#ইতি_নিশীথিনী
#১০ম_পর্ব
হঠাৎ একটা ক্ষীন শব্দ কানে আসতেই ঘুমে ছেদ ঘটে। চোখ মেলে অন্ধকারে তাকাতেই একটি কালো অবয়ব দেখে সে। অবয়ব দেখতেই আতকে উঠে সে। কপাল বেয়ে উষ্ণ ঘাম গড়িয়ে পড়ে। তড়িঘড়ি করে লাইট জ্বালালো সে। লাইট জ্বালাতেই দেখলো তার বিছানায় নীরা বসে আছে। নীরাকে দেখতেই ধরফরিয়ে উঠলো নিশী। নীরা এখনো নির্বিকার। তার মাঝে কোনো পরিবর্তন হলো না। একই মুখভঙ্গি, একই চাহনী। বেশ ধারালো তার দৃষ্টি। নিশীর গলা শুকিয়ে এসেছে। তার বুক এখনো কাঁপছে। এতো রাতে নীরাকে এভাবে তার বিছানায় বসে থাকতে দেখবে কল্পনাও করে নি সে। মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগছে। কিছু সময় চোখ বুজে নিজেকে শান্ত করলো নিশী। তারপর কোমল কন্ঠে শুধালো,
“তুমি এখানে কি করছিলে নীরা? তোমার কি কিছু লাগবে?”
নীরা উত্তর দিলো না। এখনো নির্বিকার ভাবেই তাকিয়ে রইলো সে। চোখের দৃষ্টিও পরিবর্তিত হলো না। নীরাকে এখনো অবধি বুঝতে পারছে না নিশী। মেয়েটিকে দেখলে কেউ বলবে না সে প্রতিব*ন্ধী তার আচারণ বেশ স্বাভাবিক। শুধু সে কথা বলে না। শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এমন আচারণকেও কি অটিজম বলে! হয়তো বলে! নিশী আবারো জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার কি কিছু লাগবে নীরা?”
নীরা উত্তর এখনো দিলো না। নিশীকে অবাক করে সে উঠে দাঁড়ালো। মুঠোবন্দি করে রাখা কিছু একটা বিছানায় রেখেই সে বেড়িয়ে গেলো। নিশী তার কাজে বেশ অবাক হলো। নীরার ফেলে রাখা জিনিসটি দেখে সে আরোও অবাক হলো। কারণ সেটা একটা প্রায় শেষ হওয়া স্যাভলন। একটা দশবছরের শিশুর এমন কাজ বেশ অবাক করলো তাকে। কারণ সে যে ব্যাথা পেয়েছে সেটা নীরার জানার কথা নয়। নীরা হয়তো নিজ থেকেই তা লক্ষ্য করেছে। হয়তো পায়জামায় লেগে থাকা শুকনো র*ক্তের দাগ এ সে অনুমান করেছে। তবুও এটা অবাককর। সাধারণত দশ বছরের শিশুরা নিজেরাই চোট পেলে চিৎকার শুরু করে। বুঝে উঠলে পারে না ঠিক কি করা উচিত। সেখানে নীরা নিশীর জন্য স্যাভলন নিয়ে এসেছে। নিশী এখনো সেই স্যাভলনের শেষপ্রায় টিউবটির দিকে তাকিয়ে আছে। তপ্ত নিঃশ্বাস বুক চিরে বের হলো। বাহিরে বৃষ্টির প্রবল শব্দ কানে আসছে। মাঝে মাঝে একাকীত্বে কিছু বেখেয়াল চিন্তারা ঝাপটে ধরে নিশীকে। জীবনটা তার কেমন ছিলো! বিহঙ্গের মতো বিচরণ ছিলো তার। চাচীর কটুক্তিতেও অসীম আনন্দ খুঁজে বেড়াতো সে। ভয়, চিন্তা, সব কিছুকে কলাগাছ দেখিয়ে কি চমৎকারভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলো স্বপ্নের পথে। কে জানতো এই অদম্য সাহস তার জীবনের সবচেয়ে বড় বাধা হবে, শেকলের মতো পার্থিব জীবনটিকে এতো কঠিনভাবে বেঁধে ফেলবে কে জানতো! আজ স্বপ্নের কথা মুছে ফেলেছে নিশী। প্রাণের ভয়, সম্মানহানীর ভয় কোথাও না কোথাও তাকে বারবার হানা দেয়। জীবিকা নির্বাহের চিন্তা তার ঘুমকে গ্রাস করে। এটাই হয়তো জীবনের বাস্তবতা। বাস্তবতাকে কখনোই ভয় পেতো না নিশী। তবে এতো নিষ্ঠুরভাবে তার বাস্তবতার সাথে পরিচয় হবে ভাবে নি। সে কি কখনোই শান্তি খুঁজে পাবে না, কখনোই একটি ভরসার কাঁধ খুঁজে পাবে না যার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজে থাকবে। আর এক আকাশ নিস্তব্ধতা, প্রশান্তি ঘিরে রাখবে তাকে। কিছু মানুষের অভিলাষ বুঝি অভিলাষ ই থাকে। আর নিশীও তাদের মাঝে একজন________
শান্ত সকাল। গতরাতের প্রবল বর্ষণের ফলাফল বাগানের ঘাসগুলো এখনো ভিজা। কৃষ্ণচূড়া গাছটির সামনে জমেছে কাঁদা। সূর্য্যিমামাও গা ঢাকা দিয়েছেন কৃষ্ণমেঘের আড়ালে। পৃথিবীতে এখনো সূর্যালোকের বিস্তার ঘটে নি। রোদের কিরণ এখনো সম্পূর্ণরুপে প্রভাব ফেলে নি। প্রণয় হাটছে। তার স্বভাব সকালে হাটা। প্রাতঃকালে প্রকৃতির কাছাকাছি গেলে নাকি মস্তিষ্ক চিত্ত উভয় ই শান্ত থাকে। ফলে জটিল থেকে জটিল কেসের সমাধান ও সহজভাবে করে ফেলে সে। কানে হেয়ারফোন লাগিয়ে যখন শান্ত নিবৃত্ত চিত্তে হাটছিলো তখন ই একটা হাতের স্পর্শ কাধে অনুভব করলো। আচমকা স্পর্শে চমকে উঠলো প্রণয়৷ প্রণয়ের এরুপ আচারণে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো নিশী। ইতস্তত হয়ে বললো,
“ভয় পেলেন নাকি? আসলে অনেকক্ষণ যাবৎ ই আপনাকে ডেকেছি। সাড়া দেন নি বিধায় গায়ে হাত দিয়েছি। ভয় পাবেন না আমি ভূত নই”
স্মিত হেসে কথাটা বললো নিশী। প্রণয় নিজেকে নিপুনভাবে সামলে নিলো। কন্ঠ স্বাভাবিক করে বললো,
“অবাস্তব জিনিসে বিশ্বাস হয় না, তাই আমি জ্বীন, ভুত আর প্রেমে অবিশ্বাসী”
“শেষদুটো বুঝলাম, তবে জ্বীন কিন্তু আছে”
“দেখেছেন বুঝি? অবশ্য আপনার যা কাজকর্ম, ঘাড়ে নিয়ে ঘুরেন যে তার সন্দেহ নেই”
প্রণয়ের কথায় ভ্রু সংকুচিত করলো নিশী। নেহাত মানুষটি তাকে সহায়তা করেছে নয়তো দুকথা শুনাতে পিছপা হতো না। মুখ গোল করে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো সে। তারপর কাঠ কাঠ স্বরে বললো,
“ঘাড়ে নিয়ে ঘুরবো কেনো! আমি ই তো জ্বীনের বাদশা”
“ভুল, জ্বীনের বাদশা হতে পারবেন না। হ্যা, বেগম হলে আলাদা ব্যাপার”
“ঘাট হয়েছে, ক্ষমা চাচ্ছি।”
“তর্কে হেরে হার মানলেন”
“অহেতুক মুখ ব্যাথা করতে চাচ্ছি না”
“বুদ্ধিমান আছেন দেখছি”
“বুঝতে দেরি হলো দেখছি”
প্রণয় হাসলো। দীপ্তমান, উজ্জ্বল হাসি। নেই কোনো ছলচাতুরী, নেই কোনো কলুষতা। নিশী মুগ্ধনয়নে তা দেখলো। এতো সুন্দর হাসি বুঝি পুরুষের হয়! প্রণয় এবার হাসি থামিয়ে বললো,
“গতরাত ঘুম হয়েছে তো? আসলে নতুন জায়গা, উপর থেকে আমার বাড়িটিও নিরিবিলিতে”
“হয়েছে। তবে একটা ঘটনা ঘটেছে”
“কি?”
নিশী একটু থেমে গতরাতে নীরার আগমনের কথাটা খুলে বললো প্রণয়কে। প্রণয়ের মুখের হাসিটা কিঞ্চিত মিয়ে গেলো। বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“নীরা নিজে এসেছে?”
“মনে তো হলো, হাতে একটা শেষপ্রায় স্যাভলনের টিউব ও ছিলো”
“স্ট্রেঞ্জ”
“কেনো?”
“নীরার ব্রেইন অন্য ছেলেমেয়েদের ব্রেইনের মতো নয়। কিভাবে মানুষের সাথে যোগাযোগ তৈরি করতে হয় সে৷ জানে না। সর্বদা নির্বিকারভাবে সে তাকিয়ে থাকবে। এই নিয়ে বহু ডাক্তারের সাজেশন নিয়েছি। তবে কাজ হয় নি। সে আমার ব্যতীত কারোর সাথেই ইন্টারেক্ট করতে রাজী নয়। তার আইকিউ কিন্তু প্রচন্ড শার্প। ওর ঘরের দেওয়ালের সব ছবি সেই আঁকে। ইভেন আমার সাথেও তার কথোপকথন হয় সীমিত। খুব বিক্ষিপ্ত তার শব্দ। স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতো সাজিয়ে বাক্য সে বলতে পারে না। তাই আমি ছবির মাধ্যমেই তার সাথে কথা বলি। সেখানে আপনার রুমে রাত বিরাতে যাওয়া, স্যাভলন দেওয়াটা স্ট্রেঞ্জ লাগলো। আমার মনে হয় আপনাকে ওর ভালো লেগেছে”
“আমি নিশ্চিত হতে পারছি না। কারণ সে আমার সাথে কথা বলতে বা কোনো প্রকার কমিউনিকেট করতে পছন্দ করছে না। হয়তো তার আমার প্রতি মায়া হয়েছে”
“অটিস্টিকদের ব্যাপারে মায়া শব্দটি ঠিক যায় কি না আমি জানি না, নীরা আমি বড় হয়ে দেখেছি। নিজের অনুভূতির প্রতি ই সে উদাসীন। যেখানে আপনার ব্যাথায় কাতর হওয়াটা বেশ অবাককর। একটা আবদার করবো, রাখবেন নিশীথিনী?”
প্রণয়ের কন্ঠ নরম হলো৷ একরাশ আকুতি, আবেদন জড়ো হলো যেনো কন্ঠে। নিশী হয়তো সেই অনুনয়কে নাকোচ করতেই পারতো। কিন্তু পারলো না অজানা কারণে। তাই ধীর কন্ঠে বললো,
“বলুন”
“নীরার সাথে আমি কথা বলতে চাই, স্বাভাবিকভাবে। জানি এটা আপনার কাছে এভারেস্ট জয় করার মতোই কঠিন। কিন্তু কেনো যেনো মনে হচ্ছে আপনি পারবেন। তাই স্বার্থপর মানুষের মতো আবদার করবো। নীরাকে একটু হলেও স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে শেখাবেন?”
প্রণয়ের কন্ঠ কাঁপছে। নিশী নিশ্চুপ। হ্যা বলতে ভয় হচ্ছে। সে কি সত্যি পারবে! নিষ্ঠুর বাস্তবতা যেভাবে প্রতিনিয়ত তার জীবন থেকে আলো ছিনিয়ে আঁধার নামিয়ে দিচ্ছে সেখানে সে কি করে অন্য কারোর জীবনের আলো হবে? এটা কি সম্ভব, সত্যি অজানা নিশীর_______
********
সুহা ফিরে আসায় এখন নিজ বাসায় ই ফিরে এসেছে নিশী। প্রণয় তাকে পৌছে দিয়েছে। যদিও সে বহুবার বলছিলো আপনার কিন্তু একটা রিস্ক থেকেই গেছে। কিন্তু নিশী সেটা উপেক্ষা করেছে। মানুষটির উপকার নিতে ইচ্ছে হচ্ছে না আর। সবথেকে বড় ব্যাপার, এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে কতোদিন! এক না এক সময় তো আবার কেউ না কেউ আক্রমণ করবেই। প্রণয়ের বদ্ধ ধারণা এটা সোলাইমান শেখের কাজ। নিশীর যে সন্দেহ হচ্ছ না সেটা নয়। তবে প্রমাণ নেই। এখন মাহাদী শেখ এবং সোলাইমান শেখের ভয়ে তো লুকিয়ে খাঁচাবন্দি হওয়া যাবে না। তাকে তো কলেজ ও যেতে হবে। এতো কষ্ট করে ল কলেজে ভর্তি হয়েছে সেই কষ্টকে তো বিফলে যেতে দিবে না।হ্যা, কিছু হা*য়েনা নজর হয়তো তাকে গিলে খাবে। তাকে নিজে অনেকে অনেক রটনা রটাবে। শিক্ষকের চাহনী হবে তীর্যক। কিন্তু বাবার একটি কথা এখনো মনে আছে তার,
“মানুষ কি ভাবলো তা নিয়ে যদি তুমিই সব ভাবো তবে মানুষ কি ভাববে! মানুষকে মানুষের মতো ভাবতে দাও, তুমি তোমার মনের কথামতো চলো। দেখবে একটি সময় তারা ক্লান্ত হয়ে নিজেরাই হারিয়ে যাবে”
নিশী সেটাই করবে। আজ কলেজে যাবে সে। খাবার টেবিলে আচারের বয়াম সাজাচ্ছে সুহা। নিশী তাকে বললো,
“এ কি তুই তো দেখি যশোর থেকে আচারের গুদাম তুলে এনেছিস”
“আর বলিস না, আম্মা প্যাকেট করে দিলো। মাংস ও রেধে দিলো। আমি নাকি শুকিয়ে গেছি। বল কোনদিক থেকে শুকালাম। কিন্তু শুনলোই না। তুই মাংস দিয়ে পরোটা খেয়ে যা। আমার মায়ের রান্না জোস”
সত্যি মাংসটা খেতে বেশ সুস্বাদু। খাওয়া শুরু করলে খেতেই ইচ্ছে হয়। নিশী চুপ করে খেলো। মায়েদের রান্না বুঝি সত্যি এতোটাই সুস্বাদু হয়। হয়তো হয়, অবশ্য নিজের মার রান্না খাবার সৌভাগ্য তার নেই। কারণ সে কোথায় আছে, আদৌও জীবিত আছেন কি না সেটাই জানে না নিশী। এতোটা বছর পর এখন জানতে ইচ্ছেও হয় না। থাকুক না সে তার মতো, মাহীন অনাথ তো পৃথিবীতে একটা নিশী নয়। বহু আছে________
কলেজে সকলের দৃষ্টি যেনো গিলে খাচ্ছে নিশীকে। তারা কানাগোসা করছে, তীর্যক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। কিন্তু সামনে এসে বলতে পারছে না। কেমন একটা ভীতি তাদের মধ্যে কাজ করছে। প্রত্যুষীটাও মুখ ফিরিয়ে অন্যখানে বসেছে। নিশীও তাকে ঘাটালো না। নিজের আত্মসম্মান নিজের কাছে। সেটাকে অক্ষত রাখাটা নিজদায়িত্ব। একমাঝে ঈশানের সাথে দেখা হলো লাইব্রেরিতে। ঈশানের সাথে মাহাদীর একটা রাজনৈতিক দ্বন্দ আছে। সেকারণেই তাকেও পুলিশ জেরা করেছিলো। নিশীকে দেখতেই এগিয়ে এলো সে। বিনয়ের সাথে শুধালো,
“আছো কেমন নিশী?”
“আল্লাহ যেমন রেখেছেন”
“তোমার সাথে যা হলো, আমার তো শুনেই কাটা দেয়”
নিশী চুপ করে থাকলো। সহানুভূতি তার বরাবর ই অপছন্দ। কিন্তু নেতাগোতা মানুষ, উপরন্তু ঈশানের সাথে তার সম্পর্ক বরাবর ই ভালোও নয়, মন্দ ও নয়। তাই উত্তরে শুধু নিশী অমলিন হাসি হাসলো। এদিক ওদিক কথা বলে শেষমেষ ঈশান বললো,
“মাহাদীর ভরসা নেই, ও তোমাকে ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। শুনেছি তার জ্ঞান ফিরেছে। তুমি সাবধানে থেকো কিন্তু………….
চলবে
মুশফিকা রহমান মৈথি