আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব-৭৭+৭৮

0
5294

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৭৭
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

আবিরের ক্রন্দিত কন্ঠে বলা কথাটা মেঘের কর্ণকুহরে প্রবেশ মাত্রই মেঘ কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেছে। মেঘের বুক ধড়ফড় করছে, গাত্র জুড়ে রক্ত সঞ্চালন তীব্র থেকেও তীব্র হতে শুরু করেছে, বুকের বাম প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ হৃদপিণ্ডে বেধক নাভিশ্বাস অনুভূত হচ্ছে। আবির ভাইয়ের সংগুপ্ত প্রণয়ের অনলে বারংবার আহত হওয়া মেয়েটার হৃদয় আজ আবিরের আর্তনাদে সম্পূর্ণ তছনছ হয়ে গেছে। ভীতিকর, অযাচিত পরিস্থিতি সামলানোর অণুমাত্র সামর্থ্য মেঘের নেই। মেঘ ক্ষুদ্র আলোতে আশ্চর্য নয়নে চেয়ে আছে আবিরের পরিশ্রান্ত ধৃষ্টতায়, আবিরের হাতে থাকা মেঘের হাতটা থরথর করে কাঁপছে, ক্ষণিকের ব্যবধানে মেঘের অক্ষিপট ভিজে এসেছে। আবির ভাই সরি বলছেন, কিন্তু কেনো? চোখের সামনে ঘটা সবকিছু অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির মুখে অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ অবসহন করতে মেঘের নিজের সাথে নিজেকে প্রভূত বিগ্রহ করতে হয়েছে। মনের আস্তিনের টালমাটাল হাল সামলে মেঘ ভয়ার্ত গলায় জানতে চাইল,
” আপনার কি হয়েছে? ”

কান্নার তোপে আবিরের কপালের পাশের শিরা উপশিরাগুলো দপ দপ করছে, রক্ত বর্ণের আঁখি যুগল আরও বেশি রক্তাভ হয়ে গেছে। আবিরের লাগামহীন ক্রন্দনের সমাপ্তির রেশ মাত্র নেই৷ মেঘের চোখ ছলছল করছে, দুহাত বরফের ন্যায় ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরের ঘনীভূত নভশ্চর সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেঘ ভেজা কন্ঠে আবারও প্রশ্ন করল,
“আবির ভাই, আপনি কাঁদছেন কেনো?”

আবির ঢোক গিলে মুখ তুলে মেঘের অভিমুখে চাইলো। আবিরের চোখ মুখের ধরণ অত্যন্ত গুরুগম্ভীর, চেহারায় বিন্দুমাত্র লাবন্য নেই। মেঘের তুষারের মতন ঠান্ডা দুহাত আবির অতর্কিতেই নিজের গালে রাখলো, সহসা আবিরের চওড়া দুহাত দিয়ে মেঘের ছোট ছোট হাতকে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলেছে। আবিরের গালের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি সেই সাথে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনাজলের স্পর্শে মেঘের সর্বাঙ্গে শীতল হাওয়া বইছে। প্রণয়ের পূর্ণতা পাওয়ার শাণিত আক্ষেপে যে ধ্বংসের খেলায় নেমেছিল সেই ধ্বংসলীলা প্রতিনিয়ত ব*ধ করছে মেঘের নিষ্কলুষ হৃদয়কে। মনের গহীনে এক বছরে আত্মগোপনে মন্থর গতিতে বেড়ে ওঠা অভিমানের ভাপগুলো আজ আবিরের নিগূঢ় সংস্পর্শে অনুযোগে রূপ নিতে উঠেপড়ে লেগেছে। নিদারুণ ভীতিপ্রদ পরিস্থিতিতে মেঘ হতবিহ্বল হয়ে আছে, লুকোচুরি প্রেমগুলো মনের অন্তরালেই নিথর হয়ে গেছে। আবিরের নিরেট দৃষ্টিতে উদ্বেগ স্পষ্ট, আবির আস্তে করে গলা খাঁকারি দিয়ে অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে বলল,
” অপ্রসন্নতায় ঘেরা জনপদে আমি না চাইতেও বিশল্যকরণীর কবলে পড়ে গেছি। পুঁথিগত শব্দে তোকে বুঝাতে আজ আমি অক্ষম। প্রয়োজনে সমস্ত বিপর্যয় নিরবতায় সয়ে যাব, তবুও ব্যর্থতা সইতে পারবো না। ”

মেঘ শান্ত স্বরে নির্দ্বিধায় বলল,
“আপনাকে ব্যর্থতা সইতে হবে না৷ আমি সবসময় দোয়া করি যেনো আপনি সবকিছুতে সফল হতে পারেন। আমার বিশ্বাস আপনি সফল হবেন, ইনশাআল্লাহ। এবার অন্তত থামুন,প্লিজ। ”

আবির ভেজা চোখেই মুচকি হেসে বলল,
” তবে যে কাউকে অনেকবেশি সহিষ্ণু হতে হবে।”

মেঘ উদ্বেলহীন কন্ঠে জানাল,
” কারো সহিষ্ণুতায় যদি আপনার সাফল্য অর্জিত হয়, তবে সে অমেয় সহিষ্ণু হবে।”

আবির মেঘের হাতের উপর থেকে নিজের হাত সরিয়ে মলিন হেসে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“অনেক রাত হয়েছে, ঘুমাতে যান এখন। ”

মেঘ চিন্তিত কন্ঠে শুধালো,
“আর আপনি?”

“একটু পর যাব।”

মেঘ নিজের ওড়নার একপাশ টেনে আলতোভাবে আবিরের চোখ-মুখ মুছে দিচ্ছে। আবির চোখ বন্ধ করে মেঘের স্নিগ্ধতা অনুভব করছে। এতক্ষণ কান্নার কারণে বুঝতে না পারলেও এখন মেঘের গায়ের গন্ধে আবির মত্ত হয়ে যাচ্ছে। মায়াবতীকে ছুঁতে চাওয়ার উন্মাদনা আঁকড়ে ধরেছে আবিরকে। হৃদয়ের ক্ষত প্রতিহত করার ক্ষমতা আবিরের থাকলেও মেঘের প্রতি অগাধ অনুরক্তি লুকিয়ে রাখার সামর্থ্য আবিরের নেই। মেঘের অনাবশ্যক যত্নে আবিরের বুকে অদ্ভুত শিহরণ জাগছে৷ আবিরের মনে মেঘকে নিয়ে সর্বদায় সংশয় কাজ করে। মেঘ যেদিন আবিরের চোখে চোখ রেখে আবিরের অনুভূতি জানতে চাইবে সেদিনই আবিরের সবকিছু ছারখার হয়ে যাবে। কারণ ঐ চোখে চোখ রেখে আবির কখনো মিথ্যা বলতে পারবে না। অন্যদিকে নিজেকে নিজে কথা দিয়েছে,
“মেঘকে প্রতিশ্রুতি দিবে না,বউ করে নিজের অঢেল ভালোবাসার সমক্ষ প্রমাণ দিবে।মেঘের কান্না
চিরতরে মুছে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেছে।”

সেসব কিছু ভেবেই বারংবার আহত হয় আবির। মেঘকে সম্পূর্ণ নিজের করে নিতে পারছে না, পরিবার নাম বেড়াজালে বাঁধা পড়ে আছে। এদিকে মেঘের কান্না কমার বিপরীতে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। আবির প্রতিনিয়ত নিজেকে দায়ী করছে আর অন্তরের উত্তাপে নিজেই ঝলসে যাচ্ছে।

মেঘ আবিরের চোখ-মুখ মুছে শীতল কণ্ঠে বলল,
” আমাকে রুম পর্যন্ত দিয়ে আসু্ন।”

আবির ভ্রু কুঁচকে ক্ষীণ স্বরে বলল,
” আসছিলেন কিভাবে? ”

মেঘ চট করে বলে ফেলল,
” যেভাবেই আসি না কেন, তাতে আপনার কি? এখন আমাকে দিয়ে আসবেন, চলুন।”

আবির আড়চোখে মেঘের পানে তাকালো, ক্ষুদ্র আলোতেও মেয়েটার ক্রোধিত মুখশ্রী জ্বলজ্বল করছে। আবির মৃদু হাসলো, আবিরের হাসি দেখে মেঘ হতাশ হয়ে ভারী নিঃশ্বাস ছেড়ে আকুল কন্ঠে বিড়বিড় করে বলল,
” ঐ যে দেখুন, দরজায় দাঁড়িয়ে তাঁনারা আমাকে দেখে কেমন করে হাসছে৷”

মেঘের আজগুবি কথা শুনে আবির না হেসে থাকতে পারলো না ৷ অকস্মাৎ জোরে শব্দ করে হাসতে শুরু করেছে। আবিরের মুখে হাসি ফুটাতে পেরেছে বলে মেঘ আহ্লাদে গলে যাচ্ছে। আবিরের হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে আওড়ালো,
” আপনি যতবার নিরাশ হবেন, আমি ঠিক ততবার আপনার মনে আশার আলো জ্বালাবো। আমৃত্যু আপনার পাশে হিতৈষীর ছায়া হয়ে থাকবো।”

আবেগে আপ্লুত মেঘের রঙিন ধৃষ্টতার অন্ধকার মুহূর্তেই সরে গেছে। রঙ বেরঙের স্বপ্নে সেজে ওঠেছে মনের আঙিনা। আবিরের নজর মেঘের দিকে পড়তেই জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ভ্রু নাঁচালো। মেঘ লজ্জায় চিবুক নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

” আপনার হৃদয়ে অনূভুতি সমাপ্তির পূর্বেই নবরূপে সৃজন করবো তৃপ্তির নিকেতন। ”

আবির বসা থেকে দাঁড়িয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“ম্যাম,চলুন।”

আবির হাঁটছে মেঘও আবিরের পিছুপিছু হাঁটছে। কিছুটা আলোকিত ছাদ পেরিয়ে দরজার কাছে আসতেই মেঘ চোখে অন্ধকার দেখছে। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, সত্যি সত্যি যদি তাঁনারা এখানে থাকে।মেঘ ভয়ে আবিরের শার্ট খামচে ধরেছে। মেঘের অধীরতা বুঝতে পেরে আবির একটু থেমে মেঘের পিঠ পেরিয়ে অন্যপাশের কাঁধে আলতোভাবে হাত রেখেছে। অকস্মাৎ মেঘ চিৎকার দিয়ে উঠেছে,
“আ………..”

আবির তড়িৎ বেগে মেঘের মুখ চেপে শক্ত কন্ঠে বলল,
” আরে পাগল, আমি ধরেছি। তাঁনারা ধরে নি।”

মেঘ আতঙ্কিত কন্ঠে বলে উঠল,
“আপনি এভাবে ধরেছেন কেনো? আমি ভয় পেয়ে গেছি। বলে ধরবেন না?”

আবির নাক মুখ কুঁচকে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“আপনাকে ছুঁতে গেলে অনুমতি নিতে হবে?”

মেঘ মন মরা হয়ে বলল,
” অন্ধকারে ভয় লাগে।”

আবির কিছুটা সরে গিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
“তোর কাছে ফোন আছে না? ফ্ল্যাশ জ্বালা।”

“No need.”

“কেনো?”

মেঘ দু’হাতে আবিরের বাহু চেপে ধরে বলল,
“আপনিই আছেন। ”

আবির নিঃশব্দে হেসে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। মেঘের রুমের সামনে আসতেই মেঘ শান্ত স্বরে বলল,
” আপনি কিন্তু এখন আর ছাদে যাবেন না। ”

“কেনো?”

“আপনি রুমে না থাকলে আমার ভয় লাগে। ”

আবির কপাল গুটিয়ে বলল,
” আমার রুমে আমি থাকার সাথে আপনার ভয় পাওয়া না পাওয়ার কি সম্পর্ক?”

মেঘ সাফাই দেয়ার স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
” মন কে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য পাশের রুমে মানুষ থাকা আবশ্যক। আপনার রুম ফাঁকা থাকলে তাঁনারা আমাকে ভয় দেখানোর সুযোগ পেয়ে যাবে।”

আবির নিঃশব্দে হেসে বলল,
” এত বছর যে আমার রুম ফাঁকা ছিল৷ তখন মনকে কিভাবে সান্ত্বনা দিতেন?”

মেঘ একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল,
” আপনি এত কথা বলেন কেন? ছাদে যেতে বারণ করেছি মানে যাবেন না।”

কথাটা বলেই মেঘ ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো। আবির ভ্রু কুঁচকে দু আঙুলে মেঘের নাকে আলতোভাবে চেপে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
” সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দিলেই হয়, মিথ্যা অজুহাত দেখানোর কি প্রয়োজন? হুমমমমম।”

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু ফেলেছে। আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“ঘুমান আপনি, আমিও ঘুমাতে যাচ্ছি। ”

মেঘ ঘাড় কাত করে সম্মতি দিল।

সময় চলছে নিজস্ব গতিতে। আরও একটা ঈদ কেটে গেছে। মোজাম্মেল খানের কথামতো এবার সব দায়িত্ব আবির আর তানভির একায় সামলিয়েছে। গত ঈদে মেঘ শুধু আবির, তানভিরকে পাঞ্জাবি দিলেও এই ঈদে সবার জন্য পাঞ্জাবি ডিজাইন করেছে। আর পাঞ্জাবিগুলো মোজাম্মেল খান নিজে গিয়ে পছন্দ করে নিয়ে আসছিলেন৷ মেঘের পরীক্ষার জন্য আপাতত বিয়ের ব্যাপারে মোজাম্মেল খান কোনো কথাবার্তা বলছেন না তাই আবির আর তানভির দুজনেই বেশ নিশ্চিন্ত। বাসার সবাই নিজেদের মতো বেশ শান্তিতে আছে। ইকবাল খান মাঝে মাঝেই আবিরের রুমে গিয়ে আবিরকে আলাদাভাবে বুঝিয়ে আসেন। আবিরের সাথে মেঘের সম্পর্কও আগের থেকে বেশ ভালো হয়েছে। দুজনের মধ্যে ছোটখাটো খুনসুটি সর্বক্ষণ লেগেই থাকে। একে অপরকে ভালোবাসে, দু’জন দু’জনের ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পারে তবুও মুখ ফোটে কেউ কাউকে ভালোবাসি বলতে পারে না।
আবির যেমন নিজের গন্ডিতে বাঁধা তেমনি মেঘও নিজের গণ্ডিতে বন্দি হয়ে আছে। মিনহাজের ঘটনার পরপর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল,
” যতদিন পর্যন্ত আবিরের প্রণয়ের প্রমাণ পাবে না ততদিন পর্যন্ত মেঘ আবিরকে কিছুই বলবে না।”

ধীরে ধীরে মিনহাজদের সাথেও মেঘের সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়েছে। তানভির নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে তবে সময় পেলে আবিরের গাড়ি নিয়ে ভাই বোনদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরাঘুরি করে। ফুপ্পিদের বাসার সাথেও যোগাযোগ ভালো হয়েছে। ১৫ দিন কিংবা মাসে একবার হলেও যাতায়াত হয় । সবার সম্পর্ক ভালো থাকলেও মীম আর আরিফের সম্পর্ক এখনও টম & জেরির মতো। মেঘ একটুর জন্য চোখের আড়াল হলেই মীম কোনো এক অঘটন ঘটিয়ে ফেলে। আরিফ প্রথম প্রথম আম্মুর কথা ভেবে মীমের দুষ্টামি সহ্য করলেও এখন আর করে না। সুযোগে দুটায় দুটার পিছনে লাগে।

আজ সকাল থেকেই শিমুল আর সোহাগ তানভিরকে কল দিচ্ছে। অনেকদিন যাবৎ বন্ধুদের সাথে দেখা হচ্ছে না। তাই তানভির বিকেলের দিকে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে বেড়িয়েছে৷ শিমুল আর সোহাগ দু’জনেই আগে থেকে উপস্থিত। একসঙ্গে ঘুরাঘুরি করে আড্ডা দিচ্ছিলো আর চা খাচ্ছিলো৷ তানভির চায়ে চুমুক দিয়ে রাস্তার দিকে তাকাতেই সহসা ভ্রু কুঁচকালো। বন্যা কিছু জিনিসপত্র নিয়ে একা একা হনহন করে যাচ্ছে। তানভির চায়ের কাপ রেখে তড়িঘড়ি করে উঠে বলল,
“তোরা বস, আমি আসতেছি।”

সোহাগ ধীর কন্ঠে শুধালো,
“কোথায় যাচ্ছিস?”

তানভির মেকি স্বরে জবাব দিল,
“প্রেম করতে।”

তানভির যেতে যেতে বন্যা অনেকটায় সামনে চলে গেছে। তানভির পেছন থেকে ডাকলো,
‘বন্যা। ‘

আচমকা পুরুষালি কন্ঠে নিজের নাম শুনে বন্যা ফিরে তাকালো। তানভিরকে দেখে কিছুটা স্বস্তি পেল। স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম। ”

“ওয়ালাইকুম আসসালাম। পরীক্ষা কেমন হলো?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”

কোথায় গিয়েছিলে?”

“একটা ফ্রেন্ডের বাসায় গিয়েছিলাম আর কিছু কেনাকাটা করেছি।”

তানভির হাত বাড়িয়ে বলল,
“ব্যাগ টা আমাকে দাও। আমি এগিয়ে দিয়ে আসছি। ”

বন্যা তড়িৎ বেগে বলল,
“নাহ। আমি নিতে পারবো। ”

“বিশ্বাস রাখতে পারো, তোমার ব্যাগ নিয়ে পালাবো না আমি।”

বন্যা ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” আমি কি একবারও বলেছি আপনি পালাবেন?”

“তাহলে ব্যাগটা দাও। ”

ব্যাগ নিতে গিয়ে বন্যার হাতে তানভিরের হাত লাগতেই বন্যা তৎক্ষনাৎ ব্যাগ ছেড়ে হাত সরিয়ে ফেলেছে। তানভিরের তপ্ত স্পর্শ অনুভব হতেই বন্যার বুক কেঁপে উঠছে। তানভির ব্যাগ ধরে বিস্ময় সমেত তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“কোনো সমস্যা? ”

“নাহ।”

তানভিরকে কে বুঝাবে, বন্যার কাছে তানভির মানুষটায় সমস্যা। বন্যা যতটা সম্ভব তানভিরের থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখে তবুও ততটা পারে না। কোনো না কোনোভাবে মানুষটার সাথে দেখা হয়েই যায়। বন্যা স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“আপনি এখানে কেনো আসছিলেন?”

“বন্ধুরা দেখা করার জন্য বার নার কল দিচ্ছিলো। তাই আসছি।”

“এখানে চলে আসছেন যে। বন্ধুরা খোঁজবে না? আমাকে ব্যাগটা দিয়ে বন্ধুদের কাছে যান, আমি নিতে পারবো।”

“এত কথা বলো কেনো তুমি? আমি সাথে যাচ্ছি এটা ভালো লাগছে না?”

তানভিরের ধমকে বন্যা কিছুটা কেঁপে উঠল। তানভির সহসা কৌতুক স্বরে বলল,
“আরে মজা করছিলাম। চলো, তোমাকে এককাপ চা খাইয়ে রিক্সায় উঠিয়ে দিচ্ছি।”

বন্যা নাক কুঁচকে বলল,
“চা খাবো না, ধন্যবাদ। ”

তানভির শব্দ করে হেসে বলল,
“আমি তো জানতাম তোমার চা খুব পছন্দ। এখন আমি বলছি বলে খাবে না?”

বন্যা কিছুটা উদ্বেল কন্ঠে শুধালো,
” আপনাকে কে বলছে? মেঘ?”

” সেটা তুমি জেনে কি করবা? খাবে কি না বলো।”

বন্যা আস্তে করে বলল,
“ঠিক আছে।”

অনেকটা সামনে এগিয়ে রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে দুজনেই চা খেতে দাঁড়িয়েছে। আশপাশে তেমন মানুষজন নেই৷ চায়ের দোকানে ৪-৫ জন লোক চা খাচ্ছে যার মধ্যে দু’জন সিগারেট টানছে। বন্যা গোল গোল চোখে সেই লোকদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের হাবভাব দেখে বন্যার ভ্রু যুগল আরও কুঁচকে আসে। তানভির সে দৃশ্য দেখে বলল,
“তুমি বরং এ পাশে দাঁড়াও তাহলে ধোঁয়া আসবে না। ”

বন্যা অতর্কিতে তানভিরের পানে তাকালো৷ কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে গেলো৷ তানভির তপ্ত স্বরে বলল,
“কিছু বলবে?”

বন্যা এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে না করলো।তানভির পুনরায় প্রশ্ন করল,
” তুমি কি কোনো কারণে আপসেট? ”

বন্যা চোখ তুলে তাকালো তবে কিছু বললো না। বন্যা রাস্তার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো আর তানভির রাস্তার পাশে দাঁড়ানো। এদিকে সচরাচর গাড়ি চলাচল করে না। হঠাৎ দু একটা গাড়ি আসে। বন্যার সঙ্গে সরাসরি চোখাচোখি হতেই তানভির বন্যার মাদকের ন্যায় চোখে গহীনে ডুবে গেছে। আশপাশ ভুলে নিরেট দৃষ্টিতে বন্যাকে দেখছে। আচমকা বন্যা এগিয়ে এসে তানভিরের পেট বরাবর শার্ট আঁকড়ে ধরে শক্ত করে টান দিতেই তানভির বেসামাল হয়ে বন্যার সঙ্গে ধাক্কা খেলো। তানভিরের ঘোর কাটতেই খেয়াল করলো একটা পিক-আপ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে তানভিরের পাশ কেটে স্প্রীডে চলে গেছে। তানভির সঙ্গে সঙ্গে আশপাশে দেখলো। এদিকে বন্যার দু-হাত এখনও তানভিরের পেটে। কয়েক মুহুর্তে তানভির স্বাভাবিক হলো, বন্যার স্পর্শ অনুভব করা মাত্রই তানভিরের সারা শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছে। নিজেকে সামলে তানভির সঙ্গে সঙ্গে সরে দাঁড়িয়েছে। বন্যা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
” আপনাকে এতবার ডাকলাম। কথা কানে যায় নি?”

তানভির বন্যার ক্রোধিত চোখ মুখ দেখে মৃদু হাসলো। তানভিরের মস্তিষ্ক এখনও বন্যার স্পর্শে অনুভবে মেতে আছে। কি হয়েছে বা কি হতে যাচ্ছিলো এসবে তানভিরের বিশেষ মনোযোগ নেই। তানভিরের ঠোঁটে হাসি দেখে বন্যার মেজাজ আরও বেশি খারাপ হলো। রাগে কটমট করে বলল,
” আপনি হাসতেছেন? এখন যদি গাড়িটা আপনার উপর দিয়ে যেতো। তখন কি হতো?”

তানভির মৃদুস্বরে বলল,
” জানি না। ”

বন্যা ফের বলে উঠল,
” রাস্তাঘাটে এভাবেই চলাফেরা করেন?”

তানভির কপাল গুটিয়ে প্রশ্ন করলো,
“কিভাবে চলাফেরা করি?”

“অসাবধানতায়। ”

“ওহ।”

বন্যা ফোঁস করে উঠলো,
“ওহ কি? আপনার কিছু একটা হয়ে গেলে বাসার অবস্থা কি হতো একবার ভেবেছেন?”

তানভির কপাল কুঁচকে বলল,
” কি হতো?”

তানভিরের দুষ্টামি বুঝতে পেরে বন্যা রাগে আরও বেশি ফুঁসছে। রাগের কারণে বন্যার ঠোঁট দুটা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ সরু হয়ে গেছে। গোলাপী লিপস্টিকে সরু ওষ্ঠদ্বয়ে তানভিরের নজর স্থির হয়ে আছে। বন্যা রাগে একের পর এক কথা বলছে। তানভির অবাক লোচনে শুধু ঠোঁটেই চেয়ে আছে। বন্যা অকস্মাৎ বলে উঠল,

“আমি এখনই মেঘকে কল দিয়ে সব বলব ।”

মেঘের নাম শুনে তানভিরের এবার টনক নড়ে উঠলো। তৎক্ষনাৎ বলল,
“প্লিজ, বনুকে কিছু বলো না।”

বন্যা ভারী কন্ঠে বলল,
” আপনি কতটা কেয়ারলেস এটা তো ওর জানা দরকার। আমি এখনি কল দিচ্ছি। ”

বন্যা মেঘকে কল দেয়ার জন্য নাম্বার বের করতে লাগলো৷ তানভির বন্যার হাত থেকে ফোন নিয়ে নিজের পকেটে রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” আর যাই করো সমস্যা নেই কিন্তু বনুকে আজকের ঘটনা বলো না, প্লিজ।”

“কোনো? ”

তানভির মনে মনে বিড়বিড় করল,
” ভাইয়া যদি জানতে পারে আমার জন্য বনু কান্না করছে, তাহলে সবার রাগ আমার একার উপর ঝাড়বে। ওমা আমি নাই!”

তানভির ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে বলল,
” বনুকে বললে বাসার সবাই জেনে যাবে। বনু কান্নাকাটি করে নাজেহাল অবস্থা করে ফেলবে। বাসার মানুষের বকাও খেতে হবে। ”

বন্যা চাপা স্বরে বলল,
“মেঘকে খুব ভালোবাসেন তাই না?”

তানভির কপাল কুঁচকে মৃদু হেসে জবাব দিল,
” হ্যাঁ খুব ভালোবাসি। ”

তানভির মনে মনে আওড়াল,
“বনুর বেস্ট ফ্রেন্ডকেও খুব ভালোবাসি। ”

বন্যা ধীর কন্ঠে বলল,
“মেঘও আপনাকে অনেক ভালোবাসে। ওর জন্য আর বাসার সবার জন্য হলেও একটু সাবধানে চলাফেরা করবেন। আপনার একটু উদাসীনতায় পুরো পরিবারকে কাঁদতে হবে। তাই প্লিজ, সাবধানে চলাফেরা করবেন।”

তানভির নেশাক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“ইনশাআল্লাহ, চেষ্টা করবো।”

চায়ের দোকানের মামা কোথায় চলে গেছিলেন। এতক্ষণে কোথা থেকে এসেই জিজ্ঞেস করলেন,
“মামা, আপনাদের কি চা দিবো?”

তানভির উচ্চ স্বরে বলল,
“একটা আদা চা আরেকটা লেবু চা। লেবু চা তে চিনি একটু বেশি দিবেন।”

বন্যা অবাক চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“আপনি কিভাবে জানেন আমি লেবু চা খাই আর চিনি বেশি খাই?”

তানভির আড়চোখে আকাশের পানে তাকিয়ে অকস্মাৎ বলে উঠল,
“ঠিকই তো। আমি কিভাবে জানি?”

বন্যা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“প্রশ্ন টা আমি আপনাকে করেছি।”

তানভির মেকি স্বরে বলল,
“উত্তর ভাবতে সময় দিবে তো নাকি ?”

বন্যা তানভিরের হাবভাব দেখে প্রখর তপ্ত স্বরে বলল,
“থাক, আর উত্তর দিতে হবে না।”

“বাঁচা গেলো।”

বন্যা সূক্ষ্ম নেত্রে তাকালো ততক্ষণে তানভির চা আনতে চলে গেছে। চা খেতে খেতে বন্যা বেশ কয়েকবার তানভিরের দিকে তাকিয়েছে। তানভির সেটা বুঝতে পেরে আগে থেকেই সাবধান হয়ে গেছে। চা খাওয়া শেষে চায়ের বিল দিয়ে কিছুটা সামনে গিয়ে বন্যাকে একটা রিক্সায় উঠিয়ে দিল। যাওয়ার আগে পকেট থেকে বন্যার ফোনটা বের করে দিতে দিতে আবারও বলল,
“প্লিজ, বনুকে কিছু বলো না।”
তানভির আবারও সোহাগদের কাছে গেল।

খান বাড়িতে আজ মেঘ আর মীম হৈ-হুল্লোড়ে মেতেছে। গতকালই মেঘদের প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। প্র্যাক্টিকেল এখনও বাকি৷ তবে প্র্যাক্টিকেল নিয়ে মেঘের তেমন কোনো টেনশন নেই। কারণ তামিম আর মিনহাজ দু’জনে মেঘ আর বন্যার প্র্যাক্টিকেলের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে। যদিও দায়িত্বটা আবিরের থেকে মাফ পাওয়ার জন্যই নিয়েছে। মেঘ, বন্যা সেসব কিছু জানে না। পরীক্ষা শেষ হওয়ার খুশিতে মেঘ আজ রাতের বেলা বাসার মানুষদের রান্না করে খাওয়াবে। রান্না ভালো হলে পরবর্তীতে অন্য একদিন ফুপ্পিদেরও দাওয়াত দিবে।

বিকেলের দিকে মেঘ আবিরের নাম্বারে কল দিল। আবির কল রিসিভ করে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
” বলুন।”

মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি আমাকে সবসময় আপনি বলে সম্বোধন করেন কেনো?”

“ভালো লাগে তাই। ”

মেঘ চাপা স্বরে বলল,
” সেসব বাদ দেন। রাতে কি খাবেন বলুন?”

মেঘের কথা শুনে আবির নিঃশব্দে হেসে রাকিবের দিকে তাকালো। রাকিব আস্তে করে বলল,
“কি হয়েছে?”

আবির ফোনটা একটু দূরে সরিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
” নিজেকে আজ বিবাহিত মনে হচ্ছে।”

পুনরায় ফোন কানে ধরে বলল,
” যা রান্না হবে তাই খাবো।”

মেঘ কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
” আপনি যা বলবেন তাই করবো।”

“আপনি রান্না করবেন?”

“জ্বি স্যার।”

আবির ভারী কন্ঠে বলল,
” রান্না করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি বাসায় আসার সময় সবার জন্য খাবার নিয়ে আসবো। আপনি সবাইকে দিয়ে দিয়েন।”

মেঘ রাগী স্বরে বলল,
“নাহ। আমি রান্না করবো।”

আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
” শরীরে যদি আবার তেল পড়ে?”

মেঘ অদম্য কন্ঠে বলে উঠল,
” কিছু হবে না। আপনি শুধু বলুন কি খাবেন?”

“পোলাও। ”

“আচ্ছা ঠিক আছে। সাবধানে আসবেন। আল্লাহ হাফেজ।”

“আল্লাহ হাফেজ। ”

কল কাটতেই রাকিব বলল,
” আমি একটা বিষয় সবসময় খেয়াল করি। তুই মেঘকে রান্না করতে দিতেই চাস না। সমস্যা কি তোর? তোর বউ কালো হয়ে যাবে এই ভয়ে রান্না ঘরে ঢুকতে দেস না?”

আবির গুরুভার কন্ঠে বলল,
” ও আমার মানে সম্পূর্ণ আমার। ফর্সা হলেও আমার, কালো হলেও আমার ই থাকবে। ও সবেতেই আমার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাসার মানুষ। বিয়ের দেয়ার ভয়ে আমি আগে থেকেই ও কে রান্না করতে দিতাম না। অথচ চাচ্চু সেই বিয়ে দিতেই উঠেপড়ে লেগেছে। এখন একটু শান্ত আছে ঠিকই তবে যদি একবার রান্নাবান্না শিখে ফেলে তাহলে আর ওনাকে আটকানো যাবে না।”

রাকিব ঠাট্টার স্বরে বলল,
“ভালোই হবে, মেঘের বিয়েতে আবির দিওয়ানা। বাবুর বাবা হতে গিয়ে হয়ে যাবে মামা।”

আবির অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
” নিজের মুখ টা বন্ধ রাখ শা*লা,
নয়তো তোর মা*থা ফা*টিয়ে আমি চলে যাবো থা*না। ”

রাকিব মৃদুস্বরে বলল,
“আমি কি তোর শা*লা?”

” তুই শা*লা না হলেও তোর কর্মকাণ্ড শা*লার মতোই। ভুলেও যদি উল্টাপাল্টা কথা বলবি তাহলে তোর খবর আছে। ”

রাকিব হাসতে হাসতে বলল,
” আমি ভাবছি মেঘের বিয়েতে…. ”

আবির কপাল কুঁচকে রক্তাভ চোখে তাকাতেই রাকিব থতমত খেয়ে বলল,
“তোর আর মেঘের বিযের কথায় বলছি আমি।”

“কিছু বলতে হবে না। আমি বাসায় চলে যাচ্ছি, তুই সামলে নিস।”

“আচ্ছা।”

আবির মাগরিবের নামাজের কিছুক্ষণ পর বাসায় আসছে। রান্নাঘরে মেঘ আর মীম রান্না করছে। বাড়ির তিন কর্তী সোফায় বসে চা খাচ্ছেন আর গল্প করছেন। আবির বাসায় ঢুকে এই দৃশ্য দেখে ভ্রু কুঁচকালো। কিছু বলতে গিলেও বলল না। নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ পর নিচে আসছে। আবিরকে দেখেই মালিহা খান বললেন,
“কিরে আবির, কফি করে দিব?”

“নাহ তোমরা গল্প করো। আমি করছি।”

“তুই রান্নাঘরে যাবি?”

আবির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“কেনো? রান্নাঘরে যাওয়া কি বারণ?”

“আমাদের জন্য বারণ৷ মেঘ ফোন নিয়ে রান্না করতে গেছে। আমাদের আশেপাশে ভিড়তেও নিষেধ করেছে। দেখ তোকে অনুমতি দেয় কি না।”

আবির রান্নাঘরের কাছে যেতেই মেঘ চেঁচিয়ে উঠলো,
“আপনি রান্নাঘরে আসবেন না।”

“কেনো?”

“আপনার কি লাগবে বলুন। আজ রান্নাঘরের দায়িত্ব আমার। ”

আবির উষ্ণ স্বরে বলল,
“আর তোকে দেখে রাখার দায়িত্ব আমার। ”

আবিরের কথা শুনে মেঘের থেকেও বেশি মীম লজ্জা পেয়েছে। দুজন প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে থাকতে চাই না সে। তাই মাথা নিচু করে চুপচাপ বেড়িয়ে যাচ্ছে। আবির রাগী স্বরে বলল,
“তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

মীম আস্তে করে বলল,
“রেস্ট নিয়ে আসতেছি।”

আবির গ্যাসে গরম পানি বসিয়ে মেঘের রান্না গুলো চেক করছে। পোলাও, ডিম ভুনা ছাড়াও আরও ২-৩ আইটেম অলরেডি করে ফেলেছে। রান্নাঘরের এক পাশে রান্নার ভিডিও চলছে। আবির সবগুলো একটু একটু করে টেস্ট করছে আদোও খাওয়ার যোগ্য হয়েছে কি না বুঝার জন্য। মেঘকে রান্না করতে দিতে চাই না ঠিকই কিন্তু রান্না করার পর সেই রান্না কেউ মুখে তুলতে না পারলে এটাও আবিরের জন্য অপমানজনক বিষয়। সবগুলো চেক করে আবির টুকটাক বলে দিচ্ছে, পরিশেষে পোলাও মুখে দিয়ে আবির থ হয়ে গেছে। মেঘও আহাম্মকের মতো আবিরকে দেখছে। আবির কোনোরকমে গিলে ধীর কন্ঠে শুধালো,
“লবণ দেস নি?”
“নাহ।”
“কেনো? রেসিপিতে লবণ দেয় নি তারা?”
“দিয়েছিল।”
“তাহলে তুই দেস নি কেনো?”

মেঘ উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করলো,
” ভাতে কেউ লবণ দেয়?”

মেঘের কথা শুনে আবির বেকুব বনে গেল। এমন সময় আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খান বাসায় আসছেন। আবির তাড়াতাড়ি কফি করে রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে এসে মালিহা খানকে ইশারায় রান্নাঘরে যেতে বললো। মালিহা খান গেলেও মেঘের জেদের কারণে তিনি বিশেষ কোনো সাহায্য করতে পারেন নি। ঘন্টাখানেক পর সবাই খাবার টেবিলে বসেছে। মেঘ আজ নিজের হাতে সবাইকে খেতে দিচ্ছে। মালিহা খান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলে দিচ্ছেন কোনটাতে লবণ কম হয়েছে, কোনটাতে বেশি হয়েছে। আবির আর তানভির মিটিমিটি হাসছে। মোজাম্মেল খানের নজরে পড়তেই ফোঁস করে উঠলেন,
” এত হাসাহাসি করো না। তোমরা যাও, এতগুলো আইটেম রান্না করে নিয়ে আসো তারপর দেখি কেমন হয়।”

তানভির ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল,
“আমরা সেজন্য হাসছি না। আপনি যে এ অবস্থায় বনুকে বিয়ে দেয়ার কথা ভাবেন। তারজন্য হাসছি। ”

মোজাম্মেল খান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,
“এমন বাড়িতেই মেয়ে বিয়ে দিব যেখানে আমার মেয়েকে রাঁধুনি নয় রাজরানী হয়ে থাকবে।”

তানভির মাথা নিচু করে মনে মনে আওড়াল,
“আর সেটা এই খান বাড়ি। এখানেই আমার বোন রাজরানী হয়ে থাকবে। অথচ আপনি বুঝতে পারছেন না।”

রাত ১০ টার পরে মেঘ আবার রান্না করতে গেছে। এবার আর কোনো রেসিপি চেষ্টা করে নি। সবার জন্য নুডলস রান্না করে মীম, তানভির কে রুমে দিয়ে কিছুটা আবিরের জন্য নিয়ে গেছে আর বাকিটা বাসার সবার জন্য রেখে গেছে।
মেঘ দরজায় দাঁড়িয়ে আস্তে করে বলল,
“আসবো?”

আবির ওয়ারড্রবে জামাকাপড় রাখছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে মেঘের অন্ধকারাচ্ছন্ন চেহারা দেখে থমকে দাঁড়ালো। হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে ?”

মেঘ চিবুক নামিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
” আমার রান্না ভালো হয় নি হয়তো পেট ভরে নি। তাই নুডলস নিয়ে আসছি।”

আবির মৃদু হেসে বলল,
” বি*ষ নিহিত জেনেও প্রতিনিয়ত আমরা কত কি খাচ্ছি সেখানে আপনার লবণ কম, মসলা বেশি খাবার আর এমন কি”

মেঘ কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“আমি কিছুই ঠিকমতো পারি না। ”

আবির কোমল কন্ঠে ডাকলো,
“ম্যাম”

মেঘ আস্তে করে বলল,
“হুম।”

“আপনাকে আগেও বলেছি আজ আবারও বলছি রান্নার বিষয় নিয়ে ভুলেও মন খারাপ করবেন না। পৃথিবীতে কেউ ই পারফেক্ট হয় না, মেনে নেয়া আর মানিয়ে নেয়ার মধ্য দিয়েই সারা জীবন কাটাতে হয়। ”

মেঘ মুখ ফুলিয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির আবারও বলল,
“আপনার জন্য দুটা শার্ট রেখেছিলাম, দেয়া হয় নি আর। পুরাতন শার্ট নিবেন নাকি নতুন কিনে দিব?”

আবির ইস্ত্রি করা দুটা শার্ট বের করে মেঘের দিকে এগিয়ে দিল। একটা সাদা আরেকটা কফি কালার। মেঘ শার্ট দুটা দেখে সহসা আবিরের দিকে তাকালো। আবিরের পড়নেও শুভ্র রঙের একটা শার্ট। মেঘ মনে মনে সাহস অর্জন করে হঠাৎ বলে ফেলল,
” পুরাতন ই নিব কিন্তু আমি এই সাদা শার্ট নিব না। আপনার পড়নের টা নিব।”

আবির স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“আচ্ছা, ঐ ২ টা আপাতত নিয়ে যান। কালকে এটা ধৌয়ে তারপর দিয়ে আসবো নে।”

মেঘ শ্বাস ছেড়ে নিরেট কন্ঠে বলল,
“শার্ট আমি ধৌয়তে পারবো। দিলে এখনি দেন নয়তো লাগবে না। ”

আবির সঙ্গে সঙ্গে শার্ট খুলে একটা টিশার্ট পড়ে সাদা শার্ট মেঘকে দিয়ে দিলো। মেঘ তিনটা শার্ট নিয়ে যেতে যেতে বলল,
“নুডলস টা খেয়ে নিয়েন।”

রুমে এসেই দরজা বন্ধ করে আবিরের পড়নের সাদা শার্টটা মেঘ জামার উপর দিয়েই পড়ে নিয়েছে। শার্ট লম্বায় হাঁটুর কিছুটা উপর পর্যন্ত পৌঁছেছে তবে সেসবে মেঘের মনোযোগ নেই। মেঘ চোখ বন্ধ করে আপন মনে আবিরের গায়ের গন্ধ উপলব্ধি করছে। কল্পনাতে আবিরকে নিয়ে শতাব্দী পেরিয়ে যাচ্ছে। অজানা অনুভূতি মেঘের মনকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়েছে। মেঘ পুরো ঘরে ছুটোছুটি করে ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। লজ্জায় মেঘের নাক মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। বার বার হাত দিয়ে মুখ ডাকছে আবার আঙুল ফাঁকা করে নিজেকে দেখছে। অকস্মাৎ আবির ভাইয়ের মতো হাতা ফোল্ড করতে শুরু করলো। আবিরের মতো সুন্দর না হলেও মেঘ সেভাবেই কোমড়ে হাত রেখে ফ্যাশন করছে, একটু পরপর শার্টের গন্ধ শুঁকছে। প্রায় ২০ মিনিট পর মেঘ বিছানায় শুয়ে দুচোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো।

#চলবে

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৭৮
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

দেখতে দেখতে মাসখানেক কেটে গেছে। এরমধ্যে মেঘের প্র্যাক্টিকেল পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে আবিরের ব্যস্ততা দ্বিগুণ বেড়েছে, সকালে নাস্তা করে বাসা থেকে বের হয় ফিরতে ফিরতে প্রায় ১০/১১ টা বেজে যায়। মেঘ প্রায় প্রতি রাতেই বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আবিরের জন্য অপেক্ষা করে। প্রিয় মানুষটার জন্য অপেক্ষা করতে কখনও ক্লান্ত হয় না মেয়েটা।

আজ শুক্রবার। স্নিগ্ধ শীতল পরিবেশ।মেঘের ঘুম ভাঙে প্রায় ১০ টার দিকে। ফ্রেশ হয়ে আপন মনেই নিচে যাচ্ছিলো। আচমকা সিঁড়ির কাছে এসে থমকে দাঁড়ালো। তানভিরের রুমের ভেতর থেকে আসা পড়ার শব্দে মেঘ সহসা ভ্রু কুঁচকে তানভিরের রুমের দিকে তাকালো। এক সেকেন্ড দেরি না করে তানভিরের রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে দেখলো। মেঘকে দেখে তানভির পড়া থামিয়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু বলবি?”

মেঘ হা করে দুহাতে মুখ ঢেকে উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
“তুমি পড়তে বসছো?”

তানভির নম্র স্বরে বলল,
” সামনে পরীক্ষা।”

মেঘ বিস্ময় সমেত তানভিরকে দেখছে। বাসায় মেয়ে সংগঠিত ঘটনার পর থেকে বাবা ছেলের সম্পর্কে যেমন ফাটল ধরেছে তেমনই ফাটল ধরেছে পড়াশোনার সাথেও ৷ রাজনীতিতে জড়ানোর পর পড়াশোনাটা কেবল সার্টিফিকেটের জন্য ই চালিয়ে গেছে। পরীক্ষা ব্যতীত কখনো কলেজের গন্ডিও পার হয় না। এত বছর পর হঠাৎ তানভিরকে পড়তে বসতে দেখে মেঘের বিস্ময় যেন কমছেই না, এক ছুটে গেল হালিমা খানের কাছে। একে একে সবাইকে তানভিরের পড়ার কথা বলেছে,সেসব শুনে মীম আর আদিও তানভিরকে এক নজর দেখে গেছে। মেঘ রুমে এসেই দেখে বন্যা কল দিচ্ছে। বন্যার কল রিসিভ করেই মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
” জানিস কি হয়েছে?”

বন্যা আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,
“কি হয়েছে?”

“ভাইয়া পড়তে বসছে।”

বন্যা ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“এমনভাবে বলছিস, আমি তো মনে করছিলাম কাউকে মা**র্ডা*র করে ফেলছেন। অবশ্য বলা যায় না,করতেও পারেন।”

মেঘের হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় মুহুর্তেই বেদনার ছাপ স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে। উজ্জ্বল ধৃষ্টতা অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে ভারী কন্ঠে বলল,
” সরি, আমি ভাইয়ার ব্যাপারে তোকে কিছু বলবো না ভেবেছিলাম তারপরও মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে। কিছু মনে করিস না, প্লিজ। ”

বন্যা ভাব নিয়ে বলল,
“অনেক রাগ দেখানো হয়েছে, থাক বেবি আর রাগ করতে হবে না। আর আমিও সরি, আসলে এভাবে তোর কলিজার টুকরা ভাইকে নিয়ে কথা বলা উচিত হয় নি৷ ”

মেঘ মৃদু হেসে বলল,
” বাদ দে এসব কথা। এখন তুই বল, কেনো কল দিয়েছিলি?”

” শুনলাম মিনহাজের পা ভেঙ্গে গেছে…।”

বন্যা কথা শেষ করার আগেই মেঘ ফোঁস করে উঠে রাগী স্বরে বলল,
“তুই কি বলতে চাচ্ছিস, আমার ভাই ওর পা ভেঙ্গে ফেলছে?”

বন্যা রাশভারি কন্ঠে বলল,
” আমি এ কথা বলবো কেন? বুঝলাম ভাইকে খুব ভালোবাসিস তাই বলে আমার কথা শেষ করার আগেই চিৎকার দিয়ে উঠবি?”

“ঠিক আছে, বল।”

“ফুটবল খেলতে গিয়ে কিভাবে যেন পা ভেঙ্গে গেছে। এখন হাসপাতালে ভর্তি আছে। মিষ্টিরা সবাই দেখতে যেতে চাচ্ছে। তুই তাদের নাম্বার ব্লক করে রাখছিস তাই আমাকে বার বার কল দিচ্ছে। তুই কি যাবি?”

মেঘ ধীর কন্ঠে বলল,
“আজ শুক্রবার, আব্বু, বড় আব্বু সবাই বাসায়। দেখি যেতে দেন কি না। ”

“আচ্ছা আমাকে জানাইস।”

“ঠিক আছে। ”

মেঘ নিচে আসতেই আব্বুর সাথে দেখা, মেঘ ভয়ে ভয়ে বলল,
“আব্বু, আমার একটা ফ্রেন্ড পায়ে ব্যথা পেয়েছে। সবাই দেখতে যাবে৷ আমিও যাই?”

মোজাম্মেল খান মেয়ের দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বললেন,
“ঠিক আছে যাও। তানভিরকে নিয়ে যেতে বলো।”

“ভাইয়া পড়তেছে।”

মোজাম্মেল খান আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকিয়ে বললেন,
” কি? তোমার ভাই পড়তে বসছে?”

মেঘ নিঃশব্দে হেসে বলল,
“হ্যাঁ। অনেকক্ষণ যাবৎ পড়তেছে।”

” হঠাৎ পড়তে বসার কারণ কি?”

“জানি না। ভাইয়াকে ডাকবো?”

মোজাম্মেল খান ধীর কন্ঠে বললেন,
“না থাক। পড়তে যেহেতু বসেছে পড়ুক। তুমি বরং আবিরকে বলো নিয়ে যেতে।”

আবিরের নাম শুনেই মেঘ আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,
” নাহ৷ আমি একায় যেতে পারবো। ”

মেঘ মনে মনে ভাবছে, “আবির ভাই যদি জানতে পারে আমি মিনহাজকে দেখতে যেতে চাচ্ছি তাহলে তো তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে।”

মোজাম্মেল খান হালকা ধমকের স্বরে বললেন,
” একা যেতে হবে না আবিরকে নিয়ে যাও। ”

“আবির ভাই ঘুমাচ্ছেন।”

“এত বেলা হয়ে গেছে এখনও ঘুমাচ্ছে।
আবিরের ঘুম ভাঙিয়ে তোমাকে নিয়ে যেতে বলো । আর আবির রাজি না হলে আমিই নিয়ে যাবো।”

মেঘ বিড়বিড় করতে করতে আবিরের রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো। বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ভেতরে ঢুকলো। আবিরের মায়াময় ঘুমন্ত চেহারায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, আস্তে করে ডাকলো,
“আবির ভাই..”

আবির ঘুমের মধ্যেই জবাব দিল,
“হুমমমম।”

মেঘ খানিক থেমে, মৃদুস্বরে আবারও ডাকলো,
“আবির ভাই..”

আবির ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে মেঘকে দেখেই মুচকি হাসলো। আবিরের সদ্য ভাঙা স্বপ্ন টা আবারও চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। মেঘের মায়াবী আদলে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“জ্বি ম্যাম, বলুন।”

মিনহাজের কথা শুনে কি না কি করে বসবে। সেসব ভেবেই ভয়ে মেঘের বুক কাঁপছে। তবুও সাহস নিয়ে বলল,
“আব্বু বলছেন আমাকে নিয়ে একটু বাহিরে যেতে।”

আবির শুয়া থেকে এক লাফে বসে উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
“চাচ্চু বলেছে?”

“জ্বি। ”

“কোথায়?”

“মিনহাজ পায়ে ব্যথা পেয়েছে। দেখতে যাব।”

আবির ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
” পায়ে ব্যথা কিভাবে পেয়েছে?”

“ফুটবল খেলতে গিয়ে। আপনি যাবেন?”

“যাব না কেন? চাচ্চু বলেছেন যেতে তো হবেই।”

আবির রেডি হয়ে নিচে নামতেই মোজাম্মেল খানের সাথে দেখা। মোজাম্মেল খান শান্ত স্বরে বললেন,

” যাওয়ার সময় ফলমূল কিনে নিয়ে যেও ”

“জ্বি আচ্ছা। ”

“আর হ্যাঁ, নাস্তা করে বের হও। ”

আবির বলতে নিলো,
“পড়ে খাবো।”

কিন্তু বলতে পারলো না। মেঘ রেডি হয়ে নামতে নামতে আবির অল্প নাস্তা করে নিয়েছে। রাস্তা থেকে ফল আর কিছু খাবার নিয়ে মিনহাজকে দেখতে গেল। আবির কে দেখেই মিনহাজ শুয়া থেকে উঠতে নিলো। আবির তাকে থামিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
” এত চাপ নিও না। শুয়ে থাকো।”

বন্যা, মিষ্টিরাও পাশে দাঁড়ানো। আবির মিনহাজের সাথে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলছে। তামিমও তাতে সঙ্গ দিচ্ছে কন্তু মেঘের বিষয়টা একদম ভালো লাগছে না। মেঘ এখন পর্যন্ত আবিরকে যতটা চিনেছে, আবির মোটেই এরকম নয়। মিনহাজদের সাথে আবিরের কথোপকথন শুনে মনেই হচ্ছে না যে দুদিন আগে তাদের ভেতরে এত বিদ্বেষ ছিল৷ মেঘ বন্যার হাতে চিমটি কেটে বিড়বিড় করে বলল,
” আবির ভাইয়ের হঠাৎ মিনহাজদের প্রতি এত উদার কেন হলো বলতো? রাস্তায় এক ছেলে আমার হাত ধরেছিল বলে যা তা অবস্থা করছিল। আর এখন এত বড় ঘটনার পরও ওনি এত স্বাভাবিক কেনো?”

বন্যা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” আবির ভাইয়া কি আমার নাকি তোর? আমি কিভাবে জানবো?”

আবির কিছুক্ষণ কথা বলে বেড়িয়ে গেছে। মেঘরা বেশকিছু সময় কথাবার্তা বললো। এরমধ্যে মিনহাজের বাড়ি থেকে মানুষ আসছে, এ অবস্থায় হোস্টেলে থাকতে কষ্ট হয়ে যাবে তাই কিছুদিনের জন্য ও কে বাড়িতে নিয়ে যাবে। মিনহাজকে বিদায় দিয়ে মেঘ, বন্যারা বিভিন্ন বিষয়ে কতক্ষণ আলোচনা করলো। আবিরকে কল দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবির চলে আসছে। মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কোথায় গিয়েছিলেন?”
“একটু কাজ ছিল।”
“একটা কথা বলবো?”
“হুমমম।”
“আপনার এত পরিবর্তনের কারণ কি?”

আবির ভ্রু গুটিয়ে ধীর কন্ঠে শুধালো,
“কিসের পরিবর্তন? ”

“আপনি তো আগে এমন ছিলেন না। তাহলে এখন এমন হয়ে যাচ্ছেন কেনো?”

আবির মলিন হেসে বলল,
” আপনার ভালোর জন্য। ”

“আমার ভালো মানে?”

আবির বাইক স্টার্ট দিতে দিতে বলল,
” সময় হলে বুঝবেন।”

মেঘ শঙ্কায় আর কিছুই বলতে পারলো না। চুপচাপ দুজনেই বাসায় ফিরেছে।

★★★★★

তিনদিন কেটে গেছে। তানভির গতকালই বন্ধুদের সাথে ট্যুরে গেছে ফিরতে আরও এক-দুদিন লাগবে। আজ মীমের স্কুলে পোগ্রাম তাই সকাল থেকে মেঘের কাছে বায়না ধরেছে, পোগ্রামে মেঘের ফোনটা নেয়ার জন্য। মেঘও তেমন আপত্তি করে নি, মীমকে ফোন দিয়ে দিয়েছে। বিকেল দিকে মেঘ ঘুমিয়ে ছিল, হঠাৎ হালিমা খান আর আকলিমা খান এসে ডাকতে শুরু করেছেন। মেঘ ঘুমের মধ্যেই কোনোরকমে বলল,
“ডাকছো কোনো আম্মু?”

“তোকে দেখতে মানুষ আসছে। তাড়াতাড়ি উঠ।”

সেকেন্ডের মধ্যেই মেঘের ঘুম উধাও। তড়িৎ বেগে উঠে বসে চেঁচিয়ে উঠল,
“কি?”

আকলিমা খান চাপা স্বরে বললেন,
“আস্তে কথা বল, নিচে লোকজন বসে আছেন।”

মেঘ অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আবারও চেঁচালো,
” আমি কোথাও যাব না।”

মেঘ আশেপাশে ফোন খোঁজতে নিলো হঠাৎ মনে পড়েছে মীমের ফোন নিয়ে যাওয়ার কথা। হুট করে ঘটা ঘটনাগুলো মেঘের মস্তিষ্ক অকেজো করে তুলেছে কি করবে তার দিশাবিশা পাচ্ছে না। আজ বাসায় তানভির, মীম কেউ নেই। কে বাঁচাবে মেঘকে? কিভাবে যাবে পাত্রপক্ষের সামনে? আবির ব্যতীত কাউকেই পাত্র হিসেবে দেখতেই চাই না মেঘ। যেভাবেই হোক আবির ভাইকে জানাতে হবে। মেঘ হুট করে বিছানা থেকে নেমেই দরজার দিকে ছুটলো, আম্মু বা কাকিয়া কারোর নাম্বার থেকে কল দিয়ে হলেও আবিরকে জানাতে হবে। দরজা পর্যন্ত যেতেই মোজাম্মেল খানকে দাঁড়ানো দেখে আতঙ্কে মেঘের পা যুগল থেমে গেছে। হালিমা খান আর আকলিমা খান দুজনেই হতবাক হয়ে চেয়ে আছেন। মোজাম্মেল খান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

” চুপচাপ রেডি হয়ে নিচে আসো। ওনারা তোমার জন্য সারাদিন বসে থাকবেন না। ”

মোজাম্মেল খান আবারও নিচে চলে গেছেন। মেঘকে দেখতে ছেলে, ছেলের বাবা আর ছেলের মা আসছে। ছেলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দেখতে শুনতে খুব ই ভালো। মোজাম্মেল খানের পরিচিত একজন এই সম্বন্ধের কথা বলেছেন। বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে, উত্তরাতে নিজস্ব বাসা আছে, এলাকায় বেশ নামডাকও আছে। ওনাদের একটাই ইচ্ছে মেয়েকে হতে হবে সুন্দরী যাতে ছেলের সঙ্গে মানায়৷ বাড়িতে কোনো কাজ করতে হবে না,যখন যা ইচ্ছে করতে পারবে। এসব শুনেই মোজাম্মেল খান মোটামুটি রাজি হয়ে গেছেন। মোজাম্মেল খান একায় ছেলের বাড়িতে গিয়ে ছেলে দেখে আবার তাদের নিজের সাথে করে বাসায়ও নিয়ে আসছেন। মোজাম্মেল খান ছেলের বাসায় থাকতেই আলী আহমদ খানকে কল দিয়ে বাসায় আসতে বলছেন। মালিহা খান আর বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ডরা মিলে তাদের জন্য নাস্তা রেডি করছেন৷ উপরে হালিমা খান আর আকলিমা খান মেঘকে শাড়ি পড়ার জন্য জোরাজোরি করছেন। মেঘ শাড়ি ছুঁড়ে ফেলে চিৎকার করে বলছে,
” তোমরা আমার সাথে এমন কেনো করছো? তোমরা কি চাও আমি ম*রে যায়?”

হালিমা খান মেঘের মুখ চেপে ধরে আর্তনাদ করে বললেন,
” আজেবাজে কথা একদম বলবি না। ছেলে দেখা বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তোর আব্বু হুট করে তাদের নিয়ে বাসায় হাজির হয়েছেন। এখন তুই রেডি না হলে বাড়িতে তুলকালাম কান্ড শুরু হয়ে যাবে। মা রে আমার কথা মান একটু।”

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
” আমি বিয়ে করবো না আম্মু।”

আকলিমা খান মেঘের চোখ মুছে শীতল কণ্ঠে বললেন,
“ছেলে পছন্দ না হলে তোকে বিয়ে করতে হবে না।
তুই শুধু রেডি হয়ে নিচে যাবি আর আসবি। ঠিক আছে? ”

মেঘ আবারও বলল,
” আব্বুর দেখানো কোনো ছেলেকেই আমার পছন্দ হবে না। আমি বিয়ে করবো না। ”

মোজাম্মেল খান নিচ থেকেই উচ্চস্বরে ডাকলেন,
“কি হলো? তোমাদের আর কতক্ষণ লাগবে?”

হালিমা খান আর আকলিমা খান দুজনে মেঘের চোখ মুখ মুছে মেঘকে সাজাতে শুরু করেছেন। মেঘের দু চোখ বেয়ে অনর্গল পানি পরছে, বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেঘ। আবির ই মেঘের জীবনের একমাত্র স্বপ্ন পুরুষ, আবির ব্যতীত এই দেড় বছরে কাউকে নিয়ে এক সেকেন্ডের জন্যও ভাবে নি। অথচ আজ সবকিছু তছনছ হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘকে এক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। ভেতরে ভেতরে মেয়েটা চিৎকার করে বলছে,

” আমি আবির ভাইকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবো না।”

অথচ মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারছে না। কান্না গলায় আঁটকে মেঘের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। কাশতে কাশতে চোখ লাল হয়ে গেছে তবুও কান্না থামছেই না। ২০-২৫ মিনিট পর মোজাম্মেল খান আবারও উপরে আসছেন। ততক্ষণে মেহমানদের নাস্তা খাওয়া শেষ। আলী আহমদ খান বাসায় ফিরে কেবলই ফ্রেশ হতে গেছেন। মালিহা খানও নিজের রুমেই বসা। মেঘকে অনেক জোরাজোরি করেও শাড়ি পড়াতে পারে নি তাই সবুজ রঙের একটা থ্রিপিস পড়িয়ে আকলিমা খান মোটামুটি সাজিয়ে দিয়েছেন। চোখে কাজল আর ঠোঁটে লিপস্টিক দিলেই মেয়েটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগে। আকলিমা খানও সেটায় করেছেন। মোজাম্মেল খান খান দরজা থেকে মেঘকে দেখেই কপাল গুটালো। ভেতরে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” কি শুরু করেছো তুমি? আর কতক্ষণ ওনাদের বসিয়ে রাখবো?”

মেঘ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মোজাম্মেল খান ভারী কন্ঠে বললেন,
” আমাকে ভাইজান বলেছিলো পাত্রপক্ষ বাসায় এনে তারপর কথা বলতে। আমি তাই করেছি। এখন দেখি কে আটকায়।”

মেঘ মনে মনে আওড়াল,
” আমার আবির ভাই আসলে এক মুহুর্তেই সবকিছু ছারখার করে দিবে তারপর বুঝবা কে আটকায়। ”

অকস্মাৎ নিচ থেকে আবিরের চিৎকারের শব্দ ভেসে আসছে। আবিরের কন্ঠ কানে বাজতেই মেঘ সহসা বিপুল চোখে তাকালো। সর্বাঙ্গে হিমশীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, দুচোখ চিকচিক করছে।আবিরের কন্ঠে একের পর এক হুঙ্কার আসছে। মোজাম্মেল খান দ্রুত রুম থেকে বেড়িয়ে গেলেন। ওনার পেছন পেছন হালিমা খান ও আকলিমা খানও ছুটলেন। মেঘের দুচোখ বেয়ে তখনও পানি পড়ছে কিন্তু ঠোঁট জুড়ে প্রশান্তির হাসি ফুটেছে। মেঘ দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

” আপনি আমার অভয়, আপনিই আমার প্রণয়। তাইতো দণ্ডে দণ্ডে আপনার অনুষঙ্গে ডুবে যেতে চাই।”

মোজাম্মেল খান রুম থেকে বের হয়ে বেলকনি থেকে নিচে তাকাতেই চোখে পরলো আবির একটা ফুলদানি ফ্লোরে ছুঁড়ে চিৎকার করে বলছে,
” আর কোনোদিন যদি এই বাসার চৌকাঠ পার করার চেষ্টা করেন তাহলে জীবন নিয়ে ফিরতে পারবেন না।”

পাত্রপক্ষ ভয়ে একপ্রকার জীবন বাঁচাতে পালিয়েছে। মোজাম্মেল খান সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে চিৎকার করে বললেন,
” সমস্যাটা কি তোমার?”

“আমার কোনো সমস্যা নেই।”

“তুমি বিয়ে করবে না বলে কি এই বাড়ির কারো বিয়ে হবে না?”

আবির উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,
“নাহ, হবে না। আগামী ছয় মাস এই বাড়িতে কোনো বিয়ে হবে না। ”

” তোমার কথায় শেষ কথা?”

আবির রাগান্বিত কন্ঠে পুনরায় বলল,
“হ্যাঁ, এই ব্যাপারে আমার সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত। ”

মোজাম্মেল খান রাগে ফোঁস ফোঁস করছেন। অতিরিক্ত রাগে আবিরের চোখ মুখ লাল টকটকে হয়ে গেছে। মালিহা খান, আকলিমা খান আর হালিমা খান তিনজনেই আবিরকে থামানোর চেষ্টা করছেন। আজ আবির কে থামানো সম্ভব না। মোজাম্মেল খানও রাগের চোটে যা তা বলছে, আবিরও প্রতিত্তোরে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেই চলেছে। আবির রাগে সবার পাশ কাটিয়ে উপরে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলল,
” এরপর পাত্রী দেখার নাম করে কেউ এই বাসায় আসলে চৌকাঠ পার হওয়ার আগেই দু’পা ভেঙে দিব।”

অতিরিক্ত রাগে আবিরের শরীর ঘেমে একাকার অবস্থা। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে একটু এগুতেই মেঘের সঙ্গে দেখা। ডাগর ডাগর দু চোখে গাঢ় কাজল আর ঠোঁট ভর্তি লিপস্টিক দেখে আবিরের মেজাজ তুঙ্গে। মেঘ ছলছল নয়নে তাকিয়ে আছে। এমন সময় আলী আহমদ খান নিজের রুম থেকে বের হয়েছেন। মোজাম্মেল খান তখনও নিজের মতো বকবক করেই যাচ্ছেন। আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দু হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে মেঘের দু চোখের কাজল লেপ্টে দিয়েছে, সাথে সাথে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে মেঘের ঠোঁটে ঘষা দিয়ে লাল টকটকে লিপস্টিক গাল পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছে। মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছে। আবির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” নিচে তোর শ্বশুর অপেক্ষা করছে যা নিজের রূপটা দেখিয়ে আয়।”

আবির ফোঁস ফোঁস করে নিজের রুমে চলে গেছে। মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে কতক্ষণ আবিরের দিকে তাকিয়ে রইলো৷ নিচ থেকে আলী আহমদ খানের ধমকের শব্দে মেঘ লাফ দিয়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। ড্রেসিং টেবিলে নজর পড়তেই মেঘ গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল। লেপ্টে যাওয়া কাজল আর গাল পর্যন্ত ছড়ানো লিপস্টিক দেখে মেঘ মুচকি হেসে বলল,

” আবির ভাই, আপনি বড্ড হিংসুটে। তবে এই হিংসুটে মানুষটাকেই আমি ভালোবাসি।”

নিচ থেকে চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ আসছে। মেঘ ভয়ে গুটিসুটি মেরে বিছানার এক কর্ণারে বসে আছে। দু একবার উঠে দরজা পর্যন্ত গিয়েও ফিরে এসেছে৷ আবিরের প্রতি মেঘের অগাধ বিশ্বাস,নআবির একায় সবকিছু সামলে নিতে পারবে। কিন্তু আজ আর তা হলো না। দুই ভাই এর পীড়নে আবির আঁটকে গেল।

আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,
” তোমাদের জন্য কি এলাকায় মানসম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবো না?”

আবির শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে ভাবলেশহীন জবাব দিল,
” মান সম্মান যাওয়ার মতো কাজ না করলেই হয়।”

আলী আহমদ খান আবারও চেঁচালেন,
” আমরা কি করবো কি করবো না তা কি তোমাদেরকে বলে করতে হবে?”

আবির নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। মোজাম্মেল খান দু হাতে মাথা চেপে ধরে বসে আছেন। আলী আহমদ খান আবারও বলতে শুরু করলেন,

” শুধু হাতে পায়ে বড় ই হয়েছো কিন্তু মানুষের সাথে কেমন আচরণ করতে হয় তা শিখো নি। এই মানুষগুলো যখন বাহিরে আমার উপর আঙুল তুলবে তখন কি জবাব দিব আমি? আমার ছেলে হয়ে তোমার এই আচরণ কিভাবে হতে পারে? তোমরা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করছো, তোমরা কারো ভরসার যোগ্য নও।
তোমাদের উপর ভরসা করলে একদিনে ই আমার সাম্রাজ্য ধ্বংস করে ফেলবে।”

আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ধীর কন্ঠে বলল,
” আব্বু, প্লিজ মাথা ঠান্ডা করুন। আপনি অসুস্থ.. ”

“আমার অসুস্থতা নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। তোমার আচরণ ই সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছে।”

আবির ভেতরের ক্রোধ কোনোভাবেই আটকাতে পারছে না৷ রাগী স্বরে বলল,
” ঠিক আছে৷ আমিই যেহেতু আপনার সাম্রাজ্যের একমাত্র সমস্যা, সেই সাম্রাজ্য আর কলঙ্কিত না করি। ”

আবির দীর্ঘ কদম ফেলে বাসা থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আলী আহমদ খান পেছন থেকে আবারও হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,
” এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। এই বাড়িতে কোনো গু*ন্ডা বদ-মা* শের জায়গা নেই।”

আবির কথাটা শুনেও ফিরে তাকায় নি। বাড়ির তিন কর্তী এক কোণায় চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খানের রাগে তারা বরাবরই চুপ থাকে। আবির বেড়িয়ে গেলেও দুই ভাই এখনও থামতে পারছে না। বুকের ভেতরের ক্রোধ থেমে থাকার নয়। কোনো ব্যক্তি আলী আহমদ খানের যতই প্রিয় হোক না কেনো খান বাড়ির মান সম্মানে আঘাত করলে আলী আহমদ খান তাকে কখনোই ছেড়ে দেন না। হোক সেটা আবির কিংবা ২৮ বছর পূর্বে আবিরের ফুপ্পি। প্রিয় এর চেয়েও প্রিয় মানুষকেও ক্ষণিকের ব্যবধানে অপ্রিয় করে তুলতে সক্ষম। ঘন্টা খানেকের মধ্যে খান বাড়ির পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। যে যার রুমে চলে গেছেন। আলী আহমদ খান প্রেশারের ঔষধ খেয়ে শুয়ে পরেছেন। মালিহা খান ওনার পাশে বসে আস্তে করে বললেন,

“ছেলে টাকে এভাবে কথা বলা আপনার ঠিক হয় নি। আপনি ভাববেন না যে, আমি আপনাকে জ্ঞান দিচ্ছি। আবির, তানভির দু’জনেই মেঘকে অনেক বেশি আদর করে। তাই মেঘের বিয়ের ব্যাপারটা ওরা কিছুতেই মানতে পারছে না। এদিকে মেঘের আব্বু একের পর এক ছেলে দেখেই যাচ্ছে।ওদের কি দোষ?”

আলী আহমদ খান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“ছেলেকে কল দিয়ে বাসায় আসতে বলো।”

মালিহা খান সঙ্গে সঙ্গে নিজের ফোন থেকে আবিরের নাম্বারে কল দিলো। কিন্তু আবিরের ফোন বন্ধ। টানা দু-তিনবার কল দেয়ার পরও বন্ধ পেয়ে মালিহা খান ভয়ে সিটিয়ে পরেছেন। ততক্ষণে আলী আহমদ খান ঘুমিয়ে পরেছেন। মালিহা খান রুম থেকে বেড়িয়ে দ্রুত হালিমা খানকে ডাকলেন। মোজাম্মেল খান রুমেই বসা। ভাবির আতঙ্কিত কন্ঠ শুনে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি হয়েছে ভাবি? ভাইজানের কিছু হয়েছে?”

“নাহ। আবিরের ফোন বন্ধ, কল দিয়ে পাচ্ছি না।”

মোজাম্মেল খান নিজের ফোন থেকেও একবার চেষ্টা করলেন। বন্ধ পেয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,

” রাগ করে বেড়িয়েছে তাই হয়তো ফোন বন্ধ। খুলে ফেলবে কিছুক্ষণের মধ্যে। আপনি রেস্ট নিন।”

হালিমা খানও বেশকিছুক্ষণ বুঝিয়েছেন কিন্তু মালিহা খানের আতঙ্ক কমছেই না। তানভিরকে কল দিয়েছে বলেছে৷ তানভির ওখানে থেকেই পরিচিত সবার সাথে যোগাযোগ করেছে কিন্তু আবিরের সাথে কারো কথা হয় নি। রাকিবকে কল দেয়ায় রাকিব বলল,
” আবির যাওয়ার সময় আমাকে বলেছে, প্রয়োজনে আজই আব্বু-চাচ্চুকে সব বলে দিব। তবুও এত প্যারা নিতে পারবো না।”

তানভির বাসার ঘটনা যা জানে সবটায় রাকিবকে জানিয়েছে। সব জায়গায় খোঁজখবর নিতে বলেছে। এত ঘটনার মাঝে মেঘের কোনো হদিস নেই। ইকবাল খান সন্ধ্যার দিকে অফিস থেকে ফেরার পথে মীমকে পোগ্রাম থেকে নিয়ে আসছে। বাসায় এসে এসব ঘটনা শুনে ইকবাল খান স্তব্ধ হয়ে গেছেন। মীম সঙ্গে সঙ্গে ছুটলো মেঘের রুমের দিকে। মেঘের রুমের দরজা বন্ধ, অনেকক্ষণ ডাকার পর মেঘ ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে দিয়েছে। মেঘের চোখ আর ঠোঁট এখনও আগের মতোই আছে। মীম ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোমার এই অবস্থা কেনো?”

মেঘ আয়নায় নিজের মুখটা দেখে মুচকি হেসে বলল,
” এমনি। ”

মীম মেঘের ফোন মেঘকে দিয়ে আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,
” তুমি হাসছো? ভাইয়া যে রাগ করে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেছে তা কি তুমি জানো? এমনকি ভাইয়ার ফোনও নাকি বন্ধ। ”

মেঘ আঁতকে উঠে বলল,
“কি? ”

মেঘ তাড়াতাড়ি আবিরের নাম্বারে ডায়াল করলো, সত্যি সত্যি নাম্বার বন্ধ। ইন্টারনেটে সব জায়গা থেকে মেসেজ দিয়েছে কিন্তু আবির কোথাও নেই। মেঘের চোখ মুখ মুহুর্তেই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেছে।বুকের ভেতর আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে। মেঘের এখন নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে, না ঘুমিয়ে তখন রুম থেকে বের হলেই পরিস্থিতি বুঝতে পারতো। অন্তত আব্বু আর বড় আব্বুর সামনে কিছু একটা বলতে পারতো। মীম শীতল কণ্ঠে বলল,
” আজ তোমার ফোনটা নেয়া একেবারেই উচিত হয় নি। সরি আপু।”

মেঘ মৃদু হেসে বলল,
” তোর কোনো দোষ নাই। সব দোষ আমার কপালের। তুই রুমে যা। ”

মেঘ অনবরত আবিরের নাম্বারে কল দিয়েই যাচ্ছে। ফুপ্পি, জান্নাত আপু, আসিফ ভাইয়া সবার সাথে কথা বলেছে কিন্তু কেউ কিছু জানে না। মেঘ নিচে নামতে পারছে না কারণ আজকের এই ঘটনার জন্য মেঘ নিজেকেই দায়ী করছে। মেঘ উপায় না পেয়ে বন্যাকে কল দিল। বন্যা কল রিসিভ করতেই মেঘ একে একে সব বর্ণনা করেছে। বন্যা শান্ত স্বরে বলল,
“আচ্ছা রাত পর্যন্ত অপেক্ষা কর। দেখ ওনি আসেন কি না। ”

ফোন বন্ধ জেনেও মেঘ একের পর এক কল দিয়েই যাচ্ছে। রাত ৯ টার দিকে তানভির মেঘকে কল দিল। মেঘ কান্না ভেজা কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া, আবির ভাই কোথায়?”

তানভির মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“আমি খোঁজ নিচ্ছি, যোগাযোগ হলে জানাবো। তাছাড়া আগামীকাল আমি বাসায় ফিরবো। তুই মন খারাপ করে থাকিস না৷ ”

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
” আমার জন্যই তোমাদের এত ঝামেলা
আমি যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে চলে যাব। ”

তানভির ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
” পাগলামি করিস না বনু। একটু বুঝার চেষ্টা কর। ”

মেঘ কল কেটে দিয়েছে। রাতে কারো খাওয়াদাওয়া নেই। যে যার মতো আবিরকে কল দিচ্ছে, পরিচিত সবার সাথে বার বার যোগাযোগ করেছে কিন্তু কেউ কিছুই জানে না। বন্যা রাতে আবারও কল দিয়ে খোঁজ নিয়েছে।

দু’দিন কেটে গেছে, আবির এখনও বাসায় ফিরে নি৷ দুদিন ধরে কোনো অফিসেও যাচ্ছে না। আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান, ইকবাল খান নিজেদের মতো খোঁজখবর নিয়েই যাচ্ছেন কিন্তু আশানুরূপ ফলাফল পাচ্ছেন না।

আজ বিকেলে বন্যা মেঘদের বাসায় আসছে। মেঘকে রুমে না পেয়ে সরাসরি ছাদে গেল। মেঘ চোখ বন্ধ করে সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিল। বন্যা মৃদু স্বরে ডাকলো,

“মেঘ। ”

মেঘ বন্যাকে দেখেই বসা থেকে উঠে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমার জীবনে এত কষ্ট কেন?”

বন্যা মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“কষ্ট সবার জীবনেই থাকে কেউ মনের মধ্যে চেপে রাখতে পারে আবার কেউ পারে না। মন খারাপ করিস না। দোয়া করি আবির ভাইয়া যেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসেন।”

মেঘকে বেশকিছু ক্ষণ বুঝানোর পর মেঘ শান্ত হয়েছে। দুই বান্ধবী পাশাপাশি বসা৷ বন্যা হঠাৎ ধীর কন্ঠে বলল,
” একদিক থেকে তুই খুব ভাগ্যবতী।”

“কোন দিকে?”

“এইযে আবির ভাইয়ার প্রেয়সী হিসেবে৷ দুনিয়া উল্টে যাক আর যা ই হয়ে যাক তোর বিপদে ওনি ঠিকই তোকে বাঁচিয়ে নেন। এমন মানুষ পাওয়া ভাগ্যের বিষয়।”

“সেই ভাগ্য টাকে তো কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারছি না আর নিজেকে শক্তও রাখতে পারছি না। তুই কিভাবে এত শক্ত থাকিস ? ”

বন্যা মলিন হেসে বলল,
“শক্ত থাকি না তবে শক্ত থাকার চেষ্টা করি। ”

“কিভাবে?”

“তুই একদিন বলেছিলি, মানুষ নিরন্তর সুখের নীড় খুঁজে, কষ্ট আড়াল করে প্রতিনিয়ত স্বভাবসিদ্ধ হাসে৷ সত্যি বলতে এটায় বাস্তবতা। জীবনে চলার পথে প্রতিটা মানুষ ই মানসিক শান্তি খোঁজে যেখানে সে সর্বোচ্চ ভালো থাকতে পারবে কিন্তু সেই সুখের স্থান সবার ভাগ্যে জুটে না। তখন বাধ্য হয়ে ভালো থাকার অভিনয় করতে হয়।”

মেঘ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“তোর আবার কি হয়েছে যে তোকে অভিনয় করতে হয়?”

বন্যা মলিন হেসে বলল,
” তেমন কিছু না। বাদ দে। ”

মেঘ ভারী কন্ঠে বলল,
“আমি বাদ দিব না। তোকে আজ বলতেই হবে। আমি প্রায় ই খেয়াল করি তুই মাঝে মাঝে মন মরা হয়ে থাকিস৷ জিজ্ঞেস করলে ইগ্নোর করিস। আজকে তোকে বলতেই হবে।”

” জানি কথাগুলো শুনলে তোর কষ্ট লাগছে, কারণ আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড হয়েও তোর কাছে এত বড় সত্যিটা লুকিয়েছি। ”

মেঘ ভ্রু কুঁচকে আতঙ্কিত কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
“কি হয়েছে তোর?”

বন্যা ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে বলতে শুরু করলো,
” আমাদের এসএসসি পরীক্ষার পর অনেকদিন তোর সাথে আমার যোগাযোগ ছিল না তখন হাতে ফোন ও ছিল না। ঐ সময় মামা বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ওখানে এক মামাতো ভাইয়ের সাথে মোটামুটি ভালো মিল হয়েছিল৷ ভাইয়া তখন রাবিতে পড়তো, ছুটিতে বাড়ি আসছিলো।আর যেহেতু ভাইয়াদের বাসাতেই আমরা বেড়াতে গিয়েছিলাম সেই সুবাদে দুষ্টামি, ফাজলামো করতাম৷ একদিন আম্মু, মামা, মামি কথা বলছিল, কথার মাঝখানে আমাদের দু’জনের কথা উঠে আর মোটামুটি বিয়ের আলোচনা শুরু হয়ে যায় । তখন আমি আর ভাইয়া দুজনেই রুমে উপস্থিত। আমি ফাজলামো করলেও সেটা ভাই হিসেবে করতাম কিন্তু আম্মুদের আলোচনায় তা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ভাইয়ার সাথে আমার ঐরকম কিছু নেই এটা আম্মুকে বলার পর আম্মু বলছে, এই বিয়ের আলোচনা আরও একবছর আগেই হয়েছিল যেটা এতদিনে প্রকাশ পেয়েছে। মূলকথা তারা দেখতে চেয়েছিল আমার আর ভাইয়ার বন্ডিং টা কেমন হয়। এসব জানার পর আমি আরও বেশি হতাশ হয়ে গেছিলাম বাধ্য হয়ে সুযোগে ভাইয়াকে সবকিছু খুলে বলি। ভাইয়া সাহায্য করার বদলে আমায় প্রপোজ করে বসেন৷ তখন রাগ করে মামা বাড়ি থেকে চলে আসি। এরপর থেকে ভাইয়া মাঝে মাঝে আম্মুর নাম্বারে কল দিতো, যেহেতু প্রাথমিকভাবে বিয়ের আলোচনা হয়েই ছিল তাই আম্মুও আমাকে ফোন দিতেন, আমি না চাইতেও ওনার সাথে কথা বলতাম। ধীরে ধীরে আমিও মানসিকভাবে সেই মানুষটার সাথে জড়াতে শুরু করি। আমার যেহেতু আলাদা ফোন ছিল না ঐ ভাবে কথাও হতো না। একদিন আপুর ফোন থেকে ফেসবুকে ওনার আইডি চেক করি যা দেখে আমি রীতিমতো টাশকি খেয়েছিলাম। ওনার আইডিতে একের পর মেয়ের ছবি। ওনার বন্ধু তালিকায় ছেলে নেই বললেই চলে৷ তারমধ্যে একজনের সাথে বেশ কিছু ছবিও পোস্ট করা যার সবগুলোতেই রোমান্টিক ক্যাপশন দেয়া। আমি সেসব সহ্য করতে না পেরে ওনাকে কল দিয়ে রাগারাগি করি। এক পর্যায়ে ওনি স্বীকার করেন যে সেই মেয়ে তার গার্লফ্রেন্ড শুধুমাত্র পরিবারের মানুষের সামনে ভালো সাজার জন্য এমন কাজটা করেছে। তাছাড়া ওনি আমার চেয়ে ভালো কাউকে ডিজার্ভ করেন। আরও কত কি!”

বন্যা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে আবারও বলল,
“সেদিনের পর একটা কথায় মাথায় ঢুকেছে জীবনে বহুরূপী মানুষের চেয়ে একজন অতি সাধারণ মানুষও ঢের ভালো। মানুষটা নিষ্ঠুর কিংবা পাষাণ হোক তবুও একান্ত আমার হোক।”

#চলব