#ইতি_নিশীথিনী
#৪র্থ_পর্ব
এর মাঝেই কলিংবেল বেঁজে উঠে, নিহিতা ছুটে এসে দরজা খুলে। দরজার বাহিরে পুলিশকে দেখতেই চমকে উঠে নিহিতা। বিস্মিত কন্ঠে বলে,
“কাকে চাই?”
“নিশী হক আছেন? আমরা তার খোঁজে এসেছি”
পুলিশটির কথায় আরোও খানিকটা ঘাবড়ে গেলো নিহিতা। নিশী গতরাতে বাড়ি ফিরে নি। বাসায় এসেছে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়। প্রশ্ন করলেও খুব একটা উত্তর দিচ্ছে না। আবার সকাল হতে না হতেই পুলিশের আগমণ। সবকিছুই যেনো ধোঁয়াশা। নিহিতা কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করে,
“কেনো? নিশীপুকে খুঁজছেন কেনো?”
এর মাঝেই রাহেলা বেগম দরজায় আসছেন। পুলিশকে দেখেও তিনি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। যতই মধ্যবিত্ত পরিবারে পুলিশ ব্যাপারটা বেশ আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পুলিশটি স্মিত কন্ঠে বললো,
“দেখুন আমি সদর থানা থেকে এসেছি, আমজ সাব ইন্সপেক্টর মুহিব। যদি নিশী হক বাড়িতে থাকে তবে ডেকে দিন। উনার নামে ওয়ারেন্ট বের হয়েছে”
“কিসের ওয়ারেন্ট?”
“এটেম্প টু মা*র্ডা*রের ওয়ারেন্ট”
রাহেলা বেগম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি জোরে হাক দিলেন জামশেদ সাহেবকে। তিনি ভেতর থেকে ছুটে এলেন। নিশীও এলো তার পিছু পিছু। মুহিব যেনো একটু বিরক্তই হলো। সে বারবার হাতের ঘড়ি দেখতে লাগলো। নিশী বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“চাচী কি হয়েছে? এভাবে ডাকছেন কেন?”
রাহেলা বেগম কিছু বলার আগেই মুহিব বেশ গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“আপনি নিশী হক?”
“জ্বী আমি নিশী হক”
“আমাদের সাথে একটু থানায় যেতে হবে”
“কেনো?”
“মাহাদী শেখকে হ*ত্যা*র চেষ্টায় আপনার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সোলাইমান শেখ”
কথাটা শুনতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো নিশী। তার মস্তিষ্ক যেনো মূহুর্তেই অকেজো হয়ে গেলো। যে মানুষটি তার ইজ্জতভ্রষ্ট করার প্রচেষ্টা করেছিলো তাকে হ*ত্যা*র মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। কপালে জমছে বিন্দু বিন্দু ঘাম, গলা ক্রমশ শুকিয়ে আসছে তার। এর মাঝেই রাহেলার তীক্ষ্ণ কন্ঠ কানে এলো নিশীর। তার বাহু ঝাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
“নিশী সত্যি করে বলো, কাল রাতে কোথায় ছিলে?”
নিশী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। ভেতরের শূণ্য অনুভূতি তাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। গতরাতের বর্বরতার পর আজ নতুন বিপদের মুখোমুখি নিশী। সব মিলিয়ে যেনো বড্ড ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে সাহসী মনটা। সন্তপর্ণে একটা ছোট নিঃশ্বাস গোপন করলো সে। তারপর শান্ত কন্ঠে বললো,
“আত্মরক্ষা যদি দোষ হয়, তবে আমি দোষী৷ হ্যা, আমি তাকে আক্র*মণ করেছি৷ কিন্তু সেটা কেবল নিজের সম্মান বাঁচাতে।”
মুহিব ভ্রু কুঞ্চিত করে তীর্যক নজরে তাকালো নিশীর দিকে। আপাদমস্তক একবার দেখে নিলো সে। নিশীর ঠোঁটের কাঁটা, গলার আঁচড়, হাতের ব্যান্ডেজ যেনো অনেক কিছুই ইশারা করলো। তারপর শান্ত কন্ঠে বললো,
“তবুও আইনের হাতে আমরা বাঁধা। আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে”
নিহিতা নিশীর রাত শক্ত করে ধরলো। কিন্তু নিশীকে ধরে রাখতে পারলো না। তাকে যেতে হলো মুহিবদের সাথে। জামশেদ সাহেব ফোন খুঁজতে উদ্ধত হলে রাহেলা বেগম বাঁধ সাধলেন। হিনহিনে স্বরে বললেন,
“খবরদার, তুমি এর মধ্যে জড়াবা না। একটাবার ভাবছো আমাদের একটা মেয়ে আছে”
“নিশীও তো এই বাড়ির মেয়ে”
“রাতের বেলা কি না কি করছে! তুমি এর মধ্যে থাকবা না ব্যাস”
রাহেলা বেগমের সাথে তর্কযুদ্ধে পরাজিত হলেন জামশেদ সাহেব। নিজেদের সম্মান রক্ষার্থে তিনি দমে গেলেন।
একটা বদ্ধ ঘরে মুখোমুখি বসা নিশী এবং সদর থানার অসি দীপঙ্কর হালদার। আলোর আছে তবে তা প্রাকৃতিক নয়, একটি ২২০ ভোল্টের বালব জ্বলছে ঠিক নিশীর মাথার উপর। ঘরে কোনো জানালা নেই। টেবিলের উপর রাখা একটি অর্ধখাওয়া চায়ের কাপ আর বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে সিগারেটের ছাই। দীপঙ্কর তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিশীর দিকে। নিশী শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে দীপঙ্করের চোখের দিকে। মুহিব ও বসে রয়েছে পাশে। আজ সকালেই থানায় এসে নিশীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন সোলাইমান শেখ। তার ভাষ্য মতে, নিশী মেয়েটির নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য মাহাদীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলো। মাহাদীও প্রেমে অন্ধ হয়ে নিশীকে মাথায় করে রেখেছে। কিন্তু নিশীর গত রাতে তার ছেলেকে মা*রার চেষ্টা করে। মাথায় ভারী চো*ট পায় মাহাদী। এখন হাসপালের আইসিউ তে ভর্তি সে। একটুর জন্য তার ছেলে প্রাণে বেঁচে গেছে। সোলাইমান শেখের টাকা এবং ক্ষমতার জন্য সকলেই নাস্তানাবুদ। ফলে এই অভিযোগটি দীপঙ্কর গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। তার ফলাফল আজ নিশীকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।
বদ্ধ কক্ষের নিস্তব্ধতা ভাঙ্গলো মুহিব। ধীর কন্ঠে বললো,
“আপনার ভাষ্যমতে মাহাদী আপনার সাথে অসভ্যতা করেছে, রে*প এর ট্রাই করেছে? আপনার সাথে তার কোনো সম্পর্ক ছিলো না?”
“জ্বী, আমি তাকে ঘৃণা করি। ফলে সম্পর্ক হবার তো প্রশ্ন আসে না”
“আচ্ছা, আপনি বলছেন আপনাকে কিডন্যাপ করেছিলো। আর হাইওয়ের ওখানে নিয়ে যায়। কিভাবে গিয়েছেন জানেন?”
“জ্বী না, আমি অজ্ঞান ছিলাম”
এবার দীপঙ্কর কিছুটা বিরক্ত স্বরে বলে,
“দেখুন বানিয়ে কথাগুলো বলা ছাড়ুন। আপনি কাল প্রতিদিনের মতো মাহাদী শেখের সাথে আর বাগান বাড়িতে যান। সেখানেই আপনাদের কথাকাটাকাটি হল আপনি তাকে প্র*হার করেন। এটাই সত্যি, কি ভুল বলছি?”
“মোটেই না। উনারা মিথ্যে কথা বলেছেন”
“আপনাদের মতো মেয়েদের ভালো করেই চেনা আছে আমার। টাকা ছড়ালে সব করতে পারে। আদোতে ক জনের সাথে সময় কাটিয়েছেন কে জানে! মাহাদীর টাকা, ক্ষমতার লোভ হয়তো সামলাতে পারেন নি। তবে মা*রার প্রচেষ্টা কেনো করলেন? আচ্ছা মাহাদীর প্রতিপক্ষ ঈশানের সাথে তো আপনার বেশ খাতির। তার কাছ থেকেই টাকা খান নি তো?”
নিশীর ভ্রু কুঞ্চিত হলো। চোখে ক্রোধের ছাপ। দীপঙ্করের বিশ্রী হাসি গায়ে কাটার মতো বিঁধছে। কান যেনো সহ্য করতে পারছে না এমন বিশ্রী কথা গুলো। খানিকটা রাগান্বিত কন্ঠে নিশী বললো,
“ঈশান ভাই এর সাথে আমার খাতির আছে এটা বের করতে পারলেন কিন্তু এটা জানলেন না যে মাহাদী নামক মানুষটাকে আমি অত্যন্ত অপছন্দ করি! তার সাথে আদৌও আমার সম্পর্কটি কেমন সেটা খোঁজ নিতে পারলেন না? অদ্ভুত!”
দীপঙ্করের হাসি এবার দমলো। সে কিছুই খোঁজ নেয় নি। যা তাকে বলা হয়েছে সে সেটাই পাথরের গায়ে খোঁদাই বলে মেনে নিয়েছে। এবার মুহিব শান্ত কন্ঠে বললো,
“আপনাকে কাল মেডিক্যাল টেস্ট করানো হবে। আদৌ আপনার সাথে খারাপ কিছু করার চেষ্টা হয়েছে কিনা সেটার রিপোর্ট লাগবে। কি পরিচিত কোনো উকিল রয়েছে! থাকলে যোগাযোগ করতে পারেন”
নিশী কোনো কথা বললো না। শুধু চেয়ে রইলো টেবিলের উপর পড়ে থাকা ছাই এর দিকে। ভেবেছিলো চাচা-চাচী অন্তিত থানায় আসবেন। কিন্তু তারা কেউ ই এলো না। আপন বলতে আর কেউ নেই তার। তবুও বেহায়ার মতো বাসায় ই ফোন লাগালো সে। ফোনটি বাজলো তবুও কেউ ধরলো না। নিশীর মাঝে মাঝে বিধাতাকে প্রতি বেশ অভিমান হয়, কেনো তার বাবাকে এতোটা দ্রুত কেঁড়ে নিলেন তিনি! সে থাকলে হয়তো এভাবে অপদস্ত হতে হতো না। নিশী বাধ্য হয়ে প্রত্যুষীকে ফোন করলো। মেয়েটি তার ছোটকালের বান্ধবী। প্রত্যুষী ফোন ধরলে তাকে সবকিছু খুলে বলে নিশী। কিন্তু প্রত্যুত্তরে প্রত্যুষী কাঁপা স্বরে বলে,
“তুই কেনো মাহাদীকে মা*র*তে গেলি! বলেছিলাম বেশি সাহস ভালো না”
নিশী উত্তর দিলো না। শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস গোপন করলো। ভেতরটা হাহাকার করছে। প্রচন্ড ক্লান্ত সে। গতরাতের নিষ্ঠুরতার পর আজকের এই কটুক্তির বান এবং মিথ্যে অভিযোগ যেনো নিতে পারছে না সে। বারবার মনআকাশে কালো মেঘ জমছে। কিন্তু বাবা বলতেন “দূর্বলরা যখন হেরে যায় তখন তারা কাঁদে, তুই দূর্বল নস। তাই কাঁদবি না”
আজ বাবার কথাটা মিথ্যে করে দিলো নিশী। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো নোনা অশ্রু। যখন সব দরজা বন্ধ দেখলো তখন মনে পড়লো, আগুন্তকের কথা। গতরাতে আগুন্তকের ন্যায় তাকে সহায়তা করেছিলো সে। সে নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলো পুলিশের ভায়রাভাই বলে। নিশী নিজের ওড়নার গিটে রেখেছিলো লোকটির কার্ড। যাবার সময় হয়তো এই কার্ডটি সৌজন্যরুপে দিয়েছিলো লোকটি আবার তার থেকে ধারকরা টাকাটা আদায় করার কথাটা ভেবে হয়তো দিয়েছিলো। যতই হোক, হাসপাতালের বিল তো কম আসে নি। কার্ডটি বের করে একবার চোখ বুলালো নিশী। “এডভোকেট মাহতাব হোসেন প্রণয়” নামটির নিচে একটি নম্বর লেখা। লোকটি একজন হাইকোর্টের ক্রিমিন্যাল লয়ার। সেই কারণেই বলেছিলো পুলিশের ভায়রাভাই। একরাশ সংকোচ নিয়ে ফোন লাগালো তাকে নিশী। সে না ধরার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু ডুবন্ত মানুষ খড়কুটাকে ধরেও বাঁচতে চায়। নিশীর অবস্থাটি হয়েছে তেমন। অপরিচিত একটি মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন করবে সে। কি অদ্ভুত নিশী হকের জীবন!
ফোনটি বাজছে। ভীষণ শব্দ করে ঘর কাঁপিয়ে বাজছে। চারবারের বেলায় অবশেষে প্রণয় ফোনটি ধরলো। অপরিচিত নম্বরের জন্য প্রথমে বেশ বিস্মিত হলো সে। সাধারণত কেসের ব্যাপারে তার এসিসটেন্টদের সাথেই মানুষ যোগাযোগ করে থাকে। তবুও কিছু একটা ভেবে সে ফোনটি ধরলো। ভারী কন্ঠে বললো,
“আসসালামু আলাইকুম, কে বলছেন?”
“আমি”
“আমি কে?”
“যাকে কাল রাতে আপনি সাহায্য করেছিলেন”
অপরপাশে মেয়ে কন্ঠটি শুনতেই ভ্রু কুঞ্চিত হয় প্রণয়ের। যখন জানতে পারে মেয়েটি গতরাতের তখন যেনো আরোও বেশি অবাক হয় সে। অপরিচিত মেয়েটির আচারণ প্রতি মূহুর্তে বেশ অবাক করছে প্রণয়কে। প্রথমে গাড়ির সামনে ঝাপ দেওয়া। তারপর তার কাছ থেকে মেডিক্যাল ফি এবং বাড়ি যাবার টাকা ধার চাওয়া। প্রতিটিবার বেশ অবাক হচ্ছে প্রণয়। কিন্তু কৌতুহল দমিয়ে বললো,
“জ্বী বলুন”
“আপনি তো উকিল, আমার একটা কেস লড়তে পারবেন?”
“কিসের কেস?”
“এটে*ম্প টু মা*র্ডার কেস”
কথাটা শুনতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো প্রণয়। মেয়েটি কি বলছে! সত্যি কি কাউকে খু*ন করার চে*ষ্টা করেছে!
******
মুখোমুখি বসে আছে নিশী এবং প্রণয়। প্রণয়ের মুখে কোনো শব্দ নেই। সে ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকিয়ে আছে নিশীর দিকে। নিশী তার হাতদুটো ঘষছে। অচেনা মানুষটি যে আসবে এটাই অকল্পনীয় ছিলো তার জন্য। ঘর জুড়ে নীরবতা, সেই নীরবতায় ছেদ ঘটিয়ে গভীর কন্ঠে প্রণয় বললো,
“আপনার উপর তালায় মালমশলায় সমস্যা আছে, প্রথমে আমার গাড়ির সামনে ঝাপ দিলেন। তারপর আমার কাছে মেডিক্যাল ফি আর বাড়ি যাবার টাকা ধার চাইলেন। এখন শুনছি কাল রাতে কারোর মাথা ফা*টি*য়ে দিয়েছেন। সেই কেস আমাকে লড়ার অনুরোধ করছেন। একজন অচেনা মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত সাহায্য চাওয়া হয়ে যাচ্ছে না?”
“আমার মাথা অকেজো হলে আপনারটা যে বেশ ভালো সেটা বলতে পারছি না। কারণ এই অচেনা মানুষের ফোনেই নাওয়া ঘুম ছেড়ে এখানে চলে এসেছেন আপনি। তাহলে মালমশলার ঘাটতি আপনার উপর তালায় ও আছে বলতে হবে”
প্রণয় তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালো নিশীর দিকে। তারপর গাল ফুলিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়লো। হাতজোড়া টেবিলের উপর রেখে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“ভেবে দেখুন, আপনি কি সত্যি কেসটা লড়তে চান! ওরা কিন্তু অনেক পাওয়ারফুল। আপনার সত্যতা প্রমাণের আগেই আপনার গায়ে কাঁদা ছুড়ে দিবে। তখন ভয় পাবেন না তো?”……….
চলবে