#ইতি_নিশীথিনী
#৫র্ম_পর্ব
প্রণয় তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালো নিশীর দিকে। তারপর গাল ফুলিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়লো। হাতজোড়া টেবিলের উপর রেখে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“ভেবে দেখুন, আপনি কি সত্যি কেসটা লড়তে চান! ওরা কিন্তু অনেক পাওয়ারফুল। আপনার সত্যতা প্রমাণের আগেই আপনার গায়ে কাঁদা ছুড়ে দিবে। তখন ভয় পাবেন না তো?”
নিশী কিছুসময় চুপ করে রইলো। শুধু টেবিলের উপর নজর স্থির রেখে বসে রইলো সে। মুখ থেকে শব্দটি বের হলো না তার। প্রণয় ভাবলো মেয়েটি ভয় বোধহয় পেয়েছে। ভয় পাওয়াটি খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। ভয় প্রবৃত্তিটি মানুষের চিন্তনে সর্বদাই সুপ্ত থাকে। মানুষের মন কখনোই তার অস্তিত্বকে মানতে চায় না। সে সর্বদাই এই ভয়টিকে অগ্রাহ্য করার প্রচেষ্টায় থাকে। কিন্তু ঘটনাচক্রে সেই ভয়টি তার লুকায়িত প্রকোষ্ঠ থেকে বেড়িয়ে আসে। এবং ধীরে ধীরে গ্রাস করে মস্তিষ্ক এবং হৃদয়। আর সমাজে বসবাস করতে হলে মানুষ যেটা সর্বাধিক ভয় পায় সেটা হলো সম্মানহা*নী এবং প্রা*ণহা*নী। নিশীর ক্ষেত্রে উভয় ই ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সম্মানহা*নী। সমাজের মানুষ কেউ যাচাই করতে যাবে না মেয়েটির সাথে কি ঘটেছে। তারা চোখ বুজে বলে দিবে সে সমাজের ক*লঙ্ক। নীরবতা গাঢ় হতে দেখে প্রণয় চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো। নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,
“সাহস কি জানালা দিয়ে পালালো! অস্বাভাবিক নয়। তবে আপনার যা অবস্থা তাতে জলে কু*মির ডাঙ্গায় বা*ঘ। পালানোর উপায় নেই”
“আমি ভয় পাচ্ছি সেটা আপনাকে কে বললো? আমার ভয় হচ্ছে না, শুধু বিশ্বাস করতে পারছি না আপনি সত্যি আমাকে সাহায্য করবেন। আমার আপন চাচা-চাচী আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সেখানে আপনি একজন আগুন্তক ব্যাতীত কিছুই নন”
নিশী স্বাভাবিক কন্ঠে কথাটা বললো। তার চোখে সূক্ষ্ণ সন্দেহের রেখা। মুখশ্রী কঠিন। প্রণয়ের ঠোঁটে বাঁকা হাসির উদয় হলো। ওকালতি জীবনে মানসিকভাবে দৃঢ় মানুষ খুব কম চোখে পড়েছে তার। সাধারণত বিপদে পড়লে মানুষ বিচলিত হয়ে পড়ে। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দিশাহীনের মতো ছুটে। কিন্তু নিশীর ক্ষেত্রে এমনটি নয়। তার চোখে মুখে হাহাকার আছে বটে তবে নিজেকে ভীষণ কঠিনভাবে শান্ত করে রেখেছে সে। এমন সাধারণত দুধরণের লোকেরা করে। প্রথম পক্ষ যারা সামনের মানুষকে চমকে দিতে চায়, দেখাতে চায় আমার মস্তিষ্ক বেশ জোরালো। দ্বিতীয় পক্ষ, যারা সত্যি ই এমন কঠিন মানসিকতার অধিকারী হয়। নিশী ঠিক কোনো ধাঁচের অনুমান করতে পারছে না প্রণয়। তবে মেয়েটির একটা বিষয় তাকে বেশ টানছে। তা হলো তার দীপ্তমান নয়ন। চোখগুলো যেনো আত্মবিশ্বাসের জোয়ারে জ্বলজ্বল করছে। তার দৃষ্টির তেজ ই বিচিত্র। প্রণয় বুকে হাত বেঁধে বললো,
“আপনাকে দেখে না একটা চরিত্রের কথা মনে পড়ে গেলো”
নিশী ভ্রু কুচকে তাকালো। মুখে কিছু বললো না। প্রণয় হাসির প্রসার ঘটিয়ে বললো,
“নিশীথিনী পড়েছেন? বেশ চমৎকার একটি বই। এখানে একটি নীলু নামের একটি চরিত্র আছে। মেয়েটির ধারণা ছিলো তার মাঝে দেবীর ভর। বেশ আত্নবিশ্বাসী ছিলো সে। আপনার ও কি তাই ধারণা?”
“বাবা বলতেন, “প্রতিটি নারীর মাঝেই একটি অনন্য ক্ষমতা আছে, কারণ একমাত্র নারীর থেকে জীবনের সঞ্চার হয়”। যদি বাবার কথা সত্যি হ, তবে হয়তো আমার মাঝেও দৈবিক ক্ষমতা আছে।”
বেশ শান্ত কন্ঠে কথাটা বললো নিশী। তবে তার বাক্যটি ছিলো বিষাদে ভরা, মলিনতার ছাপ অনুভূত হলো প্রণয়ের। প্রণয় কিছু বললো না। সে উঠে দাঁড়ালো৷ হাসি মুখে বললো,
“আসছি, আশা করছি আমাদের আবার দেখা হবে নিশীথিনী”
“নিশীথিনী” নামটি শুনেই বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নিশী। মনআকাশে আবার মেঘমেদুর জমেছে। এখনই বিদ্রোহ করবে তারা। ঝাপিয়ে নামবে শীতল বৃষ্টি। সেই বর্ষণে তলিয়ে যাবে হাহাকারেরা। আগুন্তক চলে যাচ্ছে, নিশী এখনো তাকিয়ে রয়েছে তারা যাবার পানে। আগুন্তক কি সত্যি ই বাঁচাবে তাকে, কে জানে________
****
মেয়েদের সেলে রাখা হয়েছে নিশীকে। নিশীর সাথে সাথে এখানে আরোও তিন জন নারী রয়েছে। একজন খু*নের দায়ে এসেছে, একজন ফ্র*ড কেস তো আরেকজন চুরি। নিশী হাত পা গুটিয়ে এক কোনায় বসে রয়েছে। মুক্তি প্রতীক্ষা করছে সে। কিন্তু মুক্তি যে সহজে মিলে না। এর মাঝেই একজন নারী তার গা ঘেষে বসলো। পান চাঁবাতে চাঁবাতে বললো,
“কি রে! কেনো এসেছিস এখানে? কি করেছিস?”
নিশী উত্তর দিলো না। বেশ বাজে গন্ধ মহিলার মুখে। একেই গতরাতে খাওয়া হয় নি। ফলে গা গুলিয়ে আসছে তার। নিশী উত্তর দিলো না। হাটুতে হাত রেখে মাথা এলিয়ে বসলো সে৷ ঘুম আসছে খুব। ক্লান্ত চোখজোড়া বিশ্রাম চায়। গয় রাতে বেশ জেরার সম্মুখীন হয়েছে সে। ফলে রাতটি নির্ঘুম কেটেছে। উপরন্তু এখানে মাটির শীতলতায় ঘুমও তাকে হলুদ কার্ড দেখিয়েছে। নিশীর এমন কাজে বেশ চটে উঠলেন মহিলা। তাকে সজোড়ে ধা*ক্কা দিয়ে বললেন,
“কানে কা*লা নাকি? শুনিস না?”
নিশী ঘুম ঘুম চোখে তাকালো। তারপর নির্লিপ্ত স্বরে বললো,
“আপনার মুখে বেশ গন্ধ চাচি। কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না”
কথাটায় মহিলার রাগ বাড়লো বই কমলো না। সে তীব্র স্বরে বললো,
“হাটুর সমান মাইয়া তোর সাহস দেখে আমি অবাক! আমার মুখে মুখে কথা কস! জানোস আমি কে?”
“আমি না জানলেও চলবে! আপনি তো জানেন আপনি কে! আশাকরি এতেই হবে”
বলেই চোখ বুজলো নিশী। মহিলাটি রাগে গজগজ করছেন। কিন্তু পাহারায় থাকা কন্সটেবলের ভয়ে কিছুই বলতে পারলো না। এর মাঝেই আরেকজন কন্সটেবল এলো৷ তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,
“নিশী হক আপনার সাথে দেখা করতে একজন এসেছেন”
নিশী চোখ খুললো। মস্তিষ্কে কথাটা ধারণ করতে সময় লাগলো। তার সাথে দেখা করতে কে এসেছে! চাচা? নিহিতা? নাকি প্রত্যুষী? দ্বিধাময় মনটাকে সাথে নিয়েই সাক্ষাৎ করতে গেলো সে। তাকে দেখতেই নিহিতা ছুটে এলো। মেয়েটির চোখ মুখ বসে গেছে। নিশীকে জড়িয়ে বললো,
“নিশীপু কেমন আছো তুমি?”
নিশী ম্লান হাসি হাসলো তারপর বললো,
“তুই কি কোচিং বাঙ্ক করে এসেছিস?”
“বুঝলে কি করে?”
“গতকাল তো ফোন ধরিস নি কেউ, তাই ভাবলাম চাচী বুঝি ১৪৪ ধারা জারি করেছেন”
“ক্ষমা করে দাও নিশীপু। বোন হয়েও তোমাকে সাহায্য করতে পারছি না”
নিশী তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললো৷ মলিন কন্ঠে বললো,
“ভবিষ্যত দেখার উপায় থাকলে ভালো হতো, নিজের নোংরা, বিশ্রী, আগাম বিষাদের খবরটা চট করে জেনে নিতাম”
নিশীর কন্ঠ ঈষৎ কাঁপছে৷ নিহিতা ব্যাস্ত গলায় বললো,
“এখান ছাড়া পাবার কি উপায় নেই?”
“একটা ব্যবস্থা হচ্ছে। হচ্ছে বললে ভুল। হতেও পারে, নাও হতে পারে। রবিবার আমাকে কোর্টে তো*লা হবে। তুই চাচা-চাচীকে জানাস। বেইলটা না হলে বোধকরি এখানেই থাকতে হবে”
নিহিতা মাথা নামিয়ে নিলো। নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে তার। প্রিয় বোনকে এতোটা অসহায় দেখতে মোটেই ভালো লাগছে না তার। নিশীকে জড়িয়ে বিক্ষিপ্ত বিষাদ গুলো অশ্রুরুপে বর্ষণ করলো নিহিতা। নিশী তার মাথায় আদরের সহিত হাত বুলিয়ে বলতে থাকলো,
“কাঁদিস না। আমার কিচ্ছু হবে না”
*******
ডুবন্ত সূর্য পশ্চিমে ঘোড়া জমিয়েছে। ব্যাস্ত দিনের অবসান ঘটাবে সে। নীলাম্বরের পশ্চিম কোনে তাই রক্তিম আভা দেখা যাচ্ছে। শ্রাবণের মেঘের সাথে মিলে এক অনন্য রুপের সৃষ্টি হচ্ছে। দক্ষিণে কালো মেঘ, পশ্চিমে রঙ্গিন প্রতিচ্ছবি। মাগরীবের আযান শোনা যাচ্ছে। মসে ঘেরা পুরান দেয়ালের গলিটি শান্ত। পুরোনো এই গলির মাথায় এসেছে প্রণয়। নিশী এই গলির কথাটি বলেছিলো। প্রণয় প্রমাণের খোঁজে এসেছে এখানে। একটা প্রমাণ না পেলে কাল মেয়েটির বেইল হবে না। আজ অবধি হেরে যাওয়া তার ডিকশনারিতে যুক্ত হয় নি। তাই এবারোও হারবে না সে। প্রণয় তীক্ষ্ণ নজরে আশপাশটা দেখলো। গলির একটু ভেতরে এক মুরুব্বিকে দেখা গেলো দোকানে শাটার দিচ্ছেন। হয়তো সে নামাযে যাবেন। গলিতে এই একটি মুদির দোকান ই নজরে পড়লো৷ প্রণয় ছুটে গেলো সেই মুরুব্বীর কাছে। আকুল কন্ঠে বললো,
“চাচা, বন্ধ করে দিচ্ছেন। একটু চাল নিতাম যে”
মুরুব্বী হাসিমুখে বললো,
“আপনি দাঁড়ান, আমি আমার ভাগ্নাকে বলছি”
বলেই শাটার খুললো সে। ভেতরে একটু যুবককে দেখা গেলো ঘুমাতে। মুরুব্বী লাথি মারতেই ধরফরিয়ে উঠলো সে। মুরুব্বী রাগী স্বরে বললো,
“উনার যা লাগে দাও। আমি গেলাম নামাযে”
বলেই মুরুব্বী প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলো, তারপর প্রস্থান করলো৷ যুবক আড়মোড়া ভেঙে বিরক্ত কন্ঠে বললো,
“কি চাই?”
প্রণয় একটু হেসে বললো,
“২কেজি চাল, ১কেজি ডাল, ১কেজি তেল, হলুদ, মরিচ, ধনে, লবঙ, এলাচ, দারচিনি। খিঁচুড়ী রান্না করবো”
“তো আমি কি করবো। রানবেন আপনি, খাইবেন আপনি। আমারে কচ্ছেন কেন? দাঁড়ান দিতেছি।”
বলেই ছেলেটি নিজ কাজে গেলো। প্রণয় দোকানটিকে একটু দেখতে লাগলো৷ দোকানের বাহিরে একটা সিসি টিভি ক্যামেরা রয়েছে। ভেতরেও রয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে তিন দিন, যদি দোকানের সামনে হয় তবে ফুটেজ পাওয়া যেতে পারে। প্রণয় গদগদ কন্ঠে বললো,
“ভাই আপনাদের দোকানে সিসি টিভিও লাগিয়েছেন, তা চলে তা?”
“চলবো না কেন? মুখ দেখাতে তো লাগানো হয় নি!”
কাঠ কাঠ কন্ঠে কথাটা বললো যুবক। প্রণয় বুঝলো ছেলেটির সদ্য ঘুম ভাঙ্গায় সে বিরক্ত। প্রণয় কিছুসময় সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলেটিকে দেখলো। একটা হাফপ্যান্ট এবং স্যান্ডর গেঞ্জি পড়া। গেঞ্জিতে ফুটো দেখা যাচ্ছে। শরীর বেশ চিকন। পর্যবেক্ষণ শেষে একটু হেসে সে বললো,
“মাল দেওয়া লাগবে না, আমি দাম দিয়ে দিচ্ছি। তবে সেই দামে অন্য কিছু দিতে পারবে? বিনিময়ে এই মাল গুলো তোমার”
প্রণয়ের কথা শুনে ছেলেটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তার চোখে মুখে অবিশ্বাস। লোকটি কি পা*গল!
*********
রাত নয়টা, অবশেষে বাড়ির কাছে পৌছালো প্রণয়। তার বাসাটা বেশ দূরে। সদর ছাড়িয়ে দৌলতপুর। রাস্তায় জ্যাম ও প্রচুর৷ নতুন ব্রীজের কাজ শুরু হবে তাই জ্যাম। ক্লান্ত শরীর নিয়ে গাড়িটি গ্যারেজে ঢোকালো সে। ঘরের দরজা খুলতে যাবে তখন ই অনুভব করলো সে একা নয়। পেছনে ঘোরার পূর্বেই সজোরে আঘাত খেলো মাথায়। কেউ রড দিয়ে প্র*হার করেছে। গল গল করে র*ক্ত বের হলো। দৃষ্ট হয়ে গেলো ঝাপসা। ফলে মানুষটিকে দেখতে পেলো না সে। কয়েক মূহুর্ত বাদে জ্ঞান হারালো প্রণয়
******
ঘড়ির কাটা দশটার ঘরে। কোর্টে হাজির করা হয়েছে নিশীকে। সোলাইমান শেখ আসে নি। কিন্তু ইমাদকে দেখা যাচ্ছে। তার মুখে পৈশাচিক হাসি। রাহেলা বেগম এবং জামশেদ সাহেব এসেছেন। তাদের সাথে কথা বলার সুযোগ হয় নি নিশীর। জজ প্রবেশ করবেন এখন ই। তবে প্রণয়কে দেখা যাচ্ছে না। নিশী চাতক পাখির ন্যায় আদালতে নজর ঘোরালো। আশাহত হলো সে। প্রণয় নেই। তবে কি আগুন্তক আসবে না……..
চলবে