#আলোছায়া
পার্ট -১৩
কলমে : #ফারহানা_কবীর_মানাল
মিরা পিছনে ফিরে মুচকি হাসি দেয়। তারপর নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। মিরা আজ বড্ড খুশি। আবার পড়তে পারবে সে। ঘরে গিয়ে আয়নার নিজের গলার তিলটা দেখতে থাকে। মিরার এতো লজ্জা লাগছে কেন! তবে কি মিরা আশরাফুলের প্রেমে পড়লো?
ব্যাপারটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করে না মিরা, তাড়াতাড়ি করে শুয়ে পড়ে। কাল সকালে আবার কলেজে যেতে হবে। আশরাফুল কি সত্যি তাকে ভর্তি করে দিবে? নাকি মিরা কোনো স্বপ্ন দেখছে!
সকালে ঘুম থেকে উঠে মিরা তাড়াতাড়ি সব কাজ শেষ করে নেয় মিরা। সকাল থেকে মিরা আশরাফুলের জন্য অপেক্ষা করছে কিন্তু আশরাফুল দরজা দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। মিরা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বেলা ১১টা বেজে গেছে। আশরাফুল তখনও ঘুম। আশরাফুলের কি মনে নেই তার আজকে মিরাকে নিয়ে কলেজে যাওয়ার কথা, মিরার মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকে, সকাল থেকে নিজের ঘরটা পর্যন্ত গোছায়নি মিরা, এখনও জানালা দরজা বন্ধ করে রেখেছে। কিছু সময় খাটের উপর বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকে। তারপর উঠে গিয়ে জানালা খুলে দেয়। দম আটকে আসছে তার৷ জানালার উপরে একটা চিঠি পড়ে আছে। মিরা চিঠিটা উঠিয়ে নেয়, তাতে লেখা-
প্রেয়সী,
অযোগ্য মানুষকে এতোটা ভালোবাসতে নেয়। তবুও আমি তোমাকে জোর করবো না, একটা আবদার করবো তোমার কাছে। একদিন অন্তত দেখা করো আমার সাথে। তোমার সব স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব আমি নিবো। আমাকে ভালোবাসতে হবে না তোমাকে, শুধু একবার সামনাসামনি দেখা করো প্লিজ।
ইতি,
ব্যাথিত হৃদয়।
মিরা চিঠিটা পড়ে একটু চিন্তায় পড়ে যায়। কি উত্তর দিবে সে? যদিও একটুও ভালো লাগছে না মিরার। আশরাফুল তাকে আজ কলেজে ভর্তি করে দিবে বলেছে কিন্তু বেলা বারোটা বেজে গেলো এখনও ঘুম দিয়ে উঠছে না। কাল আশরাফুলের একটা কথা মিরার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো আবার জোড়া লাগিছে, আজ আবারও সে-ই স্বপ্ন ভেঙে যাবে না তো? আশরাফুল কি মিরার সাথে কাল মজা করেছে? কিছু বুঝতে পারছে না মিরা। আচ্ছা আশরাফুলের কিছু হলো না তো আবার! কথাটা ভাবতেই মিরার মুখ শুঁকিয়ে যায়। আশরাফুল তো কখনো এমনটা করে না, মিরা কখনো আশরাফুলকে এতো বেলা করে ঘুম দিয়ে উঠতে দেখেনি। একবার আশরাফুলকে ডেকে দেখা উচিত, কি হলো না হলো। চিঠিটা বালিশের নিচে রেখে মিরা আশরাফুলের ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
দরজার কাছে আসতেই আশরাফুল মিরাকে ডাক দেয়। মিরা দৌড়ে খাবার টেবিলের কাছে যায়, আশরাফুল ওই দিক দিয়ে কথা বললো বলে মনে হয়। আশরাফুল খাবার টেবিলে বসে আছে। হয়তো খেতে এসেছে। মিরাকে দেখে প্রশ্ন করে, ” দুইটা প্লেটে খাবার বেড়ে রেখেছ যে? কে খায়নি সকালে?”
মিরা আশরাফুলকে সুস্থ দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, পরক্ষণেই হতাশ হয়ে যায়। আশরাফুল যখন ঠিক আছে তাহলে কেন মিরাকে নিয়ে কলেজে গেলো না? মিরা এসব ভাবতে থাকে, কোনো কথা বলে না।
আশরাফুল জবাব না পেয়ে বলে আবারও বলে উঠে, ” কোনো সমস্যা তোমার? নাকি তুমি সকালে খাওনি? মুখ শুঁকিয়ে গেছে তোমার। ”
আশরাফুলের কথায় মিরার হুশ ফিরে আসে। মন মরা হয়ে বলে, ” হ্যাঁ আমি খাইনি সকালে। আপনি বলেছিলেন আজ কলেজে নিয়ে যাবেন আমাকে। আমি আবার পড়তে পারবো। তাই ভেবেছিলাম আপনার সাথে বসে খাবো। কিন্তু আপনি তো ঘুম দিয়ে উঠলেন এখন। আমাকে কি কলেজে নিয়ে যাবেন না? যদি ভর্তি করে না-ই দিবেন তাহলে বললেন কেন? এভাবে আশা দেখিয়ে নিরাশ না করলেও পারতেন।”
মিরার কথায় আশরাফুল মুচকি হেসে বলে, ” এতো গুলো প্রশ্ন একসাথে করলে আমি কোনটা রেখে কোনটার উত্তর দিবো শুনি? একটা একটা করে প্রশ্ন করো। ”
আশরাফুলের উত্তর মিরার খুব একটা পছন্দ হয় না। তা-ই চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই কেউ একটা তার হাত ধরে ফেলে। মিরা আশরাফুলের হাতের নাগালে দাঁড়িয়ে ছিলো, বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় না যে আশরাফুলই মিরার হাত ধরেছে, হয়তে মিরাকে আটকানোর জন্য!
–” কোথায় যাচ্ছো? ”
মিরার কিছু ভালো লাগছে না। চারদিকের নানান চিন্তার ভিতর এসব মজা তার একটুও ভালো লাগছে না। তবুও শান্ত গলায় বলে, ” ঘরে যাবো, শরীরটা একটু খারাপ লাগছে। ”
–” না খেয়ে থাকলে শরীর আরো খারাপ হবে। আগে খেয়ে নাও। তারপর ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিও। ”
–” আমার কলেজে যাওয়া?”
–” আজকে শুক্রবার। যেদিন কলেজ খোলা থাকবে সেদিন তোমাকে নিশ্চয়ই নিয়ে যাবো। তোমাকে মিথ্যা আশা দেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই, আমি জানি মিথ্যা আশা মানুষকে কতটা কষ্ট দিতে পারে। নাও এখন খেতে বসো। বললে তো আমার সাথে বসে খাবে। ”
মিরা ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে দেখে আজ সত্যি শুক্রবার। আজকে তো কলেজ বন্ধ। আজ কলেজে গেলে তো কোনো লাভ হতো না। ধূর! সবকিছু খেয়াল না করে আশরাফুলকে এতোকিছু বলা উচিত হয়নি। এখন নিজেকেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে।
–” সাত পাঁচ কি এতো চিন্তা করছো? খেতে বসো। ”
মিরা আশরাফুলের পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ে। আশরাফুল মিরার হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের খাওয়ার মন দেয়। মিরা লজ্জায় কিছু খেতে পারছে না, প্লেটের খাবারগুলো নাড়াচাড়া করছে। আশরাফুল হয়তো বুঝতে পেরেছে মিরার সমস্যা হচ্ছে। তাই সে বলে ওঠে, ” আরে রিলাক্স! এমন ভুল আমাদের সবার কম বেশি হয়ে থাকে। এতো লজ্জা না পেয়ে খাওয়া শেষ করো। ”
মিরা মুচকি হেসে খাওয়ার চেষ্টা করে। দূরে দাঁড়িয়ে রেশমা বানু সবকিছু লক্ষ্য করে। বহুকাল পুরনো শাশুড়ি বউমা সম্পর্কের সাথে তাল মিলিয়ে মিরাকে সে তেমন পছন্দ না করলেও চায় আশরাফুল সুখে থাকুক। সেঁজুতির ব্যাপারটা তিনি জানেন। ছেলের কষ্টে মা’য়েরও কষ্ট হয়। রেশমা বানুও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনিও চান আশরাফুল সবকিছু ভুলে মিরার সাথে সুখে থাকুক।
খাওয়া শেষ করে আশরাফুল নিজের কাজে চলে যায়। জুমার নামাজ পড়তে গেছে হয়তো। মিরা সকালেই দুপুরে রান্না করে রেখেছে। তাই মিরাও গিয়ে বিছাবায় শরীরটা এলিয়ে দেয়। এই কলেজ যাওয়ার চক্করে আজ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে, তারপর সারাদিনের সব কাজ করেছে, এখন খুব ক্লান্ত লাগছে তার। মিরা চিঠির উত্তর লেখার প্রয়োজনবোধ করে না। বিছানায় শুয়ে পড়ে। বড্ড বেশি ক্লান্ত লাগছে তাঁর। কখন যে চোখটা লেগে আসে মিরা বুঝতেও পারে না।
।
।
” সময় কারো জন্য বসে থাকে না। মিরা এখন নিয়মিত কলেজে যায়। সে-ই অচেনা ছেলেটা এখন আর অচেনা নেই মিরার কাছে। মিরার সাথে প্রতিদিন কলেজ শেষ দেখা করতে আসে। চিঠিপত্র, গোলাপ, চকলেট এসব এখন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে গেছে। একদিন ছেলেটা মিরার সাথে পালিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। মিরার কাছে সম্পূর্ণ তার হয়ে যাওয়ার বায়না করে। মিরাও তাতে রাজি হয়ে যায়। সেদিন কলেজে যাওয়ার আগে মিরা আশরাফুলের জন্য একটা চিঠি লেখে-
প্রিয় স্বামী,
আপনি আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন। আমি আপনাকে সম্মান করি, আপনাকে কখনো আশরাফুল বলেও ডাকতে চাই না। আপনি আমার অনেক উপকার করছেন, তবে বাসর রাতে যে পুরুষ আমাকে অস্বীকার করে, তাকে আমি কখনো মেনে নিতে চাই না। আমার ভালোবাসার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে। ভালো থাকবেন।
আপনিই বলতেন বেইমানদের মনে রাখতে নেই। আশা করি আমাকে ভুলে যাবেন৷ আমি চললাম অচেনা এক গন্তব্যের পথে, আমার অচেনা ভালোবাসার হাত ধরে।
ইতি,
মিরা।
তারপর চিঠিটা আশরাফুলের বালিশের নিচে রেখে বেরিয়ে পড়ে নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সব যাত্রা তো সুখের হয় না। রাস্তায় একটা গাড়ির সাথে এক্সিডেন্ট করে মিরা। বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ে। রক্তে সারা শরীর একাকার হয়ে যায় মিরার। মৃত্যু যেন তার দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। মিরার দম আটকে আসছে, মনে হচ্ছে তার জীবন এখানে শেষ। ”
।
।
ভয়ে লাফিয়ে উঠলো মিরা, সারা শরীর ঘেমে গেছে তার। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হয় দম আটকে যাবে। মিরা নিজেকে খাটের উপর আবিষ্কার করে, হ্যাঁ সে তো নিজের ঘরে রয়েছে, নিজের খাটের উপর। মিরা কিছু মনে করতে পারছে না, মনে হচ্ছে শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে।
এমন সময় আশরাফুল মিরার ঘরে আসে। মিরা তখন খাটের উপর বিছানার চাদর খামছে বসে আছে। বারবার নিঃশ্বাস নিচ্ছে, হয়তো এখনো স্বাভাবিক হতে পারছে না। আশরাফুল মিরার কাছে গিয়ে কয়েকবার মিরার নাম ধরে ডাকে। কিন্তু মিরা কোনো সাড়া দেয় না। আশরাফুল মিরার দুই বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বলে, ” কি হয়েছে তোমার? ঠিক আছো তুমি?”
মিরা আশরাফুলের দিকে তাকিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। আশরাফুল বেশ অবাক হয়। কিন্তু মিরাকে কিছু বলে না। মিরা ভীত কন্ঠে বলে, ” আমি কোথায়?”
আশরাফুল হয়তো বুঝতে পারে মিরার কিছু সমস্যা হয়েছে। তাই শান্ত গলায় বলে, ” তুমি তোমার ঘরে মিরা। একদম ঠিক আছো। ভয় নেই, কোনো সমস্যা নেই এখানে। শান্ত হও।”
মিনিট পাঁচেক পরে মিরা নিজে থেকে আশরাফুলকে ছেড়ে দেয়। হয়তো স্বাভাবিক হয়ে গেছে। মিরার মনে পড়ে সে আশরাফুল সাথে বসে সকালের খাবার খেয়েছে তারপর আশরাফুল মসজিদে চলে গেছিলো আর মিরা ঘুমিয়ে পড়ে ছিলো। ওহ্! তার মানে মিরা এতো সময় স্বপ্নে দেখছিলো। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মিরা। তারপর আশরাফুলকে উদ্দেশ্য করে বলে, ” কিছু বলবেন আপনি?”
আশরাফুল মিরার হাতে কয়েকটা জিলাপি দিয়ে বলে, ” আজ মসজিদে মিলাদ দিয়েছে তাই তোমার জন্য নিয়ে এলাম। তুমি জিলাপি খাও?”
সত্যি বলতে মিরা খুব পছন্দ জিলাপি। ছোট বেলায় মিরার বাবা একবার মিরাকে জিলাপি এনে দিয়েছিলো মিরা তখন খুব ছোট তবুও যেন ওই একটা স্মৃতি স্পষ্ট মনে আছে। বয়সের সাথে মিরা বুঝেছে তার বাবা কোথায় চলে গিয়েছে, কেন তার মা’য়ের জীবনটা এমন কষ্টে ভরে আছে। মিরা চাইলেও তার বাবাকে মাফ করতে পারে না।
–” কি হলো মিরা কেনো সমস্যা? ”
–” না কোনো সমস্যা নেই। মা তো বাড়িতে উনাকে দিবেন না?”
আশরাফুল প্রথমে বুঝতে পারে না মিরার মা কোথা থেকে এলো, তারপর খেয়াল হয় মিরা তার মা’কে মা বলে ডাকছে। মেয়েটা কেমন অদ্ভুত। যে তাকে এতো কষ্ট দেয় তার কথাই জানতে চাইছে।
–” হুম মা’য়ের জন্য রেখেছি। তুমি খেয়ে নেও। আমি বরং মা’কে এগুলো দিয়ে আসি। ”
আশরাফুল নিজের কাজে চলে যায়। মিরার সাত-পাঁচ না ভেবে জিলাপিতে কামড় বসায়। কতদিন হয়ে গেলো তার পছন্দের মিষ্টি খায়নি।
চলবে
#আলোছায়া
পার্ট -১৪
#ফারহানা_কবীর_মানাল
আশরাফুল নিজের কাজে চলে যায়। মিরার সাত-পাঁচ না ভেবে জিলাপিতে কামড় বসায়। কতদিন হয়ে গেলো তার পছন্দের মিষ্টি খায়নি।
।
।
সকাল থেকে নিজের সকল কাগজপত্র রেডি করছে মিরা, আজ আশরাফুল তাকে কলেজে নিয়ে যাবে। এই দুইদিনে ওই লোকটার কাছ থেকে চারটা চিঠি পেয়েছে মিরা, একটাও পড়ে দেখেনি। কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছে। মিরা নতুন কোনো টেনশন নিতে চায় না, আশরাফুল তাকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিলেই হলো। মিরার সামনে নতুন সাজানো জীবন পড়ে আছে, সে-ই বাগানের পথে মাত্র কয়েকটা লোভনীয় জিনিস, মিরা ও-ই লোভের ফাঁদে পা দিতে চায় না।
আশরাফুল সবকিছু গুছিয়ে মিরার কাছে এসে বলে, ” তুমি সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছো তো?”
মিরা মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দেয়। আশরাফুল মিরার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মিরা খুব সুন্দর একটা কালো বোরকা আর কালো হিজাব পরেছে, মুখ খোলা। কিন্তু কোনো প্রকার প্রসাধনী ব্যবহার করেনি। এতেই মিরাকে বড্ড সুন্দর লাগছে।
–” আচ্ছা মিরা তুমি আগে কোন কলেজে পড়তে?”
–” আমি সে-ই কলেজেই পড়বো?”
আশরাফুল মুচকি হেসে বলে, ” হুম, তোমার কিছু কাগজপত্র সেখানে জমা দেওয়া রয়েছে, অন্য কোথাও পড়তে গেলে তো সেগুলো আনতে হবে। ”
–” আমি জানি, শুধু জানতে চাইলাম। ”
আশরাফুল মুচকি হাসে। মিরা আশরাফুলের সাথে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির সামনে চলে এসেছে। হঠাৎ মিরা প্রশ্ন করে, ” আচ্ছা আমরা কিসে যাবো?”
–” আমার বাইকে যাবে?”
মিরা অবাক হয়। আশরাফুলের বাইক আছে, তা মিরা জানতো না, কখনো দেখেনি।
–” আপনার বাইকও আছে?”
–” হুম ছিলো একটা, কিন্তু আমার কাছে নেই। ওই যে বাড়িটা দেখছো ওইখানে থাকে। ”
–” আপনার যা ভালো লাগে। ”
মিরার বড্ড অবাক হয়, নিজের বাইক থাকতে কি কেউ অটোরিকশাতে চলাচল করে নাকি! তা-ও অন্য এক জায়গাতে রেখে দিয়েছে। হবে হয়তো কোনো কারণ। আশরাফুল গিয়ে বাইকটা নিয়ে আসে। তারপর মিরাকে ইশারা দিয়ে উঠতে বলে। মিরা বাইকের পিছনে উঠে বসে। সেভাবে কখনও কারো বাইকে চড়া হয়নি মিরার। সামান্য ভয় লাগেছে, পরক্ষণেই মনে হচ্ছে এতো বড় মেয়ে বাইকে বসতে ভয় পাচ্ছে, এতো নেকামি ছাড়া অন্য কিছু নয়। তবুও মিরা উসখুস করছে, শান্ত হয়ে বসতে পারছে না। আশরাফুল খুব শান্ত হয়ে বাইক চালাচ্ছে। খুব বেশি জোরে বা অনেক আস্তে নয়।
–” অসুবিধা হচ্ছে তোমার মিরা? তাহলে আমাকে ধরে বসতে পারো। ”
মিরার সত্যিই অসুবিধা হচ্ছে, তবে আশরাফুলকে ধরতে পারছে না৷ কোনো এক অজানা দেওয়ালে আটকে গেছে, কি এমন হবে আশরাফুলের কাঁধে হাত রাখলে, সে তো নিজেই অনুমতি দিচ্ছে তাকে ধরার, তবে কিসের এতো জড়তা। কয়েক মিনিট পর হয়ে গেলেও মিরা আশরাফুলের কাঁধে হাত রাখে না, আশরাফুল বাইকের গতি কমিয়ে দেয়।
মিরা আস্তে আস্তে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। আগে পরে বাইকে ওঠেনি তার জন্যই হয়তো এতো সময় সমস্যা হচ্ছিল। কলেজের সামনে গাড়ি থামায় আশরাফুল। মিরা কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে কলেজটাকে দেখছে। বিয়ের পর সে ভেবেছিলো আর পড়াশোনা হবে না। কিন্তু আজ সবকিছু নতুন করে শুরু হচ্ছে।
কলেজে গিয়ে জানতে পারে মিরাদের ফরম ফিলাপ চলছে, করোনার সমস্যার কারণে এতো দেরিতে ফরম ফিলাপ হচ্ছে। মিরা বেশ খুশি হয়, সে ভেবেছিলো তার হয়তো একটা বছর লস হবে, ভাগ্যক্রমে আজই ফরম ফিলাপের শেষ তারিখ ছিলো, আশরাফুল টাকা দিয়ে মিরার ফরম ফিলাপ করে দেয়। মিরার চোখে মুখে কৃতজ্ঞতা ফুটে ওঠে। আশরাফুল টাকা না দিলে এতোগুলো টাকা জোগাড় করতে বেশ সমস্যায় পড়তো মিরা। কাজ শেষ করে দুইজন কলেজ থেকে বেরিয়ে পড়ে।
–” আপনাকে সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ। আপনি না থাকলে হয়তো আমার আর পড়াশোনা হতো না। ”
–” তোমার পড়াশোনা বন্ধ তো আমার জন্যই হয়েছিলো, ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু হয়নি, বরং আমার তোমার কাছে মাপ চাওয়া উচিত। ”
আশরাফুল এতো ভালো ছেলে, ভাবতেও কেমন অবাক লাগে মিরার। এই মানুষটাকে এক সময় কত খারাপ ভেবেছে মিরা। সময় হয়তো সবকিছু বদলে দেয়। আগামী কয়দিন মিরা কলেজে আসবে, সব কিছুর সাজেশন নিতে হবে স্যারদের কাছ থেকে। কলেজের কেউ তার পরিচিত নয় তেমন, নতুন ভর্তি হয়েছিলো আর তখনই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বিয়ে হয়ে গেছিলো। আশরাফুলের এমন সিদ্ধান্তে রেশমা বানু রাগারাগি করবেন না তো, হয়তো করবেন। এতো খুশির মাঝেও মিরার ভয় থেকেই যায়।
।
পাশাপাশি হেঁটে চলেছে মিরা আর আশরাফুল। আশরাফুল কলেজের সামনে বাইক রেখে এসেছে, যদিও ভেতরে গাড়ি নিয়ে আসতে পারতো কিন্তু আসেনি।
–” মিরা একটা জায়গাতে যাবে?”
–” কোথায় যাবো?”
–” বাড়ি যেতে ভালো লাগছে না, তুমি চাইলে একটু ঘুরতাম আর কি। ”
–” আচ্ছা, কিন্তু বাড়ির কাজগুলো রয়েছে তো। ”
–” তুমি সকালে রান্না করে রেখেছো? তোমার যদি সমস্যা থাকে তাহলে বাড়িতেই চলো। ”
মিরার বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করছে না। সারাক্ষণ বাড়িতে বসে থাকতে কার ভালো লাগে। সকালে রান্না করে রেখেছিলো। দুপুরের রান্না নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। নিজের কয়েকটা কাপড় ভিজিয়ে রেখে এসেছিলো, বাড়ি গিয়ে ধূয়ে দিবে। এ ছাড়া তেমন কোনো কাজ নেই মিরার।
–” না সমস্যা নেই। আপনি চলেন কোথায় যাবেন। ”
–” আমি যেখানে নিয়ে যাবো সেখানেই যাবে তুমি?”
আশরাফুলের এমন প্রশ্নের কি উত্তর দিবে ভেবে পাচ্ছে না মিরা প্রশ্নটা খুব সহজ তবে উত্তর দোওয়াটা বেশ শক্ত বলে মনে হচ্ছে মিরার। তবুও সাত-পাঁচ না ভেবে বলে,
–” হুম চলেন। ”
দুইজনে বাইকে চড়ে বসে, মিরা বেশ দূরত্ব বজায় রেখে বসেছে আশরাফুলের থেকে, আশরাফুলও আস্তে আস্তে বাইক চালাচ্ছে। আজ মনটা খুব ভালো মিরার, জীবন আমাদের নতুন নতুন কতকিছুই না শেখায়!
–” মিরা ফুচকা খাবে?”
ফুচকা জিনিসটা বরাবরই মিরার বেশ পছন্দের। তাই আর না করতে পারে না। রাস্তার পাশে বাইক দাঁড় করিয়ে দুইজন হেঁটে ফুটপাতে চলে যায়। মিরার তেমন ঝাল খেতে পারে না। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। আশরাফুল নিজের মতো ফুচকার অর্ডার দেয়।
(মিরার কেন এতো ঢ়ং বুঝি না বাপু, বললেই হয় ঝাল কম খাই হুহ)
।
সামনাসামনি দুইটা চেয়ারে মিরা আর আশরাফুল বসে আছে। দুইজনের হাতে ফুচকার প্লেট। মিরা লোভ সামলাতে না পেয়ে একটা ফুচকা মুখে পুরে নেয়।
–” জানো মিরা, এই ফুটপাতে বসে ফুচকা খাওয়ার মজাই আলাদা। আমার এসব খুব ভালো লাগে, দামী দামী হোটেলের থেকে এখানের ফুচকা বেশ ভালো হয়। এই জায়গাতে আমি আগে প্রায়ই ফুচকা খেতে আসতাম। এখন অবশ্য তেমন আসা হয় না। ”
–” কেন এখন আসা হয় না কেন?”
–” যার সাথে আসতাম, সে নেই। ”
মিরা কিছু বলে না, তবে বেশ খারাপ লাগে আশরাফুলের জন্য। চলার পথে কত মানুষের সাথে কত স্মৃতি থাকে আমাদের। তাদের কেউ স্পেশাল কেউ হয়তো অনেক বেশি স্পেশাল হয়। তবুও তারা আমাদের জীবনে থাকে না, সময়ের স্রোতে তাদের কথা হয়তো আমরা ভুলে যাই। সব কথা কি আদো ভুলে যাওয়া যায়!
।
আশরাফুল হয়তো ফুচকা জিনিসটাতে ঝাল খুব পছন্দ করে। মিরা সবগুলো ফুচকা খেয়ে নিয়েছে বটে কিন্তু এখন ঝালে সবকিছু অন্ধকার দেখছে। চোখ নাক দিয়ে পানি পড়ছে, ঠোঁটেও ঝাল লেগেছে, ঠোঁট কামড়ে ঝাল কমানোর চেষ্টা করে চেলেছে, তখন ঝাম কম খাই বললে এই দশা হতো না। আজ রুমাল বা টিস্যু কোনোটাই সাথে আনেনি মিরা। কি একটা বিশ্রী অবস্থা! এখন কি হিজাব দিয়ে নাক মুছতে হবে নাকি!
।
আশরাফুল মিরাকে একটা রুমাল দিয়ে বলে, ” ঝাল খেতে পারো না তা বলবে তো নাকি!”
মিরা রুমালটা নিয়ে চোখ নাক মুছতে থাকে, আশরাফুলের কথাট জবাব পরেও দেওয়া যাবে আগে নিজে ঠিক হয়ে নিতে হবে। ”
–” রুমালটা কি আপনার?”
–” না তোমার জন্য পকেটে নিয়ে ঘুরছিলাম। দেখো ঠিক কাজে লেগে গেলো। ”
আশরাফুলের ট্যারা উত্তর শুনে মিরার বেশ রাগ হয়, পরক্ষণে নিজের বোকা বোকা প্রশ্নের জন্য নিজেকে ধমকাতে থাকে মনে মনে।
–” একটু পানি খেয়ে দেখো ঝাল কমে নাকি! তুমি বাচ্চাদের মতো ঝাল খেতে পারো না আমি বুঝতে পারিনি৷ ”
–” আমি তো বাচ্চাই নাকি হুহ। ”
–” হুম বাচ্চা বলা যায় তোমাকে, ঠিক সময়ে বিয়ে হলে নিজেই বাচ্চার মা হতে। ”
মিরা কিছু বলতে যাবে, এর আগেই আশরাফুল কোথায় হাঁটা লাগায়। মিরা কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মিনিট দুই পরে আশরাফুল মিরার দিকে একটদ আইসক্রিম বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
–” তোমার যে অবস্থা তাতে পানি খেলে ঠিক হবে না। এই নাও, এটা খেয়ে নাও। বাচ্চা মেয়ে। ”
মিরা কপাল কুঁচকে তাকায় আশরাফুলের দিকে। ঝাল একটা মানুষ কম খেতেই পারে, তাই বলে কি তাকে বাচ্চা বাচ্চা বলতে হবে নাকি। আইসক্রিমটা নিয়ে খাওয়া শুরু করে মিরা। উফফ সত্যি অনেক ঝাল লেগেছে!
চলবে