আলোছায়া পর্ব-৩+৪

0
495

#আলোছায়া
পার্ট -৩
কলমে : #ফারহানা_কবীর_মানাল

রেশমা বানুর গলা পেয়ে খাবার ঘরের দিকে পা বাড়ায় মিরা। দূর থেকে একজোড়া চোখের মালিক মিরা কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করছিলো। সে কথা মিরার অজানাই থেকে যায়।

খাবার টেবিলে মিরার শশুর, শাশুড়ি, লাবণি আর আশরাফুল বসে আছে। সকলে নিজেদের মতো খাবার খাচ্ছে, মিরা ওদের কার কি প্রয়োজন লক্ষ্য করছে, কেন যে এরা মিরাকে বাড়ির বউ করে নিয়ে এসেছিলো ভেবে পায় না সে। মাঝে মাঝে মা’য়ের কাছে জানতে ইচ্ছে করে, এদের সবাইকেও প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, অসহায় বলে কি যা খুশি করবে আমার সাথে কিন্তু কথাগুলো বারবার গলার কাছে এসে আঁটকে যায়।
নিজের মা’ই যখন মেয়ের কথা শুনতে চায় না, কষ্ট বুঝতে চায় না সেখানে অন্য মানুষ কেন-ই বা এসব করবে।

খাবার মুখে দিতে দিতে রেশমা বানু বলেন, ” সন্ধ্যায় ওদের বাবার অফিস থেকে কয়েকজন লোক আসবে, সবকিছু গুছিয়ে ভালো কিছু রান্না করে রাখবে। ওদের যেন কোনো অসম্মান বা অযত্ন না হয়। ”

আজমল সাহেবের অফিসের লোকজন আসবে শুনে মিরার চোখ আশায় জ্বলজ্বল করে ওঠে৷ আবেগের বশে বলে ফেলে, ” মা-ও কি আসবে? ”

মিরার কথাটা যেন এখানের কেউ আশা করেনি। লাবণি মুখে পাস্তা পুরতে পুরতে বলে, ” তোমার মা বাবার অফিসে কি চাকরি করে? ওহ হ্যাঁ আয়ার কাজ করে, তাকে কেন আমাদের বাড়িতে দাওয়াত করে আনতে যাবো? থার্ডক্লাশ লোকজন!”

–” তাহলে সেই থার্ডক্লাশ লোকের মেয়েকে কেন এ বাড়ির বউ করে এনেছো? ফ্রী-তে কাজের লোক হিসাবে? যখন নিজে এমন পরিস্থিতিতে যাবে তখন শুধু লোকের অফিস নয় লোকের পায়ের জুতোও মুছবে। ”

মিরার কথায় সকলে চমকে যায়। মিরা এমন জবাব দিতে পারে কেউ আশা করেনি। রেশমা বানু কর্কশ গলায় বলে ওঠে, ” এই মেয়ে তুই ভদ্রতা জানিস না? আমার মেয়েকে এভাবে অভিশাপ দিচ্ছিস। তোর মা তো তোকে কিছুই শেখায়নি দেখছি। ”

মা’য়ের নামে কোনো প্রকার বাজে কথা মিরার সহ্য হয় না। যে মা একা হাতে ও-কে মানুষ করেছেন তাকে নিয়ে কেউ বাজে কথা বললে কাউকে ছেড়ে কথা বলার মেয়ে মিরা নয়। অসহায় হতে পারে তবে বোবা তো নয়। ঝাঁঝালো কণ্ঠে কিছু বলতে যাবে এমন সময় আশরাফুল বলে ওঠে, ” মা অন্যের মেয়েকে শিক্ষা না দিয়ে নিজের মেয়েকে ভদ্রতা শেখাও, কাজে লাগবে। ”

মিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো আশরাফুলের দিকে, এই লোকটা কখনো কখনো বড্ড বেশি সাপোর্ট করে মিরাকে, কারণটা খুঁজে পায় না মিরা। তবে বেশ ভালো লাগে। মনে কোনো আশার আলো ফুটে ওঠে, কিন্তু পরে কোনো এক দমকা হওয়ার মাঝে আলোটাও হারিয়ে যায়।

আজমল সাহেব সচারাচর মিরার ব্যাপারে কথা হলে কিছু বলেন না। আজ কি মনে করে বললেন, ” ও-র মা-ও আসবে। সবাইকেই বলেছি। সবকিছু রেডি রেখো। ”

মিরার চোখে আজ খুশির অশ্রু, কতদিন বাদে মা’কে দেখতে পাবে। বিয়ের পরে মাত্র কয়েকবার মা’য়ের সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়েছে। বহুদিন পর মা’কে দেখতে পাবে। আজ মা আসলে তার কাছে প্রশ্ন করবে কেন বিয়ে দিয়েছিলো তাকে। কি জন্য এতো কষ্ট তার জীবনে!

চোখ কোণে জমে থাকা পানিটা মুছে নিজের কাজে মন দেয় সে। হাতে সামান্য ব্যাথা করছে তবুও রেশমা বানুর কাছে কি কি রান্না হবে জিজ্ঞেস করতে যায়। লাবণি আর রেশমা বানু তখন সন্ধ্যায় কে কি পরবে তাই নিয়ে আলোচনা করতে ব্যস্ত হয়ে আছে। দরজার কড়া লাড়ে মিরা।

–” কি কি রান্না করবো? আর কতজন লোক আসবে যদি একটু বলতেন গুছিয়ে রাখতাম।”

–“দেখেছো মা নিজের মা আসবে বলে কাজের কত তাড়া এই মেয়ের!”

–” তোর মা তোর কাছে আসলে কি তুই কিছু করতি না?”

আশরাফুলের কথায় সবাই বেশ চমকে যায়। বেশ কয়েকদিন ধরে ছেলের মাঝে পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছে রেশমা বানু। ছেলে কথায় কথায় এই মেয়েকে সাপোর্ট করছে। ব্যাপারটা খুব বেশি ভালো লাগছে না তার। পুরুষ মানুষের মন সুন্দরী মেয়ে দেখলে তো গলেই যাবে। বলা বাহুল্য মিরা যথেষ্ট সুন্দরী। সুন্দরী না হলে আশরাফুলের সাথে বিয়ের প্রস্তাব কখনোই পেতো না। আজকাল লোকজন সাদা চামড়ার কাছে বড্ড দূর্বল। মুখে যা-ই বলুক বা নিজে দেখতে যেমনই হোক না কেন, তাদের পছন্দ লম্বা ফর্সা মেয়ে। আমি নিজেও এর ব্যতিক্রম নয়।

–” আশরাফুল! তুমি আজ-কাল এই মেয়ের হয়ে কথা বলছো যে? তোমার থেকে আমি এসব আশা করি না। ”

রেশমা বানুর কথা আশরাফুলের দিকে চোখ তুলে তাকায় মিরা। আশরাফুল শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে কোনো হিংস্রতা নেই। সে শান্ত গলায় বললো, ” তাহলে কি আশা করো তুমি মা? আমি ও-কে কথায় কথায় অত্যাচার করি? ওর গায়ে হাত তুলি?”

রেশমা বানু কোনো জবাব দিতে পারে না। মিরা মিনমিনে গলায় বলে, ” আমার জন্য আপনার কিছু বলতে হবে না। আমি… ”

কথা শেষ করতে পারে না মিরা তার আগেই আশরাফুল বলে ওঠে, ” আমি কিন্তু তোমাকে কিছু বলিনি। তোমার বিষয়েও কোনো কথা বলনি প্রথমে। আমি শুধু লাবণির কাছে জানতে চাইলাম মা গেলে ও কিছু করতো কিনা। যাইহোক বাজার করতে হবে তাই লিস্ট নিতে এসেছি। ”

লাবণি হয়তো ভাইকে কিছু বলতে চেয়েছিলো কিন্তু আশরাফুল সে সুযোগ না দিয়ে চলে গেলো। চোখমুখ কুঁচকে মিরার দিয়ে চেয়ে রইলো সে। রেশমা বানু নিজের হাতে লিস্ট বানিয়ে মিরা দিয়ে দিলো। যাওয়ার আগে কড়া গলায় বললো, ” রান্না জানি ভালো হয়, লোকের সামনে জানি মানসম্মান থাকে আমাদের। আর হ্যাঁ তোর ভালো কাপড় আছে তো?”

মিরা মাথা নাড়িয়ে না বলে, সত্যি বলতে তার ভালো কোনো কাপড় নেই। বিয়েতে যেসব কাপড় পেয়েছে তাই এতোদিন ধরে পরে আসছে সে। অভাব অনটনে বড় হওয়া মিরা খুব ভালো করে জানে কি করে একটা কাপড় বহুদিন ধরে ব্যবহার করতে হয়।

আশরাফুল বাজার থেকে ফিরে আসে। সাথে একজন লোকও আছে। এতো পরিমাণ রান্না মিরা একা কখন শেষ করবে মিরা জানে না। আজকের মেনুতে ইলিশ মাছ ভাজা, পোলাও, রোস্ট, গরুর গোশত, ডিম আর সালাত। সাথে অন্য কিছু আছে কিনা দেখতে হবে। ছয়টা বড় বড় ব্যাগ ভর্তি বাজার। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১১টা ৩০ বাজে। সন্ধ্যার আগে সব রান্না শেষ করতে হবে। শাশুড়ি মায়ের কড়া নির্দেশ লোকজনের সামনে কাজ করা যাবে না। একটা শাড়ি পরে ঘুরঘুর করতে হবে। লোক দেখানো সংসার কিনা! মিরা ভেবেছিলো মাছ কুটে ধূয়ে রেখে দিবে, আর মশলা পিঁসে রাখবে। তারপর গোসল সেরে বাকিসব রান্না করবে। কিন্তু দেখলো আশরাফুল মাছগুলো বাজার থেকে কেটে এনেছে। ৩৫জন মানুষের রান্না একা করা সহজ ব্যাপার না।

আস্তে আস্তে একা হাতে সব কাজ করতে থাকে মিরা। রান্না শেষ করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসে। কাজের চাপে গোসল করার সুযোগটুকু পায়নি সে। রেশমা বানু আর লাবণি ঘরের সবকিছু গুছিয়ে রেখেছে, প্লেট ধূয়ে সাজিয়েছে। তবে রান্নার কোনো কাজে হাত লাগায়নি।
সব রান্না শেষ করতে করতে মাগরিবের আজান দিয়ে দেয়। মিরা তড়িঘড়ি করে গোসলে করতে চলে যায়। রেশমা বানু মিরার খাটের উপর একটা শাড়ি রেখে গেছে সাথে কিছু গহনা। লোকের সামনে ভালো সাজতে মানুষ কিনা করে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাথরুমে চলে যায় মিরা। গোসল শেষ করে শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নেয়। গহনাগুলো পরে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যেন নিজেই চিনতে পারে না সে, এতো সুন্দর লাগে মানুষকে সাজলে! হয়তো বা! মিরা মাথায় হিজাবটা জড়িয়ে নেয়। কত্ত লোক আসবে তাদের সামনে খোলা চুলে থাকতে চায় না সে। এতো সুন্দর করে সাজায় পরেও নিজেকে দেখে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে মিরার।

সব আয়োজন শেষ, বাড়িতে লোকজন আসতে শুরু করেছে। মিরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মা’য়ের অপেক্ষায়। সবার পেছনে মিরার মা হেঁটে আসছে, পা যেন চলতে চায় না তার। মেয়ের সামনে দাঁড়াতে চায় না মোটেই।

মা’কে দেখতে পেয়েই মিরা তাকে জড়িয়ে ধরে। অবাধ্য চোখের পানি যেন বাঁধ মানতে চায় না। রেশমা বানু কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে। দাওয়াতে আসা লোকজন সব জানলেও নতুন করে অবাক চোখে তাকায়। মিরা সব দেখতে পেয়েও চোখ বন্ধ করে থাকে। সকলে নিজের কাজে ব্যস্ত, মিরা মা’য়ের সাথে গল্প করছে, এমন সাজে মেয়েকে দেখে মা’য়ের চোখ জুড়িয়ে যায়।
হঠাৎ রেশমা বানু মিরাকে ডেকে নিয়ে যায়। দুইজন মহিলাকে কিছু খাবার দিয়ে আসতে বলে। তারা পাশের ঘরে বসে গল্প করছে। মিরা খাবারের থালা সাজিয়ে উনাদের দিকে যায়।

–” আচ্ছা এতো বড়লোক পরিবার এরা। বস কেন আমাদের অফিসের আায়ার মেয়েকে বিয়ে করলো বলো তো? এরা তো ধনী পরিবারের ভালো মেয়েকে ছেলের বউ করতে পারতো।”

–” আরে তুমি তো নতুন তাই জানো না। আমাদের অফিসে একটা কথা গুজব আছে। বস নিজের দোষ চাপা দিতে নাকি আয়ার মেয়েকে বউ করছে। ”

মহিলা দুইজন উৎসুক হয়ে একে অপরের সাথে কথা বলছে। মিরা পা যেন ঘরের ভেতরে
যেতে চায় না। বড্ড জানতে ইচ্ছে করে কেন তাকে এই বাড়ির বউ করে এনেছে। কি দোষ চাপা দিতে তার জীবনে এতো কষ্ট নেমে এসেছে!

চলবে

#আলোছায়া
পার্ট -৪
কলমে : #ফারহানা_কবীর_মানাল

মহিলা দুইজন উৎসুক হয়ে একে অপরের সাথে কথা বলছে। মিরা পা যেন ঘরের ভেতরে
যেতে চায় না। বড্ড জানতে ইচ্ছে করে কেন তাকে এই বাড়ির বউ করে এনেছে। কি এমন দোষ চাপা দিতে তার জীবনে এতো কষ্ট নেমে এসেছে।

মিরা ঘরে প্রবেশ করে না, বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে। মহিলা দুইজন নিজেদের মতো কথা বলতে ব্যস্ত।

–” আমাদের স্যারের নাকি ওই আয়ার দিকে কুনজর ছিলো। একদিন ফাঁকা অফিসে স্যার ও-র সাথে খারাপ কিছু করতে যায়। কিন্তু আয়া রাজি হয় না, সবাইকে বলে দিতে চায়। পরে ওই আয়ার মুখ বন্ধ করতেই ওর মেয়েকে ছেলের বউ বানিয়ে এনেছে। যাতে ও-র মুখ বন্ধ থাকে। ”

–” কি রে এই ব্যাপার! আচ্ছা এতো বড় বাড়ি স্যারের এতো বড় পদে চাকরি কিন্তু একজন কাজের লোকও তো দেখলাম না রে। ”

–” পরের চাকরি করে, বেতন আমাদের থেকে বেশি হলেও কোম্পানির মালিক তো না। কোম্পানির মালিক বিদেশ থাকে। দেশের এই কোম্পানি উনি দেখাশোনা করে। ”

–” ওহ তাই বল। আমি তো ভাবলাম উনার নিজের কোম্পানি। ”

–” আরে না। এতো বড় কোম্পানির মালিক হলে তো রাজপ্রাসাদ বানাতো। দাসদাসী থাকতো। হা হা”

–” তবে যা-ই বলো, ভাব কিন্তু রাজাদের মতো। ”

মহিলা দুইজন হেসে গড়াগড়ি দিচ্ছে, কিন্তু মিরার চোখের পানি। মা’য়ের সম্পর্কে এমন কথা সে কখনো আশা করেনি। মা নিজের সম্মান বিক্রি করে তাকে বিয়ে দিয়েছে, ব্যাপারটা কিছুতে বিশ্বাস হচ্ছে না তার।
মিরা ঘরের ভিতর প্রবেশ করে। মুচকি হাসি দিয়ে উনাদের উদ্দেশ্যে বলে, ” আপনাদের জন্য নিয়ে এলাম। কিছু লাগলে বলবেন কিন্তু। আপনাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো? ”

মহিলা দু’জন মুচকি মুচকি হাসছে, একজন অন্যজনকে চোখের ইশারায় কিছু বলছে। মিরাকে দেখতে বলছে। সেসব মিরার চোখ এড়ায়নি, তবে কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। মায়ের কাছে আজ সবকিছু জানতে হবে। সারাজীবন এই নরক যন্ত্রণা সহ্য করা থাকা নেহাৎ বোকামি।

বাড়িতে সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত। রেশমা বানু, লাবণি আশরাফুল সকলের সাথে কথা বলছে। এরা কত সুন্দর সকলের সাথে হেসে হেসে কথা বলে, অথচ মিরার সাথে কখনো একটু হেসে কথা বলে না। ৩৫ জন মানুষের রান্না মিরা একার হাতে করেছে, একটু খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। ৩৫ জন মানুষের রান্না কি কম কথা! অল্প অল্প করে বারবার রান্না করেছে পাছে রান্না খারাপ হয়ে যায় যদি। এ বাড়িতে সব রান্না মিরা একার হাতে করলেও কখনো এতজন লোকের খাবার একসাথে রান্না করেনি। আগে বাড়িতে একজন সাহয্যকারী মহিলা ছিলো, মিরা আসার পর তাকেও বাদ দিয়ে দিয়েছে, মিরার খাওয়ার খরচ আছে, মহিলাকে বেতন দিলে নাকি টাকা কম পড়ে যাবে। হাস্যকর! মিরাও বুঝছে সে এ বাড়ির বিনা পয়সার কাজের লোক। বারবার এ জীবন থেকে চলে যেতে চেয়েছে, কিন্তু কার কাছে যাবে সে! মা’কে যতবার বলেছে আমি থাকতে চাই না। মায়ের একটাই উত্তর মানিয়ে নেও, ঠিক হয়ে যাবে।

একজন মানুষের একা ঘুরে দাঁড়াতে হলে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যেতে হয়। নয়তো কারো পক্ষে একা ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব না। মচকে যাওয়া লতাকে যেমন ডালের সাহায্য সোজা করে দেওয়া যায়, মানুষের বেলায়ও একজন মানুষের প্রয়োজন হয়। যে তাকে বুঝতে পারে। ভেঙে যাওয়া গাছে তো নতুন করে পাতার জন্ম হয়। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ একাই ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

–” মা আমার সাথে একটু ঘরে চলো না প্লিজ। কতদিন তোমার সাথে ভালো করে কথা বলি না। এদিকটা উনারা নিজেই দেখছে তোমার আমার প্রয়োজন হবে না। ”

রোজিনা রেণু মেয়ের কথা মতো মেয়ের সাথে যায়। মেয়ে ছাড়া যে কেউ নেই তার। আধা পুরনো চাদর বিছানো বিছানায় মা মেয়ে বসে আছে। মা’য়ের চোখে মুখে নিষ্প্রাণ, মলিনতার ছাপ! মেয়ের চোখে মুখে কৌতূহল, হাজার প্রশ্ন!

–” মা আমাকে এখানে বিয়ে কেন দিয়েছো?”

–” তোর ভালোর জন্য! আমার মেয়ে এতো বড় বাড়ির বউ হবে। সুখে সংসার করবে। কোন মা এমন চায় না বল?”

তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে মিরা। তারপর বলে উঠে, ” নিজের সম্মান বিক্রি করে মেয়েকে বিয়ে দিতে হলো মা? তোমার মেয়েকে কি কেউ বিয়ে করতো না? ”

রোজিনা রেণুর চোখ ছোট হয়ে যায়।তাড়াতাড়ি করে উত্তর দেয়, ” এসব কি বলছিস তুই? কেউ কি তোকে কিছু বলেছে?”

–” না আমাকে কেউ কিছু বলেনি। তবে শুনেছি। আমি যা শুনেছি তাই কি সত্যি মা?”

রোজিনা রেণু কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। কোনো এক অজানা ভাবনায় ডুবে যায়। ছেলেবেলায় বাবা শখ করে নাম দিয়েছিল রেণু, জীবনটাও তার রেণুর মতো কেটেছে, এক ফুল থেকে অন্য ফুলের খোঁজে, তার স্পর্শে ফুল থেকে ফল হয়েছে বটে তবে তার কোনো মূল্য হয়নি। বিয়ের চার বছরের মাথায় তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে অন্য মেয়ের হাত ধরে। কারণটাও ছিলো বড্ড অদ্ভুত! বিয়ের চার বছর পর মিরার যখন বছর দুই বয়স তখন এক মহিলাকে বিয়ে করে তার স্বামী মানে মিরার বাবা। সুন্দরী মহিলার ছিলো অঢেল সম্পত্তি, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর আর বিয়েও করেনি। একাই থেকেছে, কোনো সন্তানও ছিলো না তার। মিরার বাবা ওই মহিলার বাড়িতে দারোয়ানের চাকরি করতো, বেতন সামান্য হলেও ছোট সংসার বেশ ভালোই চলে যেতো তাদের। সুখের কোনো অভাব ছিলো না। কিন্তু লোভ লালসা মানুষের মনে বাসা বাঁধলে সুখ জিনিসটা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সুঠাম গঠনের অধিকারী মিরার বাবাকে দেখে কখনো দাওয়ান মনে হতো না। পেশিবহুল চেহারা, ফর্সা দেহ। যে কোনো রমনী তার সৌন্দর্য ছুঁয়ে দেখতো চাইবে। ওই মহিলারও এমন শখ জেগেছিলো। মিরার বাবাকে নিজের করে পাওয়ার। সে বৈধ অবৈধ যে কোনো ভাবেই মিরার বাবাকে তার চাই। বারবার প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু কখনো মিরার বাবার মন গলাতে পারেনি। অবশেষে সম্পত্তির লোভ দেখানো শুরু করে, তাকে বিয়ে করলে সবকিছু লিখে দেবে মিরার বাবাকে, মিরা বাবাও যেন লোভ সামলাতে পারে না শেষ পর্যন্ত। এমন অঢেল সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করার সহজ উপায় আর কোথায় পাওয়া যায়, রোজিনা রেণুকে তালাক দিয়ে ও-ই মহিলাকে বিয়ে করে নেয়। সে-ই থেকেই জীবন তাকে স্রোতের সাথে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে!

–” কি এতো ভাবছো মা? আমার কথায় উত্তর দেও।”

মেয়ে কথায় নিজের অতীতের স্মৃতিচারণ বন্ধ করে সে। চোখ তুলে মিরার দিকে তাকায়। কৌতূহলী চোখে মিরা তার দিকে তাকিয়ে আছে। কোনো উত্তর খুঁজে পায় না রোজিনা রেণু। চোখ বন্ধ করে রাখে। তবুও বন্ধ চোখের সামনে ভেসে ওঠে কুৎসিত কালো এক দিন।

” সেদিনটি ছিলো চারদিক কালো মেঘে ঢাকা, থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছে। বিকাল চারটায় যেন সন্ধ্যা নেমে এসেছে ধরণীতে। অফিসের সবাই বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছে শুধু রোজিনা রেণু, আজমল সাহেব, দাওয়ান নিরব মিয়া আর কুসুম বিবি বাদে। আজমল সাহেবের কিসব কাজ তখনও বাকি। অফিসের বস কাজ শেষ করে বাড়িতে না যাওয়ার পর্যন্ত কি নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের ছুটি মেলে নাকি! সে-ই জন্যই এরা তখনও অফিসে নিজের কাজ করছে।

এমন সময় আজমল সাহেব কুসুম বিবিকে ডাক দেয়।

–” আমাকে এক কাপ চা দিয়ে যা তো। মাথাটা বড্ড ধরেছে। ”

কুসুম বিবি তখন দুই বছরের ছোট বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে ব্যস্ত। বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে বলে বারো বছর বয়সি তামান্না ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে মা’য়ের কাছে এসেছে। কিছুতেই কান্না থামছে না ছেলেটার! ক্ষুধার জ্বালায় বড্ড কাঁদছে। ঘরে দুধ নেই বলে খাওয়াতেও পারেনি। অফিস থেকে ওদের বাড়ি দেখা যায় তাই তেমন সমস্যাও হয়নি। কুসুম বিবি ওই পাশে ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত তাই রোজিনা রেণুই চায়ের কাপ হাতে আজমল সাহেবের দরজার কড়া নাড়ে।

–” স্যার আসবো। ”

–” হ্যাঁ। ভেতরে আয়।

–” স্যার আপনার চা। ”

আজমল সাহেব চোখ তুলে তাকায়। রোজিনা টেবিলে চা রাখছে, গলার কাছে সামান্য খোলা, শরীর দেখা যাচ্ছে। কি সুন্দর ফর্সা গলা! কোমলতায় ভরা! মনের মাঝে হিংস্র সাপটা ফনা তুলে ওঠে আজমল সাহেবের। রোজিনা বেশ সুন্দরী। ফর্সা চেহারা, একদম মিরার মতো। দেখলেই কেমন লোভ জাগে। আজমল সাহেব খপ করে হাতটা ধরে ফেলে রোজিনা রেণুর।

-” একি স্যার কি করছেন আপনি? ”

–” তুই বেশ সুন্দর রে! আজ সন্ধ্যাতে তুই আমার সাথে থাক। টাকা পাবি সেই সাথে মজাও পাবি। শুনেছি তোর বর নেই বহু বছর। ”

–” নাহ আমি এসব করতে পারবো না, আপনি আমার হাত ছেড়ে দেন। ”

–” আহ্! শোন তো। এদিকে আয়। ”

আজমল সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে, তার একহাত তখনও রোজিনা রেণুর হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে। রোজিনা রেণু তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু আজমল সাহেব তাকে ছাড়তে চাইছে না। অপর হাত দিয়ে রোজিনা রেণুর আঁচল টান দেয়, শাড়ির আঁচল টান দিতেই রোজিনা চিৎকার দিয়ে উঠে, রোজিনার আঁচল ছেড়ে মুখ চেপে ধরে আজমল।

–” আমি তোরে অনেক টাকা দিবো। একটা সন্ধ্যাই তো মাত্র! না রাজি হলে তোর চাকরি খেয়ে নিবো কিন্তু! ”

–” না স্যার। চরিত্র বিক্রি করলে অনেক আগেই মেয়েকে নিয়ে ভালো থাকতো পারতাম। অফিসের বসদের শরীর দিলে বেশ সহজে চাকরি করতে পারতাম কিন্তু আমার কাছে চরিত্র আগে, আপনি আমাকে ছেড়ে দেয় আপনার চাকরি আমি করবো না। সবাইকে বলে দিবো আপনার অসভ্যতামির কথা। ”

আজমল সাহেবের মনের মাঝে জেগে ওঠা ফণা তোলা সাপ রোজিনা রেণুকে ছাড়তে চাইছে না। বিষাক্ত ছোবল বসিয়ে দিতে চাইছে। বহুদিন ধরে এ নারীকে দেখে চলেছে, অদ্ভুত সুন্দর তার শরীরের গঠন। দেখলেই বিষাক্ত মনে লালসা জেগে ওঠে। এমন সময় কুসুম বিবির গলা শোনা যায়।

–” স্যার ডেকেছিলেন আমাকে? ”

আজমল সাহেব রোজিনা রেণুর হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের চেয়ারে বসে পড়ে। কপালে জমে থাকা ঘাম বিন্দু গুলো রুমাল দিয়ে মুছে নেয়। রোজিনা রেণু দৌড়ে বেরিয়ে যায়। কুসুম বিবি দরজার পাশে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে থাকে।

চলবে