#ইতি_নিশীথিনী
#৬ষ্ঠ_পর্ব
নিশী চাতক পাখির ন্যায় আদালতে নজর ঘোরালো। আশাহত হলো সে। প্রণয় নেই। তবে কি আগুন্তক আসবে না! হয়তো সত্যি ই আসবে না। নিশী মলিন হাসি হাসলো। সে আশা ছেড়ে দিয়েছে। নিষ্ঠুর ধরণীতে নিঃস্বার্থ শব্দটি বিশেষণ মাত্র। শব্দটির অর্থ নিস্ক্রিয়। যেখানে র’ক্তের মানুষগুলো হাত ছেড়ে দিলো, সেখানে মাহতাব হোসেন কেবল ই একজন অপরিচিত ব্যাক্তি। নিশী তার কার্ডের উপর লিখা কথাগুলো ব্যতীত কিছুই জানে না। আদৌ সেই কার্ডের লিখন সত্য কি না তাও জানে না। সুতরাং আশায় বুক বাঁধা নিতান্ত বোকামি। কিন্তু অবুজ মনটা যে মানতে চায় না। সামান্য আশার ঝলক পেতেই বেহায়ার মতো স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে এক নতুন ভোরের। যে ভোর সকল অন্ধকারকে গ্রাস করে নিবে নিজের কুসুম প্রভায়। বিচারক মহোদয় চলে এসেছেন। অথচ এখনো মাহতাব হোসেন আসেন নি। নিশী কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে এক আকাশ শূন্যতা, হাহাকার। নির্ভীক নিশী আজ সমাজের পদতলে নিঃস্ব, অসহায়, হয়তো একাবিংশ শতাব্দীতে এসেও কোথাও না কোথাও নারীরা নিঃস্ব, অসহায়, শূন্য____
আদালতের কার্য শুরু হয়েছে। এর মাঝেই নিশীকে প্রশ্ন করা হলো, তার পক্ষের উকিল কি উপস্থিত! নিশী নিশ্চুপ। কি বলবে ঠিক বুঝতে পারছে না। রাহেলা বেগম এবং জামশেদ সাহেব বেঞ্চে বসে আছেন। কোথাও কোথাও জামশেদ সাহেবের নিজেকে বেশ অপরাধী মনে হচ্ছে। একটু সহায়তা করলে হয়তো আজ মেয়েটিকে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। নিশী সন্তপর্ণে একটি ছোট নিঃশ্বাস গোপন করলো। মনকে শান্ত করলো। তারপর বললো,
“আমার পক্ষের উকিল…”
তার কথাটি শেষ হবার পূর্বেই একটি জোড়ালো পুরুষালী কন্ঠ কানে এলো,
“মহামান্য আদালতের কাছে আমার দেরীর জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, আমি মাহতাব হোসেন। নিশী হকের পক্ষ থেকে এই কেসটি আমি টেক কেয়ার করছি”
পরিচিত কন্ঠটি কানে আসতেই মাথা তুলে তাকালো নিশী। কালো কোর্টের আড়ালে যুবকটিকে চিনতে সময় লাগলো না তার। কপালে শুভ্র ব্যান্ডেজ, হাতে কাগজ। দীপ্তমান তার চাহনী। অবশেষে প্রতীক্ষার সমাপ্তি হলো, আগুন্তক কথা রেখেছে। সে সত্যি এসেছে। নিশীর যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না। অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষের ক্ষীন আলোতেও চোখ ঝলসে যায়। নিশীর অবস্থাটি এখন তেমন। সে ফ্যালফ্যাল নয়নে প্রণয়ের দিকে চেয়ে আছে। প্রণয় কিছু কাগজ পেশকারের কাছে জমা দিলো। পেশকার বিচারক মহোদয়কে কাগজগুলো দিলো। প্রণয় একবার অপর পাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর তার এসিস্ট্যান্ট রফিকের পাশে বসলো। রফিক অনেক আগেই উপস্থিত হয়ে গিয়েছিলো এখানে। গতরাতের আ*ক্রম*নের পর পর ই রফিক প্রণয়ের বাসায় আসে। ততসময়ে আক্র*মনকারী প্রস্থান করেছে। বাসার সদর দরজার সম্মুখে র*ক্তাক্ত অবস্থায় প্রণয়কে দেখে রফিক বিচলিত হয়ে পড়ে। দেরি না করে তাড়াতাড়ি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ভাগ্যবশত আঘাতটা গভীর ছিলো না। তিনঘন্টা বাদে জ্ঞান ফিরে প্রণয়ের৷ জ্ঞান ফিরতেই তীব্র ব্যাথা অনুভূত হয় তার। আশপাশে চোখ ঘুরাতেই বুঝতে পারে সে বর্তমানে হাসপাতালের কেবিনে। রফিক একটি টুলে বসে আছে। প্রণয়কে চোখ মেলতে দেখেই সে ছুটে এলো। তার উদ্বিগ্ন চেহারাটা দেখে প্রণয় হাসলো। তারপর বললো,
“এটা তো রোজকার ব্যাপার রফিক, ভয় পাচ্ছো নাকি!”
রফিক উত্তর দিলো না। প্রণয় তখন গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“কাল আমি কোর্টে দেরিতে যাবো, তুমি প্রথম থেকেই সব ব্যবস্থা করে রাখবে। যদি আমি যেতে না পারি তবে আমার হয়ে তুমি বেইলের কাগজগুলো জমা দিবে। আর আমার জামাগুলো কোথায়?”
“স্যার আমার কাছে”
“আমার প্যান্টে একটা পেনড্রাইভ আছে। ওটা সযত্নে রাখো। বেইলের জন্য ওটা খুব জরুরি”
“একটা প্রশ্ন করি?”
ইনিয়ে বিনিয়ে কথাটা বললো রফিক। রফিকের সন্দীহান কন্ঠটি কানে আসতেই হাসলো প্রণয়। তারপর বললো,
“করো”
“এই কেসটা না নিলে হতো না?”
“আজকের ঘটনা না ঘটলে হয়তো মনে জিজ্ঞাসা থাকতো, এখন নেই। আর একটা কাজ করবে। আমার সদর দরজার উপরে যে হিডেন ক্যামেরা আছে ওখানের ফুটেজটা বের করবে। কাল কোর্টে নাটক হবে। তুমুল নাটক”
বলেই চোখ বুঝলো প্রণয়। ব্যাথাটা অসহনীয় মাত্রায় বেড়েছে। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তবুও মাথা থেকে একটি নাম মোটেই সরছে না। তা হলো নিশীথিনী______
মাহাদীর পক্ষের উকিল তার বক্তব্য শুরু করলো। সে বেশ আত্মবিশ্বাসের সহিত বললো,
“ধর্মাবতার, কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মায়াবী মুখশ্রীর এই নারীটি আসলে একজন বিষধারী অজ*গর সাঁপ থেকেও ভয়ংকর। গত ১৮জুলাই, সে আমার মক্কেল মাহাদী শেখকে নির্মমভাবে হত্যার ক*রার চেষ্টা করে। ভাগ্যবশত আমার মক্কেল বেঁচে যান। আজ তিনি আইসিউ তে ভর্তি। তার চাক্ষুষ সাক্ষী আমার মক্কেল মাহাদী শেখের বন্ধু ইমাদ হোসেন এবং শাহরিয়ার আহমেদ। গত ১৮জুলাই তারা নিজেদের ব্যাক্তিগত সময় কাটাতে মাহাদী শেখের বাগানবাড়িতে যান। সেখানে তারা প্রায় ই নিজেকের একান্ত সময় কাটান। রাত দশটার দিকে একটি মোবাইল কলে ইমাদ হোসেন এবং শাহরিয়ার আহমেদকে সেখানে ডাকেন আমার মক্কেল। যখন ইমাদ হোসেন এবং শাহরিয়ার আহমেদ সেখানে পৌছান তখন আহত অবস্থায় মাহাদীকে মেঝেতে পান তারা। নিশী হক ততসময়ে পলায়ন করেছেন। ভাগ্য ভালো থাকায় মাহাদী শেখের তখন ও শ্বাস চলছিলো। ইটের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে বিশ্রী ভাবে তার মাথায় আ*ঘাত করা হয়েছিলো। ফলস্বরুপ আজ সে আইসিউতে। নিশী হক মাহাদী শেখের প্রতিপক্ষ ঈশান মাহমুদের জন্য ই এই কাজ করেছেন। কারণ একই সাথে তার মাহাদী শেখ এবং ঈশান মাহমুদ উভয়ের সাথেই অনৈতিক সম্পর্ক ছিলো। টাকার জন্য তিনি মাহাদী শেখের সাথে বন্ধুত্ব করেন। আর আবেগী হৃদয় ছিলো ঈশান মাহমুদের কাছে। একমাত্র ঈশান মাহমুদের ভালোবাসা পাবার জন্য এই জঘন্য কাজ করতেও দ্বিধাবোধ করেন নি তিনি। ধর্মাবতারের নিকট আমার আর্জি এই মায়াবী মুখোশের নারীকে কঠিন থেকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হক”
প্রতিপক্ষ উকিলের কথাগুলো সূঁচের মতো গায়ে লাগছে নিশীর। এতোটা জঘন্য বানী যেনো কান জ্বালিয়ে দিচ্ছে। সম্মানহানী না হয়েও ভরা সমাজে তাকে নির্লজ্জ প্রমাণিত করা হচ্ছে নিষ্ঠুরভাবে। উকিলের বক্তব্য শেষে পালা আসে প্রণয়ের। প্রণয় তখন সবিনয়ে বলে,
“ইউর অনার, এতোক্ষণ আমার উকিল বন্ধু বেশ চমৎকার নাটকের বর্ণনা দিলেন। যার নায়ক মাহাদী শেখ এবং খলনায়িকা নিশী হক। কি বর্ণনা! ভালোবাসা পাবার জন্য খু*ন করার চেষ্টা। উকিল না হলে ভালো একজন নাট্যকার হতে পারতেন কিন্তু। যাই হোক, আমি ধর্মাবতারের নিকট অনুমতি চাইবো দুটি ভিডিও চালানোর”
“অনুমতি দেওয়া হলো”
তারপর আদালতে একটি ভিডিও চালানো হয়। যা প্রণয় মুদি দোকানটি থেকে সংগ্রহ করেছিলো। দোকান বন্ধ থাকলেও সেখানের সিসি টিভিতে সেই সন্ধ্যার চিত্র বন্দি হয়। যখন একজন পেছন থেকে নিশীকে বেহুশ করে। এবং একটি মাইক্রোতে দু-তিন জন মিলে তাকে উঠিয়ে নেয়। দুর্বৃত্তরা সকলেই কালোমুখোশধারী ছিলো। তারপর আরেকটি ভিডিও চলে, যা প্রণয়ের বাড়ির৷ যেখানে একজন কালো কাপড় পড়া মানুষ তাকে পেছন থেকে আঘাত করে। ভিডিও শেষ হলে প্রণয় শান্ত কন্ঠে বলে,
“প্রথম সিসি ক্যামেরা ফুটেজটি ১৮তারিখ সন্ধ্যে ৭.১৫টার। এখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কিছু দুর্বৃত্তরা নিশী হককে অপ*হরণ করছে। এখন আমার প্রশ্ন যে অপ*হরণ হয়েছে সে একান্ত সময় কাটাতে কিভাবে মাহাদী শেখের বাগানবাড়িতে যায়! আর যদি সে সত্যি মাহাদী শেখের সাথেই থাকে তবে বলা যেতেই পারে এই কালোকাপড়ধারীরা মাহাদী শেখের ই লোকেরা। প্রশ্ন হলো যদি মাহাদী শেখের সাথে নিশী হকের সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব এতটা গভীর থাকে তবে মাহাদী শেখ কেনো তাকে অপ*হরণ করছেন? ইউর অনার, প্রতিটি ঘটনার দুটো কাহিনী থাকে। একটি সত্য এবং একটি মিথ্যে। সত্যটি আমার প্রতিপক্ষ উকিল বন্ধু বলেছেন, এবার মিথ্যেটি আমি বলবো। তারপর এই মাননীয় আদালয় বাছাই করবেন কোনটা সত্য এবং কোনটা মিথ্যে। নিশী হক একজন ল কলেজের ছাত্রী। কলেজের প্রথম দিন থেকেই আমাদের নেতাবাবু মাহাদীর তাকে মনে ধরে। নানাভাবে প্রস্তাব ও পাঠান কিন্তু সফল হন না। দেখতে দেখতে ছয়মাস কাটে, তারপর ১০জুলাই কলেজের সম্মুখে নিশী হকের সাথে অসভ্যতা করেন। যার প্রতিবাদে তাকে চপেটা*ঘাত মানে চ*ড় খেতে হয়। তাও বিয়ে করার স্বপ্নে ১১ই জুলাই নিশীর বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান তিনি। আবারো ব্যর্থ হন, কারণ যতই হোক মার*কুটে, অভদ্র, অশ্লীল, ক্ষমতা জাহির করা মানুষটিকে নিশীহকের অপছন্দ। বারবার অপমানিত হবার কারণে মাহাদী শেখের জেদ চাপে ফলে সেই ঝাল তুলতেই অপ*হরণ করে ধ*র্ষ*ণের প্রচেষ্টা চলে। তার প্রমান এই মেডিকেল রিপোর্ট। সেদিন কোনো বাগানবাড়িতে যান নি নিশী, বরং তাকে আটকে রাখা হয় একটি বিলানের মাঝখানে কুড়েঘরে। আত্মরক্ষা করতেই মাহাদীকে আক্রমণ করে নিশী। পালাতে যেয়ে আমার গাড়ির সামনেই পড়ে সে। সেদিনের ঘটনার আমি প্রত্যক্ষদর্শী। সেই কারণেই আমার উপর আক্রমণ করা হয়। কিন্তু তারা জানতো না এই কেসটি আমি ই লড়বো। একজন নারীর সম্মান এবং প্রাণ হরণের চেষ্টা করেছেন মাহাদী শেখ, তারপর তাকেই মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়েছেন যেনো তার মুখ বন্ধ করা যায়। এই সমাজে কি তবে নারীরা এখনো নিরাপদ? যেখানে না এর মানে না হয় না, যেখানে তাদের ক্ষমতার জোরে পিশে ফেলা হয়! আমি একজন নয় সকল নারীর নিরাপত্তার বিচার চাই ইউর অনার। এই অন্যায়ের বিচার চাই।”
প্রণয়ের কন্ঠের জোর প্রগাঢ় হলো। শান্ত মানুষেরা ক্ষিপ্ত হলে বুঝি এমন ই হয়। মুগ্ধ নয়নে তাকে দেখছে নিশী। অজানা এক নিরাপত্তা বোধ করছে সে। তবে কি সে বেইলটা পাবে! হয়তো পাবে!
আদালতের সময় শেষ হলো, অবশেষে বেইল পেলো নিশী। তবে মামলার সমাপ্তি হয় নি। মামলা চলবে। সামনের শুনানি পড়লো দুমাস পর। সেদিন মাহাদী শেখকে থাকতে হবে কোর্টে। ততদিন সে এবং নিশী কেউ শহর ছাড়তে পারবে না। ইমাদ আঙ্গুল কামড়াচ্ছে। চিন্তিত ঠেকলো তাকে। প্রনয়ের জন্য পুলিশ প্রটেকশন দেওয়া হলো। নিশী ছাড়া পেতেই প্রণয়ের মুখোমুখি হলো। নরম গলায় বললো,
“ধন্যবাদ”
“ভয় পেয়েছিলেন? ভেবেছিলেন আসবো না”
নিশী উত্তর দিলো না। চুপ করে রইলো। প্রণয় হেসে বললো,
“আমার পাওনা টাকা ফেরত দিবেন কিভাবে?”
“মানে?”
“বাহ রে ফি নিবো না! মেডিকেল খরচ, বাড়ি যাবার টাকা, আমার মেডিকেল খরচ, আমার ফি কম টাকা জমে নি কিন্তু। আর আমি আবার দামী উকিল কি না”
নিশী হাসলো তারপর বললো,
“আবার দেখা হলে দিয়ে দিবো। ভাববেন না পালিয়ে যাবো। পালানো আমার স্বভাবে নেই”
“আমি আপনাকে পালাতে দিবো ও না, আসি নিশীথিনী। সাবধানে থাকবেন, আবার দেখা হবে”
বলেই হাটা শুরু করলো প্রণয়। নিশী তাকিয়ে রইলো তার যাবার পানে। দেখা তো হবেই, হতেই হবে। রাহেলা বেগম এবং জামশেদ সাহেবকে দেখা গেলো না। ফলে নিশী একা একাই বাড়ি ফিরলো। বাড়ি ফিরতেই অবাক হলো সে। আকাশটা যেনো ভেঙ্গে পড়লো তার। তার সকল জিনিস বাক্সবন্দি করে সদর দরজায় রাখা…….
চলবে