#আলোছায়া
পার্ট -৯
কলমে : #ফারহানা_কবীর_মানাল
পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি সেঁজুতি সোফায় বসে আছে আর মা’য়ের সাথে কথা বলছে, ও-কে এখানে দেখে আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করলো। এই মেয়ে এতো ডেঞ্জারাস তা তো আগে জানা ছিলো না। আমি ওঁদের কাছে যাওয়ার আগেই সেঁজুতি কাঁধে ব্যাগ তুলে বেরিয়ে গেলো। এদিকে আমি তখন মহা টেনশনে আছি।
মা’য়ের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলাম, ” মা ওই মেয়ে তোমাকে কি বলে গেলো?”
–” কেন তুই চিনিস নাকি ও-কে? মেয়েটা বড্ড ভালো রে৷ ”
–” আমাদের কলেজেই পড়তো। তোমাকে কিছু বলছে নাকি? ”
মা মুচকি হেসে বললো, ” না রে বাবা। আমি এতোগুলো বাজারের ব্যাগ তুলে আনতে পারছিলাম না, আবার শাড়ি পায়ে জড়িয়ে পড়ে গেছিলাম, মেয়েটা দূর থেকে দেখে দৌড়ে এসে আমাকে উঠালো, তারপর ব্যাগগুলো বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে গেলো। এমন ভালো মেয়ে এখন পাওয়া যায় না। ”
আমি মুচকি হেসে চলে এলাম। যাক শয়তানি আমার নামে কিছু বলেনি। কিন্তু এদিকে ও কোথায় যাচ্ছে? ও-র বাড়ি তো এদিকে নয়। কি জানি, থাকবে কোনো কাজ। টোটোকোম্পানির চাকরিটা বাঁচাতে রেডি হয়ে বের হলাম। দরজার কাছে আবারও মা’য়ের সাথে দেখা।
–” সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াস? মেয়েটার মতো ভালো কিছু তো করতে পারিস নাকি?”
–” কোন মেয়েটা?”
–” আরে ও-ই মেয়েটা, সকালে যাকে দেখলি। তাড়াহুড়ায় নামটা জানতেই ভুলে গেছি। ”
–” কি ভালো কাজ করে শুনি?”
–” ওইতো সামনের পার্কে ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়ায়, আমার ছেলেটা যে কেন এমন ভালো হলো না কে জানে!”
–” তো আমি কি খারাপ নাকি?”
–” না না বাবা। ”
মা’য়ের উপর রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। সব হয়েছে ওই সেঁজুতিটার জন্য। কি এমন ভালো কাজ করে আমি দেখতে যাবো এখন। হয়তো প্রেম করছে পার্কে বসে আর এদিকে ভালো সেজে বেড়ানো হচ্ছে। পার্কে গিয়ে দেখলাম সেঁজুতি কতগুলো বাচ্চাকে নিয়ে কিসব করছে, বাচ্চাগুলো গোল করে ঘিরে রেখেছে ও-কে। আমি ও-র কাছে গিয়ে বললাম,
” কি রে তুই সকাল সকাল আমার মা’য়ের কাছে এমন ভালো সাজতে গেলি কেন? দেখ আমার তোকে পছন্দ না। আর আমার মা’য়ের আর কোনো ছেলেও নেই। তা-ই আমার মা’কে তেল দিয়ে লাভ নেই। ও বাড়িতে তোর বিয়ে হবে না। ”
সেঁজুতি কয়েক মিনিট ভেবে বললো, ” সকালের মহিলাটা তোর মা ছিলেন? ”
–” হ্যাঁ। ”
–” আমি যদি জানতাম ওইটা তোর মা তাহলে আরো বেশি করে পটিয়ে আসতাম। ভাবি নয় তোর বউ হতে… হা হা হা! ”
সেঁজুতি হয়তো কথাগুলো মজা করে বলেছিলো তবে আমি সিরিয়াসভাবে নিয়েছিলাম। এরপর রোজ পার্কে গিয়ে ও-র সাথে দেখা করা, অনেক সময় বসে গল্প করতাম। মাস খানেক পর একদিন সেঁজুতিকে প্রশ্ন করলাম, ” একটা কথা বলবি?”
–” হুম, বল কি কথা।”
–” তুই কি সেদিন কি ওই কথাগুলো সত্যি বলেছিলি? ”
–” কোন দিন? কি কথা?”
–” যেদিন আমি প্রথম এই পার্কে এসেছিলাম, ”
–” তুই কবে প্রথম এসেছিস আমি কি জানি? তোর বাড়ি তো এখানে। ”
–” যেদিন এখানে তোর সাথে দেখা হয়েছিলো, ওই আমার মা’কে শাশুড়ি, ওই কথাটা। ”
–” ওইটা তো কথায় কথায় মজা করে বলেছিলাম। ”
–” ওহ্, সরি। ”
খুব খারাপ লেগেছিলো সেদিন, সরি বলেন সেখান দিয়ে চলে আসছিলাম এমন সময় সেঁজুতি আমাকে পিছন দিয়ে ডাক দিলো। তারপর
–” কেন তুই কি আমাকে পছন্দ করিস?”
–” ভালোবাসি! ”
কথাটা আস্তে বলেছিলাম, তবে সেঁজুতি শুনে ফেলেছিলো। মুখ কালো করে বললো, ” একটু ওদিকে চল তো। ”
ভেবেছিলাম হয়তো থাপ্পড় দিবে, কিন্তু আমার ভাবনা ভুল প্রমাণ করে দিয়ে ও আমার দুই কাঁধে হাত রাখলো, তারপর চোখ বন্ধ করে আমার ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে একটা চুমু এঁকে দিলো আমার ঠোঁটে, তারপর দুইহাত দিয়ে ও-র মুখ ঢেকে দৌড়ে পালিয়ে গেলো। কতটা ভালো লেগে ছিলো বলে বোঝাতে পারবো না। তারপর থেকে দু’জনের পথ চলা শুরু, রোজ কথা বলা, দেখা করা, একদিন ও ও-র মা’য়ের কাছে ধরা পড়ে গেলো। ও-র বাড়ি দিয়ে ওর বিয়ে ঠিক করলো। তখন সবে মাত্র অনার্স ২য় বর্ষে পড়ি আমরা দুইজন। ঠিক করলাম দুইজন পালিয়ে যাবো। দূরে কোথাও গিয়ে টিউশনি করে সংসার চালাবো, অভাব থাকলেও কষ্ট থাকবে না। কোথায় যাবো, কিভাবে যাবো কিছুই জানতাম না। এইসব নিয়ে কথা বলতেই সেদিন সেঁজুতিকে পার্কে আসতে বলেছিলাম।
সেঁজুতি এসেছিলো, আমিও গেছিলাম। কিন্তু সব শেষ তো সুখের হয় না। একটা মোটরসাইকেল সেঁজুতিকে ধাক্কা দিলো, সেঁজুতি মাটিতে পড়ে গেলো। আমি এ পাশ দিয়ে দৌড়ে যেতে গিয়ে পা জড়িয়ে পড়ে গেলাম। একটা বাস সেঁজুতিকে চাপা দিয়ে ও-র পর দিয়ে চলে গেলো। আমি দৌড়ে গিয়ে ও-কে জড়িয়ে ধরলাম। ও ততোক্ষণে অজ্ঞান হয়ে গেছে। একটা বন্ধুকে কল দিয়ে আসতে বললাম, তারপর ও-কে নিয়ে জেলা হাসপাতালে চলে এলাম। ডাক্তাররা বললেন যে অবস্থা ভালো না বিভাগীয় হাসপাতালে নিয়ে যাও। আমাদের কিছু করার নেই। দেরী না করে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ও-কে নিয়ে গেলাম। বেডে নিবে এমন সময় ও-র জ্ঞান আসলো। আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ” একটা কিস করবে আমাকে?”
আমি ও-কে জড়িয়ে ধরলাম। ততো সময় ও-কে নিতে চলে এসেছে, ও চোখ মেলে কিছু সময় চারদিকে দেখলো তারপর চিরতরে চোখ বন্ধ করে নিলো। এরপর থেকে আমার আর কোনো জ্ঞান ছিলো না, যতো সময় অজ্ঞান থাকতাম ততো সময় ভালো থাকতাম, জেগে উঠলে শুধু কাঁদতাম। ছয়দিন পর একটু স্বািহলাম। ও-র কবরে মাটি দিয়ে আসলাম। সেঁজুতির বাড়ি দিয়ে আমার নামে কেস করলো, খুনের! পরবর্তীতে ওঁরা কেস তুলেও নিয়েছিলো, কারণটা আমি জানি না। তারপর আর কি বড্ড এলোমেলো হয়ে গেলাম। খেতাম না, রাতে ঘুম আসতো না। চোখ বন্ধ করলে ও-র মরার দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠত। এভাবেই দিন চলে যেতে লাগলো।
মিরা এতো সময় নিরবে সবকিছু শুনলেও এবার বলে উঠলো, ” তার তো কোনো দোষ ছিলো না। আপনি কেন নিজেকে কষ্ট দিবেন? ”
আশরাফুল মুচকি হেসে মিরার দিকে তাকালো। মিরার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। কপল দুইটা পানিতে ভিজে গেছে একদম। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে আছে। আশরাফুল হাত বাড়িয়ে মিরার চোখ মুছে দিলো। মিরা ইতস্তত হয়ে নড়েচড়ে বসলো।
–” আপনার জীবন তো একদম সিনেমার মতো। ”
–” তোমার কাছে হয়তো নাটক সিনেমার মতো কিন্তু এটাই আমার জীবন। ”
মিরার কেমন যেন খারাপ লাগছে, বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না, কিছু জড়িয়ে ধরে কাঁদলে হয়তো একটু ভালো লাগবে। তাই ঘরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই আশরাফুল বলে উঠলো, ” চলে যাচ্ছো? আমার জীবন কাহিনী শুনবে না?”
মিরা আবারও বসে পড়লো। তারপর নিরাশ হয়ে বললো, ” এখনো শেষ হয়নি?”
–” না রে! কষ্টের জীবনের শুরুই তো এখান থেকে। ”
–” ওহ্!”
এভাবে দিন কাটতে থাকে, ঘুমের ঔষধ খেলে হয়তো কখনো কখনো ঘুম আসতো। সবকিছুর ভিতর একটা জিনিস আমার খেয়াল ছিলো যে আমি বড় ছেলের বাপের, পড়াশোনা আগের মতোই চালিয়ে যেতে লাগলাম, কিন্তু পড়তে পারতাম না, চোখের পানিতে বই ভিজে যেতো, পরীক্ষার খাতায় কি লিখবো খুঁজে পেতাম না, এভাবে সময় চলে যেতে লাগলো, এক দিন দুই দিন, এক বছর দুই বছর, এভাবে তিন বছর পার হয়ে গেলো। পড়াশোনা খুব বেশি ভালো হচ্ছিল না, তখনই আমার জীবনে আসে মিতালি। যাকে একদম তোমার মতো দেখতে, মেয়েটা অদ্ভুত ভাবে আমার সবকিছু বুঝে যেতো, আমার ছোট ছোট কষ্ট গুলো খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারতো, প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর আস্তে আস্তে প্রেম, সেখান দিয়ে কবে জানি ভালোবেসে ফেললাম। মিতালির বয়স তোমার মতো, আমাদের বয়সের পার্থক্য থাকলেও সম্পর্কে তেমন কোনো সমস্যা হতো না। ও-কে নিজের করে পাওয়ার জন্য আবারও মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম। বেকার বলে সেঁজুতিকে ও-র বাড়ি থেকে আমার সাথে বিয়ে দিতে চায়নি। মিতালি যেন সেভাবে হারাতে না হয় তাই দিন-রাত কষ্ট করতাম। জীবনটা আবারও নতুন রঙে ভরে গেলো।
আমি যেদিন চাকরি পেয়েছিলাম, কতটা খুশি হয়েছিলাম তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না, এবার মিতালির বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব দিবো, আগের ভুলটা আর হবে না। বেশ কয়েকদিন ধরে মিতালির মোবাইলটা নষ্ট হয়ে গেছিলো। আমাদের তেমন যোগাযোগ হতো না। কথা বলতে না পারলে আমার দম আটকে যেতো মনে হয়। তাই সেদিন বাবার কাছ দিয়ে টাকা নিয়ে ও-র জন্য একটা মোবাইল কিনলাম, কথা না বলতে পারলে আমার কিছুই ভালো লাগতো না। ও-র জন্য কেনা মোবাইল নিয়ে পার্কে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মিতালি প্রায় দিন এখানে ঘুরতে আসে বিকালে, যখন কথা হতো তখন মিতালিই বলেছিলো। ওদের পাড়াতে আমি আগে কখনো যাইনি, সেদিনই প্রথম গেছিলাম সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য, মনে মনে কত কিছু ভেবেছিলাম, মিতালি কতোটা খুশি হবে আমাকে দেখে, ভাবতেই মনটা আনন্দে ভরে উঠছিলো।
চলবে
#আলোছায়া
পার্ট -১০
কলমে : #ফারহানা_কবীর_মানাল
মিতালি প্রায় দিন এখানে ঘুরতে আসে বিকালে, যখন কথা হতো তখন মিতালিই বলেছিলো। ওদের পাড়াতে আমি আগে কখনো যাইনি, সেদিনই প্রথম গেছিলাম সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য, মনে মনে কত কিছু ভেবেছিলাম, মিতালি কতোটা খুশি হবে আমাকে দেখে, ভাবতেই মনটা আনন্দে ভরে উঠছিলো।
আনন্দগুলো বড্ড ক্ষীণ স্হায়ী হয় মিরা। সেদিন পার্কে মিতালিকে খুঁজতে খুঁজতে একটু নির্জন জায়গায় চলে গেছিলাম। পরে ভাবলাম এখন ফাঁকা জায়গায় মিতালি আসবে না, তাই ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই চোখে পড়লো একজন পুরুষ কোনো রমনীর কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, শাড়ি আঁচল দিয়ে হাত ঢেকে গেলেও গাছের পাশ দিয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, প্রথমে মনে করেছিলাম হয়তো কেউ একান্ত সময় কাটাচ্ছে, আমার এসব দেখা উচিত না কিন্তু পরবর্তীতে দেখলাম ওইটা মিতালি। মিতালি আমাকে দেখে চমকে গেলেও নিজেকে সামলে প্রশ্ন করলো, ” আশরাফুল তুমি এখানে কেন?”
আমি শান্ত গলায় জবাব দিলাম, ” তোমার সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। ”
মিতালি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। মিতালির সাথের ছেলেটা দৌড়ে আমাকে মারতে আসলো আমার শার্টের কলার চেপে ধরে বললো, ” তোর এতো সাহস যে আমার বউয়ের সাথে দেখা করতে আসিস?”
আমি মুচকি হেসে বললাম, ” আর যাই হোক মিতালি আপনার স্ত্রী নয়। কেউ স্ত্রীকে নিয়ে পার্কের নির্জন জায়গায় নোংরামি করে না। ”
কথাগুলো বলে লোকটার হাত শার্ট থেকে সরিয়ে নিলাম। আর মিতালিকে প্রশ্ন করলাম, ” কে এই ছেলেটা?”
মিতালি ভিতু গলায় বললো, ” এটা আমার কাজিন। ”
ছেলেটা মিতালির উপর চিৎকার করে বলে উঠলো, ” সময় করে হোটেলে যেতে পারো না নাগর সামনে এলে কাজিন। ”
আমার কিছু বুঝতে বাকি রইলো না। চুপচাপ চলে এলাম। শরীরটা কেমন যেন অবশ হয়ে আসছিলো। মিতালি এমন হতে পারে বা এমন করতে পারে আমি কখনো বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম মিতালি আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, নিজের ভুল বুঝতে পারবে। মিতালি একবার আমার কাছে ফিরে আসলে আমি সবকিছু ভুলে ও-কে নিজের করে নিতাম কিন্তু এমনটা হয়নি। ওই দিনের পর আরো সাতদিন কেটে গেলো। মিতালি আমাকে কোনো প্রকার কল বা এসএমএস দেয়নি। ওই সময়টাতে মিতালিকে ছাড়া আমি কোনো কিছুই ভাবতে পারতাম না। তাই নিজেই বেহায়ার মতো মিতালি কে কল দিলাম।
–” মিতালি কেমন আছো?”
–” অনেক বেশি ভালো আছি। শোনো আশরাফুল তুমি আমার সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি, তোমাকে নয়। ”
–” এতোদিন কি বলেছিলে আমাকে?”
–” তুমি কষ্ট পেতে একা একা তা-ই সহানুভূতি দেখিয়েছিলাম। ”
–” এখন কি আমি কষ্ট পাচ্ছি না?”
–” জানি না। তোমার এতো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় আমার নেই। ”
–” কেন এমন করলে? এটা শেষ প্রশ্ন। ”
–‘ কতদিন হয়ে গেছে তোমার কোনো চাকরি হয়নি। তুমি আমাকে সামান্য একটা মোবাইল কিনে দিতে পারো না, আর ওই ছেলে আমাকে আইফোন কিনে দিয়েছে। আমি ও-র সাথেই খুব সুখী। আমি ও-কে বিয়ে করবো। ”
–” যে ছেলে তোমাকে বিয়ের আগে হোটেলে নিয়ে যায় সে তোমাকে বিয়ে করবে বলে তোমার মনে হয়?”
–” তুমি কে এতো কথা বলার? আর কখনোই আমাকে বিরক্ত করবে না। ”
মিতালি সেদিন কল কেটে দেয়। এরপর হাজার বার ও-র সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি। আমাদের বিয়ের সাতদিন আগে মিতালি আমাকে ডেকে পাঠায়৷ জানি না কেন তখন এতো পাগল ছিলাম। মিতালির ডাকে ছুটে গেছিলাম ওর কাছে। ভেবেছিলাম হয়তো মিতালি ও-র ভুল বুঝতে পেরে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমাকে আবার আগের মতো ভালোবাসবে। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। মিতালি ওইদিন আমাকে ডেকে নিয়ে ও-র বয়ফ্রেন্ড আর কিছু ছেলেদের দিয়ে আমাকে মারে, একদম মেরেই ফেলতে চাইছিলো কিন্তু পরে কি মনে করে আর মারেনি৷ যাওয়ার আগে ওয়ার্নিং দিয়ে গেলো জানি মিতালিকে বিরক্ত না করি। তাহলে পরের বার আমাকে মেরে ফেলবে। মিতালিও আমাকে অপমান করতে ভোলেনি। সবার সামনে বললো, ” তোর মতো একটা ছোটলোক আমার পিছনে কি করে আসতে পারে। আমার রূপ দেখেছিস তুই? এই রূপের যোগ্য তুই না। একটা চাকরি খুঁজে পায় না আসে আমার সাথে লাইন মারতে। ফাউল পোলাপান। ”
মাটিতে শুয়ে ছিলাম কিছু সময়। উঠায় শক্তি ছিলো না। যে মিতালি ভেঙে যাওয়া আমিকে জোড়া লাগিয়েছে, আমি সামান্য ব্যাথা পেলে যে ব্যাকুল হয়ে যেতো আজ সে নিজে দাঁড়িয়ে আমাকে মার খাওয়ালো। কতোটা বদলে যায় মানুষ। এরপর কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। পরে রাস্তার লোকজন তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেছিলো। বাড়িতে কল দিয়ে বলছিলাম আমি অফিসের কাজে বাইরে আসছি। ওদের টেনশনে রাখতে চাইনি। সাতদিন পর হাসপাতাল দিয়ে বাড়ি ফিরে জানতে পারি সেদিন নাকি আমার বিয়ে। অনেক ঝগড়া করেছি, কিন্তু আব্বু কিছু শুনতে চায়নি। পরে ভেবেছিলাম কার জন্য বসে থাকবো, বাড়ির লোকের মনে কষ্ট দিয়ে কি লাভ! তাই ওদের সাথে গেছিলাম। বিয়ের আগে তোমার সাথে অনেক দেখা করার চেষ্টা করেছি, কথা বলতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি।
মিরার মনে পড়ে সেদিন আশরাফুল অনেকবার বলেছিলো আমি একটু পাত্রীর সাথে কথা বলবো কিন্তু রোজিনা রেণু উত্তরে বলেছিলো বিয়ে হলে সারাজীবন কথা বলতে পারবে।
আশরাফুলের চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে, এক হাত দিয়ে পানি মুছে আবারও বলতে শুরু করে,
বিয়ের দিক সব থেকে বড় ধাক্কা খেয়েছিলাম তোমাকে দেখে, কারণ তোমাকে দেখতে একদম মিতালির মতো। একটা পার্থক্য আছে বটে কিন্তু সেদিন অতো খেয়াল করিনি। আমি জানি না আমার জীবনটা কেন এমন হলো। বাসরঘরে তোমাকেই মিতালি ভেবেছিলাম, পরে জানলাম তুমি অন্যকেউ। শেষ কথাগুলো বলতে কন্ঠ জড়িয়ে আসে। আশরাফুল উঠে দাঁড়ায়, মিরার কেন জানি বড্ড কষ্ট হচ্ছে আজ। যে মানুষটা এতোদিন দোষী ভেবে এসেছে আজ তার জীবন কাহিনী মিরাকে বড্ড আঘাত করছে। মিরা আর সহ্য করতে পারে না। আশরাফুলকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে দেয়। আশরাফুল একটু অবাক কিন্তু কিছু বলে না। মিরার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে, প্রথম কোনো পুরুষের এতোটা কাছাকাছি এসেছে মিরা, আশরাফুলের উষ্ণতা অনুভব করছে তবে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। মিমিট পাঁচেক পর মিরা বুঝতে পারে এমনটা করা উচিত হচ্ছে না। তবুও আশরাফুলকে ছেড়ে দেয় না, জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। আশরাফুল নিজেই মিরার দুই বাহু ধরে মিরাকে মুক্ত করে নিজের বুকের উপর দিয়ে, তারপর দুইহাত দিয়ে মিরার দুই কপল মুছে দেয়। চোখের পানিতে গাল ভিজে একাকার হয়ে গেছে মেয়েটা।
শান্ত গলায় বলে, ” অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তাই না?”
মিরা মাথা নাড়িয়ে না বলে, তারপর কান্না জড়িত কন্ঠে প্রশ্ন করে, ” আপনি কেন কাঁদছেন? সেঁজুতি কথা বলার সময় তো কাঁদতে দেখিনি। ”
আশরাফুল হাসে, তারপর বলে, ” বেইমান দের জন্যই আমি বেশি কষ্ট পাই। চোখের পানি বেইমানরা বেশি ঝরায়। তাদের জন্য তেমন কষ্ট হয় না যারা আমাদের সত্যিকারের ভালোবাসে। আমিও ব্যতিক্রম নই রে। ”
মিরা কিছু বলতে পারে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। আশরাফুল ছাঁদ থেকে নেমে নিচে চলে যায়। চারদিকে তখন অন্ধকারে ভরে গেছে, কখন সন্ধ্যা নেমেছে মিরা জানে না। ধীর পায়ে ঘরে চলে যায়। সবকিছু এলোমেলো লাগছে না, মিরা যাকে সব থেকে বেশি ঘৃণা করে সে-ই মানুষটার জন্যই কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। এতোটা কষ্ট পেয়েও ছেলেটা কত সুন্দর হাসে। মিরা কি পারতো এমন হলে ঘুরে দাঁড়াতে? আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় মিরা, মিতালিকে তার মতে দেখতে কেন? সে কি অন্য রকম হতে পারতে না। আশরাফুল মিরাকে দেখলে কেন ঘৃণা জন্ম নিবে, আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে মিরা।
জানালায় উপর একটা সাদা কাগজ পড়ে আছে। হয়তো অচেনা লোকটা চিঠি দিয়েছে, আজ মিরা চিঠির প্রতি আর্কষণ অনুভব করে না, তবুও গিয়ে চিঠিটা হাতে তুলে নেয়। অন্য কেউ দেখলে আবার কি সমস্যা হয়!
চিঠিটা পড়তে ইচ্ছে করছে না মিরার, বালিশের নিচে রেখে দেয়। কিছু সময় একা একা কাঁদতে থাকে। তারপর স্বাভাবিক হয়ে হাত মুখ ধূয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। বেশ রাত হয়ে গেছে সবাইকে খেতে দিতে হবে, সেদিন খাবার টেবিলে আশরাফুল আসে না। মিরা সাহস করে আশরাফুলের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। দুপুরে ওইটুকু ভাত খেয়েছে এখন রাতে না খেলে হয়তো শরীর খারাপ করবে। আশরাফুলের ঘরের দরজা খোলা, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মিরা কয়েকবার ভিতরে যাওয়ার অনুমতি চায়। কিন্তু কেউ সাড়া দেয় না। মিরা দরজার পর্দা সরিয়ে দেখে আশরাফ ঘুমিয়ে আছে। বালিশের সামান্য অংশ ভিজে গেছে। হয়তো কাঁদ ছিলো সে। মিরা সাহস করে ঘরের ভিতর গিয়ে আশরাফুলের গায়ে কম্বল টেনে দেয়। তারপর লাইট অফ করে বেরিয়ে আসে। মিরা এমন ব্যবহারের কারণ মিরা বুঝতে পারছে না। তবে এই মানুষটার জন্য বড্ড খারাপ লাগছে তার। কতটা কষ্ট নিয়ে ছেলেটা ঘুরে বেড়ায়, ছাড়া আড়ালে এতো কষ্ট লুকিয়ে রাখে মানুষ। আশরাফুল রাতে খায় না, মিরাও কেন জানি না রাতের খাবার না খেয়ে শুয়ে পড়ে। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে মিরা কিন্তু ঘুম আসছে না। আশরাফুলের বলা কথা মনে পড়ছে। কতটা কষ্ট পেয়েছে আশরাফুল তা অনুভব করার চেষ্টা করছে। হঠাৎ মিরার চিটির কথা মনে পড়ে, চিঠিটা বের করে দেখে, তাতে লেখা রয়েছে –
প্রিয়তমা মিরা,
তোমার ভাগ আমি কাউকে দিবো না প্রিয়তমা। তোমার স্বামী আশরাফুলকেও নয়। তুমি একান্তই আমার, নিজস্ব সম্পত্তি! তুমি কখনো আমার চিটির উত্তর দেও না। তবে আজ আমি চাই তুমি এটার উত্তর দেও। অপেক্ষায় রইবো।
তোমার অচেনা ভালোবাসা,
চলবে