ইতি নিশীথিনী পর্ব-০৮

0
762

#ইতি_নিশীথিনী
#৮ম_পর্ব

মুখ গোল করে তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়লো নিশী৷ তারপর কলিংবেল বাজালো বাসায়। সাথে সাথেই একজন পুরুষ দরজা খুললো। নিশীকে দেখেই পুরুষটি অবাক কন্ঠে বললো,
“আপনি এখানে?”

নিশী ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে আছে। তার চোখের পলক পড়ছে না। বিস্ময়ে টুইটুম্বর দৃষ্টি তার। সম্মুখে দাঁড়ানো মানুষটি আর কেউ নয় প্রণয়। উকিল মহাশয়কে এখানে দেখবেন কল্পনাও করে নি নিশী। তদ্রুপ প্রণয়ের কন্ঠেও বিস্ময়। সে তো জিজ্ঞেস ই করে বসলো নিশীকে। নিশী আরোও একবার দরজার বাহিরে চোখ বুলালো। নাহ এখানে কোনো সাইনবোর্ড বা নেমপ্লেট নেই। সুহা এই বাড়ির ই ঠিকানা দিয়েছে। তাই ভুল হবার সম্ভাবনা কম। তবুও শঙ্কিত কন্ঠে নিশী শুধালো,
“এটা কি নীরার বাসা?”

নীরার নামটি শুনতেই প্রণয়ের ভ্রু কুঞ্চিত হলো। তার শান্ত নয়নের দৃষ্টি ধারালো হলো। কন্ঠে খানিকটা গাম্ভীর্য এনে উত্তর দেবার বদলে উলটো প্রশ্ন করে বললো,
“নীরাকে কেনো চাই?”

নিশী ঈষৎ নিশ্চিন্ত হলো, সে ভুল ঠিকানায় আসে নি। মুখে স্মিত হাসি এঁকে বললো,
“আমি ওকে পড়াতে এসেছি। ওর নিউ টিউটর”

কথাটা শুনতেই ভ্রুজোড়া আরোও কুঞ্চিত হলো প্রণয়ের। সে কিছু একটা ভেবে ভেবে ভেতরে ডাক দিলো,
“পৃথা, একটু এদিকে আসো”

নিশী এখনো বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে৷ তাকে একটিবার ও ভেতরে প্রবেশ করার কথা বলে নি কেউ। ফলে সে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে সদর দরজায়। কপাল বেয়ে পড়ছে নোনা ঘামের বিন্দু। এর মাঝেই একটি উনিশ-বিশ বছরের মেয়ে ছুটে আছে। পরণে বেগুনী রঙ্গের টপস আর সাদা লং স্কার্ট। মেয়েটির সাথে প্রণয়ের চেহারায় বেশ মিল। সে আসতেই প্রণয় গম্ভীর কন্ঠে তাকে শুধায়,
“নীরার জন্য কি টিউটর তুমি ডেকেছো?”
“হ্যা, আসলে কালকে থেকে তো আমার কলেজ। তুমি ও ব্যস্ত থাকো তাই আমি চাচ্ছিলাম ওই সময়টুকু নীরার কেউ যত্ন নেক”
“আমাকে জানানোর প্র‍য়োজনবোধ করলে না?”

প্রণয়ের কন্ঠস্বর কঠিন থেকে কঠিনতম হচ্ছে। পৃথা নামক মেয়েটি আমতা আমতা করতে লাগলো। নিশী খানিকটা থতমত হয়ে গেলো। গলা খাকারি দিয়ে বললো,
“আমি কি তবে চলে যাবো?”

নিশীর প্রশ্নে সম্বিত ফিরলো প্রণয়ের৷ সে খানিকটা রয়ে সয়ে বললো,
“সরি, আপনাকে বাহিরে রেখেছি। আসুন ভেতরে আসুন”

নিশী তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললো। মাসটি জুলাই, তপ্ত রোদে পুড়ে যাচ্ছে ব্যাস্ত শহর। বাসাটা বাহির থেকে যেমন সুন্দর, ভেতরটা আরোও বেশি সুন্দর। সিমসাম, সাদামাটা তবে গোছানো। নিশীর মনে হলো সে হয়তো কোনো বই এর রাজ্যে এসেছে৷ বসার ঘরের একটি দেয়াল জুড়ে শুধু বই। নিশী বসলো সিংগেল সোফাটিতে। প্রণয় এবং পৃথা বসলো তার উলটো পাশে। প্রণয় খানিকটা কঠিন স্বরে বললো,
“আপনি নীরার টিউটর হতে চান?”
“জ্বী”
“নীরা কিন্তু অন্য বাচ্চাদের মতো নয়। জানেন তো?”
“জ্বী জানি”
“দেখুন টিউটর মানেই পড়ানো নয়, আপনাকে তার সাথে ইন্টারেকশন করতে হবে। তাকে সামাজিক করতে হবে। এবং সেটা খুব আলতো হাতে”

নিশী কিছু একটা ভেবে প্রশ্ন করলো,
“জ্বী বুঝতে পেরেছি। কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করতে পারি?”

প্রণয় ভ্রু উঁচিয়ে ভারী কন্ঠে বললো,
“করুন”
“নীরা আপনার কে হয়?”
“আমার মেয়ে”

কথাটি শুনতেই কিঞ্চিত অবাক হলো নিশী। প্রণয়কে দেখে সে মোটেই আশা করে নি তার মেয়ে থাকতে পারে। তাও দশ বছরের। অজানা কারণে মনটা একটু বসে গেলো। এক তীব্র কালো মেঘের দল ভিড় করলো মনের আকাশে। কেনো নিজেও জানে না। আগুন্তকের প্রতি এমন অনুভূতি কাম্য নয়। নিশী আর প্রশ্ন করলো না। নিশীকে চুপ দেখে প্রণয় বললো,
“নিশীথিনী, নীরা একটা স্পেশাল চাইল্ড। আমি ওকে কারোর সাথে ভরসা করতে পারি না। যেহেতু অপর পক্ষের মানুষটি আপনি, তাই আশা করছি আমি আশাহত হবো না?”
“একটু বিশ্বাস করছেন বোধ করছি!”

প্রণয় নিঃশব্দে হাসলো। তারপর বললো,
“হয়তো”

নিশী আর কথা বললো না। নিস্তব্ধতা বিরাজ করলো বসার ঘরে।

********

পৃথা তাকে নিয়ে গেলো নীরার ঘরে। ছোট একটি রুম। তুলোর পুতুলে ঘেরা তার ছোট খাট। বেশ অগোছালো। দেয়ালে রংধনুর তৈলচিত্র। রঙধনুর নিচে একটি ছোট মেয়ে বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের পানে। ছবিটি দক্ষ হাতের নয়। অন্য দেয়ালে মোম রঙ্গের আকাবুকি। নীরার বয়স মাত্র দশ। তার অটিজমটি ঠিক কেমন নিশীর জানা নেই। নিশী সারা ঘরে চোখ ঘুরিয়ে অবশেষে নীরাকে পেলো জানালার ধারে। এক দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে কালো মেঘে ঘেরা উজ্জ্বল আকাশের দিকে। প্রথা একটু উচ্চগলায় বললো,
“নীরু, দেখো তো তোমার সাথে বন্ধুত্ব করতে কে এসেছে?”

পৃথার কথায় পাত্তা দিলো না নীরা। সে তাকিয়ে আছে বাহিরের দিকে। পৃথা আবার ডাকলো,
“নীরা”

এবার পেছনে ফিরলো সে। নিশী অবাক দৃষ্টিতে দেখলো মেয়েটিকে। কি চমৎকার দেখতে মেয়েটি। দুধের মতো গায়ের রঙ। মায়াবী মুখের আদলে, টানা টানা ঘোলাটে চোখ যেনো লেন্স পড়ে আছে। বিড়াল চোখ ও বলা যায়। কুচকুচে কালো চুল, বড্ড এলোমেলো। যেনো কেউ একটিবার ও হাত দেয় নি। নির্জীব চোখে তাকিয়ে আছে নিশীর দিকে। নিশী একটু দ্বিধাবোধ করলো। মেয়েটি কি তার সাথে বন্ধুত্ব করবে! কে জানে! সে একটু এগিয়ে বললো,
“আমি নিশী। তোমার নাম কি?”

মেয়েটির দৃষ্টি মূহুর্তেই কিঞ্চিত ধাঁরালো হলো। সে মুখ ফিরিয়ে নিলো। আবার তাকিয়ে রইলো বাহিরের দিকে। পৃথা বললো,
“ও কারোর সাথে কথা বলতে পছন্দ করে না ভাইয়া বাদে। কিন্তু ভাইয়াও ওকে টগিক সময় দিতে পারে না। ওর যে ডাক্তার উনি ই আমাকে সাজেস্ট করেছেন যেনো আমি একজন বাহিরের কাউকে যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে আনি। আপনি পারবেন তো?”

নিশী স্মিত হাসলো৷ তারপর বললো,
“চেষ্টা করতে ক্ষতি কি। আর যাবার সময় দরজাটা টেনে যাবেন কেমন!”

পৃথা চলে গেলো। নিশী এগিয়ে গেলো নীরার পাশে। নীরাকে দেখলে কেউ বলবে না সে প্রতিব*ন্ধী। তার সবকিছুই বেশ স্বাভাবিক। শুধু সে কথা বলে না। নিজেকে আটকে রেখে নিজের বানানো প্রকোষ্ঠে। নিশী রুমটা ঘুরে ঘুরে দেখলো। তারপর দাঁড়ালো নীরার টেবিলের ওখানে। সেখানে একটি বই হাতে নিবে তখনই চিলের মতো ছো করে নীরা সেটি নিয়ে নিলো। ক্ষিপ্র দৃষ্টি প্রয়োগ করলো নিশীর উপর। তারপর সেই বইটি লুকিয়ে ফেললো খাটের নিচে। বেশ অবাক হলো নিশী। এই প্রথম এমন বিচিত্র স্বভাবের ছাত্রীর সাথে সে ইন্টারেক্ট করছে। নিশী কোমল কন্ঠে বললো,
“আমাকে তোমার পছন্দ হয় নি”

নীরা উত্তর দিলো না। সে আবার চলে গেলো তার জায়গায়। তারপর উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকলো মুক্ত আকাশে। নীরার বিরুপ আচারণে নিশী বুঝলো এতো সহজ নয় মেয়েটির সাথে বন্ধুত্ব করা। কিন্তু টাকার অংকটিও যে বড়, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে এটুকু তো করতেই হবে_____

ব্যস্ত শহরে নামলো আঁধার। ব্যস্ত দিনের পাঠ চুকালো শহর। কালো আকাশঅটা আঁধারে হয়ে উঠলো আরোও গভীরতম কালো। ছোট একটা দুটো তারার দেখা মিললেও চাঁদ ঢাকা দিলো মেঘের চাঁদর। সমীরের দিক বোঝা যাচ্ছে না। একটু থমথমে পরিবেশ। হয়তো কালোমেঘের বর্ষণ হবে। নিশী একবার জানালা দিয়ে বাহিরে দেখলো। বাসায় যেতে হবে। এখান থেকে বাড়ি যেতেও লাগবে একঘন্টার মতো। এদিকে তিনঘন্টার চেষ্টা ব্যার্থ হলো তার। নীরা এখনো নির্বিকার। একটা অদৃশ্য দেওয়াল তাদের মাঝে। মেয়েটি না কথা বলে, না কথা শুনতে আগ্রহী। নিশী নিজ থেকে উদ্যোগ নিলেও তার নির্লিপ্ততার সামনে হাটু গাঁড়লো। নিরাশ চিত্তে বের হলো সে নীরার ঘর থেকে। তখন ই দেখা হলো প্রণয়ের সাথে। সে কোথাও বের হচ্ছে হয়তো। নিশীকে দেখতেই বললো,
“এনি প্রোগ্রেস?”

নিশী মাথা নাড়ালো। প্রণয় বাহাত দিয়ে কিছুসময় কপাল ঘষলো তারপর বললো,
“চলুন আপনাকে বাড়ি পৌছে দেই”
“আমি যেতে পারবো”
“আটটা বাজে, জিদ করবেন না। চলুন। আবহাওয়াটাও ভালো না, বৃষ্টি হবে”

নিশী আর তর্ক করলো না। সে রাজী হলো।

******

পিচের রাস্তায় চলছে গাড়ি। বৃষ্টি নেমেছে পুরোদমে। ব্যাস্ত শহর ভিজে যাচ্ছে। নিশী গ্লাসে মাথা ঠেকিয়ে দিয়েছে। প্রণয় ডানহাত দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। তার দৃষ্টি রাস্তায়। সেই অবস্থায় প্রশ্ন করলো,
“নীরা কথা বলে নি?”
“নাহ, ওর সময় লাগবে হয়তো”
“হয়তো”

নিশী একটু চুপ করে থাকলো। তারপর বললো,
“আপনার স্ত্রীকে দেখলাম না?”
“বিয়ে না করলে কোথা থেকে আমদানী করবো বলুন?”

তার কথায় নিশী অবাক চোখে তাকালো। তারপর বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“তবে যে বললেন, নীরা আপনার মেয়ে”
“হ্যা, নীরা আমার মেয়ে কিন্তু আমি বিবাহিত নই”
“আপনার উপরতালায় দেখছি সত্যি গন্ডগোল আছে”
“বাবা হতে হলে বিয়ে করতে হয় বুঝি?”
“অবশ্যই হয়!”

প্রণয় শব্দ করে হাসলো। তারপর বা হাত নিয়ে কপালের চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিলো। নিশী কিঞ্চিত বিরক্ত হলো। সে চোখ কুঁচকে তাকালো বাহিরের দিকে। লোকটার সাথে এখন গোলকধাঁধা খেলতে আগ্রহী নয় সে। প্রণয় ও কথা বললো না। নিশ্চুপ কাঁটলো তাদের যাত্রা। শুধু বৃষ্টির শব্দ আর হালকা মেলোডির গান,
“আমার সারাটা দিন, মেঘলা আকাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম”……..

নিশীকে বাড়ি পৌছে দিয়েই গাড়ি স্টার্ট দিলো প্রণয়। বরাবরের মতো আজও ধন্যবাদ দেওয়া বা নেওয়াটি হলো না। নিশী তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে পা বাড়ালো নিজ বাসায়। রাতে সুহা ফিরবে না। মেয়েটি বিকেলে যশোর গেছে। ফলে একাই থাকতে হবে নিশীকে। প্রচুর ক্ষুদা পেয়েছে। এখন রান্না করবে সে। ডিমভুনা এবং খিঁচুড়ি। দরজাটি খুলে লাইট জ্বালালো নিশী। তখন অনুভব করলো তার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে……

চলবে