আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব-৭৯+৮০

0
5021

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৭৯
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

মেঘ বন্যার গুরুগম্ভীর চেহারায় খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ মুখভার করে বলে উঠল,
” এত বড় ঘটনা টা আমাকে না জানিয়ে তুই কিভাবে ছিলি ?”

বন্যা ইতস্ততভাবে জবাব দিল,
“অপ্রত্যাশিত ঘটনায় আমি নিজেই হতভম্ব হয়ে গেছিলাম তখন অনীস্পিত ব্যাপারটা ভুলে যাওয়ায় ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। তাছাড়া আমি তো তোকে খুব ভালো করে চিনি, এই রকম একটা ঘটনা শুনলে তুই নিজেই মানসিক ভাবে ভেঙে পরতি। যে আঘাত আমি পেয়েছি সেটা ইচ্ছেকৃত তোকে দিব এতটা নিষ্ঠুর আমি নয়।”

মেঘ ভরাট কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
” তারপর কি বিয়ে ভেঙে গেছে? ”

“আমি ভেঙে দিয়েছি যার কারণে আম্মু মামার বাড়িতে গেলে এখনও অনেক কথা শুনতে হয়। ওনাদের নজরে ওনাদের ছেলে একদম নিষ্পাপ, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও তারা না দেখার মতো আচরণ করে। তাই আমি নিজেকে অপকৃষ্ট মেনে নিয়েই মামার বাড়ির সাথে যোগাযোগ বন্ধ করেছি। ”

“বাসায় কেউ কিছু বলে নি?”

“আমার বাসার মানুষ সবটায় জানে বরং ঐ সময়টাতে আপু আর আম্মু ই আমাকে সাপোর্ট করেছে। তাছাড়া আব্বু আগে থেকেই এই সম্পর্কে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। ”

মেঘ শীতল স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“তুই কি ওনাকে এখনও মিস করিস?”

বন্যা মেঘের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে বলল,
” প্রয়োজনে দূর্বাঘাসে ফাঁ* স নিবো তবুও দুশ্চরিত্রা ব্যাটাকে মিস করবো না। ”

মেঘ আর বন্যা দুজনেই হাসছে৷ এরমধ্যে মীম পেছন থেকে শক্তপোক্ত গলায় বলে উঠল,
“বন্যাপু তুমি দূর্বাঘাসে ফাঁ *স নিবা কেনো?”

মেঘ আর বন্যা দু’জনে একসঙ্গে ঘুরে তাকালো। বন্যা হেসে বলল,
“আরে মজা করছিলাম।”

মীম বলল,
“আম্মু তোমাদের ডাকছে, চলো।”

তিনজনই একসঙ্গে নিচে আসছে। বন্যা সচরাচর মেঘদের বাসায় আসে না। হঠাৎ আসলে তার জন্য বাহারি নাস্তার আয়োজন করা হয় আজও তার ব্যতিক্রম হয় নি। বন্যা অল্প নাস্তা করে মেঘের সাথে সোফায় বসে গল্প করছে এমন সময় তানভির বাসায় আসছে৷বন্যাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে সোজা নিজের রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল। কয়েকটা সিঁড়ি উঠতেই মেঘ ডাকল,
” ভাইয়া।”

তানভির আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
“বল।”

“খেয়েছো কিছু?”

“না।”

“খেতে দেয়?”

“নাহ। খিদে নেই।”

তানভির যথারীতি উপরে চলে গেছে। বন্যা ভ্রু কুঁচকে ভারী কন্ঠে বলল,
“তোরা এসব কিভাবে সহ্য করিস?”

“কিসব?”

“এত অনিয়ম।”

মেঘ স্বাভাবিক স্বরে বলল,
“আসলে এখন তুই আছিস যে তাই লজ্জা পেয়েছে। ”

বন্যা দৃঢ় কন্ঠে শুধালো,
” তোর ভাই লজ্জাও পায়?”

মেঘ কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ ফেলে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” তোর কি আমার ভাই কে ছ্যাঁচড়া মনে হয়?”

বন্যা রাশভারি কন্ঠে বলল,
” আমার ভুল হয়ে গেছে। তোর ভাইকে নিয়ে কথা বলে বড্ড অন্যায় করে ফেলছি। আমায় মাফ করে দে।”

মেঘ মুচকি হেসে বলল,
” করতে পারি তবে একটা শর্তে। ”

“কি শর্ত?”

“তুই আমার ভা…”
এটুকু বলেই মেঘ থেমে গেছে। ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে বলল,
“কিছু না। ”

বন্যা আরও কিছুক্ষণ গল্প করে বেড়িয়ে গেছে। মেঘ উপরে যেতেই তানভির ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“বন্যা কোথায়?”
“চলে গেছে। ”

তানভির আস্তে করে বলল,
“আমায় ডাকতে পারতি, এগিয়ে দিয়ে আসতাম।”

মেঘ মৃদুস্বরে বলল,
” আমি বন্যাকে বলেছিলাম কিন্তু ও বারণ করলো।”

“ওহ।”

মেঘ চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে আবারও থমকে দাঁড়ালো। বন্যার সামনে মেঘ কিছু না বললেও বন্যাকে ভাবি বানানোর সুপ্ত ইচ্ছে এখনও মেঘের মনে বর্তমান৷ তানভিরের অভিব্যক্তি বুঝার জন্য মেঘ ধীর কন্ঠে বলল,
“ভাইয়া জানো, বন্যার মনটা আজ ভীষণ খারাপ। ”

তানভির ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
” কেনো?”

মেঘ জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে বুকে সাহস নিয়ে বলল,
“বন্যাকে একটা ছেলে খুব কষ্ট দিয়েছে।”

তানভিরের সহসা কপাল গুটিয়ে সূক্ষ্ণ নেত্রে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
” ছেলের নাম কি? করে কি?”

“নাম ঠিকানা জানি না। বন্যার মামাতো ভাই। ওদের মধ্যে বিয়ের কথাও হয়েছিল৷ তারপর জানতে পারছে ছেলেটা ভালো না। তাই বিয়ে ভেঙে দিছে। ”

তানভির গুরুগম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
” কবে ভাঙছে?”

মেঘ আনমনে বলল,
“৩-৪ বছর আগে। ”

তানভির বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,
“৪ বছর আগের ঘটনায় আজ মন খারাপ করার কি আছে? অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে জীবনে এগোবে কেমন করে?”

মেঘ মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে বলল,
” আমাকে আজ ই শেয়ার করেছে। ”

তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
” ৪ বছর যেহেতু তোকে শেয়ার করে নি তাহলে তোর ও বুঝতে হবে সে এই বিষয়টা ভুলে যেতে চাচ্ছে। তুই এটা নিয়ে কথা বলিস না। অতীত সবার জীবনেই থাকে, আমার জীবনেও আছে৷ তাই বলে আমি কি এখনও সেসব নিয়ে বসে আছি?”

মেঘ হুট করে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া, তুমি কি এখন কাউকে পছন্দ করো?”

তানভির চাপা স্বরে বলল,
” সময় হলে তোকে জানাবো।”

মেঘ নিঃশব্দে হেসে করিডোরে হাঁটছে আর মনে মনে ভাবছে,
” তুমি কিংবা বন্যা দুজনেই আমার খুব প্রিয় আর আমি কাউকে ঠকাবো না। তোমার অতীত যেমন বন্যাকে জানিয়েছি তেমন বন্যার অতীতও তোমাকে জানালাম। এখন তোমাদের মন পরীক্ষার পালা। তোমাদের মনে অনুভূতি জাগলেই এক করে দিব দু’জনকে। কিন্তু কিভাবে করবো? আমার আবির ভাই কই?”

মেঘের শান্ত মন আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে। অস্পষ্ট অভিমান বুকের ভেতর বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। সকাল থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত অসংখ্যবার আবিরের নাম্বারে কল দেয়।

রাতের বেলা মেঘ মীমের রুমে গেল, মীম তখন পড়ছিল। মেঘ বিছানায় হেলান দিয়ে বসে জিজ্ঞেস করল,
” আচ্ছা মীম বন্যাকে তোর কেমন লাগে?”

“বন্যাকে আপুকে আমার অনেক ভালো লাগে। এটা নতুন করে বলার কি আছে?”

মেঘ ধীর কন্ঠে বলল,
“এভাবে না। অন্যভাবে।”

মীম ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“অন্যভাবে আবার কিভাবে?”

“আমাদের ভাবি হিসেবে কেমন লাগবে?”

মীম আঁতকে উঠে বলল,
“আবির ভাইয়ার…”

মেঘ মীমের মাথায় গাট্টা মেরে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“আবির ভাই আমার।”

মীম মাথায় ঘষতে ঘষতে বলল,
“তানভির ভাইয়া?”

“হ্যাঁ।”

মীম মাথা চুলকে আনমনে ভাবছে। মেঘ ফোঁস করে উঠে বলল,
“এত কি গবেষণা করছিস?”

মীম চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“বন্যা আপুকে কি ভাইয়া পছন্দ করবে?”

মেঘ মৃদুস্বরে বলল,
“জানি না রে। তবে আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা হতেও পারে।”

মীম উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
“হলে খুব ভালো হবে আপু। বন্যা আপুকে আমার খুব ভালো লাগে। কত সুন্দর করে কথা বলে, আমাদের সাথে মিশে তাছাড়া ভাইয়ার পাশে দুজনকে মানাবেও ভালো।”

★★★★★

আবির বাসায় নেই এক সপ্তাহ হতে চললো৷ বাড়ির পরিবেশ থমথমে। কেউ কারো সাথে তেমন কথা বলে না, সবার ভেতরেই চাপা কষ্ট লুকিয়ে আছে। বিকেল দিকে হালিমা খান সোফায় বসে ছিলেন ওনাকে দেখে মালিহা খানও এসে বসলেন। হালিমা খানকে এক পলক দেখে শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

“তোর কি শরীর খারাপ? ”

হালিমা খান মলিন হেসে জবাব দিলেন,
” মনটা খুব খারাপ। আবির এখনও বাসায় ফিরছে না। কোথায় আছে কি অবস্থায় আছে আল্লাহ ভালো জানেন।”

মালিহা খান শ্বাস ছেড়ে ভারী কণ্ঠে বললেন,
” ওদের বাবা ছেলের কর্মকাণ্ডে আমি আর কুলাতে পারছি না। মেঘের আব্বু যেভাবে রাগ দেখায়, আবিরের আব্বুও তেমন রাগ দেখায়। কেউ কিছু বুঝার চেষ্টা করে না। ছেলেটা এসব কত সহ্য করবে।”

হালিমা খান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“মেঘের আব্বু কিছুদিন যাবৎ রাতে ঘুমায় ই না। সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা করে। যত বন্ধু আর পরিচিত মানুষ আছে সবাইকে কল দিয়ে আবিরের কথা জিজ্ঞেস করে। ”

মালিহা খান মলিন হেসে বললেন,
” মেঘের আব্বুকে তো আমি চিনি। রাগ দেখানোর সময় কোনো কিছু ভাববে না অথচ পরে নিজেই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা করবে। অন্যদিকে আবিরের আব্বু সম্পূর্ণ উল্টো। ওনার নিয়ম নীতির বাহিরে গেলেই ওনার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। ছেলে, বউ,ভাই-বোন কিছুই দেখে না। সেদিন মেঘের আব্বু চিল্লাচিল্লি করার পরও আবির বেশ শান্ত ছিল কিন্তু হুট করে ওর আব্বু যখন শুরু করলো তখন আর সহ্য করতে পারলো না। ”

হালিমা খান অনেকটা সময় নিশ্চুপ থেকে মালিহা খানের দিকে এক পলক তাকিয়ে নীরবতা ভেঙে বললেন,
“আফা, একটা কথা বলি?”

মালিহা খান ভ্রু কুঁচকে বললেন,
” কথার মধ্যে মাপামাপি কবে থেকে শুরু করলি? বল কি বলবি। ”

হালিমা খান কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেলেন সহসা মৃদু হেসে বললেন,
“না থাক। কিছু না।”

“কি বলতে চাইছিলি বল ”

” বাসার নিয়ম নীতি ভুলে অলীক কল্পনায় ডুবে ছিলাম। যা কখনো সম্ভব না তা নিয়ে ভেবেছিলাম। ”

ঢোক গিলে শান্ত স্বরে আবারও বললেন,
“রাতে কি রান্না করবো?”

এরমধ্যে আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খান বাসায় ফিরেছেন। মালিহা খান বসা থেকে উঠতে উঠতে আচমকা মেঘ হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নামছে, চোখ মুখ লাল টকটকে হয়ে আছে। পেছন থেকে তানভির ডাকছে,
“বনু শুন। কি হয়েছে বল আমাকে।”

মেঘের হাতে তানভিরের ফোন। মেঘ নামতে নামতে আলী আহমদ খান ও মোজাম্মেল খান মেঘের সামনে হাজির। মোজাম্মেল খান গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
” কি হয়েছে তোর ?”

তানভির বলতে বলতে নামছে,
“কে কল দিছিলো বলবি তো?”

আব্বুকে দেখেই তানভিরের গতি কমে গেছে। সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়েছে। তানভিরের পড়নে লুঙ্গি আর গলায় একটা গামছা ঝুলানো, সম্পূর্ণ শরীর ভেজা। আব্বু আর বড় আব্বুকে দেখেই তানভির গামছা দিয়ে মাথা মুছতে শুরু করেছে। একটু আগে মেঘ আবিরের খোঁজ নিতে তানভিরের রুমে গিয়েছিলো। তানভির ওয়াশরুমে থাকায় কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে নি। হঠাৎ তানভিরের ফোনে কল বাজতে শুরু করে। মেঘ উচ্চ স্বরে ডাকে,
“ভাইয়া, তোমার ফোনে কল আসতেছে। ”

” দেখ, কে কল দিয়েছে। ”

মেঘ ফোনের স্ক্রিনে তাকায়। অপরিচিত নাম্বার দেখে তেমন পাত্তা দেয় নি। একবার রিং বন্ধ হয়ে গেছে। মেঘ দরজা পর্যন্ত যেতেই আবারও কল বাজতেছে। ওয়াশরুম থেকে তানভির বলছে,
“রিসিভ করে বল আমি ব্যস্ত।”

মেঘও যথারীতি কল রিসিভ করে বলতে নিলো,
“ভাইয়া ব্য..”

এটুকু বলতেই ওপাশ থেকে সুপরিচিত কন্ঠস্বর ভেসে আসলো,
“তানভির, আমি আবির। ”

মেঘ আর আবির দুজন একসঙ্গে কথা বলে অকস্মাৎ দু’জনই থেমে গেছে। মেঘ উত্তপ্ত কন্ঠে ডেকে উঠলো,
“আবির ভাই। ”

ততক্ষণে আবির কল কেটে দিয়েছে। এমন সময় তানভিরও ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে। মেঘের হাতের কম্পন দেখে ধীর কন্ঠে শুধালো,
“কে কল দিছিলো?”

মেঘ উত্তর না দিয়েই রুম থেকে দৌড়ে বেড়িয়ে আসছে।

মেঘের চোখ মুখ দেখে আলী আহমদ খান প্রশ্ন করলেন,
” কিছু হয়েছে? ”

মেঘ অতর্কিতে ভেঁজা কন্ঠে বলে উঠল,
” এইমাত্র ভাইয়ার ফোনে আবির ভাই কল দিয়েছিল। আমার কন্ঠ শুনে কল কেটে দিয়েছে। ”

তানভির ভারী কন্ঠে শুধালো,
“কি? ভাইয়া কল দিয়েছিল?”

আলী আহমদ খান সহ সবাই তানভিরের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তানভির সবাইকে এক পলক দেখে সহসা বললো,
“আমার সাথে ভাইয়ার সত্যিই যোগাযোগ নেই। আমি জানি না কিছু।”

তানভির নেমে এসে মেঘের হাত থেকে ফোন নিয়ে নাম্বার টা চেক করতে লাগলো। মেঘ দুই সিঁড়ি উঠে তানভিরের ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। তানভির কল ডিটেইলস বের করে মেঘকে উদ্দেশ্য করে বলল,

” দেখ তো আমার সাথে কথা হয়েছে কি না। তাছাড়া আমার সাথে যদি ভাইয়ার যোগাযোগ থাকতো ই তাহলে আমি এত খোঁজাখুঁজি কেনো করতাম?”

আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে বললেন,
“তোমার সাথে আবিরের যোগাযোগ আছে কি নেই সেটা আমার জানার প্রয়োজন নেই। তুমি এই মুহুর্তে আমাদের সামনে আবিরকে কল দিবা। ”

তানভিরের হাত কাঁপছে, ভয়ে ভয়ে ডায়াল করল সেই নাম্বারে। মোজাম্মেল খানের কথা মতো কল লাউডস্পিকারে দিয়েছে। প্রথমবার কল রিসিভ হয় নি। দ্বিতীয়বার কল রিসিভ করে আবির গুরুভার কন্ঠে বলল,
” কিছু বলবি?”

আবিরের কন্ঠস্বর শুনেই মেঘের বুক কাঁপছে, দু চোখ ছলছল করছে। আব্বু, বড় আব্বু, আম্মুরা সামনে দাঁড়ানো। তাই বার বার ঢোক গিলে মেঘ নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে৷ তানভির সহসা বললো,
“ভাইয়া, কোথায় তুমি?”

তানভিরের কন্ঠ শুনে আবির কিছুটা থতমত খেলো। কয়েক মুহুর্ত পর দৃঢ় কন্ঠে উত্তর দিল,
” আছি। ”

আলী আহমদ খান অত্যন্ত গুরুতর কন্ঠে বলে উঠলেন,
” ও কে বলে দাও, যেখানেই আছে আজকের মধ্যে বাসায় ফিরতে। প্রজেক্টের দায়িত্ব যেমন নিয়েছে সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনও তাকেই করতে হবে। রাগ,জেদ দেখিয়ে আমার কোম্পানির ক্ষতি করবে তা আমি কখনোই সহ্য করবো না। ”

তানভির শক্ত কন্ঠে বলল,
“শুনেছো?”

“হ্যাঁ।”

মোজাম্মেল খান এবার রাশভারি কন্ঠে বললেন,
” শুধু শুনলেই হবে না। যেখানেই আছো রাত ১০ টার মধ্যে বাসায় আসবে। ”

“আচ্ছা। ”

আলী আহমদ খান ও মোজাম্মেল খান নিজেদের রুমে চলে গেছেন। মালিহা খান আর হালিমা খান তানভিরের ফোন নিয়ে হাহাকার শুরু করে দিয়েছেন। মেঘ সিঁড়ির সাথে ঠেস দিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবিরের সাথে কথা শেষ করেই মালিহা খান নিজের রুমে গেলেন। আলী আহমদ খান বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। মালিহা খান কপট রাগ দেখিয়ে বললেন,
” ছেলেটা রাগ করে বাসা থেকে চলে গেছে, এক সপ্তাহ ধরে বাসায় ফিরছে না। তার সাথে আপনার এই ব্যবহার টা না করলে হতো না? ”

আলী আহমদ খান রাশভারি কন্ঠে বললেন,
” শুনো, সে কোম্পানির দায়িত্বে আছে মানে এই নয় যে আমি আমার নিয়ম নীতি থেকে সরে যাব। তোমার ছেলে অফিসে মেইল করেছে। কিন্তু সে হয়তো জানে না আমার অফিসে মেইলের মাধ্যমে নেয়া ছুটির পরিমাণ মাত্র তিনদিন৷ এর বেশি ছুটি লাগলে সশরীরে উপস্থিত থেকে আবেদন করে তারপর নিতে হয়। কিন্তু তোমার ছেলে সেই কাজ করে নি। তারপরও আমি আরও তিনদিন ছাড় দিলাম। কিন্তু সে নিজে দায়িত্ব নিয়ে যে প্রজেক্টগুলো শুরু করেছে, সেগুলোর কি হবে? প্রজেক্ট নেয়ার সময় যেমন রাগ, জেদের কথা মনে ছিল না, প্রজেক্ট শেষ করার ক্ষেত্রে আমিও এখন তার রাগ, জেদকে প্রাধান্য দিতে পারবো না। ”

“সারাজীবন শুধু ব্যবসা আর নিয়মনীতি ই করলেন। কখনো ছেলেটার সাথে একা বসে পাঁচ মিনিট কথা বলেছেন? ছেলেটা কি চায় না চায় জানতে চেয়েছেন?”

আলী আহমদ খান ভ্রু কুঁচকে শীতল চোখে তাকিয়ে ঈষৎ হেসে বললেন,
“তুমি তো মা। তোমার কাছে কখনো কিছু চেয়েছে?”

মালিহা খান ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,
“নাহ।”

“তাহলে বুঝো কেমন ছেলে তোমার।”

মালিহা খান হালকা রাগী স্বরে বললেন,
“আপনার জন্যই তো এমন হয়েছে।”

আলী আহমদ খান স্ব শব্দে হেসে বললেন,
” মন মতো কিছু হলেই আমার দোষ নাকি?”

মালিহা খান রেগেমেগে রুম থেকে বেড়িয়ে গেছেন।খান বাড়ির মানুষদের মন বুঝা দুষ্কর, এই ভালো এই খারাপ। মালিহা খান আবিরের পছন্দ মতো খাবার রান্না করতে ব্যস্ত। মেঘ সোফায় বসে আছে, সামনে টিভি চলছে তবে মেঘের নজর মেইন গেইটে। অনেকক্ষণ পর আবির বাসায় আসছে। আবিরকে দেখেই মেঘ টিভি বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়েছে। মালিহা খান রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে আসছেন। আবির আম্মুর সাথে কথা বলার ফাঁকে মেঘকেও এক পলক দেখে নিলো। মেঘও নিরেট দৃষ্টিতে আবিরকে পরখ করছে৷ এই এক সপ্তাহেই আবিরের মুখটা শুকিয়ে গেছে, চোখগুলো ফুলা ফুলা। আবির বেশি কথা না বলেই ফ্রেশ হতে উপরে চলে গেছে। কিছুক্ষণ পর নিচ থেকে আলী আহমদ খান ডাকলেন, আবির নিচে আসতেই আলী আহমদ খান জিজ্ঞেস করলেন,
“কোথায় গিয়েছিলে?”
” কাছেই। ”
“কেনো?”
“কাজ ছিলো।”

আলী আহমদ খান গম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন,
” নিজেকে কি মনে করো তুমি? ”

আবির মৃদু হেসে বলল,
“আপাতত আপনার অযোগ্য সন্তান। ”

“মজা করতেছো?”

আবির তপ্ত স্বরে বলল,
“সরি আব্বু,আপনার সাথে মজা করার মতো যোগ্যতা আমার নেই।”

” তা এই এক সপ্তাহে কি নিরীক্ষণ করলে?”

“নিজের আদতে লাগাম দেয়া। আমার ব্যবহারে আপনারা কষ্ট পেয়ে থাকলে অনুগ্রহ করে আমাকে মাফ করবেন৷ আর তিনটা প্রজেক্ট এর কাজ মোটামুটি শেষ, আগামী তিনদিনে সম্পূর্ণ কমপ্লিট হয়ে যাবে ”

“আলহামদুলিল্লাহ। ”

মোজাম্মেল খান ভারী কন্ঠে বললেন,
” ভাইজান তোমার মাথা কি ঠিক আছে? ছেলেটা এক সপ্তাহ পরে বাসায় ফিরেছে। কোথায় আগে খাওয়া দাওয়া করাবে তা না ব্যবসা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছো৷ ”

মোজাম্মেল খান আবিরের কাঁধে হাত রেখে শান্ত স্বরে বললেন,
“তোমার আব্বুর কথায় কিছু মনে করো না। চলো, খাবে চলো। ”

আবির ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে বলল,
“সরি চাচ্চু৷ সেদিন আপনার সাথে ঐরকম ব্যবহার করা আমার একদম ই উচিত হয় নি। প্লিজ কিছু মনে রাখবেন না। ”

“দূর বোকা ছেলে। তুমি আমার সন্তান সমতুল্য। সন্তানরা ভুল করবে এটায় স্বাভাবিক। যা হয়েছে সব ভুলে যাও। চলো খাবে এসো।”

মেঘ আর মীম ড্রয়িং রুমের এক কর্ণারে দাঁড়িয়ে সব দেখছে৷ তানভির বাসায় নেই, ফিরতে একটু দেরি হবে বলেছে। ইকবাল খান দুদিন হলো সিলেট গেছেন। আদিও ঘুমিয়ে পরেছে। খাবার টেবিলে এখন আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান, আবির, মীম আর মেঘ। মেঘ আবিরের বিপরীতে বসায় স্বাভাবিক ভাবেই বার বার আবিরের দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু আবির প্রতিবার নিজের নজর সরিয়ে নিচ্ছে। আবিরের কর্মকাণ্ডে মেঘ একদিকে যেমন বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে আব্বুর আচরণে বেশ অবাকও হচ্ছে। আলী আহমদ খান আজ অল্প বিস্তর রাগ দেখালেও মোজাম্মেল খান একবারের জন্য মুখ কালো করেও কথা বলেন নি৷ মেঘ খাবার শেষ করে এক মুহুর্ত দেরি না করেই নিজের রুমে চলে গেছে। বন্যাকে কল দিয়ে আবিরের ফেরার কথা বলেছে তারপর ফোন রেখে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে কিছু ভাবছে। আচমকা পেছন থেকে আবির ডাকলো,

“ম্যাম”

মেঘ আঁতকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো তবে কিছুই বললো না। আবির আবারও বলল,

” নিজেকে কষ্ট দেয়া ছাড়া আপনার আর কোনো কাজ নেই তাই না?”

মেঘ আড়চোখে আবিরকে খানিক দেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” নাহ।”

আবির মলিন কন্ঠে বলল,
” ভালো।”

মেঘ নিরেট কন্ঠে বলতে শুরু করল,
” বাসা থেকে চলে যাওয়ার আগে কেউ কি একবারের জন্য আমার কথা ভেবেছিল? আর যাওয়ার পরও একটা বারের জন্য কল দিয়ে নিজের অবস্থা জানানোর প্রয়োজন মনে করলো না৷ এত নিষ্ঠুর কিভাবে হয় মানুষ? ”

আবির তপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কেমন আছেন? ”

“বেঁচে আছি।”

আবির মলিন হেসে বলল,
” ঠিক আছে। ”

আবির চলে যেতে নিলেই মেঘ আবারও ডাকলো,
“আবির ভাই”

আবিরের চিরচেনা জবাব,
“হুমম।”

তবে আজ উত্তরে তেমন প্রাণ নেই। মেঘ ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
” আপনি কোথায় ছিলেন?”

“ছিলাম কোনো এক জায়গায়। ”

মেঘ হঠাৎ ই ভেঁজা কন্ঠে বলে উঠল,
“এক সপ্তাহ নিখোঁজ হয়ে কিভাবে ছিলেন আপনি ? আমি আপনাকে কতশত বার কল দিয়েছি। আর একটু হলে ম*রেই যেতাম। ”

আবির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মনমরা হয়ে বলল,
” এক সপ্তাহে ই এত ক্লান্ত হয়ে পরেছেন? মনে জোর না থাকলে সামনের ঝড়টা কিভাবে সামলাবেন, ম্যাম?”

#চলবে

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৮০
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

আবিরের কথা শুনে মেঘের কোমলপ্রাণ হৃদয় মুষড়ে উঠলো, সহসা উদাস চোখে তাকালো আবিরের পরিশ্রান্ত ধৃষ্টতায়। আবিরের দুচোখ বন্ধ, ব্যর্থতার গ্লানি মুখে ফুটে উঠেছে। কোনো এক অজ্ঞাত ক্লেশে আবিরের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে। মেঘ রাশভারি কন্ঠে বিড়বিড় করল,
“আপনি পাশে থাকলে আমি সব ঝড় নিরবে সয়ে যাব।”

আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ খুললো। একপলক মেঘের দিকে তাকিয়ে কোমল কন্ঠে বলল,

“নগর জুড়ে বৃষ্টি নামুক, আমায় সুরে ভাসিয়ে ফেলুক। তবুও সহিষ্ণুতায় তোকে পরিপূর্ণ রাখুক।”

আবির মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে। মেঘ মুখ ভার করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে রইলো। সময় যত এগুচ্ছে পরিস্থিতি ততই বেসামাল হচ্ছে। মনের আড়ালে জমে থাকা সুপ্ত অনুভূতিগুলো বি*ষা*ক্ত হতে শুরু করেছে।

সপ্তাহ কেটে যাচ্ছে, আবিরের ভাব-গতিকে এসেছে বিশাল পরিবর্তন। বাসায় ফেরার পর থেকে আবির একদম নিশ্চুপ হয়ে গেছে। আব্বু, চাচ্চুদের সাথে কোনো প্রকার কথা বলে না। এমনকি ঠিকমতো বাসায়ও ফিরে না। তিনটা প্রজেক্ট শেষ হয়েছে বাকি দুটার কাজ একা হাতে সামলাচ্ছে। কখনো রাত ২-৩ টায় বাসায় ফিরে কখনো বা ফিরেও না। মেঘ দিনে কয়েকবার করে কল দিয়ে আবিরের খোঁজ নেয় তবে ইদানীং আবির মেঘের সাথেও তেমন কথা বলে না। সবসময় দায়সারা ভাব নিয়ে কথা বলে। মেঘ কিছু জিজ্ঞেস করলে শুধু উত্তর দেয়, নিজ থেকে কিছুই বলে না৷ মেঘও কিছুদিন যাবৎ বিষয়টা খেয়াল করছে। আবিরকে জিজ্ঞেসও করেছে কিন্তু আশানুরূপ কোনো উত্তর পায় নি। আবিরের নিস্তব্ধতা আর সহ্য করতে পারছে না মেয়েটা । মোজাম্মেল খানও ইদানীং আবিরের সাথে বেশ শান্ত স্বরে কথা বলেন। কিন্তু আলী আহমদ খানের মনে আবিরের প্রতি ক্ষোভের অন্ত নেই।

আজ সকালে খাবার টেবিলে সবার উপস্থিতিতে আলী আহমদ খান আবিরকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,
” তোমার যে আগামীকাল ফ্লাইট এটা কি সবাই জানে?”

বড় আব্বুর মুখ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে মেঘ অতর্কিতে
চোখ বড় করে তাকালো। আবির এক নজর মেঘকে দেখে গম্ভীর স্বরে বলল,
“নাহ। বলা হয় নি এখনও।”

মালিহা খান কথাটা শুনামাত্রই রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে আসতে আসতে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কিসের ফ্লাইট? ”

আলী আহমদ খান মেকি স্বরে বললেন,
“কেনো তোমার আদরের ছেলে তোমাকে কিছু জানায় নি?”

মালিহা খান ভারী কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,
“আবির, কিছু বলছিস না কেনো?”

আবির মাথা নিচু করে গাম্ভীর্যের স্বরে জবাব দিল,
” একটা প্রজেক্টের কাজে কয়েকমাসের জন্য দেশের বাহিরে যেতে হবে।”

অপ্রত্যাশিত বাক্য কর্ণকুহরে প্রবৃত্ত হওয়া মাত্রই মেঘের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, আঁখি যুগল পূর্বের তুলনায় আরও বেশি প্রশস্ত হয়ে গেছে। বুকের ভেতর কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়েছে৷ মনে হচ্ছে, মেঘের হৃদয়ের উষ্ণ অনুভূতিরা মেঘের গলা চেপে ধরেছে, নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। বুকের ভেতরের তোলপাড় চোখে মুখে ফোটে উঠতে বেশি সময় লাগলো না। মেঘের দৃষ্টি নিরেট, চোখে নেই কোনো লুকোচুরি, ভ্রু যুগল কুঁচকে আছে। দৃষ্টি জুড়ে আহাজারি, দুচোখ ছলছল করছে। মালিহা খান আর্তনাদ করে উঠলেন,

” পড়াশোনার নাম করে ৭ টা বছর দূরে ছিলি কিচ্ছু বলি নি আমি। আর সহ্য করতে পারবো না, কোথাও যাবি না তুই।”

মালিহা খান আলী আহমদ খানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
” আপনারা কি শুরু করেছেন? ব্যবসার নাম করে প্রতিনিয়ত আমার ছেলেটার সাথে যা তা আচরণ করছেন। আমার ছেলে কোথাও যাবে না। টাকা পয়সার প্রয়োজন নেই, আমি চাই আমার ছেলে আমার চোখের সামনে থাকুক।”

আলী আহমদ খান রাশভারি কন্ঠে বললেন,
” আমি তোমার ছেলেকে জোর করি নি, তোমার ছেলে নিজে বুঝে শুনে প্রজেক্ট নিয়েছে। তাছাড়া এই সিদ্ধান্ত আরও ৪-৫ মাস আগেই নেয়া হয়েছে। তোমার ছেলে বাসায় কাউকে বলতে বারণ করেছিলো তাই বলি নি। আগামীকাল ফ্লাইট এজন্য বাধ্য হয়ে বলতে হচ্ছে। ”

মালিহা খান রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠলেন,
” তোর আব্বু কি বলছে আবির? ”

আবির মায়ের হাতে হাত রেখে শীতল কণ্ঠে বলল,
” মাত্র কয়েক মাসের ব্যাপার আম্মু। এবার তোমার অপেক্ষা দীর্ঘ হবে না,কথা দিচ্ছি।”

আবিরের ভেজা কন্ঠের কথা শুনেও মালিহা খান নিজেকে সামলে নিতে পারলেন না৷ কান্নারত কন্ঠে বললেন,
” তোদের যা ইচ্ছে কর। আমি আর কিছুই বলবো না। ”

মালিহা খান নিজের রুমে চলে গেছেন। হালিমা খান আর আকলিমা খানও সেদিকেই ছুটলেন। সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে মালিহা খানের রুমের দিকে তাকিয়ে আছে অথচ মেঘের নজর আবিরের অভিমুখে। আশপাশের ভ্যাপসা গরমে মেঘের শরীর ঘেমে যাচ্ছে তবুও ভাতের প্লেটে হাত রেখে নিস্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছে। আবির মেঘকে দেখে সেকেন্ডের মধ্যে চোখ নামিয়ে নিয়েছে। গত এক সপ্তাহ যাবৎ আবির মেঘের চোখে চোখ রাখে না, সামনাসামনি দেখা হলেও মাথা নিচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তাছাড়া যথাসম্ভব বাসা থেকে দূরেই থেকেছে। আজও আবির সেই চোখে তাকাতে পারছে না। ঐ দুচোখে তাকালেই আবির বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। যখন থেকে প্রজেক্ট বিষয়ে কথা হয়েছে তখন থেকেই আবির মেঘকে অল্প বিস্তর বুঝাতে শুরু করেছে। সরাসরি না বললেও কৌশলে অনেকবার ই বুঝিয়েছে। যেই মিনহাজের প্রতি আবিরের এক রাশ আক্রোশ ছিল, যারা মেঘের আশেপাশে ভিড়লেও আবিরের মেজাজ গরম হয়ে যেতো সেই মিনহাজদের সাথে জোরপূর্বক মেঘের সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করেছে। যাতে আবিরের অবর্তমানে নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে না হয়। মেঘকে সর্বক্ষণ সহিষ্ণু আর ধৈর্যের কথায় বলে এসেছে।

আলী আহমদ খান হঠাৎ ভণিতা না করেই জিজ্ঞেস কেন,
” আবির, তুমি কি কোনো বিষয়ে কিছু বলতে চাও?”

আবির সটান দাঁড়িয়ে চোয়াল শক্ত করে জবাব দিল,
” নাহ, আমার কিছুই বলার নেই। ”

আবির বেসিন থেকে হাত ধৌয়ে সরাসরি আম্মুর রুমে চলে গেছে। একে একে সবাই খাওয়া শেষ করে উঠে যাচ্ছে অথচ মেঘ তখনও থম মেরে বসে আছে। মেঘের নিরবতায় চারপাশ স্তব্ধ হয়ে আছে। তানভির এক পলক মেঘকে দখে কিছু না বলেই উঠে গেছে। মীম দু-তিন বার মেঘকে ডেকেছে কিন্তু মেঘ পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। এতক্ষণ যাবৎ বুকের ভেতরে যে তোলপাড় চলছিল এখন তার ছিটেফোঁটাও বাহিরে প্রকাশ পাচ্ছে না। ছলছল করা দু চোখের পানি শুকিয়ে গেছে, গলায় আঁটকে যাওয়া নিঃশ্বাসটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে গেছে।
আবির, আলী আহমদ খানরা সবাই অফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেছে। মেঘ নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে সেই যে দেয়াল ঘেঁষে বেলকনিতে বসেছিল সারাদিনে এক ইঞ্চিও নড়ে নি৷ সূর্যের প্রখর উত্তাপ নিরবে সহ্য করে নিয়েছে আর মনে মনে আবিরের কথা ভাবছে। আবির বলেছিল, “কাউকে অনেক বেশি সহিষ্ণু হতে হবে।” মেঘ সেদিনই কোনো এক ঝড়ের আশঙ্কা করেছিল তবে সেই ঝড় টা যে তাকে প্রস্তরে পরিণত করে ফেলবে সেটা বুঝতে পারে নি। মেঘের ফোনে একের পর এক কল বাজতেছে, মীম কিছুক্ষণ পর পর দরজায় এসে ডাকছে কিন্তু মেঘ বেলকনি থেকে একবারের জন্যও উঠছে না। সরাসরি রোদের প্রখরতা কখনই সহ্য করতে পারে না মেয়েটা, অল্পতেই মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায় অথচ আজ দিব্যি ঘন্টার পর ঘন্টা বসে আছে৷ মাথা ব্যথা অনুভব করার মতো শক্তি পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই। রুমে এসে ফোন হাতে নিতেই দেখলো আবিরের নাম্বার থেকে অনেকগুলো কল আসছে। অন্য সময় আবিরের নাম্বার থেকে একটা কল আসলেই আনন্দে মেঘের মন নেচে উঠতো অথচ আজ এতগুলো কল আসার পরও চোখে কোনো উজ্জ্বলতা নেই, শুকনো ঠোঁটে হাসির রেশ মাত্র নেই৷ কান্নায় মেঘের বুক ভেঙে আসছে তবুও কাঁদতে পারছে না। এমন সময় আবির আবারও কল দিয়েছে। মেঘ কাঁপা কাঁপা হাতে রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে আবিরের হুঙ্কার আসলো,
” তুই কি আমাকে বাঁচতে দিবি না?”

আবিরের এমন হুঙ্কারে মেঘ অপ্রস্তুত হয়ে গেছে। দীর্ঘসময় নিশ্চুপ থাকায় মেঘের গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। আবির গম্ভীর কণ্ঠে আবারও বলল,
” আমি মা*রা গেলে শান্তি পাবি?”

মেঘ গলা খাঁকারি দিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো,
” বাজে কথা বলবেন না, প্লিজ। ”

আবির নিচু স্বরে বলল,
“এতগুলো কল দিলাম একবারের জন্য রিসিভ করার প্রয়োজন মনে করলি না। এটা কি ঠিক?”

মেঘ আমতা আমতা করে বলল,
” ফোনের কাছে ছিলাম না। ”

“কোথায় ছিলি?”

মেঘ নিশ্চুপ। আবির কিছুক্ষণ নিরব থেকে আবারও প্রশ্ন করলো,
” দুপুরে খেয়েছিস?”

“নাহ।”

আবির শক্ত কন্ঠে বলল,
” তোকে ১ ঘন্টা সময় দিচ্ছি এরমধ্যে যাবতীয় কাজ শেষ করে একেবারে রেডি হয়ে বাসা থেকে বের হবি। আমার যেন অপেক্ষা করতে না হয়।”

মেঘ ভণিতা ছাড়াই বলল,
“আমি বের হবো না।”

আবির খানিকটা রাগী স্বরে বলে উঠল,
” আমি সিদ্ধান্ত চাই নি মেঘ, তোকে এক ঘন্টার মধ্যে আমার সামনে দেখছে চাইছি।”

মেঘ আর কিছুই বলতে পারলো না। তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক ঘন্টার আগেই বাসা থেকে বেড়িয়ে রিক্সায় করে রওনা দিল। বাসায় একমাত্র মীম কে বলে বেড়িয়েছে। মালিহা খান সারাদিন কান্নাকাটি করে ঘুমিয়েছেন, হালিমা খান সেখানেই বসে আছেন। আকলিমা খান আদিকে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমিয়েছেন। মেঘ কিছুটা সামনে এগুতেই আবিরকে দেখলো। মেঘকে দেখেই আবির জিজ্ঞেস করল,
” খেয়ে আসছিস?”

মেঘ উপর নিচ মাথা নাড়ালো। পশ্চিমা আকাশ সূর্যের রক্তিম আভায় ছেঁয়ে আছে, আবির যথারীতি মেঘের পাশে রিক্সাতে বসলো। ব্যস্ততম শহরে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়ার কোনো স্থান নেই। উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যে রিক্সা চলছে, কারো মুখে কোনো কথা নেই। কিছুটা নির্জন জায়গায় আবির রিক্সা থামাতে বলল। রিক্সা থেকে নেমে দু’জনেই হাঁটতে শুরু করলো।মেঘের চিবুক নামানো৷ কিছুটা এগুতেই আবির খুব ঠান্ডা গলায় বলল,
” সবাই শুনলে কষ্ট পেতো তাই আমি আগে কাউকে কিছু বলি নি। কিন্তু আমার এখন যাওয়াটা খুব প্রয়োজন। আশা করি তুই অন্ততপক্ষে বুঝবি।”

মেঘ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচু স্বরে বলল,
” প্রয়োজন হলে অবশ্যই যাবেন। ”

আবির ভ্রু কুঁচকে ব্যস্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
“তুই কি এখনও রেগে আছিস?”

মেঘ হালকা হেসে বলল,
“নাহ। ”

সামনাসামনি দুটা চেয়ারে দুজন বসেছে, দুকাপ চাও অর্ডার করেছে। আবিরের চোখ মাটিতে স্থির হয়ে আছে। মেঘের চোখের দিকে এক সেকেন্ডের জন্যও তাকাতে পারছে না। মেঘ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার কি শরীর খারাপ? ”

আবির চোখ মুখ মুছে ঠিক করে বসলো। ধীরে ধীরে এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে কাঁধ উঁচিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
” চল উঠি৷ ”

আবিরের অস্বস্তি বুঝতে পেরে মেঘ আর কিছু বলল না। কাপে তখনও অর্ধেক চা আছে, সেভাবেই কাপ রেখে দিয়েছে৷ মেঘের মন ভালো করতে বাসা থেকে বের করে এনেছিলো আবির অথচ বুকের ভেতরের হাহাকারে নিজেই অস্বস্তিতে পরে গেছে। সময় নষ্ট না করে মেঘকে নিয়ে সরাসরি শপিং করতে গেল। বেশ কয়েকটা শপ ঘুরে মেঘের জন্য একটা স্মার্ট ওয়াচ নিয়েছে। ফোনের সাথে কানেক্ট করে মেঘের হাতে পড়িয়ে দিতে দিতে গুরুভার কন্ঠে বলল,
“আজকের পর থেকে ঘুম আর গোসল ব্যতীত সর্বক্ষণ এটা পড়ে রাখবি৷ তোর অবহেলায় আমার একটা কল যদি মিস হয় তারপর বুঝাবো।”

মেঘ নীরবে চোখ তুলে তাকাতেই আবিরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় হলো। অতর্কিতেই আবির নিজের চোখ নামিয়ে নিয়েছে। মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলল,
” ওখানে গেলে কি আপনার আমার কথা মনে থাকবে?”

আবির চটজলদি বলে উঠল,
“মনে থাকবে না কেনো?”

মেঘ উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুড়লো,
” বাসায় যাব না?”

আবির ভ্রু কুঁচকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
” কেবল আজকের রাতটায়, কাল থেকে হুটহাট জোর করার মতো কেউ থাকবে না৷ তুই তোর মতো থাকতে পারবি। ”

মেঘ চোখ গোল গোল করে তাকালো ততক্ষণে আবির সামনে চলে গেছে, মেঘও পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলো৷ টুকিটাকি কেনাকাটা শেষে বেড়িয়েছে। আজ কারো মুখেই তেমন কোনো কথা নেই। অনেকটা সামনে এগুতেই দেখলো মেলা চলছে। সন্ধ্যার পর পর রাস্তায় বেশ ভিড় জমেছে। আবির মেঘের ডানহাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে। মেঘ উদাস ভঙ্গিতে আশপাশের মানুষজন দেখছে, কত কত কাপল ম্যাচিং শাড়ি পাঞ্জাবি পড়ে ঘুরছে, একসঙ্গে বসে খাচ্ছে। এসব দেখে মেঘের বুক খুঁড়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেড়িয়ে আসলো। আচমকা তাকালো হাতের দিকে। নিজের অজান্তেই মুচকি হেসে বলল,
” নিয়তির নির্দয়তার নিমিত্তে এই মানুষটা
আমার হয়েও আমার নয়।”

মেঘের আনমনে আশপাশে তাকানো দেখে আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
” মেলায় যাবি?”

মেঘ ডানে বামে মাথা নেড়ে সঙ্গে সঙ্গে মুখেও বলল,
“যাব না।”

আবির মৃদু হেসে সামনে থেকে দুটা টিকিট কেটে মেঘকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। মানুষের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। আবির অতি সন্তপর্ণে মেঘকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। বাসায় এত এত কাঁচের চুড়ি থাকা স্বত্তেও মেঘ একটা দোকানে দাঁড়িয়ে নতুন ডিজাইনের কাঁচের চুড়ি দেখছে। মেঘের চুড়ির প্রতি কৌতূহল দেখে আবির খুব যত্ন সহকারে চুড়ির ভেতর তিন আঙুল ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে পরীক্ষা করে সুন্দর ডিজাইনের তিনসেট চুড়ি মেঘের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এগুলো দেখ।”

মেঘের হাতে অলরেডি সেইম ডিজাইনের এক সেট চুড়ি। আবির সেটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে বলল,
“এগুলো তোর হাতে বড় হবে। ঐগুলো পড়।”

মেঘ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে তপ্ত স্বরে বলল,
“কে বলছে বড় হবে? এগুলো ঠিকঠাক মতো লাগবে।”

আবির মলিন হেসে বলল,
” ওয়েট। ”

আবির দুই সেট চুড়ি খুলে আলতোভাবে মেঘের দু’হাতে পড়িয়ে দিচ্ছে। বড় চুড়িগুলো ডানহাতে পড়িয়েছে। মেঘ অপলক দৃষ্টিতে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির চুড়ি আগে গিফট করলেও এই প্রথমবার নিজের হাতে পড়িয়ে দিচ্ছে। চুড়ি পড়ানো শেষে মেঘ দুহাত নাড়িয়ে দেখতে লাগলো। আবিরের দেয়া চুড়ির সেট খুব সুন্দর মতো লেগেছে অন্যটা একটু বড় হওয়ায় মনে হচ্ছে খুলে পড়ে যাবে। মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
” আমার হাতে ঐ চুড়িটায় লাগবে এটা আপনি কিভাবে বুঝছেন?”

আবির দুচোখ ছোট করে হাসল। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। আশপাশে তাকিয়ে মেকি স্বরে বলল,
” থাক, এখানে কিছু না বলি। ”

আবিরের মুখে দুষ্টু হাসি দেখেই মেঘ ভ্রু কুঁচকালো। সঙ্গে সঙ্গে তাকালো দোকানের ছেলেটার দিকে, ছেলেটাও কেমন করে হাসছে। বিরক্তিতে মেঘ বলল,
“চলুন এখান থেকে।”

“আর কিছু নিবি না?”

“এই দোকান থেকে নিব না।”

ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে মন খারাপ করে বলল,
” সরি ভাবি, আমি আর হাসবো না। আপনার যা পছন্দ হয় নিন।”

অপরিচিত এক ছেলের মুখে ভাবি ডাক শুনে মেঘ অপ্রত্যাশিতভাবে তাকালো, পরপর চোখ তুলে তাকালো আবিরের মুখের পানে। আবিরের ঠোঁটে তখনও হাসি লেগেই আছে। মেঘ এক মুহুর্তের জন্য আবিরের যাওয়ার ঘটনা বেমালুম ভুলে গেল। আবিরের হাস্যোজ্জ্বল মুখের পানে তাকিয়ে নিজেও হাসলো তারপর আদুরে ভঙ্গিতে শুধালো,
“আর কি নিবো?”

আবির ওষ্ঠ যুগল আরও প্রশস্ত করে বলল,
” হায়রে মেয়ে মানুষ! এক সেকেন্ডেই সব ক্রোধ গায়েব।”

মেঘ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ঠিক আছে। চলে যাচ্ছি। ”

আবির সঙ্গে সঙ্গে মেঘের বাহু চেপে ধরে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
” এই নাহ। তোর যা ভালো লাগে সব নিতে পারিস। ”

আবিরের হাতে থাকা মেঘের বাহু দুই আঙুলে পরখ করে মেঘের হাতটা উপরে তুলে মেঘকে দেখিয়ে আবির অকস্মাৎ শক্ত কন্ঠে বলল,
” এখন যেমন রেখে যাচ্ছি ফিরে এসে যেন তেমনই পায়। এক ইঞ্চি এদিক-সেদিক হলে সোজা বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসবো।”

মেঘ ওষ্ঠ উল্টে বিড়বিড় করে বলল,
“কেনো?”

আবির নিরেট কন্ঠে বলল,
” আমার বাড়িতে কোনো কংকালের জায়গা হবে না। ”

মেঘ মুখ ফুলিয়ে আবিরের দিকে চেয়ে আছে। আবির দোকান থেকে দুটা টিকলি হাতে নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করে একটা মেঘের কপালে ধরে মৃদু হেসে বলল,
“এটা একদম ঠিকঠাক। ”

বেশ কয়েকটা আংটিও দেখে নিল। মেঘের আঙুলে পড়িয়ে পড়িয়ে দেখছে। মেঘ বিস্ময়কর দৃষ্টিতে আবিরের কর্মকাণ্ড দেখছে। আবির খুব যত্ন নিয়ে প্রতিটা জিনিস পর্যবেক্ষণ করছে। একটা মেয়ের জীবনে এর থেকে বেশি চাওয়া বোধহয় আর কিছুই হতে পারে না। স্বর্ণ কিংবা হীরার চেয়েও অধিক মূল্যবান প্রিয় মানুষের থেকে প্রাপ্ত সময়, তার মনোযোগ আর ভালোবাসা। মেলা থেকে কেনা প্রতিটা জিনিসের মূল্য অতি নগন্য অথচ মেঘের কাছে সেগুলোই খুব মূল্যবান। মেঘের জন্য কেনাকাটা শেষ করে, মীম আর আদির জন্যও মেলা থেকে কিছু কিছু জিনিস নিয়েছে। মেলা থেকে বেড়িয়ে দু’জন আবারও হাঁটতে শুরু করলো। এরমধ্যে তানভিরকে কল দিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে আসতে বলেছে। ভিড় ঠেলে আবির মেঘের হাত ধরে হাঁটছে, আবির অবশ্য রিক্সা নিতে চেয়েছিল কিন্তু মেঘের আবিরের সঙ্গে হাঁটতে খুব ইচ্ছে করছিল তাই রিক্সায় উঠে নি। এইযে আবির মেঘের হাতটা শক্ত করে ধরে আছে এতেই মেঘের বিষাদে ঢাকা মন ভালো হয়ে গেছে। কিন্তু রিক্সায় উঠলে আবারও সেই কোমল মনে বিষাদ ভরে যাবে তাই সে কোনোভাবেই রিক্সায় উঠবে না। আবির আর মেঘ একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলো। মেঘকে একটা টেবিল দেখিয়ে আবির স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“তুই একটু বস, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

আবির চলে যেতেই তিনটা মেয়ে মেঘের সামনে হাজির হলো। মেয়েগুলো দেখতে মাশাআল্লাহ বেশ সুন্দরী আবার সাজুগুজুও করেছে তবে বয়সে মেঘের থেকে অনেক বড় হবে। মেঘ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তিনটা মেয়ের মধ্যে একজন বলে উঠলো,
” তোমার পাশে ছেলেটা আবির ছিল না?”

মেঘ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিরেট কন্ঠে বলল,
“হ্যাঁ। কেনো?”

আরেকটা মেয়ে আহ্লাদী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি বুঝি আবিরের গার্লফ্রেন্ড? ”

মেঘ ঢোক গিলল। আবিরের প্রতি মেঘের তীব্র প্রেমানুভূতি সেই সাথে আবিরের যত্নে দুজনের সুপ্ত প্রেমের সম্পর্ক অস্বীকার করার উপায় নেই। আবির মুখ ফুটে এখনও কিছু না বললেও মেঘ মেয়েগুলোর সামনে শান্ত স্বরে বলল,
“জ্বি।”

মেয়ে গুলো একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“বলছিলাম না গার্লফ্রেন্ড৷ দেখলি তো?”

মেঘ উদ্বিগ্ন কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“আপনারা কারা? আর আবির ভাইকে কিভাবে চিনেন?”

একটা মেয়ে কপাল গুটিয়ে বলল,
” আবিরকে ভাই ডাকছো কেনো? বয়ফ্রেন্ড কে কেউ ভাই ডাকে?”

মেঘ চিবুক নামিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“ওনি আমার চাচাতো ভাই। কিন্তু আপনারা কারা?”

এবার মেয়েগুলোর ধাক্কাধাক্কি বেড়ে গেছে। তাদের মধ্যে একজন মিষ্টি করে হেসে বলল,
” ওহ আচ্ছা। তুমিই তবে সে যার জন্য আবির কলেজে কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে তাকিয়েও দেখে নি? বাড়িতে পরী থাকলে বাহিরে পেত্নী দেখার তো প্রশ্নই আসে না।”

মেঘ অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আরেকটা মেয়ে বলে উঠল,
“আমরা তোমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে একই কলেজে পড়তাম। আজ এতবছর পর হঠাৎ মেলার মধ্যে আবিরকে দেখলাম তারপাশে তুমি ছিলে। আবিরের যত্ন দেখেই সন্দেহ করেছিলাম তুমি নিশ্চয় আবিরের প্রেমিকা হবে। তাই সিউর হতে তোমাদের ফলো করে এখান পর্যন্ত এসেছি। বাই দ্য ওয়ে, তুমি খুব লাকি যে আবিরের মতো একজন মানুষ পেয়েছো।”

আরেকটা মেয়ে চাপা স্বরে বলল,
“যত্নে রেখো আমার অতীতের ক্রাশকে।”

মেঘ মোলায়েম কন্ঠে বলল,
” জ্বি ইনশাআল্লাহ। আপনারা দোয়া করবেন।”

“ফি আমানিল্লাহ। এখন আসি।”

মেঘ উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“চলে যাবেন কেনো? ওনি এখনি চলে আসবে, বসুন আপনারা। আমাদের সাথে ডিনার করুন।”

মেয়েগুলো উদাস ভঙ্গিতে বলল,
“আবির যদি এসে আমাদের এখানে দেখে নিশ্চিত ভাবতে তোমার কাছে উল্টাপাল্টা কথা লাগাচ্ছি। থাক তোমরা আনন্দ করো,আসি।”

পাশের মেয়েটা আবারও বিড়বিড় করে বলল,
” ক্রাশের প্রেমিকাকে দেখেই পেট ভরে গেছে। আজ রাতে কিছু না খেলেও চলবে। ”

যেতে যেতে পাশের জন ধমক দিল,
” মুখ টা বন্ধ রাখ তোর, মেয়েটা কি ভাবছে কে জানে।”

মেয়েগুলো রেস্টুরেন্ট থেকে বেড়িয়ে গেছে। এরমধ্যে আবির হাত মুখ ধৌয়ে চলে আসছে। টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে মেঘের দিকে তাকালো। মেঘ তখনও সেদিকে তাকিয়ে আনমনে হাসছে। আবির পেছনে ঘুরে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে?এভাবে হাসছিস কেনো?পরিচিত কেউ আসছিলো?”

মেঘ হেলান দিয়ে বসে আবিরের দিকে তাকিয়ে ঠাট্টার স্বরে বলল,
“আপনার গার্লফ্রেন্ড আসছিলো।”

আবির কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ ফেলে প্রখর তপ্ত স্বরে শুধালো,
“আমার গার্লফ্রেন্ড মানে?”

মেঘ হেসে আবারও বলল,
“আহারে মেয়েটা আপনাকে কত ভালো..”

বলতেই আবিরের চোখে চোখ পরলো। আবির অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে শাণিত কন্ঠে বলল,
” আজেবাজে কথা একদম বলবি না।”

এমন সময় তানভির এসে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“সমস্যা কি তোমার? আমার বনুটাকে বকা দেয়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই তোমার? ”

আবির মুখে পূর্বের মতো গাম্ভীর্যতা রেখে আবারও বলল,
” আমাকে বলছিস কেন, তোর বোনকে জিজ্ঞেস কর।”

তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
” কি হয়েছে বনু?”

মেঘ সাফাই দেয়ার স্বরে বলল,
” এক মেয়ে বলছে আবির ভাই নাকি তার ক্রাশ ছিল তাই আমি মজা করছিলাম।”

তানভির সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
” কোনটা আসছিলো?”

মেঘ চোখ বড় করে বিস্ময় সমেত তাকিয়ে বলল,
“কোনটা মানে? কয়জনের ক্রাশ ওনি?”

আবির অকস্মাৎ টেবিলের নিচে তানভিরের পায়ে পা চেপে ধরে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো। তানভির মজার ছলে বলল,
“আসলে ভাইয়াকে তো অনেক মেয়েই পছন্দ করে কিন্তু ভাইয়া কাউকে পাত্তা দেয় না। ”

মেঘ মুচকি হেসে বলল,
“হ্যাঁ, জানি। ”

আবির আর তানভির দুজনেই মেঘের দিকে সূক্ষ্ণ নেত্রে তাকিয়ে আছে। কোন মেয়ে আসছিল, কি বলছে এসব ভেবেই দুই ভাই আঁতকে উঠছে। তানভিরের সাথে ইদানীং সম্পর্ক ভালো হওয়ায় মেঘ অনেক কথায় তানভিরের সামনে বলে দেয় কিন্তু তাই বলে এই না যে প্রেমিকের এক্স ফ্যানের কথাও অতর্কিতে ভাইয়ের সামনে বলতে থাকবে। তিনজন একসাথে খাওয়াদাওয়া করে বেড়িয়েছে। আবির তানভিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুই ও কে নিয়ে বাসায় যা।”

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
” আপনি বাসায় যাবেন না?”

তানভির মিটিমিটি হেসে বাইক স্টার্ট দিতে চলে গেছে। আবির মলিন হেসে বলল,
“রাকিবদের সাথে দেখা করে বাসায় ফিরবো।”

মেঘ আস্তে করে বলল,
“তাড়াতাড়ি ফিরবেন।”

মেঘ বাসার মেইন গেইট পার হতেই সবাই এক দৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকালো। জিজ্ঞেস করতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে তানভির এসে বলল,
“কিরে বনু, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? তুই না মীম আর আদির জন্য জিনিস কিনলি। ওদের দে।”

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে আদিকে নিয়ে মীমের রুমে চলে গেছে। আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কোথায় গিয়েছিলে?”

তানভির তড়িৎ বেগে জবাব দিল,
” মেলা হইতেছে তাই বনুকে নিয়ে মেলায় গিয়েছিলাম।”

মোজাম্মেল খান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
” তোমরা দুই ভাইবোন একসঙ্গে বের হতে না বারণ করেছিলাম”

তানভির ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” মনে ছিল না, এরপর থেকে বনুকে রিক্সায় পাঠিয়ে আমি বাইকে আসবো। তাহলে হবে তো?”

আলী আহমদ খান হেসে বললেন,
” বোনকে একা নিয়ে গেলে। মীম আর আদিকে নিলে না কেনো?”

তানভির মেকি স্বরে বলল,
” তিনজনকে একা সামলানো সম্ভব না। পরবর্তীতে বাসার সবাই মিলে একদিন যাব।”

আলী আহমদ খান আবারও প্রশ্ন করলেন,
“আবির কোথায়?”

তানভিরের স্বাভাবিক জবাব,
“রাকিব ভাইয়াদের সাথে অফিসিয়াল মিটিং করছে। ”

মোজাম্মেল খান ভ্রু উঁচিয়ে বললেন,
” অফিসিয়াল মিটিং। ”

তানভির রাশভারি কন্ঠে বলল,
“ভাইয়া চলে গেলে সম্পূর্ণ দায়িত্ব তো রাকিব ভাইয়া আর রাসেল ভাইয়াকেই নিতে হবে। তারজন্য মিটিং প্রয়োজন না?”

“হ্যাঁ, অবশ্যই প্রয়োজন। বাসায় কখন ফিরবে?”

“মিটিং শেষ হলে।”

“ঠিক আছে তুমি রুমে যাও।”

তানভির স্বাভাবিক ভাবেই রুমে চলে গেছে। মীমদের জিনিস পত্র দিয়ে মেঘ নিজের রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে চুল খুলে মাথায় টিকলি, নতুন কেনা বড় বড় ঝুমকা, হাত ভর্তি চুড়ি, কোমরে বিছা পড়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছে। আজকের পড়া প্রতিটা জিনিস ই আবির ভাইয়ের পছন্দ করে কেনা। মেঘ একবার ওড়না দিয়ে ঘোমটা দিচ্ছে আবার ঘোমটা তুলে নিজের লাজুক মুখখানা দেখছে৷ আচমকা মেঘের মনে বিষাদের ছায়া নেমে আসলো, মনে পড়ে গেল আবির ভাইয়ের চলে যাওয়ার কথা।
ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি মুহুর্তেই বিলীন হয়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে সব খুলে ফেলেছে, চুলে হাত খোঁপা করে বিছানার এক কোণে চুপটি করে বসে পরেছে। মনে মনে ভাবছে ছোট থেকে ফেলে আসা সব স্মৃতি। অকস্মাৎ মেঘের মনে পড়লো, আজ থেকে প্রায় ৯ বছর আগের কথা যখন প্রথমবারের মতো আবিরের দেশ ছাড়ার কথা হচ্ছিলো। আবির আকুল কন্ঠে বার বার মেঘকে জিজ্ঞেস করেছিল,
” তুই কি চাস আমি তোকে ছেড়ে চলে যাই? প্লিজ মেঘ, তুই একবার বল যেতে হবে না। আমি সত্যি সত্যি যাব না। কিছু তো বল, প্লিজ।”

অথচ মেঘ সেদিন একবারের জন্যও মুখ খুলে নি। এমনকি আবিরের আকুল কন্ঠে বলা কথাগুলোর মানেও বুঝার চেষ্টা করে নি। তীব্র অভিমান বুকে জমিয়ে রেখেছিল, যার জন্য বাধ্য হয়ে সেদিন আবিরকে কাঁটা বেছানো পথকেই বেছে নিতে হয়েছিলো। তখন আবির বাড়ি ছাড়ায় সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল মেঘ অথচ আজ সম্পূর্ণ উল্টো। আজ সবচেয়ে বেশি কষ্ট মেঘ ই পাচ্ছে। মালিহা খানকে বুঝানোর পর ওনিই মেনে নিয়েছেন কিন্তু মেঘ কোনোকিছু বুঝার অবস্থাতেই নেই। আবিরের উপস্থিতি ছাড়া মাত্র ৭ দিনেই মেয়েটা আধমরা হয়ে গিয়েছিলো। সেখানে সাত সমুদ্র পার হয়ে আবির চলে যাবে এটা সে কোনোভাবেই মানতে পারছে না। ঘন্টা দুয়েক যাবৎ মেঘ এলোপাতাড়ি ভাবনায় মগ্ন। হঠাৎ ভাবনার মাঝে আগমন ঘটে আবিরের তিন বান্ধবী। যাদের মধ্যে একজন বলেছিল,
“তুমিই তবে সে যার জন্য আবির কলেজে কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে তাকিয়েও দেখে নি? বাড়িতে পরী থাকলে বাহিরে পেত্নী দেখার তো প্রশ্নই আসে না।”

এটুকু মনে পড়তেই মেঘ অকস্মাৎ সোজা হয়ে বসলো। রেস্টুরেন্টে বিষয়টা সেভাবে ভেবে দেখে নি তবে এখন এটার মানে বেশ বুঝতে পারছে। মেঘ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল,
“তবে কি আবির ভাই আমাকে তখন থেকেই ভালোবাসতেন?”

মেঘের হৃৎস্পন্দন জোড়ালো হতে শুরু করেছে, আচমকা বুকের বা পাশে তীব্র শূন্যতা অনুভব হচ্ছে। ৯ বছর যাবৎ আবির ভাইকে কত কষ্ট দিয়েছে সেসব ভেবেই মেঘের কলিজা কাঁপছে। যদিও মেঘ সিউর না এটা কেবল সন্দেহ তবুও মেঘ স্তব্ধ হয়ে গেছে। কোনো কিছু ভেবে না পেয়ে দ্রুত রুম থেকে প্রস্থান নিয়ে ছুটলো আবিরের রুমের দিকে। ততক্ষণে রাত গভীর হয়ে গেছে। ঘড়ির কাটা ১১-১২ টার ঘরে। আবিরের রুমের দরজা চাপানো তবুও ইতস্তততা ছাড়াই মেঘ দরজা ধাক্কা দিল। ছুটে গেলো রুমের ভেতর কিন্তু আবির রুমে নেই। রুমে লাগেজ সাথে প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছানো দেখেই মেঘের বুকটা আবারও ছ্যাৎ করে উঠলো৷ রুমে ফোন দেখে সিউর হলো আবির বাসায় ই আছে। রুমে আবিরকে না পেয়ে সোজা ছুটলো ছাদের দিকে। ছাদের কার্নিশে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে আছে আবির। দৃষ্টি আকাশের পানে। মেঘ দরজায় দাঁড়িয়ে ঘন ঘন শ্বাস ফেলে তাকালো আবিরের দিকে৷ আবিরের পেছন সাইড দেখেই মেঘ বুঝতে পেরেছে । বুকের ভেতরে আঁটকে থাকা সবটুকু নিঃশ্বাস ছেড়ে মেঘ আবারও ছুটলো। আবির গভীর মনোযোগ সহকারে অসীম আকাশে তাকিয়ে আছে। মেঘের নুপুরের শব্দ আবিরের কর্ণকুহরে প্রবেশের আগেই মেঘ পেছন থেকে আবিরকে ঝাপটে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিয়েছে। আকস্মিক ঘটনায় আবির এক পা সামনে এগিয়ে ছাদের সাইডের দেয়ালে হাত চেপে ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল। মেঘের ছোট্ট ছোট্ট দুটা হাত আবিরের বুকের উপর। মেঘের অবাধ কান্নায় আবিরের পিঠের দিকে টিশার্ট ভিজে যাচ্ছে। আবির এক হাতে নিজের দুচোখ মুছে মেঘকে খানিকটা ছাড়িয়ে সামনে ঘুরল। মেঘ এবার অতর্কিতে আবিরের প্রশস্ত বুকে ঝাপিয়ে পড়েছে। মেঘের গগন বিদায়ী কান্নায় প্রকৃতি স্তব্ধ হয়ে গেছে, ছাদে বয়ে যাওয়া হিমশীতল হাওয়াও থেমে গেছে। পূর্ণিমার চাঁদে আলোকিত ছাদে আবির আর মেঘ ব্যতীত কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব নেই। ধীরে ধীরে মেঘের কান্নার মাত্রা বেড়েই চলেছে। আবিরের গলা দিয়েও কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না, মেঘকে সান্ত্বনা দেয়ার মতো কোনো ভাষাও খোঁজে পাচ্ছে না। কয়েক মুহুর্ত নিস্তব্ধ থেকে আবির আচমকা নিজের একহাত মেঘের কোমরের কিছুটা উপরে, আরেক হাতে পিঠ বরাবর রেখে মেঘকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আবিরের স্পর্শ অনুভব করা মাত্র মেঘ আবিরকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, জোরে শব্দ করে কাকুতি শুরু করেছে। এই প্রথমবার আবির মেঘকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করেছে, প্রশস্ত হাতের সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে তার প্রেয়সীকে আলিঙ্গন করেছে। এর আগে যে কয়বার ধরেছে ততবারই আবির দূরে থেকেছে। তবে আজ দুজনের মাঝে এক ইঞ্চির দূরত্বও নেই, দুটা নিষ্কলুষ হৃদয়ের মানুষের কান্নাতেই একে অন্যের হৃদয়ের ক্লেশ উপলব্ধি করছে। আবির কিছুটা নিচু হয়ে মেঘের মাথার উপর আলতোভাবে নিজের গাল ছোঁয়াতেই আবিরের চোখের কার্ণিশ ঘেঁষে এক ফোঁটা অশ্রু মেঘের কেশরাজ ভেদ করে ভেতরে চলে গেছে। কান্নার তোপে মেঘ সেই নোনাজল উপলব্ধিও করতে পারে নি। আবির সঙ্গোপনে দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে মেঘের মাথায় নিজের মাথা কাত করে রাখতেই মেঘ আবিরের প্রশস্ত বুকে নিজের মুখ চেপে ধরেছে৷ অকস্মাৎ মেঘের খোঁপার বাঁধন খুলে আবিরের দুহাত ঢেকে মেঘের ঘন কালো চুল পৌছে গেছে হাঁটুর উপর পর্যন্ত। আবিরের সুপ্ত অনুরাগের মতো কেশরাজরাও যেন লুকিয়ে ফেলেছে আবিরের ভালোবাসার বন্ধনকে। মেঘ আবিরের বুকের বা পাশে মাথা রেখে অবাঁধে কাঁদছে, আবির নিরবে মেঘের কান্নার গভীরতা মাপছে। প্রায় ৪৫ মিনিট পেরিয়ে গেছে অথচ মেঘ থামছেই না। আবির বাধ্য হয়ে কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,
” এবার একটু থাম, প্লিজ।”

মেঘ আরও কিছুক্ষণ কেঁদে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামলো তবে তখনও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদেই যাচ্ছে। খানিক স্থির হওয়ায় আবিরের বুকের বাম প্রকোষ্ঠে থাকা হৃদপিণ্ডের প্রবল স্পন্দন অনুভব করছে যা বাহির থেকে স্পষ্ট শুনা যাচ্ছে। মেঘের কান্না থেমে গেছে, দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনাজলও থমকে গেছে। মেঘ ফোঁপানো কন্ঠে বলে উঠলো,
” আবির ভাই, আপনি ব্যতীত আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাবো। আমাকে ছেড়ে যাবেন না, প্লিজ। ”

আবির একহাতে মেঘের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
” এই বিস্তৃত নক্ষত্রমন্ডলকে সাক্ষী রেখে আবির মেঘকে কথা দিচ্ছে, আজ থেকে ঠিক পাঁচ মাস পর মেঘ যা চাইবে, ঠিক যেভাবে চাইবে সেভাবেই পাবে। মেঘের কোনো ইচ্ছে আমি আবির অপূর্ণ রাখবো না, কথা দিলাম। শুধু একটু ধৈর্য রাখ, প্লিজ।”

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি এর বেশি ধৈর্য রাখতে পারছি না, আবির ভাই। আমার মনে হচ্ছে আমি আর বাঁচবো না। ”

আবির সহসা মেঘকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠল,
” তোর কিছু হলে আমি বাঁচতে পারবো না। ”

#চলবে