ইঁচড়েপাকা এবং সে পর্ব-২৬+২৭+২৮

0
790

#ইঁচড়েপাকা_এবং_সে❤️
#Ruhi_Jahan_Maya

পর্বঃ–২৬

” হঠাৎ করে অসুস্থ হলে, কি ভাবে বলা তো?”

” অসুস্থতা কি বলে কয়ে আসে?”

আয়শা স্টোর রুমের ব্যাপার টা এড়িয়ে গেলো। এখন বাসায় জানালে আয়শার কাজে অসুবিধা হবে। তাই না বলা টাই শ্রেয়।
ওরিন গাল ফুলিয়ে বললো..

” থাক এখন আর কথা বলতে হবে না৷ নাও ঔষধ খাও।”

ওরিন ঔষধ গুলো আয়শার হাতে দিলো। আয়শা ঔষধ খেয়ে, আধো শোয়া হয়ে বসে রইলো। চোখ বন্ধ করে। ফোনের শব্দে আয়শা ফোনটার দিকে তাকালো। ফোনের স্ক্রিনে, ‘ খারুস ‘নাম,টা ভেসে উঠলো।

আয়শা ফোন রিসিভ করে “হ্যালো” বলতেই ওপাশ থেকে নাছিম বললো..

” কেমন আছেন এখন মিস আয়শা। ”

” এখন একটু ভালো। আপনি?”

” আমি কি?”

” আপনি কেমন আছেন? ”

নাছিম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো..

” ভালো আছি। ”

দুজনই চুপ করে রইলো। কেউ কথা বলছেনা। ফ্যানের কৃত্রিম বাতাসের সাথে আয়শার শ্বাস নেওয়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছে৷ সর্দির কারনে আয়শা জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। হঠাৎ করে আয়শা বললো…

” থ্যাংক ইউ। ”

” কেনো?”

“আমাকে বাঁচানোর জন্য। ”

” আমি আপনাকে বাঁচাইনি। আল্লাহ বাঁচিয়েছে। আমি তো মাধ্যম মাত্র। ”

আয়শা কি বলবে বুঝতে পারছে না। অফিসে বসের সাথে ফর্মাল কথা ছাড়া আর কি বা বলা যায়। নিরিবতা ভেঙ্গে নাছিম বললো…

” মেডিসিন নিয়েছেন? ”

” হুম। ”

” আপনার দু দিন অফিসে আসার দরকার নেই। আপনি রেস্টে থাকুন। ”

” আমার স্যালা..”

নাছিম কথা কেড়ে নিয়ে বললো…
” কাম ডাউন। আপনার স্যালারি কাটা হবে না। ”

আয়শা সস্তির নিঃশ্বাস নিলো। ফোনের ওপাশ থেকে নাছিম বললো..

” এখন রেস্ট নিন। বায়। ”

” হুম। ” বলেই আয়শা ফোনটা কেটে দিলো।
সামনে ওরিন হা করে তাকিয়ে আছে। আয়শা ওরিনার চাহুনি দেখে অবাক হয়ে বললো..

” এভাবে ভুত দেখার মতো। তাকিয়ে আছিস কেনো? মুখে মাছি, হাতি, ঘোড়া ঢুকে যাবে।”

” তোমার বস, ফোন দিয়েছিলো তাই না?”

” হ্যাঁ। কেনো?”

“আমার আগেই কেনো জানি মনে হয়েছিলো, এই ভালো খারুস টা তোমার খবর নিবে।”

” নাছিম স্যার ভালো খারুস হয়ে গেলো। ”

” হুম। কারন স্যার ভালো মানুষ। কিন্তু অনেক খারাপ খারুস আছে, যারা মেয়েদের ট্রাপে ফেলে, চলে যায়৷ ওই খারাপ খারুস টাকে শিক্ষা দেওয়া উচিত। ”

” যেমন?”

” কিছু না আপু। তুমি রেস্ট নাও এখন। ”

ওরিন রুম থেকে চলে গেলো। আয়শা চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো। শরীর টা বড্ড খারাপ লাগছে, কিন্তু খারুস টার খোঁজ নিয়েছে তাকে সেইফ করেছে ভাবতেই আয়শার ভালো লাগছে খুব। নাছিমের দেওয়া রুমাল টা আয়শা হাতে নিয়ে দেখছে। খারুস টার কথা তার এতো মনে পড়ছে কেনো?

———————————-

ফরিদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, আছে। লাল পারের সাদা শাড়ি পরা তরুণীর দিকে এক দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে। সেই তরুণীর চোখ, ঠোঁট , গাল খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে।
লম্বা শ্বাস টেনে ফোন স্ক্রিনের রমণীর দিকে তাকিয়ে বললো..

” তুমি কি ভেবেছো মিস ওরিন তোমাকে আমি চিনতে পারবো না। তোমার হাটা চলার, কথা বলার স্টাইল, কর্ম কান্ড দেখলেই আমি বুঝতে পারি। ”

ফরিদের ঠোঁটের কোনো এক ফালি হাসি ফুঁটে উঠলো। এবার বুঝবে মজা। আমার গাড়ির টায়ারে পিন দিয়ে গুতিয়ে হাওয়ার বের করেছো। এর দাম তো তোমাকে দিতেই হবে।

” ফরিদ কে বোকা বানানো এতো সহজ না। ওরিন৷ ”

” কে কাকে বোকা বানাবে?”

নাছিম পেছন থেকে বললো। ফরিদ জুসের গ্লাসে চুমুক দয়ে বললো..

” কিছু ভাইয়া। ”

” ও তাই না? ”

বলেই নাছিম, ফরিদের ফোন স্ক্রিনে আড় দৃষ্টিতে তাকালো। শাড়ি পড়া একটা মেয়ের ছবি নাছিম চেহারাটা স্পষ্ট দেখতে পারলো না তার আগেই ফোনের স্ক্রিন অফ হয়ে ফেলো।

” কিছু বলবে, ভাইয়া?”

” হ্যাঁ। কালকে তো মারিয়ার বিয়ের আট দিন। ”

” হুম। বুড়িটার শ্বশুর বাড়ি যাবো। তাই না?”

” হ্যাঁ সাবাই যাবো। দাদী প্রথম যাবে। তাই তুষার কে গিফট দেবার জন্য একটা আংটি অর্ডার দিয়েছে। ছবিটা দেখে বল তো কেমন? ”

ফরিদ ফোনটা হাতে নিয়ে আংটি টা দেখে বললো…

” আমাদের স্টাইলিশ দাদীর পছন্দ বেশ ইউনিক৷ ”

ফরিদের কথা শুনে নাছিম হাসলো। ফরিদ ফোনে কোন মেয়ের ছবি দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলো? ব্যাপার টা নাছিম কে বেশ ভাবাচ্ছে। ফরিদ হয়তো মেয়েটা কে পছন্দ করে৷ তার ভাই ও যে কারো প্রেমে পড়েছে, কথাটা চিন্তা করতেই নামের চাপা আনন্দ হচ্ছে।

———————————-

সকাল সারে দশটা…

ক্যাম্পাসের এক পাশে দাঁড়িয়ে তনু ওরিনের জন্য অপেক্ষা করছে। এর মধ্যেই হঠাৎ বাধন সামনে এসে দাঁড়ালো। তনু একটু ভাব নিয়ে বললো.…

” কি চাই?”

বাঁধন মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো…

” কিছু না। ”

” তাহলে হনুমানের মতো চেহারা নিয়ে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো। সরুন। ”

” কিহ আমার চেহারা হনুমানের মতো? সিনিয়রের সাথে এভাবে কথা বলছো?”

” তো কি করবো। মাথায় উঠিয়ে নাচবো?”

” মাই গড! মেয়েরা এতো ঝগড়া কি ভাবে করে?”

তনু চটে গিয়ে বললো..
” আমার গলায় ওল কচু আছে তাই ঝগড়া করার জন্য গলা চুলকায়। বুঝেছেন? ”

” না, বুঝিনি। ওল কচু দেখতে কেমন।”

” হনুমানের মতো। ”

বলেই তনু গেটের দিকে হাটা দিলো। ওরিন তনুকে হাটতে দেখে দূর থেকে ডাক দিলো। তনু ওরিনের ডাক শুনে ওরিনের দিকে তাকালো। ওরিন দ্রুত পায়ে হেটে, তনুর কাছে এলো।

” কিরে তুই এমন রেগে আছিস কেনো?”

” আর বলিস না। ওই হনুমান টা মুড খারাপ করে দিলো। ”

” কে এই মানুষ রূপি হনুমান? ”

তনু হাত ইশারা করে দেখিয়ে দিয়ে বললো..
” ওই যে দেখ।”

ওরিন হো হো করে হেসে বললো।
” ওটাতো বাধন ভাই৷ উনি আবার কি করলো? ”

” তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। হনুমান টা আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। আজাইরা প্যাঁচাল শুরু করেদিছে।”

” সবই তো বুঝলাম। তা ওর বন্ধু কথায়?”

” জানি না রে। মনে হয় গাড়ির টায়ারের শোকে এখনো কাতর হয়ে আছে। ”

” একদম ঠিক বলেছিস তনু। ”

দুজনেই হো হো করে হাসলো, ক্লাসের উদ্দেশ্য চলে গেলো। ক্লাস শেষে ওরিন, এদিক সেদিক তাকিয়ে, কোথাও ফরিদ কে দেখতে পেলো না৷ মনে মনে ক্ষানিকটা নিরাশ হয়ে, চির চেনা সেই কৃষ্ণ চূড়া ফুল গাছ টার নিচে বসে রইলো। ওরিন কে চুপ চাপ দেখে তনু কিছু বলতে গিয়েও বললো না।

” মানুষের কখনো কখনো কয়েক মূহুর্তের জন্য একা থাকা উচিত।
একাকিত্ব মন কে শক্তি যোগায়।”

~ রুহি জাহান (মায়া)

——————————————-

গত কালকের তুলনায় আজ আয়শা বেশ সুস্থ হয়েছে। বাবা বারণ করা সত্বেও, দুপুরের রান্না টা সে নিজেই করেছে। প্রতিদিনের কাজ গুলো অভ্যাসে পরিনত হয়েছে, যে অভ্যাস টা চাইলেও ছাড়া যায় না। আয়শাকে রান্না ঘরে দেখে বাবা তাড়া দিয়ে বললেন..

” মা তুই এখনো রান্না ঘরে পরে আছিস। তোর শরীর টা তো খারাপ। ”

আয়শা চামুচ-বাটি গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললো..

” এখন ভালো আছিতো বাবা।”

” গত কাল, অফিসে কি হয়েছিলো সত্যি করে বল তো?”

আয়শা হঠাৎ থমকে গেলো। বাবার দিকে তাকিয়ে বললো..

” স্টোর রুমে ফাইল আনতে গেছিলাম। বুঝতে পারিনি এতো ধুলা হবে। তাই হঠাৎ এলার্জিটা বেরে গেলো। ”

” সত্যি বলছিস তো?”

” হুম। ”

আয়শা নিজেও খুব ভালো করেই জানে এটা কেউ ইচ্ছা করে করেছে। হয়তো কেউ আয়শা অপছন্দ করে এজন্যও হতে পারে। সঠিক না জেনে আয়শা কাউকে ব্লেইম করতে চায় না।

সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে আয়শা রুমে শুয়ে, আছে। ওরিন কলেজ থেকে এসে রেস্ট নিচ্ছিলো। হঠাৎ বেল বাজার শব্দে ওরিন চমকালো৷ বাবা তো ছাদের দরজা তো খোলাই তাহলে আবার কে বেল বাজালো? আরো একবার দরজায় শব্দ হলো। ওরিন দরজাটা সম্পূর্ণ খুলে দিয়ে চমকে গেলো। কারন…
.
.
চলবে

#ইঁচড়েপাকা_এবং_সে❤️
#Ruhi_Jahan_Maya

পর্বঃ-২৭

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই মাগরিবের আজান দেবে। আকাশ টা কমলা রঙের বর্ন ধারন করেছে।

সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে আয়শা রুমে শুমে শুয়ে, আছে। ওরিন কলেজ থেকে এসে রেস্ট নিচ্ছিলো। হঠাৎ বেল বাজার শব্দে ওরিন চমকালো৷ বাবা তো ছাদে। দরজাতো খোলাই তাহলে আবার কে বেল বাজালো? আরো একবার দরজায় শব্দ হলো। ওরিন দরজাটা সম্পূর্ণ খুলে দিয়ে চমকে গেলো। কারন বাইরে নাছিম দাঁড়িয়ে, আছে।

নাছিমের চেহারা, দেহের আকৃতি অনেকটাই ফরিদের মতো। ওরিন হা করে তাকিয়ে, নাছিমের আপাদমস্তক খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। অপরিচিত কোন মেয়ের এমন অদ্ভুত চাহুনি দেখে নাছিম থত মত খেলো।
ওরিন ক্ষানিকটা হেসে বললো…

” খারু..মানে আপনি আপুর বস তাই না?”

নাছিম ব্লেজার টা ঠিক করে বললো…

” জ্বি। মিস, আয়শা বাসায় আছেন। ”

” হ্যাঁ আছে। আচ্ছা আপনার কি কোন ছোট ভাই আছে?”

” কেনো বলুন তো??”

” না এমনি জিজ্ঞেস করলাম। আপনি প্লিজ বসুন। ”

নাছিম সিংগেল সোফায় বসতে বসতে বললো…

” মিস, আয়শা এখন কেমন আছে?”

” ভালো। আমি আপাকে ডেকে দিচ্ছি। ”

বলেই ওরিন ভেতরের রুমে ঢুকলো। আয়শার বাবা আফজাল সাহেব ছাদ থেকে নেমে বাসায় ঢুকলেন। নাছিম কে দেখে কিছুটা অবাক হলো। নাছিম দাঁড়িয়ে আয়শার বাবা কে সালাম দিলো। আয়শার বাবা সালামের উত্তর দিয়ে বললেন..

” তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না??”

” আমি, মিস আয়শার বস। নাছিম হোসাইন। ”

” ও আচ্ছা। বসুন না। ”

নাছিম বিনয়ের হাসি দিয়ে, সোফায় বসলো। নাছিম বাসার রুমে ডেকরেশন দেখে বললো…

” বাসাটা সুন্দর। ”

আফজাল সাহেব হাসলেন। তারপর বললেন…

” আয়শা সাজিয়েছে। ”

নাছিম মনে মনে ভাবলো, মেয়েটার চয়েজ আছে বটে। ওরিন রুমে ঢুকে আয়শার কানে ফিস ফিস করে বললো…

” আপুউউউ..”

আয়শা আড়মোড়া হয়ে বললো..”হুম।”

” ড্রইংরুমে চলো, একটা সারপ্রাইজ আছে। ”

আয়শা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো..
” কি সারপ্রাইজ ওরিন?”

ওরিন মুখ টিপে হেসে বললো..
” আরে চলোই না। তাহলে তো দেখতে পারবে। ”

ওরিন রুম থেকে বের হলো, ওরিনের পিছু পিছু আয়শা রুম থেকে বেরিয়ে ভুত দেখার মতো তাকিয়ে রইলো। সোফায় নাছিম বসে আছে৷ তার বাবার সাথে গল্প করছে৷ আয়শা নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারলো না, নাছিম তার বাসায়। আয়শা ওরিন কে বললো…

” আই কান বিলিভ ইট। আমি কি কল্পনা করছি নাকি সত্যি। নাছিম স্যার আমার বাসায়.. ”

ওরিন আয়শার হাতে চিমটি কেটে বললো..

” এটা স্বপ্ন না। আপা এটা সত্যি। ”

আয়শা চিমটির ব্যাথায় ” আউউউচ “বলে শব্দ করলো।

নাছিম আয়শার দিকে তাকালো। আয়শার উদ্দেশ্য বললো..

” কেমন আছেন মিস.আয়শা?”

” ভালো আছি স্যার। আপনি হঠাৎ? ”

” ফ্রেন্ডের বাসায় যাচ্ছিলাম। ভাবলাম আপনার সাথে দেখা করে যাই। আপনার শরীর এখন ভালো তো?”

” জ্বি। ভালো। ”

আফজাল সাহেব আয়শার উদ্দেশ্য বললেন..
” বাসায় মেহমান এসেছে, নাস্তার ব্যাবস্থা করো..”

আয়শা হালকা হেসে বললো..

” স্যার আপনি চা কফি, নাকি কোল্ড ড্রিংক খাবেন? ”

সে দিন কার কফির কথা ভাবতেই নাছিম শিউরে উঠলো, নাছিম হাসি টেনে বললো…
” এখন কিছু খাবো না। অন্য এক দিন। ”

আয়শার বাবা বললেন.. ” এটা বললে হয় নাকি? তুমি প্রথম বার এসেছো আমাদের বাসায়। ”

নাছিম, ভদ্রতার খাতিরে বললো..
” কোন্ড ড্রিংকস। ”

আয়শা রান্না ঘরের দিকে গেলো। ফ্রিজ থেকে এক বোতল কোক গ্লাসে ঢেলে নিয়ে, নাছিমের কাছে গেলো। নাছিমের কাছে গ্লাস টা এগিয়ে দিয়ে দেখলো, বাবা চলে গেছে, ওরিন রুমে পড়তে বসেছে, হয়তো। নাছিম গ্লাস টা হাতে নিয়ে, আয়শা কে বললো…

” মিস, আয়শা বসুন প্লিজ। ”

আয়শা ওরনা দিয়ে ভেজা হাত মুছতে মুছতে সোফার এক কোনে বসলো। নাছিম সিরিয়াস কন্ঠে বললো..

” সে দিন আপনাকে রুমে কেউ আটকে দিয়েছিলো। ইচ্ছা করে। ”

” কিহহ”

” হ্যাঁ। মিলি আর নিলা। ”

আয়শা হতাশা কন্ঠে বললো.. ” কিন্তু কেনো এমন টা করলো? আমি কি দোষ করেছি। ”

“আপনি কোনো দোষ করেন নি। ওরা আপনাকে হিংসা করতো। ”

” ছিঃ আমাকে ওরা অপছন্দ করতো আগে থেকেই বুঝেছিলাম। তাই বলে এমন টা করলো। ”

নাছিম আয়শার হাতের ওপর হাত রেখে বললো..

” কাম ডাউন। আমি ওদের ব্যাবস্থা করেছি। আপনার কিচ্ছু হবে না। ”

আয়শা নাছিমের মুখ পানে তাকিয়ে রইলো। এই ভয়ংকর লোকটার কথায় আয়শা এতো ভরসা পায় কেনো? মাঝে মাঝে আয়শার মনে হয়, নাছিম যতো ক্ষন তার সাথে আছে কেউ তার কোন ক্ষতি কর‍তে পারবে না। নাছিম তাকে সেইফ করবে।

হঠাৎ ওরিন ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখলো, নাছিম বস আয়শার হাত ধরে, আছে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। ওরিন ফটা ফট একটা ছবি তুলে নিলো। ইচ্ছা করে কাঁশি দিলো। আয়শা নাছিমের ধ্যান ভঙ্গ হতেই আয়শা এদিক ওদিকে তাকাচ্ছে। নাছিম ও বেশ লজ্জায় পড়ে গেলো, গ্লাস থেকে দু চুমুক কোক খেয়ে নাছিম বললো…

” মিস আয়শা আজ আমি আসি। ”

” আচ্ছা। ”

নাছিম সোফা থেকে উঠে বাইরে চলে গেলো। ওরিন ঠোঁট টিপে হাসতে হাসতে বললো…

” কি করছিলে আপু?”

আয়শা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো..
” কি করছিলাম? ”

ওরিন মুচকি হাসি দিয়ে ফোনে তোলা ছবিটা আয়শা কে দেখালো। আয়শা হা করে তাকিয়ে রইলো। উত্তেজিত কন্ঠে ওরিন কে বললো…

” এটা তুই কখন তুলেছিস?”

” যখন তোমাদের চোখে চোখে আলাপ চলছিলো, তখন। ”

” দে ফোনটা দে.. ওরিন। ”

ওরিন ফোন নিয়ে ভো দৌড়ে রুমে চলে গেলো। আয়শা কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

” ওরিন দিন দিন বেশি দুষ্ট হয়ে যাচ্ছিস। ”

ওরিন উঁকি দিয়ে বললো…
” ফোন আমি দেবো না। ”

আয়শা দৌড়ে ওরিনের পেছনে ছুটলো…

_____________________

সকাল এগারো টা দশ মিনিট….

ওরিন আর তনু ক্লাস করছে, ক্লাসে মাঝে ব্যাগ থেকে বই বের করতে যাবে ঠিক তখনি ওরিন দেখলো, তার ব্যাগে বোরখা দুটো নেই৷ ওরিন থত মত খেয়ে গেলো। বাসায় তো ব্যাগ চেক করাই হয়নি। আর আয়শা বেশি ভাগ সময় তার কাজে ব্যাস্ত থাকে। আয়শা তার ব্যাগে হাত দিবে না হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর। তাহলে বোরখা দুটো গেলো কোথায়?

তনু ওরিনের কানে ফিস ফিস করে বললো..
” স্যার পড়া ধরতে পারে, বই বের কর। ”

ওরিন তনুর কানে ফিসফিস করে বললো..
“দোস্ত বোরখা দুটো খুঁজে পাচ্ছি না। ”

তনু চমকে গিয়ে বললো..”কিহহ! কোথায় গেলো বোরখা, কেউ চুরি করবে?”

” তাহলে? বোরখা কে নিলো?”

” কলেজে আসার পর ব্যাগ আমার কাছেই ছিলো। চুরি নো চান্স। ”

” গতকাল বাসায় যাবার পর ব্যাগ চেক করেছিলি?”

ওরিন, দুঃখী দুঃখী মুখ করে বললো.. “নাহ রে। ”

” তাহলে হতেই তো পারে গতকাল বাসায় যাবার আগে বোরখা দুটো গায়েব হয়েছে।”

ওরিন কিছু একটা ভাবতে ভাবতে বললো…

” ওয়েইট! গত কাল ওই ইঁচড়েপাকা দুটো আমাদের কাছে কেনো এসেছিলো? আমি যখন ফুল কুড়াতে ব্যাস্ত ছিলাম, তখন ওদের সাথে কি কথা হয়েছিলো?”

” তেমন কিছুই না। জিজ্ঞেস করেছি আমি কেমন আছি।”

” মাই গড। তোকে ব্যাস্ত রেখে ব্যাগ সার্চ করে ওরা বোরখা নিয়ে গেছে। ”

তনু ভয় ভয়ে ঢোক গিলে বললো..

” ওরা মনে হয়, সব বুঝে গেছে। এবার কি হবে দোস্ত?”

” ক্লাস শেষে দ্রুত কেটে পরতে হবে। ওরা আমাদের দেখার আগেই তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে যাবো। ”

” ওকে দোস্ত। ”

ক্লাস শেষে ওরিন আর তনু দ্রুত বের হতে যাবে ঠিক তখনি কেউ পিছু ডাক দিলো। দুজন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো..


চলবে
#ইঁচড়েপাকা_এবং_সে❤️
#Ruhi_Jahan_Maya

পর্বঃ–২৮

বিশাল সেই কৃষ্ণচূড়া গাছ টা নিচে, কাঠের পাতা ব্রেঞ্চিতে দুজন বসে আছে। শান বাধানো পুকুরের কাছে, বাধন দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগেই যখন ওরিন আর তনু গেট দিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনি, বাধন তাদের পিছু ডাক দেয়, দু জনই মূর্তি মতো দাঁড়িয়ে রইলো।

সিনিয়ার ভাই দের ভয় দুজন ঢোক গিললো। তনু কিছুটা ভীতু প্রকৃতির হলেও ওরিন খুব একটা ভয় পায় না কাউকে। এখন কেনো জানি ওরিনেও ভয় ভয় লাগছে । বাধন দু’জনের উদ্দেশ্য করে বললো..
” ফরিদ তোমাদের পুকুর ঘাটের কাছে, অপেক্ষা করতে বলেছে। ”

ওরিন অবুঝ মুখ করে, হালকা হাসি দিয়ে বললো…

“কেনো ভাইয়া। আমরা কি করেছি?”

” নাহ তোমরা কিছু করো নি।”

তনু ওরিনের সাথে তাল মিলিয়ে হেসে বললো..
” আমাদের মতো ইনোসেন্ট মেয়েরা কি, কিছু করতে পারে। ”

বাধন মুখ বাকিয়ে বললো,
” একদম নাহ। তোমাদের মতো নিষ্পপী মেয়ে আর তিনটা আছে নাকি? ”

তনু কানের পিঠ চুলকাতে চুলকাতে বললো..
” তাই তো তাই তো!”

ওরিন তনুর কানে ফিস ফিস করে বললো..
” এটা একটু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে না৷ ”

তনু ওরিনের কানে ফিস ফিস করে বললো…
” কি করবো দোস্ত। একটিং না করলে তো ধরা খেয়ে যাবো।”

” তুই যেটা করছিস সেটাকে ওভার একটিং বলে। ”

” ওপসসস নার্ভাস হয়ে যাচ্ছি রে দোস্ত। ”

বাধন মৃদু ধমক দিয়ে বললো..
“নিজের মধ্য ফুসু ফুসুর না করে, পুকুরের কাছে চলো। ”

বলেই, বাধন হাটা শুরু করলো, বাধনের পিছু পিছু ওরিন আর তনুও গেলো। দুজন মনে মনে দো’য়া পড়তে পড়তে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পরও ফরিদ আসছে না। ওরিন এদিক সেদিক তাকিয়ে,বললো…

” ভাইয়া আর কতক্ষণ বসে থাকবো? ”

তনু কাচুমাচু হয়ে হয়ে বললো..
“বাসায় যেতে লেট হলে আম্মু চিন্তা করবেন।”

ফরিদ ঘড়ির দিকে এক নজর তাকিয়ে বললো…
” আর একটু অপেক্ষা করো আজকে, ফরিদের এক্সট্রা সাব্জেক্টের এক্সাম আছে। ”

ওরিন বসে বসে বিরক্ত অনুভব করে, আবার কৃষ্ণচূড়া ফুল কুড়াতে শুরু করলো। লাল টকটকে তাজা কৃষ্ণচূড়া ফুল ওরিন কানের পিঠে গুজে নিলো। কয়েক মিনিট পরই ফরিদ তাড়াহুড়ো করে এলো…

” সরি গাইজ। লেট হলো। মাস্টার্সের ফাইনাল এক্সাম বুঝোই তো, কতো প্যারা।”

ওরিন দাঁড়িয়ে বললো..
“ইটস ওকে। আচ্ছা আমাদের কেন ডেকে ছিলেন?”

ফরিদ ওরিনের দিকে তাকালো। উজ্জ্বল মুখে গাড়ো লাল কৃষ্ণচূড়া বেশ মানিয়েছে ওরিন কে। হালকা বাতাসে ওরিনের চুল গুলো উড়ছে। ফরিদ ক্ষানিক সময়ের জন্য স্ট্যাচুর মতো ওরিনের দিকে তাকিয়ে রইলো।

ফরিদের সামনে ওরিন হাত দুটো নাড়িয়ে বললো…

” কি ভাবছেন? ”

ফরিদ মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো..
” কিছু না। তোমাদের জন্য। সারপ্রাইজ আছে। ”

তনু কিছুটা এক্সাইটেড হয়ে, বললো…

” কি সারপ্রাইজ ভাইয়া?”

ফরিদ পেছন থেকে হাত দুটো সামনে আনলো। ফরিদের হাতে কালো রংয়ের দুটো বোরখা। ওরিন আর তনু দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। ওরিন ঢোক গিলে বললো…

” এটা কি?”

ফরিদ উত্তর দিলো ” দুটো বোরখা।”

ফরিন জোর পূর্বক ঠোঁট টেনে হাসে বলল…
” আমাদের কে কেনো দিচ্ছেন ভাইয়া?”

ফরিদ কিছুটা বিরক্ত গলায় বললো…
” ভাইয়া ভাইয়া করছো কেনো৷ আমি তোমার কোন সম্পর্কে ভাই হই? ”

ফরিদের রাগ দেখে, ওরিন বেশ ক্ষানিকটা আবাক হলো,..
” না মানে। আপনি সিনিয়ার না। ”

” সো হুয়াট?”

” নাথিং। ”

“তোমরা বলছো বোরখা তোমাদের না?”

” জ্বি না। ”

ফরিদ বোরখা দুটো দলা পাকিয়ে পুকুরে ফেলে দিলো।”

” এই এই… আপনি কি করলেন?বোরখা দুটো ফেলে দিলেন কেনো?”

ফরিদ ভাব নিয়ে বললো..
” আমি ভেবেছিলাম। বোরখা দুটো তোমাদের। এখন তোমাদের না তো, বোরখা গুলো দিয়ে কি করবো?
আমি তো আর মেয়ে নই। ”

” তাই বলে বোরখা দুটো ফেলে দিলেন? ”

” কেনো খুব আফসোস হচ্ছে বুঝি?”

ওরিন বিড়বিড় করে বললো ” বোরখা দুটো পানি তে ফেলে দিলো, তোর পিন্ডি চটকাতে ইচ্ছা করছে।”

” কিছু বললে?ওরিন। ”

” নাহ কিচ্ছু বলি নি। লেট হচ্ছে, এখন আমরা আসি। ”

বলেই ওরিন তনু হাটা শুরু করলো। তনু বললো..
” দোস্ত ওখানে আমার মায়ে বোরখা ছিলো৷ মা যখন বোরখা খুঁজবে তখন কি করবো? ”

” কি আর বলবি। আমার বোরখাটাও তো ছিলো ওখানে সব তো ভাসিয়ে দিলো হাদাটা। ”

ফরিদ দাঁড়িয়ে ওরিনের যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে। মনে মনে হাসছে।
‘তোমরা যে মেইন কালপ্রিট তা তো আমি আগেই বুঝেছি। তোমরা স্বিকার করো নি এবার ঠেলে সামলাও। ‘
ফরিদ শীশ বাজাতে বাজাতে হাটতে শুরু করলো।

———————————-

” স্যার আসবো?”

কারো মিষ্টি কন্ঠের শব্দ শুনে নাছিম, সামনে তাকালো,আয়শা এসেছে। নাছিম ভেতরে আসার অনুমতি দিয়ে বললো…

” আপনার তো আজকে আসার কথা ছিলো না। তাহলে..”

” এখন তো আমি ঠিক আছি। একদম সুস্থ। ”

” দ্যাটস গুড। ”

আয়শা হাসলো, নাছিম খেয়াল করে দেখলো, আয়শার হাসিটা বেশ মিষ্টি লাগে দেখতে। আয়শা নাছিমে কে বললো…

” স্যার মিলি আর নিলা কাউকেই তো দেখছি না? ”

” ওনারা অফিসে কাজ করবেন না, গার্মেন্টস সেকশনে ট্রান্সফার হয়েছে। ”

” ও আচ্ছা। ”

” ভায় পাবেন না। কেউ আপনার কিছু করতে পারবে না। ”

নাছিমের কথা গুলো আয়শার কানে বাজিতে শুরু করলো৷ আয়শা ভালো লাগছে কথা টা শুনে। কিন্তু কেনো ভালো লাগছে, তা বুঝতে পারছে না। আয়শা ইচ্ছ, হচ্ছে নাছিম আরো বলুক ‘ আয়শা আমি তোমার পাশে আছি। তোমার সাথে আছি। ‘

” কিছু বলছেন না যে?”

নাছিমের কথায় আয়শার ভাবনা ছেদ পড়লো। আয়শা বিন্দু বিন্দু ঘামছে। আয়শা যখন অতিরিক্ত ভাবনায় থাকে তখন নার্ভাস ফিল করে প্রচুর। আয়শা নাছিম কে বললো…

” কিছু না স্যার। এখন আসি। ”

” ওকে। ”

আয়শা নিজের ডেক্সে কাছে চলে এলো। নিজের এই উল্ট পালটা ইচ্ছা থেকে নিজের কাছেই নিজের খুব লজ্জা লাগছে। কেনো এমন ভাবনা আসে আয়শার মনে। কেনো ওই লোকটার প্রতি দিন দিন এতো ভালো লাগা জন্ম নিচ্ছে তার মনে।

আয়শা দু হাত দিয়ে মাথাটা চেপে চোখ বন্ধ করে বসে রইলো। তার এখন মেডিটেশনের দরকার। এতো হায়পার হলে চলবে না। আয়শা নিজেকে ব্যাস্ত রাখার জন্য, মারিয়ার বিয়ের ভিডিও গুলো এডিট করতে মন দিলো। আয়শা মারিয়ার বিয়ের ভিডিও এডিট করছে, কম্পিউটার স্ক্রিনে নাছিম কে দেখা যাচ্ছে।

সেই আকাশীরংয়ের পাঞ্জাবি পড়া। দেখতে নাছিম কে কতো সুদর্শন লাগছে। সে দিন নাছিম আয়শার খোঁপায় দুটো সাদা গোলাপ গুঁজে দিয়েছিলো। সাদা গোলাপের সুভাষ সাথে এই ভয়ংকর লোকটা। ভাবতেই আয়শার কেন জানি খুব ভালো লাগছে।

আয়শা নাছিমের কেবিনের দিকে তাকালো। সচ্ছ কাঁচের বরাবর নাছিম কে দেখা যাচ্ছে, বাতাসে কপালের কাছে কয়েকটা চুল উড়ছে। নীল রঙের শার্ট লাল রঙের হালকা লাল রঙের টাই৷ নীল রঙের আবিষ্কার মনে হয় এই ভয়ংকর লোকটার জন্যই হয়েছিলো।

কম্পিউটারে মগ্ন হয়ে কাজ করছে নাছিম। আর এই অবাধ্য তরুনী তার দিকে তাকিয়ে আছে, সে কি কিছু বুঝে না? কেনো বুঝেনা?
আয়শার পাশে রাখা টেলিফোনটা শব্দ করে বেজে উঠলো।

আয়শা ফোনটা কানে নিয়ে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে নাছিম বললো…

” আমার কে দেখা শেষ হয়েছে?”

আয়শা চোখ বুজে জ্বিহবায় কামড় দিল। এই লোকটা কিভাবে বুঝে যায়। আয়শার লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করছে। টেলিফোনের ওপাশ থেকে নাছিম আবারো বললো…

” আমাকে দেখা শেষ হলে, দয়া করে আমার রুমে আসুন। ”

আয়শা ফোনটা রেখে দিলো। কম্পিউটারে মনিটর অফ করে নাছিমের কেবিনের দিকে গেলো। নাছিমের অনুমতি নিয়ে, ভেতরে ঢুকলো আয়শা।

নাছিম কম্পিউটারের মনোযোগ সরিয়ে আয়শার দিকে তাকিয়ে বললো…

” মিস, আয়শা আপনার জন্য একটা খবর আছে। ”

আয়শা একটু অবাক হলো। পর মূহুর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো…
” কি খবর স্যার। ”

নাছিম বলতে শুরু করলো…



চলবে।