আলোছায়া পর্ব-৫+৬

0
513

#আলোছায়া
পার্ট -৫
কলমে : #ফারহানা_কবীর_মানাল

আজমল সাহেব রোজিনা রেণুর হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের চেয়ারে বসে পড়ে। কপালে জমে থাকা ঘাম বিন্দু গুলো রুমাল দিয়ে মুছে নেয়। রোজিনা রেণু দৌড়ে বেরিয়ে যায়। কুসুম বিবি দরজার পাশে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে থাকে।
তারপর রোজিনা রেণুর কাছে যায়। রোজিনা রেণুর হাতে আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। লাল হয়ে আছে।

–” আপা আমাকে এক গ্লাস পানি দেন। ‘
হাঁপাতে হাঁপাতে কথাটা বলে রোজিনা। কুসুম বিবি একগ্লাস পানি তার সামনে ধরে। কুসুম বিবির হাত থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে সবটুকু শেষ করে ফেলে। তারপর মন মরা হয়ে বলে উঠে, ” আমি আর এই অফিসে চাকরি করবো না আপা। আপনার জানা শোনা কোন কাজ আছে। বেতন অল্প হলেও হবে। ”

–” কেন চাকরি করবা না কেন? এইটাই তো বেশ ভালো চাকরি, বেতনও ভালোই।”

–” আমার চাকরি লাগবে না, নিজের মানসম্মান সবার আগে। ”

বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে রোজিনা রেণু। সে ভেবেছিলো কথাগুলো কুসুম বিবি শুনতে পায়নি। কিন্তু কথাগুলো ঠিকই কুসুম বিবির কর্ণগোচর হয়েছিল। পরের দিন আর অফিসে আসে না রোজিনা। বাড়িতে বসে থাকে। আজীবন নিজের সম্মান বাঁচিয়ে এসেছে, একা মেয়ে হওয়ার সবাই বারবার সুযোগ নিতে চেয়েছে। শকুনের নজর থেকে নিজেকে আগলে রেখেছে, সে-ই সাথে মেয়েকেও। জীবনে চলার পথে বারবার পড়ে গেছে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। এবার কেন পারবে না! এতোবার উঠে দাঁড়াতে পারলে এবারও নিশ্চয়ই পারবে।

ওদিকে অফিসে আজমল সাহেবের চিন্তার শেষ নেই। সারা অফিস জুড়ে কালকের গুঞ্জন! সত্যি কথার সাথে মিথ্যা কথা মিশিয়ে নানান গল্প। কেউ কেউ বলছে আজমল সাহেব নাকি রোজিনা রেণুকে ভোগ করে অনেক টাকা দিয়ে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছে। কারো মতে রোজিনা রেণু লজ্জায় আর অফিসে আসে না। কুসুম বিবি নাকি নিজের চোখে সব দেখছে।
সময় যাওয়ার সাথে সাথে সমালোচনার মাত্রাও বাড়তে থাকে। আজমল সাহেবের সামনে কেউ কিছু না বললেও পিছন থেকে সব কথাই কানে আসে।

–” শিউলি আপা শোনো, আমি ভাবছি চাকরিটা ছেড়ে দিবো, যে স্যারের নজর আয়ার উপর পড়তে পারে তার নজরে আমি পড়বো না এটা কি করে হতে পারে! ”

–” আরে কিসব বলছো চাকরি কেন ছাড়বে, বরং তোমার রূপের সুধা দিয়ে প্রমোশন করিয়ে ফেলো। ”

আজমল সাহেবের অগোচরে দুইজন মহিলা কর্মচারী কথোপকথন।
আজমল সাহেবের আড়ালের বলেছে কথাগুলো তবুও আজমল সাহেবের কানে এসে পৌঁছায়, সেখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না আজমল সাহেব। ওদের চোখ এড়িয়ে নিজের কেবিনে গিয়ে বসে পড়ে। এমন চলতে থাকলে ওনার নিজের চাকরিও থাকবে না আর মানসম্মানের কথা না হয় না-ই বা বললাম। কোম্পানির মালিক বড্ড ভালো মানুষ। মেয়েদের অনেক বেশি সম্মান করে, কোনো ভাবে এ কথা তার কানে গেলে আজমল সাহেবকে চাকরি থেকে বের করে দিতে দ্বিধা বোধ করবেন না। অফিসে আজমল সাহেবের পদটা দখল করতে চায় এমন লোকেরও অভাব নেই। টেনশনে মাথা ফেটে যাওয়ার অবস্থা তার।

চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে আজমল সাহেব। নিজের লালসাকে বশ করতে পারলে আজ এইদিন দেখতে হতো না। অনেক বেশি ভাবছে তো সে। কিন্তু ভাবনাটা অস্বাভাবিক কিছু না। সেবার একজন তার নিম্নপদস্থ কর্মচারীকে খারাপ প্রস্তাব দিয়েছিলো। সে ঘটনা মালিকের কানে গেলে তাকে সাথে সাথে চাকরি থেকে বের করে দেয়। কারো কোন কথা শোনেনি। সেই সাথে আজমল সাহেবকে কড়া হুকুম দেন, এসব কাজ দ্বিতীয়বার কেউ করলে যেন তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এখানে সবাই নিজের যোগ্যতা দিয়ে কাজ করে, কেউ কারো লালসা হাসিল করার বস্তু নয়। এখন এই মালিক যদি জানতে পারে আজমল সাহেব অফিসের আয়ার সাথে খারাপ কিছু করতে চেয়েছিলো তাহলে তার কি দশা করবে! ভাবতেই ভয়ে কলিজা ঠান্ডা হয়ে যায় আজমল সাহেবর।
চোখ বন্ধ করে চিন্তা করতে থাকে, কি করে সব সামাল দেওয়া যায়। ব্যাপারটাকে এমনভাবে ধামাচাপা দিতে হবে যেন কারো কিছু বলার সাহস না থাকে। অনেক চিন্তা করে অফিসের দারোয়ানকে ডেকে পাঠায়।

–” স্যার ভিতরে আসবো?”

–‘ হুম আসো। আচ্ছা আমাদের অফিসের আয়া, কি যেন নাম ও-র? ”

বিদ্রুপে মুখ বেঁকে আসে নিরব মিয়ার। কাল বিকালে যার হাত ধরে টানাটানি করছিলো আজ তার নাম ভুলে গেছে। কত নাটক করতে পারে মানুষ! ইচ্ছে করে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিতে তবুও চাকরির ভয়ে চুপ করে থাকে। মিনমিনে গলায় বলে, ” আয়ার নাম তো রোজিনা রেণু। কিন্তু সে তো আজ অফিসে আসে নাই স্যার। ”

–” ওহ, তাহলে ও-কে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এসো। আর হ্যাঁ এই না-ও। কিছু খেয়ে নিও। আর ও-কে সাথে করে নিয়ে আসবে। কেমন? ”

নিরব মিয়ার দিকে এক হাজার টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দেয় আজমল সাহেব। নিরব মিয়া হাত বাড়িয়ে টাকা নিয়ে রোজিনা রেণুর বাড়ির পথ ধরে। নানান প্রশ্ন মনের মাঝে জেগে ওঠে তবুও নিজেকে শান্ত রাখে। কি দরকার এসব ঝামেলায় জড়িয়ে।

–” রোজিনা আপা, এদিকে শোনো তো। ”

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক ছাড়ে নিরব। রোজিনা তখন উনুনে ভাত চাপিয়েছে, মেয়েটা সকালে না খেয়ে কলেজে গেছে। এসে জানি গরম ভাত খেতে পারে। নিরব মিয়ার গলা শুনে বাইরে বেরিয়ে আসে।

–” কিছু বলবে নিরব ভাই?”

-” বড় সাহেব তোমাকে ডেকেছে। এখনই চলো। আমাকে তোমাকে সাথে নিয়ে যেতে বলেছে। ”

চোখমুখে ভয়ের ছায়া এসে ভীড় করে রোজিনা রেণুর। তবুও মুখে কিছু বলে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর মাথা নেড়ে ঘরের ভিতর চলে যায়। মিনিট দশেক পরে বেরিয়ে এসে বলে, ” চলো নিরব ভাই। ”

নিরব মিয়া রোজিনা রেণুর পাশে হেঁটে চলেছে। বারবার আড়চোখে এই মহিলাকে দেখছে। মাঝে মাঝে তাকে বড্ড অসহায় মাঝে মাঝে বড্ড ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে। কিন্তু কারণগুলো নিবর মিয়া নিজেও ধরতে পারছে না।

–” স্যার রোজিনা আপাকে নিয়ে এসেছি। ‘

–” আচ্ছা তুই যা এখন।”
নিরব মাথা নেড়ে চলে যায়। রোজিনা রেণু মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। হাতের আঙ্গুলে কাপড় পেঁচিয়ে যাচ্ছে। কি জন্য তাকে ডেকে নিয়ে এসেছে বুঝতে পারছে না। এখন মনে হচ্ছে না আসলেই ভালো হতো।

–” রোজিনা তোর মেয়ে আছে না একটা?”

–” হ্যাঁ, একটাই মেয়ে আমার। ”

–” কি করে তোর মেয়ে?”

–” এই তো কলেজে পড়ে। অনার্স ভর্তি হয়েছে এবার। ”

–” বিয়ে দিবি তোর মেয়েকে আমার ছেলের সাথে?”

রোজিনা রেণু অবাক দৃষ্টিতে আজমল সাহেবের দিকে তাকায়। কি করতে চায় এই লোকটা। কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।

–” আমার ছেলে একটা বড় কোম্পানিতে চাকরি করে। তুই তো ও-কে দেখেছিস। ”

রোজিনা রেণুর কাছে আশরাফুল ছেলেটা অপরিচিত নয়। কয়েকবার বাবার অফিসে এসেছে। সে-ই সুবাদেই দেখা। আজমল সাহেব এই অফিসে চাকরি দিতে চেয়েছিলো ছেলেকে তবে ছেলে নাকি নিজের যোগ্যতায় চাকরি করবে, বাবার নাম ভাঙিয়ে চলবে না। তাই রাজি হয়নি। ছেলেটার কথা বলার ধরণ বেশ ভালো। ছোট বড় সবাইকে সালাম দিয়ে কথা বলে। আগেরবার রোজিনা রেণু আশরাফুলকে চা দিতে গেলে তাকেও সালাম দিয়েছে। দেখতেও সুন্দর!

–” কি রে কি ভাবিস? এতো ভাবনা ছেড়ে দে। তোর মেয়েকে দেখতে বেশ সুন্দর। আমার বেশ পছন্দ। আমার ছেলের সাথে বেশ সুখেই থাকবে। ”

রোজিনা রেণু ভেবে পায় না৷ ছেলে ভালো চাকরি করে, স্বভাব চরিত্র ভালো এমনই শুনছে। ছেলের বাপের চরিত্র যেমন ছেলে আবার তেমন না তো। ভয় হয় রোজিনা রেণুর তবুও মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে দেয়।

–” আজ বিকালে তোর মেয়েকে দেখতে যাবো। বিয়ের ঝামেলা শেষ হলে আবার অফিসে আসবি কেমন?”

–” আচ্ছা ঠিক আছে। ”

সারাপথ চিন্তা করেও কোনো কূল পায় না রোজিনা। নিজের স্বামীর টাকার লোভে তাকে ছেড়ে চলে গেছে। সল্প বেতনে চাকরি করে এমন ছেলের কাছে মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি নয় সে। এই প্রস্তাবটা বেশ ভালো। না করার দরকার হয় না। পুরুষ মানুষের একটু সমস্যা থাকতেই পারে, আর বাপের দোষ আছে বলে কি ছেলেরও দোষ থাকবে নাকি। তাছাড়া আজমল সাহেব এতো বছর বউকে নিয়ে সংসার করছে, কই তাকে ছেড়ে অন্য কাউকে তো আর বিয়ে করেনি। মেয়ের বিয়ে সে এখানেই দিবে।

ছেলে ভালো চাকরি করে, দেখতে সুন্দর, বড় ঘর হলেই মেয়ে সুখে থাকবে। এমন চিন্তা ধারা আজকালকার ৯০% মানুষের ভিতর দেখা যায়। রোজিনা রেণুও তাদের ব্যতিক্রম নয়। হয়তো টাকাই সুখ দিতে পারে, না হলে তার স্বামী কেন তাকে ছেড়ে চলে যাবে! স্বামী চলে যাওয়ার পর থেকে রোজিনা রেণুর মনে গেঁথে গিয়েছে টাকাই জীবনে সুখ আনতে পারে, টাকা জীবনের সব। তা না হলে অমন সুখের সংসার ছেড়ে কি কেউ চলে যায় নাকি? নিজের টাকা ছিলো না বলে স্বামী চলে গেছে মেয়ের বেলায় সে এই ভুল করবেন না। বড়লোক বাড়ি দেখেই বিয়ে দিবে। এরপর মিরার বিয়ে হয়ে যায় আশরাফুলের সাথে।

–” কি হলো মা? কি ভাবছো?”

মেয়ের কথায় হুঁশ ফিরে আসে রোজিনা রেণুর। নড়েচড়ে বসে বলেন, ” না কিছু না। এসব কি শুনেছিস তুই কে জানে! এসব সত্যি না। ”

চলবে

#আলোছায়া
পার্ট -৬
কলমে : #ফারহানা_কবীর_মানাল

নিজের টাকা ছিলো না বলে স্বামী চলে গেছে মেয়ের বেলায় সে এই ভুল করবেন না। বড়লোক বাড়ি দেখেই বিয়ে দিবে। এরপর মিরার বিয়ে হয়ে যায় আশরাফুলের সাথে।

–” কি হলো মা? কি ভাবছো?”

মেয়ের কথায় হুঁশ ফিরে আসে রোজিনা রেণুর। নড়েচড়ে বসে বলেন, ” না কিছু না। এসব কি শুনেছিস তুই কে জানে! এসব সত্যি না। ”

মায়ের বিচলিত চেহারা বলে দিচ্ছে সে মিথ্যা বলছে। মিরা আর দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করে না। মা হয়তো তাকে সত্যিটা বলতে চাইছে না, কেউ যদি তোমাকে কোনো কথা বলতে না চায় তবে সে কথা না শোনাই সব থেকে ভালো।
রোজিনা রেণু মিরার চিবুক স্পর্শ করে বলে, ” মা তুই ভালো আছিস তো?”

মিরার মলিন হেসে বলে, ” এইতো মা আল্লাহ যেমন রেখেছে বেশ ভালোই। খাওয়ার চিন্তা নেই। এতো বড় বাড়িতে থাকতে পারছি। আর কি চাই বলো!”

রোজিনা রেণু মুচকি হেসে বলেন, “মা আমি যা করেছি তোর ভালোর কথা ভেবেই করেছি। তোর বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে দিনরাত পরিশ্রম করে তোকে বড় করে তুলেছি। বড়লোক পরিবার দেখে বিয়ে দিয়েছে যাতে তোর বাবার মতো লোভী হয়ে না যায়। তুই আমার উপর কোনো রাগ রাখিস না মা।”

মিরা কোনো উত্তর দিতে পারে না। জীবনের এমন বাঁকে দাঁড়িয়ে একজনকে পাশে পেতে বড্ড ইচ্ছে করে কিন্তু কে তার পাশে দাঁড়াবে? কে তাকে আগলে রাখবে? এমন কি কেউ নেই!

–” মা চলো, অনেক রাত হয়েছে খেয়ে নিবে। ”

রোজিনা রেণু মেয়ের কথা মতো খেতে চলে যায়। সকলে নিজের মতো খেয়ে নিয়েছে অনেকে বাড়িও চলে যাচ্ছে। রোজিনা রেণুও খেয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। মিরা অনেকবার থাকতে বলেছিলো কিন্তু সে রাজি হয় না। পাছে মেয়েকে যদি কোনো অপমান সহ্য করতে হয়।

মিরা মন খারাপ করে ঘরে বসে আছে। চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে। কতদিন হয়ে গেলো মা’য়ের পাশে ঘুমায় না। মা একদিন থেকে গেলে কি এমন হতো! বড্ড অভিমান হয় মা’য়ের উপর। পরক্ষণেই মনে হয় মা চলে গিয়ে ভালোই করেছে, থাকলে হয়তো মিরার কষ্টগুলো চোখ পড়তো তার। কি দরকার শুধু শুধু মা’য়ের কষ্ট বাড়িয়ে। তাছাড়া এ বাড়ির কেউ তো মা’কে থাকতে বলেনি। এতো রাতে মা কি করে যাবে সে চিন্তাও কারো মাথায় আসেনি। সকলে নিজের মতো খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ছে। মিরা বা রোজিনা রেণু খেয়েছে কিনা সে খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে হয়নি কারো কাছে, এ বাড়িতে মা না থেকেই বেশ ভালো করেছে।

মিনিট দশেক পর বাইরে ঘরে রোজিনা রেণুর গলা শোনা যায়। মিরা মনের ভুল মনে করে তেমন গায়ে লাগায় না, একমনে কিছু একটা চিন্তা করতে থাকে।

–” মিরা মা জামাই আজ যেতে দিলো না। মাঝ পথ থেকে নিয়ে এসেছে, এতো রাতে কিছুতেই একা যেতে দিলো না। ছেলেটা ”

রোজিনা রেণুর গলা পেয়ে মিরা চোখ তুলে তাকায়, আশরাফুল আর রোজিনা রেণু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। মিরা চোখের ভুল মনে করে চোখ কচলে আবার তাকিয়ে একই দৃশ্য দেখতে পায়। আবেগে চোখ দিয়ে পানি আসতে চায়, তবে অজানা আবরণে অশ্রুকণা আঁটকে যায়। বিছানা গুছিয়ে মা’কে নিজের ঘরে ঘুমাতে বলে ছাঁদে চলে যায় মিরা। মা’য়ের পাশে ঘুমাতে বড্ড ইচ্ছে করছে তবে নিজের দাম্পত্য জীবনের কষ্ট মা’কে দেখাতে ইচ্ছে করছে না। সারাজীবন মা অনেক কষ্ট পেয়েছে, এখন না হয় মেয়ের দুঃখে কষ্ট না-ই বা পেলো।
রোজিনা রেণু বিছানায় পিঠ এলিয়ে দেয়। কিছু সময় পর গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। মেয়ে হয়তো জামাইয়ের কাছে আছে, তাই আর খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে হয় না তার।

নিস্তব্ধ রাত, অন্ধকার আকাশে কয়েকটা তারা নিজের মতো জ্বলে চলেছে। কিন্তু তাদের আলোয় পৃথিবী আলোকিত হচ্ছে না, বরং অন্ধকার আরো গাঢ়ো হয়ে ফুটে উঠেছে। মিরার রাতের অন্ধকারে তারার আলো দেখছে ব্যস্ত হয়ে আছে, আকাশ-পাতাল কিসব ভেবে চলেছে। তার পাশে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তা মিরার চোখে পড়েনি।

–” আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি এমনকি এখন দিয়ে চলেছি, তাই না মিরা?”

আশরাফুলের কন্ঠে মিরা চমকে ওঠে। ব্যস্ত হয়ে আশেপাশে তাকায়, পাশে তাকাতেই দেখতে পায় আশরাফুল দাঁড়িয়ে আছে। বুকের সাথে হাত বেঁধে, আকাশের দিকে তাকিয়ে মিরার মতো তারা দেখছে। মিরা কোনো উত্তর দেয় না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।

–” নিরবতাকে কি আমি সম্মতি ধরে নিবো?”

মিরা তবুও জবাব দেয় না। কি জবাব দিবে সে। আশরাফুল তাকে মেনে নিলে হয়তো এতো কষ্ট সহ্য করতে হতো না মিরাকে, তবুও আশরাফুলকে সে দোষ দিতে পারে না। আশরাফুল তো তাকে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেনি, আজমল সাহেবের কথা রাখতে বিয়ে করেছে, তবুও দোষ তার। সে কি পারতো না নিজের বাবাকে বোঝাতে বা বিয়েটা না করতে কিন্তু সে তা করেনি। এমনি বিয়ে পরে কখনো মিরার কি প্রয়োজন বা মিরা কেমন আছে তা দেখতে যায়নি। তাহলে কি দোষটা তার না?

মিরা কথা ঘুরিয়ে বলে ওঠে, ” একটা প্রশ্ন করবো আপনাকে?”

আশরাফুল খানিকটা চমকে যায়। এতোদিনে মিরা কখনো তার কাছে কিছু জানতে চায়নি। যতটুকু যা কথা হয়েছে সবটাই কাজের প্রয়োজনে। তবুও মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়, আস্তে আস্তে বলে ওঠে, ” হুম বলো। ”

মিরার মাঝে সংকোচ কাজ করে, এবার ভাবে, না কিছুই জানতে চাইবে না। কি দরকার কারো কাছে কিছু জানতে চেয়ে, বলার হলে তো নিজে থেকেই বলতো। তবুও কৌতুহল কমে না। নিজের সাথে দন্দ কাটিয়ে প্রশ্ন করে, ” আপনার মানিব্যাগে আমার ছবি কেন?”

আশরাফুল শান্ত গলায় জবাব দেয়, “ছবিটা তোমার মতো দেখতে হলেও মানুষটা তুমি না। ”

মিরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। মিরার মতো দেখতে! তার মানে মিরার মতো দেখতে আরো কেউ পৃথিবীতে আছে। কলেজে স্যারের কাছে শুনেছিলো একজনের মতো দেখতে নাকি অনেক মানুষ পৃথিবীতে থাকে। তাহলে এই ছবির মেয়েটা কি তেমনই একজন।

–” সত্যি! আমার মতো দেখতে অন্য কেউ এই পৃথিবীতে আছে? আমাকে তার সাথে একবার দেখা করিয়ে দিবেন?”

আশরাফুল মিরার কৌতুহল দেখে অবাক হয়। নিজের মতো দেখতে অন্য একজন আছে শুনে কারো মনে এতো কৌতুহল জাগতে পারে? একরাশ হতাশা নিয়ে আশরাফুল জবাবে বলে,

–” কি করে তোমার সাথে তার দেখা করাবো বলো, সে তো আমার জীবনেই নেই। হাসিখুশি ছেলেটাকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে চলে গেছে। ”

–” আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে? ”

–” শুধু আমাকে ছেড়ে চলে যায়নি। বরং মানুষের উপর আমার ভরসা বিশ্বাস এগুলোও নষ্ট করে দিয়ে গেছে। আমি চাইলেও নতুন করে কাউকে আমার জীবনে জড়াতে পারি না। বড্ড ভয় হয়। ”

–” সবাই তো সমান হয় না। একজন চলে গেছে মানে এমন তো না যে সবাই চলে যায়। ”

–” তোমার মতো আমিও এটাই ভাবতাম, তবে আমার বিশ্বাস একবার নয় দুইবার ভেঙে গেছে, ভেঙে যাওয়া গাছে নতুন পাতা গজাতে অনেকদিন সময় লাগে। আমি তো নিঃশেষ হয়ে যাওয়া মানুষ।”

মিরার কোনো কথা বলে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। নিজের জীবন-ই যখন এতো কিছু দেখিয়েছে তখন অন্যের জীবন নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করছে না। তবুও বলে,

–” আমাদের জীবনে এমন একজন মানুষ অবশ্যই থাকে, যার কথা ভেবে আমরা শান্তি পাই। আমাদের তাঁকে নিয়ে ভাবতেও বড্ড ভালো লাগে। ”

–” তোমার জীবনে এমন কেউ আছে? যাকে নিয়ে ভাবতে তোমার ভালো লাগে?”

আশরাফুলের প্রশ্নের কি জবাব দিবে জানা নেই মিরার। তবে অচেনা কারো থেকে পাওয়া চিঠির কথাটা মনে পড়ে, কে চিঠিটা পাঠিয়েছে মিরা জানে না, তবে সে মিরাকে নিজের খেয়াল রাখতে বলেছে, এতটুকুই বা কে বলে ও-কে!

নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে মিরার। যা আশরাফুলের চোখ এড়ায়নি। আশরাফুল ব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে,

–” তোমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন করে ফেললাম। দুঃখিত। ‘

কথাটা বলে আশরাফুল ছাঁদ থেকে চলে যায়। মিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। জীবন মানুষকে কত কিছুই না দেখায়! আজ আশরাফুল আর মিরার তো একটাই ব্যক্তিগত জীবন হওয়ার উচিত ছিলো। দুইজন একান্ত দু’জনের! তাঁরা যে স্বামী স্ত্রী। তবে এই সম্পর্কটা নেহাৎ কাগজে কলমে। বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।

রাত বাড়তে থাকে, মিরা ঠিক করে মা’য়ের কাছেই ঘুমাবে। মা জানতে চাইলে বলবে তার কাছে ঘুমাতে ইচ্ছে করছিলো খুব। তা-ই চলে এসেছে। তাছাড়া এখন রাতও অনেক হয়েছে, মা নিশ্চয়ই ঘুম। মিরা ঘরের দিকে পা বাড়ায়। হঠাৎ খেয়াল করে একটা কাগজের টুকরো পড়ে আছে। কৌতূহল বশত কাগজের টুকরো হাতে তুলে নেয়। তাতে লেখা-

“শুভ জন্মদিন প্রণয়ী। হে আমার প্রিয়তমা, তুমি আমার জীবনে না আসা পর্যন্ত আমি কখনই সুখ অনুভব করিনি। তুমি আমার জন্য এই পৃথিবীস্বরুপ। তোমার এই বিশেষ দিনে, আমি তোমার জীবনে ভালবাসা, আনন্দ, শান্তি এবং সুখের জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি।”

আজ মিরার জন্মদিন! মিরার নিজেরই মনে ছিলো না। কিন্তু এখানে এই কাগজটা কে রাখলো? আশরাফুল?

চলবে