ইঁচড়েপাকা এবং সে পর্ব-২৩+২৪+২৫

0
731

#ইঁচড়েপাকা_এবং_সে❤️
#Ruhi_Jahan_Maya

পর্বঃ২৩

” অস্তগামী সূর্যের সাথে বেজায় পাল্লায় মহানগর গোধূলির ,
মেঘনার পাড়ে শরৎ আগমন,হলদে আভা।

হৈমন্তীর গান গায় কচি ধানের চারা,
বিলের গহীন জলে দাঁড়িয়ে লকলকে ধঞ্চে…”

” অসাধারণ লিখেছিস। আবৃত্তি টাও দারুণ। ”

ওরিন একটু হাসলো। ঠোঁটের সাথে কলম ঘষে আরো দু এক লাইন ছন্দ মেলানোর চেষ্টা করলো। আয়শা বেলকনির দরজায় দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছে। বাইরে থেকে হালকা বাতাস আসছে। আয়শার চুল গুলো হাওয়ায় খেলা করছে।

আয়শা কফি খাওয়া শেষ করে ল্যাপটপ টা কাছে নিয়ে বসলো৷ মারিয়ার বিয়ের ভিডিও তৈরি করার জন্য।
ওরিন বেশ কিছুক্ষণ ভাবার পর, তার মনে আর কোন ছন্দ খেলছে না। ওরিন আয়শার দিকে তাকালো, আয়শার উদ্দেশ্য বললো..

“উফফ সব সময় এই ল্যাপটপ নিয়ে ব্যাস্ত থাকো কেনো বলতো? চোখ দুটো খাবে নাকি। ”

” ধুর! কি যে বলিস। বেশ কিছু দিন হয়েছে, এখনো কোন ভিডিও এডিট করিনি, এগুলো তৈরি করতে হবে তো। ”

ওরিন চেয়ারে পা দুলিয়ে আয়শার দিকে তাকিয়ে আছে। আয়শা আবার মুখ ভেংচি কেটে বললো…

” আমার বস আবার যে খারুস। সময় মতো সিনেমাগ্রাফিটা তৈরি না করলে আবার আমাকে ফাঁকি বাজ বলবে৷ এক দম খারুস। ভয়ংকর লোক একটা। ”

” হইছে হইছে। সে দিন তো দেখলাম, সে তোমায় বাড়ি পৌঁছে দিলো। তোমার বস যদি অতিরিক্ত রাগী আর তোমাকে অপছন্দ করতো, তাহলে তোমার উপকার করতো না। বুঝলা? ”

” আমাকে বাসায় পৌঁছে দেয়াটা ওনার দ্বায়িত্বের মধ্য পড়ে। তাই পৌঁছে দিয়েছে। ”

“এই দ্বায়িত্ব টাই বা ক’জন পালন করে বলো তো? তোমার বস চাইলে, ড্রাইভার কে দিয়েও তোমায় পৌঁছে দিতে পারতেন। ”

” হুম। এটা ঠিক বলেছিস। ”

” তোমার বস একটু খারুস। তবে মানুষ ভালো।”

আয়শা মনোযোগ দিয়ে, ওরিনের কথা শুনছে এবং আনমনা হয়ে কিছু একটা ভাবছে। আয়শার পাশে রাখা ফোনটা ভু ভু করে বেজে উঠলো। আয়শা ফোনের দিকে তাকিয়ে অবাক হলো নাছিম ফোন দিয়েছে।

ওরিন তাগাদা দিয়ে বললো…

” কে ফোন দিয়েছে?রিসিভ করো, কেটে যাবে তো…”

আয়শা ফোনটা রিসিভ করে বললো…

” হ্ হ্ হ্যালো.. ”

” হ্যালো মিস.আয়শা বলছেন? ”

“হুম। ”

” কেমন আছেন? ”

” ভালো। ”

” মেডিকেল চেক আপ করিয়েছেন? পা য়ের অবস্থা এখন কেমন? ”

আয়শা পায়ের দিকে তাকালো। ব্যান্ডেজ পেঁচানো পায়ে, আয়শার হাটতে সমস্যা হচ্ছিলো তাই, আয়শা ঘাঁ শুকানোর আগেই ব্যান্ডেজ টা খুলে ফেলেছে।

ফোনের ওপাশ থেকে নাছিম বললো…

” মিস.আয়শা! ”

” হ্যাঁ চেক -আপ করিয়েছি। সব কিছু ঠিক ঠাক। ”

” গুড। এখন রাখছি। ”

” ওকে স্যার। ”

নাছিম ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে দিলো। ওরিন ভ্রু নাচিয়ে বললো…

” কে ছিলো? আমি কিন্তু বুঝেছি। ”

” খারুস বস। ”
বলেই আয়শা ল্যাপটপে মনোযোগ দিলো।

ওরিন একটু হেসে দিয়ে, আফসোসের সুরে বললো,

” আমার যদি এমন একটা কেয়ারিং বস থাকতো, কতোই না ভালো হতো। সিক থাকলে খোঁজ নিতো, বাড়ি ফিরতে দেরি হলে বাসায় ড্রপ করে দিতো। কতোই না ভালো হতো! ”

আয়শা ওরিনের দিকে একটা বালিশ ছুঁড়ে মারলো। ওরিন বালিশটা কেচ করে। হো হো করে হেসে দিলো।

——————————

সকাল সারে দশটা…

ভার্সিটির পার্কিং এরিয়ার এক কোনে ওরিন এবং তনু লুকিয়ে বসে আছে। তনু কিছুক্ষণ পর পর কাঁপা কাঁপা হাতে কপালের ঘাম মুছছে, ভীতু গলায় ওরিন কে জিজ্ঞেস করছে…

” দোস্ত আমার খুব ভয় করছে। ”

ওরিন ধমক দিয়ে বললো…
“বাল লাগছে। আধা ঘন্টা ধরে তোর এক কথা শুনতে শুনতে কান ধরে গেলো। ”

” রাগ করছিস কেনো দোস্ত?”

” রাগ করবো না। চুপ চাপ অপেক্ষা কর।”

তনু খপ করে, ওরিনের হাতটা ধরে বললো…

” ধরা খেলে এক দম শেষ। সি সি ক্যামেরা আছে।”

ওরিন কিছুক্ষণ ভেবে বললো,
“ভালো কথা মনে করেছিস তো?” মুখে মাক্স পড়ে ওরনা পেচিয়ে পড়বো। একটা কেনো দশ টা সি সি ক্যামেরা কিছু করতে পারবে না। হু।”

তনু ভয়ে, অসস্তিতে এদিক ওদিক তাকালো। ফরিদের গাড়ি দেখা মাত্রই তনু চিতকার দিয়ে বললো…

” দোস্ত এসেছে এসেছে। ”

ওরিন তনুর মুখ চেলে ধরলো, ফিস ফিস করে বললো…

” কি করছিস দোস্ত শুনতে পাবে তো ওরা। ”

তনু ফিস ফিস করে বললো..

” ওওপস সরি দোস্ত, খেয়াল করি নি। ”

ফরিদ ড্রাইভিং ডোর খুলে বের হলো, তার সাথেই বাধন ও তার গাড়ি পার্ক করলো। ফরিদ বাধনের উদ্দেশ্য বললো…

” আমি মনে হয় কারো কথার আওয়াজ পেলাম। ”

বাধন গাড়ির দরজা লক করে বললো…

” কোথায়? আমি তো কোন শব্দ পেলাম না। ”

ফরিদ গাড়িতে হেলান দয়ে বললো..
” তাহলে হয়তো আমি ভুল শুনেছি। ”

বাধন তাল মিলে বলল..

” হতেই পারে। চল আমরা ক্লাসে যাই। আজকে আবার ইংরেজি লেকচারার প্রথম ক্লাস নিবে। ”

“হুম। চল। ”

বলেই, ফরিদ এবং বাধন ক্লাসের দিকে চলে গেলো। ওরিন, তনু আড়ালের থেকে এড়িয়ে এলো। ওরিন হাতের পিন টার দিলে তাকিয়ে বললো…

” সে দিন, খেয়ে দেয়ে আমাদের নামে বিল ছেড়ে এসেছিলি না? রিভেঞ্জ হবে। হুহ। দেখ এবার মজা। ”

মারিয়া পিন দিয়ে গাড়ির দুটোয় ফুটো করে দিলো। তনুও ভয় ভয় বাধনের গাড়ির একটা চাকা ফুটো করে দিলো। অন্য টা করতে পারলো না, ধরা খাবার ভয়ে। ওরিন তনুর হাতের থেকে পিন টা নিয়ে, বেশি করে চাকায় খোঁচা মারে বললো…

” বড় লোকের নাতী এবার হবে শিক্ষা। টিট ফর টেট। ”

বলেই ওরিন, তনু দ্রুত সরে গেলো। ক্লাসে গিয়ে বসলো। তনু বই বের করতে করতে বললো…

” কাজটা কি ঠিক করলাম?”

” একশো পার্সেন্ট ঠিক করেছি। সে দিন ওভাবে আমাদের না ফাঁসালেই পাড়তো। সে দিন যদি ঠিক মতো টাকাটা পেমেন্ট করতে না পারতাম, তাহলে কি অবস্থা হতো। বুঝতে পারছিস? ”

” হুম। লজ্জায় মাথা হেড হয়ে যেতো। ”

” হ্যাঁ। আর ওরা মজা নিতো। তাই যা করেছি ঠিক করেছি৷”

তনু আর বেশি কথা এগোলোনা। দু জনই ক্লাসে মনোযোগ দিলো।

——————————-

আজকে অফিসে পৌঁছাতে আয়শা পানের মিনিট লেট করে ফেলছে। আয়শা পা টিপে টিপে হাটতে হাটতে এদিক ওদিকে তাকালো। ম্যানেজার স্যার ফাইল নিয়ে কাজ করছেন। আয়শার নাছিমের কেবিনের দিকে তাকালো, নাছিম গালে হাত দিয়ে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে।

আয়শা সুযোগ বুঝে দ্রুত রুমে ঢুকে তার ডেক্সে বসে পড়লো। কম্পিউটার অন করে, কাজ করা শুরু করলো।
নাছিম কম্পিউটার স্ক্রিনে তাকিয়ে হাসলো,

‘ বোকা মেয়ে একটা। ওর মনে নেই, করপোরেট অফিসে ক্যামেরা থাকে,

কিছুদিন আগেই নাছিম, আয়শার ডেক্সের সামনে, আরেকটা ক্যামেরা বসিয়েছে। ফাঁকি বাজ টার দিকে লক্ষ্য রাখার জন্য। এলিয়েন মেয়েটা ভেবেছে নাছিম কিছুই বুঝতে পারবে না।

এতোটুকু ভাবে নি, বোকা হলে, সারা অফিস, কোম্পানি নাছিম কন্ট্রোল করতে পারতো না। আয়শা একটা ফাইলের দরকারে উঠে দাঁড়ালো। রিসেপশনে মিলির কাছে গিয়ে, বললো…

” দুইশো তেইশ নম্বর ফাইল টা কোথায় রাখা আছে?”

মিলি বিরক্ত ভংগিমায় আয়শা কে বললো…

” খুঁজে দেখো কোথায় রাখা আছে। ”

” খোঁজার দ্বায়িত্ব আমার না, আপনার মিলি আপু। ”

” স্টোর রুমের লাইব্রেরিতে আছে। ”

“আচ্ছা। ”

বলেই আয়শা স্টোর রুমের দিকে গেলো। আয়শা স্টোর রুমের ভেতরে, তাকে ফাইল খুঁজছে। মিলি আর নিলা ও আয়শার পিছু পিছু গেলো, আয়শা যখন ফাইল খুঁজতে ব্যাস্ত ঠিক তখনি বাইর থেকে দরজা আটকে দিলো, মিলি।

মিলি অট্টহাসি দিয়ে বললো..
” নাছিম স্যারের কাছে যাবার খুব শখ তাই না?এবার বুঝো মজা৷ ”
দু’জন সরে গেলো। ভেতরে..



চলবে

#ইঁচড়েপাকা_এবং_সে❤️
#Ruhi_Jahan_Maya

পর্বঃ-২৪

কৃষ্ণচূড়া গাছের ফাঁকে ফাঁকে রোদ আসছে। মৃদু বাতাসে কঁচি ডাল গুলো নড়াচড়া করছে। মাঠের এক অংশ কৃষ্ণচূড়া ফুল পরে সবুজ ঘাসে লাল আবরণ তৈরি হয়েছে। তনু ব্রেঞ্চে বসে আছে, ওরিন কত গুলো তাজা ফুল কুড়াচ্ছে। ক্লাস শেষে রোজ এই জায়গায় কিছুক্ষণ সময় কাটায় ওরিন আর তনু।

ক্লাস শেষ করে ফরিদ আর বাধন পার্কিং প্লেসে আসলো। ফরিদ গাড়ির দরজা খুলে ব্যাগ টা ভেতরে রাখলো। বাধন ফরিদের উদ্দেশ্য বললো…

” আগামীকাল আসছিস তো?”

” না দোস্ত। আগামীকাল মারিয়া বিয়ের অষ্টম দিন। মারিয়াকে আনতে যাবো সবাই। ”

” ঠিক আছে। তাহলে পরশু দেখা হচ্ছে। ”

“ওকে। ”

বলেই ফরিদ গাড়ির ভেতরে ঢুকে গাড়ি স্টার্ট দিলো কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় গাড়ি চলছে না। শব্দ করেই যাচ্ছে। ফরিদ গাড়ি থেকে নেমে দেখলো, গাড়ির চাকা থেকে হাওয়া বেরিয়ে টায়ার চেপ্টা হয়ে গেছে। অবাক করার বিষয় চার টা টায়ার পাংচার করা।

বাধন গাড়ি থেকে ভু ভু শব্দ হচ্ছে কিন্তু তার গাড়ি টাও চলছে না। ফরিদ বাধনের গাড়ির কাছে গিয়ে দেখলো, ঠিক তার মতোই বাধনের গাড়ির চাকার হাওয়া বেরিয়ে গেছে৷ পিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্রর দাগ৷

ফরিদ হতাশ হয়ে বললো..

” ওহ শীট! ”

বাধন গাড়ি থেকে বের হলো মাথা চুলকাতে চুলকাতে জিজ্ঞাসা করলো…

” গাড়ির টায়ারের এই অবস্থা হলো কি ভাবে? ”

” সেটাই তো ভাবছি আর এতো গাড়ি থাকতে আমার আর তোর গাড়ি টায়ার পাংচার হয়ে গেছে। ”

” সেটাই তো কথা। ”

ফরিদ ভাবতে ভাবতে বললো..
“আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এটা। কেউ ইচ্ছা করে করেছে। ”

” কি বলছিস দোস্ত। ”

” ঠিক বলছি আর নয় তো এতো গাড়ি থাকতে তোর আর আমার গাড়ি কেনো?”

বাধন ইশারা করে দেখিয়ে বললো..

” ওই দেখ দোস্ত সি সি ক্যামেরা। ”

” চল। দেখি। ”

” সিকিউরিটি আমাদের দেখতে দিবে তো?”

” ঘুষ দিলে ঠিকই দেবে। ”

বলেই ফরিদ বাঁকা হাসলো। ‘আমি দেখবো কার এতো বড় সাহস। আমার গাড়ির টায়ার পাংচার করলো। ‘

ফরিদ এবং বাধন দুজনেই ক্যামেরা রুমে গেলো। প্রথম প্রথম সিকিউরিটি ম্যান ঢুকতে না দিলেও। ফরিদ ঘুষ দিয়ে ভেতরে ঢুকলো। ক্যামেরা চেক করতেই দেখলো, দু জন বোরখা পড়া মেয়ে আপাদ মস্তিষ্ক ঢেকে হাতে পিন নিয়ে গাড়ির টায়ারের হাওয়ার বের করে দিচ্ছে।

দ্বিতীয় মেয়েটা বাধনের গাড়ির টায়ার ঠিক মতো লিক করতে পারলো না, তাই প্রথম মেয়েটা পিন হাতে নিয়ে কথা বললো। তারপর টায়ার লিক করে দিলো।

” এসব কি হচ্ছে ফরিদ? ”

” আমার ধারনা টাই ঠিক কেউ ইচ্ছা করে কাজ টা করেছে। ”

” কে করেছে? আর কেনোই বা করেছে। আমরা কি ভুল করেছি। ”

” এই বোরখা পড়া মেয়ে দুটো কে পেলেই বুঝতে পারবো সেটা। ”

” হুম। এখন চল বাইরে যাই।”

ফরিদ বাধন ক্যামেরা রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। কে হতে পারে এরা দুজন। ফরিদ হাটছে এবং ভাবছে। তিন দিন আগেই তো ফরিদ আর বাধন ওরিনের ওপর রেস্টুরেন্টের বিল ছেড়ে চলে এসেছিলো৷ ওরা দুজন কান্ড টা করে নিতো?

ফরিদের জানা মতে, ওরিন অথবা তনু কেউই তো বোরখা পরে না। তবুও কেনো জানি বার বার সন্দেহের তীর ওই বিচ্ছু মেয়ে দুটোর দিকেই যাচ্ছে। এমটা ও তো হতে পারে ধরা খাবার ভয়ে দুজন বোরখা পড়ে এসেছিলো।

ফরিদ আর বাধনের ওপর প্রতিশোধ নিতে, প্লেন করে কাজ টা করে গেছে৷ ফরিদ মাথায় হাত দিলো..

” কি ভাবছিস ফরিদ? ”

“কাজ টা ওরিন আর তনু করেছে। ”

বাধন অবাক হয়ে বললো..
” কিহহ।”

“হ্যাঁ। রিভেঞ্জ নিয়েছে। ”

” এতো বড় সাহস ওদের। ”

” কুল কুল। এখন রাগলে চলবে না৷ যা করার ঠান্ডা মাথায় করতে হবে। আচ্ছা ওরা কি এখন বেড়িয়ে গেছে?”

বাধন একটু ভেবে বললো..
” জানিনা। কিন্তু কলেজের পেছনে লেকে ওদের ছুটির পর প্রায়ই দেখি। ”

ফরিদ তাড়া দিয়ে বললো..
” তাহলে ওখানেই চল৷ আজ ওদের হাতে নাতে ধরবো। ”

বলেই, ফরিদ আর বাধন দৌড়ে ভার্সিটির পেছনে গেলো। দুজনেই আড়াল থেকে লক্ষ্য করলো। ওরিন ফুল কুড়াচ্ছে, আর তনু ব্রেঞ্চে বসে পা দোলাচ্ছে। পাশেই দু’জনের ব্যাগ রাখা। ফরিদ বাধনের উদ্দেশ্য বললো…

” তুই গিয়ে তনু কে ব্যাস্ত রাখবি। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে পেছন থেকে ওদের ব্যাগ নিয়ে চেক করবো। কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নাকি। ”

” ওকে গুড আইডিয়া। ”

ওরিন যখন ফুল কুড়াতে কুড়াতে ক্ষানিকটা দূরে চলে গেছে। বাধন গিয়ে, তনুও পাশে বসতেই তনু ভুত দেখার মতো তাকিয়ে রইলো..
বাধন হালকা হেসে বললো..
” কি দেখছো?”

“আপনি এখানে কি করছেন?”

” কিছু না এমনি। ”

” তুমি এখনে কি করছো ?”

তনু ভয়ে ভয়ে নার্ভাস গলায় বললো..
” এমনি। ”

তনু চুপ চাপ বসে আছে। মনে মনে তার ভয় লাগছে। প্রশ্ন জমছে, হঠাৎ করে বাধন এখানে কেনো এলো? কিছু বুঝে যায় নি তো?
ফরিদ চুপি সারে একটা ব্যাগ হাতে নিলো। চেইন খুলতে দেখলো কালো কাপড়। ফরিদের বুঝতে আর বাকি রইলো না। এই দুই বিচ্ছু মেয়েই গাড়ির টায়ার ইচ্ছা করে লিক করে দিয়েছে।

ফরিদ দ্রুত ব্যাগ টা রেখে দিলো। হাত ভর্তি লাল টকটকে কৃষ্ণচূড়া ফুল নিয়ে ওরিন, তনুর কাছে এ এসেই অবাক হলো। ফরিদ আর বাধন কে দেখে। এখন ওরিনের মনে মনে কিঞ্চিৎ ভয় লাগছে। এই ইঁচড়েপাকা দুটো সব বুঝে গেলো না তো?

ফরিদ ওরিনের কাছে গিয়ে বললো..

“নাইস ফ্লাওয়ারস। ”

ওরিন একটু হাসে বললো..
” থ্যাংক ইউ। এই তনু চল না। লেট হচ্ছে তো। ”

” আমরা আসি, লেট হচ্ছে। ”

“ওকে যাও..”

বলেই ফরিদ হালকা হেসে বিদায় দিলো। ওরিন তনু দ্রুত সরে এলো ওখান থেকে।

” দোস্ত কিছু পেয়েছিস? ”

ফরিদ হাতের পিছনে রাখা বোরখার প্যাকেট টা বাধন কে দেখাতেই, বাধন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।

———————————-

স্টোর রুমে ছবির এলবাম ওয়ালা ফাইল খুঁজতে আয়শার বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলো। আয়শা ঘন ঘন হাঁচি দিচ্ছে। আয়শার ডাস্টার্ড এলার্জি আছে, ধুলোর মধ্যে বেশি ক্ষন থাকতে পারে না।

আয়শা ফাইল টা হাতে নিয়ে বের হবে, দরজা ধাক্কা দেবার পর ও খুলছে না। আয়শা জোরে জোরে ধাক্কা দিলো তবুও দরজা টা খুলছে না। মনে হচ্ছে বাইরে থেকে কেউ আটকে দিয়েছে..

আয়শা জোরে জোরে দরজায় বাড়ি দিচ্ছে, বাই থেকে কারো সারা শব্দ নেই। আয়শা জোরে চিতকার দিয়ে বললো…

” কেউ আছেন এখানে। আমি ভেতরে আটকে গেছি। ”

বেশ কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে কারো সারা পেলো না আয়শা। স্টোর রুমটা অফিসের এক দম কোনায় তাই এখানে খুব বেশি কেউ যাওয়া আসা করে না।

আয়শার খুব বেশি জানা নেই। কারন সে অফিসে জয়েন করেছে মাত্র দু মাস ধরে। আয়শা আবার ও বললো..

” কেউ আছেন এখানে। প্লিজ হেল্প মি। ”

বলেই আয়শা বসে পরলো। আদো কি তার শব্দ কেউ শুনতে পারছে। আয়শা ফোন টাও আনে নি। বন্ধ একটা ঘর জানালাও নেই৷ আয়শার মাথাটা ঝিম ধরছে৷ এখান থেকে কি ভাবে সে বের হবে।

আয়শার কান্না করতে ইচ্ছে করছে। আয়শা বসে পড়লো।

“আল্লাহ প্লিজ বাঁচাও আমাকে। ”

আয়শা হু হু করে কেঁদে দিলো। ধুলোর মধ্য আয়শা বার বার হাঁচি দিচ্ছে। গা চুলকাচ্ছে খুব।

কফির মগে চুমুক দিয়ে, নাছিম আয়শার ডেক্সে তাকিয়ে অবাক হলো। বেশ কিছুক্ষণ আগে নাছিম আয়শাকে উঠে যেতে দেখেছে। প্রায় দু ঘন্টা হয়ে গেছে আয়শা এখনো নিজের ডেক্সে আসে নি৷

নাছিম, আয়শার ডেক্সের কাছে গেলো। কাগজের পৃষ্ঠা গুলো খোলা। তার মানে আয়শা কাজ করছিলো। তাহলে কোথায় গেলো..
নাছিম রিসিপশনের কাছে গিয়ে নিলা কে জিজ্ঞেস করলো..

” মিস আয়শা কে দেখেছেন?”

” আয়শা তো..

” কি?”

মিলি চোখ ইশারা করে তাকালো নিলার দিকে। নিলা না বুঝার ভান ধরে বললো..

” খেয়াল করি নি স্যার। ”

নাছিম আয়শার ফোনে কল দিলো, আয়শার ডেক্সের কাছ থেকে রিং শব্দ এলো। নাছিম এগিয়ে যাবে ঠিক তখনি স্টোর রুমের দিক থেকে মৃদু চিতকারের শব্দ পেলো।

নাছিম স্টোর রুমের কাছে গিয়ে দেখলো দরজা বাইরে থেকে অলরেডি আটকানো। ভেতর থেকে হাঁচির শব্দ পেয়ে নাছিম দ্রুত দরজা টা খুলে দিলো। আয়শা কান্না করছে আর ঘন ঘন হাঁচি দিচ্ছে। নাছিম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো..

” মিস আয়শা আপনি। এখানে? আপনার এই অবস্থা কেনো? ”

আয়শা,কান্না করতে করতে বললো..

” দু ঘন্টা ধরে ভেতরে আটকে আছি। ফাইল নিতে এসে ছিলাম। আমি তো ভেবেছি সারা দিন এখানেই পড়ে থাকবো। ”

” ডোন্ট ক্রাই। আপনি আটকে গেলেন কি ভাবে। ”

“মনে হয় কেউ বাইরে থেকে দরজা আটকে দিয়েছিলো।”

নাছিম পকেট থেকে রুমাল বের করে আয়শার চোখের পানি, মুছে দিলো….


চলবে

#ইঁচড়েপাকা_এবং_সে❤️
#Ruhi_Jahan_Maya

পর্বঃ-২৫

রুমে পিন পতন নিরবতা ছেয়ে আছে কেউ কোন কথা বলছে না।
টেবিলের কোনায় রাখা একটা চেয়ারে আয়শা বসে আছে৷ অপর টিতে ম্যানেজার স্যার বসে আছেন৷ নাছিম অনেক ক্ষন যাবত কম্পিউটারে কিছু একটা ঘাটা ঘাটি করছে। ম্যানেজার স্যার আয়শার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করলো, আয়শা নাক, মুখ ফুলে লাল লাল ছোপ দেখা যাচ্ছে। জামায় মাকড়ের আঁশ লেগে আছে।

নাছিমের বিশ্বাস কেউ ইচ্ছা করেই বাইরে থেকে দরজা আটকে দিয়েছে৷ সারা অফিসে ওয়ার্কিং প্লেসে ক্যামেরা থাকলেও স্টোর রুমের দিকে ক্যামেরা নেই, ঠিক সেটার সুযোগ নিয়েছে কেউ।

কে হতে পারে সে? কার আয়শার সাথে দুশমনি। একটা মেয়েকে স্টোর রুমে আটকে রাখবে। নাছিম শব্দ না পেলে হয়তো আয়শা সারা দিন ধূলো ময়লার রুমে পড়ে থাকতো। সকাল এগারো টার ফুটেজ অন করে নাছিম মন দিয়ে দেখছে৷

আয়শা তার ডেক্স থেকে উঠে রিসিপশনে গেলো। এক মিনিট রিসিপশনের দাঁড়িয়ে মিলির সাথে কথা বললো..মিলি হাত ইশারা করে স্টোর রুম দেখিয়ে দিলো। আয়শা স্টোর রুমের দিকে গেলো, আয়শার পিছু পিছু মিলি এবং নিলাও পিছু নিলো। এর পর আর কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। কয়েক সেকেন্ড পর নিলা, মিলি ফিরে এলো নিজের জায়গায় কিন্তু আয়শা এলো না৷

নাছিম ভিডিও টা পজ করে চোখ বন্ধ করে বসে রইলো। কোন মতেই সে তার নিজের রাগ টাকে কন্ট্রোল করতে পারছে না। নাছিম ম্যানেজারের উদ্দেশ্য বললো…

” মিস আয়শাকে বাসা পর্যন্ত দিয়ে আসুন৷ ওনার যা অবস্থা ওনার রেস্ট নেয়া খুবই প্রয়োজন। ”

আয়শা এখনো ঘন ঘন হেচকি তুলছে। ম্যানেজার স্যার উঠে চলে গেলো, আয়শা উঠে দাঁড়ালো, নাছিম কে বললো..

” আসছি স্যার। ”

” হুম। নিজের খেয়াল রাখবেন। ”

আয়শা হ্যা সূচক মাথা দুলিয়ে কেবিন থেকে বাইরে চলে গেলো। নাছিম রিসিপশনের কল দিয়ে, মিলি আর নিলা কে আসতে বললো।

মিলি নিলার ডেক্সের কাছে গিয়ে নিলা কে ডাক দিয়ে বললো..

” স্যার আমাদের যেতে বলেছেন। ”

নিলা কিছুটা অবাক হয়ে বললো..
“কেনো রে?”

” জানি না রে। এই মাত্র দেখলাম আয়শা অফিস থেকে বেড়িয়ে গেলো। ”

নিলা ক্ষানিকটা ভয় পেয়ে গেলো। ভীত কন্ঠে বললো..

” আমরা ধরা পরে গেলাম না তো? ”

মিলির চোখে মুখে চিন্তার ভাজ পডলো। দু’জন নাছিমের কেবিনে গেলো। নাছিম ভেতরে আসার পার্মিশন দিলো। দু’জন কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করলো।

নাছিম কম্পিউটার স্ক্রিনে দিকে তাকিয়ে বললো..

“বসুন আপনারা। ”

দু’জন চেয়ার টেনে বসলো। নাছিম দুজনের উদ্দেশ্য বললো…

” আপনারা আমার অফিসে চাকরি করেন কত বছর হলো?”

নাছিমের অদ্ভুত প্রশ্নে দু’জনই কিছুটা ভরকে গেলো। মিলি ঢোক গিলে বললো..

” স্যার দু বছর তিন মাস। ”

” মিস নিলা আপনি? ”

” এক বছর।”

” কালকে থেকে আপনারা দু’জন অফিসে আসবেন না। আপনাদের বাসায় ডেজিগনেশন লেটার পৌঁছে যাবে। ”

মিলি ভয়ার্ত কন্ঠে বললো..
” কি বলছেন স্যার। আমরা কি দোষ করেছি। ”

” কি দোষ করেছেন? যারা ভুল করে, নিজেদের ভুল টাকে স্বীকার করে, তাদের সুযোগ দেওয়া যায়৷ আর যারা ইচ্ছা করে ভুল করে, তাদের কোন মাফ নেই। ”

নিলা কান্না জরানো সুরে বললো…
” স্যার আমরা কি করেছি। ”

” আয়শা কে স্টোর রুমে আটকে রেখেছে কে?”

” আমরা জানি না স্যার। ”

” আমাকে কি ইডিয়ট মনে হয়? আমি প্রমাণ ছাড়া কিছু বলি না। ”

নাছিম কম্পিউটার স্ক্রিনেটা দু’জনের দিকে ঘুড়িয়ে দিলো। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আয়শার পিছু পিছু তার দুজন গিয়েছিলো। তারা দুজন ফিরে আসলেও আয়শা ফিরে আস্তে পারে নি। কারন বাইরের থেকে দরজা লক করে দিয়েছিলো।

” আপনাদের আর কিছু বলার আছে?”

নিলা কান্না করতে করতে বললো..
“প্লিজ আমার চাকরিটা নিবেন না। ”

” সেটা দোষ করার আগেই ভাবা উচিত ছিলো। ”

মিলি অনুরোধ করে বললো..
” আমার মা অসুস্থ একজন মানুষ। চাকরিটা চলে গেলে, মায়ের চিকিৎসা করাবো কি ভাবে? ”

নাছিম রাগে, টেবিলে জোরে বাড়ি মেরে বললো…

” তাহলে এই কাজটা কেনো করেছেন? ”

নিলা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো..

” আয়শা নতুন জয়েন করেও কতো সুবিধা পাচ্ছে, সবার এটেনশন পাচ্ছে। আমাদের দুজনের খুব হিংসে হতো। এই জন্য আমারা কাজ টা করেছি। ”

নাছিম চুপ করে বসে আছে। এরা দুজন ছেলে হলে এতোক্ষনে নাছিম ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতো। হিংসার বশে মানুষ কতো নিচে নামতে পারে, এদের না দেখলে নাছিম নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারতো না। ডাস্টার্ড এলার্জি সমস্যায় ভুগা মেয়েটাকে এভাবে আটকে রেখেছিলো।

আয়শার কিছু হয়ে গেলে সে, কখনো নিজেকে মাফ করতে পারতো না৷ মেয়েটার বড় ধরনের সমস্যা হয়ে গেলে নাছিম আয়শার পরিবারের কাছে কি জবাব দিতো?
নিলা কান্না করতে করতে বললো…

“স্যার প্লিজ আমাদের মাফ করে দিন। ”

” আমার মাফ করালে, বা না করলে। কোন যায় আসে না। মিস, নিলা আই নো আপানার ফ্যামিলিতে কেউ নেই। আপনার একটা ছোট ভাই আছে। সবার কোন না কোন ফ্যামিলি ট্রমা আছে।

আপনাদের কারো চাকরি আমি ছিনিয়ে নিবো না। তবে কালকে থেকে আপনারা, অফিসের কোন দ্বায়িত্ব থাকবেন না। ”

” তাহলে স্যার। ”

” গার্মেন্টস ডিপার্টমেন্টে এক্সিকিউটি করবেন৷ আন্ডার স্টেন্ড। ”

” ওকে স্যার। ”

” আপনারা এখন আসতে পারেন। ”

মিলি নিলা দুজনেই উঠে চলে গেলো। নাছিমের চোখের সামনে মায়ের চেহারা ভাসছে। ছোট বেলায় নাছিমের মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলো..

” কখনো কাউকে শাস্তি দিবি না। কারন মানুষের কর্মের শাস্তি দিবে আল্লাহ। মানুষে কোন কিছুতেই হাত নেই। ‘

মায়ের কথাটা রাখার জন্যই হয়তো নাছিম দুজনের চাকরি নেয় নি।

——————————-

বাসায় পৌঁছে কলিং বেল বাজাতেই আয়শার বাবা আফজাল সাহেব দরজা খুলে দিলেন। আয়শার চেহারা দেখে অবাক হলেন।

” তোর এ অবস্থা হলো কি ভাবে মা? ”

ম্যানেজার স্যার পেছন থেকে বললেন..

” স্টোর রুমে ফাইল আনতে গেছিলেন। ডাস্টার্ড এলার্জি বেরে গেছে মনে হয়। ”

আয়াশা ম্যানেজার স্যার কে বিদায় দিয়ে, ওয়াশ রুমে ঢুকে গেলো। লম্বা শাওয়ার নেয়ার পর আয়শা বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিলো।
বিকাল বেলা আয়শার ঘুম ভাংলো ওরিনের ডাকে। ওরিন খাবারের প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশে বাবাও দাঁড়িয়ে আছে।

আয়াশা খুব কষ্টে বসলো। ওরিন আয়শার কপালে হাত দিয়ে, তাপ মাত্রা বুঝার চেষ্টা করলো। ওরিন ভাত আয়শার মুখে পুরে দিয়ে বললো…

” শরীর টা তো বেশ গরম। অনেকক্ষন ধরে নিশ্চয়ই পানিতে ভিজেছো। ”

” হুম। ”

” কি হয়েছে আপু? হঠাত অসুস্থ কেনো হলে?”

আয়শা স্টোর রুমে আটকে থাকার ব্যাপার টা এড়িয়ে গেলো। জানা জানি হলে, আয়শার কাজে অসুবিধা হবে বেশি। তাই আয়শা ব্যাপার টা প্রকাশ করলো না।

হালকা হেসে আয়শা ওরিন কে উত্তর দিলো,
” অসুস্থতা কি বলে কয়ে আসে?”

ওরিন মুখ ভারি করে বললো..
” থাক এখন আর কথা বলতে হবে না। ”

আয়শা চুপ করে রইলো। কোন রকমে খাবার খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দিলো ওরিন। আয়শা আধো শোয়া হয়ে বসে রইলো। মাথাটা ভার বার লাগছে।
পাশে রাখা ফোন টা বেজে উঠলো। আয়শা ফোন টা রিসিভ করলো। ফোনের ওপাশ থেকে নাছিম বললো..



চলবে।