ে আসেন নি কেন? আমার ভয় লাগতাছে। রাস্তায় একটা রিক্সাও নেই এখন কিভাবে বাসায় যাব?”

আবিরের নির্লিপ্ত জবাব এলো,
“আমি ভেবেছিলাম তুই অনেক সাহসী মেয়ে।”

মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
” আমি দিনের বেলা সাহসী কিন্তু রাতের বেলা ভিষণ ভীতু। ”

আবির শান্ত চোখে চেয়ে মনে মনে কিছু একটা ভেবে মৃদু হাসলো। মেঘের সেদিকে মনোযোগ নেই, একবার বিদুৎ চমকাচ্ছে আর মেঘের গা কেঁপে উঠছে।
আবির উদাসীন কন্ঠে শুধালো,
“আমি কাছে থাকা স্বত্তেও তুই এত ভয় পাচ্ছিস? তাহলে আমি থেকে কি লাভ হলো?”

মেঘ নিশ্চুপ। ফুটপাত দিয়ে হাঁটছে দুজন, কারো মুখেই কোনো শব্দ নেই। আবির কিছু বলতে চেয়েও বার বার ঢোক গিলে কথা গিলছে । বৃষ্টিস্নাত পথে প্রেয়সীর হাতে হাত রেখে বুকের বাম প্রকোষ্ঠে লুকায়িত কথাগুলো বলার সুপ্ত ইচ্ছে আবিরের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত এক দেয়াল বার বার আঁটকে দিচ্ছে আবিরকে। পরিবার নামক বেড়াজালে আবির আবদ্ধ হয়ে আছে, মেঘ আবিরকে ভালোবাসে, অনেক বেশিই ভালোবাসে কিন্তু আবিরকে পাওয়ার জন্য আদোও কি মেঘ পরিবারের সামনে দাঁড়াতে পারবে? যেখানে আবির নিজেই বাড়ির সবার মুখোমুখি হওয়ার জন্য নিজেকে যোগ্য ভাবতে পারছে না সেখানে মেঘ তো কিছুই না। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি বাড়ছে, সেই সাথে বিদ্যুৎ চমকানোর মাত্রাও বেড়েছে৷ দুজনেই কাকভেজা হয়ে গেছে, আবিরের পড়নে নেভিব্লু রঙের শার্টটা ভিজে গায়ের সঙ্গে একবারে লেপ্টে গেছে। ফোন আর ওয়ালেট টা ফুপ্পির বাসা থেকেই পলিথিনে পেঁচিয়ে নিয়ে আসছিলো। মেঘ আজ থ্রিপিস পড়েছিল, চুলে খোঁপা করে মাথায় ওড়না দিয়েছিল কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে নাজেহাল অবস্থা হয়ে গেছে। সরু রাস্তায় বড় বড় কদম ফেলায় আবির মেঘের থেকে কিছুটা এগিয়ে গেছে। প্রবল বৃষ্টিতে মেঘ হাঁটতেই পারছে না। আবির সামনে থেকে মেঘের দিকে তাকালেই মেঘ তেজঃপূর্ণ কন্ঠে বলে উঠল,
“আপনি আমায় ফেলে চলে যাচ্ছেন কেন? দেখছেন না আমি ভয় পাচ্ছি? ”

আবিরের পদযুগল থমকে গেছে, একপলক সামনে তাকালো পুনরায় আড়চোখে চেয়ে গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,
“কোলে নিতে হবে?”

মেঘ শশব্যস্ত হয়ে আবিরের দিকে তাকালো। সহসা মনে পড়ে গেছে আবিরের সঙ্গে কোনো এক বিকেলে বৃষ্টিতে ভেজার ঘটনা। সেদিন হোঁচট খাওয়ার পরপর আবিরের কোলে তোলার ঘটনা মনে পড়তেই মেঘ থতমত খেয়ে বলল,
‘নাহ নাহ, আপনি শুধু আমার কাছাকাছি থাকুন। ”

আবির নিজের হাত বাড়ালো, মেঘ একহাতে আবিরের হাতটা ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু মেঘের ছোট্ট হাত আবিরের মোটা হাতকে ঠিকমতো ধরতে না পেরে সহসা দু’হাতে আবিরের বাহু চেপে ধরেছে। আবির চাপা স্বরে বলল,
” মুরগির কলিজা নিয়ে রাতে ঘুমাস কিভাবে তুই?”

মেঘ ঠোঁট উল্টিয়ে আবিরের দিকে তাকাতেই আবারও বিদ্যুৎ চমকালো, মেঘ ভয়ে দুহাতে আবিরের বাহু আরও শক্ত করে ধরেছে। আবিরের নিজের অন্য হাত মেঘের হাতের উপর রেখে কোমল কন্ঠে বলল,
“ভয় পাইস না, আমি আছি তো!”

আবিরের স্পর্শ সেইসঙ্গে মোলায়েম কন্ঠে বলা ছোট্ট একটা কথাতেই মেঘের মন থেকে ভয় ডর সব একেবারে চলে গেছে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে আকাশের পানে চেয়ে মুচকি হেসে বলল,
” আমার আবির ভাই আমার পাশে থাকলে আর কিচ্ছু চাই না। যদি আজ আমার মৃ*ত্যুও হয় তবে যেন আবির ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে ম*রতে পারি। ”

আস্তে আস্তে মেঘের ভ*য় অনেকটায় কে*টে গেছে। আবিরের হাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে মেঘও নিজের মতো হাঁটছে। তবে আবিরের হাত একবারের জন্যও ছাড়ছে না।মেঘ আর আবির ফুপ্পিদের বিষয়ে টুকিটাকি কথা বলছে। এতবছর আবিরকে নিয়ে তেমন মাথা না ঘামালেও এখন আবিরের ব্যাপারে মেঘের খুব চিন্তা। মেঘ আচমকা প্রশ্ন করে বসল,
“আবির ভাই, আপনি কি এখনও সি*গারে*ট খান?”

আবির ভ্রু গুটিয়ে বলল,
“নাহ। কেনো?”

“সত্যি করে বলুন, আপনি কবে থেকে সি*গারে*ট খাওয়া শুরু করেছিলেন আর কবে শেষ করেছেন? নাকি এখনও খান?”

রোমান্টিক আবহাওয়ায় মেঘের এমন প্রশ্ন আবিরের কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো লাগছে। আবির কড়া গলায় বলল,
” এখন এসব প্রশ্ন করার সময়?”

মেঘ গাল ফুলিয়ে চোখ নামিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“তারমানে আপনি এখনও সি*গা*রেট খান?”

আবির বিরক্ত হয়ে মেঘের দিকে তাকালো পরপর এদিক সেদিক তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” আমি মিথ্যা কথা বলি না মেঘ, তারপরও যদি তোর আমাকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তাহলে আমার কিছুই বলার নেই। ”

মেঘ হতবাক হয়ে গেছে। আবিরকে ইদানীং কিছু বললেই ছ্যাত করে উঠে৷ বিশেষ করে বিশ্বাস নিয়ে কথা বললে তো উপায় ই নেই। মেঘ মনোযোগ দিয়ে কতক্ষণ আবিরকে দেখে প্রশ্ন করল,
“কি হয়েছে আপনার? এভাবে কথা বলছেন কেন?”

আবির জোর গলায় বলা শুরু করল,
” আমি কখনো কারো বিশ্বাস ভঙ্গ করি নি। তোর তো নয় ই। সি*গা*রেট আমার নে*শা না, যখন কোনো বিষয়ে খুব বেশি রে*গে থাকি, দিশাবিশা পায় না তখন একটু আধটু সিগা*রেট খেতাম এটুকুই ৷ তারপরও এত বছরে হাতে গুনা কয়েকটা সি*গারেট ই খেয়েছি। এসব এখন অতীত। সি*গারেট ছেড়েছি বহুদিন হলো, ছোঁয় ও না পর্যন্ত। সেদিনের পর তুই কোনোদিন আমার হাতে সিগা*রেট দেখেছিস? রুমে পেয়েছিস? নাকি আমার গায়ে সি*গারেটের গন্ধ পেয়েছিস? তবুও কেন এত অবিশ্বাস? তোর সন্দেহের তালিকায় কেনো সবসময় আমার নামটায় থাকে? এখনও এই মানুষটাকে একেবারে বিশ্বাস করা যায় না? ”

আবির একরাশ হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলেছে। শেষ প্রশ্ন গুলো বলার সময় আবিরের গলা কাঁপছিল । অজানা এক ক্রোধে আবির আবার দগদগে স্বরে বলল,
“তানভির কে কল দিয়ে তোকে নিয়ে যেতে বলি।”

মেঘ আর্তনাদ করে উঠল,
“কেনো?”

“আর যাই হোক, আবির কখনো কাউকে জোর করবে না অন্ততপক্ষে তাকে বিশ্বাস করতে তো নয় ই। আমার সত্যিই গাড়িটা নিয়ে আসা উচিত ছিল। ”

মেঘ মায়াবী দৃষ্টিতে চেয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
“আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন? আমি আপনাকে বিশ্বাস করি, অনেক বেশি বিশ্বাস করি। সত্যি বলছি। ভাইয়াকে কল দিবেন না, প্লিজ। আমি আপনার সাথেই যাব। ”

আবির উদাসীন কন্ঠে বলল,
” যেখানে তুই ই আমাকে বিশ্বাস করতে পারিস না সেখানে তোর বাবা মায়ের চোখে তো আমি মস্ত বড় অপরাধী হয়ে যাব। তোর জ্বর হলে কেউ আমায় ছেড়ে কথা বলবে না। ”

আবির দু পা এগুতেই,মেঘ এক হাতে আবিরের আঙুল ধরার চেষ্টা করে কিন্তু আবির আঙুল ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতেই মেঘ তড়িঘড়ি করে আবিরের সামনে গিয়ে সরাসরি আবিরের শার্ট আঁকড়ে ধরে সাফাই দেয়ার মতো করে আকুল কন্ঠে বলে উঠল,

” আমি আর কোনোদিন আপনাকে এমন কথা বলব না, আপনাক কখনও অবিশ্বাস করব না৷ আপনি যা বলবেন, যে অবস্থাতেই বলবেন আমি সাথে সাথে বিশ্বাস করে ফেলবো৷ প্লিজ আপনি রাগ করবেন না, প্লিজ৷ আমি কানে ধরছি….”

এতক্ষণ আবির শক্ত থাকলেও মেঘের শেষ বাক্যে আবির তৎক্ষনাৎ মেঘের হাত চেপে ধরলো৷ মেঘের হাত তখনও আবিরের বুকেই ছিল, সবেমাত্র কানে ধরার জন্য হাত তুলতে যাচ্ছিলো। তার আগেই আবির আঁটকে দিয়েছে। আবিরের রাগ মুহুর্তেই দমে গেল। ভারী কন্ঠে বলল,
” অতি সামান্য কারণে আবির কাউকে এত বড় শাস্তি দিবে না!”

মেঘ ফের বলে উঠল,
“আপনি রাগ করলে আমার খুব ভয় হয়..”

আবির অনুচিন্তন মনে শুধালো,
“কিসের ভয়?”

মেঘ বিড়বিড় করে বলল,
“আপনাকে হারানোর। ”
ঝুম বৃষ্টিতে মেঘের বিড়বিড় করে বলা কথাটা আবির ঠিকমতো বুঝতে পারে নি। সিউর হতে আবির পুনরায় শুধালো,
” কি বললি?”

মেঘ কিছু না বলে আবিরের উপর মাথা ঠেকালো। অনেকক্ষণ যাবৎ বৃষ্টিতে ভেজার কারণে মেঘের শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে অকস্মাৎ ভয়ে আবিরের বুক কাঁপছে, মেঘের শরীর যদি আবার খারাপ হয়! আবির তড়িঘড়ি করে বলল,
“শরীর খারাপ লাগছে?”

মেঘ সহসা আবিরের থেকে দূরে সরে দাঁড়ালো। প্রিয় মানুষের সাহচর্য পেলে মানুষ সব ভুলে যায়। মেঘের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে৷ ঘোরের মধ্যে কখন যে আবিরের বুকে মাথা রেখেছে সেটা খেয়াল ই করে নি৷ আবির ডাকতেই মেঘের ঘোর কেটে গেছে। লজ্জায় মাথা নিচু করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আবির পিছু পিছু ডাকছে, কিন্তু মেঘ তাকাতেই পারছে না। আবির এগিয়ে গিয়ে মেঘের মাথার কিছুটা উপরে দুহাত রাখলো। যেন সরাসরি বৃষ্টির পানি মেঘের মাথায় না পড়ে। মেঘ চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল একবার, পুনরায় লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। আবির ভাই মানুষটা কেমন জানি, এই রাগ করেন,এই আবার ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নেন। ওনার মন বুঝার সাধ্যি পৃথিবীর কারোর নেই৷ কিছুটা এগুতেই মেঘ চা খাওয়ার জন্য বায়না ধরেছে অথচ আবির খোঁজছে মেডিকেল শপ৷ নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অসময়ে মেঘকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে এখন নিজেই টেনশন করছে। মেঘের সেদিকে খেয়াল নেই, সে নিজের মতো ঘুরছে আর চায়ের দোকান খোঁজছে । জীবনে প্রথমবার গভীর রাতে বৃষ্টিতে ভিজছে, মেঘের মন এমনিতেই খুব উতলা হয়ে আছে তারউপর সাথে আবির ভাই। বাসার সব চিন্তা ভুলে বৃষ্টি উপভোগ করছে আর আবিরের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে আছে। অবশেষে একটা চায়ের দোকানে মেঘকে বসিয়ে আবির পকেট থেকে ফোন আর ওয়ালেট বের করছে। উপরে টিনের চালে টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। মেঘ আপনমনে বসা থেকে সেই চালের দিকে চেয়ে আছে। টিনের চালের মাতাল করা শব্দে মেঘের ভাবনারা ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছে। মেঘ আবিরের দিকে তাকাতেই আবির বলে উঠল,
” বৃষ্টির শব্দটা ভালো লাগছে?”

“হ্যাঁ! আগে বর্ষাকালে নানা বাড়ি গেলে এই শব্দটা শুনতাম, অনেক ভালো লাগতো। কতবছর পর আবার শুনছি। ”

আবির প্রশ্ন করল,
“লাল চা খাবি নাকি দুধ চা?”
“লাল চা খাব।”
“ঠিক আছে ম্যাম।”

আবির চলে গেল। হঠাৎ ই মেঘের কানে আবিরের কন্ঠ বেজে উঠলো,
“মামা, আপনি বসুন। চা আমি বানাচ্ছি।”

মেঘ আঁতকে উঠে পিছনে ঘুরলো। সত্যি সত্যি আবির চা বানাচ্ছে । মেঘ তৎক্ষনাৎ বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ভেতরে থাকা হৃদপিণ্ড ছুটছে দিগবিদিক, ঠোঁটে ফুটে উঠেছে প্রশান্তির হাসি। অকস্মাৎ মনে দুশ্চিন্তারাও ভর করেছে, নিজের অজান্তেই বলে উঠল,
” এত সুখ আমার কপালে সইবে তো?”

সঙ্গে সঙ্গে মেঘ নিজের মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
“কি সব বাজে কথা ভাবছিস!”

আবির দুকাপ চা নিয়ে এগিয়ে আসলো৷ আদা, লেবু দিয়ে দুকাপ চা নিয়ে আসছে। আবিরকে দেখে মেঘ পুনরায় চেয়ারে বসলো। মেঘকে এককাপ চা দিয়ে আবির পাশের চেয়ারে বসে চায়ে চুমুক দিল। মেঘ একচুমুক চা খেয়ে মেঘ মুগ্ধ হয়ে আবিরের পানে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি আর ঠিক কি কি পারেন একটু বলবেন?”

আবির নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
” বলতে পারবো না, তবে প্র্যাক্টিকেললি সব পারবো।”

“বাহ! বড় আব্বু আর বড় আম্মুর একমাত্র ভদ্র ছেলে। আপনি ছেলে হয়ে যা পারেন আমি মেয়ে হয়েও তা পারি না।”

আবির উদগ্রীব হয়ে বলল,
“আমি কখনোই ভদ্র ছেলে ছিলাম না। আমি এক নাম্বারে অসভ্য আর অভদ্র একটা ছেলে। তাছাড়া তোকে কাজ শিখতে বলেছে কেউ? তোর যখন যা লাগবে শুধু অর্ডার করবি!”

মেঘ প্রশ্ন করল,
” আপনি অভদ্র এটা কে বলছে? ”

“তোর আব্বু৷ ”

মেঘ হেসে বলল,
” আব্বুর চোখে দুনিয়ার সব ছেলেরায় অভদ্র। দেখবেন দুদিন পর থেকে আদিকেও এভাবেই কথা শুনাবে।”

আবিরও মলিন হাসলো। নিষ্টুর এই পৃথিবীতে সবার প্রিয় হয়ে উঠা কারো পক্ষেই সম্ভব না। তবে আবিরের প্রচেষ্টা শুধুমাত্র নিজেকে প্রমাণ করা। আবির অভদ্র নয় তবে অসভ্য তো বটেই। মেঘকে কাছে পেলে আরও বেশি অসভ্য হয়ে যায়। এজন্য মেঘের দিকে ঠিকমতো তাকাচ্ছেই না। আবির ফোন চেক করতেই দেখলো মোট ১৭ টা কল আসছে। বাসা থেকে ৮ টা কল আসছে, তানভিরও ৪-৫ বার কল দিয়েছে, ফুপ্পি, রাকিব ও কয়েকবার কল দিয়েছে। এখন ফোন দিলেই যে যার মতো কথা শুনাবে তারপর আবার মন খারাপ হবে সেই ভেবে কাউকেই কল ব্যাক করে নি। রাস্তায় একটা মেডিকেল শপ থেকে মেঘকে ঔষধ কিনে খাইয়েছে যাতে জ্বর না আসে। আবির আশেপাশে রিক্সা খোঁজছে, বাসার মানুষের থেকেও বেশি টেনশন হচ্ছে মেঘকে নিয়ে। কারণ মেঘকে সামাল দেয়ার মতো মানসিক অবস্থা আবিরের নেই। বৃষ্টির পানিতে চিকচিক করা মেঘের দু গাল, গোলাপের ভেজা পাপড়ির মতো লাল টকটকে দুই ঠোঁটে তাকানো মাত্রই আবিরের বুকে কম্পন অনুভব করে সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নেয়। কিন্তু মেঘ নিজের মতো করে কথা বলছে, হুটহাট আজগুবি প্রশ্ন করতে শুরু করে যে প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মতো পরিস্থিতি আবিরের নেই। তাই মেঘকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে চাচ্ছে। একটা ফুলের দোকান দেখে মেঘ বলে উঠল,
“আবির ভাই, আমাকে একটা গোলাপ ফুল কিনে দিবেন?”
“নাহ।”
“কেনো?”
” গোলাপ ব্যতীত অন্য কোনো ফুল নে। ”

“লাল গোলাপ গুলো খুব সুন্দর লাগছে। একটা নেয়?”
“বললাম তো নাহ।”

মেঘ মন খারাপ করে দুটা বেলীফুলের মালা নিয়েছে। আবির টাকা দিয়ে বেড়িয়ে এসে বলল,
“দে পড়িয়ে দেই। ”
“প্রয়োজন নেই।”
“কেন?”
“কারণ এগুলো মীমের জন্য নিয়েছি।”
“ওয়েট আরও কয়েকটা নিয়ে আসি। ”
“লাগবে না। আমার জন্য আনলে লাল গোলাপ নিয়ে আসুন।”

আবির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“চল সামনে যায়, সামনে হয়তো রিক্সা পাবো।”

মেঘ উষ্ণ স্বরে বলল,
“তবুও গোলাপ দিবেন না?”

“নাহ।”
মেঘ রাগে ফোঁসতে ফোঁসতে চলে যাচ্ছে। বৃষ্টি কমে এসেছে। তবে গাছ থেকে এখনও টুপটুপ করে পানি পড়ছে। আবির মেঘের গমনপথে চেয়ে ভারী কন্ঠে বলল,
“যেই ফুল তোকে অন্য কোনো ছেলে দিতে চেয়েছিল, সেই ফুল আমার চোখে বিষের মতো। আবির সেই বিষ ছুঁবে না। ”

এদিকে তানভির বাসার কাছে গাছের নিচে বাইকে বসে আছে আর ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। বৃষ্টি কমাতে আবিরকে কয়েকবার কল পর্যন্ত দিয়েছে কিন্তু আবির ফোন ই ধরছে না। হঠাৎ বন্যার কথা ভেবে কল দিল বন্যার নাম্বারে। অনেকদিন পর বন্যার ফোনে কল ঢুকছে। প্রথমবার রিসিভ হলো না। দ্বিতীয় বার রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে বন্যা প্রশ্ন করল,
“হ্যালো কে?”

তানভির কপাল গুটিয়ে বলল,
“বাহ! এত অপরিচিত হয়ে গেলাম?”

বন্যা তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,
“আসসালামু আলাইকুম”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
“সরি তানভির ভাই। নতুন ফোন তাই নাম্বার টা সেইভ ছিল না। ”
“ওহ আচ্ছা। ফোন কবে কিনলা?”
“আজকেই কিনেছি। আপনি কি বাহিরে?”

“হ্যাঁ। কেনো?”

“বৃষ্টি, বাতাস এসবের শব্দ হচ্ছে মনে হয় ।”
“ওহ আচ্ছা। গাছতলায় বসে আছি তাই এমন শব্দ হচ্ছে। ”

“গাছতলায় কেন?”
“এমনিতেই একটু কাজ ছিল। রাতে খেয়েছো?”
“জ্বি। আপনি?”
“হ্যাঁ ফুপ্পিদের বাসায় খেয়ে আসলাম।”

“ফুপ্পিরা কেমন আছেন?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
“আচ্ছা ভালো থাকুন, রাখি এখন।”
“কেনো?”
“ঘুমাবো।”
“আচ্ছা ঘুমাও। ”

তানভিরের কথা শেষ হওয়া মাত্রই আবির আর মেঘ আসছে। যথারীতি তিন জনেই কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরেছে৷ রাত ১১ টার উপরে বেজে গেছে, অথচ তিন ভাই ই সোফায় বসে আছে। কাঠগড়ায় মেঘ,আবির আর তানভির। মেঘ হাঁচি দিতেই আবির মাথা নিচু করে কপাল গুটিয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে ধরেছে। আজ একটা ঘূর্ণিঝড় হতে চলেছে যার সূচনা মেঘের একটা হাঁচিই করে দিল। আবির মাথা নিচু করে মেঘকে আস্তে করে বলল,
“রুমে যা। ”

মেঘ কোনোদিকে না তাকিয়ে ভেজা জামা নিয়েই নিজের রুমে দিকে ছুটছে৷ ড্রয়িং রুম, সিঁড়ি সব ভিজে গেছে। আলী আহমদ খান মেঘের দিকে একবার তাকিয়ে পুনরায় আবিরদের দেখলো৷ গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“তোমাদের এই অবস্থা কেন?”

আবির সাফাই দেয়ার স্বরে বলল,
“আপনিই বলেছেন বাইক যেন না চালাই। আর রাস্তায় রিক্সা পায় নি।”
“গাড়ি নাও নি কেন?”
“ফুপ্পিদের বাসা পর্যন্ত গাড়ি ঢুকবে কি না সিউর ছিলাম না৷ ”
“বাসা পর্যন্ত না যাক রাস্তা পর্যন্ত তো যেতো?”
“রাস্তায় রাখবো, তারপর কোনো এক্সিডেন্ট হলে আই মিন চু*রি হলে গাড়ির দায় কে নিবে? আমি?”

আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে বললেন,
“তুমি না নিলে তোমার বাপেই না হয় দায় নিতো। যত যাই হোক গাড়ি টা তো তোমার বাপের ই। ”

আবির মৃদু হেসে বলল,
” আমার জন্য কাউকে কোনো দায় নিতে হবে না৷ আর আমিও অযথা কোনো দায় নিতে চাই না। ”

মোজাম্মেল খান এবার চেঁচিয়ে উঠলেন,
” তোমাদের ঘাড়ত্যাড়ামির জন্য আমার মেয়েটাকে কেন ভিজিয়েছো? ওর কিছু হলে! ”

আবির রাশভারি কন্ঠে বলল,
“আপনার মেয়ের কিছু না হলেই তো হলো! ”

এতরাতে এখানে কথা বাড়ালে ঝামেলা হবে ভেবেই মোজাম্মেল খান হুঙ্কার দিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে চলে গেছেন। ইকবাল খান ও নিজের রুমে চলে গেছেন। আলী আহমদ খান কাজের মহিলাকে ডেকে ফ্লোর মুছার কথা বলে নিজেও ভেতরে চলে গেছেন। আবির ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে। রুমে গিয়ে রাগে বিছানার উপর ফোন ছুঁড়ে ফেলে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেছে৷ আবিরের রাগের একমাত্র কারণ সে নিজেই। আবির শাওয়ার নিয়ে আবার রান্নাঘরে এসে মেঘের জন্য স্যুপ আর কফি করে নিয়ে গেছে। মেঘকে ডাকতেই মেঘ দরজা খুলে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“ভেতরে আসুন ”

আবির গুরুতর কন্ঠে বলল,
“নাহ থাক, কখন আবার চেঁচিয়ে তোর আব্বুকে ডাকবি। ”

মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে থেকে খাবার গুলো নিলো। আবির সঙ্গে সঙ্গে চলে গেছে। তানভির ফ্রেশ হয়ে আবিরের রুমে আসছে। মূলত মিনহাজদের ব্যাপারে কথা বলতেই এসেছে। আবিরের এক্সিডেন্টের পর থেকে মেঘের মতো আবিরও ওদের ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। তানভিরকে প্রথম এক দুবার জিজ্ঞেস করলেও এরপর থেকে একবারের জন্যও তাদের কথা জিজ্ঞেস করে নি। তানভির আজ নিজ থেকেই কথা বলতে আসছে।

আজ শুক্রবার। ফুপ্পির বাসাতে আজকে সবার দাওয়াত৷ নামাজ পড়েই সবাই রওনা দিয়েছে। আবির, তানভিররা, মেঘ, মীম,আদি ইকবাল খানের গাড়িতে যাচ্ছে৷ বাকিরা আলী আহমদ খানের গাড়িতে। আরিফ আর আসিফ দুজনেই গলির মোড় থেকে ওনাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে৷ মীম আরিফকে দেখেই বড় করে ভেঙছি কাটলো। আত্মীয়তার সম্পর্কের খাতিরে আরিফ মৃদুভাবে হাসলো। মেঘ মীমকে সারাদিন সামলে রেখেছে, যেন কোনোভাবেই কোনো অঘটন না ঘটায়। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে বিকেলের দিকে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে । আগামী পরশু থেকে রমজান শুরু তাই ফুপ্পির জোরাজোরিতে আজই সবাইকে আসতে হলো। ফুপ্পির সাথে সবার ই খুব ফরমাল সম্পর্ক৷ আবিররা ফুপ্পিকে যতটা আপন করে নিয়েছে বড় ঠিক ততটা পারছে না।

মাঝরাতে হঠাৎ ই আবিরের ফোনে কল বাজতেছে। আবির ঘুমের ঘোরে প্রথমে কেটে দিয়েছে। খানিকক্ষণ বাদে আবারও ফোনে কল বাজতেছে। আবির কল রিসিভ করে অর্ধ ঘুমন্ত অবস্থায় জিজ্ঞেস করল,
“কে?”

“পে*ত্নী।”

(চলবে)

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৭০
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

আবির ঘুমের ঘোরেই মুচকি হাসলো। ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে বিমোহিত কন্ঠে জানতে চাইল,

“আবির কি কোনো অন্যায় করেছে? তা না হলে, মাঝরাতে পরীর বদলে পে*ত্নী কেন কল দিবে আমায়?”

“হ্যাঁ। আপনি মস্ত বড় অ*পরা*ধ করেছেন।”

আবিরের চোখ বন্ধ, এখনও ঘুমের রেশ লেগে আছে চোখে মুখে। আধঘুমে থেকেই আবির পুনরায় প্রশ্ন করল,
” সর্বনাশ! অপ*রা*ধ টা কি বলা যাবে?”

মেঘ নিচু কন্ঠে বলল,
“আপনি আমার প্রথম কল টা ধরলেন না কেন?”

আবির চোখ মেলে ফোনের দিকে তাকালো। তড়িঘড়ি করে কল লিস্ট চেক করল। ঘুমের ঘোরে কল কাটার ঘটনা মনে পড়তেই মাথা চুলকে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“Ops! Sorry. ঘুমের মধ্যে কিভাবে বুঝবো যে আপনি কল দিয়েছেন? সরি ”

সদ্য ঘুম থেকে উঠা আবিরের ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠ শুনে মেঘের হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে কি যেন হৃদ*য়ে ছু*রি*র ন্যা*য় তোলপাড় চালাচ্ছে। সবকিছু যেন মুহুর্তেই ত*ছনছ করে দিবে। মেঘ বুকের বাম প্রকোষ্ঠে হাত রেখে নিজেকে সংযত করে ধীরস্থির কন্ঠে প্রশ্ন করে,
“সেহরি খাবেন না? উঠুন। ”

আবির নীরস গলায় বলল,
“না খেয়ে কত রমজান কাটিয়েছি! এখন না খেয়ে রোজা রাখা অভ্যাস হয়ে গেছে। ”

মেঘ শক্ত কন্ঠে বলল,
” না খেয়ে থাকতেন কেন? ”

“তখন তো আর কেউ কল দিয়ে জাগিয়ে দিত না আমায়।”

মেঘ চাপা স্বরে বলে উঠল,
” এখন যেহেতু জাগিয়ে দিচ্ছে, তারমানে বুঝতে হবে অভ্যাস পরিবর্তন করার সময় হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি ওঠেন, আমি রাখছি। ”

আবির তপ্ত স্বরে ডাকল,
“মেঘ…”

“জ্বি৷ ”

” নিজেকে সবকিছুতে জড়িয়ে রাখিস। কোনো একটাকে কেন্দ্র করে চললে পরবর্তীতে তার ব্যথাটা সহ্য করতে পারবি না। ”

মেঘ কপাল গুটিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,
“রাত-বিরেতে এসব কি কথা বলছেন? উঠবেন নাকি উঠবেন না বলুন? ”

“আরে বাবা এখনি উঠতেছি৷ হাত মুখটা ধৌয়ে আসছি। ”

“ওকে।”

মেঘ কল কেটে তাড়াতাড়ি নিচে আসছে। ততক্ষণে টেবিলে খাবার রেডি৷ প্রথম রোজা বলে আজ আদিও উঠেছে। আবির হাত মুখ ধৌয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিচে আসছে, আসার সময় তানভিরকেও ডেকে নিয়ে আসছে। মেঘের বিপরীতে বসতে বসতে আবির অল্প করে ভ্রু নাচালো । মেঘ অপ্রখর হেসে চিবুক নামিয়ে নিল। খাওয়া শেষে যে যার মতো রুমে চলে গেছে। আবির নামাজে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। মেঘ রেস্ট নেয়ার জন্য একটু শুয়েছে। বন্যাকে নেটে দেখে সঙ্গে সঙ্গে কল দিল। বন্যা কল রিসিভ করামাত্র মেঘ বলে উঠল,
“আসসালামু আলাইকুম। সেহরি খেয়েছো জানু? ”

“মাত্রই খেয়ে আসলাম। তুমি খেয়েছো বেবি?”
“হ্যাঁ খেয়েছি৷ এখন রেস্ট নিচ্ছি।”

বন্যা ঠাট্টার স্বরে বলল,
” সাবধান, রোজা রমজানের দিন৷ দিনের বেলা মন কে সংযত রাখিস। আবির ভাইয়াকে ঢ্যাবঢ্যাব করে দেখিস না আর ওনাকে নিয়ে বেশি ভাবিসও না৷ ”

মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“ওনাকে দেখব কিভাবে? ওনি সারাদিন অফিসেই থাকবেন৷ আচ্ছা একটা কথা বলবি?”

“কি? ”

“আমি যদি রোজা রেখে পাঞ্জাবি বা টিশার্ট পেইন্ট করি তাহলে কি আমার রোজা হালকা হয়ে যাবে?”

বন্যা হাসতে হাসতে বলল,
“হ্যাঁ হয়ে যাবে কারণ তুই রঙ করতে করতে আবির ভাইয়ার কথা ভাববি। তাই দিনের বেলা জামা কাপড়ের দিকে ভুলেও তাকাবি না। বুঝলি?”

“আচ্ছা ঠিক আছে। নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছে। রাখছি। ”

বন্যা কল কাটতেই দেখল তানভিরের আইডি থেকে মেসেজ আসছে। ছোট করে লেখা,
“সেহরি খেয়েছো?”

বন্যা উত্তর দিল,
“জ্বি, আলহামদুলিল্লাহ। আপনি খেয়েছেন?”

“হ্যাঁ৷ ”

কোনো পাশ থেকেই আর কোনো মেসেজ আসলো না। তানভির ২-৩ বার কিছু লিখেও বার বার মুছে দিয়েছে। কিছু একটা বললে সেই মেসেজ মেঘকে দেখালে বোনের নজরে তানভির ছোট হয়ে যাবে সেসব ভেবেই তানভির কিছু লিখতে পারছে না। প্রায় ৫ মিনিট পর বন্যার আইডি থেকে মেসেজ আসলো,
“গুড নাইট৷ ”

তানভির মলিন হেসে লিখল,
“গুড নাইট & টেইক কেয়ার। ”

সকালে মেঘের ঘুম ভাঙার আগেই আবির অফিসে চলে গেছে। বাড়ি সম্পূর্ণ নিরব। মেঘ একে একে সবার রুমেই চক্কর দিয়ে আসছে। মীম আর আদি টিউশনে গেছে, তানভির, আবির, আলী আহমদ খানরা কেউ বাসায় নেই। বাড়ির তিন কর্তী নিজেদের রুমে কুরআন শরীফ পড়ছেন। মেঘ ঘুরে ফিরে নিজের রুমে এসে শাওয়ার নিয়ে ওজু করে সেও কুরআন শরীফ পড়তে বসেছে৷ ইফতারের আগমুহূর্তে আবিররা বাসায় ফিরেছে। প্রথম রোজা তাই মালিহা খান বার বার সবাইকে বলে দিয়েছিলেন যেন ইফতারের আগেই চলে আসে৷ মেঘ শরবত বানাচ্ছে, মীম মেঘকে সাহায্য করছে। আর আদি দুপুর থেকেই সোফায় পরে আছে। ১০ মিনিট পর পর জিজ্ঞেস করে,

“মেঘাপু, আর কতক্ষণ? ”

“আপু আর কতক্ষণ পরে আজান দিবে?”

মেঘ আর মীম আদি কে বুঝিয়ে রাখতে রাখতে নিজেরাই ক্লান্ত হয়ে গেছে। আদি এইযে শোফায় শুয়েছিল আর উঠতেই পারছে না। আবির ইফতারের আগে আগে এসে আদিকে কোলে করে চেয়ারে নিয়ে বসিয়েছে। চেয়ারে বসেও আদি হেলে পড়ে যাচ্ছে । আদির অবস্থা দেখা মীম মিটিমিটি হাসছে। আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে বললেন,
“এভাবে হেসো না, এমন দিন সবাই পার করে আসছে। ”
সঙ্গে সঙ্গে মীমের হাসি থেমে গেছে। চুপচাপ ইফতার করতে বসে পরেছে। মেঘ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শরবতে একটু পর পর চিনি দিচ্ছে৷ প্রথমবারের মতো শরবত বানানোর দায়িত্ব মেঘ নিয়েছে। যদি ঠিকঠাক না হয় তাহলে বাড়ির সবার সামনে নাক কাটা যাবে। এজন্য আরও বেশি ভয় পাচ্ছে৷ আবারও চিনি দিতে যাবে তখনই আবির মৃদু স্বরে বলল,

“আর কত চিনি দিবি! থাম এবার। তোর চিনি দেয়া দেখে একদিনেই সবার ডায়াবেটিস হয়ে যাবে। ”

মেঘ কপাল গুটিয়ে তাকালো কিন্তু কিছু বলল না৷ তানভির বলে উঠল,
“প্রথম বার শরবত বানাচ্ছে তাই এই অবস্থা। সপ্তাহ খানেক বানালেই অভ্যাস হয়ে যাবে। ”

আকলিমা খান রান্নাঘর থেকে আসতে আসতে প্রশ্ন করলেন,
” তানভির, সবসময় তো তুমিই শরবত বানাও। এবার দায়িত্ব মেঘকে দিয়েছো কেনো?”

তানভির মুচকি হেসে বলল,
” সবসময় আমার শরবত খেয়েছো এবার আমার বোনের হাতের শরবত খাবে। সমস্যা কি?এই রমজান যেমন স্পেশাল তেমন শরবত টাও স্পেশাল হবে।”

“রমজান স্পেশাল কেন?”

“বাহ রে! কতবছর পর ভাইয়ার সাথে রমজান পালন করছি। তাছাড়া আমাদের ফুপ্পিকে পেয়েছি। স্পেশাল হবে না?”

“হ্যাঁ, অবশ্যই। ”

পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)

★★★★★

ব্যস্ততার মধ্যেই রমজান কাটছে সবার। ঈদের ছুটির জন্য বেশিরভাগ কাজ আগেভাগে শেষ করে রাখছে। সময় করে ইকবাল খান সিলেট আর মোজাম্মেল খান কিছুদিনের জন্য রাজশাহী গেছেন। আলী আহমদ খান আর আবির মিলেই অফিস সামলাচ্ছে। আলী আহমদ খান ইফতারের আগে আগে বাসায় চলে গেলেও আবির প্রতিদিন ফিরতে পারে না। আব্বুর অফিসের কাজ শেষ করে নিজের অফিসে যাওয়ার আগে, মাঝে মাঝে রাস্তাতেই মাগরিবের আজান পড়ে যায়, মাঝে মাঝে রাকিবদের সাথে ইফতার করে৷ কিন্তু প্রতিদিন মাগরিবের নামাজের পরপরই মেঘ কল দেয়। কল দিয়ে প্রথম প্রশ্ন টায় থাকে,
“ইফতার করেছেন? কি কি খেয়েছেন?”
দ্বিতীয় প্রশ্ন,
“বাসায় কখন আসবেন?”
প্রতিদিন ই মেঘের একই রুটিন। আবিরের বাসায় ফেরার সময় অনুসারে মেঘ নিজের কাজ শেষ করে। আবির বাসায় ইফতার করে বের হলে ফিরতে ফিরতে প্রায় ১-২ টা বেজে যায়৷ আর ইফতার বাহিরে করলে তারাবির নামাজ শেষে বাসায় চলে আসে। মেঘও সেই অনুযায়ী নামাজ শেষ করে পাঞ্জাবি ডিজাইন করতে থাকে। আবির ফিরলে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে৷ রাত ছাড়া এখন আবিরকে দেখা যায় না বললেই চলে৷ তাই রাতটায় আবিরকে দেখার উত্তম সময়৷ যেদিন আবির বেশি রাত করে বাসায় ফিরে সেদিন সেহরিতে আবির মেঘকে আগে কল দেয়৷ অন্যদিনগুলোতে মেঘ আবিরকে কল দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়৷ পাশাপাশি রুমে থেকেও সামনাসামনি কারো মুখে কোনো কথা নেই৷

আজ শুক্রবার অফিস বন্ধ থাকায় আবির সকাল থেকে জামাকাপড় ধৌয়তেছে। মেঘ কোনো কারণে ছাদে গিয়ে দেখে ছাদ ভরে আছে আবিরের শার্ট আর টিশার্টে। সবগুলোর মধ্যে সাদা শার্টের সংখ্যায় বেশি। সবগুলো গুনে শেষ করে মাথায় হাত দিয়ে বিড়বিড় করতে করতে মেঘ নিচে নামছে৷ আবির আরও কতগুলো শার্ট আর পাঞ্জাবি নিয়ে উপড়ে উঠছে৷ মেঘকে বিড়বিড় করে নামতে দেখে প্রশ্ন করল,

” ভরদুপুরে ছাদে গেছিলি কেন?”

মেঘ উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“একটা মানুষের ২৭ টা সাদা শার্ট কিভাবে থাকবে পারে?”

আবির ভ্রু কুঁচকে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“আরও ৫ টা এখনও পড়িই নি।”

“এত শার্ট দিয়ে কি করবেন?”

“ধৌয়ে দিলাম, যেগুলো ছোট হবে সেগুলো দিয়ে দিব। ”

মেঘ চাপা স্বরে আওড়াল,
“আমাকে দুটা শার্ট দিয়েন।”

আবির ভারী কন্ঠে শুধালো,
“তোর শার্ট লাগবে?”

মেঘ বিপুল চোখে চেয়ে তাড়াতাড়ি এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লো৷ মনে মনে বলল,
“ইশশশ, ওনি শুনে ফেলল!”

মেঘ দ্রুত নিজের রুমে চলে গেছে। আবির নামাজ পড়ে এসে সেই যে ঘুমিয়েছে এরমধ্যে রাকিব প্রায় ২২ টা কল দিয়েছে। আবির ঘুম থেকে উঠে এতগুলো কল দেখে ভয়ে ভয়ে কল দিল। রাকিব কল রিসিভ করেই হুঙ্কার দিল,

“আজকে রোজা রাখছি বলে, তোকে বকতে পারছি না৷ কতগুলো কল দিলাম কই ছিলি?”
“ফোন সাইলেন্ট করে ঘুমাইছিলাম। কেনো? ”
“একটু ঝামেলা হয়ছে। একটু না বেশিই ঝামেলা। ”

“ফোনে বলবি নাকি দেখা করবি?”

“ইফতার করে বের হইস।”

আবির উষ্ণ স্বরে জানালো,
“শরীর টা খুব দূর্বল। তুই বাসায় আয়। এখনি চলে আয় সমস্যা নেই। ”

“নাহ নাহ। এখন আসলে সবার সাথে ইফতার করতে হবে। তোর বাপেরে আমি বিরাট ভয় পায়। ওনি আমার দিকে তাকালেই মনে হয়, আমি গড়গড় করে সব বলে দিব।”

”কি বলে দিবি?”

“তোর আর মেঘের ব্যাপারে যা জানি সব এমনিতেই মুখ ফঁসকে বলে দিব। তারচেয়ে বরং ইফতারের পরে আসি৷ ”

“তোর ইচ্ছে। ”

নামাজ শেষে আবির বাসায় আসার ১০ মিনিট পর ই রাকিব বাসায় আসছে। মালিহা খানকে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে সরাসরি আবিরের রুমে চলে গেছে। আবিরকে বিস্তারিত ঘটনা বলার পর আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
” তুই এখন কি চাচ্ছিস?”

“আমি রিয়াকে বিয়ে করতে চাচ্ছি।”

“এখনি বিয়ে করবি?”

“সব জানাজানি হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বিয়ের সিদ্ধান্ত না নিলে পরবর্তীতে ঝামেলা আরও বাড়বে। ”

আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“তাহলে আন্টিকে তুই বুঝা।”

‘গতকাল রাত থেকে আম্মু আমার সাথে কথা বলে না। প্রথমে ভাবছি ঠিক হয়ে যাবে। আজকে বিকাল নাগাদ যখন কথায় বলছে না তখন বাধ্য হয়ে বাসা থেকে চলে আসছি। ”

“এখন আমি কি করতে পারি সেটা বল।”

রাকিব মলিন হেসে বলল,
“তুই আম্মুকে বুঝাবি। ”

আবির হুঙ্কার দিয়ে উঠল,
” আমি আমার পরিবার মানাতে পারছি না বলে বিয়েই করতে পারছি না৷ সেখানে তুই আসছিস আমাকে দিয়ে তোর পরিবার মানাতে? বাহ! রাকিব বাহ!”

“প্লিজ বন্ধু, তুই ছাড়া আমার কে আছে বল?”

“তুই আমার কাছে যেকোনো সমস্যার সমাধান চা আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। কিন্তু যেই মারপ্যাচে আমি আঁটকে আছি সেটার সমাধান আমার কাছে চাইস না৷ ”

রাকিব আকুল কন্ঠে বলে উঠল,
“এতদিন আমার বাসায় সমস্যা ছিল না শুধু রিয়ার বাসায় সমস্যা ছিল। কিন্তু এখন ওদের বাসার সাথে সাথে আম্মুও প্যাঁচ ধরে বসে আছে। জান্নাত আম্মুকে বুঝানোর অনেক চেষ্টা করছে, কিন্তু আম্মু কথা মানার অবস্থাতেই নেই। ”

আবির রাশভারি কন্ঠে বলল,
“দেখ, এর সমাধান আমার কাছে নেই। তুই যেমন আব্বুকে ভয় পাস আমিও তেমন আন্টিকে ভয় পায়। আমার এখনও মনে আছে, ছোটবেলা গণিত পরীক্ষায় তুই দুই নাম্বার কম পেয়েছিলি বলে রাস্তার মাঝখানে তোকে কি মাই*রটায় না দিয়েছিল৷ সেই থেকে আমি তোর বাসায় যায় না। ”

“তুই না গেলে কি হবে। আম্মু তোকে খুব ভালোবাসে। তোর কথা বললে যেকোনো অনুমতি দিয়ে দেন। কিন্তু এই ব্যাপারটা সিরিয়াস তাই তোকে নিয়ে যেতে হবে।”

“আমার পা টা ঠিক হয়ছে বেশিদিন হয় নি। আব্বু এখনও বাইক চালানোর অনুমতি দেন নি৷ রিক্সায় করে অফিসে যায় আমি৷ সেখানে তোর বিয়ের কথা বলতে তোদের বাসায় যায় আর আন্টির হাতে মা*ইর খেয়ে আবার বিছানায় পড়ি নাকি? গতবার আমার শ্বশুর বেশি না মাত্র ২ ঘন্টা ঝাড়ছিল, এবার কিছু হলে সোজা মা*র্ডা*র করে ফেলবে। তুই কি চাস না আমি বিয়ে করি? ২-১ টা পরী আমাদের সংসারে আসুক, তোকে চাচ্চু বলে ডাকুক? আর আমায় আব্বু! ”

রাকিব গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলল,
” একটা প্রবাদ বাক্য আছে, অইবো পোলা ডাকবো বাপ তে যাইবো মনে পাপ। তোর অবস্থা হইছে এরকম।”

আবির ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে বলল,
“আমার পোলা লাগতো না। একটা মেয়ে হলেই হবে যাকে ঘিরে আমাদের ছোটখাটো একটা সংসার হবে। ”

রাকিব রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
” আর কত কল্পনায় ভাসবি এবার বাস্তবে আয়। বাস্তবে এসে আমাকে বাঁচা৷ ”

“আমি পারবো না, দুঃখিত।”

মেঘ দরজা থেকে উঁচু স্বরে বলল,
“আসবো?”

আবির ঠোঁটে হাসি রেখে বলল,
“হ্যাঁ, আসেন।”

মেঘ মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“বড় আম্মু আপনাদের জন্য খাবার পাঠিয়েছেন।”

রাকিব ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছো আপু?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো৷ আপনি কেমন আছেন ভাইয়া?”

“আমি ভালো নেই। আমার অবস্থা খুব খারাপ। ”

“কেনো ভাইয়া? কি হয়েছে?”

“তোমার আবির ভাইকে একটু বলো আমাকে সাহায্য করতে। ও ছাড়া আমি কাউকে ভরসা করতে পারবো না। তুমি একবার বলো মেঘ!”

মেঘ ভ্রু কুঁচকে সরু নেত্রে চেয়ে আছে, আচমকা প্রশ্ন করল,
“কি বলবো?”

আবির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“কিছু না। তুই রুমে যা। ”

“নাহ মেঘ। তুমি যাবে না। তুমি আবিরকে একবার বলো তারপর চলে যেও। ”

মেঘ আবারও প্রশ্ন করল,
“বলবো কি আমি?”

“তুমি বলো আমাকে যেন আবির সাহায্য করে। ”

মেঘ আবিরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মসৃণ কন্ঠে বলল,
“রাকিব ভাইয়া কিসের সাহায্য চাচ্ছেন। করে ফেলুন সাহায্য! ”

আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“ঠিক আছে। তুই যা এখন।”

রাকিব পুনরায় বলে উঠল,
” আপু, তুমি জিজ্ঞেস করো, আবির সাহায্য করবে কি না! হ্যাঁ অথবা না। ”

আবির চেঁচিয়ে উঠে বলল,
” হ্যাঁ হ্যাঁ করব সাহায্য, হইছে? ”

রাকিব স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে হাসিমুখে বলল,
“এই না হলে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ”

আবির অগ্নিদৃষ্টিতে রাকিবের দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ চলে যেতে নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করল,
“আচ্ছা কি হয়ছে?”

রাকিব স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি রিয়া কে চিনো?”

“আপনার গার্লফ্রেন্ড রিয়া আপু?”

রাকিব আবিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাহ! আবির”

পুনরায় মেঘকে বলল,
“হ্যাঁ। আমাদের বাসার সবাই রিয়ার ব্যাপারে মোটামুটি জানতো। বিয়া দু একবার আমাদের বাসায়ও আসছে। সবার সাথে আলাপ ও হয়েছে। রিয়া শারীরিক ভাবে একটু অসুস্থ, এটা আমার বাসায় কেউ জানতো না, গতকাল কথায় কথায় এটা বলেছি তারপর থেকে শুরু হয়ছে আম্মুর চিল্লাচিল্লি। বাড়ির বড় বউ হবে, রোগী হলে কিভাবে হবে? লোকে কি বলবে? সারাজীবন ডাক্তারের কাছে দৌড়াইতে দৌড়াইতে শেষ হয়ে যাব।আরও কত কি! আম্মু এখন আমার সাথে কথায় বলতেছে না। তাই তোমার আবির ভাইকে বলতেছি, আমাদের বাসায় যেতে, আম্মুকে একটু বুঝাতে। ”

“বিয়া আপুর কি সমস্যা? ”

“শ্বাসকষ্ট, এনার্জির সমস্যা আরও কিছু সমস্যা আছে।”

মেঘ জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে উদাসীন কন্ঠে মনে মনে বলল,
” রিয়া আপুর সামান্য সমস্যার কারণে আন্টি কত বছরের সম্পর্ক মানছেন না।আর আমি যে তাড় ছিঁড়া এটা জানার পর আমার শ্বাশুড়ি কি আমাকে মেনে নিবেন?”

আবির মেঘকে ডাকতেই মেঘ নড়েচড়ে উঠল,কথা শেষ করে দ্রুত রুম থেকে বেড়িয়ে গেছে। মেঘ যেতেই রাকিব বলল,
“আজ মেঘ আসছিল বলে বেঁচে গেলাম।”

আবির রাগান্বিত কন্ঠ বলল,
” লোকে এজন্যই বলে কাউকে দূর্বল জায়গা চিনাতে নেই। ”

“আমি নিজেই এখন আধমরা তাই তো মেঘকে দিয়ে সাহায্য চাইলাম। আচ্ছা, তুই না একবার বলছিলি মেঘ অসুস্থ। ঠিকই তো দেখলাম।”

আবির কপাল গুটিয়ে গুরুভার কন্ঠে বলল,
” অসুস্থ না রে, বৃষ্টিতে ভিজছিলাম। ধমকের হাত থেকে বাঁচতে শ্বশুরের মুখের উপর বলছিলাম,
“আপনার মেয়ের কিছু না হলেই তো হলো।” যেই কথা সেই কাজ, আমার শ্বশুর সকাল বিকাল দেখে মেয়ের জ্বর, সর্দি আসছে কি না! কারণ কিছু একটা হলেই আমায় ইচ্ছে মতো ঝাড়তে পারবে। ওনি যদি ঢালে ঢালে চলে তবে আমিও চলি পাতায় পাতায়। সপ্তাহ খানেক মেঘকে গরম পানির উপর রেখেছি, সারাক্ষণ গরম পানি খেয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াইছি, প্রাকৃতিক ঔষধ সহ যতধরনের ঘরোয়া পদ্ধতি আছে সব চেষ্টা করে ফেলছি৷ আল্লাহ র রহমতে সর্দি-জ্বর কিছু হয় নি৷ ”

“তোর জীবন এখন ডিসকভারি চ্যানেলের বাঘ আর হরিণের মতো হয়ে গেছে। জামাই শ্বশুরের চ্যালেঞ্জ৷ চাচ্চু যেদিন জানতে পারবে ওনার পরীর মতো মেয়ের পিছনে তোর মতো বানর ঘুরঘুর করছে৷ তখন ওনার কি অবস্থা হবে আবির?”

“সেই দিন নিয়ে এখনও ভাবি নি। যা হবে সেদিনই হবে। বাঁচা আর ম*রা দু হাতে নিয়েই ওনাদের সম্মুখীন হবো। ”

“আচ্ছা এখন চল, নামাজ পড়ে আমাদের বাসায় যাবি। ”

আবির আচ্ছা বলার আগেই জান্নাত আবিরের নাম্বারে কল দিল। আবির রিসিভ করতেই জান্নাত বলল,
“আবির ভাইয়া, রাকিব ভাইয়া বাসা থেকে চলে গেছে, ভাইয়ার ফোনও বন্ধ। আম্মু টেনশনে অসুস্থ হয়ে পরেছিল, এখন কিছুটা সুস্থ হয়েছে। ভাইয়ার সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন। আপনি ভাইয়াকে খোঁজে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় আসুন, প্লিজ।”

“আচ্ছা আসতেছি ”

আবির আর রাকিব ঘন্টাখানেকের মধ্যে রাকিবদের বাসায় আসছে। আন্টি আংকেলের সাথে কথা বলে অনেক কষ্টে রাজি করিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে রিয়াকে কল দিয়ে রিয়ার আম্মুর সাথেও কথা বলে। প্রায় ঘন্টাদুয়েক আলাপ-আলোচনা শেষে রাকিব আর রিয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ঈদের একদিন পরেই বিয়ে। রিয়ার পরিবার আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে অনেকেই এই বিয়েতে রাজি না তাই মোটামুটি ঘরোয়া ভাবে বাসাতেই পোগ্রাম করা হবে। আবির বাসায় ফিরতেই আলী আহমদ খান শুধালেন,
“কোথায় ছিলে?”

“রাকিবদের বাসায় গিয়েছিলাম। ”

“রাকিব দেখলাম সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় আসলো আবার তুমি এখন ওদের বাসা থেকে ফিরছো। কোনো সমস্যা? ”

“নাহ আব্বু। তেমন কোনো সমস্যা না। রাকিবের বিয়ে ঠিক হয়েছে। ঈদের একদিন পর বিয়ে।”

আলী আহমদ খান রাশভারি কন্ঠে বললেন,
” কোথায় ঈদের পর তোমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। তা না হয়ে তোমার বন্ধুর বিয়ে করছে । ভালো ভালো। ”
আবির মনে মনে আওড়াল,
“যাকে বিয়ে করতে চাই তাকে বিয়ে না দিলে এই ঈদ কেন, একেরপর এক ঈদ কেটে গেলেও আবির অন্য কাউকে বিয়ে করবে না। ”

★★★★★

দেখতে দেখতে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। এক সপ্তাহে পরেই ঈদুল ফিতর। খান বাড়িতে শপিং এর মেলা বসেছে। আলী আহমদ খান, ইকবাল খান, মোজাম্মেল খান তিনজনই আলাদা আলাদাভাবে সবার জন্য জামাকাপড় এনেছে। বছরে একবার ই ওনারা নিজে শপিং এ যান। তাছাড়া তানভিরও সবার জন্য জামাকাপড় এনেছে। বাড়ির ছোট দুই কর্তী একদিন মেঘদের শপিং এ নিয়ে গিয়ে সবার জন্য শপিং করিয়ে এনেছে। মেঘের অলরেডি ৫-৬ সেট ড্রেস হয়ে গেছে। তবে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির থেকে এখনও কিছু পাওয়া হয় নি তাই মেঘের মন তেমন ভালো না। আবিরদের পাঞ্জাবি, টিশার্টের কাজ কমপ্লিট৷ এখন শুধু দেয়ার অপেক্ষা।

আজ সকাল থেকে তানভির আবিরকে খোঁজছে।। আবির রাকিবের বিয়ের শপিং করতে বেড়িয়েছে। আবির দুপুরের দিকে বাসায় আসতেই তানভির ছুটে গেল। আবির নির্বিকার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে তোর? ”

তানভির অনচ্ছ হেসে বলল,
“ওর জন্য একটা ড্রেস কিনেছি। কিভাবে দিব বুঝতে পারছি না। হেল্প করো।”

” আমার হেল্প করতে হয় কেন? সামনে যেতে না চাইলে নিজের বুদ্ধি কাজে লাগা। ”

“মানে?”

“তোর বোনকে যেভাবে গিফট পাঠিয়েছিলি সেভাবে পাঠা। ”

“ও যদি না পড়ে?”

“এত চিন্তা করলে অকালে চুল পেঁকে যাবে। তোর কাজ গিফট দেয়া, এক্সেপ্ট করবে কি না সেটা তার বিষয়। ”

“ঠিক আছে।”

তানভির বন্যার ঠিকানা দিয়ে ড্রেস কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিয়েছে। কুরিয়ার থেকে বক্স নিয়ে বন্যা রুমে গেল। সন্দেহ নিয়ে বক্স খুলতেই বিশাল গর্জিয়াছ এক ড্রেস বের হলো। ড্রেসের ওজনই বলে দিচ্ছে ড্রেসটা অনেক দামী। বন্যা সঙ্গে সঙ্গে মেঘকে কল দিয়ে সব ঘটনা খুলে বলল। মেঘ অচতুর কন্ঠে বলল,
“গিফট কে পাঠালো সেটা বড় বিষয় না। গিফট পেয়েছিস এটা নিয়েই খুশি থাক।”

“এত দামী ড্রেস কি করব আমি? কেউ হয়তো ভুলে পাঠাইছে।”

মেঘ তাড়িত বেগে বলল,
“আরে বোকা! ঠিকানা তোর বাসার, ফোন নাম্বার তোর মানে কেউ ইচ্ছে করেই তোকে পাঠিয়েছে।”

“আমি এই ড্রেস পড়ব না। যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দিব।”

মেঘ সঙ্গিনভাবে ধমকে উঠে,
“তুই ড্রেস না পড়লে মজা টা করবো কিভাবে?”

“কিসের মজা?”

“তুই ড্রেস টা পড়ে ছবি তুলে একটা ছবি ফেসবুকে পোস্ট করবি, তারপর দেখব পরিচিত মানুষের বাহিরে কে তোর ছবিতে রিয়েক্ট দেয়। সেখান থেকে খোঁজে নিব, মনে মনে কে তোকে পছন্দ করে। আর কোন বড়লোক বাপের ছেলে এত দামী ড্রেস তোর জন্য পাঠায়।”

“আমি পারবো না।”

“চুপ, আমি যা বলছি তাই হবে। এ ব্যাপারে আমি আর কোনো কথা শুনবোও না মানবোও না।”

“কিরে? তোর আবার কি হলো?”

“না দেখছিলাম, আবির ভাইয়ের স্টাইলে কথা বললে কেমন লাগে, রাখি এখন, টা টা। ”

“আচ্ছা। টা টা। ”

আগামীকাল ঈদ৷ মেঘ এখনও অপেক্ষায় আছে আবির তাকে একটা ড্রেস গিফট করছে। আর সেটা মেঘ ঈদের দিন সকালে পড়বে। অথচ আবির এখনও ড্রেস দিচ্ছে না। এদিকে দুপুর থেকে হালিমা খান মেঘদের পার্লারে যেতে বলছেন, মেহেদী দেয়ার জন্য বুকিং দিয়ে রেখেছে আরও ১ মাস আগে। কিন্তু মেঘের পার্লার যাওয়াতে মনোযোগ নেই। এক ফাঁকে মেঘ ছুটে গেল আবিরের রুমে। আবিরকে ডেকে বলল,
“আবির ভাই আপনি আমায় মেহেদী দিয়ে দিবেন না?”

“কেন? মেহেদী আর্টিস্ট কোথায়?”
“আর্টিস্টের কাছে দিব না। আপনি রাতে দিয়ে দিবেন। ”

“আমি পারব না। মীমকে নিয়ে তাড়াতাড়ি মেহেদী দিতে যা। ইফতারের আগে আগে চলে আসিস। ”

মেঘ কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল,
“মাইশা আপুর বিয়েতে আপনি কত সুন্দর করে মেহেদী দিয়ে দিছিলেন, আজকে একটু দিয়ে দেন না! প্লিজ”

আবির রাগান্বিত কন্ঠ বলল,
“মেঘ, উল্টাপাল্টা বায়না ধরবি না। যা বলছি তা শুন।”

মেঘ মন খারাপ করে নিজের রুমে চলে গেছে। মেহেদী দিবে না বলার পরও বাড়ির সবাই জোর করে পার্লারে পাঠিয়েছে। সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরেই মেঘ দেখল তার বিছানার উপর একটা শপিং ব্যাগ রাখা৷ শপিং এ দুটা ড্রেস, একটা হলুদ রঙের আরেকটা গাঢ় নীল রঙের। দুটা ড্রেস ই খুব সুন্দর তবে মেঘের নীল ড্রেস টা বেশি পছন্দ হয়েছে। মেঘ ড্রেস দেখতে দেখতে আজান পড়ে গেছে। মেঘ দ্রুত ইফতার করতে চলে গেছে। ইফতার করে রুমে এসে নামাজ শেষে আবারও ড্রেস গুলো দেখছে। আবির ইশার নামাজ পড়তে বের হতেই মেঘ আবিরের জন্য ডিজাইন করা দুটা পাঞ্জাবি আর টিশার্ট গুলো আবিরের রুমে রেখে আসছে। তানভিরের রুমেও একটা পাঞ্জাবি আর একটা টিশার্ট রেখে আসছে।

আবির কিছুক্ষণ পর রুমে এসে দেখলো পাঞ্জাবির উপর ছোট একটা চিরকুট। হাতে নিতেই দেখল এতে লেখা,

” আপনার Sparrow-র দেয়া প্রথম পাঞ্জাবি। ভালো লাগলে চোখ খুলে পড়বেন, ভালো না লাগলে চোখ বন্ধ করে পড়বেন, তবুও পড়তেই হবে। ”

সাথে আরেকটা চিরকুটে লেখা,

” আপনি আমার কোমল মনে আঘাত দিয়েছেন তাই আমি রাগ করেছি, খুব রাগ করেছি। সামান্য একটু মেহেদী দিয়ে দিলে আপনার খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেত? আপনি আমার মনের ছোট ছোট অভিযোগে সৃষ্টি বিশালাকার পর্বত। আপনাকে ঘিরে আমার যত অভিযোগ ছিল সব ঈদের চাঁদের কাছে সঁপে দিয়েছি। তবুও দোয়া করি আপনি ভালো থাকুন, পৃথিবীর সব সুখ আপনাকে ঘিরে রাখুক, ঈদ মোবারক। ”

আবির চিরকুট টা পড়ে মুচকি হেসে বলল,
“পৃথিবীর সব সুখ যদি আমায় ঘিরে রাখে তবে আমি সেই সুখের চাদর দিয়ে তোকে ঘিরে রাখবো। তোর মনের ঘরে চুল পরিমাণ অভিযোগ ঢুকার রাস্তাও রাখবো না। তোকে আমার ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে রাখবো। একদিন কেন, সারাজীবন তোকে রাঙিয়ে রাখার দায়িত্ব আমি নিবো ইনশাআল্লাহ। ”

মেঘ আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পরেছে। এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছে। ঘুম ভাঙতেই তড়িঘড়ি করে উঠে শাওয়ার নিতে চলে গেছে। ফজরের নামাজ পড়ে ঘন্টাখানেক কুরআন শরীফ পড়েছে। তারপর বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে আছে। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে মেঘের দুচোখ বেয়ে টুপটুপ করে পানি পড়তে শুরু করেছে। দাদা, দাদু সহ যত আত্মীয় মারা গেছেন তাদের কথা ভেবেই মেঘ কাঁদছে৷ নামাজ পড়েও তাদের দোয়া করেছে । ঘন্টাখানেক নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে মেঘ ওয়াশরুম থেকে হাতমুখ ধৌয়ে রেডি হতে শুরু করলো। বিছানা ছড়ানো ৮ টা ড্রেস। সবগুলোই সুন্দর কিন্তু মেঘের নজর এক আবিরের ড্রেসেই আঁটকে গেছে। খুব ভেবে চিন্তে আবিরের দেয়া নীল রঙের ড্রেসটায় পরেছে। সাথে নীল রঙের বড় বড় কানের দুল, হাতে নীল চুড়ি। শুরুতেই চুল শুকিয়ে স্ট্রেইট করে নিয়েছিল সেই চুলে মাঝখানে সিঁথি করে দুপাশে দুটা কাঁকড়া বেন্ট দিয়ে ডিজাইন করে চুল বেঁধেছে। পেছন থেকে সব চুল ছাড়া, তবে স্ট্রেইট করার জন্য খুব সুন্দর লাগছে। মুখে হালকা মেকাপ করে ঠোঁটে গোলাপি রঙের লিপস্টিক লাগিয়েছে। সাজা শেষে রুম থেকে বেড়িয়ে সেদিক সেদিক উঁকি দিচ্ছে, কোথাও কেউ নেই, আবিরের রুমেও দেখে এসেছে আবির নেই। হঠাৎ বড় আব্বুকে নামাজ থেকে ফিরতে দেখে মেঘ দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেছে, আর আবিরের উপরে আসার অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ পর আবির উপরে আসামাত্রই মেঘ রুম থেকে বেড়িয়ে সোজা আবিরের সামনে গিয়ে বসে পরেছে। মেঘের এমনকান্ডে আবির কিছুটা ভড়কে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে দু পা পিছিয়ে দাঁড়ালো । মেঘ উপরে তাকিয়ে দুহাতে আবিরের দু পা স্পর্শ করলো। ততক্ষণে আবির নিচু হয়ে মেঘের দু কাঁধ আলতোভাবে হাত রেখে বলল,
“সালাম করতে হবে না, ওঠেন।”

মেঘ সালাম করে ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। আবিরের পড়নে মেঘের দেয়া সাদা পাঞ্জাবি। তা দেখে মেঘের ওষ্ঠ যুগল আরও বেশি প্রশস্ত হলো।মেঘের কল্পনায় আবির ভাইকে যতটা সুন্দর লেগেছিল বাস্তবে তার থেকে বহুগুণ বেশি সুন্দর লাগছে। আবিরও নির্বাক হয়ে মেঘকে দেখছে, নীল রঙ আবিরের খুব প্রিয় তবে সচরাচর নীল রঙের কিছু আবির কিনে না। কারণ প্রিয় মানুষকে প্রিয় রঙের ড্রেসে দেখলে মুগ্ধতায় চোখ সরাতে পারবে না ভেবেই এই রঙটাকে এড়িয়ে যায় । তবে দোকানে নীল রঙের জামাটা দেখে এত পছন্দ হয়েছিল যে না কিনে থাকতেই পারে নি। অকস্মাৎ আবির ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করল,
“সালামি লাগবে?”

মেঘ মুচকি হেসে বলল,
” আগে দোয়া করবেন তারপর সালামি দিবেন।”

আবির মেঘের মাথায় হাত রেখে সুমধুর কন্ঠে বলল,
” দোয়া করি জীবনে অনেক বড়, সবসময় হাসি খুশি থাক”

মেঘ নাক সিটকিয়ে বলল,
“এসব দোয়া তো সবাই করে, আপনি বরং ইউনিক দোয়া করুন।”

“দোয়াও আবার ইউনিক হয়?”

“হ্যাঁ হয়। ”

আবির মাথা থেকে হাত নামিয়ে দুহাতে মেঘের দুগালে আলতোভাবে হাত রাখলো। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে স্নিগ্ধশীতল কন্ঠে বলল,
” আমি দোয়া করি, তোর মনের সব ইচ্ছে পূরণ হোক। ছোট থেকে বড় ইনফেক্ট যেগুলো তুই মনে মনে ভাবিস কিংবা ঘুমের ঘোরে স্বপ্নে বা কল্পনায় দেখিস সেই সব ইচ্ছে পূরণ হোক। তুই যা চাস, যাকে চাস ঠিক যেভাবে চাস সেভাবেই যেন পেয়ে যাস। তোর আকাশ জুড়ে ভালোবাসার বৃষ্টি হোক, যেই বৃষ্টি তোর মনে জমে থাকা অভিযোগ, অভিমান গুলোকে ধৌয়ে মুছে বিলীন করে দিবে সেই সঙ্গে আগামী দিনগুলোতেও তোর মন ভালো রাখবে। প্রয়োজনে বৃষ্টির ফোঁটার সাথে সাথে দুটা হাঁসের বাচ্চাও আসুক। যেগুলো তোকে সারাদিন হাসাবে। মহিলা হাঁসটার নাম হবে মেঘ, পুরুষ হাঁসের নাম যা খুশি রেখে দিস। তারপর তাঁদের একটা সংসার হবে ।পরে ডিম হবে, বাচ্চা দিবে.. আরও বলবো?”

মেঘ ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
“এটা আপনার ইউনিক দোয়া?”

“তো কি দোয়া চাস বল?”
“থাক দোয়া করতে হবে না। সালামি দেন!”
“কত লাগবে? ২ টাকা নাকি ৫ টাকা? ”
“আপনার যত ইচ্ছে দেন । সালামি চাইতে নেই। ”

“আবির পকেট থেকে একটা নতুন ৫০০ টাকার বান্ডেল বের করে দিল।”

মেঘ অবাক চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
” এত টাকা নিয়ে কি করব?”

“তোর বোধশক্তি হওয়ার পর প্রথমবার সালামি দিচ্ছি৷ কম কেনো দিব?”

মেঘ আবিরের দিকে তাকিয়ে তপ্ত স্বরে বলল,
“ধন্যবাদ। ”

“সালামি দিলে আবার ধন্যবাদও দেস?”

“সালামির জন্য ধন্যবাদ দেয় নি। পাঞ্জাবির জন্য দিয়েছি। ”

“ওহ আচ্ছা। তাহলে আপনাকেও ধন্যবাদ, জামাটা পড়ার জন্য। ”

মেঘ রুমে যেতে যেতে হঠাৎ বলে উঠল,
“আমি কিন্তু পুরুষ হাঁসের নাম ফিক্সড করে ফেলেছি। ”

আবির মুচকি হেসে বলল,
“আমি জানি। ”

আবির নিজের রুমে চলে যাচ্ছে।মেঘ নিজের রুমে এসে টাকাগুলো ড্রয়ারে রেখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছে,

“পুরুষ হাঁস টা আবির আর মহিলা হাঁসটা মেঘ। একদিন তাদের বিয়ে হবে। তাদের সাজানো ছোট্ট একটা সংসার হবে। তারপর তাদের ঘর আলো করে একটা রাজকন্যা না হয় রাজপুত্র আসবে। উফফফ”

বলেই মেঘ লজ্জায় দুহাতে নিজের মুখ ডেকে ফেলেছে। ব্লাশ দেয়ায় গাল দুটা যতটা লাল হয়েছিল এসব কথা ভেবে দু গাল তিনগুণ বেশি লাল হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পরেই মেঘ স্বাভাবিক হয়ে নিচে নামলো। মেঘের ড্রেস দেখে কাকিয়া বলল,
” এই ড্রেসটা অনেক সুন্দর। তোকে খুব ভালো লাগছে। কিন্তু তুই যেটা পছন্দ করে কিনলি সেটা পরিস নি কেন?”

মেঘ হাসিমুখে বলল,
“ঈদ সাতদিন থাকে। সবার দেয়া ড্রেস ই পড়বো।”

তানভির নামাজের সময় তাড়াহুড়ো করে গেছিল বলে মেঘের দেয়া পাঞ্জাবি টা পড়ে যেতে পারে নি। বাসায় এসে তাড়াতাড়ি করে মেঘের দেয়া পাঞ্জাবি পড়ে নিচে আসছে। আবিরও ততক্ষণে নিচে আসছে। সবাই একবার আবিরকে দেখছে আবার তানভিরকে। হালিমা খান প্রশ্ন করলেন,
“তোরা কি সেইম পাঞ্জাবি কিনছিস?”

তানভির ঠোঁটে হাসি রেখে বলল,
” পাঞ্জাবি গিফট পেয়েছি। ”

“কে দিল?”
“বনু আমাকে আর ভাইয়াকে গিফট করেছে!”

“ডিজাইন নিজে করেছিস?”

মেঘ ছোট করে বলল,
“হ্যাঁ!”
“বাহ! খুব সুন্দর হয়েছে। তোর আব্বু চাচ্চুদেরও দিতি।”
“ভালো লাগলে ইনশাআল্লাহ আগামী ঈদে সবাইকে দিব।”

“ইনশাআল্লাহ। ”

সবাই একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া শেষ করে ৫ ভাইবোন মিলে ঘুরতে বেড়িয়েছে। তানভির ড্রাইভ করছে আবির তার পাশের সিটে বসে আছে। ফুপ্পির বাসা থেকে অলরেডি ঘুরে অল্প নাস্তা করে আসছে। রাস্তায় যেতে যেতে মেঘ হঠাৎ ই বলে উঠল,
“ভাইয়া চলো না বন্যাদের বাসার এদিকে যায়।”

আবির আর তানভির দুজনেই আঁতকে উঠল। তাদের প্ল্যান ছিল এদিক সেদিক ঘুরে শেষে বন্যাদের বাসার এদিকে যাবে । কিন্তু মেঘ শুরুতেই বলে ফেলল। তানভির মুখভঙ্গি স্বাভাবিক রেখে প্রশ্ন করল,
“ঐদিকে কেন?”

“বন্যা ঈদে কোথাও বের হয় না। আমরা যেহেতু বের হয়ছি ওকে দেখে আসি৷ ”

আবির মৃদু হেসে বলল,
“শুধু দেখে আসবি কেন? ওকে নিয়ে আসিস। সবাই এক সঙ্গে ঘুরবো।”

“আচ্ছা। বলবো ওকে। ”

#চলবে