আলোছায়া পর্ব-৭+৮

0
459

#আলোছায়া
পার্ট -৭
কলমে : #ফারহানা_কবীর_মানাল

আশরাফুল মিরার জন্য এমন প্রেমময় চিঠি লিখেছে! মিরার যেন কথাটা বিশ্বাস হতে চায় না। আচ্ছা সেই অচেনা ছেলেটি এ চিঠি লেখেননি তো? মিরা নিজের হাতের দিকে তাকায়। পোড়া জায়গাটা বেশ শুকিয়ে এসেছে। এখন তেমন ব্যাথাও নেই। সামান্য যত্ন মানুষের মনের উপর কতটা প্রভাব ফেলে! মিরার অচেনা ছেলেটার কথা ভাবতে বড্ড ভালো লাগে। কে হতে পারে লোকটা। মিরার হাতের চিঠিটা উল্টে পাল্টে দেখে, চিঠির পিছনে এক বছর আগের তারিখ লেখা রয়েছে । নিমেষেই মিরার মনের আকাশে কালো মেঘ জমা হতে থাকে। এই বুঝি চোখ দুটি থেকে বৃষ্টি গড়িয়ে পড়বে।

কপলের উপর দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানির চিহ্নগুলো হাত দিয়ে মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। অতিরিক্ত আশা করতে নেই। মিনিট পাঁচেক পর আশরাফুল ফিরে আসে।

–” মিরা একটা চিঠি দেখেছো তুমি? এখানেই হয়তো ফেলে গেছি। ”

মিরা কেন জানি কথা বলতে পারে না। গলা আঁটকে আসে। তবুও মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দেয়। তারপর চিঠিটা আশরাফুলের দিকে বাড়িয়ে দেয়।

আশরাফুল মিরার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে। তারপর তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে, ” যে নেই তার স্মৃতি রেখে কি লাভ! ভুলে যাওয়াই সব থেকে ভালো, তবুও কেন ভুলতে পারি না। ”

মিরার মনে নানান প্রশ্ন জমা হতে থাকে। তবে জানতে চাওয়ার ইচ্ছে হয় না। চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে থাকে। কয়েক পা সিঁড়ি দিয়ে নামলে আশরাফুল মিরার নাম ধরে ডাক দেয়। মিরা সামান্য অবাক হয়, সে-ই সাথে অদ্ভুত এক অনুভূতির সাক্ষী হয়। নিজের অনুভূতিকে নিজের ধিক্কার জানায় মিরা। তারপর পিছন ফিরে বলে,

–” কিছু বলবেন?”

–” আজ কি তোমার জন্মদিন? ”

মিরা বুঝতে পারে না কি জবাব দেওয়া উচিত। এমন সহজ একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েও যেন বারবার থমকে যাচ্ছে। আজ কেন সবকিছু এমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে মিরার।

–” বলবে না আমাকে?”

–” হ্যাঁ, আজ আমার জন্মদিন। ”

আশরাফুলের চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে ওঠে। কি করে দুইটা মানুষের এতোটা মিল থাকতে পারে?

–” তোমার কি যমজ বোন আছে মিরা? ”

–” না আমার কোনো বোন নেই। আমি একা। ”

হতাশার ছাপ ফুটে ওঠে আশরাফুলের মুখে। সে কি কখনো তার প্রেয়সীকে খুঁজে পাবে না? হয়তো বা না। যে নিজের ইচ্ছার হারিয়ে যায় তাকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়? তাকে হয়তো খুঁজে বেড়ানোও অনুচিত। তবুও কেন তাকে খুঁজতেই মন ব্যাকুল হয়ে থাকে?

মিরা আর দাঁড়াতে পারছে না। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত লাগছে। সারাদিন অনেক কাজ করেছে সে। এখন চাইলেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করা সম্ভব না।

–” আপনি কি কিছু বলবেন? আসলে শরীরটা ভালো লাগছে না, বড্ড ক্লান্ত লাগছে। ”

–” ওহ! আমি দুঃখিত। তুমি যাও।”

মিরা দ্রুত পায়ে ছাঁদ থেকে নেমে যায়। তারপর মা’য়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে, রোজিনা রেণু দরজা খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো। ভালোই হয়েছে মিরার জন্য, না হলে রান্নাঘরের ঠান্ডা মেঝেতে ঘুমাতে হতো। বিছানায় শুয়ে নানান কথা ভাবতে থাকে মিরা। ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে যায় খেয়ালই করে না।

সকালের সূর্য তখন পূর্ব আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। চারদিক সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে গেছে। মিরার বেশ দেরিতে ঘুম ভাঙে। সারাদিন কাজ করার পর অতো রাত জেগে থাকলে কি সকাল সকাল ঘুম ভাঙে নাকি! মিরারও তো রক্ত মাংসে গড়া শরীর। রোবট তো নয়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে আটটা বেজে গেছে। তড়িঘড়ি বিছানা থেকে নেমে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। না জানি আজ তাকে কোন অপমান সহ্য করতে হয়৷ আবার মা-ও আছে এখানে। নিজের উপরই রাগ হচ্ছে মিরার। কে কাল ছাঁদে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গেলো আশরাফুলের সাথে।

রান্নাঘরে গিয়ে দেখতে পায় রেশমা বানু প্লেট ধূয়ে সাজিয়ে রাখছেন। কাঁপা গলায় বলে, ” সকালে কি রান্না করবো? আমার উঠতে অনেক দেরী হয়ে গেছে, দুঃখিত। ”

রেশমা বানু কোনো উত্তর দেয় না। পিছন থেকে লাবণির কন্ঠ শোনা যায়। সে মিরার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে, ” তুমি ঘুম ছিলে বলেই ভাইয়া এতো সুন্দর একটা খাবার কিনে আনলো সবার জন্য। তুমি জেগে থাকলে তো রোজকার মতো ওইসব শাকপাতা খেতে হতো। ”

লাবণির কথায় মিরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, ততো সময়ে রেশমা রেনুর থালাবাসন ধূয়ে রান্নাঘর থেকে চলে যায়। রোজিনা রেণু রেডি হয়ে বসে আছে। মিরার সাক্ষাৎ পেলে বাসার দিকে রওনা দিবে। মিরা বাচ্চাদের মতো গিয়ে মা’কে জড়িয়ে ধরে তারপর আহ্লাদী কন্ঠে বলে, ” আমাকে তোমার কাছে থাকতে খুব ভালো লাগে মা। আমাকে নিয়ে যাবে তুমি?”

রোজিনা রেণু মেয়ের ভালোবাসা দেখে একটু অবাক হয় না। ছোট থেকেই রোজিনা রেণুর সাথে এমন ব্যবহার করে মিরা।

–” মা তোমাকে সকালে কে খেতে ডেকেছিলো? ”

–” জামাই বাবা। বড্ড ভালো ছেলেটা। তুই ঘুম ছিলে বলে নিজে বাইরে গিয়ে খাবার নিয়ে এসেছে। আবার সবাইকে বলে গেছে আজ বাড়িতে রান্না করতে হবে না, বাইরে থেকে খাবার কিনে আনবে। ”

মিরা ব্যাপারটা নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখায় না। হয়তো বাইরে খাবার খেতে ইচ্ছে করেছে তাই কিনে এনেছে। সবকিছু নিজের মতো সাজিয়ে রঙিন করা উচিত নয়। পরে অনেক বেশি কষ্ট পেতে হয়। মিরা এ কষ্ট পেতে চায় না৷ রোজিনা রেণু তাড়াতাড়ি করে চলে যায়, বাড়ি গিয়ে তার অফিসে যেতে হবে। মিরা রাস্তায় পাশে দাঁড়িয়ে মা’য়ের যাওয়ার দৃশ্য দেখে, চোখ কোণ থেকে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে মিরার। শুষ্ক মাটি নিমেষেই তা শুষে নেয়। মিরার নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। কিছুই ভালো লাগছে না তার।

ঘরে গিয়ে জানালার আশেপাশে কিছু একটা দেখতে থাকে মিরা, মনে হচ্ছে কিছু খুঁজে চলেছে, কাঙ্ক্ষিত দুইটা কাগজের টুকরো দেখে ঠোটের কোনায় হাসি ফুটে ওঠে। তাড়াতাড়ি করে কাগজ দুইটা হাতে তুলে নেয়।

তার একটাতে লেখা-

” নিজের যত্ন নিতে শেখো, শুধু রাত দুপুর বেলা ছাঁদে দাঁড়িয়ে তারা দেখলে হবে? সকালে ঘুম থেকে উঠতে হবে, গাছে পানি দিতে হবে। এতো এলোমেলো হলে কি করে হবে শুনি?”

মিরা বুঝতে পারে না লোকটা কে! কি করে তাকে দেখতে পায়! তবে কেন জানি বড্ড ভলো লাগে মিরার। কেউ একজন আছে যাকে মিরা নিজের ভালো লাগা বলতে পারে। লোকটাকে অবশ্য মিরা দেখেনি, তবুও তার থেকে চিঠি পেতে বেশ ভালো লাগছে। দ্বিতীয় চিঠিতে লেখা –

” তোমার চোখের পানি, আর তোমার পাশে দ্বিতীয় কোনো পুরুষ আমায় বড্ড পোড়ায়। কেন এতো হিংসে হয় বলতে পারো?”

মিরা চিঠিগুলো পড়ে লজ্জা লাল হয়ে যায়, সারা মুখে লজ্জা মিশ্রিত হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়ে। দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ডাকে মিরা, এমন মনে হচ্ছে যেন কেউ তাকে সারাক্ষণ দেখেই চলেছে। কয়েক মুহুর্ত পরে নিজের কাজেই বিরক্ত হয় সে, চেনা নেই জানে নেই, অচেনা একটা লোকের এই তিনটা চিঠিতে এতো লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। চিঠি দুইটা একটা খাতার ভাঁজে রেখে দুপুরের রান্না করতে চলে যায়।

মিরার সারাদিন কেটেছে চিঠি আর আশরাফুলের কথা মনে করে। আশরাফুলের অতীত জীবনের প্রেম কাহিনী বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে, সব থেকে বেশি অবাক হচ্ছে ওই মেয়েটাকে নিয়ে, কি করে এতো মিল থাকতে পারে ও-র চেহারার সাথে। আছে মা’য়ের কাছে শুনে দেখলে তো মন্দ হয় না। মোবাইল বের করে মা’কে কল দেয়। দুই বার রিং হওয়ার পর রোজিনা রেণু কল রিসিভ করে।

–” আসসালামু আলাইকুম মা, কেমন আছো? ”

–” ওয়ালাইকুম আসসালাম। এইতো মা আছি। তুমি কেমন আছো?”

–” আমি যেমন থাকি। দুপুরে খেয়েছিস মা?”

–” হুম মা। তুমি খেয়েছো?”

রোজিনা রেণু দুপুরে খায়নি। মেয়ের বাড়ি থেকে এসে আর রান্না করা হয়নি, তাই দুপুরে খাওয়া হয়নি। তবুও মুখে বলে, ” হুম। “.

–” মা একটা কথা জানতে চাইবো?”

–” হ্যাঁ মা বল, কি বলবি?”

–” আমার কি কোনো যমজ বোন আছে?”

–” না রে, আমার কাছে আছে। রাতে কথা বলি। ”

মিরা কল কেটে দেয়। মা তো বললো তার যমজ বোন নেই, তাহলে কি করে ওই মেয়েটার সাথে এতো মিল মিরার!

রাতের আকাশে তারা ফুটে উঠেছে। মিরা আজও ছাঁদে দাঁড়িয়ে আছে। রহস্যময় মানুষটা এখন তাকে দেখছে নিশ্চয়ই। আশেপাশে উঁকি দিতে থাকে, কিন্তু তেমন কাউকে দেখতে পায় না। তবুও দাঁড়িয়ে থাকে, তার চোখজোড়া যেন কাউকে খুঁজে চলেছে, অচেনা অজানা এমন কেউ, যাকে মিরা বড্ড বেশি চিনতে চায়। একবারের মতো এক পলক দেখতে চায়। দূরে তাকিয়ে দেখে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কিছু করছে, ছেলেটার মুখে মোবাইলের আলো পড়ে শুধু মুখটা দেখা যাচ্ছে। অন্ধকারের ভিতর একটা ছায়া! এই কি তবে সে? মিরার কৌতূহল বেড়েই চলেছে। কিন্তু ছেলেটা অনেক দূরে, চাইলেও ডাক দেওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া মিরা তো তার নামও জানে না। এমনও নয় যে মিরা আর ছেলেটা পরিচিত। এ যদি অন্যকেউ হয় তবে অনেক ঝামেলা হয়ে যাবে। মিরার চোখে মুখে হতাশার ছাপ ফুটে ওঠে।

নিচ থেকে কেউ মিরার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ছাদে আসতে থাকে। কন্ঠ শুনে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় এটা আশরাফুল। আশরাফুল ছাঁদে এসে মিরার হাতে একটা ফুলের তোড়া ধরিয়ে দেয়। তারপর শান্ত গলায় বলে,” I am sorry for everything. ”

কথাগুলো বলে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না সেখানে, হনহন করে চলে যায়। মিতা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আশরাফুল ইদানীং অদ্ভুত ব্যবহার করছে মিরার সাথে!

চলবে

#আলোছায়া
পার্ট -৮
কলমে : #ফারহানা_কবীর_মানাল

কথাগুলো বলে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না সেখানে, হনহন করে চলে যায়। মিতা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আশরাফুল ইদানীং অদ্ভুত ব্যবহার করছে মিরার সাথে!

সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না, সেদিন পর প্রায় দুই মাস কেটে গেছে, আশরাফুল মিরার সাথে বেশ ভালোই কথা বলে, খাওয়ার টেবিলে মিরা রান্নার প্রশংসা করতে ভোলে না। মিরার এখন আশরাফুলকে নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই। অচেনা সে-ই ছেলেটা প্রতিদিন মিরাকে নতুন চিঠি দেয়, ভরসা দেয়। আজও মিরা সকাল থেকে অপেক্ষা করছে চিঠির জন্য, বেশ কয়েকবার ঘরে গিয়ে দেখে এসেছে কিন্তু কোনো চিঠি নেই। অপেক্ষার সময় যেন পার হতেই চায় না।

দুপুরে সকলের খাওয়া শেষ হয়ে গেছে, মিরা সবে মাত্র খেতে বসেছে এমন সময় আশরাফুল অফিস থেকে বাড়িতে আসে, আশরাফুল কখনো দুপুরবেলা বাড়িতে আসে না। আজ হঠাৎ চলে এসেছে, মিরা আশরাফুলের দিকে তাকিয়ে বলে, ” আপনি দুপুরে খাবেন?”

আশরাফুল মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দেয়, তারপর নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। মিনিট দশেক পর ফ্রেশ হয়ে খেতে আসে। মিরা বাড়তি খাবার রান্না করে না, কালে ভদ্রে খাবার বেশি থাকলেও আজ বাড়তি কিছুই নেই। মিরা নিজের খাবারটা রেখে বাকি ভাতগুলো পিছনের পুকুরে দিয়ে এসেছে, উপায় না পেয়ে নিজের প্লেটটা আশরাফুলের সামনে সাজিয়ে দিয়ে বলে, ” আপনি খেতে শুরু করেন। আমি ডিম ভেজে আনছি। ”

আশরাফুল আঁড়চোখে মিরার দিকে তাকায়, তারপর শান্ত গলায় বলে, ” তুমি খাবে না? আমার সাথেই বসে পড়ো। বেলা তো অনেক হলো। ”

মিরা কি জবাব দেবে ভেবে পায় না। হাতের আঙ্গুলে ওড়না পেঁচাতে থাকে।

আশরাফুল উত্তর না পেয়ে আবার প্রশ্ন করে, ” কি হলো তুমি খাবে না? আমি যখন আসলাম তখন তুমি খেতে বসছিলে তাহলে?”

–” আসলে আমার খাওয়া শেষ। আপনি খেয়ে নিন। আমি ঘরে যাই। ”

আশরাফুল মুচকি হেসে বলে, “জানো তো মিরা মিথ্যা কথা বলতে নেই। তুমি আমার সাথে একসাথে বসে খাবার খেতে চাও না, এটা বললেই তো পারো। অবশ্য তোমার আমার মুখ দেখাও উচিত না। ”

–” না মানে…”

মিরা কোনো জবাব খুঁজে পায় না। কি বলা উচিত বুঝতেও পারে না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। আশরাফুলের মুখে তখনও একটা হাসি লেগে রয়েছে, হয়তো বিদ্রুপের হাসি।

–” আচ্ছা মিরা আমি কি অনেক বেশি খারাপ?”

–” না তেমন কিছু না, আসলে আর খাবার নেই। আমি যে প্লেটে খেতে বসেছিলাম ওইটাই আপনাকে দিয়েছি। আমার প্লেট আপনাকে দিয়েছি শুনলে হয়তো রাগ করতেন তাই আর বলিনি। ”

আশরাফুল মুচকি হাসে, তারপর অন্য একটা প্লেটে নিয়ে তাতে সব খাবার অর্ধেক ভাগ করে। মিরার দিকে তাকিয়ে বলে, ” এবার এসো। এতো কাজ করে না খেয়ে থাকা উচিত নয়। ”

মিরা ভাবতেও পারেনি আশরাফুল এমন কিছু করবে, সে ভেবেছিলো হয়তো ও-র প্লেট আশরাফুলকে দিয়েছে জানলে আশরাফুল রাগ করবে, তাকে ছোটলোক বলে মারতে আসবে কিন্তু আশরাফুল খাবার ভাগভাগি করে খেতে চাইবে তা কখনো বুঝতে পারেনি। আশরাফুল দিন দিন অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছে। কত সাদামাটা একটা ছেলে, যে মেয়েকে বিয়ের রাতে অস্বীকার করেছে তার সাথে আজ খাবার ভাগ করে নিচ্ছে। দুনিয়ার মানুষগুলো কত অদ্ভুত।

–” তুমি কি আমার সাথে বসে খাবে? নাকি আমি উঠে যাবো। ”

মিরা চায় না আশরাফুল খাওয়া ছেড়ে উঠে যাক। এটা রেশমা বানু বা লাবণি শুনলে তাকে অনেক কথা শোনাবে, অশান্তি একদম ভালো লাগে না তার। তাই দেরি না করে একটা চেয়ার টেনে খেতে বসে পড়ে।

–” মিরা লাউ চিংড়ি রান্নাটা দারুণ হয়েছে। তুমি কিন্তু দারুণ রান্না করো। ”

মিরা মুচকি হাসে, তারপর প্লেটে হাত নাড়াচাড়া করে, খাবার মুখে তুলতে পারে না। হয়তো আগে কখনো আশরাফুলের সাথে এক টেবিলে খায়নি তার জন্য। আশরাফুলও ব্যাপারটা বুঝতে পারে, তাই মিরাকে জোর করে না, নিজের মতো খেয়ে চলে যায়। মিরাও খাওয়া শেষ করে ঘরে চলে যায়। এতোক্ষণে হয়তো লোকটা চিঠিটা রেখে গেছে, প্রতিদিন দুপুরে পরেই মিরা চিঠিটা হাতে পায়, জানালার পাশেই রাখা থাকে, এদিকে বাড়ির কেউ আসে না বলেই কেউ কখনো চিঠিটা হাতে পায়নি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো এখনও কেউ চিঠি রেখে যায়নি, মিরার মনটা বেশ খারাপ হয়। মন খারাপ করে ছাঁদে চলে যায় সে।

ছাঁদের উপর বেশ কয়েক রকমের ফুল ফলের গাছ। আশরাফুল নিজের হাতে লাগিয়েছে সবকিছু, মিরা ছাঁদে গিয়ে দেখতে পায় আশরাফুল কিছু পোড়াচ্ছে, আগুনের শিখার উপর দিয়ে কালো ধোঁয়া আকাশের ওঠে যাচ্ছে, আশরাফুল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে, চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে কপল ভিজিয়ে দিয়েছে আশরাফুলের। মিরা অবাক হয়, এই ছেলেটাও কাঁদতে পারে। যে কিনা মিরাকে এতো কাঁদিয়েছে সে-ও আজ কাঁদছে। হয়তো ভাগ্যই এমন হয়। মিরা উপস্থিতি বুঝতে পেরে আশরাফুল চোখ মুছে ফেলে তারপর শান্ত গলায় বলে, ” কিছু বলবে তুমি?”

মিরা মাথা নাড়িয়ে বলে, ” না এমনি ছাঁদে এসেছিলাম, ঘরে ভালো লাগছিলো না বলে।”

–” মিরা জীবন সিনেমার থেকেও অদ্ভুত হয় তাই না বলো? সিনেমা তো আমরা তিন ঘন্টা দেখে শেষ করে ফেলি, তবে জীবনে প্রতি মুহূর্তে কষ্ট পেতে হয়।”

–” আপনি এমন কেন বলছেন? আপনার জীবনে তো কোনো কষ্ট নেই। কত সুন্দর আপনার জীবন, এতো বড় বাড়ি, সকলে আপনাকে কত ভালোবাসে। এমন জীবন তো সবাই পায় না”

আশরাফুল তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে, ” তুমিও আমাকে ভালোবাসো নাকি?”

মিরা নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আশরাফুলকে সে কখনো ভালোবাসতে পারে না। এই ছেলেটা মিরার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে, সেদিন মিরাকে বিয়ে করে নরক যন্ত্রণা বরণ করতে হয়েছে মিরাকে, শশুর শাশুড়ি লাবণি কত অত্যাচার করেছে ওকে, কখনো প্রতিবাদ করেনি, পাশে এসে দাঁড়ায়নি, এমনি স্ত্রী’র মর্যাদা পর্যন্ত দেয়নি। এমন মানুষকে ভালোবাসা যায় না, শুধু ঘৃণাই করা যায়। মিরার নিরবতা আশরাফুলকে বিচলিত করে না, সকলেই নিরবতাকে সম্মতি হিসাবে ধরে নেয়, তবে আশরাফুল নিশ্চিত এখানে উত্তরটা না। তাকে মিরার ভালোবাসার কোনো প্রশ্নই আসে না। আশরাফুল মিরার ভালোবাসা আশাও করে না।

শান্ত গলায় বলে, ” জানো মিরা সব জিনিস যেমন দেখা যায় তেমন হয় না, সমুদ্র কে-ই দেখো, কত সুন্দর, কত বিশালতা তার, হাজার হাজার মানুষ সমুদ্র পাড়ে বেড়াতে যায়, পানিতে সাঁতার কাটে, তবে সে-ই মাঝিই এর নিষ্ঠুরতা জানে যে সাগরে পড়েছে, খুব কাছ থেকে একে উপভোগ করছে, সে-ই নাবিক এর নিষ্ঠুরতা জানে যার শেষ সম্বলটুকু সাগর জলে বিলীন হয়ে গেছে। আমার জীবনটাও অনেকটা তেমন, দূর থেকে অনেক বেশি সুন্দর তবে কাছ থেকে আমি এর নিষ্ঠুরতা জানি। ”

মিরা অবাক হয় না। বরং কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করে, ” কি এতো নিষ্ঠুরতা আপনার জীবনে?”

–” অনেক বিশাল কাহিনী। তুমি শুনবে নাকি?”

মিরা উত্তর দিতে দেরী করে না। চট করে বলে বসে, ” হ্যাঁ শুনবো। ”

আশরাফুল বলতে শুরু করে তার জীবন কাহিনী, মিরা উৎসুক শ্রোতার মতো আশরাফুলের দিকে চেয়ে থাকে। দূরের আকাশে সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে, তবুও সন্ধ্যা নামতে বেশ দেরী।

–” মিরা এই যে দেখো কিছু জিনিসকে আগুনে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে ফেলছে এগুলো আমার ভালোবাসার চিহ্ন। অনেক যত্ন করে রেখেছি এতোদিন, আজ কেন জানি আর রাখতে ইচ্ছে করলো না। ”

–” যাকে ভালোবাসা হয় তার জিনিস তো যত্ন করে রাখতে হয়, আমিও তার চিঠি যত্ন করে রেখেছি।”

তার চিঠি যত্ন করে রেখেছি কথাটা আস্তেই বলে মিরা তবুও আশরাফুল হয়তো শুনতে পেয়েছে তাই কপাল কুঁচকে তাকালো মিরার দিকে, কিন্তু কিছু বললো না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। মিরাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। নিরবতা ভেঙে মিরা প্রশ্ন করে, ” আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে ছেড়ে দিলেন কেন?”

ম্যানিব্যাগ থেকে মিরার মতো দেখতে মেয়েটার ছবিটা বের করে কয়েক টুকরো করলো আশরাফুল তারপর আগুনে পুড়িয়ে দিতে দিতে বললো, ” বেইমানদের মনে রাখতে হয় না। ”

–” আমি কিছু বুঝতে পারলাম না। ”

–” বুঝতে হলে তো তোমাকে সবটা শুনতে হবে। তাই না? ”

–” হুম। ”

–” মিরা আমি তখন সবে মাত্র এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, পড়াশোনা নেই, রেজাল্টও বের হয়নি। কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সারাদিন ঘুরে বেড়ানো আর দিন শেষ বই পড়া, আড্ডা দেওয়া, সকলের সাথে গল্প করা। সেঁজুতি নামের একটা মেয়ে আমার ক্লাসমেট ছিলো। একসাথে পড়তাম স্কুলে, কলেজে। কলেজে যাওয়া হতো না বলে ও-র সাথে তেমন যোগাযোগ হতো না। আমরা বন্ধুও ছিলাম না। একদিন হঠাৎ রাস্তায় ও-র সাথে দেখা হলো। হাতে ছোট বাচ্চাদের বই নিয়ে কোথাও যাচ্ছে। আমাকে দেখে ডাক দিলো, আমি তখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রথমবারের মতো সিগারেট ঠোঁটে লাগিয়েছি্। সুখটান দেওয়ার আর সুযোগ পেলাম না।

–” আশরাফুল এদিকে শোন। ”

ও-র ডাক শুনে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে ও-র কাছে গেলাম। সেঁজুতি হয়তো আমাকে সিগারেট ফেলতে দেখে ফেলেছিলো। ও-র কাছে যাওয়ার সাথে সাথে বলে উঠলো, ” দেখ তুই রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খেলে কিন্তু আমি কাকি মা-কে বলে দিবো। ”

ও-র কথায় বড্ড মেজাজ খারাপ হয়েছিলো। কে কোথা থেকে আসছে আমার মা’কে নালিশ করতে, রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বললাম, ” তুই কে রে যে আমার মা’কে বলতে যাবি। তুই কি আমার মা’য়ের দাসীবাঁদী নাকি রে?”

সেঁজুতি মুচকি হেসে বললো, ” না রে পাগল, আমি তো তোর বড় ভাবি। তোর ভাইয়া আমাকে অনেক পছন্দ করে, কত্ত চিঠি দিয়েছে আমাকে জানিস তুই?”

সেঁজুতি কথায় আমি শক খেলাম বড়সড় রকমের কারণ আমার কোনো ভাই নেই। লাবণি তখনও বেশ ছোট। মুখ বেঁকিয়ে বললাম, ” দেখ আমার কোনো বড় ভাই নেই। বাজে কথা বলিস না তো। নিজের কাজে যা। ”

–” দেখো ছেলের রাগ, কতোদিন বয়স তোর যে এখন সিগারেট টানছিস? আমার মতো ভালো কাজ কর পারলে। ”

–” কি এমন মহান কাজ করিস তুই শুনি? আর তাছাড়া তুই তো মহান কাজ করবি কারণ কয়েকদিন পর তোর বিয়ে হবে, তুই তো বুড়ি হয়ে যাবি তখন। ”

সেঁজুতি আমার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে নিজের কাজে চলে গেলো। আমিও ও-কে মনে মনে গালাগালি দিতে দিতে বাড়িতে আসলাম। কত শখ করে সিগারেট খেতে গেছিলাম, মাটি করে দিলো একদম। পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি সেঁজুতি সোফায় বসে আছে আর মা’য়ের সাথে কথা বলছে, ও-কে এখানে দেখে আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করলো। এই মেয়ে এতো ডেঞ্জারাস তা তো আগে জানা ছিলো না। আমি ওঁদের কাছে যাওয়ার আগেই সেঁজুতি কাঁধে ব্যাগ তুলে বেরিয়ে গেলো। এদিকে আমি তখন মহা টেনশনে আছি।

চলবে