আলোছায়া পর্ব-১১+১২

0
501

#আলোছায়া
পার্ট -১১
কলমে : #ফারহানা_কবীর_মানাল

মিরা চিঠিটা পড়ে হতভম্ব হয়ে বসে থাকে। সে তো কখনো ওই অচেনা লোককে ভালোবাসি বলেনি। কেমন অদ্ভুত একটা লোক রে বাবা! মিরা চিঠি নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। চিঠির উত্তর লেখারও প্রয়োজন মনে করে না। শুধু ভাবতে থাকে সত্যিকারের ভালোবাসা বুঝি অবহেলিত হয়। যেমন আশরাফুল নিজের ম্যানিব্যাগে সেঁজুতির ছবি না রেখে মিতালির ছবি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এমন আকাশ পাতাল চিন্তা করতে করতে মিরা ঘুমিয়ে যায়। সকালবেলা ঘুম হতে উঠে নিয়মিত সে সকল কাজ করে সে-ই সকল কাজ শেষ করে রেশমা বানুর কাছে যায়। রেশমা বানু তখন খাবার টেবিলে বসে চা খাচ্ছে। একটু বেলা করেই ঘুম থেকে উঠেছে সে। মিরা তার কাছে গিয়ে কোনো প্রকার ভনিতা না করে প্রশ্ন করে,

–” আচ্ছা মা সেঁজুতি কে?”

সেঁজুতি নাম শুনে রেশমা বানু একটু নড়েচড়ে বসে। তারপর ব্যস্ত হয়ে বলে, ” তোমাকে এই নাম কে বলেছে?”

মিরা রেশমা বানুর বিচলিত হওয়ার কারণ বুঝতে পারে না। শান্ত গলায় বলে, ” আপনার ছেলে বলেছে। ”

রেশমা বানুর চোখ চকচক করে ওঠে। চা’য়ের কাপের উপর একটা ঢাকনা দিয়ে চা ঢেকে রাখে। তারপর বলে, ” পাঁচ মিনিটে রেডি হয়ে আসো তুমি৷ আমি আসছি। ”

মিরা বুঝতে পারে না তার শাশুড়ি কি করতে চাইছে, তবুও ঘরে গিয়ে বোরকা পরে নেয়। সাথে মাথায় একটা ওড়না পেঁচিয়ে নেয়। রেশমা বানু একটা চাদর নিয়েছে শুধু। মিরার কাছে এসে ছোট করে বললো, ” এসো আমার সাথে। ”

মিরা বাধ্য মেয়ের মতো রেশমা বানুর সাথে চলে যায়। বাড়ির সামনে দিয়ে একটা রিকশা নিয়ে তাতে উঠে বসে। মিরা ভাবতে পারেনি রেশমা বানুর মতো মহিলা তার পাশে বসে কোথাও যাবে। এই মহিলা তাকে কতটা অপমান করেছে, কত কথা শুনিয়েছে। রিকশা ছুটে চলেছে এক অজানা গন্তব্যের দিকে। দুইজন রমণী দুই দিকে মুখ করে বসে আছে। হালকা বাতাস মুখে লাগছে, এক অদ্ভুত শীতল অনুভূতি! রিকশা একটা জায়গায় থেমে যায়। রেশমা বানু ভাড়া মিটিয়ে মিরাকে নিয়ে একটা খোলা মাঠে নিয়ে যায়। খোলা মাঠ বলতে সামান্য ফাঁকা জায়গা উঁচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরা, তার চারপাশের জমি গুলো খালি পড়ে আছে।
রেশমা বানু একটা কবরের দিকে ইশারা দিয়ে বলে, ” এই যে সেঁজুতি ঘুমিয়ে আছে।”

মিরা অবাক হয়ে শাশুড়ির দিকে তাকায়। এই মহিলার চোখের কোণেও পানি জমে আছে। কি অদ্ভুত পৃথিবী। যারা মানুষকে কাঁদায় তাদেরকেও একদিন কাঁদতে হয়। চাইলেও সে সুখী হতে পারে না, মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কবরের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে বলে, ” তোমাকে তো কেউ ভালোবেসে ছিলো। আমার দিকে দেখো! ”

কবর জিয়ারত করে রেশমা বানু আর মিরা হাঁটতে থাকে। কিছু সময় পর একটা রিকশা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। মিরার বড্ড কষ্ট হচ্ছে, অদ্ভুত কষ্ট। যার কোনো কারণ সে খুঁজে পায় না। বাড়িতে ফিরে রেশমা বানু মিরার হাত ধরে বলে, ” মা তোর সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। পারলে আমাকে মাফ করে দিস। একটা অনুরোধ করি, আমার ছেলেটাকে আগের মতো হাসি খুশি বানাতে পারবি। ছেলেটা বড্ড শান্ত হয়ে গেছে। ”

রেশমা বানুর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মিরার চোখ পানিতে টলমল করছে, এই বুঝি গড়িয়ে পড়বে। মিরা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়, রেশমা বানু চোখ মুছে চলে যায়। দুনিয়া কত বিচিত্রময়! যাদের আমরা সবসময় কষ্ট দিয়ে থাকি, প্রয়োজনে তাদের কাছে হাত জোড় করতেও দ্বিধা করি না।

সকালের খাওয়ার সময় মিরা এক দৃষ্টিতে আশরাফুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। তখন শুধু আশরাফুল একাই খাবার খাচ্ছে। মিরা পাশেই টেবিলের উপর হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদি আশরাফুলের কিছু প্রয়োজন হয়। এই মানুষটা কি করে এতো কষ্ট সহ্য করেছে! একদম পাথর হয়ে গেছে হয়তো। আশরাফুল হয়তো মিরার তাকিয়ে থাকার অর্থ বুঝতে পারে। মিরার হাতের উপর হাত রেখে শান্ত গলায় বলে, ” যে তোমাকে কষ্ট দেয় তার কষ্ট দেখে তোমার কষ্ট পাওয়া উচিত নয়৷ এতে এরা মনে করবে তুমি দূর্বল। খুব সহজে তোমাকে আঘাত করা যাবে।”

মিরা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। আশরাফুল মিরা হাত শক্ত করে চেপে ধরে পরক্ষণেই ছেড়ে দেয়। তারপর নিজের কাজে চলে যায়। অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। মিরা চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কেন জানি আজ কাল শুধু কষ্ট হয় মিরার, বড্ড কান্না পায়।

দুপুরের রান্না করতে করতে প্রায় বারোটা বেজে যায়। মিরা সবকিছু গুছিয়ে নিজের ঘরে যায়। গোসল সেরে ফেলতে পারলে মন্দ হয় না। জানালার উপর একটা সাদা কাগজ পড়ে রয়েছে। হয়তো লোকটা চিঠি দিয়েছে। মিরা গিয়ে কাগজটা উঠিয়ে নেয়। তাতে লেখা রয়েছে–

প্রিয়তমা,

তুমি কিন্তু আমার মনে ইচ্ছে পূরণ করলে না। আমি তোমাকে ভালোবাসি। একটা চিঠি তো পেতে পারি, তাই না? তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না? কেন এতো দ্বিধা তোমার?”

ইতি,
আমি।

মিরা মনে হয় এইবার লোকটাকে একটা উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। কেন জানি এই চোর পুলিশ খেলা আর ভালো লাগছে না। মিরা চিঠিটা বালিশের নিচে রেখে গোসল করতে যায়। গোসল শেষ করে সবার খাবার গুছিয়ে রাখে। হাতের নাগালে সবকিছু রেখে দেয় যাতে কারো মিরাকে ডাকার প্রয়োজন না হয়৷ সব কাজ শেষ করে মিরা নিজের খাওয়া শেষ করে, তারপর ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দেয়। চিঠির উত্তর লিখবে বলে। তার ঘরে একটা খাতা পড়ে আছে। পড়বে বাড়ি থেকে একটা বই আর খাতা কলম নিয়ে এসে ছিলো কিন্তু পড়াশোনা আর হয়নি। মিরা একটা সাদা কাগজে লিখতে শুরু করে–

জনাব,

আপনাকে আমি চিনি না। তাই প্রিয় বলে সম্মোধন করতে পারছি না। আমি একজন বিবাহিত নারী। আমার স্বামী আছে। আমি চাইলেও অন্য পুরুষের দিকে আকৃষ্ট হতে পারি না। আপনাকে বড় জোড় বন্ধু ভাবতে পারি। এর থেকে বেশি কিছুই নয়। আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। এতোদিন খেয়াল রাখার জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। ধন্যবাদ দিয়ে আপনাকে ছোট করবে না৷

ইতি,
মিরা

লেখা শেষ করে কাগজটা ভাজ করে জানালায় উপর রেখে দেয়। একটা ছোট ইটের টুকরো কাগজের উপর দিয়ে রাখে, পাছে যদি বাতাসে উঠে যায়।

মিরার কিছু ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে কোনো দমকা হাওয়া তার জীবনটা এলোমেলো করে দিবে। এতো দিন আশরাফুলকে ঘৃণা করার কারণ ছিলো মিরার কাছে কিন্তু আজ-কাল আশরাফুলকে দেখতে একদম রাগ হয় না। সহানুভূতি জেগে ওঠে। কতটা কষ্ট ছেলেটার জীবনে, তাও কি সুন্দর সবকিছু মানিয়ে চলেছে। কোনো অচেনা লোককে বিশ্বাস করে ঘর ছাড়তে রাজি নয় মিরা। বাইরের দুনিয়ায় ভয়ংকর রূপ সে দেখেছে। মা’য়ের লড়াই দেখেছে। এই বাড়ির ভিতর তবুও তার সতীত্ব অক্ষত আছে, কিন্তু বাইরে হাজারও হিংস্র কুকুর ওত পেতে আছে একটা নরম শরীর ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য। শিক্ষিত ডিগ্রীধারী লোক হতে বাসের ড্রাইভার। সত্যিকারের মানুষ পাওয়া যেন বড্ড দায়। অনেক ভাবে মিরা, শেষ মেষ সিদ্ধান্ত নেয় পরকীয়া নামক মরণ ফাঁদে সে পা দিবে না। আশরাফুলের সাথে যদি তার ডিভোর্স হয় তবেই কাউকে নিয়ে কিছু ভেবে দেখবে। সাগর দূর থেকেই সুন্দর। এর ভয়ংকর রূপ তো সাগরে ডুবে মারা যাওয়া লোকগুলো জানে। মুখে বলা যতটা সহজ বাস্তবে সেগুলো করে দেখানো বড্ড কঠিন। একজন বিবাহিত মেয়ের সাথে হাজার ছেলে প্রেম করতে আসে, হাজার রকমের ভালোবাসা দেখায় কিন্তু বাস্তবে কেউ বিয়ে করতে চায় না। যদিও কেউ বিয়ে করে সে-ই সংসারে সুখের নিশানা থাকে না। যদি এমন কেউ সুখী হয়ে থাকে তবে সে অতিরিক্ত ভাগ্যবতী। তার কথা আলাদা। প্রেমিকদের স্বামীর মতো দায়িত্ব থাকে না। স্বামী হয়ে ওঠা বড্ড কঠিন!

সন্ধ্যার দিকে আশরাফুল আসে। ঘরে যাওয়ার আগে মিরাকে বলে, ” মিরা এক কাপ কফি দেবে আমাকে? মাথাটা বড্ড ধরছে। ”

মিরা মাথা নেড়ে রান্নাঘরে চলে যায়। কি সুন্দর করে আবদার করে আশরাফুল! ফিরিয়ে দেওয়া যে বড্ড কঠিন। আচ্ছা আশরাফুল যদি কখনো মিরাকে আবদার করে বসে, কি করবে মিরা? অতিতের কষ্ট আঁকড়ে আশরাফুলকে ফিরিয়ে দিবে নাকি সবকিছু ভুলে নতুন করে পথ চলতে চাইবে?

মিরা কফির মগটা হাতে নিয়ে আশরাফুলের ঘরের দিকে যায়। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে বলে,” ভিতরে আসবো?”

–” হুম আসো। ”

মিরা মগটা আশরাফুলের হাতে দেয়। আশরাফুল মুচকি হেসে বলে, ” Thank you. ”

প্রতি উত্তরে মিরা মুচকি হাসে। আশরাফুল মিরার দিকে মগটা এগিয়ে দিয়ে বলে, ” তুমি তো নিজের জন্য আনোনি। যেখানে দুইজন মানুষ থাকে সেখানে একা কোনো খাবার খাওয়া উচিত নয়। তুমি বরং এখান থেকেই একটু খাও। ”

মিরা আশরাফুলের কথায় হতভম্ব হয়ে যায়। এ ছেলে বলে কি! সত্যি কি মিরার এঁটো খাবার আশরাফুল খাবে নাকি? মিরার মনে প্রশ্ন জেগে ওঠে কিন্তু বলে, ” আসলে আমি কফি খাই না। আপনি খান। ”

আশরাফুল নিজের মতো কফি খেতে থাকে। মিরা তখনও দাঁড়িয়ে আছে। আশরাফুল ব্যপারটা লক্ষ্য করে বলে, ” একি! তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো। ”

মিরা খাটের উপর বসে পড়ে। আশরাফুলের খাটের এক কোণে বসে কফি খাচ্ছে। আর মিরা দু-হাত দূরে বসে কিসব ভাবছে।

–” আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”

আশরাফুল কফির মগে চুমুক দিতে দিতে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। মিরা বলে উঠে, ” আপনি ম্যানিব্যাগে মিতালির ছবি কেন রাখতেন? সেঁজুতি তো আপনাকে সত্যি ভালোবাসতো। ”

–” আসলে মিরা আমরা তাদেরকে বড্ড বেশি ভালোবেসে ফেরি যারা আমাদের খারাপ সময় একটু সান্ত্বনা দেয়। একটু সাপোর্ট করে। আমিও মিতালিকে এমনই ভালোবাসতাম। ”

কথাগুলো বলে আশরাফুল মিরার দিকে ম্যানিব্যাগ এগিয়ে দেয়।

–” সেঁজুতি ছবি তো এখনো আমার কাছে আছে। ”

মিরা মুচকি হাসে। কোনো এক অজানা কারণে বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার। ধীর পায়ে আশরাফুলের ঘরে থেকে বেরিয়ে আসে। রাতের খাবার গোছাতে হবে।

ওদিকে মিরার চিঠি পড়ে অচেনা লোকির চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে চিঠির উপর। কাগজের চিঠি আস্তে আস্তে পানিকণাগুলো শুষে নেয়। পরক্ষণেই লোকটার মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে। এই হাসি-ই কি মিরার জীবন উলোটপালোট করে দিবে?

চলবে

#আলোছায়া
পার্ট -১২
কলমে : #ফারহানা_কবীর_মানাল
ওদিকে মিরার চিঠি পড়ে অচেনা লোকের চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে চিঠির উপর। কাগজের চিঠি আস্তে আস্তে পানিকণাগুলো শুষে নেয়। পরক্ষণেই লোকটার মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে। এই হাসি-ই কি মিরার জীবন উলোটপালোট করে দিবে?

রাতের খাওয়া শেষ করে মিরা নিজের ঘরে চলে যায়। দরজা চেপে দিয়ে খোপা খুলে দেয়। কোমর সমান লম্বা চুল পিঠের উপর ছড়িয়ে পড়ে। চুলগুলো বেঁধে ঘুমাতে যাবে মিরা, খোলা চুলে তার ঘুম আসে না। এমন সময় কেউ মিরার দরজায় কড়া নাড়ে। মিরা ভিষণ অবাক হয়। সচারাচর তার ঘরে কেউ আসে না, প্রয়োজন পড়লে তাকে ডাকে তবে এমন কখনো হয় নি। মিরা প্রশ্ন করে,

–” কে?”

ওপাশ থেকে পুরুষালী কন্ঠ বলে ওঠে, ” আমি আশরাফুল। ভিতরে আসবো?”

মিরা মাথার কাপড় টেনে দেয়। তারপর আস্তে করে বলে, ” হুম আসেন। ”

আশরাফুল মিরার ঘরে এই প্রথমবার এলো। বিয়ের এক বছর হয়ে গেলেও আশরাফুল মিরার ঘরে আসেনি। বাসর রাতে মিরাকে অপমান করে ছিলো। মিরাকে স্ত্রী বলে সম্মান দেয়নি। তারপরের দিন সকালে মিরা জন্য এই ঘরটা বন্দবস্ত করা হয়, আশরাফুল নিজেই তদারকি করে এই ঘরটা গুছিয়ে দিয়েছিলো। মিরাকে হয়তো স্ত্রী অধিকার দেয়নি, তবে কখনো কারণে অকারণে মিরার গায়ে হাত তোলেনি। মিরা হয়তো মনেও করতে পারে না আশরাফুল তাকে কখনো চড় পর্যন্ত মেরেছিলো কিনা! আশরাফুল হয়তো মিরার পক্ষ হয়ে লাবণি বা রেশমা বানুকে কোনো কথা বলেনি, তবে কখনোই মা বোনের কাজকে সমর্থন করেনি। আশরাফুল নামের মানুষটাকে ঘৃণা করা গেলেও অসম্মান করা যায় না।

–” শুধু ঘরে আসবে বলবে? বসতে দিবে না?”

আশরাফুলের প্রশ্নে মিরা বিব্রত হয়ে বলে, ” না না তা কেন বসুন। আপনি এখন এখানে কেন? মানে কিছু দরকার কিনা তাই জানতে চাইলাম। ”

–” না তেমন কিছু না, এমনিই আসলাম। তোমার অসুবিধা থাকলে বলো, চলে যাচ্ছি। ”

মিরার বড্ড ঘুম আসছে৷ কিন্তু আশরাফুলকে চলে যেতে বলতে পারছে না। কি না কি ভেবে বসে কে জানে! মিরা ঘুমে পড়ে যাচ্ছে,, আশরাফুল হয়তো বুঝতে পারে মিরার ঘুম আসছে তাই উঠে দাঁড়িয়ে বলে,” সারাদিন অনেক কাজ করো তুমি, এখন ঘুমাও। ”

মিরা খুব খুশি হয়৷ সত্যি অনেক ঘুম আসছে। আশরাফুল মুচকি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মিরা মাথার ওড়না খুলে বিছানার পাশে রেখে চুল বাঁধতে থাকে। আশরাফুল কি মনে করে আবার ফিরে আসে, পর্দায় ওপাশে কোনো এক রমণী খোলা চুলে দাঁড়িয়ে আছে, আশরাফুলের বড্ড লোভ হয় মিরাকে এক পলক দেখার কিন্তু ইচ্ছেটাকে দমন করে আবারও চলে যায়। ঘুমাতে যাওয়ার আগে মিরা জানালা লাগাতে গিয়ে আরো একটা চিঠি পায়। এই চিঠিগুলো মিরার খুব পছন্দের হলেও আজ ভয় হচ্ছে। মিরা কোনো প্রকার অশান্তি চায় না। চিঠিটা নিয়ে জানালা বন্ধ করে দেয়। চিঠিতে লেখা —

প্রেয়সী,

আমি তোমার বিপদের দিনে তোমার পাশে ছিলাম। আমি তোমার খেয়াল রেখেছি, তোমার স্বামী কখনো তোমার দিকে ফিরে তাকায়নি। তোমাকে প্রাপ্য সম্মান দেয়নি। তাকে তুমি ছেড়ে আসতে চাইছো না। এমনটা করো না মৃগ নয়নী, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

ইতি,
আমি।

মিরার কিছু চিন্তা করতে পারছে না। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দেয়, বড্ড ঘুম আসছে তার। সকালে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে নিয়মমাফিক গাছে পানি দিতে যায় মিরা। আজও সে-ই অচেনা ছেলেটা মিরাকে দেখছে। মিরার মনের মাঝে ভয় জন্মাতে থাকে। এ-ই আবার সেইটা নয় তো। মিরা কিছু ভেবে পায় না। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে ঘরে চলে আসে। সকালে রান্না শেষ করতে হবে।
আশরাফুল ঘুম থেকে উঠেছে অনেক আগে, কোথাও গেছে হয়তো। খাওয়ার টেবিলে আশরাফুলের সাথে দেখা হয় না মিরার। মিরা বাড়িতে কোথাও আশরাফুলকে দেখেনি। কোথায় চলে গেলো কে জানে! কাজ শেষ করে মিরা একটা চিঠি লিখতে বসে,

জনাব,

আপনি কে জানি না, কখনো দেখিনি। কয়েকটা চিঠি দিয়ে খেয়াল রাখা ভালোবাসা হতে পারে নিশ্চয়ই তবে আমি আপনাকে ভালোবাসি না। আমি বিবাহিত। আপনি আমার স্বামীর দোষটা দেখেছেন। হ্যাঁ আমার স্বামী হয়তো আমাকে স্ত্রী সম্মান দেয়নি, তবে কখনো শারীরিক চাহিদাকে ভালোবাসা মনে করেনি। সে চাইলেই আমার সাথে শারীরিক করতে পারতো আমার তাকে বাঁধা দেওয়ার উপায় ছিলো না। কিন্তু সে এমন করেনি, সে আমার গায়ে হাত তুলতে পারতো, আমাকে নানান ভাবে অত্যাচার করতে পারতো কিন্তু কখনো এমন করেনি। আপনি যে-ই হন না কেন, আমি আপনাকে ভালোবাসি না। কখনো আপনার কাছে যেতে চাই না।

ইতি
মিরা

চিঠিটা দেওয়ালের উপর ভাজ করে রেখে ছাঁদের দিকে পা বাড়ায় মিরা। সে অচেনা লোকটাকে এভাবে না বলে দিয়ে ভুল করছে না তো। লোকটা তার অনেক খেয়াল রেখেছে, পোড়া হাতের জন্য ঔষুধ কিনে দিয়েছে। হাজার প্রেমময় কথা শুনিয়েছে। তুবও কেন মিরা তাকে চাইতে পারছে না। মিরার তো উচিত তাঁকে মেনে নেওয়া। আশরাফুলকে ডিভোর্স দিয়ে ওই লোকটার কাছে চলে যাওয়া।

ছাঁদের একটা জায়গাতে মিরা বসে পড়ে। নানান চিন্তা তার মাথায় ঘুরতে থাকে, আশরাফুলের জীবনে যা-ই হোক মিরা কোনো দোষ করেনি। মিরাকে এভাবে কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে হয় না। আবার আশরাফুলের কথা ভাবতে গেলে যে ও-কে সব থেকে বেশি কষ্ট দিয়ে চলে গেছে তার মতো দেখতে একটা মেয়েকে মেনে নেওয়া এতো সহজ নয়। তারপর আবার যেভাবে বিয়েটা হলো। আশরাফুলকে সব কিছু জন্য দোষী করতে পারে না মিরা, সে নিজেও তো এভাবে বিয়েটা মানতে পারেনি। স্বামী খারাপ ব্যবহার করলে তার সাথে ঝগড়া করা যায়, অভিমান করা যায়, প্রয়োজনে ঘৃণা করা যায় তবে তার থেকে বেশি গুরুত্ব অন্য কাউকে দেওয়া উচিত না।
দুপুর হয়ে আসে তখনও মিরা ছাঁদে একাকি বসে আছ। না জানি এই অচেনা লোকটা কে,
বিকালে মিরা ছাঁদ থেকে নেমে ঘরে যায়। আজ কাল কিছুই ভালো লাগছে না তাঁর।
রেশমা বানু হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মিরার দিকে। আজকাল মেয়েটা কেমন অদ্ভুত লাগে তার কাছে। রেশমা বানু কয়েকদিন মিরা তেমন একটা কাজের হুকুম করে না। সারাক্ষণ মন মরা হয়ে থাকেন রেশমা বানু। কারো সাথে তেমন কথা বলে না। লাবণি বাড়িতে নেই, কোনো এক আত্মীয় বাড়ি গেছে বলে শুনেছে সে। তেমন খোঁজ করার প্রয়োজন মনে করেনি। লাবণি মিরা সাথে ভালো ব্যবহার করলে হয়তো মিরা খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করতো কিন্তু এই মেয়ে তো সবসময় মিরার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে।

সন্ধ্যার দিকে মিরা আরো একটা চিঠি পায়। তাতে লেখা-

প্রিয়,

এতো দিন এতো খেয়াল রাখার কি কোনো মূল্য নেই তোমার কাছে? আমি হয়তো আশরাফুলের মতো বড়লোক নই তবে সত্যি তোমার খেয়াল রাখবো। একটা কথা জানতে চাই তোমার কাছে, আমার প্রতি কি তোমার কোনো অনুভূতি নেই? কেন ভালো বাসতে পারো না তুমি আমাকে?”

ইতি,
আমি

মিরা চিঠিটা পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর নিজেও লিখতে শুরু করে,

জনাব,

প্রথমেই আমি আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনার আমার শুভাকাঙ্ক্ষী, হয়তো খুব ভালো বন্ধু। তবে আমার ভালোবাসা নয়। আমি বিবাহিত একজন নারী। আমার অন্য পুরুষের প্রতি আসক্তি থাকা অন্যায়। আমি যদি কখনো ডিভোর্সি হই তবেই ভেবে দেখবো আপনার ব্যাপারে৷

ইতি,
মিরা।

মিরার নিজের চিন্তাকে বড্ড সেকেলে লাগছে। তবুও সে বিবাহিত, কারো প্রতি আসক্ত হয়ে পড়া উচিত নয়। আশরাফুল তাকে মেনে নিবে কিনা মিরা জানে না। মিরার নিজেও আশরাফুলের প্রতি অঘাত ভালোবাসা নেই। যে সবকিছু ভুলে সে শুধু তা
র হয়ে থাকবে। মিরা আশরাফুলকে সম্মান করে, লোকটা চাইলে মিরার সতীত্ব নষ্ট করে মিরাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারতো, দিনের পর দিন মারধর করতে পারতো, লাথি মেরে বাড়ও থেকে বের করে দিলেও অস্বাভাবিক কিছু হতো না। কিন্তু সে এমনটা করেনি। নিজেই মিরার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে, এতটুকুই বা কম কিসে!

সন্ধ্যার পরে আশরাফুল মিরাকে নিজের ঘরে ডাকে। মিরা বুঝতে পারছে তাক কেন ডাকছে আশরাফুল । ঘরের সামনে গিয়ে বলে,

–” ভেতরে আসবো। ”

আশরাফুল উঠে এসে দরজা খুলে দেয়। তারপর মুচকি হেসে বলে, “হুম আসো। তোমার জন্যই বসে ছিলাম। ”

মিরা আশরাফুলের দিকে এক কাপ কফি এগিয়ে দিয়ে বলে, ” আপনি হয়তো এটা চাইতেন।”

আশরাফুল মুচকি হেসে বলে, ” না আজ মাথা ব্যাথা করছে না। তবে তুমি যখন নিয়ে এসেছো তখন খেয়ে নিচ্ছি। ”

মিরা একটু ইতস্তত হয়ে বলে, ” তাহলে কেন ডেকেছেন আমাকে?”

আশরাফুল কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বলে, ” তুমি আবার পড়াশোনা করবে? তুমি বললে আমি তোমাকে আবার কলেজে ভর্তি করে দিবো। ”

মিরা বিশ্বাস করতে পারে না সে আবার পড়াশোনা করবে। এ বাড়িতে প্রথম যখন পড়ার কথা বলেছিলো তখন রেশমা বানু মুখের উপর না বলে দিয়েছিলো। পরে আর কাউকে বলার প্রয়োজন মনে করেনি। সময় বুঝিয়ে দিয়েছিলো সে এ বাড়ির দলীল বিহীন কাজের লোক। মিরা মুখে কিছু বলতে পারে না। শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দেয়।

আশরাফুল হেসে বলে, ” তাহলে কাল আমার সাথে যাবে, তোমার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে, আমি তোমাকে ভর্তি করে দিবো ইনশাআল্লাহ। ”

মিরা খুব খুশি হয়। সে আবার পড়তে পারবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। হারিয়ে যাওয়া সব স্বপ্ন যেন আবারও মিরার চোখে ধরা দেয়। খুশিতে চোখের কোণে আনন্দ অশ্রু টলটল করে। আশরাফুল নিজে হাতে চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলে, ” খুশি হলে আলহামদুলিল্লাহ বলে আল্লাহর শোকর আদায় করতে হয়। কাঁদতে হয় না পাগলী। ”

মিরার ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে। খুশি মনে মিরা নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। দরজার কাছে আশরাফুল বলে ওঠে, “তুমি সেদিন বললে না মিতালির দেখতে হুবহু তোমার মতো কিনা। তোমরা হুবহু এক রকম দেখতে নও, তোমার গলার তিলটা ও-র ছিলো না। ”

মিরা পিছনে ফিরে মুচকি হাসি দেয়। তারপর নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। মিরা আজ বড্ড খুশি। আবার পড়তে পারবে সে। ঘরে গিয়ে আয়নার নিজের গলার তিলটা দেখতে থাকে। মিরার এতো লজ্জা লাগছে কেন! তবে কি মিরা আশরাফুলের প্রেমে পড়লো?

চলবে