ইতি নিশীথিনী পর্ব-০৭

0
813

#ইতি_নিশীথিনী
#৭ম_পর্ব

বাড়ি ফিরতেই অবাক হলো নিশী। আকাশটা যেনো ভেঙ্গে পড়লো তার। তার সকল জিনিস বাক্সবন্দি করে সদর দরজায় রাখা। নিশীর জিনিসপত্র খুব বেশি নয়। কয়েক সেট কাপড়, ক্লাসের বই, কিছু গল্পের বই আর একটি ছোট এমথ্রি প্লেয়ার। বাবা তাকে দশম জন্মদিনে দিয়েছিলো। খুব দামী আবদারের মধ্যে এটি ছিলো। আজ অবধি সামলে রেখেছে নিশী। জিনিসগুলো অগোছালো অবস্থায় একটি পুরোনো কার্টুনের ভেতর রাখা। নিশীর বুঝতে বাকি রইলো না এই কাজের মর্মার্থ। এই বাড়িতে তার আশ্রয়ের সময় শেষ। চাচী তাকে ঘর থেকে বের করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন ব্যাপারখানা তার জানা ছিলো। কিন্তু এতোটা নিষ্ঠুরভাবে তার কাজ সম্পন্ন করবেন সেটা ভাবতে পারে নি নিশী। নিশী তবুও একবার চাচীর মুখোমুখি হতে চায়। জানতে চায় কেনো নির্দোষ হবার পর ও তার সাথে এমন হচ্ছে! নিশী কলিংবেল বাজালো। দুবারের সময় রাহেলা বেগম দরজা খুললেন। নিশীকে দেখেই তীর্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন তিনি। তার মুখখানা থমথমে। নিশী শান্ত কন্ঠে বললো,
“আমার জিনিসপত্র বাহিরে কেনো চাচী?”
“দেখো নিশী, তোমাকে এতোদিন আমাদের বাড়িতে রেখেছি কারণ তোমার বড়চাচার মতে সেটা তার দায়িত্ব। তুমি নাবালিকা, উপরন্তু অনাথ। রাস্তায় তো ফেলে রাখা যায় না। আমরা বাদে আর কেউ এগিয়েও আসে নি। বিগত ৬-৭ বছর তোমাকে আমরা মেয়ের মতো রেখেছি। এখন তুমি আর নাবালিকা নয়, বয়স উনিশ পার হচ্ছে। সুতরাং এবার নিজের রাস্তা নিজেই দেখো। যতই হোক, আমাদের একটা মেয়ে আছে। তার ভবিষ্যত আছে। তোমার কেলেঙ্কারির জন্য তো ওকে বানের জলে ভাসিয়ে দিতে পারি না। সুতরাং তুমি তোমার জিনিস বুঝে নাও এবং নিজের ভবিষ্যত নিজে দেখো”

কাঠ কাঠ কন্ঠে রাহেলা বেগম কথাগুলো বললেন। নিশী বিমূঢ় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চাচীর মুখোপানে চেয়ে রইলো। তার যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না রাহেলা বেগম সত্যি ই এতোটা নিষ্ঠুরতা দেখাচ্ছেন। সর্বদা তাদের সম্পর্কটি তিতকুটেই ছিলো। সর্বদা নিশীকে তার অপছন্দ ছিলো। কিন্তু সবসময় এই অপছন্দটি তিনি চেপে রাখতেন। আর নিশীও গায়ে মাখাতো না চাচীর অবহেলা। তবে আজ ভেতরটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কোথায় যাবে সে! পৃথিবীটা বিশাল হলেও কোথায় না কোথায় তার পৃথিবীটা ছোট। আজ সেই ছোট পৃথিবীটা তাকে হাত ঝেড়ে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। নিশী তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললো, বিষাদের স্বাদ তাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। সে এক ফোঁটা শান্তি চায়। একটু ক্লান্ত হৃদয়টিকে বিশ্রাম দিতে চায়। শান্ত কন্ঠে বললো,
“আমি এখন কোথায় যাবো চাচী! আপনিও ভালো করে জানেন আমার যাবার ঠায় নেই।”
“সেটা আমি কিভাবে বলবো? তুমি তো স্বাধীন নাগরিক! একটা কিছু ঠিক ব্যাবস্থা করে নিবে, যেভাবে উকিলের বন্দবস্ত করেছিলে। তা উনাকেই বলো”

চাচী ঠিক কি ইঙ্গিত করেছে বুঝতে বাকি রইলো না নিশী। সে মলিন হাসি হাসলো। হাসলো নিজের বিষাক্ত ভাগ্যের উপর। ভাগ্য বললে ভুল হবে, দূর্ভাগ্যের উপর। তারপর সব জিনিস গুলো দেখতে লাগলো। রাহেলা বেগম এর মাঝে হিনহিনে স্বরে বললেন,
“সব বুঝে নিয়ে বিদেয় হও”
“সব বুঝলাম, কিন্তু এখানে বাবার ইন্সুরেন্সের টাকা আর আমার বিয়ের জন্য জমানো টাকাগুলো নেই চাচী”

নিশীর নির্লিপ্ত চিত্তের কথায় থতমত খেয়ে গেলেন রাহেলা বেগম। নিশী বিদ্রুপের হাসি একে বললো,
“আমি যতদূর জানতাম বাবা বেশ কিছু টাকা পেয়েছিলেন তার ইন্সুরেন্সের জন্য। যা বড় চাচা তার ব্যবসায় লাগিয়েছেন। সেই টাকাগুলো কিন্তু নেই এখানে চাচী। উপরন্তু আমার বিয়ের জন্য সে একটু একটু করে প্রায় লাখ খানের মতো টাকা জমিয়েছিলো। সেগুলোও নেই। নিজের জিনিস তো বুঝে পাচ্ছি না চাচী”

নিশীর কথায় তব্দা খেয়ে গেলেন রাহেলা বেগম। নিশীর কথা বরাবর ই ধারালো বিষা*ক্ত ছু*রির ন্যায় লাগে তার কাছে৷ তবে আজ যেনো ধা*রটা একটু বেশি ই ছিলো। রাহেলা বেগম রাগে গজগজ করতে করতে বললেন,
“এই ক বছর তোমাকে খাওয়েছি, পড়িয়েছি, আর তুমি কি না হিসেব চাচ্ছো? তোমার স্পর্ধা দেখে আমি অবাক। এতোদিন দুধকলা দিয়ে আমি কালসাপ পুষেছি। আনুগত্যের বদলে তুমি কি না চাচার কাছে হিসেব চাইবে?”
“বাবা একটা কথা বলতো জানেন তো, কৃতজ্ঞতা তার স্বীকার করা উচিত যে নিজেকে জাহির করে না। আপনি এই ক বছরে যতবার খোঁটা দিয়েছেন তাতে আমি আপনাদের আনুগত্য স্বীকার করতে পারছি না। আর আমার বিপদের সময় আমার থেকে যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন সেটা দেখে কৃতজ্ঞতা শব্দটি ঠিক যাচ্ছে না। আর মজার ব্যাপার আমাকে যদি ভাড়াটে হিসেবেও রাখেন তাহলেও এই ক বছরে আমার বাবার টাকাটা কিন্তু শোধ হচ্ছে না চাচী। এবার আমার টাকাটা কিভাবে ফেরত দিবেন সেটা না বুঝে তো আমি যেতে পারছি না”

নিশীর কথায় কি উত্তর দিবেন বুঝে পাচ্ছেন না রাহেলা বেগম। তিনি গজগজ করেই চলছেন। নিশী এখনো অনড়, পানি যে মাথার উপর চলে গেছে তার____

পড়ন্ত বিকেল, দক্ষিণ আকাশে কালোমেঘের ঘটঘটা। সারা শহরময় এক মলিন বিষন্নতা। যেনো এখনই দুঃখের জোয়ার আকাশ থেকে ছাঁপিয়ে নামবে আর ভেসে যাবে জীবন্ত শহর। সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের এক কোনে বসে রয়েছে নিশী। পাশে তার জিনিসপত্রের কার্টুন। তার ব্যাগে এখন পঞ্চাশ হাজার টাকা। অনেক বড় একটি অংক। চাচী তাকে আজ ই ঘাড় থেকে নামানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। তাই তো নিশীকে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়েছেন। নিশীর অবশ্য এই টাকার হিসেব নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। রিক্তহস্ত যে সে নয় এই ঢের। সে একটি নতুন মোবাইল কিনেছে, নতুন একটি সিম কিনেছে সে। একজন পুরোনো বান্ধবীকে ফোন করেছে সে। মেয়েটির নাম সুহা। সে একা একা বাড়ি ভাড়া করে নিরালায় থাকে। বাবা মা যশোরে থাকে বিধায় শহরে তার আপন কেউ নেই। তাই এতো বড় শহরে সে একাই থাকে। নিশী তাকে ফোন করেছে। সে জানিয়েছে সাহায্য করতে পারবে। দু দিন আগে তার রুমমেট বাড়ি বদল করেছে ফলে সিট ফাঁকা। নিশীর জেলগমনের কথা অবশ্য সে চেপে গেছে। বলা তো যায় না, প্রত্যষীর মতো সেও মুখ ফিরিয়ে নিলো। পুরোনো টিউশন গুলোকে ফোন দিয়েছে। তারা কোনো ভাবে হয়তো তার জেলগমনের খবর পেয়েছে। ফলে টাকা না দিয়েই তাকে বলেছে তার আসা লাগবে না। নিশী ঘাটায় নি। আফসোস কয়েক হাজার টাকা মা*র হয়ে গেলো। ইতোমধ্যে সুহা চলে এসেছে। নিশীকে দেখেই বললো,
“কি রে মুখ শুকনো কেনো? খাস নি?”

নিশী ম্লান হেসে বললো,
“খেয়েছি, আসলে বাহিরের খাবারে রুচি হয় নি। আর রোদের জন্য মুখটা এমন দেখাচ্ছে। আচ্ছা তোর বাড়ি কতদূর?
“এই তো কাছেই, চল চল যেয়ে গড়িয়ে নিবি”

সুহার সাথে তার বাসায় গেলো নিশী। দু রুমের বাসা। একটি ছোট রান্নাঘর। বেশ গোছানো। সুহা বামের রুমটি দেখিয়ে বললো,
“এটা তোর। এটাচ বাথরুম আছে”
“আরেকটা সাহায্য করতে পারবি সুহা?”
“কি সাহায্য?”
“একটা টিউশন বা পার্টটাইম চাকরি৷হলে খুব ভালো হতো। আসলে আমার হাতে এখন তেমন কিছু নেই। বাড়ি ভাড়া, পড়াশোনা তো করতে হবে!”

সুহা একটু ভাবলো। তারপর বললো,
“একটা ব্যাবস্থা করতে পারবো। কিন্তু কাজটা তুই পারবি?”

*******

দৌলতপুরের একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিশী। ছোট একটি একতলা বাড়ি। সামনে বাড়ির নেমপ্লেট ঝুলছে “শুভ্রনীড়”। নামটা খুব সুন্দর। এখানে আসার কারণ তার কাজ, সে এখানে একটি মেয়েকে পড়ানোর জন্য এসেছে। মেয়েটির নাম নীরা। সমস্যা হলো মেয়েটি অটিজমের স্বীকার। সে সবার সাথে কথা বলতে পছন্দ করে না। তাই সুহা বলেছিলো কাজটি কঠিন। তবুও নিশী কাজটি নিয়েছে কারণ বেশ ভালো অংকের টাকা পাবে সে। মুখ গোল করে তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়লো নিশী৷ তারপর কলিংবেল বাজালো বাসায়। সাথে সাথেই একজন পুরুষ দরজা খুললো। নিশীকে দেখেই পুরুষটি অবাক কন্ঠে বললো,
“আপনি এখানে?”………

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি