আষাঢ়ের দোলনচাঁপা পর্ব-০৮

0
316

#আষাঢ়ের_দোলনচাঁপা
#পর্বঃ৮
#Jhorna_Islam

“দোল দোল দোলনি,
রাঙা মাথার চিরুনি!
এনে দিবো হাঁট থেকে
মান তুমি করো না।”

দোলন মুখ ফুলিয়ে রুমের দরজা দিয়ে বসে আছে। সেই কখন থেকে সুমন ডেকে যাচ্ছে কিন্তু মেয়েটা দরজা খুলছে না।সুমন অনেক করে ডেকেও যখন দরজা খুলাতে পারেনি তখন এরকম সুর তুলে গান গেয়ে চলেছে। সুমনের গানে দোলন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে, একেইতো সকালে বলে গেছে আজ দোলনচাঁপা ফুল আনবে। দোলন কতো আশা নিয়ে বসে ছিলো তার ভাই তার জন্য দোলনচাঁপা ফুল নিয়ে আসবে। সারাদিন সুমনের জন্য অপেক্ষা করে দোলন। সুমন যখন বাড়িতে আসে দোলন নিজে দরজা খুলতে যায় আনন্দের সাথে। দোলন আশায় ছিলো সে দরজা খোলার সাথে সাথে সুমন ফুল বাড়িয়ে দিয়ে বলবে এই নে তোর ফুল। কিন্তু দোলনের সব আশা ভেঙে দিয়ে সুমন দোলনের মাথা গাট্টা মেরে বলে সামনে থেকে সর। খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছে, আমার ভিতরে প্রবেশ করার জন্য তোর থেকে টিকিট কাটতে হবে নাকি?

দোলন মন খারাপ করে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকে।
কিছু সময় অপেক্ষা করে সুমন ফুলের ব্যাপারে কিছু বলে নাকি।কিন্তু সুমন কিছুই বলে না। দোলন ধৈর্য হারা হয়ে বলে,,,ভাইয়া আমার ফুল কোথায়?

—- কিসের ফুল?
—- তুমি ভুলে গেছো সকালের কথা? কি বলেছিলে মনে নেই তোমার?
—– কই কি বলেছি আমার মনে পরছে না?
—– সত্যিই তোমার মনে নেই?
—– তোর কি মনে হয় আমি মিথ্যা বলছি?

দোলন আর একটা কথা ও বলে না কাঁদু কাঁদু মুখ নিয়ে সেই যে দরজা দিয়েছে রুমের এখনও খুলছে না।

সুমন ফুল নিয়ে এসেছে ঠিকই কিন্তু দোলনকে রাগানোর জন্য বলেছে আনেনি। কিন্তু সে ঠিক দোলনচাঁপা এনেছে দোলনের জন্য। কি করে বলবে এখন মেয়েটাকে দরজা ও খুলছে না। সুমনের কথাকে পাত্তাই দিচ্ছে না দোলন।

সুমন কোনো উপায় না পেয়ে ফুলের ছবি তুলে দোলন কে সেন্ড করে।

দোলন মেসেজের শব্দে ফোন হাতে নেয়।
ফোনের দিকে তাকিয়ে চোখ ঝলমলিয়ে উঠে দোলনের। সুমন তাকে দোলনচাঁপা ফুলের ছবি পাঠিয়েছে তারমানে ফুল এনেছে। এক দৌড়ে দরজা খুলে রুম থেকে বের হয়ে সুমনের হাত থেকে খপ করে ফুলের তোড়াটা নিয়ে নেয়।
ফুলগুলো নিয়ে দোলন কি পরিমাণ যে খুশি হয়।

সুমন শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দোলনের কান্ড দেখছে। অনেক দিন পরে দোলনকে এই সামান্য ফুল পেয়ে এতো খুশি দেখাচ্ছে আজ।

দোলন খুশি হয়ে ফুল নিয়ে ছাদে চলে যায়। ছাদে গিয়ে ফুল নিয়ে অনেকগুলো ছবি ক্লিক করে। ভালো কয়েকটা সিলেক্ট করে আয়শাকে সেন্ড করে পছন্দ করে দেওয়ার জন্য।

“– সিলেক্ট করে দে ।”
— সবগুলোইতো সুন্দর।
— গা/ধী সবগুলো কি আর প্রোফাইল দিতে পারবো?
— ওহ পিপি দিবি? আচ্ছা ওয়েট দিচ্ছি। আয়শা অনেক ভেবে চিন্তে একটা পিকচার সিলেক্ট করে দেয়।

দোলন সাথে সাথে ঐ পিক প্রোফাইলে দিয়ে দেয়।
ফোন স্ক্রল করতে করতে ভুলবশত একটা আইডিতে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট চলে যায়। দোলন তেমন খেয়াল করে নি। ঐ মুহূর্তে দোলনের খালামনির ডাক আসায় ফোন রেখেই বেরিয়ে যায়। দোলন জানতে ও পারে না সে নিজের অজান্তেই কি করে ফেলেছে।

********-*
আজ শুক্রবার। সকলেরই অফিস, ভার্সিটি সব বন্ধ। আষাঢ়দের বাড়ির সকলেই আজ বাড়িতে। সকলের আজ দুপুরের লাঞ্চ করার কথা একসাথে।লাঞ্চের সময় হওয়ার সাথে সাথে একে একে টেবিলে আসতে থাকে সকলে।

মিসেস রিমি আর মেঘ সকলের আগে উপস্থিত দুইজনেই বাপ বেটার জন্য অপেক্ষা করছে। অনেক সময় হয়ে যাওয়ার পর ও মি. শ্রাবণ আর আষাঢ়ের কোনো খবর নেই। ওদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে দুইজনই নানান ধরনের গল্প করতে থাকে।এরমধ্যে মি. শ্রাবণ এসে উপস্থিত হয়।

—” কি ব্যাপার লেডিস?”
— এতক্ষনে আসার সময় হলো?( মিসেস রিমি)
—- মি. শ্রাবন হাসতে হাসতে বলে,, ফ্রেশ হতে গিয়ে লেইট হয়ে গেছে। তারপর মেঘের দিকে তাকিয়ে বলে,,,মেঘ মামনি সব ঠিকঠাক? আমাদের এখানে কেমন লাগছে তোমার? কোনো অসুবিধা হচ্ছেনাতো?

— না আংকেল সব ঠিকঠাক, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। ( মেঘ)

— গুড অসুবিধা হলে বা কোনো দরকার হলে অবশ্যই আমাকে জানাবে?

— হ্যা আংকেল।

তা রিমি তোমার নবাবপুত্র কোথায়?

বাপকা বেটাইতো দুইজনই লেইট লতিফ।
মিসেস রিমির কথায় মি.শ্রাবণ শব্দ করে হেসে দেয়।
ওদের কথোপকথনের মধ্যে মেঘ সামনের দিকে তাকিয়ে থমকে যায়। চোখ দুটো মুগ্ধতায় ছেঁয়ে যায়।

আষাঢ় সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে আর নিজের ভেজা চুলগুলো ঝাঁকাচ্ছে।আষাঢ়ের পরনের ব্লু টিশার্ট টা বেশ কিছু জায়গায় ভিজে লেপ্টে আছে আষাঢ়ের শরীর সাথে। এই কালারের টিশার্টে আষাঢ় কে কি যে হ্যান্ডসাম লাগছে। মেঘ চেয়ে ও আষাঢ়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিতে পারছে না। মেঘের হুঁশ আসে আষাঢ় যখন চেয়ার টেনে বসে তার শব্দে। মেঘ নিজেকে সামলে শুকনো ঢুক গিলে।
—-“তোমরা এখনও খাওয়া শুরু করোনি কেনো?(আষাঢ়)
— তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম বেটা।(মি. শ্রাবণ)
— দিস ইজ নট ফেয়ার বাবা! খাওয়া শুরু করতে আমার জন্য অপেক্ষা করারতো কিছু নেই।
—সপ্তাহে এই একটা দিনই একসাথে খেতে খেতে গল্প করার সুযোগ পাই।সেই সুযোগ হাত ছাড়া করে কে শুনি?(মিসেস রিমি)
— আষাঢ় হাসে আর কিছু বলে না।
— তা আষাঢ় তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?
— গুড বাবা।
বাবা ছেলের মধ্যে আরো নানান ধরনের কথা হতে থাকে। মিসেস রিমি ও বলছে মাঝে মাঝে। এরমধ্যে নিরব দর্শক হলো মেঘ।
আষাঢ়ের সাথে একসাথে খাবে বলে কতো সাজুগুজু করেছে সময় নিয়ে অথচ ছেলেটা একটা বার ফিরে ও তাকাচ্ছে না তার দিকে। মানুষতো ফরমালিটির জন্য ও ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে।
মেঘ একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে খাওয়ায় মন দেয় কিন্তু খুব করে চায় আষাঢ় যেনো একটা বার তার দিকে ফিরে তাকায়।

আষাঢ় খেতে খেতে বাম হাতে মোবাইলটা নেয় কিছু একটা মনে পরেছে তার। মেসেঞ্জারে ঢুকে নিজের কাজ শেষ করে। কি মনে করে ফেসবুকে ঢুকে আষাঢ়। রিকোয়েস্ট অপশনে অনেকগুলো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে। আষাঢ় রিকোয়োস্ট অপশনে ক্লিক করতেই সবার প্রথমে দোলনচাঁপা নাম দেখতে পায়।
আষাঢ় বেশ অবাক হয় দোলনের ছবি দেখে, আরো বেশি অবাক হয় আষাঢ় কে রিকোয়েস্ট দিয়েছে এটা দেখে। আষাঢ় কোনো কিছু না ভেবে একমুহূর্ত ও দেরি না করে একসেপ্ট করে নেয়।
রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করে সাথে সাথে মেসেজ অপশনে গিয়ে লিখে,,,,
—- হোয়াট?
আষাঢ় মেসেজ দেওয়ার সাথে সাথেই সিন হয়।দোলন মাত্রই মেসেঞ্জারে ঢুকেছে আড্ডা দিতে। দোলন মেসেজ সিন করে আগে আইডি ভিজিট করতে চলে যায়। “আষাঢ় এহমাদ”

আষাঢ় এহমাদ নামটা মনে ধরেছে দোলনের। দোলনের এমনিতেই আষাঢ় মাস বেশ প্রিয়, এই নামে কোনো মানুষের নাম দেখে বেশ ভালো লাগলো। ছবিতে ক্লিক করে বেশ চমকায় দোলন।
এই লোকটার নাম তাহলে আষাঢ়।
দোলন ছবি দেখে মনে মনে বলে,,, কি স্টাইল নিয়ে ছবি তুলেছে দেখো মনে হচ্ছে রাজপুত্র। তবে বেশ লাগছে লোকটাকে দেখতে।

দোলন আষাঢ়ের মেসেজের রিপ্লাই দেয়,,,,
— হোয়াট?( আষাঢ়)
— হোয়াট অর্থ কী।(দোলন)
— মানে?
— আপনি প্রশ্ন করলেন আমি উত্তর দিলাম।
+–পাগল মেয়ে।
— ছাগল ছেলে বলেই দোলন জিভে কা’মড় দেয়।কথার তালে তালে কি বলে ফেলেছে। দোলন তারাতাড়ি মেসেজ রিমোভ করতে নিয়ে দেখে অলরেডি মেসেজ সিন হয়ে গেছে।

দোলনরে এইবার তোর কি হবে? লোকটা তোকে মোবাইলের ভিতর দিয়ে এসে চি/ বিয়ে খাবে। আষাঢ় দোলনের মেসেজের কোনো রিপ্লাই না দেওয়ায় তারাতাড়ি দোলন মেসেজ রিমোভ করে অনলাইন থেকে চলে যায়।

মেঘ আষাঢ়ের দিকে তাকিয়ে আছে, বুঝতে পারছে না খেতে বসেও কার সাথে এতো মেসেজ করছে।মেঘের কেন জানি দেখতে ইচ্ছে করছে কার সাথে কথা বলছে। মেঘ ঘাড় উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করে।

আষাঢ় কিছু সময় ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর কেন জানি দোলনের মেসেজ টা পরে রাগ না উঠে হাসি পাচ্ছে। আষাঢ় ঠোঁট কামড়ে হেসে দোলনের মেসেজের রিপ্লাই দেয়,,,

—– সামনে একবার পাই মেয়ে তোমার খবর আছে। তারপর মোবাইল রেখে খাওয়ায় মন দেয়।

#চলবে,,,,,?