আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব-৮১+৮২

0
4432

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৮১
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

আবিরের আর্তনাদ শুনে মেঘ আবিরের বুক থেকে মাথা উঠিয়ে বিস্মিত নয়নে আবিরের মুখের পানে তাকিয়েছে। পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে মেঘের দুধে-আলতা আদলে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানির দাগগুলো মুক্তার ন্যায় চকচক করছে। মেঘের বিষন্ন চিত্তে নৈসর্গিক পুলক নিরূপণ হচ্ছে, উদ্বিগ্ন আদল মুহুর্তেই বদলে গেছে মনোমুগ্ধতায়। আবিরের অন্তরের মর্মভেদী প্রদাহে প্রতিনিয়ত বিধ্বস্ত হওয়া অবসন্ন ধৃষ্টতায় মুহুর্তেই স্তম্ভিত ফিরলো। আবিরের অচঁচল চাহনি ছোট্ট মেঘের বুকের ভেতর আবদ্ধ হৃদপিণ্ডটা কে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। মেঘের পিঠ থেকে হাত সরিয়ে আবির অতীব আত্ততায় মেঘের দুচোখ মুছে দিয়েছে। মেঘ তখনও ছোট্ট হাতের সর্বশক্তি দিয়ে আবিরকে জড়িয়ে ধরে আছে। আবির গালের পানি মুছে দুহাতে মেঘের দুগালে হাত রেখে নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে পূর্বের ন্যায় আবারও জিজ্ঞেস করল,

” ম্যাম, আমাকে কি পাঁচটা মাস সময় দেয়া যাবে?”

আবিরের আজ্ঞাসূচক প্রশ্ন শোনামাত্র মেঘের চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গাল পর্যন্ত নামতেই আবির নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলের সহিত সেই গতি থামিয়ে দিয়ে মুখে গম্ভীর ভাব বজায় রেখে বলল,

” মাস বাদ দিলাম মাত্র ১৫০ দিন হলেই চলবে। ঘুম ভাঙলেই ১৪৯ দিন। চলবে?”

মেঘের মুগ্ধ চাহনিতে আবারও বিষাদ নেমেছে, বুকের ভেতর তীব্র অভিমান জমেছে, অভিমানী মুখ খানা দেখে আবিরের বুকের যন্ত্রণা তীব্র হতে শুরু করেছে। গত দিনগুলোতে মেয়েটাকে অবহেলা করে নিজেকে যতটা শক্ত রাখার চেষ্টা করেছিলো সেই সবকিছু মুহূর্তেই পরিবর্তন হয়ে গেছে। আবির নিজেকে নিরূদ্ধ করতে আকাশের পানে তাকিয়ে দুচোখ বন্ধ করে সঙ্গোপনে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লো। হঠাৎ অনুভব করলো আবিরের পিঠ থেকে মেঘের দু হাত সরে গেছে, আবির তৎক্ষনাৎ চোখ মেললো। ততক্ষণে মেঘের শরীর হেলে পড়ছে আবির তড়িৎ বেগে মেঘকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে আর্তনাদ করে উঠল,
“এই মেঘ, কি হয়েছে তোর?”

মেঘের নিস্তেজ দেহ আবিরের গায়ে পড়ে আছে। আবির অনর্গল ডাকছে কিন্তু মেঘের হুঁশ নেই। মেঘকে কোলে নিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসিয়ে দ্রুত পানি এনে মেঘের চোখে মুখে ছিটিয়ে দিচ্ছে আর অবিরত ডেকে যাচ্ছে। সকাল থেকে করা একের পর এক অনিয়ম, মনের বিরুদ্ধে সারাদিন উত্তপ্ত ক্ষিপ্রতায় নিজেকে প্রহত করার তীব্র প্রচেষ্টা, বুকের ভেতর কষ্ট চেপে রাখার উদ্যম তার সঙ্গে অনাবশ্যক কান্নার ফলে মেঘের দেহ নিস্তেজ হয়ে পরেছে। মিনিট দশেকের মধ্যে মেঘ পিটপিট করে চোখ মেললো, আবির ছাদের ফ্লোরে বসে মেঘের দুহাত আঁকড়ে ধরে আকুল কন্ঠে ডেকেই যাচ্ছে। আবিরের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে মেঘের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছে। মনের অন্তরালে চলছে একের পর এক প্রশ্নের ছুটোছুটি কিন্তু তার একটাও শ্বাসনালী পেরিয়ে মুখ পর্যন্ত আসতে পারছে না। আবির আকুল কন্ঠে শুধালো,
” কি হয়েছে তোর?”

আবিরের প্রশ্নে মেঘের ধ্যান ভাঙ্গে, চিবুক নামিয়ে আস্তে করে বলল,
“আমার মাথা কেমন করছে। ”

আবির শ্বাস ছেড়ে নিজেকে ধাতস্থ করে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল,
” এতো পাগলামি কেনো করিস? তুই তো জানিস কাঁদলে তোর মাথা ব্যথা করে, শ্বাসকষ্ট হয় তবে কেনো এমন করিস? নিজের প্রতি যত্নশীল কবে হবি?”

আবিরের আদরমাখা একের পর এক প্রশ্ন শুনে মেঘের অভিমানী মনে রাশি রাশি অভিমান ভর করছে। মুখটা আগের থেকেও বেশি চুপসে গেছে। মেঘ আবিরের দিকে তাকিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বলল,
” আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুত্কণ্ঠিত হবো, নিজেকে প্রতিহত করে নিজেই আশাহত হবো। ”

আবির মলিন হেসে বলল,
“আমাকে জ্বালাতে তোর খুব ভালো লাগে। তাই না?”

মেঘ না চাইতেও ক্ষীণ হাসতো, তবে হাসিটা পূবের ন্যায় প্রাণহীন। আবির ঠান্ডা কন্ঠে হুমকি দিল,
” আমি যাওয়ার পর যদি কোনোভাবে শুনতে পারি যে তুই স্ব ইচ্ছায় নিজেকে নিজে আহত করেছিস তাহলে এই আবিরকে আর পাবি না। চুপচাপ রুমে যা।”

মেঘ নিরাশ হয়ে বলল,
” আমি রুমে যাব না। ”

আবির ফ্লোর থেকে উঠে ট্রাউজারের ধূলো ঝেড়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
” রুম পর্যন্ত দিয়ে আসতে হবে?”

মেঘ আকাশের পানে তাকিয়ে উষ্ণ স্বরে বলল,
” চাঁদটা খুব সুন্দর তাই না?”

আবির আড়চোখে চাঁদের পানে তাকিয়ে মুখের গম্ভীর ভাব সরিয়ে মেকি স্বরে বলল,
” তোর থেকে বেশি না। ”

মেঘ মলিন হেসে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
” যে অনলের উত্তাপে সদাই ঝলসে যাচ্ছি সেই অনলে ঘি না ই বা ঢাললেন! আমি উন্মাদ হতে পারি তবে বিবশ নয়। ”

আবির মেঘের পাশে সোফায় বসে নিজের হাঁটুতে দুহাতের ভর ফেলে মাথা নিচু করে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে তপ্ত স্বরে বলে উঠলো,
” এজন্যই আমি বাসায় কিছু বলতে চাই নি। ভেবেছিলাম ঐখানে পৌঁছে ফোন করে জানাবো কিন্তু আব্বু জানিয়ে দিয়ে সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। ”

মেঘ কপাল গুটিয়ে সূক্ষ্ণ নেত্রে আবিরের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠল,
“আপনি আমায় না জানিয়ে চলে যেতে পারতেন? ”

“হয়তো।”

মেঘ দু’হাতে আবিরের বাহু শক্ত করে ধরে আবিরের শক্তপোক্ত বাইসেপে মাথা এলিয়ে মিনমিন করে বলে,
“আপনি বড্ড নিষ্ঠুর।”

আবির আড়চোখে চেয়ে বলল,
” তাহলে নিষ্ঠুর মানুষটার পাশে বসে আছিস কেনো? রুমে চলে যা। ”

মেঘ অনুষ্ণ কন্ঠে জবাব দিল,
” নিষ্ঠুর মানবের নিষ্ঠুরতা আমায় বন্দি করে ফেলেছে। আমি এখন কি করবো?”

আবির মোলায়েম কন্ঠে বলল,
” নিষ্ঠুর মানবের জন্য প্রতীক্ষা করবি।”

আবির একটু থেমে আবারও বলল,
” শুন, আমি চাই না আমার অবর্তমানে তুই নিজের উন্মুক্ত মনটাকে বন্দি করে নিজেকে কষ্ট দেস। তোর জীবন যেভাবে চলছিল সেভাবেই চলবে, বন্ধু, আড্ডা, পড়াশোনা তাছাড়া যা যা করতে ভালো লাগে সব করতে পারিস। যদি ঘুরতে ইচ্ছে করে তানভিরকে বললেই নিয়ে যাবে, মন খারাপ লাগলে ফুপ্পির সাথে দেখা করে আসিস। সবথেকে বড় কথা যদি কখনো আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে তাহলে নির্দ্বিধায় কল দিস । হোক রাত ২ টা কিংবা দুপুর ১২ টা তোর যখন ইচ্ছে হবে তখন ই কল দিবি, যা ইচ্ছে তাই বলতে পারবি। যদি মাঝরাতে টিকটিকি কিংবা ব্যাঙের স্বপ্নে ঘুম ভাঙে আর সেই স্বপ্নের কথা শেয়ার করতে ইচ্ছে হয় তবে সঙ্গে সঙ্গে আমায় কল দিবি। সবসময় মনে রাখবি, কোথাও কেউ একজন তোর চিন্তায় নিরন্তর মগ্ন আছে। ”

মেঘ নিশ্চুপ বসে আছে। আবির গলা খাঁকারি দিয়ে আস্তে করে বলল,
“সেই সাথে লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি, আমি চলে যাওয়ার পর আমার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যদি নিজেকে কষ্ট দেস তবে আমি আবির তোকে চিনি না। মাইন্ড ইট।”

মেঘ আবিরের হাত ছেড়ে সোজা হয়ে বসেছে। প্রিয় মানুষের সঙ্গ পেতে মনে সায় দিলেও আজ শরীরটা সায় দিচ্ছে না। সারাদিনের উদ্দামতা মেঘের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে। মাথা অনবরত ঘুরছে, চোখে ঝাপসা দেখছে, নিজের সাথে নিজে বিগ্রহ করেও ঠিক থাকতে পারছে না, একবার মাথা চেপে ধরছে, একবার আকাশের পানে তাকাচ্ছে, আবার আবিরকে দেখছে। মেঘের অস্থিরতা বুঝতে পেরে আবির শান্ত স্বরে শুধালো,
“শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?”

মেঘ উপর নিচ মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ।”

“ঘুমালে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। চল তোকে রুমে দিয়ে আসি।”

মেঘ শক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
“আমি রুমে যাব না। এখানেই থাকবো। ”

আবির নড়েচড়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে মেঘকে কাছে টেনে আবিরের উরুতে শুইয়ে দিয়েছে। আকস্মিক ঘটনায় মেঘের সর্বাঙ্গ শিহরিত হচ্ছে, বুকের ভেতরের টালমাটাল অবস্থা সামলাতে বারংবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। আচমকা আবিরের সংস্পর্শ মেঘকে নাজেহাল করে তুলছে তবে আবিরের সেদিকে বিশেষ মনোযোগ নেই। আবির ব্যস্ত মেঘের লম্বা চুল সামলাতে। মেঘের বুকের বা পাশের হৃদপিণ্ডের কম্পন বাহির থেকে শুনা যাচ্ছে, লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে চোখ ই খুলতে পারছে না। সেই সঙ্গে শরীরের দূর্বলতার জন্য উঠার চেষ্টাও করতে পারছে না। আবিরের একহাত মেঘের চুলে, খুব যত্ন সহকারে মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মেঘ ভেতরে ভেতরে আবিরের কোল থেকে উঠার চেষ্টা করছে, আস্তে আস্তে সাইডে সরে যাচ্ছে আচমকা আবির অন্য হাতে মেঘের পেটের পাশে হাত রেখে মেঘের শরীর সোফার মাঝ বরাবর এনে উষ্ণ স্বরে বলল,
” কথা না শুনলে সোজা রুমে ফেলে দিয়ে আসবো। তারপর কান্নাকাটি করবি না বলে দিলাম।”

আবিরের উষ্ণ স্পর্শে মেঘের নিঃশ্বাস আঁটকে গেছে সেই সঙ্গে ভারী কন্ঠের হুমকিতে মেঘ সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে গেছে। চোখ বন্ধ করে ঘন ঘন শ্বাস ছাড়ছে। আবির মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সেই সঙ্গে মেঘকে শীতল কণ্ঠে বুঝাচ্ছে। আবিরের বিস্তর আলাপচারিতার পর মেঘ ধীরে ধীরে চোখ মেললো৷ উজ্জ্বল আলোতে আবিরের মায়াময় মুখখানায় তাকিয়ে মনে মনে আওড়াল,

” এত কথা বলতে পারছেন অথচ একবারের জন্য কি ভালোবাসি শব্দটা বলা যায় না? সারাজীবনের জন্য আমাকে আপনার ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নেয়া যায় না?”

আবির শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কি ভাবছেন? ”

মেঘ চোখ সরিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“কিছু না। ”

মেঘ অসীম আকাশে জ্বলজ্বল করা চাঁদের পানে চেয়ে আছে আর আবিরের নেশাক্ত দৃষ্টি তাকিয়ে আছে মেঘের মায়াবী আদলে। আবিরের বুকের বা পাশে যেই চাঁদের অবস্থান সেই চাঁদ আজ আবিরের কোলে শুয়ে আছে। আবির না চাইতেও আজ তার একান্ত চাঁদের রূপ আর মায়ায় নিজেকে জাহির করতে বাধ্য হয়েছে।
বেসামাল দশার কত সময় পেরিয়েছে সেদিকে কারোর হুঁশ নেই। আবিরের আত্ততায় একসময় মেঘ আবিরের কোলে শুয়েই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। আবির তখনও মায়াবী দৃষ্টিতে মেঘের ঘুমন্ত মুখখানা দেখছে।
প্রায় শেষরাতের দিকে আবির মেঘকে তার রুমে নিয়ে গেছে। আবির মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে আলতোভাবে মেঘের কপালে একটা চুমু খেয়ে ভেজা কণ্ঠে বলল,
” খুব মিস করবো তোকে।”

আবির উঠে যেতে নিলে মেঘ ঘুমের ঘোরেই আবিরের টিশার্ট খামছে ধরেছে। আবির উঠতে চেয়েও থমকে গেছে। এই হাত ছাড়িয়ে চলে যাওয়া আবিরের পক্ষে অসম্ভব তাই চুপচাপ মেঘের পাশে বসে পরেছে।

সকাল হয়ে গেছে। মেঘ আধ ঘুমে থেকেই আশপাশে তাকিয়ে নিজেকে রুমে আবিষ্কার করল। তৎক্ষনাৎ ঘড়ির কাটা টিক টিক করে উঠলো৷ মেঘ চোখ ঘুরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখলো ঘন্টার কাটা ঠিক ১১ টায়। মেঘ এক লাফে শুয়া থেকে উঠে আগপাছ না ভেবেই বিছানা থেকে নেমে ছুটতে শুরু করল। মাথা ঘুরছে, চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে তবুও মেঘ থামছে না। রুম থেকে বেড়িয়ে বেলকনি পেরিয়ে আবিরের রুমের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো, রুমের দরজা আটকানো, দরজার বাহিরে জ্বলজ্বল করছে একটা সিলভার রঙের তালা। মেঘ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বুকে হাত রেখে এক পা এক পা করে পেছাতে শুরু করলো, দু চোখ ছলছল করছে। সদ্য ঘুম ভাঙায় ঠিকমতো তাকাতে পারছে না। আচমকা আবারও ছুটতে শুরু করেছে, পাবে না জেনেও তানভির, মীম সহ নিচের প্রতিটা রুমে আবিরকে খোঁজছে। এমনকি বাড়ির মেইন গেইট পর্যন্ত ছুটে গেছে৷ বাসায় তেমন কোনো মানুষ ই নেই। মীম, আদি স্কুলে, তানভির নিজের কাজে ব্যস্ত, মোজাম্মেল খানরা অফিসে। হালিমা খান আর মালিহা খান ডাক্তারের কাছে গেছেন, আকলিমা খান নিজের রুমে ঘুমাচ্ছেন। মেঘ মেইনগেইট থেকে এক দৌড়ে ছাদে গিয়ে সোফার কাছে গিয়ে থামলো। গতরাতে যে সোফায় আবিরের কোলে মাথা রেখে শুয়েছিলো সেই সোফার সামনে ফ্লোরে বসে হাউমাউ করে কান্না শুরু করেছে। সূর্যের প্রখর আলো মাথার উপরে চলে এসেছে। গতকালের রেশ টায় ঠিকমতো কাটে নি তারমধ্যে আজও তাই করছে। মেঘকে থামানোর জন্য আবির, তানভির, মীম কেউই আজ উপস্থিত নেই। মেঘ চিৎকার করে কাঁদছে, কাঁদতে কাঁদতে বার বার দম আঁটকে যাচ্ছে তবুও থামছে না। রোদের তাপে সারাশরীর ঘেমে একাকার অবস্থা তারউপর চুল ছড়িয়ে বসে আছে। ঘন্টাদুয়েক পর মেঘ আবারও দৌড়ে রুমে গেছে, রুমে ঢুকতেই চোখ পরে টেবিলের উপর একটা চিরকুটে। চিরকুটে ছোট করে লেখা,

” ভোরের স্বপ্নের মতোই সত্যি হয়ে ফিরবো কোনো এক অবসন্ন অপরাহ্নে। অপেক্ষায় থেকো, My Dear Sparrow. ”

ওয়ারড্রব থেকে আবিরের সেই সাদা শার্টটা বের করে চিরকুট হাতে ধপ করে ফ্লোরে বসে দুহাতে শার্ট জড়িয়ে ধরে আবারও কাঁদতে শুরু করেছে। গতরাতে আবিরের এতকরে বুঝানো সব কথা ভুলে গগন কাঁপানো কান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ২ টার দিকে তানভির বাসায় আসছে, কাকিয়াকে জিজ্ঞেস করে সরাসরি রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে মেঘের রুমের সামনে হাজির হয়েছে। দরজায় ডাকতেই মেঘ আবিরের শার্টটা বালিশের নিচে লুকিয়ে চোখেমুখে পানি দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ব্রাশ হাতে নিয়ে দরজা খুলে দিল। তানভির ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“মাত্র উঠছিস?”

“হ্যাঁ।”

“ঠিক আছে।ফ্রেশ হয়ে আয়।”

মেঘ হাত মুখ ধৌয়ে আসতেই তানভির ভাতের প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলল,
“খেয়ে নে।”

“খিদে নেই। পরে খাবো।”

তানভির চোখ গোল গোল করে তাকাতেই মেঘ চিবুক নামিয়ে ফেলেছে। তানভির শক্ত গলায় আবারও বলল,

“তোর মুখে না শুনতে সব কাজ ফেলে বাসায় আসি নি আমি। দেখি হা কর।”

খাওয়ানো শেষে যাওয়ার সময় মেঘ উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“আবির ভাই কখন গেছেন?”

“সকালে। ”

মেঘ স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, তানভির চলে গেছে। মেঘ কিছুক্ষণ বসে থেকে দরজা বন্ধ করে বালিশের নিচ থেকে আবিরের শার্ট বের করে আবারও কান্না শুরু করেছে। মীম স্কুল থেকে ফিরেই মেঘেকে দেখতে আসছে। মেঘ তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। প্রচন্ড মাথা ব্যথায় মেঘের চেহারা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেছে, চোখ মেলে ঠিকমতো তাকাতেও পারছে না। মীমকে জড়িয়ে ধরে আবারও কাঁদতে শুরু করেছে। সেই ১১ টা থেকে চলছে মেঘের নিরবধি কান্না। কখনো বেশি কখনো বা কম।

ঘড়ির কাটা থমকে আছে সূর্যাস্তের পূর্ব মুহুর্তে।
কিছু অনুভূতিহীন শব্দ এখনও বুকের ভেতর চাপা পড়ে আছে। যা কান্না রূপে প্রতিনিয়ত বুক খুঁড়ে বেরিয়ে আসছে। বেলকনির দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দূর আকাশের পানে। দু চোখ রক্তাভ হয়ে আছে, শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে বাসা বাঁধছে এক অজ্ঞাত অতুষ্টি। গত কাল থেকে আজ অব্দি যে ঝড় মেঘের মনের উপর দিয়ে চলছে তার কোনো অন্ত নেই।

রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে গেছে। আবির ঠিকঠাক মতো পৌছেই মেসেজ করে জানিয়েছে। গভীর রাত ছিল বলে কাউকে কল দেয় নি। সকাল দিকে একের পর এক কল দিচ্ছে কিন্তু বাসার কেউ কল রিসিভ করছে না, এমনকি তানভিরও কল রিসিভ করছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবিরের শরীর ঘামতে শুরু করেছে। বুকের ভেতর অজানা ভয় কাজ করছে। আগপাছ না ভেবেই কল দিলো আলী আহমদ খানের নাম্বারে। আলী আহমদ খান কল রিসিভ করে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

” কখন পৌঁছালে? সবকিছু ঠিকঠাক আছে? তুমি সুস্থ আছো?”

” রাতে আসছি। জ্বি আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু বাসার কেউ আমার কল রিসিভ করছে না কেনো? ”

আলী আহমদ খান গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন,
“বাসায় কেউ না থাকলে কল রিসিভ করবে কিভাবে?”

“কোথায় গেছে সবাই?”

“হাসপাতালে। ”

আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“কেনো? কার কি হয়ছে?”

আলী আহমদ উদাস ভঙ্গিতে বললেন,
“গতকাল রাত থেকে মেঘ মামনির জ্বর, মাথা ব্যথা। একপর্যায়ে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে তাই বাধ্য হয়ে রাত ২ টার দিকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। বাসার সবাই এখনও হাসপাতালেই। ”

#চলবে

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৮২
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

আলী আহমদ উদাস ভঙ্গিতে বললেন,
“গতকাল রাত থেকে মেঘ মামনির জ্বর, মাথা ব্যথা। একপর্যায়ে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে তাই বাধ্য হয়ে রাত ২ টার দিকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। বাসার সবাই এখনও হাসপাতালেই। ”

অভিশঙ্কায় আবিরের আঁখি যুগল রক্তাভ হয়ে উঠেছে, উদ্বিগ্ন আদল বদলে মুহুর্তেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। বুকের ভেতর অবস্থিত হৃদপিণ্ডটা ভয়ঙ্কর রকমে কাঁপছে। কপাল গুটিয়ে রুমের ছাদের দিকে তাকিয়ে সবটুকু শক্তি দিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো, আবিরের অক্ষিপট ভিজে আসছে। আলী আহমদ খান কোমল কন্ঠে বললেন,

” আমি আসার সময় দেখে আসছি ঘুমাচ্ছে। তুমি বরং তানভিরকে কল দাও। ”

আবির আস্তে করে গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” ঠিক আছে, রাখছি। ”

আবির কল কেটে সঙ্গে সঙ্গে তানভিরের নাম্বারে কল দিলো। আগেও বেশ কয়েকবার দিয়েছে কিন্তু তানভির কল রিসিভ করে নি। ভেতরের ক্রোধ আবিরের তামাটে চেহারায় স্পষ্ট ভেসে উঠছে। তিনবারের মাথায় তানভির কল রিসিভ করলো। তানভির কিছু বলার আগেই আবির রাগান্বিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
” তোরা দুই ভাই বোন কি শুরু করছিস?”

আবিরের রাগান্বিত কন্ঠ শুনেই তানভিরের অন্তরাত্মা শুকিয়ে যাচ্ছে, ঢোক গিলে ভীতু গলায় বলল,
” সরি ভাইয়া, একটু ব্যস্ত ছিলাম। ”

আবির পূর্বের ন্যায় আবারও বলে উঠল,
” কিসের ব্যস্ততা দেখাচ্ছিস? তোর বোন হাসপাতালে ভর্তি এটা আমাকে জানানোর মতো সময় তোর নেই? এত ব্যস্ততা তোর?”

তানভির ব্যস্ত ভঙ্গিতে জানতে চাইল,
” তোমাকে কে বলছে?”

আবির ক্রোধে ফুঁসে উঠলো। বিরক্তি নিয়ে বলল,
” বাহ! তারমানে তুই আমাকে জানাতেই চাইছিলি না?”

তানভির আমতা আমতা করে বলতে শুরু করল,
“বিষয়টা এমন না। তুমি এতটা জার্নি করে গেলে ঐ অবস্থায় রাতে তোমাকে জানালে তুমি শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করতে সেজন্য বলি নি।”

আবির গম্ভীর স্বরে বলল,
“ওহ আচ্ছা৷ তোর বোন অসুস্থ এমনকি হাসপাতালে ভর্তি এটা আমার জন্য খামাকা দুশ্চিন্তার বিষয়? খুব ভালো বলছিস।”

তানভির খুব শান্ত গলায় বলল,
“ভাইয়া প্লিজ তুমি মাথাটা ঠান্ডা করো। বনুর শ্বাসকষ্ট এখন অনেকটায় কমেছে। মানসিক প্রেশার আর অতিরিক্ত কান্নাকাটি করায় এমনটা হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন সিরিয়াস কিছু না তবে..”

আবির হুঙ্কার দিয়ে উঠল,
“তবে কি?”

“ডাক্তার আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে বড় কোনো রোগের সম্ভাবনা আছে।”

আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে রাশভারি কন্ঠে বলে উঠল,
” তোরা দুই ভাই বোন মিলে আমায় খু*ন করে ফেললে আজ এই দিনটা দেখতে হতো না। তোর বোনকে এতটা সময় নিয়ে বুঝিয়েছি, বার বার ওয়ার্নিং দিয়েছি অথচ তোর বোন আমার কথার কি প্রতিদান দিলো? আসার আগে তোকে ১০০ বার বলেছি ও কে একা ছাড়িস না, ছাড়িস না তারপরও তুই একা ছেড়ে দিলি। আব্বু, চাচ্চুর মতো তোরাও প্রমাণ করে দিলি আমি মানুষটা অপচিত আর আমার অভীপ্সাগুলো বড্ড ঠুনকো। তোদের আচরণে নিজেকে আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অপকৃষ্ট মানব মনে হচ্ছে। যেখানে সামান্যতম মূল্য আমার নেই সেখানে কথা বলা আমার শোভা পায় না। ভালো থাকিস আর তোর বোনকে যত্নে রাখিস। আল্লাহ হাফেজ। ”

এক আকাশ সম অভিমান নিয়ে আবির কথাগুলো বলেছে। তানভির কিছু বলার আগেই আবির কল কেটে দিয়েছে। কল ব্যাক করতে করতে আবির ফোন বন্ধ করে ফেলেছে। এদিকে মেঘের শরীরের অবস্থা এখনও অনেকটায় খারাপ। আবির যাতে দুশ্চিন্তা না করে তারজন্য তানভির ইচ্ছেকৃত কোনোকিছু বলতে চাই নি অথচ তাই হলো। আবির, মেঘ আর তানভির দুজনকেই ভুল বুঝে কল কেটে দিয়েছে। মেঘের এই সমস্যা ছোট থেকেই ছিল, বাসায় কোনো বিষয়ে খুব বেশি বকা খাওয়া,কিংবা পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ হওয়া, ছোটবেলা আবিরের হাতে থাপ্পড় খাওয়ার পর সপ্তাহ খানেক জ্বরে ভোগা এগুলো হরহামেশায় হয়ে থাকে কিন্তু ইদানীং তারসাথে যোগ হচ্ছে শ্বাসকষ্ট নামক এক গুরুতর সমস্যা। আবির কাছ থেকে রিয়াকে না দেখলেও রাকিবের মুখে বরাবরই রিয়ার অসুস্থতার কথা শুনে এসেছে। সেই আতঙ্কে মেঘকে সবসময় দূরে দূরে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু মেঘের অপরিমেয় আত্ততা আর অনুরাগে ধীরে ধীরে নিজেকে জাহির করতে বাধ্য হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে আজ এই দিনটার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

তানভির রুমে এসে মেঘের পাশে একটা চেয়ারে বসে অনুষ্ণ দৃষ্টিতে মেঘের ঘুমন্ত আদলে চেয়ে আছে। হালিমা খান মেঘের মাথায় অনবরত জলপট্টি দিচ্ছেন, মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। মালিহা খান হাতে পায়ে মালিশ করছেন। মোজাম্মেল খান কাছেই একটা চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন। তানভির মেঘের দিকে তাকিয়ে থেকেই মনে মনে বলল,

” চোখের সামনে বোনের স্বপ্নময় জীবনটাকে প্রতিনিয়ত ধ্বংস হতে দেখছি, হাসির আড়ালে কষ্ট লুকাতে দেখছি। এ অবস্থায় আমি তাকে ঠিক কি বলে সান্ত্বনা দিতাম? মুখের উপর ধমক দিতে গেলে আগে নিজের কলিজায় আঘাত লাগে। আমি তো সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি কিন্তু তবুও ঠিক রাখতে পারি নি। আমি সত্যিই দুঃখিত ভাইয়া। ”

তানভির চেয়ারে বসে আবিরকে একের পর এক মেসেজ দিচ্ছে। বিস্তারিত সব ঘটনা বলেছে কিন্তু আবিরের কোনো রেসপন্স নেই।

মোজাম্মেল খান তানভিরকে উদ্দেশ্য করে হঠাৎ ই তপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“আবিরের সাথে কথা হয়েছে? ও কি ঠিকমতো পৌঁছেছে? ”

তানভির মাথা নিচু করে ধীর কন্ঠে বলল,
“হ্যাঁ।”

“মেঘের অসুস্থতার কথা জানিয়ে দিয়েছো?”

তানভির ভারী কন্ঠ জবাব দিল,
” আমি জানায় নি তবে হয়তো বড় আব্বু জানিয়েছে।”

মোজাম্মেল খান কপাল গুটিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
” ভাইজানের কি দরকার ছিল ছেলেটাকে জানানোর? শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করবে।”

আব্বুর চিন্তাভাবনার সাথে তানভিরের চিন্তাভাবনা মিলে গেছে দেখে তানভির মাথা নিচু রেখেই নিঃশব্দে হাসলো।

পেইজঃ Salma Chowdhury – সালমা চৌধুরী (scsalma90)

★★★★★

এক সায়াহ্নে মেঘ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে বিষন্ন চিত্তে দূরের একটা ল্যামপোস্টের ক্ষুদ্র পরিসরের আলোর পানে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, এক সেকেন্ডের জন্য পলক ফেলতেও বেমালুম ভুলে গেছে। পাঁচ দিনের প্রখর অসুস্থতা অবসহন করে আজ মেঘের শরীরের অবস্থা কিছুটা ভালো হয়েছে তবে মনের অবস্থা এখনও দূর্বিষহ। এই পাঁচদিনে জ্বরের ঘোরে দুনিয়াবি কোনো হদিস ছিল না মেঘের। আজ সন্ধ্যের আগে আগে বিছানা থেকে উঠে বেলকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে। গত পাঁচদিনে না দেখেছে সূর্য উদয় আর না সূর্যাস্ত। আবির বাড়ি নেই ৬ দিন হলো, এরমধ্যে আবিরের কন্ঠস্বর পর্যন্ত শুনে নি। দীর্ঘ সময়ের ঘোর কাটিয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে গুটিগুটি পায়ে রুমে গেল। টেবিলের উপর ফোনটা বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। মেঘ ফোনটা চার্জে দিয়ে আবারও শুয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই হালিমা খান রুমে আসছেন ওনার খানিক বাদে মোজাম্মেল খানও মেয়ের পছন্দ মতো বেশকিছু খাবার নিয়ে আসছেন। মেঘ মোটামুটি সুস্থ হয়েছে শুনে একে একে সবাই রুমে হাজির হয়েছে। সবার দৃষ্টি এক মেঘেতে স্থির হয়ে আছে। ইদানীং তানভিরও বেশিরভাগ সময় বাসায় থাকার চেষ্টা করে। মোজাম্মেল খান আহ্লাদী কন্ঠে মেয়েকে একের পর এক খাবার সাধছেন। আলী আহমদ খান টুকিটাকি কথা বলছেন ওনাদের সঙ্গে মালিহা খানও এটা সেটা বলছেন। হালিমা খান মেঘের মাথার পাশে বসে চুপচাপ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তানভির দরজার পাশে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গত কয়েকদিনে আবিরের মাথা ঠান্ডা করতে তানভির সহ রাকিব, রাসেল, লিমনরা সবাই যতটা সম্ভব চেষ্টা করছে। কিন্তু আবিরের রাগ কমার বদলে উল্টো বেড়েই চলেছে।

তাদের একের পর এক আহ্লাদী কথা শুনে মেঘ মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। পুরো রাজ্যের কথার ভিড়ে কারো মুখে একবারের জন্যও আবিরের নামটা উঠছে না। মেঘ সবাইকে এক নজর দেখে মলিন হেসে মনে মনে আওড়াল,
“ওরা এ মন কেমন বুঝে না,
ওরা আসল কারণ খোঁজে না।”

মেঘের দু-চোখ ছলছল করছে, চোখের কার্নিশ ঘেঁষে এক ফোঁটা অশ্রু কানের লতি পেরিয়ে গেছে। হালিমা খান উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
” কাঁদছিস কেনো? ”

মেঘ দুই আঙুলে চোখের পাশের পানির দাগ মুছে একগাল হেসে বলল,
“কই? কাঁদছি না তো!”

সবাই সবার মতো চলে গেছে। হালিমা খান মেঘের পাশে বসে আছেন, তানভির একটু পর পর এসে দেখে যাচ্ছে। চার্জ থেকে ফোন খুলে মেঘ ফোন ওপেন করল। হালিমা খান তখনও মেয়ের পাশেই বসা। মেঘ একে একে কল লিস্ট, সোশ্যাল মিডিয়া সব চেক করলো কিন্তু কোথাও আবিরের কোনো মেসেজ নেই। এমনকি আবির কোথাও সক্রিয়ও নেই৷ এক রাশ আশা নিয়ে মেঘ ফোনটা হাতে নিয়েছিল অথচ রেখেছে এক রাশ হতাশা নিয়ে। বুকের ভেতর ছোটাছুটি করা অদৃষ্ট অনুভূতিরা প্রতিনিয়ত কোমল হৃদয়ে তীরের ন্যায় আঘাত করছে, তীব্র অভিঘাত সহ্য করতে না পেরে মেঘ মায়ের কোলে মাথা রেখে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করেছে। পাঁচ মিনিট পরেই মোজাম্মেল খান হাতে ফোন নিয়ে রুমে আসছেন।ফোনটা হালিমা খানের হাতে দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
“আবিরের সাথে কথা বলো।”

হালিমা খান ফোন কানে নিতেই ওপাশ থেকে আবিরের কন্ঠস্বর কানে বাজলো,
“আসসালামু আলাইকুম। ”
আবিরের কন্ঠ শুনামাত্র মেঘ চোখ মেলে আম্মুর মুখের দিকে তাকালো। হালিমা খান শীতল কণ্ঠে বললেন,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছিস?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তোমরা কেমন আছো?”

“আমরা আর কেমন থাকবো, ৫ দিন পর আজকে মেঘের একটু হুঁশ আসছে। এই মেয়েকে নিয়ে কি করবো না করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। তোর কি অবস্থা?তোকে কল দিলে পাওয়া যায় না। ওখানে গিয়ে আমাদের কথা মনেই পড়ে না নাকি?”

আবির মৃদুস্বরে বলল,
” সবকিছু গুছাতে একটু সময় লাগছে।”

মেঘের ভেজা চোখের নিরেট দৃষ্টি দেখে হালিমা খান মোলায়েম কন্ঠে বললেন,
” মেঘের সাথে কথা বলবি? ফোন দিব ও কে?”

আবির ভারী কন্ঠে বলল,
” এখন একটু ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলবো। রাখছি, আল্লাহ হাফেজ। ”

আবির সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দিয়েছে। মেঘ অবাক লোচনে আম্মুর মুখের পানে চেয়ে আছে। মোজাম্মেল খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
“মেয়েকে খাইয়ে দাও। ঔষধ খাওয়াতে হবে তো!”

হালিমা খান খাবার আনতে নিচে গেছেন। এই সুযোগে মেঘ ফোন হাতে নিয়ে আবিরের নাম্বারে কল দিল। একবার দু’বার নয় টানা ৬ বার কল দিয়েছে অথচ কল রিসিভ হচ্ছে না। আজ পর্যন্ত এমন ঘটনা কখনো হয় নি। আবিরের ফোন খোলা থাকলে আর ফোনের কাছে থাকলে মেঘের কল কখনো মিস হয় না অথচ আজই তার ব্যতিক্রম ঘটছে। মেঘের বুকের ভেতর অজানা ভয় হানা দিচ্ছে। একটু পরেই বন্যা কল দিলো। বন্যার সাথে ২-৩ মিনিট কথা বলেছে এরমধ্যে হালিমা খান খাবার নিয়ে চলে আসছেন। হালিমা খান স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কে কল দিয়েছে?”

“বন্যা।”

“ওহ। মেয়েটা ঐদিন তোকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিল কিন্তু তোর অবস্থা খারাপ ছিল তাই হয়তো বুঝতেই পারিস নি।”

মেঘ উদাস ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
“বন্যা হাসপাতালে গেছিলো?”

“হ্যাঁ।”

মেঘ আস্তে করে বলল,
“ওহ।”

মেঘ রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার আবিরকে কল দিয়েছে। অনেকগুলো মেসেজও দিয়েছে কিন্তু আবির মেসেজ, কল কোনো কিছুতেই রেসপন্স করছে না।

বন্যা ভার্সিটি থেকে বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে অল্প খেয়েই মেঘকে দেখার জন্য বাসায় আসছে। মূলত তামিম, মিষ্টিরা সবার ই আসার কথা ছিল কিন্তু তানভিরের ভয়ে ওরা আর সাহস করতে পারে নি। বন্যা কিছু ফল আর মেঘের পছন্দের টুকিটাকি জিনিসপত্র নিয়ে আসছে। আজ তানভির আগে থেকেই বাসায় ছিল, বন্যাকে ঢুকতে দেখেই সোফা থেকে উঠে এগিয়ে গেলো। বন্যা শান্ত স্বরে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মেঘ কোথায়?”

তানভির সালামের উত্তর দিয়ে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বন্যা উপরে চলে গেছে। বাসায় আজ তেমন মানুষজন নেই। আকলিমা খান মীম আর আদিকে নিয়ে ওনার এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গেছেন। দুপুরের পর হওয়ায় হালিমা খান ও মালিহা খান দু’জনেই ঘুমে। তানভির কিছুক্ষণ সোফায় বসে হঠাৎ উঠে রান্না ঘরে চলে গেছে। চা, নুডলস সাথে ফল কেটে প্লেটে সাজিয়ে নিয়েছে। মেঘের রুমের সামনে এসে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“আসবো?”

“আসো।”

তানভিরের হাতে নাস্তা দেখে মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছে। বন্যা চেয়ার থেকে উঠে হাত বাড়িয়ে একটা ট্রে নিয়ে টেবিলের উপর রাখলো। আরেকটা তানভির নিজে ই রেখেছে। মেঘ আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকিয়ে শুধালো,
“নাস্তা তুমি নিয়ে আসছো?”

তানভির আস্তে করে বলল,
“হ্যাঁ”

মেঘ দু চোখ প্রশস্ত করে জানতে চাইলো,
“সত্যি?”

তানভির ভ্রু কুঁচকে কিছুটা ভারী কন্ঠে বলল,
“জ্বি।”

বন্যাও কপাল গুটিয়ে তাকিয়ে আছে। মেঘ আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,
“আম্মু কোথায়?”

“আম্মু, বড় আম্মু ঘুমাচ্ছেন তাই ডাকি নি।”

তানভির চায়ের কাপ বন্যার দিকে এগিয়ে দিয়ে চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“চিনি হয়েছে কি না দেখো। ”

বন্যা চায়ে চুমুক দিতে দিতে মেঘ বলে উঠল,
“বন্যা চায়ে চিনি বেশি খায়।”

তানভির মুখের উপর জবাব দিল,
“জানি।”

বলেই তানভির থতমত খেয়ে উঠল। বন্যা মৃদু হেসে বলল,
“চিনি ঠিক আছে, ধন্যবাদ।”

মেঘ তানভিরের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বন্যার সামনে কিছু জিজ্ঞেস করবে কি না তাই ভাবছে। তানভির মেঘের নজর খেয়াল করে ধীর কন্ঠে বলল,
” আমি আসি, নাস্তা ভালো না লাগলে আমার কিছু করার নেই। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আম্মু উঠলে আবার নাস্তা পাঠাবো নে।”

তানভির তড়িঘড়ি করে রুম থেকে বেড়িয়ে গেছে। মেঘ তখনও সন্দেহের দৃষ্টিতে দরজার পানে তাকিয়ে আছে। বন্যা কপাল গুটিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“তোর ভাই রান্নাও পারে?”

মেঘের ঠোঁট জুড়ে মুচকি হাসি। মাথা দুলিয়ে মেকি স্বরে বলল,
“নুডলস আর চা টায় কোনোরকমে করতে পারে।”

বন্যা মৃদু হেসে স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আবির ভাইয়ার সাথে কথা হয়েছে তোর?”

“নাহ।”

“কেনো?”

“ওনি আমার কল রিসিভ করেন না। গতকাল আব্বু- আম্মুর সাথে কথা বলেছে।আম্মু আমাকে ফোন দিতেও চাইছিলো কিন্তু ওনি কথা বলেন নি। ”

বন্যা তপ্ত স্বরে বলল,
“ওনার সমস্যা কি?”

” আমাকে ওয়ার্নিং দিয়েছিল আমি যেন ইচ্ছেকৃত নিজের ক্ষতি না করি। হয়তো সেজন্যই রাগ করে কথা বলছেন না। ”

বন্যা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” ভালো হয়েছে। তোর সাথে এমন করায় উচিত। ”

মেঘ মন খারাপ করে বলল,
“তুই আমাকে এভাবে বলতে পারলি?”

“তো কিভাবে বলবো, আগে ওনি পাত্তাই দিতো না তবুও ওনার পেছন পেছন ঘুরতি অথচ এখন ওনি তোকে প্রাধান্য দিচ্ছে তবুও তুই অনিয়ম করছিস। ”

মেঘ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
“আবির ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে আমার মনের ভেতর যেই ঝড় চলছে তা আমি তোকে কিভাবে বুঝাবো। মাথায় ২৪ ঘন্টা একটা অজ্ঞাত শঙ্কা ঘুরঘুর করছে৷ আমি কেনো ভাবেই শান্ত থাকতে পারছি না। ”

বন্যা ঘন্টাদুয়েক মেঘের সাথে গল্প করেছে। এরমধ্যে মিষ্টিরাও বন্যার ফোনে ভিডিও কল দিয়ে মেঘের সাথে কথা বলেছে। কিছুক্ষণ পর হালিমা খান আবারও নাস্তা নিয়ে আসছেন। বন্যা বিপুল চোখে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“আন্টি, আমি নাস্তা খেয়েছি। আপনি প্লিজ এগুলো নিয়ে যান।”

হালিমা খান শক্ত কন্ঠে বললেন,
“তানভির হাবিজাবি কি দিছে ঐগুলা খাইছো? নাও এগুলো খাও।”

বন্যা অনুষ্ণ কন্ঠে বলল,
” ওনার রান্না খারাপ হয় নি।”

মেঘ আহ্লাদী কন্ঠে বলল,
” আম্মু, ভাইয়া যেহেতু রান্না পারে চলো ভাইয়াকে বিয়ে দিয়ে দেয়।”

হালিমা খান প্রখর তপ্ত স্বরে বললেন,
“এই বাড়িতে বিয়ের নাম ভুলেও মুখে নিবি না। ”

মেঘ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কেনো?”

“এমনি।”

হালিমা খান চলে গেছেন। বন্যা আরও কিছুক্ষণ বসে চলে যাওয়ার জন্য নিচে নামতেই মোজাম্মেল খানের সাথে দেখা। বন্যা ওনাকে দেখেই সালাম দিলো। মোজাম্মেল খান মিষ্টি করে হেসে সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
“বাসায় চলে যাচ্ছো?”
“জ্বি আংকেল।”
“সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, একা কিভাবে যাবে?”
“যেতে পারবো৷ সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে যাব। সমস্যা নেই।”

মোজাম্মেল খান গুরুভার কন্ঠে বললেন,
” সমস্যা আছে। মেঘ যেমন আমার মেয়ে তুমিও আমার মেয়ের মতো। এই সন্ধ্যে বেলা আমি আমার মেয়েকে যেমন একা ছাড়তে পারবো না তেমনি তোমাকেও একা ছাড়তে পারবো না।”

মোজাম্মেল খান উচ্চস্বরে ডাকলেন,
“তানভির”

বন্যা খানিকটা ইতস্ততবোধ করছে। তানভির নিজের রুম থেকে বেড়িয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“জ্বি আব্বু। ”

“বন্যাকে ওদের বাসা পর্যন্ত দিয়ে আসো।”

তানভির আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে শুকনো গলায় ঢোক গিলল। মোজাম্মেল খান আবারও বললেন,
“নিয়ে যাবে কি না?”

তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“চাবি টা নিয়ে আসি৷”

#চলবে