#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৮৩
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_
মোজাম্মেল খান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,
“বাইক নিতে হবে না। তোমাকে আমি একটুও বিশ্বাস করি না। এক্সিডেন্ট করবা একা করো, আমার কোনো আপত্তি নেই কিন্তু তোমার অসাবধানতার জন্য অন্য কারো হাত-পা ভা*ঙবে এসব আমি সহ্য করব না। গাড়ি নিয়ে যাও।”
মোজাম্মেল খানের কথা শুনে বন্যা না চাইতেও হেসে ফেলল। তানভির ভ্রু গুটিয়ে চাবি আনতে চলে গেছে। মোজাম্মেল খান বন্যার দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বললেন,
“তুমি কিছু মনে করো না, আমাদের বাবা ছেলের সম্পর্কটাই এমন। এখন কিছু না বললে ওর বেপরোয়া স্বভাব কখনো ঠিক হবে না।”
বন্যা মৃদু হেসে বলল,
“আমি কিছু মনে করি নি আংকেল।”
“ঠিক আছে। সময় করে মাঝে মাঝে বেড়াতে এসো।”
“জ্বি আচ্ছা আংকেল।”
বন্যা তানভিরের পিছন পিছন বাসা থেকে বেড়িয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“আমি গাড়িতে যাব না।”
তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“বাইকে যাবে?”
“নাহ।”
“তো?”
“আমি রিক্সায় চলে যেতে পারবো আপনার যেতে হবে না।”
তানভির মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তোমাকে বাসায় পৌঁছে দেয়া আমার দায়িত্ব আর সেই দায়িত্ব টা স্বয়ং মোজাম্মেল খান আমাকে দিয়েছেন। ওনার কথা অমান্য করলে আমাকে বাসায় জায়গা দিবেন না। তুমি কি তাই চাও?”
বন্যা তৎক্ষনাৎ উত্তর দিল,
“না, আমার জন্য আপনার কোনো সমস্যা হোক তা আমি কখনোই চাইবো না। কিন্তু….”
“কোনো কিন্তু নেই। তুমি রিক্সায় যেতে চাইলে তাই যাব। চলো।”
“আংকেল যে গাড়ি নিতে বললো..”
“তোমার আংকেল নিশ্চয় এও বলছেন, আমি দায়িত্বজ্ঞানহীন, বেপরোয়া স্বভাবের ছেলে। গাড়ি না নেয়ার অপরাধে না হয় ২-১ টা বকা খেয়ে নিবো।”
বন্যা আড়চোখে তানভিরের দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে বলল,
“সব বুঝেন তাহলে বেপরোয়া চলাফেরা কেনো করেন?”
তানভির উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
“আব্বুর মতো তোমারও কি তাই মনে হয়?”
তানভির সামনে চলে গেছে। বন্যা অবাক লোচনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। কি বলবে তার উত্তর খোঁজে পেল না, খানিক বাদে মেইনগেইটের দিকে এগিয়ে গেল। প্রথমবারের মতো এক রিক্সায় দুজন পাশাপাশি বসেছে। স্বভাবতই বন্যা এক সাইড হয়ে বসেছে তবুও চলন্ত রিক্সায় তানভিরের শক্তপোক্ত বাহু বারবার বন্যার কাঁধের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে। আচমকা বন্যার হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। শুকনো গলায় বার বার ঢোক গিলছে, নিজেকে যতটা সম্ভব এক পাশে সরিয়ে নিচ্ছে যেনো কোনোভাবেই তানভিরের সঙ্গে ধাক্কা না খায়। বন্যা ভেতরে ভেতরে নিজের প্রতি ক্ষুব্ধ হচ্ছে, ভেবেছিল রিক্সায় একা চলে যাবে তাহলে বাইক, গাড়ির ঝামেলাও পোহাতে হবে না। গাড়িতে চলাচল করতে বন্যার একদম ই ভালো লাগে না। তারউপর মাঝেমধ্যে গলির রাস্তায় গাড়ি থেকে নামলে আশেপাশের মানুষজন কেমন করে চেয়ে থাকে, নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে এগুলো বন্যার সহ্য হয় না তাই সবসময় সাদামাটা চলতেই পছন্দ করে। বন্যার অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড দেখে তানভির আচমকা নিজের হাত বন্যার পেছন দিকে ঘুরিয়ে বন্যার কাঁধ বরাবর রিক্সাতে রেখেছে। একবার তানভিরের হাতের স্পর্শ অনুভব হওয়ামাত্র বন্যা সঙ্গে সঙ্গে তানভিরের হাতের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,
“হাতটা সরান, প্লিজ।”
তানভির স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“যেভাবে সাইডে যাচ্ছ, কখন জানি রিক্সা থেকে পরে যাও। আমার আব্বাজান বাইক আনতে নিষেধ করেছেন যাতে তুমি ব্যথা না পাও সেখানে রিক্সা থেকে পরে যদি ব্যথা পাও, আব্বু কি আমাকে আস্ত রাখবেন? তুমিই বলো।”
বন্যা পূর্বের ন্যায় আবারও বলল,
“আমি পড়বো না, প্লিজ হাতটা সরান। আমার অস্বস্তি লাগছে।”
তানভির উদাস ভঙ্গিতে বলল,
“আমার পাশে বসে কেউ এমন আচরণ করলে আমারও অস্বস্তি লাগে।”
মেঘের মতো তানভিরও খুব জেদী এটা বন্যার অজানা নয়। তানভির হাত সরাবে না এটা বুঝতে পেরে বন্যা দুহাতে নিজের ব্যাগটাকে শক্ত করে ধরে গুটিশুটি মেরে বসে বুকের বা পাশে অবস্থিত হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি অনুভব করছে। ইদানীং বন্যার মাথায় হুটহাট তানভিরের চিন্তা চলে আসে। বিশেষ করে তানভিরের জীবন কাহিনী শুনার পর থেকে বন্যা মাঝে মাঝেই সেই ভাবনায় মগ্ন থাকে। না চাইতেও তানভিরের প্রতি অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। তানভির সামনে আসলে নিজের অজান্তেই সেই অবিদিত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে। বন্যা বার বার ঘড়ি দেখছে আর রাস্তা কতদূর বুঝার চেষ্টা করছে। তানভির কপাল গুটিয়ে বন্যার দিকে তাকিয়ে আছে। তানভির আচমকা মৃদুস্বরে ডাকল,
“বন্যা।”
বন্যা তৎক্ষনাৎ চোখ বড় করে তানভিরের দিকে তাকালো। বাতাসে চুল এলোমেলো উড়ছে, ভ্রু যুগল
কুঁচকানো, নাক স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা ফোলা,
জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে তানভির প্রশ্ন করল,
“তোমার জীবনের একমাত্র অস্বস্তিকর ব্যক্তি টা কি আমি ই?”
বন্যা তখনও নিরেট দৃষ্টিতে তানভিরের দিকে তাকিয়ে আছে। তানভির বন্যার পাশ থেকে হাত সরিয়ে এনে চোখ নামিয়ে আবারও বলল,
“যদি তাই হয় তবে আজকের পর তোমার অস্বস্তির কারণ আমি হবো না।”
তানভির পকেট থেকে ফোন বের করে কারো সাথে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে গেছে। বন্যা অবাক চোখে তানভিরকে দেখছে। তানভিরের মনোযোগ ফোনে, অন্যদিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর কন্ঠে কথা বলেই চলেছে। বন্যার নজর আঁটকে আছে তানভিরের গাল ভর্তি কিছুটা লম্বা দাঁড়িতে, সেই সঙ্গে বাতাসের সাথে সাথে চুলের নড়াচড়াও খেয়াল করছে। বন্যার শরীর জুড়ে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে চলেছে। বাকি রাস্তা তানভির একবারের জন্যও বন্যার দিকে তাকায় নি। অথচ বন্যা পুরো রাস্তা তানভিরের ঘোরে বন্দি ছিল। গলির মোড় পর্যন্ত আসতেই মাগরিবের আজান পড়ছে। তানভির চাপা স্বরে বলল,
“মামা রিক্সা থামান।”
তানভির রিক্সা থেকে নেমে ওয়ালেট থেকে টাকা বের করে রিক্সা ভাড়া দিয়ে এক পলক বন্যার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“সাবধানে যেও।”
তানভির মাথা নিচু করে হাঁটতে শুরু করল। বন্যা থম মেরে রিক্সায় বসে আছে। তানভিরের আকস্মিক পরিবর্তন বন্যার মনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে।
এদিকে মেঘ দিনে কম করে হলেও আবিরকে ১০০ মেসেজ পাঠায়। আজও তার ব্যতিক্রম হয় নি। কিন্তু আবিরের কোনো রিপ্লাই আসে না। সন্ধ্যা থেকে একের পর এক কল দিচ্ছে আবির কল রিসিভও করছে না। মনের ভেতরে জমে থাকা অভিমানে মেঘের চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। কাঁদো কাঁদো মুখ করে আবিরকে চিঠি লিখছে,
“প্রিয় নিষ্ঠুর মানব,
কেমন আছেন? আমি জানি খুব ভালো আছেন। অবশ্য ভালো থাকার ই কথা কারণ মেঘ নামক এক উন্মাদের থেকে মুক্তি পেয়ে গেছেন। কিন্তু আমি ভালো নেই, একটুও ভালো নেই। আজ থেকে দেড় বছর আগ পর্যন্ত আমি খুব ভালো ছিলাম। কারণ তখন আবির নামক কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব আমার হৃদয়ে ছিল না। কিন্তু এই দেড় বছরে সবকিছু বদলে গেছে, সেই সঙ্গে বদলে গেছে আমার অভিপ্রায়ও। আবির নামক নিষ্ঠুর মানবের প্রতি আমার তীব্র আসক্তি জন্মেছে। প্রতিনিয়ত ওনাকে দেখার জন্য উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছি। ওনার আকস্মিক দূরত্ব মেনে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তারউপর আমার অবিদ্যমানতায় ওনার চলে যাওয়াটা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারি নি। তাই ওনার আদেশ মেনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছি।ওনাকে জানিয়ে দিয়েন, আমি এখন আলহামদুলিল্লাহ সুস্থ আছি। খাওয়াদাওয়া, ঔষধ সবকিছু ঠিকমতো খাচ্ছি। যদি সম্ভব হয় তবে আমায় যেন ক্ষমা করে দেন। ওনি আমার মেসেজের রিপ্লাই করছেন না তাই বাধ্য হয়ে চিঠি লিখছি। আমার একটা কবুতর থাকলে তার পায়ে বেঁধেই চিঠিটা পাঠাতাম। কিন্তু আপসোস আমার এমন কোনো মাধ্যম নেই তাই বাধ্য হয়ে চিঠিটা ইনবক্সে পাঠাতে হচ্ছে। ওনার গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
আজ আর কোনো মেসেজ দিব না। ওনাকে সাবধানে থাকতে বলবেন।
ইতি ওনার অবাধ্য ডোনা,
মেঘ
আবির ল্যাপটপে কাজ করছিলো। মেঘের আইডি থেকে মেসেজটা আসা মাত্রই ফোন হাতে নিয়ে মেসেজ টা পড়েছে। দুচোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তানভিরকে কল দিল। তানভির কল রিসিভ করে একদমে সরি সরি সরি সরি বলেই যাচ্ছে। আবির ঠান্ডা কন্ঠে ধমক দিল,
” হয়েছে থাম। এখন সরি বললে আর কি হবে?”
তানভির মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,
“বনুর সাথে কথা হয়েছে?”
“না।”
“রাগটা সাইডে সরিয়ে বনুর সাথে একটু কথা বলো। ওর মনের অবস্থা খুব খারাপ।”
আবির কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“এত সহজে তোর বোনকে ছাড় দিচ্ছি না। ওর জন্য কি পরিমাণ কষ্ট প্রতিনিয়ত আমি অনুভব করি কমপক্ষে তার একাংশ উপলব্ধি করুক তারপর না হয় ভেবে দেখবো।”
তানভির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আমার বোনের চোখে তোমার জন্য আর এক ফোঁটা অশ্রুও দেখতে চাই না আমি।”
আবির মেকি স্বরে বলল,
“আপসোস, আজ একটা বোন নেই বলে আমার পক্ষ ধরে কেউ কথা বলতে পারে না।”
তানভির মুচকি হেসে শুধালো,
“বড় আব্বুকে কি বলবো?”
আবির আহ্লাদী কন্ঠে বলে উঠল,
“আপাতত দাদা-দাদু হওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে বলিস। এখন আর বোন লাগবে না আমার মেয়ে বড় হয়েই আমার পক্ষে কথা বলবে।”
“আহাগো। শখ কত!”
আবির হাসি থামিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“শুন, তোর বোন সুস্থ হলে ভার্সিটিতে যেতে বলিস। সারাদিন বাসায় থেকে উল্টাপাল্টা চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই।”
“তুমি কি বনুর সাথে কথা বলবাই না?”
আবির মুচকি হেসে বলল,
“তোর বোনের সাথে কথা না বলে থাকতেই পারবো না আমি। শুধু কয়েকটা দিন দেখব, এই আর কি! রাখছি এখন, সাবধানে থাকিস।”
“তুমিও সাবধানে থেকো, আল্লাহ হাফেজ।”
প্রতিদিনের ন্যায় আজ বিকেলেও মেঘ ঘুম থেকে উঠে ছাদে আসছে। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে এক জায়গায়
স্থির দাঁড়িয়ে আকাশের পানে চেয়ে আনমনে কিছু ভাবছে। হঠাৎ পেছন থেকে তানভির ডাকল,
” বনু, তোর কি মন খারাপ?”
মেঘ থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি চোখ মুখ মুছে ভেজা কন্ঠে বলল,
“কই না তো।”
তানভির মেঘের থেকে কিছুটা দূরে ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“কাঁদলেই যদি সব পাওয়া যেতো তবে সবাই তাদের ইচ্ছে পূরণ করতে দিনরাত এক করে কাঁদতো। বুঝলি?”
মেঘ উপর-নিচ মাথা নাড়লো। মেঘ কেন কাদঁছে তা জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করল না। মেঘও কিছু বুঝানোর চেষ্টা করল না। তানভির মলিন হেসে বলল,
“জানিস তো আল্লাহ ধৈর্যশীল ব্যক্তিকে অনেক বেশি পছন্দ করেন। ধৈর্য রাখ, ইনশাআল্লাহ ভালো ফলাফল পাবি।”
মেঘ ভেজা চোখে তানভিরের দিকে তাকিয়ে করুণ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া, আবির ভাই কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছেন।”
“তোমার সাথে রেগুলার কথা হয়?”
“না। ভাইয়া একটু ব্যস্ত আছে।”
“ওহ।”
তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো,
“তুই ঠিক আছিস?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
“ভার্সিটিতে যাচ্ছিস না কোনো?’
মেঘ মন খারাপ করে উত্তর দিল,
“ভালো লাগে না।”
তানভির মুচকি হেসে বলল,
“ক্লাসে গেলেই মন ভালো হয়ে যাবে। সকালে রেডি থাকিস, তোকে নিয়ে বের হবো।”
মেঘ ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো। তানভির পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে মেঘের সামনে রেখে ধীর কন্ঠে বলল,
“সন্ধ্যের আগে রুমে চলে যাস।”
তানভির চলে গেছে। একটু পরেই মেঘকে খোঁজে মীম ছাদে আসছে। মেঘ নিজের চকলেট থেকে অর্ধেকটা ভেঙে মীমকে দিয়েছে। মীম উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“আবির ভাইয়া কি তোমার সাথে এখনও কথা বলেন না?”
“না।”
“কিন্তু কেনো?”
“জানি না।”
“এখন কি করবা?”
মেঘ খানিক ভেবে হঠাৎ নিঃশব্দে হেসে বলল,
“কাল পরশু শাড়ি পড়ব। আমায় ছবি তুলে দিস।”
“আচ্ছা।”
দিন কাটছে শম্বুকগতিতে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পরপর মালিহা খান অথবা হালিমা খানের ফোনে আবিবের কল আসে। একে একে সবার সাথেই ভিডিও কলে কথা বলে কিন্তু মেঘের কন্ঠস্বর শোনামাত্রই ব্যস্ততার ভান করে কল কেটে দেয়। প্রথম প্রথম মেঘ কথা বলতে চাইলেও আবির কথা বলতো না। এখন মেঘও তেমন আগ্রহ দেখায় না। আজ সন্ধ্যার পরপর মীম, আদি আর মেঘ সোফায় বসে গল্প করছে আর স্যুপ খাচ্ছে। এমন সময় মালিহা খানের ফোনে আবিরের নাম্বার থেকে ভিডিও কল আসছে।
মেঘ উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো,
“বড় আম্মু, তোমার বাবু কান্না করছে।”
মালিহা খান রান্নাঘর থেকে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কে কান্না করছে?”
মেঘ ফিক করে হেসে উত্তর দিল,
“তোমার ছেলে কল দিচ্ছে।”
“তুই রিসিভ করতে পারিস না?”
মেঘ উদাস ভঙ্গিতে বলল,
“তোমার বাবুর কি আমার সাথে কথা বলার মতো সময় আছে নাকি? কত ব্যস্ত মানুষ। তুমি ই কথা বলো।”
দ্বিতীয়বার কল বাজতেছে। মেঘ ফোন নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। মালিহা খান রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে এসে কল রিসিভ করে মেকি স্বরে প্রশ্ন করলেন,
“কি হয়েছে বাবু? কান্না করছিস কেনো?”
আবির কি বলতে চেয়েও থেমে গেছে। ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে শুধালো,
“কান্না করলাম কোথায়? আর হঠাৎ বাবু ই বা ডাকছো কেনো?”
“আমি নিজে থেকে ডাকি নি। মেঘ বলতাছে আমার বাবু নাকি কান্না করছে তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“তোমাদের আদরের মেয়েকে বাড়াবাড়ি কম করতে বলো।”
মেঘ ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকিয়ে আছে। মালিহা খান মেঘকে এক নজর দেখে সহসা রান্নাঘরের দিকে তাকালেন। মেঘের হাতে ফোন দিতে দিতে আতঙ্কিত কন্ঠে বলে উঠলেন,
“নে মেঘের সাথে কথা বল, তরকারি পুড়ে যাচ্ছে মনে হয়। আসছি আমি।”
তাৎক্ষণিক ঘটনায় মেঘ থতমত খেয়ে কোনোরকমে ফোন মুখের সামনে ধরেছে। আবিরের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই আবির চোখ নামিয়ে নিয়েছে। টেবিলের উপর ফোন রেখে পাশে ল্যাপটপে কাজ করছে। মেঘ অপলক দৃষ্টিতে আবিরকে দেখছে, সহসা ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটেছে। কতদিন পর প্রিয় মানুষটাকে দেখছে, আজ মুখের উপর কলও কাটছে না। মেঘ ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে আহ্লাদী কন্ঠে ডাকল,
“বাবু”
আবির অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে মেঘের হাসি দেখে সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিয়েছে। মেঘ দুষ্টামির ছলে আবারও ডাকল,
“বাবু……”
আবির এবার ফোন কাছে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “এইযে বাবু বাবু ডাকছেন। বাবুর মতো আচরণ করলে সামলাতে পারবেন?”
আবিরের মুখে এমন কথা শুনে মেঘের আঁখি যুগল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি প্রশস্ত হয়ে গেছে। নিষ্পলক চোখে আবিরের মুখের পানে তাকিয়ে আছে। ফোন আগের জায়গায় রেখে আবির আবারও কাজে মনোযোগ দিয়েছে। তবে মুখে গাম্ভীর্যতার বদলে ক্ষীণ হাসি ফুটেছে। মালিহা খান এগিয়ে এসে বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলে উঠলেন,
“বাসায় থাকাকালীন সারাক্ষণ ই বকবক করতিস আর এখন মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। আগের রূপে ফিরে গেছিস? দেখি দে ফোন।”
মেঘ বড় আম্মুকে ফোন দিয়ে আহাম্মকের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। খানিক বাদে মাথা নিচু করে রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। মালিহা খান সোফার কাছে আসতেই মীম আর আদিও আবিরের সাথে কথা বলতে শুরু করেছে। এরমধ্যে হালিমা খানও রুম থেকে বেড়িয়ে এসেছেন। মেঘ নিজের রুমে গিয়ে আবিরের একটা ছবি বের করে কিছুক্ষণ পরখ করে চোখ জোড়া বন্ধ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আই মিস ইউ।”
আজ সকাল সকাল মেঘ শাওয়ার নিয়ে একেবারে রেডি হয়ে নিচে নেমেছে। নাস্তা করে তানভিরের সাথে বেড়িয়েছে। মোজাম্মেল খানের নির্দেশ মতই বোনকে গাড়ি দিয়ে নিয়ে গেছে। অনিবার্য কারণ বশত প্রথম ক্লাস হবে না তাই মিনহাজ, তামিম, মিষ্টি, বন্যা চারজন চা খেতে বেড়িয়েছে। মেঘ ওদের দেখেই উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
“ভাইয়া, গাড়ি থামাও। বন্যারা চা খাচ্ছে।”
তানভির ওদের দিকে একবার তাকিয়ে পর পর মেঘের হাস্যোজ্জ্বল মুখের পানে তাকিয়ে হেসে বলল,
“কে জানি বলছিলো ভার্সিটিতে আসতে ভালো লাগে না?”
মেঘ তানভিরের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হেসে বলল, “কে জানি বলছিলো, মনে নেই।”
তানভির মুখে হাসি রেখেই বলল,
“ঠিক আছে যা। ক্লাস শেষে কল দিস। ফ্রি থাকলে এসে নিয়ে যাব।”
মেঘ কোমল কন্ঠে বলল,
“ভাইয়া, আসো। এক কাপ চা খেয়ে যাও।”
“আজ না। অন্য কোনো দিন।”
“প্লিজ ভাইয়া, চলো।”
মিনহাজ, তামিম মেঘকে দেখেই এগিয়ে আসছে। তানভিরকে রিকুয়েষ্ট করে চা খেতে নিয়ে গেছে। বন্যা চোখ তোলে তানভিরকে দেখেই চোখ সরিয়ে নিয়েছে। মাথা নিচু করে মেঘের সাথে আস্তে আস্তে কথা বলছে। তানভির, মিনহাজ আর তামিমের সাথে টুকটাক কথা বলতে বলতে এক কাপ চা খেয়েছে। বন্যার দিকে এক বারের জন্যও তাকায় নি। মিনহাজ বন্যাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাবি, আজকের ট্রিট যে আপনার পক্ষ থেকে এটা ভাইকে বললেন না?”
বন্যা রাগী স্বরে বলল,
” ভাবি ডাকটা বন্ধ করবি?”
তানভির টাকা বের করে বিল পরিশোধ করতে যাবে ওমনি বন্যা তানভিরের হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে শমিত কন্ঠে বলল,
“আজকের বিল আমি দিব।”
তানভির উষ্ণ স্বরে জানাল,
“তোমার লিস্টে নিশ্চয় আমি ছিলাম না। আমার বিল টা আমি দিয়ে দিচ্ছি।’
বন্যা এবার শক্ত কন্ঠে বলল,
” বললাম তো আমি বিল দিব।”
মিষ্টি আর মেঘ কানে কানে ফিসফিস করে কথা বলছে। মেঘ একহাতে মুখ চেপে হাসছে আর দুজনকে দেখছে। মিনহাজ আর তামিমও তাদের দেখছে। মিনহাজ ইচ্ছেকৃত গলা খাঁকারি দিতেই তানভির সেদিকে তাকালো। বন্যা তখনও তানভিরের হাত ধরে আছে। বন্যার নজর মেঘদের দিকে পড়তেই তড়িৎ বেগে হাত সরিয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়েছে। তানভির টাকা পকেটে রেখে স্বাভাবিক ভাবে মেঘের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে। বন্যা টাকা পরিশোধ করে সামনে চলে গেছে। মেঘ আর মিষ্টি পেছন পেছন যাচ্ছে। মেঘ পেছন থেকে সর্বশক্তি দিয়ে বলে উঠলো,
“তোর সাহস তো কম না, তুই আমার ভাইয়ের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলিস।”
বন্যা থেমে ক্ষীণ ক্রোধ দেখিয়ে বলল,
“সামান্য এক কাপ চায়ের জন্য যে তোর ভাই টাকার
গরিমা দেখালো সে বেলায়।”
“আমার ভাই টাকার গরিমা দেখায় নি। মিনহাজ, তামিম এমনকি আমি ভাইয়াকে ডেকে নিয়ে আসছি। আসার পর তুই ভাইয়ার সাথে কোনো কথা বলিস নি, কথা না ই বলতে পারিস। চা পর্যন্ত খেতে বলিস নি অথচ ট্রিট তুই দিচ্ছিস। ভাইয়ার নিজের বিল পরিশোধ করাটা কি অন্যায় ছিল?”
“তুই তো তোর ভাইয়ের পক্ষ ই নিবি।”
মেঘ এক গাল হেসে বিড়বিড় করে বলল,
“তুই আমার ভাবি হলে, তোর পক্ষ ই নিতাম।”
বন্যা রাগী স্বরে বলল,
“বিড়বিড় করে কি বলছিস?”
“কিছু না।”
★
মেঘ বিকেলে একা একায় শাড়ি পড়ে মীমকে নিয়ে ছাদে গেছে। মাথায় ঘোমটা দেয়া ছবি থেকে শুরু করে, স্টাইল করে বেশ কিছু ছবি তুলেছে। রুমে বসে বসে ছবিগুলো দেখছে। একা একা শাড়ি পড়ায় কুঁচির যাচ্ছেতাই অবস্থা। তবুও অনেক খোঁজাখুঁজি করে ৩ টা ছবি আবিরকে পাঠিয়েছে। প্রথম ২ টা ঘোমটা ছাড়া ছবি, তৃতীয় টা মাথায় ঘোমটা দেয়া ছবি। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই আবির মেসেজ সীন করেছে। ছবিগুলো দেখামাত্র আবিরের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠেছে। মেঘের মায়াবী আদলে তাকিয়ে আবির মোলায়েম কন্ঠে বলে উঠল,
“মাশাআল্লাহ। দেখি, আবিরের দরুন তার প্রেয়সীর মন ঠিক কতখানি উত্তপ্ত হতে পারে।”
কাছে টেনে ছবিগুলো দেখতে দেখতে আবির হঠাৎ ই কপাল গুটালো। শাড়ির কুঁচিতে নজর আটকে আছে। আবির মুচকি হেসে আকুল কন্ঠে বলল,
“ইশশ, আমি কাছে থাকলে কুঁচির বেহাল দশা হতেই দিতাম না।”
আবিরের রিপ্লাই পাবার আশায় মেঘ নিষ্পলক দৃষ্টিতে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। ৫ মিনিট, ১০ মিনিট, ১৫ মিনিট হয়ে গেছে অথচ কোনো রিপ্লাই আসছে না। মেঘের ব্যাকুল মন কোনোভাবেই শান্ত হচ্ছে না। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বেশকিছুক্ষণ ভেবে হঠাৎ ই মুচকি হেসে বলল,
“কথায় আছে, সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকাতে হয়। এতদিন আপনার বহু তালবাহানা সহ্য করেছি এবার আমার ভিন্ন রূপ দেখাবো।”
মেঘ নিজের তোলা শাড়ি পড়া ছবিগুলো থেকে ২ টা ছবি ফেসবুকে ডে পোস্ট দিয়ে অপেক্ষা করছে। যেই ভাবনা সেই কাজ। পোস্ট করার ১০ মিনিটের মধ্যে আবির পোস্ট সীন করেছে। মেঘ মিটিমিটি হাসছে, আবিরকে জ্বালানোর এর থেকে উত্তম উপায় আর নেই। হাতে গুনা ২ মিনিটের মধ্যে মেঘের আইডি থেকে ছবিগুলো ডিলিট হয়ে গেছে। মেঘ নিঃশব্দে হেসে বিড়বিড় করল,
“মি. খান আপনি ধরা পরে গেছেন। আপনার রাগ, জেদের আড়ালে লুকানো অনুভূতি প্রকাশিত হয়ে গেছে। আপনি সবকিছু আড়াল করতে পারলেও আপনার অন্তরের হিংসুটে মনোভাবকে কোনোভাবেই আড়াল করতে পারলেন না।”
একদিনের ব্যবধানে আবিরকে পাঠানো মেসেজের পরিমাণ কমে এসেছে। ছবি পাঠানোর পর ২ দিনে আবিরকে একটাও মেসেজ করে নি। এমনকি একবারের জন্য কলও করে নি। সন্ধ্যায় কল দিলে আবিরকে শুনিয়ে শুনিয়ে মেঘ ইচ্ছেকৃত ব্যস্ততার ভান করে। আবিরের বড় মামী অসুস্থ তাই আজ সকাল সকাল আলী আহমদ খান আর মালিহা খান ত্রিশালের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। বিকেল দিকে মেঘ কল দিয়ে মামির খোঁজ নিয়েছে। মালিহা খানরা এক রাত থাকবেন সেই সুবাদে নিশ্চিতভাবে বলা যায় আজ আবির হালিমা খানের নাম্বারে কল দিবেই দিবে। এজন্য সন্ধ্যার পর পর মেঘ নিজের নাম্বার থেকে হালিমা খানের নাম্বারে কল দিয়ে দুই ফোন বিছানার উপর রেখে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে গুনগুন করে গান গাইতেছে। মীমকে আগে থেকেই সবকিছু শিখিয়ে দিয়েছে। মামনির নাম্বার ওয়েটিং পেয়ে আবির বাধ্য হয়ে কাকিয়ার নাম্বারে কল দিয়েছে। যথারীতি মীম কল রিসিভ করে মেঘের শেখানো কথাগুলো বলতে শুরু করেছে। আবির সেসব কথায় পাত্তা না দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“মামনি কি বেশি ব্যস্ত?”
মীমের সরল স্বীকারোক্তি,
“মামনি সম্পূর্ণ ফ্রী। আম্মুর সঙ্গে গল্প করছেন। কেনো ভাইয়া?”
আবির ভ্রু গুটিয়ে ভারী কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“মামনির ফোন ওয়েটিং কেনো?”
“ওহ আচ্ছা। মামনির ফোন দিয়ে আপু কার সঙ্গে যেন কথা বলতেছে।”
আবির তড়িৎ গতিতে বলে উঠল,
“৩০ মিনিট যাবৎ ওয়েটিং। এতসময় ধরে কার সাথে কথা বলছে?”
“আমি জানি না। আমাকে বিরক্ত করতে নিষেধ করেছে।”
আবিরের কপাল কুঁচকানো। মুহুর্তেই চেহারা অন্ধকার হয়ে গেছে। ঢোক গিলে নিজেকে সংযত করে ধীর কন্ঠে বলল,
“ফোনটা মামনি না হয় কাকিয়াকে দে।”
“ঠিক আছে।”
মীম ফোন দিয়ে দৌড়ে মেঘের রুমে চলে গেছে। মেঘকে ঘটনা বলতেই মেঘ শুধু মুচকি হাসলো। মামনি আর কাকিয়ার সাথে কথা শেষ করে আবির তৎক্ষনাৎ তানভিরকে কল দিয়েছে। যথারীতি তানভিরও মিনহাজ, তামিমকে কল দিয়ে পরপর বন্যাকে কল দিয়েছে। বন্যা কল রিসিভ করতেই তানভির প্রশ্ন করল,
“সন্ধ্যার পর বনুর সাথে কথা হয়েছে তোমার?”
বন্যা স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিল,
“আজ ফোনে কথা হয় নি।”
“কথা হয়নি?”
“নাহ। কেনো?”
“তেমন কিছু না, রাখছি।”
তানভির বাসায় ফিরে আম্মুর ফোনও চেক করেছে অথচ কারো নাম্বার নেই। মেঘকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারছে না।
আলী আহমদ খান আর মালিহা খান একরাত থেকে পরদিন ই বাসায় চলে আসছেন। আলী আহমদ খান বাসায় ফিরে বিকেল থেকে মন খারাপ করে সোফায় বসে আছেন। মালিহা খান শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনার কি শরীর খারাপ?”
আলী আহমদ খান এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লেন। মোজাম্মেল খান নিজের রুম থেকে বেড়িয়ে আসতে আসতে বললেন,
“ভাবি, ভাইজানের শরীর নয়, মন খারাপ। এই মন আর ভালো হবে না।”
মালিহা খান উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালেন,
“কেনো? কি হয়েছে?”
মোজাম্মেল খান ঠাট্টার স্বরে বললেন,
“ভাইজান, ভাবিকে বলবো?”
আলী আহমদ খান গম্ভীর কণ্ঠে হুঙ্কার দিতেই মোজাম্মেল খান থেমে গেছেন। মোজাম্মেল খান হালিমা খানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
” দু’কাপ চা দিও।”
মেঘ সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আহ্লাদী কন্ঠে বলল, “আব্বু, চা আমি করি?”
মোজাম্মেল খান আর আলী আহমদ খান দু’জনেই একসঙ্গে মেঘের দিকে তাকালেন। আলী আহমদ খান ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,
“চা করতে পারবা?”
“পারবো।”
মোজাম্মেল খান রাশভারি কন্ঠে বলে উঠলেন,
“আমার মেয়ের হাতের রান্না খাওয়ার পর, সামান্য চা নিয়ে ডাউট করা শোভা পায় না। আমার মেয়ে সব পারবে, প্রয়োজনে আমি শিখিয়ে দিব।”
আলী আহমদ খান শুকনো গলায় কেশে উঠলেন। আব্বুর ওভার কনফিডেন্স দেখে মেঘ মৃদু হেসে রান্নাঘরে চলে গেছে। আলী আহমদ খান মেকি স্বরে বললেন,
“তুই রান্না শেখাবি?”
“হ্যাঁ।”
“ঠিক আছে। তাহলে আগে তুই ই বল, চিংড়ি মাছের মালাইকারি কিভাবে রান্না করে?”
মোজাম্মেল খান ঝটপট উত্তর দিলেন,
“জানি না।”
আলী আহমদ খান আবারও প্রশ্ন করলেন,
“পায়েস তো রান্না করতে পারবি নাকি?”
“পারবো না।”
আলী আহমদ খান তপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“এই জীবনে শখেও কোনোদিন রান্নাঘরে পা রাখছিলি?”
মোজাম্মেল খান মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বললেন, “আমি না হয় জীবনেও পা রাখি নি। গত ২০ বছরে তুমি পা রেখেছো?”
এরমধ্যে মেঘ দুই কাপ চা নিয়ে আসছে। আলী আহমদ খান চায়ে চুমুক দিয়ে ভারী কন্ঠে বললেন,
“আমাকে তো তোর ভাবি রান্নাঘরে ঢুকতে দেয় না। তাছাড়া আমি গত ২০ বছর পা না রাখলেও রান্না সম্পর্কে তোর মতো অজ্ঞ না। খুব তো বলছিস তোর মেয়েকে তুই রান্না শিখাবি। সামান্য পায়েসের রেসিপি বলতে পারছিস না আবার সব শেখাবি।”
মোজাম্মেল খান রাগী স্বরে বললেন,
“তুমি বলো তাহলে।”
আলী আহমদ খান গুরুভার কন্ঠে বলে উঠলেন,
“তুই কি কোনোভাবে আমায় চ্যালেঞ্জ করছিস?”
“হ্যাঁ করছি।”
আব্বু আর বড় আব্বুর কথোপকথনের মাঝে মেঘ থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুই-তিনবার থামানোর চেষ্টাও করেছে কিন্তু থামাতে পারে নি। মালিহা খান নিজেও ব্যর্থ হয়েছেন। আলী আহমদ খান আচমকা বসা থেকে উঠে মোজাম্মেল খানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আমি মুখের কথায় বিশ্বাসী না। তুই অপেক্ষা কর, রান্না করে তোর সামনে হাজির করবো।”
হালিমা খান, মালিহা খান আর মেঘ তিনজনই আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে। আলী আহমদ খান মেঘকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“চলো, আজ আমি তোমাকে দিক নির্দেশনা দিব। যেভাবেই হোক তোমার আব্বুকে চ্যালেঞ্জে হারাতেই হবে।”
মালিহা খান উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠলেন,
” দয়া করে আমার সাজানো রান্নাঘরটাকে ছেড়ে দেন। পায়েস আমি করে দিচ্ছি।”
আলী আহমদ খান উদাসীন কন্ঠে বলে উঠলেন,
“তুমিও আমায় ভরসা করো না?”
মালিহা খান উত্তর খোঁজে পেলেন না। একবার উপর নিচ মাথা নাড়ছেন আবার এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ছেন। যত যাই হোক পুরুষ মানুষ রান্নাঘরে গেলে সেই রান্নাঘরের নাজেহাল অবস্থা হতে বাধ্য। আবিবের জন্মের আগে-পরে আলী আহমদ খান মাঝে মাঝে শখ করে রান্না করতেন। রান্না যেমন তেমন, কিন্তু পরবর্তীতে রান্নাঘরে ঢোকার মতো অবস্থা থাকতো না। তারজন্য একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে মালিহা খান খুব করে অনুরোধ করেছেন যাতে আলী আহমদ খান রান্নাঘরে পা না রাখেন। সেই থেকে আলী আহমদ খান রান্নাঘরে পা রাখেন না। এত বছর পর ছোট ভাইয়ের সাথে চ্যালেঞ্জ নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকছেন। তবে আজ রান্না মেঘ করবে, ওনি কেবল মেঘকে সাহায্য করবেন। এরমধ্যে হালিমা খান তানভিরকে কল দিয়ে জানিয়েছে। আলী আহমদ খান নিজেই ফ্রিজ থেকে চিংড়ি মাছ, দুধ সহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বের করছেন। এদিকে ভয়ে মেঘের হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আলী আহমদ খান মানেই আতঙ্ক, আব্বুর থেকেও মেঘ বড় আব্বুকে বেশি ভয় পায়। রান্নায় গন্ডগোল করলে আজ মেঘের খবর ই আছে, এই ভয়ে বার বার ঢোক গিলছে। কিছুক্ষণের মধ্যে তানভির আসছে। হালিমা খান, মালিহা খান দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেঘদের কর্মকাণ্ড দেখছেন। তানভির রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“আমি কি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?”
আলী আহমদ খান রাগী স্বরে বললেন,
“তোমার আব্বু পাঠিয়েছে নাকি?”
“না না।”
“সাহায্য লাগবে না।”
তানভির ঠোঁট চেপে হাসছে আর ফোন দিয়ে ভিডিও করছে। মোজাম্মেল খান সোফায় বসে আছেন। ঘন্টাখানেক পর আবির কল দিয়েছে। কল
রিসিভ করতেই আবির বলে উঠল,
“আসসালামু আলাইকুম চাচ্চু।
প্রজেক্টের কিছু ডিটেইলস লাগতো। আগামীকাল সকালের মধ্যে দিলে ভালো হতো।”
মোজাম্মেল খান ঠাট্টার স্বরে বললেন,
” ওয়ালাইকুম আসসালাম। প্রজেক্ট নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আপাতত ভিডিও কল দাও।”
আবির ভ্রু কুঁচকে ভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ভিডিও কল কেনো?’
“আরে দাও আগে।”
সচরাচর মোজাম্মেল খানের সাথে ভিডিও কলে কথা হয় না বললেই চলে। প্রয়োজনে ২-৪ মিনিট ফোনেই কথা বলে। আবির ভয়ে ভয়ে ভিডিও কল দিল। মোজাম্মেল খান কল রিসিভ করে হাসতে হাসতে বললেন,
“তোমার আব্বুর মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। দাঁড়াও দেখাচ্ছি।”
আবির ভ্রু কুঁচকে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে আছে। চাচ্চুর কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না। মোজাম্মেল খান রান্নাঘরের কাছে গিয়ে ফোন ওদের দিকে ঘুরিয়ে হাসতে শুরু করেছেন। আলী আহমদ খান আবিরকে এক নজর দেখে শক্ত কন্ঠে বললেন,
“তোমার চাচ্চু আমায় চ্যালেঞ্জ দিয়েছে আমি নাকি রান্না পারি না।”
আবির শুকনো গলায় ঢোক গিলে ধীর কন্ঠে বলল, “আপনার শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো না। তারমধ্যে আজ ই এতটা পথ জার্নি করে আসছেন।এই অবস্থায় এসব চ্যালেঞ্জের কোনো মানে হয় না।”
আলী আহমদ খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
“আমি বেশি কিছু করছি না। মেঘ মামনিই সবটা দেখছে।”
মেঘের দিকে ফোন ঘুরাতেই আবিরের চোখ কপালে উঠার অবস্থা। মেঘের কপালে কাপড় বাঁধা, চুল গুলো শক্ত করে খোঁপা করা, ওড়না পেঁচিয়ে কোমড়ে বেঁধে রেখেছে। মেঘকে এ অবস্থায় দেখে আবির শুকনো মুখেই বিষম খেয়ে উঠেছে। আতঙ্কিত কন্ঠে বলে উঠল,
“এই পাগ…”
আবির মুখে আসা কথাটা গিলে দু চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে উষ্ণ স্বরে বলল,
“ও এখানে কি করে?”
মোজাম্মেল খান মেকি ভঙ্গিতে বললেন,
“তোমার আব্বু আমার মেয়েকে রান্না শেখাচ্ছে।”
আবির মনে মনে বিড়বিড় করল,
“তোমাদের পাগলামির মাঝে আমার অবুঝ বউটাকে কেনো টানো?”
আলী আহমদ খান মৃদুস্বরে বললেন,
“আবির, তুমি আমার স্পেশাল রেসিপিগুলো মিস করবে।”
আবির না চাইতেও মলিন হেসে শুধালো,
“তা কি কি রান্না হচ্ছে?”
“চিংড়ি মাছের মালাইকারি, বেগুন ভর্তা, পাবদা মাছ ভুনা, আমার স্পেশাল ডালের রেসিপি সাথে পায়েস।”
আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল,
“এত কিছু করার কি দরকার। আর আম্মু কোথায়?”
মীম মালিহা খানের কাছে ফোন নিয়ে গেছে। আবির রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠল,
“আম্মু, এসব কি হচ্ছে? তুমি কিছু বলছো না কেনো?”
“আমি অনেকবার বারণ করেছি। তোর আব্বু কি কথা শোনার মানুষ নাকি?”
আবির রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“আব্বুর এই শরীর নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকতে দিলে কেনো? আর তোমরা কি এটুকু বুঝো না, মেঘ কি বেগুন পুড়াতে পারবে নাকি? হাত পা পুড়ে নাজেহাল অবস্থা করে ফেলবে। ওনাদের উল্টাপাল্টা চ্যালেঞ্জকে তোমরা কিভাবে সাপোর্ট করছো?”
মালিহা খান শান্ত স্বরে বললেন,
“কারো কিছু হবে না তুই মাথা ঠান্ডা রাখ। তাছাড়া ওদের রান্না প্রায় শেষ দিকে।”
আবির রাগী স্বরে বলল,
“যা ইচ্ছে করো আমার কি!”
আবির রাগে কল কেটে দিয়েছে। মেঘদের রান্না প্রায় শেষ দিকে। তানভির ছবি তুলে আবিরকে পাঠিয়েছে। আবির ছবিগুলো দেখে সঙ্গে সঙ্গে রাগী ইমোজি পাঠিয়েছে। খাবার টেবিলে মুখোমুখি দুই ভাই বসা। মেঘ দু’জনকেই খাবার বেড়ে দিচ্ছে। মোজাম্মেল খান চুপচাপ খাবার শেষ করে উঠে যেতে যেতে বললেন,
“ভাইজান, তুমি জিতেছো। এবার মন ভালো হয়েছে?”
আলী আহমদ খান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“আমার মন ভালো করার অযথা উদ্যমটা খুব ভালো ছিল, ধন্যবাদ।”
#চলবে
#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৮৪
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_
আবির প্রজেক্টের কাজে অত্যধিক ব্যস্ত। মোজাম্মেল খানের সাথে কাজের ব্যাপারে প্রতিনিয়ত কথা হয় তবে ইদানীং আলী আহমদ খানের মন ভীষণ খারাপ। বাড়িতে কিংবা অফিসে কোথাও কারো সাথে বেশি কথা বলেন না। তানভির নিজের কাজের পাশাপাশি সময় পেলে মাঝেমধ্যেই আবিরের অফিসে যায়। রাকিব আর রাসেলকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করে। বিগত সাত বছরের ন্যায় বর্তমানে আবির ব্যতীত খান বাড়ির পরিবেশ ততটা নিস্তব্ধ নয়। দেড় বছরেরও বেশি সময় আবির বাসায় থাকাতে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বেশ মজবুত হয়েছে। আবির নিজের কাজ শেষ করে রুমে এসে ফ্রেশ হয়েই বাসায় কল দেয়। সারাদিনে ২-৪ মিনিট কথা হোক বা না হোক নিয়ম করে সন্ধ্যার পর ঘন্টাখানেক কথা বলাটা অভ্যাস হয়ে গেছে। আবিরের অনুপস্থিতিতে ১৭ দিন কেটে গেছে অথচ এতদিনেও মেঘের সাথে সম্পর্কের উন্নতি হচ্ছে না। প্রথম ৮-১০ দিনের মতো মেঘ আর কান্নাকাটি করে না বরং প্রতিনিয়ত আবিরকে জ্বালানোর নতুন নতুন পরিকল্পনা করে। আবির কাজের ফাঁকে মেঘের এসব কর্মকান্ড দেখে একা একায় হাসে। আবিরের হাসি দেখে কেউ কেউ হয়তোবা আবিরকে উন্মাদ ভাবে তবে আবিরের সেদিকে বিশেষ মনোযোগ নেই। প্রজেক্ট আর মেঘ ব্যতীত আপাতত আবিরের মস্তিষ্কে অন্য কিছুই নেই। প্রাত্যহিক সকালে ঘুম ভাঙার পর মেঘের প্রথম কাজ ক্যালেন্ডারে গত হওয়া এক একটা দিন মার্ক করা। মেঘের মতো আবিরও প্রেয়সীর ক্রন্দনরত আদলে হাসি ফুটানোর তাগিদে সর্বক্ষণ দিন গুনছে।
আজ সকাল থেকে মালিহা খান আর হালিমা খান রান্নাঘরে ব্যস্ত। আবিরের বড় মামিকে ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় নিয়ে আসবে সাথে বড় মামা আর মালাও আসবে। তাছাড়া মাইশা আর তার হাসবেন্ডকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছে। ইকবাল খান বেশকিছু দিন যাবৎ চট্টগ্রামে আছেন তাই মীম, আদিকে নিয়ে আকলিমা খান নিজেই স্কুলের মিটিং এ গেছেন। মেঘ ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে কেবল শুয়েছে এরমধ্যে বড় মামি আর মালা বাসায় আসছে। ওনাদের কন্ঠ শুনে মেঘ তাড়াতাড়ি নিচে আসছে। সালাম দিয়ে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করছে। মামি হাসিমুখে কথা বললেও মালা মুখ ফুলিয়ে রেখেছে। মেঘ মালার দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক জিজ্ঞেস করল,
” আপু কেমন আছেন?”
মালা এবার বাধ্য হয়ে উত্তর দিল,
“ভালো। তুমি?”
মেঘ মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো।”
মেঘ মালাদের পাশের সোফায় বসে চোখ বন্ধ করতেই গতবছর মাইশা আপুর বিয়ের প্রতিটা ঘটনা চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। তখন মালাকে নিয়ে মেঘের মনে অভিযোগের কমতি ছিল না। আবির একজন দায়িত্বশীল প্রেমিক হিসেবে কত সুন্দর ভাবে সবগুলো ঘটনার সমাধান করেছিলো। বোকা মেঘ আবিরের উদ্বীগ্নতা তখন বুঝতেই পারে নি। মাইশা আপুর গায়ে হলুদের দিন সকালে মেঘের উন্মুক্ত পৃষ্ঠে আবিরের হাতের স্পর্শের কথা মনে পড়তেই মেঘের শরীরের সব লোম দাঁড়িয়ে গেছে, সেই সঙ্গে শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছে। আবিরকে দেখার জন্য মনটা আনচান করছে। মেঘ চোখ মেলে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লো। মালা আড়চোখে মেঘকে দেখছে, মেঘের পড়নে একটা সাদামাটা থ্রিপিস, বিনুনি করা চুলগুলোও কোমড় ছাড়িয়েছে, সামনের দিকের ছোট ছোট চুলে কপাল ঢেকে আছে। ক্লাসে যাওয়ার আগে দেয়া গোলাপি রঙের লিপস্টিকের অল্পস্বল্প এখনও ঠোঁটে লেগে আছে। মালা অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মনে মনে ভাবছে,
“মেঘের মধ্যে স্পেশাল কি গুণ আছে যা আমার মধ্যে নেই। আমি কি তোমার প্রেমিকা হতে পারতাম না? এই বাড়ির বড় বউ হওয়ার জন্য আমি কি একেবারেই যোগ্য ছিলাম না?”
হালিমা খান রান্নাঘর থেকে উচ্চস্বরে ডাকলেন,
“এই মেঘ, তুই ও কি মেহমান হয়ে গেছিস?”
মেঘ তড়িঘড়ি করে উঠে রান্নাঘরে গেলো। বড় মামা এখনও আসে নি। মাইশা আপু আর ওনার হাসবেন্ড কে নিয়ে আসবেন। তাই আপাতত মামি আর মালার জন্য শরবত করা হয়েছে। মালাকে শরবত সাধতেই মালা বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,
“শরবত খাবো না আমি।”
মেঘ স্বাভাবিক ভাবেই শরবত রেখে দিয়েছে। মালিহা খান আর আবিরের বড় মামি নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। মালা সোফা থেকে উঠে সারা বাড়ি ঘুরে দেখছে, হয়তো আবিরের রুমে যেতে চেয়েছিল কিন্তু তালা দেখে আবারও নিচে আসছে। মেঘকে উদ্দেশ্য করে ঠাট্টার স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আবির ভাইয়ার রুমে তালা কেনো? তোমার জন্য নাকি?”
অতি সামান্য কথাতেই অভিমানী মেঘের মনে ভীষণ ক্ষোভ জমেছে। গম্ভীরমুখের গাম্ভীর্যতা সরিয়ে ক্ষীণ হেসে ধীর কন্ঠে বলল,
” উফফ, ভাবতেই ভালো লাগছে যে ওনি আমার জন্য এতটা উদ্বিগ্ন। আমার ভয়ে ওনি নিজের রুমে তালা দিয়ে গেছেন। আবির ভাই আমাকে এত ভয় পায়। ওয়াও!”
মেঘের মুখে উল্টাপাল্টা কথা শুনে মালা বেশ বিরক্ত হলো। মেঘ ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে ফের বলল,
“রুমে তালা থাকুক কিংবা না থাকুক, ওনার শূন্য রুমের পূর্ণতা ওনাকে ছাড়া অসম্ভব। তাছাড়া রুমে তালা দিয়ে ভিনদেশে পাড়ি দিলেও ওনার মনটা তো আমার কাছেই রেখে গেছেন।”
মালা রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠল,
“মানে?”
“নাথিং।”
ইদানীং আবিরকে জ্বালাতে জ্বালাতে মেঘের স্বভাব খারাপ হয়ে গেছে। মালাকে দেখেও খুব জ্বালাতে ইচ্ছে করছে। যেই ভাবনা সেই কাজ। মেঘ সোফায় বসে দুহাতে মালিহা খানের বাহু আঁকড়ে ধরে কাঁধ বরাবর মাথা এলিয়ে দিয়েছে। মালিহা খান কথা থামিয়ে ডানহাতে মেঘের কপালে হাত রেখে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালেন,
“কিরে শরীর খারাপ নাকি?”
মেঘ আহ্লাদী কন্ঠে বলল,
“নাহ। তোমার আদর খেতে খুব ইচ্ছে করছে।”
মালা ভেতরে ভেতরে রাগে কটকট করছে। মালিহা খান মেঘকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর আবিরের মামীর সঙ্গে কথা বলছেন। অন্যান্য কথোপকথন শেষে দুজনেই আবিরের ব্যাপারে কথা বলতে শুরু করেছেন। আবিরের মামি ঠান্ডা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“আবিরের জন্য মেয়ে কি পছন্দ করে রাখছো?”
মালিহা খান মলিন হেসে বললেন,
“মেয়ে কিভাবে পছন্দ করবো। ছেলে তো বিয়ের জন্য রাজি ই হয় না।”
“আবিরের পছন্দ আছে নাকি?”
মালিহা খান উদাস ভঙ্গিতে বললেন,
“আমি আবিরকে জিজ্ঞেস করেছি ভাবি। আবিরের আব্বু সরাসরি কিছু না বললেও ছেলের পছন্দ আছে কি না এ বিষয়ে ওনি নিজেও কয়েকবার জানতে চেয়েছেন কিন্তু আবির কিছুই বলে নি। উল্টো দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি করছে।”
“কি করেছে?”
“একদিকে আবির বিয়েতে রাজি হয় না, অন্যদিকে মেঘের আব্বু মেঘের জন্য সম্বন্ধ দেখছে এসব নিয়ে আবিরের আব্বু আর মেঘের আব্বুর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়ছে। এরপর থেকে দুই ভাই ই নিরব। বিয়ে বিষয়ক আলোচনা বন্ধ।”
মেঘ বড় আম্মুর দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে প্রশ্ন করল, “বড় আব্বু আর আব্বুর মধ্যে ঝগড়া হয়েছে? কবে?আমি কোথায় ছিলাম?”
“তেমন সিরিয়াস ঝগড়া না। কথা কাটাকাটি হয়ছিল। তোরা বাহিরে ছিলি। আমিও বিস্তারিত শুনি নি আর তোর বড় আব্বু আমাকে তেমন কিছু বলেও নি।”
মেঘ বোকার মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। মনে মনে ভাবছে,
“এজন্যই কি আম্মু সেদিন বিয়ের কথা বলতে নিষেধ করেছিলো?”
আবিরের আম্মু আর মামি আবারও নিজেদের মতো গল্প করছেন। মেঘ সোফার পাশ থেকে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে লুকিয়ে আবিরকে মেসেজ লিখেছে,
” বড় মামি আর মালা আপু আমাদের বাসায় আসছেন। বড় মামি আপনার বিয়ের…..”
লেখা অসমাপ্ত রেখেই মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছে। ফোন উল্টিয়ে রেখে পূর্বের ন্যায় আবারও বড় আম্মুর গা ঘেঁষে বসেছে। মালিহা খান ধীরেসুস্থে মেঘের চুলে হাত বুলাচ্ছেন। ৪ থেকে ৫ মিনিট পরেই মেঘের হাতে থাকা ঘড়ি কম্পিত হচ্ছে। ঘড়ির স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে,
You received
1 message from
Amar Abir…..
………..
মেঘ বুঝে উঠার আগেই মালার নজর ঘড়িতে পড়লো। মালা কপাল গুটিয়ে রাগান্বিত দৃষ্টিতে মেঘের ঘড়ির স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। মেঘ ঘড়ির স্ক্রিনে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই লাফিয়ে উঠেছে। আজ ১৭ দিন পর আবির মেসেজের রিপ্লাই করেছে মহানন্দে মেঘের বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা ছটফট করছে। খুশিতে চোখের কোণে পানি চলে এসেছে। প্রিয় মানুষটার নিজের হাতে কিনে পড়িয়ে দেয়া ঘড়িটায় আজ সেই মানুষটার নাম ভেসে ওঠায় মেঘের উজ্জ্বল মুখশ্রী আরও বেশি ঝলমল করছে। মেঘ ফোন হাতে নিয়ে এলোমেলো পায়ে সিঁড়ি পেরিয়ে নিজের রুমের দিকে ছুটছে। মালা নির্বাক চোখে মেঘকে দেখছে। মালিহা খান তপ্ত স্বরে বললেন,
“আস্তে যা। পড়ে যাবি তো।”
আবিরের মামি কপাল গুটিয়ে চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
“মেঘের হঠাৎ কি হলো? এভাবে ছুটছে কেনো?”
মালিহা খান মৃদু হেসে বললেন,
“ও এমনই। ওর ছোটাছুটির কারণ লাগে না। হয়তো কিছু একটা মনে পড়ছে এজন্য এভাবে ছুটছে। একটু পরেই চলে আসবে।”
মেঘ রুমে ঢুকেই উত্তেজিত হস্তে মেসেজ সীন করলো। আবিরের ছোট রিপ্লাই আসছে,
“আমার বিয়ের ব্যাপারে কি বলছে?”
মেঘের শরীর রীতিমতো কাঁপছে, ঠোঁটে স্মিথ হাসি ফুটে উঠেছে, দুচোখ জ্বলজ্বল করছে। মেঘ গলা খাঁকারি দিয়ে আস্তে করে বলল,
“মি. খান আমি ঠিক জানতাম, এই কথা বললে আপনার রিপ্লাই আসবেই আসবে।”
মেঘ কাঁপা কাঁপা হাতে মেসেজ লিখছে,
“আপনার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখার কথা বলছে। তাছাড়া মালা আপু……..”
আবিরের তৎক্ষনাৎ রিপ্লাই,
“মালা কি করছে?”
“আপনাকে মিস করছে।”
আবির রাগী ইমোজি পাঠিয়ে পরপর মেসেজ পাঠালো,
“ফাজলামো করবি না। মালা কি আজেবাজে কিছু বলছে?”
“হুমমমম।”
“কি বলছে?”
মেঘের আর কোনো রিপ্লাই নেই। আবির পর পর মেসেজ দিচ্ছে, মেঘ রিপ্লাই করছে না। বাধ্য হয়ে আবির কল দিয়েছে। মেঘের বামহাতে থাকা ঘড়ি আর ডানহাতে থাকা ফোন একসঙ্গে ভাইব্রেশন হচ্ছে। আবিরের কল দেখে মেঘ কিছু সময়ের জন্য থমকালো। বুকের বা পাশের তীব্র কম্পন উপেক্ষা করে চোখ পিটপিট করে কল রিসিভ। সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে আবিরের রাগান্বিত কন্ঠস্বর ভেসে আসছে,
“সমস্যা কি তোর? ত্যাড়ামি করাটা কি তোর স্বভাব হয়ে গেছে? আমার অপছন্দ জেনেও অনবরত এই কাজগুলো করেই যাচ্ছিস। কথা অসম্পূর্ণ রাখার অভ্যাস টা কবে ত্যাগ করবি?”
মেঘ মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,
“কেমন আছেন?”
আবির রাগান্বিত কন্ঠে হুঙ্কার দিল,
“তুই কি ভালো থাকতে দিচ্ছিস?”
মেঘ অভিমানী কন্ঠে বলল,
“আমি কি আপনাকে খুব বেশি জ্বালাতন করি?”
আবির উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করল,
“মালা কি বলছে?”
মেঘ ঢোক গিলে ভেজা কন্ঠে বলল,
“আমি আপনাকে খুব বেশি জ্বালায়। আমার অত্যাচারে আপনি নিজের রুমে তালা দিয়ে গেছেন। এমনটায় বুঝিয়েছে।”
আবির দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে রাশভারি কন্ঠে বলতে শুরু
করল,
“রুমে প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসপত্র এলোমেলো করে রেখে আসছি। রুম খোলা রেখে আসলে যে যার মতো ঢুকে কাগজপত্র নষ্ট করে ফেলতো। আর হ্যাঁ তানভিরের কাছে চাবি আছে যখন ইচ্ছে রুমে যাস তবুও দয়া করে মানুষের কথায় গাল ফুলিয়ে কান্না করিস না, প্লিজ।”
মেঘ আকুল কন্ঠে বলে উঠল,
“আমার কান্না নিয়ে আপনার এত চিন্তা তাহলে এতদিন কথা কেনো বলেন নি?”
“তোকে বারবার বারণ করা স্বত্তেও আমার কথা অমান্য করেছিলি কেনো? তুই ভালোভাবেই জানিস, আমি যা বলি তাই করি। তোকে এত বুঝানোর পরও যেহেতু আমার কথা অমান্য করেছিস তাই আমিও কথা বলি নি।”
মেঘ কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল,
“আপনি যাওয়ার সময় আমায় ডাকলেন না কেনো? আমায় ঘুমের মধ্যে রেখে কেনো চলে গিয়েছিলেন? এতটা হৃদয়হীন কিভাবে হতে পারলেন? আপনার বুক কি একটুও কাঁপলো না?”
আবির ঢোক গিলে শীতল কণ্ঠে জবাব দিল,
“কেউ কি জানে, তার একজোড়া ক্রন্দিত নেত্র আমার সুস্থির ব্রহ্মাণ্ডে তোলপাড় চালাতে সক্ষম। কান্নাভেজা ঐ আঁখি যুগলের মুখোমুখি হওয়ার সামর্থ্য আমার ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে হৃদয়হীনের মতো ই পালিয়ে এসেছি।”
আবিরের ভেজা কন্ঠস্বর কানে বাজতেই মেঘ নিজের চোখ মুছে আহ্লাদী কন্ঠে বলে উঠল,
“কেউ কি জানে, তার জন্য আমি কি পরিমাণ কান্না করেছি?”
“কান্নারও পরিমাণ হয় বুঝি? তা কত বালতি পানি জমেছিল?”
মেঘ তড়িৎ বেগে জবাব দিল,
“৯ বালতি।”
আবির মলিন হেসে বলল,
” ইসস আর এক বালতি হলে ভালো হতো।”
মেঘ আচমকা কান্না শুরু করেছে। আবির অতর্কিতে প্রশ্ন করল,
“এই কি হয়েছে? কান্না করছিস কেনো?”
মেঘ কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট কন্ঠে বলে উঠল,
“আপনি না বললেন, আর এক বালতি পানি জমালে ভালো হতো।”
আবির শক্ত কন্ঠে ধমক দিল,
“এ বেলায় কথা মানতে উঠেপড়ে লাগিস। অন্য বেলায় কি হয়?”
মেঘ ভেজা চোখে ফিক করে হেসে উত্তর দিল,
“ভূ*তে পায়।”
“আমারও তাই মনে হয়। বাসায় ফিরে আগে আপনার ভূ*ত টাকে বিদায় করতে হবে। মামির শরীর কেমন?”
“এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালো। সিরিয়াস কোনো সমস্যা নেই। আপাতত ডাক্তার কিছু ঔষধ লিখে দিয়েছেন।”
আবির ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,
“আপনার শরীর কেমন?”
মেঘের ঠোঁটে আবারও হাসি ফুটলো। আদুরে ভঙ্গিতে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো ছিল তবে এখন খুব ভালো।”
“সাবধানে থাকবেন। আর একটা কথা।”
“জ্বি বলুন।”
“মালা পর্যন্ত আমার নাম্বারটা যেন না পৌঁছায়।”
“পৌঁছালে কি হবে?”
“তেমন কিছু না। হোয়াটসঅ্যাপে দিনে কমপক্ষে ১০-১৫ বার কল আসবে, আমি বসে বসে কল রিসিভ করবো। প্রতিবার ১ ঘন্টা করে কথা বললে জাস্ট ১০ থেকে ১৫ ঘন্টা কথা হবে। তারপর ৮ ঘন্টা ঘুমাবো আর ১ থেকে ২ ঘন্টা অন্যান্য কাজ করব।”
মেঘ দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,
“আর আমি পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে আপনাদের কলিজা ভুনা করে এলাকার কুকুরগুলোকে খাওয়াবো।”
আবির নিঃশব্দে হেসে শুধালো,
“কিছু বলছেন?”
মেঘ দাঁতে দাঁত চেপে রাগী স্বরে জবাব দিল,
“বলছিলাম মাত্র ১৫ ঘন্টা কেনো কথা বলবেন, বললে পুরো ২৪ ঘন্টায় কথা বলিয়েন। ঠিক আছে?”
আবির এবার শব্দ করে হাসলো। পরপর উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল,
” মনে হচ্ছে কিছু পুড়তেছে। আমি এখান থেকেও পুড়া পুড়া গন্ধ পাচ্ছি। কি পুড়ছে?”
মেঘ রাগান্বিত কন্ঠে জবাব দিল,
“আপনার নাক একটু বেশিই এডভান্স। কলিজা ভুনা এখনও বসায় নি, ওয়েট একটু পর বসাবো।”
জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আবির মৃদুস্বরে বলল,
“ম্যাম, কলিজা ভুনায় মনে করে লবণ দিয়েন।”
মেঘ ফোঁস করে উঠল,
“আরও বেশি টেস্টি করতে একটু বিষও দিব নে।”
বলেই মেঘ কল কেটে দিয়েছে, রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। আবিরের হাসি থামছেই না, হাসতে হাসতে বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছে। আজ অফ ডে বলে আবিরের কাজের তেমন চাপ নেই। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে খানিক বাদে আবারও মেঘকে কল দিল। কল বাজতে বাজতে শেষ পর্যায়ে মেঘ কল রিসিভ করল সঙ্গে সঙ্গে আবির মোলায়েম কন্ঠে ডাকলো,
“ম্যাম।”
মেঘ নিশ্চুপ। আবির আদুরে কন্ঠে আবারও ডাকল,
“ম্যা….ম”
আবিরের কন্ঠে আদুরে ডাক শুনে মেঘের বুকের ভেতরের ধুকপুকানি বেড়ে গেছে। মন খারাপ, রাগ, অভিমান, খারাপ লাগা মুহুর্তেই সব উধাও। অনুভূতিদের পাশ কাটিয়ে মেঘ কাঠকাঠ গলায় প্রশ্ন করল,
“কিছু বলবেন?”
“হুমমমমম।”
“বলুন।”
“বলছিলাম, রান্নার টেস্ট বাড়াতে বি*ষ টা ব্যবহার না করলে হয় না?”
“বি*ষ ব্যবহার করলে কি হবে?”
“না মানে, কেউ লবণ চেক করতে গেলে তো সাড়ে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
মেঘ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আপনি এসব বলতে আবারও কল দিয়েছেন? রাখছি আমি। ”
আবির তড়িৎ বেগে ডাকলো,
“শুনো…!”
আবিরের মুখে তুমি সম্বোধন শুনামাত্রই মেঘের দু চোখ প্রশস্ত হয়ে গেছে। মুহুর্তেই শ্বাস থেমে গেছে,হতভম্ব মেঘের মস্তিষ্কে অনুভূতিদের তোলপাড় চলছে। চোখের পাতায় জ্বলজ্বল করছে আবিরের হাস্যোজ্জ্বল আদলখানা। । দুরুদুরু কাঁপছে বুক, চোখে মুখে রাগের রেশ মাত্র নেই। আবির তৎক্ষনাৎ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“অতি সামান্য কারণে যেভাবে রেগে যান ভবিষ্যতে কি হবে, ম্যাম? ”
মেঘ চোখ কুঁচকে জানতে চাইলো,
“কি হবে?”
“সদা আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে থাকতে হবে।”
আবির চটজলদি গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,
” আবারও বলছি, মালা পর্যন্ত আমার নাম্বার পৌঁছালে সব দায়ভার আপনার। মনে থাকে যেনো।”
মেঘ চিন্তিত কন্ঠে শুধালো,
“বড় আম্মুর থেকে নাম্বার নিয়ে নিলে?”
“আমি আম্মুকে বারণ করেছি আম্মু কাউকে নাম্বার দিবে না। অন্য কারো কাছে নাম্বার চাওয়ার সাহস মালার হবে না। একমাত্র আপনি আছেন, অনুগ্রহ করে আপনিও দিবেন না।”
“ওহ আচ্ছা। এজন্যই বড় আম্মু আমাকে নাম্বার দিচ্ছিলো না। তাতে কি আমি তো নাম্বার দেখেই মুখস্থ করে ফেলেছি।”
“আমি কারো নাম উল্লেখ করি নি তাই আম্মুও বুঝতে পারে নি। আপনি যে নাম্বার মুখস্থ করার পাবলিক এটা আমি জানি৷ তাছাড়া আমি নিজেই আপনাকে কল দিতাম। কিন্তু আপনার অসুস্থতার কথা শুনে… ”
“কোনো ব্যাপার না। কিন্তু মালা আপু আমার কাছে নাম্বার চাইলে কি বলবো?”
“এটাও আমার শিখিয়ে দিতে হবে?”
“না, একদম না। এখন রাখি?”
” আচ্ছা।”
মেঘ ফের বলল,
“শুনুন। ”
“জ্বি ম্যাম, বলুন”
“রাতে কল দিলে রিসিভ করবেন? নাকি আবারও রাগ করে বসে থাকবেন ?”
আবির কপাল গুটিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“ফ্রী হয়ে মেসেজ দিয়েন। ”
“আর একটা কথা। ”
“হুমমমমম।”
মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় আস্তে করে বলল,
“মিস ইউ।”
বলেই কল কেটে দিয়েছে। আবির মলিন হেসে ফোনের স্ক্রিনে তাকালো। মেঘের শাড়ি পড়া একটা ছবি ফোনের ওয়ালপেপার দেয়া, আবির অপলক দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। অতর্কিতে হাসি থামিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বলল,
“My dear sparrow,
I feel empty without you.”
কথা শেষ করে মেঘ আবারও নিচে নামলো। ততক্ষণে মাইশারা চলে আসছে৷ মাইশাকে দেখেই মেঘ ছুটে গেল। মাইশা হালকা রঙের একটা জামদানি শাড়ি পড়ে এসেছে, ৪ মাসের অন্ত:সত্ত্বা হওয়ায় আগের থেকেও বেশ কিউট লাগছে। মেঘ আপুকে ভালোভাবে পরখ করে আহ্লাদী কন্ঠে বলল,
“ভাইয়া- আপু, ভাইগ্না অথবা ভাগ্নীকে সর্বপ্রথম আমি কোলে নিতে চাই। আদির পরে আমি এখনও কোনো ছোট বাবু কাছ থেকে দেখি নি। আমাকে জানাবেন, প্লিজ।”
মাইশা আর তার হাসবেন্ড একসঙ্গে হেসে উঠলো। ভাইয়া বললেন,
“ইনশাআল্লাহ, বাবুকে প্রথমেই তোমার কোলে দিব। ”
” ইনশাআল্লাহ। ”
মাইশারা সারাদিন শেষে বিকেল দিকে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। মামা, মামিরাও বাড়িতে চলে যাবেন। আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খান অফিসে থাকলেও দুপুরে বাসায় এসে সবার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছেন। যাওয়ার আগে আগে মালা হঠাৎ মেঘকে ডেকে শক্ত কন্ঠে বলল,
“আবির ভাইয়ার নাম্বারটা দাও তো।”
মেঘ কপাল গুটিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” ওনার নাম্বার দিয়ে আপনি কি করবেন?”
“কথা বলবো।”
মেঘ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে স্বাভাবিক স্বরে বলল,
“ওনি প্রজেক্টের কাজে ব্যস্ত আছেন। আপাতত আত্মীয় স্বজনদের সাথে কথা বলার সময় নেই ওনার।”
মালা বিরক্ত হয়ে শুধালো,
“তোমার সাথে কথা বলার সময় আছে?”
মেঘ কপালের মাঝ বরাবর ভাজ ফেলে মেকি স্বরে বলল,
” আমার সাথে কথা না বললে ওনার রাতে ঘুম ই হয় না।”
মেঘ যে ইচ্ছেকৃত রাগানোর জন্য এসব বলছে এটা বুঝতে মালার বেশি সময় লাগলো না। মালা তৎক্ষনাৎ রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
” যত যাই বলো, ভাইয়ার নাম্বার আমি সংগ্রহ করেই নিব। আগেও কত রাত ভাইয়ার সাথে আনলিমিটেড কথা বলেছি তার হিসেব নেই, এবারও তাই হবে। ঘুম পাড়ানোর জন্য প্রয়োজনে ভাইয়াকে ঘুমের ঔষধ সাজেস্ট করবো।”
মেঘ ভেতরে ভেতরে রাগলেও রাগটা প্রকাশ করল না। ফিক করে হেসে বলল,
“চেষ্টা করে দেখতে পারেন। হতেও পারে ওনার হার্টবিট আপনার দেয়া ঘুমের ঔষধের পাওয়ারকেও হার মানিয়ে দিল।”
মালা কটমট করে বলল,
“তুমি যে কোন ভরসায় এসব বলো আল্লাহ ই ভালো জানেন। ”
অকস্মাৎ মেঘের ঘড়িতে আবিরের মেসেজ আসছে,
“All okay? ”
মেঘ মালার দিকে ঘড়ি টা এগিয়ে দিয়ে মোলায়েম কন্ঠে জবাব দিল,
“এই ভরসায়।”
নামের জায়গায় শুধু Amar Abir লেখাটায় ভাসছে। মালা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মিনমিন করে বলল,
“ফোনে আমার আবির লিখে রাখলেই আবির ভাইয়া তোমার হয়ে যাবে না।”
আরও কি কি বিড়বিড় করতে করতে মালা বেড়িয়ে গেছে। মেঘ মুখ ফুলিয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে। সত্যিই তো, ফোনে আমার আবির…… ভাই নামটা গত দের বছর যাবৎ ই সেইভ করে রেখেছে। নতুন নাম্বারটাও একই নামে সেইভ করেছে কিন্তু তাতে সম্পর্কের কোনো উন্নতি হচ্ছে না। আবিরের অন্তর্নিহিত অনুভূতি বুঝার সক্ষমতা মেঘের হয়েছে ঠিকই কিন্তু আবির যতদিন না নিজের অনুভূতি প্রকাশ করছে ততদিন মেঘের আত্মবিশ্বাস আসবে না। জোর গলায় নিজেকে যতই আবিরের প্রেমিকা বলুক না কেনো, দিনশেষে এটায় সত্যি আবির তাকে কোনো প্রকার প্রতিশ্রুতি দেয় নি। মেঘ মুখ ফুলিয়ে রুমে চলে গেছে।
শেষ বিকেলের দিকে একটা হ্যান্ড পার্টস আর সাথে দুটা ফাইল আর কিছু কাগজপত্র নিয়ে বন্যা আপনমনে হাঁটছে। আচমকা নজর পরে অনেকটা সামনে তানভিরের মতো কেউ একজন ফোনে কথা বলতে বলতে যাচ্ছে। সিউর হওয়ার জন্য বন্যা দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ছেলেদের হাঁটার স্বাভাবিক গতির সাথে মেয়েদের দৌড়ের গতি মোটামুটি সমান ধরা যায়। রাস্তায় দৌড়াতে পারছে না তবে যথাসাধ্য দ্রুত হেঁটে তানভিরের বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে। পেছন থেকে ২-৪ বার ডেকেওছে কিন্তু সেই ডাক তানভিরের কর্ণকুহরে পৌছায় নি। বন্যা এবার থেমে শ্বাস টেনে উচ্চস্বরে ডাকল,
” ঐ ভিলেন। ”
মেয়েলী কণ্ঠস্বর কানে বাজতেই তানভির উদ্দেশ্যহীনভাবে পেছনে ঘুরলো। বন্যাকে দেখেই থমকে দাঁড়ালো। ভ্রু কুঁচকে কল কেটে কপট রাগী স্বরে জানতে চাইল,
“কোনদিক থেকে ভিলেন মনে হয় আমায়?”
“কখন থেকে ডাকছিলাম, আপনি শুনছিলেন ই না। তাই বাধ্য হয়ে ডাকলাম।”
“হঠাৎ আমাকে ডাকার কারণ?”
“এমনি। আপনার বাইক কোথায়?”
“একটা ছোটভাই নিয়ে গেছে। কোনো?”
“এমনি। জিজ্ঞেস করতে পারি না?”
তানভির মলিন হাসলো৷ কিছু একটা ভেবে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
” সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, বাসায় চলে যেও৷ আসছি।”
তানভিরের এমন ব্যবহারের আগামাথাও বন্যা বুঝলো না। কিছুক্ষণ ভাবার পর হঠাৎ পূর্বের ঘটনাগুলো মনে পড়লো। বন্যা সহসা ডাকল,
“এইযে”
তানভির ঘাড় ঘুরিয়ে বিমুঢ় দৃষ্টিতে বন্যার দিকে তাকালো। বন্যার মুখের মায়াবী হাসিতেই তানভিরের হৃদয় দুরুদুরু কাঁপছে। তানভির উত্তর না দিয়ে খানিক ভ্রু নাচালো। বন্যা এক গাল হেসে বলল,
“ঝালমুড়ি খাবেন?”
তানভিরের তাৎক্ষণিক উত্তর,
“নাহ।”
“তাহলে ফুচকা?”
“না।”
“চটপটি?”
“না।”
“চা?”
“না।”
বন্যা এবার খানিক রেগে গেছে। চোখের পাতা ঝাপটে আনমনেই বলে উঠল,
“তাহলে কি সিগারেট খাবেন?”
তানভির প্রশস্ত নেত্রে বন্যার দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে শুধালো,
“কি বললে?”
বন্যা উত্তর না দিয়ে অন্যপাশে তাকিয়ে লজ্জায় আর আতঙ্কে নিজের মুখ চেপে ধরেছে। নিজের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে ঘনঘন নিঃশ্বাস ছাড়ছে। তানভির স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে, বন্যাকে আপাদমস্তক দেখে মুচকি হেসে বলল,
” সিগারেট খেতে পারি যদি তুমি আমার সঙ্গে খাও।”
অপ্রত্যাশিত কথায় বন্যা স্যাট করে তানভিরের অভিমুখে তাকালো। চোখ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ বড় আকার ধারণ করেছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বেসামাল পরিস্থিতি সামলে বন্যা দৃঢ় কন্ঠে শুধালো,
“ছিঃ! আপনি সিগারেটও খান?”
“তুমি খাওয়াতে চাচ্ছো তাহলে আমার খেতে সমস্যা কোথায়?”
বন্যা মাথা নিচু করে জড়সড় হয়ে বলল,
” মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে, সরি। ”
“এতদিন মানুষকে মুখ ফস্কে অনেককিছু বলতে শুনেছি। আজ প্রথমবার কোনো মেয়ে মুখ ফস্কে সিগারেট অফার করছে। বিষয়টা বেশ ইন্টারেস্টিং। চলো, সামনে থেকে দুটা সিগারেট নিচ্ছি। ”
বন্যা আতঙ্কিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
“নাহ, আমি যাব না।”
বন্যার চেঁচানোর শব্দে তানভির আঁতকে উঠে বুকে হাত রেখে আশেপাশে তাকিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“যেভাবে চিৎকার করছো, মানুষ তো অন্যকিছু ভাববে।”
বন্যা আস্তে করে বলল,
“যার যা খুশি ভাবুক, আমি সিগারেট খাব না।”
তানভির স্ব শব্দে হেসে বলল,
“ঠিক আছে। এবারের মতো ছেড়ে দিলাম। এরপর মুখ ফস্কে সিগারেটের কথা বললে সত্যি সত্যি টেস্ট করাবো।”
“এগুলো ঠিক না। আপনি এসব করতে পারেন না।”
“বাহ রে! ডাকবা ভিলেন আর কিছু বললে ই ন্যায়-অন্যায়ের জ্ঞান দিবা তা তো মানবো না।”
বন্যা বিরক্ত হয়ে বলল,
“দেখুন, আমি আপনাকে ট্রিট দিতে ডেকেছিলাম। আপনি ইচ্ছেকৃত আমার সাথে এমন ব্যবহার করছেন। ”
তানভির সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে দৃঢ় কন্ঠে শুধালো,
“আমি আবার কি করলাম?”
” যাই অফার করছি শুধু না ই করে যাচ্ছেন।”
” আমার সাথে চলাচলে যার অস্বস্তিবোধ হয়, আমাকে যার অসহ্য লাগে। আমি তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলার চেষ্টা করি।”
বন্যা উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“আমি কি একবারও বলেছি আপনাকে অসহ্য লাগে? নাকি বলেছি আপনি আমার অস্বস্তির কারণ?”
তানভির স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে অকস্মাৎ হেসে বলল,
” চলো।”
“কোথায়?”
“বাহ! ট্রিট না দিবা বললা। এখন এটা বলো না যে মুড
নেই বা সময় নেই। ”
বন্যা ঠিক এই কথাটায় বলতে চেয়েছিল। মুখের কথাটা গিলে শান্ত স্বরে বলল,
” কি খাবেন?”
“ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি এনিথিং।”
বন্যা ভ্রু গুটিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। মনে মনে তানভিরকে অল্পস্বল্প বকেও নিলো। মেঘ আর তার ভাইয়ের স্বভাবে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। দুজনই বেশ অভিমানী, মেঘ মেয়ে বলে অভিমান টা একটু বেশিই প্রকাশ পায়। ঝালমুড়ি হাতে দুজনেই পাশাপাশি দুটা চেয়ারে বসা। এক প্লেট ফুচকা আর একটা চটপটিও অর্ডারও দিয়েছে। তানভির ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,
“হঠাৎ আমাকে ট্রিট দেয়ার কারণ কি?”
বন্যা ঢোক গিলে আস্তে করে বলল,
” সেদিন আপনাকে চা খেতে বলি নি বলে আপনার বোন আমায় কতগুলো কথা শুনিয়েছে তাই আজ…”
তানভির ভ্রু গুটিয়ে ধীর কন্ঠে জানতে চাইল,
” বনু তোমায় কথা শুনিয়েছে? কি বলেছে?”
তানভির নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তানভিরের দৃষ্টি দেখে বন্যা থতমত খেয়ে হাসার চেষ্টা করল। হাসিমুখে বলল,
“তেমন কিছু না৷ আসলে সেদিন আমার তরফ থেকে সবাইকে চায়ের ট্রিট ছিল তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার আপনাকে চা অফার করা উচিত ছিল।কিন্তু আমি সেটা করি নি তাছাড়া বিল দেয়ার বিষয়টা নিয়ে মেঘ একটু রেগে গেছিলো।”
“বনুর কথায় কিছু মনে করো না, প্লিজ।”
বন্যা ঠোঁট উল্টিয়ে বিদ্রূপের ভঙ্গিতে বলে উঠল,
” ওহ আচ্ছা। ঠিক আছে। কিছু মনে করলাম না৷ ওকে?”
“কি সমস্যা? এভাবে কথা বলছো কেন?”
” এমনি। ”
তানভির সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে শুধালো,
“এমনি বলাটা কি তোমার স্বভাব? ”
বন্যা উপর নিচ মাথা নাড়লো। তখনি বন্যার বড় আপুর কল আসছে। বন্যা স্বাভাবিকভাবেই কল রিসিভ করে কথা বলছে। ইতিমধ্যে ফুচকা আর চটপটি দিয়ে গেছে। বন্যা কথা শেষ করে চটজলদি ২-৩ টা শিট বের করে তানভিরের হাতে দিয়ে বলল,
“এগুলো মেঘকে দিয়ে দিয়েন। কাল ভার্সিটি বন্ধ, পরশু একটা ক্লাস টেস্ট আছে। পড়ে নিতে বলবেন।”
তানভির গাল ফুলিয়ে নির্বোধের মতো বন্যাকে খানিক দেখে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,
” এত সমাদরের রহস্য তবে এই ছিল? স্বার্থপর মেয়ে কোথাকার। ”
বন্যা ফুচকা খেতে খেতে আড়চোখে তানভিরের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল,
” একদম স্বার্থপর বলবেন না। নিজের বোনকে তো ঠিকই যত্নে রাখেন, প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের ই হতে দেন না। ২-৩ টা শিটের জন্য এতটা রাস্তা পেরিয়ে আমাকেই আপনাদের বাসায় যেতে হতো আর নয়তো পিডিএফ দিতে হতো। সেই পিডিএফ আবার আপনাকেই প্রিন্ট আউট করে আনতে হতো। যেহেতু আপনাকে পেয়েছি, তাই আপনাকে দিয়ে দেয়াটায় বেস্ট অপশন ছিল। আমি চাইলেই রাস্তায় ডেকে ২ টা শিট আপনাকে ধরিয়ে দিয়ে চলে যেতে পারতাম। যদি সেই কাজটা করতাম তবে স্বার্থপর বলতে পারতেন৷ আমি আপনাকে ট্রিট অফার করলাম, ৪০ মিনিট সময় দিলাম অতঃপর সেই শিটগুলো দিচ্ছি। তারথেকেও বড় কথা শিটগুলো আপনার বনুর প্রয়োজন। তাহলে আমি স্বার্থপর কিভাবে হলাম?”
“যেভাবে যুক্তি দেখিয়ে ঝগড়া করছ, আমার মনে হচ্ছে তোমার উদ্ভিদবিজ্ঞান সাবজেক্ট না নিয়ে দর্শন সাবজেক্টে অনার্স করা উচিত ছিল।”
বন্যা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“আমি ঝগড়া করছি?”
তানভির ঠোঁট চেপে হেসে বলল,
“এটাকে অবশ্য ঝগড়া বলে না তবে তর্কের বিবাদ বলা যায়।”
বন্যা সেসবে পাত্তা না দিয়ে ফুচকা খাচ্ছে। তানভির টুকটাক ফুচকা খেতে পারলেও আজ চটপটি নিয়েছে। কারণ এক প্লেট ফুচকা একা শেষ করা তানভিরের পক্ষে সম্ভব না। মেঘদের সাথে বের হলে, মেঘ, মীম আর আদির থেকে অল্প কয়টা খায়। আজ আগেভাগেই চটপটিটা বেছে নিয়েছে। বন্যা ফুচকা শেষ করে উঠতে উঠতে বলল,
“আপুদের জন্য একটা পার্সেল নিয়ে বিলটা দিয়ে আসছি, আপনি বসুন।”
তানভির তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,
“বিলটা আমি দেয়?”
বন্যা রাগী রাগী মুখ করে তাকাতেই তানভির ঢোক গিলে শান্ত কন্ঠে বলল,
” ঠিক আছে। আমি বসছি, বিলটা তুমিই দিয়ে আসো।”
বন্যা মুচকি হেসে চলে গেছে। বিল দিয়ে এসে তানভিরের হাতের শিটগুলো আবারও দেখে নিল। পার্টস আর শিটগুলো হাতে নিতে নিতে শীতল কন্ঠে বলল,
” সরি,সময়ের অভাবে চা খাওয়াতে পারছি না। অন্য কোনোদিন খাওয়াবো, ইনশাআল্লাহ।”
তানভির মুচকি হেসে বলল বলল,
” চা কিন্তু তোমার হাতের বানানো হতে হবে।”
“দেখা যাক। আসছি।”
“আমি এগিয়ে দিয়ে আসি?”
” তার কোনো দরকার নেই। আপু নিয়ে যাবে আমাকে।”
“সাবধানে যেও।”
“আচ্ছা,আপনিও।”
বন্যা রাগ করেছে ভেবে, সেদিনের ঘটনা জানতে মেঘকে জিজ্ঞেস করার জন্য মেঘের রুমের সামনে আসতেই তানভির থমকে দাঁড়ালো। মেঘ আপনমনে বন্যার সাথে ফোনে কথা বলছে, দুজনের আবোলতাবোল কথা আর হাসির শব্দে তানভির থম মেরে দাঁড়িয়ে পরেছে। কোথায় ভেবেছিল মেঘ আর বন্যার মধ্যে মান অভিমান চলছে, মেঘের থেকে কারণ জেনে সমাধান করার চেষ্টা করবে কিন্তু ঘটনা সম্পূর্ণ উল্টো। তানভির আস্তে করে গলা খাঁকারি দিয়ে রুমে এসে শিট রেখে চলে যাচ্ছে। মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,
“ভাইয়া, কিছু বলবা?”
“না”
তানভির বিড়বিড় করতে করতে যাচ্ছে,
“মায়ের কাছে মাসির গল্প বলে আর কি হবে!”
রাত ৯ টা বেজে গেছে। মেঘ আবিরকে কোনো মেসেজ করে নি। কিছুক্ষণ পর আবির ই মেসেজ দিল,
“Busy?”
মেঘের ছোট রিপ্লাই,
“No”
তৎক্ষনাৎ আবিরের কল আসছে। মেঘ কল রিসিভ করে চুপচাপ বসে আছে। ওপাশ থেকে আবির বলছে,
” ফ্রী হয়ে মেসেজ দিতে বলছিলাম। বিকেল থেকে মুখ ফুলিয়ে রুমে বসে আছেন, কিছু খানও নি শুনলাম, একটা টেক্সট পর্যন্ত করেন নি। কি সমস্যা? ”
“কোনো সমস্যা নেই।”
“মালা কি আবারও আজেবাজে কথা বলছে?”
মেঘ মুখ ফস্কে বলে ফেলল,
“চরিত্রের সমস্যা আপনার, মালা আপু কি বলবে?”
আবির উত্তেজিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
“কি? আমার চরিত্রে সমস্যা?কে বলছে? প্রমাণ কি?”
#চলবে