#ইতি_নিশীথিনী
#৯ম_পর্ব
আজ রাত একা একাই থাকতে হবে নিশীকে। প্রচুর ক্ষুদা পেয়েছে। এখন রান্না করবে সে। ডিমভুনা এবং খিঁচুড়ি। দরজাটি খুলে লাইট জ্বালালো নিশী। তখন অনুভব করলো তার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। মূহুর্তেই এক অসামান্য নিকষকালো ভয় হৃদয়কে চেপে ধরলো। সে নিশীকে দেখে ধীরে ধীরে বেড়িয়ে আসছে দরজার পেছন থেকে। নিশী ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আড়চোখে তাকালো পেছনে। কালো একটি অবয়ব। তার আশঙ্কা ঠিক। নিশী তার ব্যাগটা শক্ত করে ধরলো। ছাত দিয়ে ভেতরটা খুঁজলো। কিন্তু তার আত্মরক্ষার জন্য রাখা ছোট চা*কুটা পেলো না৷ ভয়টা দৃঢ় হলো। নিস্তব্ধ ঘরে অজানা বিপদের পদধ্বনি কানে আসছে। লোকটি কিছু একটা করার জন্য উদ্ধত হচ্ছে। নিশী নিজের অশান্ত হৃদয়কে শান্ত করলো। এই মূহুর্তে এই বাড়িতে সে ব্যতীত কেউ নেই। লোকটি কে সেটাও তার অজানা। তবে সে এখানে খুব একটা ভদ্র উদ্দেশ্যে আসে নি। আসলে দরজার কোনায় লুকিয়ে থাকতো না। লোকটি সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করে নি। নিশীদের বাসাটা চারতালা। নিশী এবং সুহা দোতালায় ভাড়া থাকে। নিশীর মনে আছে সে তাড়াহুড়ো বারান্দার দরজাটা দিতে ভুলে গেছে। অর্থাৎ মানুষ লোকটি হয়তো বারান্দা দিয়েই প্রবেশ করেছে। হয়তো সে অপেক্ষা করছিলো কখন নিশী ফিরবে! কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে লোকটি জানলো কি করে এই বাড়ির দো তালায় নিশী থাকে। সে কি নিশীর জন্য ই এসেছে নাকি সুহার কোনো ক্ষতি করতে এসেছে। নিশীর মাথা কাজ করছে না তবে সে নিজেকে বিপদের মাঝে নাস্তানাবুদ হতে দিবে না। সদর দরজাটি এখনো খোলা। কোনোভাবে পালাতে পারলে এ যাত্রায় বেঁচে যাবে। কিন্তু লোকটি এখনো তার পেছনে। নিশী সন্তপর্ণে তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর ঘাড় ঘোরালো পেছনে। তখন ই কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা মানুষটি আক্রমণ করলো ধারালো ছু*রি দিয়ে। ভাগ্যক্রমে আক্রমণ টি ঠেকালো নিশীকে তার চটের ব্যাগ দিয়ে। ধস্তাধস্তির মূহুর্তে লোকটির ছু*রি পড়ে গেলো মেঝেতে। নিশী অতর্কিতে আক্রমণ করলো ব্যাগ দিয়ে। লোকটি টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে বসে পড়লো। এই সুযোগ এখন ই পালাতে হবে। নিশী সদর দরজার দিকে দৌড়াতে যাবে তখন ই লোকটি তার পা টেনে ধরলো। ফলে হুমড়ি খেয়ে পড়লো নিশী মেঝেতে। প্রচন্ড ব্যথা পেলো কনুই এবং হাটুতে। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো নিশী। লোকটি মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালো। খুঁজতে থাকলো তার ছু*রি। নিশী উঠতে চাইলো কিন্তু পা হার মানলো। ব্যাথার জন্য উঠে দাঁড়াতে পারছে না। নিশী চিৎকার করলো। যেনো নিচের দারোয়ান অন্তত উঠে আসে। কিন্তু কারোর সাড়া পেলো না। ইতোমধ্যে লোকটি তার ছু*রি পেয়েও গেলো। নিশী ভয়ার্ত কন্ঠে শুধালো,
“আপনি কে? কেনো আমাকে মারতে চাইছেন?”
লোকটি উত্তর দিলো না। বরং ছু*রিটা নিয়ে তাকে আক্রমণ করার জন্য উদ্ধত হলো। নিশী দুহাত নিয়ে মুখ ঢেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় চিৎকার করে উঠলো। এর মাঝেই একটা শব্দ কানে এলো নিশীর। চোখ মেলতেই দেখলো, আক্রমণকারী মেঝেতে পড়ে রয়েছে। তার প্রণয় তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে। নিশীকে দেখতে সে তাড়াতাড়ি তার কাছে এগিয়ে এলো, ব্যস্ত কন্ঠে শুধালো,
“আপনি ঠিক আছেন?”
“জ্বী”
কাঁপা স্বরে নিশী উত্তর দিলো। নিশীর উত্তরে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো প্রণয়। তারপর সে যেই না আক্রমণকারীকে ধরতে যাবে অমনি কালো কাপড় ঢাকা আক্রমণকারী নিশীর ঘরের দিকে ছুটলো। তারপর বারান্দা থেকে লাফ দিলো। প্রণয় পিছু নিতে চাইলো কিন্তু ইতোমধ্যে সে পালিয়েছে। নিশীদের দারোয়ান তখন হেলেদুলে বিড়ি খেতে খেতে আসছিলো। প্রণয় দারোয়ান কে বললো,
“চাচা, ওই লোকটা চোর ওকে ধরুন”
কিন্তু বৃদ্ধ সেই তাগড়া যুবকের সাথে পারলো না। প্রণয় “ধ্যাত” বলে সজোরে বারান্দার রেলিং এ আঘাত করলো। তার অসামান্য রাগ হচ্ছে। একটুর জন্য লোকটি পার পেয়ে গেলো। তার চিন্তার মাত্রা গভীর হলো যখন মস্তিষ্কে আসলো, “ঠিক সময়ে না আসলে কি হতো”
সাথে সাথেই প্রণয় ডাইনিং এর স্পেসে গেলো। একটা ছোট প্লাস্টিকের ডাইনিং টেবিল আছে সেখানে। নিশী কোনো মতে মেঝে থেকে উঠে চেয়ারে বসেছে। তার হাটু ছি*লে গেছে। পায়জার উপর থেকে র*ক্তের ছোপ দেখা যাচ্ছে। তাই এতো অসামান্য ব্যাথা করছে। প্রণয় তার কাছে এসে বললো,
“আপনার এখানে থাকাটা কিন্তু রিস্কি”
প্রণয়ের কথায় মাথা তুলে নিশী। প্রত্যুত্তরে প্রশ্ন ছুরে বলে,
“আপনি এখানে কি করছেন?”
নিশীর মোবাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলে,
“আপনার মোবাইল গাড়িতে ফেলে এসেছিলেন, ভাগ্যিস ফেলে এসেছিলেন। সঠিক সময়ে না আসলে কি হতো ভেবেই কাটা দিচ্ছে।”
নিশী উত্তর দিলো না। এখন বাস্তবের সাথে নিজেকে মেলাতে পারছে না। এখনো ঘোরের মতো লাগছে। সত্যি ই কি বেঁচে আছে সে। প্রণয় না আসলে কি হতো! প্রণয় যখন গাড়ি ঘুরিয়ে মেইন রাস্তায় উঠলো তখন একটা মোবাইলের শব্দ পেলো সে। তার ফোন চেক করলো, কিন্তু সেটা বাজছে না। মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পেলো সিটের উপর একটি মোবাইল রাখা। নিশীকি মোবাইলটা ভুলে রেখে গেছে! হতেই পারে ব্যাগ থেকে পড়ে গেছে হয়তো। প্রণয় আবার গাড়ি ঘোরায়। পৌছায় নিশীর বাসায়। দারোয়ানকে কোথাও দেখতে পায় না। গেটটাও খোলা। তাই সাত পাঁচ না ভেবেই ঢুকে পড়ে। বিপদ বাঁধলো যখন বুঝতে পারছিলো না নিশী কোন ফ্লোরে থাকে। তবুও প্রণয় উপরে উঠলো। প্রথম তলার দরজায় তালা ঝুলছে। তাই প্রণয় দোতলায় উঠলো। তখন ই একটা মেয়েলি কন্ঠের চিৎকার শুনলো সে। ছুটে গেলো সেখানে। দরজাটি ভেজানো। দরজা ঠেলে ঢুকতেই দেখলো নিশী মেঝেতে বসা আর একজন তাকে আক্রমণ করতে মরিয়া হয়ে আছে। প্রণয় সাথে সাথে মানুষটিকে ধাক্কা দিলো। ফলে আক্রমণকারী ছিটকে মেঝেতে পড়লো। প্রণয়ের আর একটু দেরি হলে ঠিক কি হতো জানা নেই, হয়তো নিশীথিনীর গল্পের অন্তিম পাতাটি আজ ই লেখা হতো।
প্রণয় একটু থেমে বললো,
“আপনার বাড়ির লোকেরা কোথায়?”
“নেই”
“নেই মানে?”
“আমি একা থাকি”
“কিন্তু সেদিন যে বললেন আপনি বাড়ি যাবেন, সবাই চিন্তা করছে?”
প্রণয়ের প্রশ্নে উত্তর দিলো না নিশী। চুপ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে বসে রইলো। কি বলবে! তার তথাকথিত পরিবার তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকার বিনিময়ে ত্যাগ করেছে। সন্তপর্ণে একটি ছোট্ট নিঃশ্বাস গোপন করলো। প্রণয় আর ঘাটালো না। তবে নিশীকে নিয়ে তার চিন্তা কমলো না। একবার যেহেতু আক্রমণ হয়েছে আবার হতে পারে। অজানা মেয়েটিকে বিপদে রাখতেও ভালো লাগছে না। কেনো যেনো মেয়েটিকে বিপদে দেখলে নিজেকে শান্ত রাখতে পারে না প্রণয়। বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বললো,
“আপনার পুলিশ প্রটেকশন নেওয়া উচিত”
“ক্রিমিনাল লয়ার আপনি, পুলিশ কি একজন ক্রিমিনালকে প্রটেকশন দিবে?”
নিশীর প্রশ্নের উত্তর পেলো না প্রণয়। কিন্তু সেও কম নয়, দৃঢ় কন্ঠে বললো,
“আমি আপনাকে এখানে একা ফেলে কিন্তু যাচ্ছি না নিশীথিনী। যেহেতু আপনি পুলিশ প্রটেকশন নিবেন না তাই আমাকে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে”
লোকটির কথায় বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকালো নিশী। লোকটি যেনো তার উপর অঘোষিত কর্তৃত্ব ফলাচ্ছে! কিন্তু কিসের এই কর্তৃত্ব! শুধুই কি সাহায্য করার প্রবণতা!
*****
ঘড়ির কাটা এগারোটার ঘরে। আকাশের অবস্থা ভালো নেই। মেঘের গর্জন কানে আসছে। তীব্র বাতাসে নড়ছে গাছের পাতা। বিষন্নতা ছেয়ে আছে যেনো নীল আকাশে। পৃথা জানালা আটকে দিলো। না দিলে বৃষ্টি হলেই পানি ঘরে ঢুকে যায়। নীরা ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। কি যেনো আঁকছে সে। কিন্তু পৃথার সেদিকে খেয়াল নেই। সে অপেক্ষা করছে প্রণয়ের আসার। তখন ই কলিংবেল বাজলো। পৃথা ছুটে দরজা খুললো। দরজা খুলতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। অবাক কন্ঠে শুধালো,
“উনি এখানে কি করছেন?”
প্রণয় একা নয়, নিশীও এসেছে সাথে। অবশেষে তর্কযুদ্ধে পরাজিত হয়েছে সে। প্রণয় তাকে বগলদাবা করে নিয়ে এসেছে এখানে। সুহা নেই, যদি লোকটি আবার আক্রমণ করে! উপরন্তু প্রণয় একজন পুরুষ, একা একটি বাড়িতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষের থাকাটাও অসামাজিক। তাই তাকে নিজের বাড়িতেই নিয়ে এসেছে প্রণয়। যুক্তি,
“আমার বাড়িতে আমার বোন থাকে, মেয়ে থাকে। সুতরাং আপনার অসুবিধা হবে না। কেউ আপনাকে দুষবেও না”
পৃথার প্রশ্নের উত্তরে বললো,
“উনার সাথে একটা দূর্ঘটনা ঘটেছে। তাই আজ রাত উনি আমাদের বাড়ি থাকবেন। গেস্ট রুম খুলে দে”
পৃথার মনে হাজারো প্রশ্ন জমলেও সে তা প্রকাশ করলো না। কপালে ভাঁজ টেনে ভেতরে গেলো। নিশী খেয়াল করলো নীরা ডাইনিং রুমের চেয়ারে বসে আছে। সে কিছু আঁকছে। তবে কি আঁকতে পছন্দ করে সে!
****
নিগুঢ় আঁধারে ঘেরা নিস্তদ্ধ ঘর। নিশী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলাতেই জগতের ঘুম ভর করেছে। ফলে মূহুর্তেই ঘুমের জোয়ারে ডুবে যায় সে। হঠাৎ একটা ক্ষীন শব্দ কানে আসতেই ঘুমে ছেদ ঘটে। চোখ মেলে অন্ধকারে তাকাতেই একটি কালো অবয়ব দেখে সে। অবয়ব দেখতেই আতকে উঠে সে। কপাল বেয়ে উষ্ণ ঘাম গড়িয়ে পড়ে। তড়িঘড়ি করে লাইট জ্বালালো সে। লাইট জ্বালাতেই দেখলো তার বিছানায় নীরা বসে আছে……….
চলবে