আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব-৮৯+৯০

0
4763

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৮৯
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

আবিরের নিগূঢ় আঁখি যুগলে অসহায়ত্বের ছাপ। মেঘ অভিনিবিষ্টের ন্যায় আবিরের জলসিক্ত নয়নের পানে তাকিয়ে আছে। হৃদপিণ্ডের তীব্র কম্পনে মেঘের গায়ের রক্ত প্রবল বেগে টগবগ করছে। আবিরের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে, অনবরত তিরতির করে ঠোঁট কাঁপছে। মাথা থেকে ঘামের রেখা কপালের পাশ বেয়ে গড়িয়ে পরছে। আবিরের শীতল দুচোখ মেঘের অভিমুখে। মেঘ আনমনে কতকিছু ভেবে হঠাৎ পল্লব ঝাপ্টে প্রশ্ন করল,
“কি স্বপ্ন দেখেছেন?”

সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে মেঘের প্রশ্ন শুনে নড়ে উঠল আবির তবে তখনও গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। থমথমে গলায় উত্তর দিল,
” দুঃস্বপ্নের কথা বলতে নেই। আর আমি ম*রে গেলেও এই স্বপ্ন সত্যি হতে দিব না। ”

মেঘ ঠোঁট উল্টে চোখ গোল গোল করে অসহায় মুখ করে চেয়ে আছে। আবির পরক্ষণেই বলে উঠল,
“আচ্ছা শুন”
“জ্বি। ”
“তোর শরীর কেমন এখন?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
“এখনও শ্বাসকষ্ট হয়? বা অন্য কোনো সমস্যা? ”

“শ্বাসকষ্ট হয় না তবে অন্য সমস্যা আছে।”

আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“কি সমস্যা? বলিস নি কেনো আগে?”

একটু থেমে আবারও বলে উঠল,
“আমি তানভিরকে বলে রাখবো কাল সকালে মামনিকে নিয়ে ডাক্তারের….”

এরমধ্যে মেঘ আবেগময় কন্ঠে বলল,
“কাউকে অতিরিক্ত মিস করার সমস্যা। কোন ডাক্তার দেখাবো বলুন..”

আবিরের কথা বন্ধ হয়ে গেছে। মেঘের এমন কথায় আবিরের চোখে মুখে খানিক উজ্জ্বলতা ফুটে উঠেছে।
নিদারুণ অনুভূতিরা বক্ষস্পন্দন বাড়াতে ব্যস্ত। আবির নিশ্চুপ হয়ে চেয়ে আছে অপরূপ সেই মুখমণ্ডলে। মেঘ আহ্লাদী কন্ঠে আবারও শুধালো,
“বলুন না, কোন ডাক্তার দেখাবো?”

আবির ভ্রু কুঁচকে গুরুভার কন্ঠে বলল,
” সব বিষয় নিয়ে মজা করিস না, মেঘ। শারীরিক
কোনো সমস্যা মনে হলে ডাক্তার দেখাস প্লিজ। ”

অভিমানের দমকা হাওয়া বয়ে গেল মেঘের মনে। মেঘ ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে জানতে চাইল,
“মানসিক সমস্যা হলে কি করব?”

“তোর মানসিক সমস্যা শুনার জন্য তো আমিই আছি। এই ডাক্তার চলবে না? ”

মেঘ ফিক করে হেসে বলল,
” আপনি ডাক্তার?
সার্টিফিকেট টা দেখাবেন প্লিজ।”

আবির চোখ সরু করে বলে উঠল,
” সার্টিফিকেট টা না হয় দেশে ফিরেই দেখালাম।”

টুকটাক কথা চলল কিছুক্ষণ। আবিরের মন ভালো করতে অল্পস্বল্প দুষ্টামিও করেছে মেঘ। কিন্তু আবিরের মন ভালো হওয়ার বিন্দুমাত্র লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এদিকে রাত গভীর হচ্ছে, ঘুমে মেঘের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। মেঘ নিজের প্রতি খুব ক্ষুদ্ধ হচ্ছে। আবির আজ খুব মনোযোগী। মেঘ যা জিজ্ঞেস করছে সবেতেই তার আদরমাখা উত্তর রেডি। এই অপরুপ মুহুর্ত রেখে ঘুমানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই মেঘের কিন্তু চোখ যেন মেঘের ইচ্ছেকে পাত্তায় দিচ্ছে না। আবিরের কথার মাঝে ঘুমের আবেশে বার বার চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা খেয়াল করে আবির অত্যন্ত নমনীয় স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ঘুম পাচ্ছে?”

মেঘ চোখ বড় করে তাকিয়ে জবাব দিল,
” কই না তো।”

আবির মলিন হেসে বলল,
“জোর করে কথা বলতে হবে না। আমি পালিয়ে যাচ্ছি না, ঘুমান।”

” ঘুম চলে গেছে। ”

“কে চলে গেছে কে যায় নি সেটা পরে দেখছি। আপাতত কল না কেটে ফোনটা পাশে রেখে চোখ বন্ধ করুন। ”

মেঘ আঁতকে উঠে চাইল আবিরের অভিমুখে। হৃদপিণ্ড ছুটছে দ্বিকবিদিক, হৃদপিণ্ডের পিটপিট শব্দ বেড়েই চলেছে। “কল না কেটে” কথাটা যেন মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে। মেঘ থমথমে কন্ঠে বলল,
“কল না কাটলে ঘুম আসবে না।”

আবির গুরুভার কন্ঠে জানাল,
“সেটা আমি বুঝবো। এখন যা বলছি করুন।”

আবিরের ক্ষিপ্ত নয়ন জোড়া দেখে মেঘ ঢোক গিলে বালিশের পাশে ফোন হেলান দিয়ে রেখে গায়ে পাতলা কাঁথা জরিয়ে শুয়ে পরেছে। মেঘ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে শীতল কন্ঠে বলল,
” কল কাটবেন কখন? আমার লজ্জা লাগছে।”

আবিরের নিরুদ্যম কণ্ঠের জবাব,
” লজ্জা লাগছে যেহেতু চোখ বন্ধ করে রাখ। বেশরমের মতো তাকিয়ে থাকতে কে বলছে? ”

মেঘ চোখমুখ কুঁচকে কন্ঠ ভারী করে বলল,
“আপনি এটা বলতে পারলেন!”

আবির গম্ভীর গলায় বলল,
“চোখ বন্ধ। আর একবার চোখ খুললে খবর আছে। ”

মেঘ চোখ বন্ধ করে কাটকাট গলায় জানাল,
“আপনি কিন্তু নিজ দায়িত্বে কল কেটে দিবেন।”

আবিরের আর কোনো জবাব এলো না। বৈদ্যুতিক বাতির আলোতে আলোকিত রুমে ফ্যানের বাতাসে মেঘের চুলগুলো অনবরত উড়ছে, আবির অবাক লোচনে সেই দৃশ্য দেখতে ব্যস্ত । মেঘের মুখের প্রতিটা পশম সূক্ষ্ম নেত্রে পরখ করছে আবির৷ মেঘের ফর্সা কপোলের নিকষ কালো তিলটা খুব বেশি আকৃষ্ট করছে। আবিরের হৃদয় কেঁপে উঠেছে, শরীরজুড়ে অজানা শিহরণ। কিছু সময়ের মধ্যে মেঘের নিশ্বাসের শব্দ জোড়ালো হলো। রাত ২ টা বেজে ১৭ মিনিট, মেঘ গভীর ঘুমে নিমগ্ন আবির ফোনের অপর পাশ থেকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তার প্রেয়সীকে দেখতে ব্যস্ত।

ভোরের মৃদু আলো আর বৈদ্যুতিক বাতির আলোতে মেঘের রুম ঝলমল করছে। চোখে আলো লাগছে, মেঘ ঘুমের মধ্যেই ভ্রু কুঁচকে নড়ে উঠল। কপালে হাত রেখে চোখ ঢাকার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। দীপ্ত আলোর চিত্তদাহে বিরক্ত হয়ে কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে অল্পবিস্তর চোখ মেলল মেঘ। ঘুম ঘুম চোখের কোণে ফোনে নড়ে ওঠা কারো অবয়ব ভেসে উঠল। মেঘ তৎক্ষনাৎ ঘাড় কাত করে স্পষ্ট চোখে তাকালো সেদিক।সঙ্গে সঙ্গে মেঘের সমস্ত শরীর শিউরে উঠলো। বালিশে হাত রেখে তারউপর মাথা রেখে আবির নিগূঢ় দৃষ্টিতে মেঘের দিকে চেয়ে আছে, ঠোঁটে লেগে আছে মায়াবী হাসি। আবিরের উষ্কখুষ্ক চুল, গাল ভর্তি ছাপ দাঁড়ি আর নেশাক্ত দৃষ্টি দেখে শোভিত পুরুষের সুষুপ্ত আদলের মোহে ডুবে গেছে। আবির ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে বলল,
“Good Morning,Sparrow.”

আবিরের ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠস্বর কানে বাজতেই দুর্ভেদ্য আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল মেঘ। এই দৃষ্টি, কন্ঠস্বরে মেঘের অন্তরাত্মা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে। চোখ খুলে রাখার বিন্দু পরিমাণ শক্তি অবশিষ্ট নেই। আবির তখনও নিষ্পলক চোখে তাকিয়েই আছে। আবির একগাল হেসে শান্ত কন্ঠে শুধালো,

“ঘুম ভালো হয় নি? আমি এসে পর্দা টেনে দিয়ে যাবো?”

মেঘ এবার সর্বশক্তি দিয়ে সাফ তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“আপনি কি সারারাত ঘুমান নি?”

“না।”
“কেনো?”
“ঘুম আসছিল না।”

মেঘ কন্ঠ খাদে নামিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কল কাটতে বলছিলাম কাটেন নি কেনো?”

” কল কাটতে ইচ্ছে করে নি তাই কাটি নি।”

মেঘ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
” অফিস নেই?”
“আছে।”

মেঘ সময় দেখে পুনরায় শক্ত কন্ঠে বলল,
“সময় হয়ে যাচ্ছে। উঠছেন না কেনো এখনও?”

“যেতে ইচ্ছে করছে না।”

আবিরের নিরুদ্বেগ কন্ঠের একেকটা উত্তর শুনে মেঘ আশ্চর্য বনে যাচ্ছে। যে মানুষটাকে এতদিন গুরু-গম্ভীর,অনুভূতিহীন আর নিষ্ঠুর ভেবে এসেছে সেই আবির ভাইয়ের আকস্মিক পরিবর্তন মেঘের মনে বিশাল প্রভাব ফেলছে। মেঘ রাশভারী কন্ঠে শুধালো,
“সমস্যা কি আপনার? ”

আবির মুচকি হেসে উত্তর দিল,
” বহুত সমস্যা। এদের কোনো সমাধানও নেই।”

নিজের অজান্তেই মেঘের ঠোঁট জুড়ে ললিত হাসি ফুটলো। লজ্জায় লাল হওয়া দু গাল চিকচিক করছে। মেঘ শক্ত কন্ঠে বলল,
” থাক ভাই বুঝছি আপনার সমস্যা। প্লিজ, এখন উঠে অফিসে যান।”
“আমি তোর ভাই?”
” ভাই না তো কি?”

মেঘের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে আবির ভেতরে ভেতরে জ্বলে উঠলো। গম্ভীর মুখ করে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে অগ্নিকণ্ঠে বলল,
“আমি তোর বাবার দাদুর নাতির ছেলে হতে পারি কিন্তু তোর ভাই না, বাই।”

আবির কল কেটে দিয়েছে। মেঘ আহাম্মকের মতো বসে আছে। আবির যে ভাই ডাকার ক্ষোভে রাগ করে ফোন কেটেছে এটা বুঝতে সময় লাগলো না মেঘের। কিন্তু এটাও বুঝতে পারছে না, আবির ভাই আর শুধু ভাই এর মধ্যে পার্থক্য টা কি! বেশকিছুক্ষণ বসে থেকে চটজলদি উঠে রুম গুছিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেল। ওজু করে ফজরের নামাজ পড়ে ছাদে গিয়ে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে রুমে আসলো। এরমধ্যে আবিরের আর কোনো কল আসলো না। মেঘের মনে বেশকিছু প্রশ্ন উদ্গত হচ্ছে। রুমে কিছুক্ষণ পায়চারি করে এক বুক সাহস নিয়ে অডিও কল দিল ৷ কল বাজতে বাজতে কেটে গেছে। মেঘ এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ভিডিও কল দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রিসিভ হলো। দেখেই বুঝা যাচ্ছে সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়ে কোনোরকমে কল টা রিসিভ করেছে আবির । এখনও ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। আবিরের জলসিক্ত উন্মুক্ত শরীর, কোমড়ে বাঁধা সাদা টাওয়েল। আবিরের ভেজা চুল, লোমশ বুকে আর নির্মেদ পেট দেখে মেঘ যত্রতত্র দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ঢোক গিলে উষ্ণ শ্বাস ছেড়ে বলল,

“সরি সরি। অসময়ে কল দিয়ে ফেলছি। ”

আবির মেকি স্বরে বলল,
” সরি বললেই কি আমার মানইজ্জত ফিরে পাবো? ”

মেঘ চোখ নামিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
” আমি বুঝতে পারি নি, সরি। ”

আবির মুচকি হেসে অন্য একটা টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলল,
” দূর পাগলি, এসব কোনো ব্যাপার না। তাছাড়া আমি আপনার কলের অপেক্ষায় ছিলাম।”

“কেনো?”

“আজ প্রজেক্টের ফাইনাল মিটিং কি পড়ে যাব বুঝতে পারছিলাম না। আবার করেছি রাগ তাই নিজে থেকে কলও দিতে পারছিলাম না।”

মেঘ লাজুক হেসে বলল,
” আপনি এমন ঢং করা কোথা থেকে শিখছেন?”
“আপনার থেকেই শিখেছি।”

মেঘ ভেঙচি কাটলো। আবির মুচকি হেসে ২-৩ টা শার্ট ফোনের সামনে ধরে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কোনটা পড়ব?”

মেঘ কয়েক সেকেন্ডেই একটা শার্ট সিলেক্ট করে দিল, আবির ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে একদম ইন করে শার্ট পড়ে, ব্লেজার-টাই সঙ্গে সু জুতা পড়ে সম্পূর্ণ রেডি হয়ে গেছে। ফোন থেকে খানিকটা দূরে সরে উঁচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কেমন লাগছে?”

মেঘ আপাদমস্তক দেখে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“মাশাআল্লাহ কিন্তু… ”
“কিন্তু কি?”

“How do I bite the pinky finger now?”
(আমি এখন কনিষ্ঠা আঙুলে কিভাবে কামড় দিব?)

“In a dream” (স্বপ্নে)

আবির টেবিল থেকে সানগ্লাস টা নিয়ে চোখে দিয়ে শেষবারের মতো ফাইল গুলো দেখে নিচ্ছে। এদিকে সানগ্লাস চোখে দেখায় মেঘ গুনগুন করে গান গাইতে শুরু করল,
“কালো সানগ্লাসটাই কেন এতো সুখ,
হে যুবক।”

আবির ফোন কাছে নিয়ে বলল,
“দৃষ্টিতে যেন সে রাসপুতিন,
খু*ন হয়ে যাই আমি প্রতিদিন।
এটা বলবেন না?”

মেঘ নিজের মাথায় গাট্টা মেরে, মুখ চেপে ধরেছে। আবির জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে মলিন হেসে বলল,
” শুনলাম আপনি ইদানীং খুব বেশি গান গাইতেছেন। কই আমাকে তো শুনালেন না!”

মেঘ বিড়বিড় করে বলল,
” আপনার অফিস কখন? যান না কেনো?”

“যাবই তো। আগে কথা শেষ করি। ”

“আপনার সাথে আর কোনো কথা নেই। গুরুত্বপূর্ণ মিটিং থাকা সত্ত্বেও সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। এখন আবার ঢং করতেছেন। এদিকে আব্বু শুধু আমার ভাইয়ের দোষ ই দেখে আপনার দোষ দেখে না। আপনি যে সারারাত ঘুমান নি এটা কি ঠিক করেছেন? এর প্রভাব মিটিং এ পড়বে না?”

“জ্বি না ম্যাম। বরং আজকের মিটিং বেস্ট হবে। আপনি শুধু দোয়া করবেন। মিটিং শেষ করেই কল দিব। ঠিক আছে? ”

“ফি আমানিল্লাহ। বেস্ট অফ লাক।”
“থ্যাংক ইউ।”

বিকেলের দিকে আবিরের সাথে কথা হয়েছে। আজকের মিটিং ঠিকঠাক মতো শেষ হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রজেক্ট কমপ্লিট হয়ে যাবে। মোজাম্মেল খান আর আলী আহমদ খান আবিরকে বাসায় ফিরতে বলছেন। কিন্তু আবির বলেছে আরও ২ মাসের মতো সময় লাগবে। কারণ জিজ্ঞেস করায় বিস্তারিত কিছুই বলে নি। এদিকে মেঘও বেশ উদ্বিগ্ন। বন্যার সাথে আগে থেকে প্ল্যান করা ছিল আজ বিকেলে মেলায় যাবে। বন্যা রেডি হয়ে বিকেলের দিকে বেরিয়েছে ঠিকই কিন্তু মেঘ আবিরের উপর অভিমান করে ফোন বন্ধ করে ঘুমিয়ে পরেছে। বন্যা বেশ কয়েকবার কল দিয়েছে, বন্ধ পেয়ে একা একায় হাঁটছে। অন্যসময় হলে মেঘকে বাসা থেকে নিয়ে আসতো কিন্তু ইদানীং মেঘদের বাসায় যাওয়ার কথা মাথায় আসলেই লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যায়। ঘন্টাখানেক পর তানভিরের কল আসছে। অসময়ে তানভিরের কল দেখে বন্যা খানিকটা অবাক হয়ে আশেপাশে তাকালো। কোথাও পরিচিত কাউকে নজর পড়ছে না। ভয়ে ভয়ে কল রিসিভ করল। তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

” একা একা ঘুরছো কেনো?”

” আপনার বোন আমাকে বাসা থেকে বের করে এখন ফোন বন্ধ করে ফেলেছে।”

“তুমি আমাকে কল দিতে পারতা না?”

“এত ইমার্জেন্সি ছিল না তাই দেয় নি।”

“কোথায় আছো? বলো আমি আসতেছি।”
“আপনার আসতে হবে না।”

“বলো।”

বন্যা জায়গার নাম বলতেই তানভির বলল,
“আমি কাছেই আছি। ১০ মিনিট অপেক্ষা করো৷ ”

৮ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে তানভির বাইক সমেত হাজির হলো। বন্যা তানভিরকে দেখে আস্তে করে বলল,
“আপনার আসার কোনো দরকার ছিল না। আমি এখনি চলে যেতাম।”

” রেগে আছো? ”

বন্যা শ্বাস ছেড়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
“নাহ।”

” বনু ঘুমাচ্ছে৷ তুমি বাসায় গেলে না কেনো? আর নয়তো আমাকে আগে কল দিতে। আমি বনুকে নিয়ে আসতাম।”

“আমি বাহিরে আছি এটা আপনাকে কে বলছে?”

“বনু কল দিয়েছিল। বলছে ওর বের হওয়ার মুড নেই। তোমাকে যেন মেলায় নিয়ে যায়।”

বন্যা কপাল গুটিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
“আমি মেলায় যাব না।”
মনে মনে মেঘকে কিছুক্ষণ বকে নিল। তানভির সবসময়ের মতো গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“বনুর কথা অমান্য করলে বাসায় তুলকালাম কান্ড করে ফেলবে। এমনিতেই বাসায় আমাকে কেউ সহ্য করতে পারে না এ অবস্থায় বনুকে রাগালে আমায় নিশ্চিত বাসা থেকে বের করে দিবে। ”

বন্যা কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে পশ্চিমা আকাশের পানে তাকিয়ে আছে। সূর্য আপন গতিতে নিজ গন্তব্যে ছুটছে। আজকের আকাশ অন্যান্য দিনের থেকেও অনেক বেশি সুন্দর। তানভির বন্যার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“যাবে না?”

বন্যা রক্তিম আকাশের পানে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিল,
“আজকের আকাশটা খুব বেশি সুন্দর। কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। ”

বন্যার দৃষ্টি লক্ষ্য করে তানভিরও আকাশের পানে তাকালো। গাঢ় নীল রঙের আকাশে মেঘেদের আনাগোনা, পাখিরা আপন গতিতে উড়ে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে তাদের বাড়ি ফেয়ার বড্ড তাড়া। গোধূলি লগ্নের সূর্যটা বরাবরের মতোই রক্তিম। তানভির কয়েক মুহুর্ত আকাশ দেখে আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বন্যার কাছাকাছি স্টিলের বেষ্টনীতে মৃদুভাবে হেলান দিয়ে বন্যার অভিমুখে তাকালো। সূর্যের বিক্ষিপ্ত আলোকরশ্মিতে বন্যার মুখ লাল হয়ে আছে। তানভির বন্যার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বেশ সময় নিয়ে অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে বলল,
“নীল অম্বরের ভাঁজে ভাঁজে,
তোমার নামে সন্ধ্যা সাজে।”

বন্যা অকস্মাৎ আড়চোখে তাকাতেই তানভির নড়ে উঠল। কাজল পরিহিতা টানাটানা চোখদুটা যেন দৃষ্টিতেই তানভিরের মতো শক্তপোক্ত ছেলের সত্তাকে বিলীন করে ফেলবে। বন্যা কোন কথা না বলে পরপর দুবার ভ্রু নাচালো। তানভির মুচকি হেসে এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে অন্যদিকে মুখ করে তাকালো। বন্যা তানভিরের দিকে লাজুক হাসলো। ফোন ভাইব্রেট হতেই বন্যা ফোনের দিকে তাকালো। মেঘের মেসেজ আসছে,
“আমার ভাইকে দিয়ে দিলাম, দেখে রেখো।”

বন্যা ছোট করে মেসেজ পাঠালো,
” ওকে ননদিনী।”

অকস্মাৎ পেছন থেকে একটা মেয়েলী কন্ঠস্বর কানে বাজলো। মায়াবী কন্ঠের ডাক,
“তানভির। ”

তানভিরের সঙ্গে সঙ্গে বন্যাও ঘুরে দাঁড়ালো। বোরকা পড়া এক মেয়ে। চোখ, হাত-পা ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বন্যা ভ্রুক্ষেপহীন, নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছো?”

তানভির কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে বন্যাকে এক পলক দেখে ভারী কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“কে আপনি?”

“আমাকে চিনতে পারছো না?”
“আপনাকে চেনার কথা ছিল নাকি?”

মেয়েটা এবার চোখ নামিয়ে শীতল কন্ঠে বলল,
“আমি আয়েশা। চিনতে পেরেছো?”

অকস্মাৎ তানভিরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। কপালে আরও কয়েকটা ভাঁজ পড়লো, দুচোখ আগ্নেয়গিরির লাভার ন্যায় টগবগ করছে, অক্ষিপটে ব্যথা অনুভব হচ্ছে। বন্যা তখনও স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তানভির আর সেই মেয়েকে দেখছে। বন্যা বুঝতেই পারছে না কে এই মেয়ে! সে ভেবেছে পরিচিত, বান্ধবী বা অন্য কেউ হতে পারে। আয়েশা কন্ঠ খাদে নামিয়ে নমনীয় কন্ঠে বলল,
” তোমাকে অনেকদিন পর দেখলাম।”

তানভির মুখ ফুলিয়ে ঘন ঘন শ্বাস ছাড়ছে। চোখ মুখে তীব্র আক্রোশ৷ আয়েশা আবারও বলল,
“তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।”

বন্যার দিকে তাকিয়ে বলল, “পার্সোনাল।”

বন্যার এতক্ষণ কোনোকিছু অনুভব না হলেও এবার কিছুটা রেগে গেছে। মনের ভেতর প্রশ্ন জাগছে,
“কে এই মেয়ে?”

তানভির অন্যদিকে তাকিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“কথা বলার মতো সময় আর ইচ্ছে কোনোটায় আমার নেই।”

তানভির পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে হুঙ্কার দিল,
“বন্যা, আসো। যেতে হবে।”

বন্যা ঐ মেয়েকে দেখে দেখে এগুচ্ছে। তানভির বাইক পর্যন্ত যেতে যেতে ঐ মেয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠল,
“তানভির, আমি তোমাকে এখনও ভালোবাসি।”

তানভির শুনেও যেন কথাটা শুনলো না। রাগে হাত-পা কাঁপছে। মেয়ে বলে পারছে না শুধু গায়ে হাত তুলতে। মেয়ের কথা শুনে বন্যা থমকে দাঁড়ালো। বুকের ভেতরটা অকস্মাৎ মোচড় দিয়ে উঠেছে। বুঝতে বাকি রইলো না যে এই মেয়েই তানভিরের এক্স গার্লফ্রেন্ড। তানভির বাইক স্টার্ট দিয়ে অগ্নি কন্ঠে চিৎকার করল,
“বন্যা, আসতে বলছি তোমায়।”

বন্যা থতমত খেয়ে ছুটে গেল। চুপচাপ বসে পড়ল বাইকের পেছনের সিটে। তবে বরাবরের মতো এবারও তানভিরের সঙ্গে দূরত্ব রেখে বসেছে। কিছুক্ষণ আগেও আকাশের পানে তাকিয়ে ভাবছিল, আজ থেকে বাইকে বসলে তানভিরকে ধরে বসবে কিন্তু তা আর হলো কই! দুজনের বুকের ভেতর যে ঘূর্ণিঝড় বয়ে যাচ্ছে সে খবর কেউ জানে না। মেলার কাছাকাছি এসে বাইক থামালো। বন্যার মেলায় যাওয়ার মতো বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আর না আছে তানভিরের। তবুও মেঘের কথা মেনে ঢুকলো মেলায়। বন্যা চুপচাপ ঘুরে দেখছে। মেঘের সঙ্গে অনেককিছু কেনার প্ল্যান করেছিল ঠিকই তবে এখন আর ইচ্ছে নেই। কিছুক্ষণ ঘুরে বন্যা চাপা স্বরে বলল,
” আমার বাসায় যেতে হবে।”

তানভির ঘড়িতে সময় দেখে নিল। বন্যা দ্রুত হেঁটে গেইটের দিকে যাচ্ছে। বন্যা দু-তিনটা দোকান পেরিয়ে হঠাৎ খেয়াল করল আশেপাশে তানভির নেই। থমকে দাঁড়িয়ে পেছন তাকিয়ে দেখল তানভির দোকানে কি কিনতেছে। বন্যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্রুত এগিয়ে এসে বলল,
“তোমাকে ডাকছিলাম, তুমি শুনো নি। সরি।”

বন্যা আবারও হাঁটা শুরু করল। তানভির ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“এগুলো তোমার। ”

“আমার কিছু লাগবে না, ধন্যবাদ।”

বন্যা বেড়িয়ে পরেছে। অন্যান্য দিনের মতো তানভির আজ জোর গলায় কিছু বলতেও পারছে না। দ্রুত এগিয়ে গেল বন্যার কাছে। বন্যার চোখ মুখ স্বাভাবিক, যেন কিছুই হয় নি। শান্ত কন্ঠে বলল,
” আমি এখান থেকে রিক্সা নিয়ে যেতে পারব।”

“কিন্তু আমি তোমাকে একা ছাড়তে পারবো না।”

বন্যা মলিন হেসে মনে মনে আওড়ালো,
” আপনার অতীত বর্তমান হলে আপনার জীবনে এই বন্যার অস্তিত্ব থাকবে না।”

তানভির বাইক স্টার্ট দিয়ে উঠতে বলল, বন্যাও বাধ্য হয়ে উঠে বসল। কারো মুখে কোনো কথা নেই। মোখলেস মিয়ার দোকানের সামনে আসতেই মোসলেম মিয়া বন্যাকে ডাকতে শুরু করলেন। বন্যা নামাতে বলায় তানভিরের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাইক থাকালো। তানভিরের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে। তানভির শক্ত কন্ঠে বলল,
“যদি গিফট না নাও তাহলে আমি এখানেই বসে থাকব।”

বন্যা কিছু না বলে দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। মোখলেস মিয়ার পাশের দোকানে বন্যার আব্বু কাপড় ইস্ত্রি করতে দিয়েছিল। ইমার্জেন্সি কাজে ওনাকে এক জায়গায় যেতে হয়েছে তাই ইস্ত্রি করে জামাকাপড় মোখলেস মিয়ার দোকানে রেখে গেছে। মোখলেস মিয়া কাপড় আর কিছু খাবার দিয়েছেন। বন্যা না করা সত্ত্বেও ওনি জোর করেই দিয়েছেন। বন্যারা সচরাচর বাসা থেকে বের হয় না, বন্যাদের কিছু খেতে ইচ্ছে হলে বন্যার ছোট ভাই রিদ ই নিয়ে যায়। মাস শেষে বন্যার আব্বু টাকা দিয়ে দেন। তানভির বাইক থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে রাগী চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ মোখলেস মিয়ার নজর পড়ে তানভিরের দিকে। তানভিরের তাকানো দেখে মোখলেস মিয়া বন্যাকে জিজ্ঞেস করলেন,

” পোলায় এমনে তাকায় আছে কেন? ভাড়া দাও নি?”

বন্যা কিছু বলার আগেই মোখলেস মিয়া দোকান থেকে বের হতে হতে উচ্চস্বরে শুধালো,
“এই ছেলে তোমার ভাড়া কত? আমি ভাড়া দিয়ে দিচ্ছি তবুও আমার বউ এর দিকে এভাবে তাকায় থাইকো না।”

তানভিরের মেজাজ চরম মাত্রায় খারাপ হয়ে গেছে। রাগে দাঁত কটমট করছে। দু’চোখ লাল হয়ে গেছে। বন্যা দ্রুত বেড়িয়ে যেতে যেতে বলল,
“দাদা, আমি কথা বলছি।”

বন্যা তানভিরের কাছে গিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বাসায় যান, প্লিজ।”

“তুমি গিফট না নিলে আমি এক পাও নড়বো না।”

বন্যা আস্তে করে কপাল চাপড়ালো। মেঘের ভাই বলে কথা, সে তো মেঘের মতোই জেদি হবে। এটা বন্যা ভুলে গেছিল ভেবেই রাগ লাগছে।
মোখলেস মিয়া দোকান থেকে ডাকলেন,
” সমস্যা কোনো?”
“নাহ দাদা।”

বন্যা তানভিরের হাত থেকে গিফটের ব্যাগটা নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“এবার এখান থেকে যান, প্লিজ। আব্বু দেখলে সমস্যা হবে।”

তানভির কথা না বাড়িয়ে মোখলেস মিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গলি থেকে বেড়িয়ে চলে গেছে। এদিকে মেঘ আবিরের উপর রাগ করে ফোন আর অন ই করে নি। আম্মুর ফোন থেকে তানভিরকে কল দিয়েছিল। সন্ধ্যার পর নিচে এসে নুডলসের পাকোড়া বানাতে শুরু করল। মীম আর আদি আগে থেকেই রেডি হয়ে বসে আছে। আবির বাসার সবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে মেঘের কথাও জিজ্ঞেস করল। আকলিমা খান রান্নাঘরে এসে মেঘের দিকে ফোন ধরে একগাল হেসে বললেন,

“সে এখন রেসিপি শিখতে ব্যস্ত। ৮-১০ পদের পাকোড়া বানানো শিখে ফেলছে। ”

আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“পাকোড়াতে লবণ দেয় তো?”

মেঘ ফোঁস করে উঠল। আকলিমা খান কপট রাগী স্বরে বললেন,
” মেয়েটাকে কেনো রাগাচ্ছো বলো তো।”

আবির শান্ত কন্ঠে বলল,
“কেউ যদি বিজ্ঞ হয়েও অজ্ঞের মতো আচরণ করে তো আমি কি করবো? রাখি।”

কাকিয়া লবণের বিষয়ে আঁটকে থাকলেও আবিরের কথার মিনিং মেঘ ঠিকই বুঝেছে। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করছে যেন রুমে গিয়ে আবিরকে কল দিতে পারে। এরমধ্যে তানভির বাসায় আসছে। চোখ-মুখ কালো হয়ে আছে। মেঘকে রান্নাঘরে দেখে শান্ত কন্ঠে বলল,
“বনু, এককাপ কফি করে দিবি?”

“আনছি ”

মেঘ কফি আর পাকোড়া নিয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে হাজির হলো। তানভির চোখ মুখ দেখে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে ভাইয়া? কোনো সমস্যা? ”

“না।”

মেঘের ভয়ে বুক কাঁপছে। বন্যার সাথে যদি ঝগড়া করে তাহলে কি হবে? মেঘ শক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া বলো কি হয়েছে? বন্যা কোথায়?”

“ওকে বাসার কাছে দিয়ে আসছি। ”

“তাহলে আর কি হয়ছে? তুমি এত রেগে আছো কেনো?”

তানভির কফির কাপে চুমুক দিয়ে কাপ সামনে রেখে আস্তে করে বলল,
“আজ আয়েশার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।”

আয়েশা নাম শুনেই চমকে উঠল মেঘ। প্রশস্ত আঁখি যুগল আরও বেশি প্রশস্ত করে গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করল,
” থা*প্পড় দিয়েছো? ”

“না।”

মেঘ অকস্মাৎ সোফায় ঘুষি শুরু করল। পরপর বেশ কয়েকটা ঘুষি দিতে দিতে চেঁচিয়ে উঠল,
“তোমাকে আমি বলেছি সামনে পেলে চোখ বন্ধ করে থা*প্পড় দিবে। তুমি থা*প্পড় দিলে না কেনো?”

তানভির তড়িৎ বেগে উঠে মেঘের দু-হাত শক্ত করে ধরে বলল,
” একটু ঠান্ডা হয়ে কথা তো শুনবি।”

“তুমি থা*প্পড় দাও নি কেনো?”

“পাবলিক প্লেসে মেয়েদের গায়ে হাত তোলাটা শোভা পায় না। ”

“ইসস আমি কেন গেলাম না আজ। ঐ মেয়েকে কয়েকটা থাপ্প*ড় দিয়েই আসতাম। বন্যা কোথায় ছিল? বন্যাও দেখেছে?”

“বন্যা সাথেই ছিল। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করে নি।”

মেঘ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে বলল,
” শেষ! আমার সব শেষ। ”

তানভির সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“বিড়বিড় করছিস কি?”

“কিছু না। হাত ছাড়ো রুমে যাব।”

“ঘুষাঘুষি করবি না তো?”

“ঘুষাঘুষি করে নিজের হাত ভেঙে কি করব। যার নাকমুখ ভাঙা দরকার তার টায় যদি না ভাঙতে পারি। বুঝছি, তুমি কিছু পারবা না। আবির ভাই কে বলতে হবে।”

তানভির হাত ছেড়ে ভীত কন্ঠে বলল,
“প্লিজ, ভাইয়াকে এখন কিছু বলিস না। এই ঘটনা ভাইয়া শুনতে পারলে আমার কপালে বহুত দূর্গতি আছে। ”

“ঠিক আছে বলবো না। ”

মেঘ রুমে এসে ফোন অন করতেই বন্যার কল আসলো। বন্যা একে একে সব ঘটনা খুলে বললো। মেঘ যতটা সম্ভব বুঝানোর চেষ্টা করেছে। পর পর আবিরকে কল দিল। আবির কল রিসিভ করে শক্ত কন্ঠে ধমক দিল,

“এই মেয়ে, এত নির্বোধ কেন তুই?”

“আমি কি করেছি। ”

“কথা না শুনে, না বুঝেই ফোন বন্ধ করে বসে আছিস।”

“কি শুনবো আর কি বুঝবো? আপনি যেই কাজে গিয়েছিলেন সেই কাজ শেষ তবুও আপনি বাসায় ফিরবেন না। এটাতে কি বুঝবো আমি?”

“আমি শুধুমাত্র প্রজেক্টের কাজে এতদিনের জন্য এতদূর আসি নি। বাংলাদেশে টানা তিন প্রজেক্ট করলেই এটার সমান বেনিফিট পেতাম। সব ছেড়ে এখানে এসে পড়ে থাকতাম না। আমি আমার প্রয়োজনে আসছি আর প্রজেক্টটা শুধুমাত্র আমার বাহানা ছিল। যে প্রজেক্ট ১৫ দিনে শেষ করতে পারতাম সেটা কমপ্লিট করতে ৩ মাসের উপরে সময় নিচ্ছি যেন আব্বু, চাচ্চু কিছু বুঝতে না পারে। ”

“আপনি কেনো গিয়েছেন? কি প্রয়োজন আপনার?”

“আমার টাকার প্রয়োজন।”

মেঘ কপাল কুঁচকে বলল,
“আপনার কত টাকা প্রয়োজন? আপনি আমাকে একটা ক্রেডিট কার্ড দিয়েছিলেন মনে নেই? ঐটাকে অনেক টাকা আছে। আপনি এখান থেকে টাকা নিতে পারতেন৷ আমার এত টাকা লাগেই না। ”

আবির মুচকি হেসে বলল,
“ঐটা শুধুমাত্র তোর আর ওখানে প্রতিমাসে একটা নির্দিষ্ট এমাউন্ট পাঠানো হচ্ছে শুধু তোর জন্য। তোর যা ইচ্ছে হয় তা কিনিস, আরও বেশি প্রয়োজন হলে একবার জানাস শুধু।”

“আমার টাকার বিশেষ কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি এগুলো নিয়ে যান৷ তবুও চলে আসেন প্লিজ।”

আবির শ্বাস ছেড়ে শীতল কন্ঠে বলল,
“কেনো বুঝতে পারছিস না, আমার লাখ টাকার প্রয়োজন না। আরও বেশি প্রয়োজন।”

“তাহলে কত প্রয়োজন?”
“কোটি।”
“What? কোটি টাকা দিয়ে আপনি কি করবেন?”
“দরকার আছে।”

“এত টাকা কে দিবে আপনাকে?”

“আমার টাকা আমি নিতে আসছি। কে দিবে আবার কি? এখানের স্থানীয় এক ফ্রেন্ডের বাবা বড় বিজনেসম্যান। ওনার কথা মতো আমরা দুজন স্টুডেন্ট থাকাকালীন ছোট ছোট বেশ কয়েকটা কোম্পানিতে শেয়ার কিনেছিলাম। যদিও সবকিছু ওনিই ম্যানেজ করে দিয়েছিল। আমি দেশে যাওয়ার আগে সবগুলো শেয়ারের এমাউন্ট একসাথে করে আংকেলের কোম্পানিতে কিছুটা শেয়ার কিনে গিয়েছিলাম৷ কারণ আমার কাছে ওনারায় একমাত্র বিশস্ত মানুষ ছিলেন। এখন আমার টাকার প্রয়োজন, আংকেলকে জানানোর পর আংকেল এখানে আসতে বলেন। কোম্পানির বেশকিছু কাজ প্যান্ডিং আছে সেগুলো কমপ্লিট করতে পারলে আমি যত আশা করেছি তার থেকেও অনেক বেশি দামে শেয়ারটা বিক্রি করতে পারবো। তানভির আর রাকিব ব্যতীত এই কথা আর কেউ জানে না। আজ তোকে বলছি। আব্বু- চাচ্চু এসব জানতে পারলে কিভাবে রিয়েক্ট করবেন আমি জানি না। তাই প্রজেক্টের নাম করে এখানে আসছি।”

মেঘ সবকথা শুনে রাশভারি কন্ঠে বলল,
“শেয়ারটা বিক্রি না করলে হয় না? আপনার এত কি প্রয়োজন?”

” প্রতিনিয়ত মানুষকে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে বাঁচতে পারবো না। আমি সব মায়াজাল কাটিয়ে একটা স্বচ্ছ জীবন কাটাতে চাই। জীবন চালাতে ঠিক যতটা প্রয়োজন ততটা ইনকাম করতে পারলেই হবে। আমি শুধু মানসিক শান্তি চাই।”

মেঘ চুপ করে বসে আছে। কিছু বলার মতো শব্দ খোঁজে পাচ্ছে না। আবির মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,
” রাগ করেছিস?”

“না। রাগ করবো কেন! আপনি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা অবশ্যই ভেবেচিন্তেই নিয়েছেন।”

“বাসার কাউকে এ ব্যাপারে কিছু বলিস না ।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। রাখি এখন।”

“আচ্ছা।”

★★★

আজ সকাল থেকে আলী আহমদ খান ও মোজাম্মেল খানের মধ্যে মনোমালিন্য চলছে। সারাদিন খাওয়া নেই। যে যার রুমে শুয়ে আছেন। বাসার সবাই চেষ্টা করেও রাগ ভাঙাতে পারে নি। দুপুরের পর পর ফুপ্পি, জান্নাত আপু, আইরিন আর আসিফ ভাইয়া আসছে। আজ ইচ্ছে করেই আরিফ আসে নি। প্রতিনিয়ত মীমের সাথে ঝগড়া করতে ভালো লাগে না তার। মেঘের ফুপ্পি প্রথমেই মোজাম্মেল খানের রুমে গেলেন। মোজাম্মেল খান বোনকে দেখে শুয়া থেকে উঠে বসে ভারী কন্ঠে বললেন,
“কেমন আছিস?”

“কেমন থাকবো? এই বয়সে এসে তোমরা ভাইয়ে ভাইয়ে কোন দ্বন্দ্বে মেতেছো?”

“আমি কি বলব, ভাইজানের যা মন চাই তাই করছেন। কিছু বললেও ওনি রেগে যান। বুঝার চেষ্টা পর্যন্ত করেন না। জানিস ই তো ওনার স্বভাব। যা বলবে তাই করবে।”

“সমস্যা কি নিয়ে?”

“সমস্যা তো অনেক কিছু নিয়েই। আমার ছেলেকে শাসন করলেও দোষ, না করলেও দোষ। মেয়েকে কিছু বললেও দোষ, না বললেও দোষ। আগে আবির অফিস সামলে নিতো তাই অফিসের বিষয়ে এত কথা আমায় শুনতে হতো না। এখন আবির নেই, কাজের একটু এদিকসেদিক হলেই রাগ। আমরা নাকি গুরুত্ব দেয় না, ওনি একা পরিশ্রম করে সবকিছু করেছেন। ওনি যা বলবেন তাই হবে। আরও অনেককিছু। ”

“ভাইজান কি কোনোভাবে সংসার ভাঙার কথা বুঝাতে চাচ্ছেন?”

“এই কথা ভুলেও ভাইজানের সামনে বলিস না। আমি সেদিন রাগে বলে ফেলছিলাম, তুমি বললে সংসার ভাগ করে ফেলি। বলেছি না মরেছি, আমার সাথে কথা তো বলেনই না এমনকি এটাও বলেছেন, আমার ছেলে, আমার মেয়ে দুজন ই ওনার। ছেলেমেয়ের ব্যাপারে কিছু বলার অধিকার পর্যন্ত আমার নেই। ইকবাল ই ভালো। তার এসব বিষয়ে কোনো চিন্তাভাবনায় নেই। ”

“তানভির, আবির কি বলে?”

“আবিরের সঙ্গেও ঝামেলা। ”

মাহমুদা খান চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“আবিরের সঙ্গে আবার কিসের ঝামেলা? ”

” প্রজেক্ট শেষ তবুও আবির দেশে আসছে না। তাছাড়া সেদিন আবির আমার পক্ষে দুটা কথা বলেছিল সেই রাগে আবিরের সঙ্গেও কথা বলেন না।”

“এখন করণীয় কি?”

“দেখ তুই মানাতে পারিস কি না?”

মাহমুদা খান মোজাম্মেল খানের রুম থেকে বেরিয়ে আলী আহমদ খানের রুমে গেলেন। রুমে ঢুকতেই আলী আহমদ খান গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
” তুই ও কি তার পক্ষে কথা বলতে আসছিস?”

“নাহ ভাইজান। আমি আপনার মুখে শুনতে চাই। ঘটনা কি?”

“ঘটনা কিছুই না। মোজাম্মেলের অত্যাচার আর সহ্য হচ্ছে না৷ ”

“কেনো? ভাই কি করেছেন?”

“তানভিরের সাথে ওর কি শত্রুতা আমি জানি না। কথায় কথায় ছেলেকে বকাবকি করে। আমি কিছু বলতে গেলে আমার ছেলের সাথে তুলনা দেয়। আমার ছেলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে ওর ছেলে বেকার। কিছুই ঠিকমতো করতে পারছে না। কোথায় আমি আমার ছেলে নিয়ে গর্ব করব উল্টো সে গর্ব করে। সে সারাক্ষণ আমার পিছনে লাগে। এই যে ছেলেমেয়ে গুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগাচ্ছে ওরা কি সারাজীবন একসাথে থাকতে পারবে? আমি এজন্য সেদিন রাগে বলেছিলাম,
ওর মতো চিন্তাভাবনা আমার থাকলে আমি একা এই সংসার টাকে এতদূর টানতে পারতাম না। এই সংসার আমার, এখানে আমার অধিকার সবচেয়ে বেশি, আমি যা বলবো তাই হবে। আমি বুঝাতে চেয়েছি, ওর উল্টাপাল্টা আচরণ গুলো যেন পরিবর্তন করে। অথচ সে বুঝেছে আমি সংসার ভাঙতে চাচ্ছি। এজন্য আমিও বলেছি ও যদি চায় বাড়ি থেকে চলে যেতে পারে। কিন্তু তানভির, মেঘ আর ওদের মা আমার বাড়িতেই থাকবে। ওদের উপর বাবার অধিকার খাটাতে যেন না আসে।”

#চলবে

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৯০
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

আলী আহমদ খানের কথা শুনে মাহমুদা খান আনমনেই হেসে উঠলেন। বোনের হাসি দেখে আলী আহমদ খান রাগী স্বরে বললেন,

“এভাবে হাসছিস কেনো? আমি কি হাসির কথা বলেছি?”

মাহমুদা খান হাসি থামিয়ে মৃদুস্বরে বললেন,
“তোমরা এখনও ছোটবেলার মতো অভিমান করো, এটা দেখেই হাসি পাচ্ছে। তোমার জায়গা থেকে তুমি নিজেকে ঠিক মনে করছো, ওদিকে ভাইয়ের জায়গা থেকে ভাই নিজেকে ঠিক মনে করছে। এসব দেখে ছোটবেলার একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে।”

“কোন ঘটনা?”

“একবার তোমার ক্রিকেট ব্যাট ভেঙ্গে ফেলায় তুমি আর ভাই বাড়িতে তুমুল ঝগড়া শুরু করেছিলে। তুমি বলছিলা মোজাম্মেল ভাই ভাঙছে আর ভাই বলছিল সে ভাঙে নি। সেই নিয়ে একপর্যায়ে তোমাদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে গিয়েছিল, আমি আর আম্মা কোনোভাবেই তোমাদের থামাতে পারছিলাম না৷ আব্বা বাড়িতে এসে তোমাদের এই মারামারি দেখে রাগে কু*ড়াল নিয়ে মা* রতে আসছিল। দুই ভাই সেই যে পালিয়েছিলে, রাত ১০ টার উপরে বেজে গেছিলো বাড়িয়েই আসছিলে না৷ আমি আর আব্বা তোমাদের খোঁজতে খোঁজতে হয়রান হয়ে যাচ্ছিলাম। তারপর নদীর ধারে একটা গাছের নিচে পেয়েছিলাম তাও দুজন একসাথে। তুমি গাছে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছিলে আর ভাই তোমার কোলে ঘুমাচ্ছিলো। মনে আছে ভাইজান? ”

আলী আহমদ খান একগাল হেসে বললেন,
” হ্যাঁ, মনে আছে। সেদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দুই ভাই আবার ঝগড়া লাগছিলাম। বেশ কয়েকজন মিলে আমাদের থামিয়ে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করেছিল, তখন আমরা সব ঘটনা খুলে বলছি। তারপর এক ছোটভাই বলছিল, ইকবাল আমার ব্যাট নিয়ে খেলত গেছিল আর ঐখানে গাছের সাথে বারি খেয়ে ব্যাট ভেঙে গেছে। আমরা দুই ভাই তখন অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিলাম। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি ওর গায়ে হাত দেয় নি। আমি মোজাম্মেল কে অনেক ভালোবাসি, সে আমার ভাইয়ের থেকে বন্ধু বেশি। যখন গ্রাম ছেড়ে, সবকিছু ছেড়ে শহরে আসছিলাম তখন মোজাম্মেল ছাড়া আমার আর কেউ ছিল না। সে বন্ধুর মতো সবসময় আমার পাশে থেকে সাহস দিয়েছে। ওর সাথে আমার সম্পর্ক আজীবন এমনই থাকবে, ইনশাআল্লাহ। কিন্তু ওর কিছু কিছু কাজ আমার সত্যিই খারাপ লাগে। আমি মানছি তানভির একটু বেখেয়ালি, ওর নিজের লক্ষ্য স্থির করে তারপর কিছু করা উচিত। তাই বলে এটা না সারাক্ষণ উঠতে বসতে ছেলেকে বকবে। তারথেকেও বড় কথা তানভির কে বুঝানোর জন্য তানভিরের সামনে প্রতিনিয়ত আবিরের প্রশংসা করাটা আমার পছন্দ নয়। তানভিরের বয়স কম, রগচটা, জেদি সে একমাত্র আবিরের কথা একটু আধটু মানে। ওর মনে যদি একবার উল্টাপাল্টা কিছু ঢুকে যায় তখন কি আবিরের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা থাকবে?”

মাহমুদা খান চাপা স্বরে বললেন,
“তানভির আর আবিরের সম্পর্ক তোমাদের থেকেও অনেক বেশি স্ট্রং। ওরা এসব সামান্য বিষয়ে মাথায় ঘামায় না। তারপরও আমি ভাইকে বলে দিব যেন তানভিরের সাথে বাজে ব্যবহার না করে। শুনলাম আবিরের সাথেও কথা বলছো না, কেনো? ও আবার কি করছে?”

“অনেক কিছু করছে কয়টা শুনবি? আমার বাধ্য ছেলে অবাধ্য হয়ে গেছে এটায় মূল কথা। তার কাজ শেষ দেশে আসতে বলছি, এখন আসতে পারবে না। রমজানের আগে থেকে বিয়ের কথা বলতেছি কিন্তু সে বিয়েও করবে না। কি ভাবে, কি করে একমাত্র সে আর আল্লাহ ই ভালো জানেন। আমার ছেলে আগে এমন ছিল না৷ এতগুলো বছর যাবৎ আমি যা বলেছি তাই করেছে, এমনকি আবিরের কিছু লাগলে, কিছু চাওয়ার থাকলে দ্বিধাহীন ভাবে আমার কাছে চেয়েছে, ও যা বলেছে আমি তাতেই রাজি হয়েছি, সব অনুমতি দিয়ে দিয়েছি। তাহলে এখন এত দূরত্ব কেন হচ্ছে? গত তিনবছরে কি এমন হলো যে আমার ছেলের মধ্যে এত পরিবর্তন চলে এসেছে?”

মাহমুদা খান শ্বাস ছেড়ে উষ্ণ স্বরে বললেন,
“ছেলে বড় হচ্ছে, প্রতিনিয়ত মাথায় কত কত প্রেশার ঢুকছে। হয়তো আবেগের বশবর্তী হয়ে করা ভ্রান্তিগুলোর জন্য ভেতরে ভেতরে পুড়ছে, নিজেই নিজের বিবেকের সম্মুখীন হতে পারছে না।ভাইজান, এমনও হতে পারে আবির তোমাকে কিছু বলতে চায়। তুমি রাগারাগি না করে ওকে একটু সময় দিও, আবিরকে বুঝার চেষ্টা করো। ও কি বলতে চায় শুনো।”

আলী আহমদ খান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,
” আমার এখন আর কিছু শুনার নেই। অনেকবার তার মতামত জানতে চেয়েছি, ও কি চাই না চাই সব জানতে চেয়েছি, কোনো সমস্যা কি না তাও জানতে চেয়েছি, আমাকে কিছু বলতে চায় কি না সেটাও জিজ্ঞেস করেছি এমনকি তার মাকে দিয়েও জিজ্ঞেস করিয়েছি। কিন্তু আবির প্রতিবার আমার কথা এড়িয়ে গেছে, ওর মাকে পর্যন্ত কিছু বলে নি। এখন ওর মনের কথা জানার আর কোনো আগ্রহ আমার নেই। আলী আহমদ খান কাউকে কোনো ব্যাপারে এত সুযোগ দেন না, সে আমার ছেলে বলে আমি তাকে অনেক ছাড় দিয়েছি কিন্তু আর সম্ভব না।”

এমন সময় মোজাম্মেল খান দরজায় দাঁড়িয়ে মোলায়েম কন্ঠে বললেন,
“ভাইজান আসবো?”

আলী আহমদ খান সেদিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বললেন,
“চলে যাচ্ছিস নাকি?”

” আমি কোথাও যাচ্ছি না৷ খিদা লাগছে খাবো তাই তোমাকে নিতে আসছি৷ আর হ্যা আমি সত্যি দুঃখিত ভাইজান। তোমাকে ঐভাবে কথাটা বলি নি। আমার মনে আসছিল তাই মুখ ফস্কে বেড়িয়ে গেছিল।”

“খিদা লাগছে খেতে যা আমাকে বলার কি আছে?”

“বলছি কারণ আজ দুপুরের রান্না স্পেশাল মানুষজন করেছেন। আসিফের বউ, আইরিন আর আমার মেয়ে তো আছেই। তোমাকে রেখে একা খেলে আবার দশটা কথা শুনাবা। তার থেকে বরং তুমিও চলো।”

আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,
” আমি যেতে পারি তবে একটায় শর্তে, আজকে থেকে তানভির, মেঘ দু’জনের ব্যাপারে তুই আর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবি না। আমি যা বলবো, যেভাবে বলবো কোনো দ্বিমত ছাড়ায় মেনে নিতে হবে। বল রাজি?”

মোজাম্মেল খান একগাল হেসে বললেন,
” আমি রাজি৷ তোমার প্রতি আমার অগাধ আস্হা আছে। আমি ভুল করলেও আমার ভাই কখনো ভুল করতে পারে না।আর হ্যাঁ আমি কিন্তু আমার চ্যালেঞ্জে জিতেই গেছি তাই বাসা ছাড়ার প্রশ্ন ই আসে না। ”

আলী আহমদ খান গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“তুই জিতেছিস ঠিকই তবে আমি হেরে যায় নি। কথাটা মাথায় রাখিস। এই বাড়িতে আমার কথায় শেষ কথা, এটা ভুলে যাস না।”

“ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি আসো।”
“যা আসছি।”

মাহমুদা খান দীর্ঘ মনোযোগ দিয়ে দুই ভাইয়ের কথোপকথন শুনছিলো। মোজাম্মেল খান বেড়িয়ে যেতেই প্রশ্ন করলেন,
” ভাই হার জিতের কথা বলছিল কেন?”

” ওর তো সারাদিন কাজ ই এটা। আমার কোন কথা ঠিক হয়েছে কোনটা ঠিক হয় নি এসব নিয়েই তার গবেষণা। কয়দিন যাবৎ এক প্রজেক্ট নিয়ে লাগছে, আমি বলেছিলাম শেষ করতে পারবে না। এখন শেষ করে ফেলছে তাই জিতছে বলে খুশি হচ্ছে। অথচ সেই প্রজেক্টেও আমার ছেলেই হেল্প করেছে। এটা এখন বললে আবার রাগ করে বসে থাকবে। তার থেকে খুশি হচ্ছে হোক। তোরা আসছিস অনেকক্ষণ হয়েছে, চল খেতে যায়।”

মাহমুদা খান বসা থেকে উঠতে উঠতে বললেন,
“ভাইজান, আবিরের সাথে একটু কথা বলিয়েন।”

“আচ্ছা।”

ইদানীং বন্যার মন ভীষণ খারাপ। তানভিরের ফোন রিসিভ করে না বেশকিছুদিন হলো। তানভির প্রায় ই বন্যাদের বাসার এদিকে আসে। দু-একদিন মোখলেস মিয়ার সাথে দেখা হয়েছে ঠিকই কিন্তু বন্যার সাথে একদিনও দেখা হয় নি। তানভিরের ঘনঘন যাতায়াত মোখলেস মিয়া ভালোই পর্যবেক্ষণ করছেন।

আজ বিকেলে মোখলেস মিয়া জোরপূর্বক তানভিরকে বাইক থামাতে বলেন। তানভিরও একপ্রকার বাধ্য হয়ে বাইক থামায়। তানভিরকে নিয়ে কাছেই এক চায়ের দোকানে বসে জিজ্ঞেস করলেন,

“ঐ পোলা, তুমি কি আমার বউকে পছন্দ করো?”

আচমকা মোখলেস মিয়ার এমন প্রশ্নে তানভির কিছুটা ইতস্তত বোধ করে। দৃষ্টি মাটিতে নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মোখলেস মিয়া আবারও বললেন,

” দেখো ভাই, বয়স আমার কম হয়ছে না। চোখ দেইখা মানুষের মনের কথা বুঝবার পারি। সেদিন বন্যার সাথে তোমারে দেইখাই সন্দেহ হয়ছিল। আর ইদানীং তোমার এই গলিতে আসা যাওয়ায় নিশ্চিত হইয়া গেলাম। ”

তানভির এখনও চুপ করে বসে আছে। বলার মতো কিছুই নেই তার। মোখলেস মিয়া তানভিরের কাঁধে হাত রেখে শান্ত কন্ঠে বললেন,

” পছন্দ করো ভালো কথা কিন্তু শুধু বাইক চালাইয়া কি ঢাকা শহরে বউ পালতে পারবা? আর বন্যার আব্বা কিন্তু মোটরসাইকেলের ড্রাইভারের কাছে মেয়ে বিয়া দিতো না। সময় থাকতে ভাবো আর নাইলে আমার বউরে ভুইলা যাও। ”

ভুইলা যাও শব্দটা যেন তানভিরের মস্তিষ্কে গুরুতরভাবে আঘাত করেছে। তানভির কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে বসা থেকে উঠে শক্ত হাতে চায়ের কাপ রাখতে রাখতে হুঙ্কার দিল,

” ভুইলা যাইতে পারবো না। প্রয়োজনে আপনার এই বন্যা বউকে ভাগাইয়া নিয়ে যাবো৷ যেতে না চাইলে কি*ডন্যা*প করে নিয়ে যাব, তবুও ভুলতে পারব না৷ আর আপনি যদি উল্টাপাল্টা কথা বলেন তাহলে আপনাকেও কি*ডন্যাপ করে পঞ্চগড় পাঠায় দিব। ওখানে তিন নাম্বার বিয়ে করে সংসার কইরেন।”

তানভির রাগে কটমট করতে করতে বাইকে উঠে গেছে। মোখলেস মিয়া হাসতে হাসতে বললেন,

“সাব্বাস! ব্যাটার তেজ আছে ভালো।”

আজ ভার্সিটির ক্লাস একটু তাড়াতাড়ি শেষ হয়েছে৷ তাই সবাই একসঙ্গে ঘুরতে বেড়িয়েছে। ড্রাইভারকে আগেই জানিয়ে দিয়েছে। পার্কে বসে সবাই আড্ডা দিচ্ছে। মিনহাজ হঠাৎ বলে উঠল,

” সবাই শুন, মেঘ আর বন্যাকে ডাকতে গেলে আমাদের বেশ কিছু সমস্যায় পড়তে হয়। প্রথমত স্যার ম্যামদের সামনে ভাবি বলে ফেললে ১০ টা প্রশ্ন করে, শুধু শুধু বকাও খেতে হয়। তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন থেকে ভাবি ডাকবো না। যেহেতু খান বাড়ির বড় ছেলে আবির ভাইয়া তাই স্বাভাবিক ভাবে মেঘ হবে সেই বাড়ির বড় বউ। আর বন্যা হবে মেজো বউ৷ তাই আমরা এখন থেকে সেই অনুসারে ডাকবো। মেঘকে ডাকবো V1 মানে ভাবি-১ আর বন্যাকে ডাকব ভাবি-২ মানে V2, ঠিক আছে?”

সাদিয়া, মিষ্টি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,
” একদম ঠিক আছে”

মেঘের মুখে হাসি থাকলেও বন্যা মুখ ফুলিয়ে রাগী স্বরে বলল,
“আমাকে ভাবি/ V2 / V3 কিছুই ডাকতে হবে না।”

মেঘ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“কি হয়েছে বেবি? এখনও রেগে আছো?”

“না কিন্তু ভাবি ডাক শুনার ইচ্ছে নেই।”

মেঘ ন্যাকামির স্বরে বলল,
“না…. এ হতে পারে না। আমার হৃদপিণ্ড চিঁড়ে ছোট ছোট অনুভূতি একত্রিত করে তোমাকে ভাবি বানানোর জন্য প্রপোজ করলাম। আর তুমি এখন এসে নাটক করছো, ভাবি ডাক শুনার ইচ্ছে নেই? তাঁর ছিঁড়া মার্কা কথা বললে সত্যি সত্যি বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিয়ে যাব। আর ভাইয়াকে গিয়ে বলল, তোর এই জীবন ভালো লাগে না, তুই নিজের জীবনের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে বুড়িগঙ্গা ঝাপ দিয়েছিস৷ তখন কেমন হবে?”

বন্যা মলিন হেসে বলল,
” ভালোই হবে। তোর থেকে বেশি তোর ভাই খুশি হবে।”

” খুশি হবে না ছাই! চোখ বন্ধ করে নিজেও বুড়িগঙ্গায় ঝাপ দিবে দেখিস। ”

“বাজে কথা বলিস না মেঘ। ওনার অতীত ফিরে আসছে, ওনার জীবনে বন্যা এখন কেউ না। ”

মেঘ রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
” শুন ভাইয়ার অতীত যদি ভাইয়ার জীবনে আবারও ফিরতে চায় আর আমার ভাই যদি নির্লজ্জের মতো ঐ মেয়েকে এক্সেপ্ট করে নেয় তাহলে তোকে কিছু করবো না৷ আবির ভাই আর আমি মিলে বাসার পেছনের বাগানে ভাইয়াকে কু*পে দিয়ে আসবো। ”

বন্যার দুচোখ ছলছল করছে। ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে বসে বসে কান্না গিলছে। মেঘ শক্ত কন্ঠে শুধালো,

“ভাইয়া তোকে ভালোবাসে, এটা কি তুই বিশ্বাস করিস?”

বন্যা অসহায় দৃষ্টি তাকিয়ে আছে। মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“আমি এখন ভাইয়াকে কল দিব। জাস্ট সামান্য একটা কথা বলব দেখবি ভাইয়া পাগলের মতো ছুটে আসবে।”

“কোনো দরকার নেই।”

“তোর দরকার না থাকলেও আমার দরকার আছে। আমি আমার ভাবির চোখে পানি দেখতে চাই না। ”

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে তানভিরের নাম্বারে কল দিল। লাউডস্পিকার দিয়ে রেখেছে। আশেপাশে সবাই বসা। তানভির পার্টি অফিসে মিটিং করছে। মিটিং প্রায় শেষ পর্যায়ে। সবার বুঝানোর পরও তানভির নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় কমিটি বাতিল করা ছাড়া আর কোনো অপশন নেই। এরমধ্যে মেঘের কল আসায় তানভির মিটিং থেকে বেরিয়ে কল রিসিভ করতেই মেঘ কাঁদো কাঁদো কন্ঠে ডাকল,
“ভাইয়া..”

তানভির আঁতকে উঠে বলল,
“কি হয়েছে বনু? কোনো সমস্যা?”

মেঘ নাক টানতে টানতে বলল,
” আমার কোনো সমস্যা না কিন্তু বন্যা….. ”

“কি হয়েছে বন্যার? ”

“বন্যা…..” মেঘ আর কিছুই বলছে না। তানভির আতঙ্কিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
” বন্যার কি হয়েছে?”

“জানি না। বন্যা কেমন জানি করছে।”

“কোথায় আছিস তোরা?”

মেঘ জায়গার নাম বলতেই তানভির ঝটপট বলল,
“আমি এখনি আসতেছি।”

“ভাইয়া শুনো”
ততক্ষণে তানভির কল কেটে দিয়েছে। মেঘ বন্যার দিকে তাকিয়ে ভেঙচি কেটে বলল,
” দেখ কেমনে আসতেছে। তুই বসে বসে দোয়া কর যেন দ্রুত আসতে গিয়ে কোনো সমস্যা না হয়।”

তামিম প্রশ্ন করল,
“এই V1, তুই গ্রুপ থেকে বেড়িয়ে গেলি কেন? তুই ছাড়া গ্রুপটা ভালো লাগে না। সবাই খুব বোরিং আর তোর ভাবি তো আরও বেশি বোরিং।”

মেঘ হেসে উত্তর দিল,
” আমার ওনি যদি গ্রুপের চ্যাটিং দেখে আমাকে সোজা চান্দে পাঠায় দিবে। তাছাড়া আমি যে কাজে গ্রুপ খুলতে বলছিলাম সেই কাজ শেষ তাই এখন আমার গ্রুপ আর প্রয়োজন নেই। ”

সাদিয়া শান্ত কন্ঠে শুধালো,
“তুই যে কিছুদিন গ্রুপে এত এত মেসেজ দিলি, নাটক করলি সেসব তোর ওনি দেখে নি?”

“প্রথমত গ্রুপে কথা শেষে আমি সঙ্গে সঙ্গে গ্রুপ সমেত সব মেসেজ ডিলিট করে দিতাম। দ্বিতীয়ত আমি সারাক্ষণ আমার আইডির Login Activity চেক করতাম যেন আমার ওনি আমার আইডিতে লগ ইন করলেই আমি এলার্ট হতে পারি। আমার ওনি এই কয়দিনে আমার আইডিতে একবারের জন্যও ঢুকে নি তাই সুযোগের সৎ ব্যবহার করে গ্রুপ থেকে বেড়িয়ে পরেছি যাতে ওনি কিছুই বুঝতে না পারেন।”

বন্যা মেঘের দিকে তাকিয়ে উদাসীন কন্ঠে শুধালো,
“তুই এত চালাক হইলি কবে?”

“কিছুদিন যাবৎ অনলাইনে চালাক হওয়ার ট্রেনিং করছি। বুঝলি?”

বন্যা মলিন হাসলো সাথে বাকিরাও। হঠাৎ মেঘের নজর পড়ে কিছুটা দূরে দাঁড়ানো এক ছেলের দিকে। লম্বাচওড়া ছেলেটার দুহাত পেছনে হাতে বেশ কিছু ফুল৷ দেখেই বুঝা যাচ্ছে কাউকে প্রপোজ করতে এসেছে। কিন্তু আশেপাশে কোনো মেয়ে নেই। মেঘ স্থির দৃষ্টিতে ছেলেটার হাতের ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পর শাড়ি পড়া এক মেয়ে আসলো, বেশ সুন্দর করে সেজেগুজে এসেছে। মেয়েটা এসে ছেলেটার সামনে দাঁড়াতেই ছেলেটা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। পেছন থেকে ফুল গুলো বের কয়ে মেয়েটার সামনে ধরলো। এভাবে ফুল দেয়ার বিষয়টা কমন হলেও সবার আবেগ গুলো ভিন্ন ভিন্ন৷ সেদিন মেঘ নিজেই বন্যার জন্য কতটা আবেগ নিয়ে ঠিক এভাবে হাঁটু গেড়ে বসে প্রপোজ করেছিল তবে সেটায় অন্যরকম অনুভূতি ছিল। আজ এই দৃশ্য দেখে মেঘের বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে। আচমকা আবিরকে বড্ড বেশি মিস করছে। লম্বাচওড়া আর দেখতে ছেলেটা অনেকটায় আবিরের মতো তাই হয়তো মেঘের একটু বেশিই মনে পড়ছে। মেঘ আনমনে ভাবছে,
” আবির ভাই কি কখনো এভাবে প্রপোজ করবেন আমায়? সামান্য একটা লাল গোলাপ চেয়েছিলাম তবুও দেন নি, ওনার কাছে ফুল সমেত প্রপোজ আশা করা বড্ড বেমানান।”

বন্যা ডাকতেই মেঘের হুঁশ ফিরলো৷ কোনো কথা না বলে ফেসবুকে ঢুকে পোস্ট করল,

❝সাত সাগর আর তের নদী
পার হয়ে তুমি আসতে যদি
রূপকথার রাজকুমার হয়ে
আমায় তুমি ভালবাসতে যদি।❞

পোস্ট আপলোড হওয়া মাত্রই তানভির উপস্থিত হলো। দ্রুত এগিয়ে এসে আতঙ্কিত কন্ঠে শুধালো,
“কি হয়েছে তোমার?”

বন্যা থতমত খেয়ে তানভিরের দিকে তাকালো। বন্যা একদম স্বাভাবিক, চোখে মুখে অসুস্থতার রেশ মাত্র নেই। বন্যা কি বলবে এটায় বুঝতে পারছে না। তানভির একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। বন্যা শুধু মেঘকে দেখছে কিন্তু মেঘের মনে যে রাজ্যের দুঃখ। মন খারাপের পাহাড় সরিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে মেঘ আস্তে করে বলল,
“তেমন কিছু হয় নি ভাইয়া । বরই খেতে গিয়ে বরই এর একটা বিচি গিলে ফেলছিল। যদি পেটে গাছ হয়ে যায় এই আতঙ্কে বন্যা সহ আমরা সবাই ভয় পাচ্ছিলাম। তারপর এক আন্টি বলছে কোনো সমস্যা হবে না। ”

তানভির হাতের উল্টোপিট দিয়ে নিজের চোখ মুখ মুছে আকাশের পানে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে প্রশ্ন করল,

“এটায় সত্যি ঘটনা? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে যা কিন্তু এখন বলছিস না।”

মেঘ ঘনঘন এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে বলল,
“আর কোনো কারণ নেই। ”

মেঘ একটু থেমে আবার বলল,
“আসলে বন্যার কয়েকটা বই কেনা দরকার কিন্তু আমাদের কারো সেদিকে যেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি যেহেতু চলেই আসছো, বন্যাকে নিয়ে যাবা, প্লিজ।”

বন্যা অগ্নি চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ তানভিরের সঙ্গে একা কোথাও যাওয়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বন্যার নেই। আয়েশাকে দেখার পর থেকে বন্যার আতঙ্ক কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। রাতবিরেতে ঘুম ভেঙে যায়, ঘন্টার পর ঘন্টা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। প্রায় রাতেই আপু সজাগ হয়ে বন্যাকে ডেকে নিয়ে ঘুম পাড়ায়। তানভিরের কল রিসিভ করে না, বেশকিছু দিন ক্লাসে পর্যন্ত আসে নি। তানভির রাশভারি কন্ঠে শুধালো,
“তুই কিভাবে যাবি?”

“মিষ্টি ওর ফুপ্পির বাসায় যাবে। ওনাদের বাসা আমাদের বাসার এদিকে। আমি মিষ্টির সাথে চলে যাবো।”

“ঠিক আছে। সাবধানে যাস।”

“আচ্ছা। তুমি বন্যাকে নিয়ে যাও আর হ্যাঁ বন্যাকে মোখলেস দুলাভাই এর দোকান পর্যন্ত দিয়ে এসো।”

তানভির নির্বাক চোখে মেঘকে দেখে নিল। মেঘের ঠোঁট জুড়ে হাসির ঝলক। তানভির চাইলেও বোনকে কিছু বলতে পারছে না। বন্যার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,
“চলো”

বন্যা তখনও মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের ভাষায় বুঝাচ্ছে সে তানভিরের সঙ্গে যাবে না। কিন্তু মেঘ সেই ভাষাকে পাত্তা না দিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“কিরে যাচ্ছিস না কেনো? ভাইয়া কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে বলতো! ”

বন্যা বিড়বিড় করতে করতে উঠে গেল। মেঘ, মিষ্টি, সাদিয়া, মিনহাজ, তামিম তখনও বসা। তানভির যাওয়ার আগে বোনকে সতর্ক করে গেলো যেন তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যায়। মিষ্টিরা টুকিটাকি বিষয় নিয়ে দুষ্টামি করছে। অথচ মেঘের মনোযোগ কাপল টার দিকে৷ দু’জন পাশাপাশি বসে কি সুন্দর ভাবে গল্প করছে। আবিরের জন্য মেঘের মনটা খুব বেশি ছটফট করছে। আগপাছ না ভেবেই সবার মধ্যে থেকে উঠে গেলো৷ কিছুটা দূরে গিয়ে আবিরকে কল করল। এদিকে আবির অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছে। সচরাচর দিনের বেলা আবিরকে কেউ কল দেয় না তাই ফোন সাইলেন্ট করতেও ভুলে গেছে। আচমকা কল বাজতেই একজন বয়স্ক ব্যক্তি বিরক্তির স্বরে বললেন,
“Silence your phone.”

আবির তড়িৎ বেগে ফোন সাইলেন্ট করতে টেবিলে কাছে এগিয়ে আসলো। ফোনের স্ক্রিনে নজর পড়তেই থমকালো। অসময়ে মেঘের কল দেখে ভেতরটা কেঁপে উঠলো। উপস্থিত সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল,
“I’m Sorry. I can’t cut this call. Excuse me.”

আবির কল রিসিভ করে কিছুটা সাইডে সরে দাঁড়িয়েছে। রিসিভ হওয়ামাত্রই মেঘ আর্তনাদ করে উঠল,
“আবির ভাই…… ”

আবির বরাবরের মতো শান্ত আর আবেশিত কন্ঠে জবাব দিল,
“হুমমমমমম।”

“আপনি কবে আসবেন?”
“আসবো।”

মেঘ শীতল কন্ঠে শুধালো,
“কবে আসবেন?”

আবির এবার আস্তে আস্তে বলল,
“আমি কবে আসবো এটা তো আপনি তো খুব ভালোভাবে জানেন। আপনিই বলুন, আর কতদিন বাকি?”

মেঘ মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“২৭ দিন। ”

“Very Good. এখন বলুন আপনার কি হয়েছে?”

“কিছু হয় নি। এমনিতেই ভালো লাগছিল না। খেয়েছেন আপনি?”

“এখনও খাওয়া হয় নি একটু পর খাবো। আপনি খেয়েছেন?”
” বাহিরে খেয়েছি। বাসায় যায় নি এখনও।”

আবির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“এখনও বাসায় যান কি কেনো? সাথে কে?”

“মিষ্টিরা সবাই আছে।”

মেঘ আবারও ডাকল,
“আবির ভাই…”

আবির পূর্বের ন্যায় জবাব দিল,
“হুমমমমমম।”

মেঘ ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে বলল,
“I Miss You Abir Vai. Miss You a lot. ”

সহসা আবিরের ওষ্ঠ যুগল প্রশস্ত হলো। সবার দিকে এক নজর দেখলো৷ রুমে উপস্থিত সবার নজর আবিরের দিকে। আবির সঙ্গে সঙ্গে নজর সরিয়ে আস্তে করে গলা খাঁকারি দিয়ে মুচকি হেসে বলে উঠল,
“আচ্ছা, তারপর। ”

মেঘ এবার আহ্লাদী কন্ঠে বলে উঠল,
“I Miss You Infinity. Do you miss me?”

আবিরের মোলায়েম কন্ঠের ছোট জবাব,
“হুম।”

মেঘ এবার ঠোঁট উল্টালো। সবসময় মিস ইউ বলে মেঘ কল কেটে দিলেও আজ সে কল কাটছে বা বরং আবিরকে প্রশ্ন করছে অথচ আবির হুমম, আচ্ছা বলে কথা কাটাচ্ছে। মেঘ মনে মনে ক্ষুদ্ধ হলো। বুক ভরে শ্বাস টেনে রাশভারি কন্ঠে শুধালো,
“আপনি কি ব্যস্ত?”

“প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিলাম। ”

মেঘ আতঙ্কিত কন্ঠে বলতে শুরু করল,
“সরি সরি সরি, আমি বুঝতে পারি নি। আপনি কল কেটে দিলেই পারতেন৷ রাখি এখন।”

আবির শান্ত কন্ঠে বলল,
“দ্রুত বাসায় যান। আমি প্রেজেন্টেশন শেষ করে কল দিচ্ছি। ওকে?”

“আচ্ছা। ”

মেঘ কল কেটে মোবাইল দিয়ে নিজের কপালে আস্তে করে গাট্টা দিতে দিতে নিজেকে বকতে লাগলো। মানুষ কল দিয়ে প্রথমে জিজ্ঞেস করে কেমন আছেন, কি করেন অথচ মেঘ সেই প্রশ্ন সবার শেষে জিজ্ঞেস করেছে। প্রথমে জিজ্ঞেস করলে এমন একটা ঘটনা কখনোই ঘটতো না। মেঘ নিজেকে বকতে ব্যস্ত। আবির ফোন সাইলেন্ট করে টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল,
“Sorry for wasting your time.”

সবার মধ্য থেকে মোটামুটি বয়স্ক একজন জিজ্ঞেস করলেন,
“Is she your lover?”

আবির নিঃশব্দে হেসে মোলায়েম কন্ঠে উত্তর দিল,
“She is my everything. I’m nothing without her. ”
মধ্যবয়স্ক লোক এবার একগাল হেসে বললেন,
“She is truly lucky to have a life partner like you. Best of luck.”

আবির অনুষ্ণ কন্ঠে জানাল,
“No,Sir. I am more lucky to have someone like her in my life. Pray for us & Again Sorry.”

তানভির বন্যাকে নিয়ে একটা লাইব্রেরিতে গেল। বন্যা আশেপাশে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো। আপাতত কোনো বই কেনার ই প্ল্যান ছিল না তার, তবুও অনেক দেখেশুনে ২-৩ টা বই নিল। তানভির বন্যাকে কিছু বলতে চাচ্ছে কিন্তু বন্যা খুব ব্যস্ততা দেখাচ্ছে এমনকি তানভিরের দিকে তাকাচ্ছেও না। কাজ শেষে তানভিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনি চলে যান আমার আরও কিছু কাজ আছে।”

” কাজ অন্যদিন করো আজ চলো, একজায়গায় যাব। ”
বন্যা ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“আমার শরীর ভালো না।”

তানভির মলিন হেসে বলল,
“বরই এর বিচি খেলে কিছু হয় না বোকা। ”

বন্যা তানভিরের দিকে স্পষ্ট চোখে তাকিয়ে বলল,
“আমি বোকা না।”

” তাহলে কি? চালাক? কতটা? ”

বন্যা তখনও তানভিরের দিকে তাকিয়ে আছে। তানভির রাশভারি কন্ঠে বলল,
“কল দিলে কল রিসিভ করো না কেনো?”

বন্যা ঢোক গিলে ভেতরের কষ্ট চেপে রেখে আস্তে করে বলল,
” সবসময় ফোনের কাছে থাকি না।”

“পরে তো দেখো। তখন একটা কল দিতে পারো না?”

বন্যা আর কিছু বলল না। তানভির এবার শক্ত কন্ঠে জানতে চাইলো,
” তুমি কি আমার উপর বিরক্ত?”

বন্যা এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে নিচু স্বরে বলল,
” আমি বাসায় যাব।”

বন্যার ভেতরে ঠিক কতটা যন্ত্রনা হচ্ছে এটা সে তানভিরকে বুঝাতেই পারছে না। তানভির বন্যাকে নিয়ে একটা চায়ের দোকানে বসলো। যদিও বন্যার ইচ্ছে ছিল না, তানভির জোর করেই এনেছে। দু’জনে দু কাপ বুলেট চা নিয়েছে। বন্যা দ্রুত চা খাচ্ছে যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাসায় চলে যেতে পারে। তানভির বন্যার এমন কর্মকাণ্ড দেখে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আচমকা বলে উঠল,
“সেদিনের মেয়েটার কথা মনে আছে?”

বন্যা বুঝেও অবুঝের মতো প্রশ্ন করলশ
“কোন মেয়ে?”

“আয়েশা।”

নামটা কর্ণকুহরে প্রবেশ মাত্রই বন্যা বিষম খেয়ে উঠল। টক আর কাঁচা মরিচের ঝাঁজে কাশতে কাশতে বন্যার শ্বাস আঁটকে যাচ্ছে। দুচোখ বেয়ে পানি পরছে, তানভির তড়িঘড়ি করে এক গ্লাস পানি নিয়ে আসলো। শ্বাস আঁটকে যাওয়ায় পানিটা পর্যন্ত খেতে পারছে না। তানভির কি করবে বুঝতে না পেরে বন্যার মাথায় অনবরত ফুঁ দিচ্ছে। বন্যার স্বাভাবিক হতে বেশকিছুটা সময় লাগলো। তানভির তখনও বন্যা পাশে দাঁড়ানো। বিষয়টা খেয়াল করে বন্যা আস্তে করে বলল,
“আমি ঠিক আছি। আপনি বসুন।”

তানভির “সরি” বলে দূরে সরে বসেছে। বন্যা বলল,
“তখন কি যেন বলছিলেন, বলুন।”

তানভির মনে মনে বিড়বিড় করল,
“যে শাঁকচুন্নির নাম নেয়াতে তোমার এই অবস্থা হয়েছে এই শাঁকচুন্নির নাম আর জীবনেও মুখে নিবো না। ”

বন্যা আবারও বলল,
“কি হলো, বলুন।”

“কিছু না,চলো তোমাকে বাসা পর্যন্ত দিয়ে আসি।”

আবির প্রেজেন্টেশন শেষ করেই মেঘকে কল দিয়েছে ততক্ষণে মেঘ বাসায় চলে গেছে। কথা শেষ করে ফেসবুকে ঢুকা মাত্র মেঘের পোস্ট সামনে আসছে৷ পোস্ট দেখে আবির জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে অনুগ্র কন্ঠে বলল,
“রূপকথার রাজকুমার না হলেও মাহদিবার রাজকুমার হয়ে খুব শীঘ্রই আসবো, ইনশাআল্লাহ।”

নিত্যদিনের মতো রাত ১০:৩০ নাগাদ আবিরের কল আসছে। মেঘ যেন প্রতিদিন এই সময় টায় জন্যই অপেক্ষা করে। আবির কল দিয়েই ধীর কন্ঠে শুধালো,
“কি অবস্থা? ”
“কিসের কি অবস্থা? ”
“শপিং কতদূর?”
“কিসের শপিং?”
“বিয়ের।”
“কার বিয়ে?”
“তোর।”
“আমার বিয়ে! কবে?”

” সেসব জেনে তোর কাজ কি? তুই না বলছিলি বিয়ের জিনিসপত্র নিয়ে পালানোর শখ তোর। টাকা পাঠিয়েছি কি কি লাগে সব কিনে নিস। ”

মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে বলল,
“আমি আপনাকে এটা বলি নি।”

“সেসব বাদ দে, এখন বল তোর কি লাগবে?”

মেঘ মনে মনে বিড়বিড় করল,
“আপনাকে লাগবে। এখন দিয়ে দেন আমায়।”

“কি হলো বল!”

“আমার কিছু লাগবে না।”

আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“আগামীকাল শপিং এ যাব৷ সারারাত লিস্ট করে পাঠাবেন। মনে থাকবে?”

“হুমমম।”

★★

তানভির রাজনীতি ছেড়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছে। সেই সঙ্গে আপাতত আবিরের অফিসের টুকটাক দেখাশোনা করতে হচ্ছে। এছাড়াও আরও কিছু কাজ আছে। এরমধ্যে আয়েশার সঙ্গে আর দেখা হয় নি। তানভিরও ভুলে গেছে সেই মেয়ের কথা।

বন্যা ইদানীং একটা টিউশন শুরু করেছে। মূলত বন্যার বড় আপু মেয়েটাকে পড়াতো৷ কিন্তু এখন চাকরির চাপে টিউশন পড়ানো টা কষ্ট হয়ে যায় তাই বন্যা পড়াচ্ছে। বিকেল দিকে বন্যা টিউশন থেকে বেড়িয়ে হেঁটে মেইনরোড পর্যন্ত যাচ্ছিলো। অনেকটা যাওয়ার পর হঠাৎ পাশ থেকে একজন ডাকলো,
“বন্যা।”

মেয়েলী কন্ঠস্বরে নিজের নাম শুনে বন্যা থমকে দাঁড়িয়ে পাশে তাকালো। থ্রিপিস পড়া এক মেয়ে মাথায় ওড়না দেয়া, এগিয়ে আসলো বন্যার কাছে। বন্যা সূক্ষ্ণ নেত্রে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

“কে আপনি? আমাকে কিভাবে চিনেন?”

“আমি আয়েশা। সেদিন দেখা হলো মনে নেই? তানভিরের সাথে ছিলে তুমি।”

বন্যা শ্বাস ছেড়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
“কিছু বলবেন?”

“হ্যাঁ। তুমি মেঘের ফ্রেন্ড বন্যা না?”

“জ্বি৷ কেনো?”

“আসলে তোমাকে সেদিন তানভিরের সাথে দেখার পর কেন যেন মনে হচ্ছিল তুমি ওর গার্লফ্রেন্ড। অনেক ভাবার পর মনে হয়েছে। তুমি তো মেঘের ফ্রেন্ড। অনেক আগে তোমাকে দেখেছিলাম। তখন তোমরা অনেক ছোট ছিলে। ”

বন্যা নিজের ভেতরে ক্রোধ চেপে রেখে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আমাকে কি কোনো দরকারে ডেকেছেন? আমার কিছু কাজ আছে, যেতে হবে৷ ”

“তানভিরের বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই ডেকেছিলাম। তুমি জানো কি না জানি না, তানভিরের সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল৷ পারিবারিক সমস্যার কারণে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না। মূলত তানভিরের জন্য আমার ঢাকায় আসা। মাস্টার্স আর চাকরির প্রস্তুতি কেবল বাহানা। আচ্ছা, তানভির কি বর্তমানে কোনো সম্পর্কে আছে? জানো তুমি?”

“আমি কিভাবে জানবো?”

“তোমার সাথে কিছু নেই তো?”

বন্যা কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“থাকলে কি করবেন?”

আয়েশা ফিক করে হেসে বলল,
“মজা করতেছো? তোমাকে তানভির ছোট বোনের চোখে দেখে। তাই তোমার প্রতি ওর কোনো অনুভূতি আসবেই না।”

বন্যা ফোঁস করে বলল,
“তাহলে তো আপনি ই ভালো জানেন। আসছি”

বন্যা চলে যাচ্ছে। মেয়েটা পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার কাছে তানভিরের নাম্বার আছে?”

বন্যা কোনো উত্তর দিল না। মেয়েটা আবারও বলল,
“তানভিরের সাথে দেখা হলে আমার কথা বইলো।”

★★★

ইদানীং আবিরের আব্বুর অফিসে বেশ চাপ যাচ্ছে। মোজাম্মেল খানও ঢাকায় নেই। আলী আহমদ খান একা সব সামলে হিমসিম খাচ্ছেন। তারমধ্যে কয়েকজন নতুন জয়েন করেছে। তাদেরকে সবকিছু বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে। আবির সকাল থেকে বেশ কয়েকবার কল দিয়েছে, আলী আহমদ খান ফোনের কাছে নেই তাই রিসিভ করতে পারেন নি। অনেকক্ষণ পর ফোন দেখে আবিরকে কল ব্যাক করলেন। আবির সালাম দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,

“আব্বু, সিফাতের ব্যাপারে আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা কি ভেবেচিন্তে নিয়েছেন?”

“হ্যাঁ। কেনো?”

“কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনার এই সিদ্ধান্তটা নিয়ে আবারও ভাবা উচিত।”

“তোমার চাচ্চু তোমার কাছে বিচার দিয়েছে?”

“না আব্বু। চাচ্চু শুধু জানিয়েছেন। এটা একান্ত ই আমার মতামত। তারপরও যদি মনে হয় আপনি তাকে জয়েন করাবেন, তাহলে অন্ততপক্ষে কিছুদিন সময় নিন। আমি কিছুদিনের মধ্যেই চলে আসবো। চাচ্চু, কাকামনি ঢাকায় ফিরলে সবার সাথে কথা বলে সিদ্ধান্তটা নিলে ভালো হতো না?”

” কি বলতে চাচ্ছো, আমার নেয়া সিদ্ধান্ত ভুল? তোমরা যা ঠিক মনে করবে শুধুমাত্র তাই ঠিক?”

“আব্বু প্লিজ আপনি মাথা ঠান্ডা করে একবার ভাবুন, যেখানে ২৫-৩০ বছর যাবৎ গ্রামের মানুষের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। ভুলকরেও কখনো গ্রামে যান না, সেখানে সেই গ্রামের এক ছেলেকে গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে জব দিচ্ছেন। সেটা কি আদোঃ যুক্তিপূর্ণ? ১৫ দিনের মধ্যে আমি চলে আসবো। তাছাড়া খুব সমস্যা হলে তানভিরকে বললেই অফিসে আসবে। এরপরও যদি নিতে চান আরও অনেক মানুষ আছে। প্লিজ একবার অন্তত ভাবুন।”

আলী আহমদ খান গুরুতর কন্ঠে বলতে শুরু করলেন,
“দেখো, মানুষ সারাজীবন খারাপ থাকে না। তার পরিবার আমাদের সাথে যে অন্যায় টা করেছে সেটা অনেক বছর আগের ঘটনা। এতবছর পর সে বিপদে পড়ে জবের জন্য আমার কাছে এসেছে। এখন আমিও যদি তাদের মতো খারাপ ব্যবহার করি তাহলে তাদের আর আমাদের মধ্যে কি পার্থক্য রইলো? দ্বিতীয়বার সুযোগ পেলে মানুষ নিজের প্রথম ভুলগুলোকেও শুধরাতে পারে। দেখা যাক সে কি করে!”

আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলল,
” আমার মন কোনোভাবেই সায় দিচ্ছে না। আপনার ভালোমানুষির সুযোগ নিয়ে অনেকেই অনেককিছু করতে পারে।”

” তুমি দুশ্চিন্তা করো না। সাবধানে থেকো আর যত তাড়াতাড়ি চলে এসো। যদি তোমার ইচ্ছে হয়!”

আবির মলিন হেসে বলল,
“সরি, আব্বু।”

“সরি বলছো কেনো?”

“বলতে ইচ্ছে করলো তাই বললাম।”

★★★★

আরও এক সপ্তাহ কেটে গেছে। আবিরের বাড়ি ফেরার কেবল এক সপ্তাহ বাকি। খান বাড়ির আমেজ বদলে গেছে। মালিহা খান, হালিমা খান বিভিন্ন জাতের পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত। আকলিমা খানও তাদের কাজে সহযোগিতা করছে। মেঘ সকাল থেকে আম্মুদের বিশাল আয়োজন দেখছে। আজ ভার্সিটি যেতে একদম ইচ্ছে করছে না। তারপরও কি মনে করে ভার্সিটিতে এসেছে। একটা ক্লাস শেষ হয়ে আরেকটা ক্লাস শুরু হয়েছে কেবল ১৫ মিনিট হবে। এরমধ্যে মেঘের মাথা ঘুরছে, চোখে অন্ধকার দেখছে। একবার ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে এসেছে তারপরও ঠিক হচ্ছে না। মেঘের অবস্থা দেখে বন্যাও ভয় পাচ্ছে তানভিরকে ফোন দিতে চাচ্ছে কিন্তু মেঘ বার বার আটকে দিচ্ছে । প্রায় ১০-১৫ মিনিট পর মেঘ আচমকা সেন্স হারিয়ে বন্যার গায়ের উপর ঢলে পড়েছে।

#চলবে