ইতি নিশীথিনী পর্ব-৪৭+৪৮

0
738

#ইতি_নিশীথিনী
#৪৭তম_পর্ব

নিশী আর বায়না করলো না। কিছু একটা ভেবে বললো,
“রফিকের কি অবস্থা?”
“মা*রা গেছে, ক্রস ফায়ার।”
“আপনি আমাদের খুঁজলেন কি করে?”
“আশ্চর্যের ব্যাপার জানো তো। আমি তো ভেবেছিলাম আমি বা পুলিশ তোমাকে খুঁজেই পাবো না। পরে জসীম সাহেব এগিয়ে এলেন। উনার জন্যই তোমাকে খুঁজে পেলাম”

“জসীম সাহেব” নামটি শুনেই কপাল কুঞ্চিত হলো নিশীর। বাজে রকম ভাঁজ পরলো তার কপালে। কিছু সময় হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে। মুখখানা হালকা খুলে গেলো। তার মস্তিষ্ক কাজ করছে না। নিশী উঠে বস্তে চাইলো। প্রণয় সাহায্য করো তাকে বসতে। নিশীর মুখশ্রী এখনো বিভ্রান্তিতে ঘিরে রয়েছে। সেই মুখশ্রী দেখে নিঃশব্দে হাসলো প্রণয়। বুকে হাত জড়ো করে কিছুসময় নিশীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। তারপর স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“আমি তোমার জসীম স্যারের কথাই বলছি”
“কিন্তু উনি জানলেন কিভাবে আমরা নিখোঁজ”
“ব্যাপারটি কাকতালীয় বটে। তোমার স্যার যে মানুষ নয়, আমাকে বলো নি কেনো?”
“উনি একটা আস্তো পাগল, কি বলে কি করে বুঝি না। আমার তো তাকেই খু*নী খু*নী মনে হয়। জ্যান্ত ক্রি*মিনাল ভাইভ আসে তার থেকে। চোখ দেখলেই তো মনে হয় না জানি কত রহস্য মনে লুকিয়ে রেখেছেন”

নিশীর কথা শুনে সশব্দে হাসলো প্রণয়। হাসিটা কোনো মতে থামিয়ে বললো,
“অস্বীকার করবো না। তবে আমারও সেটাই মনে হয়েছিলো। কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম, সকল বিজ্ঞ-জ্ঞানীরাই অল্পস্বল্প পাগল থাকে। তোমার জসীম স্যারের টুকু একটু বেশি আরকি! আর্কিমিডিস যদি বস্ত্রহীন ছুটতে পারেন তবে উনার দোষ কি বলো! যাক গে! ঘটনাটি কাকতালীয় আবার নাও হতে পারে। আমি যখন বাসায় পৌছাই তখন অলরেডি রফিক তোমাদের নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো। বাসার ফ্লোরে কিছু ছোপছোপ র*ক্ত ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাই নি। খুব ভয় পেয়েছিলাম জানো। তবে ও যে তোমাদের এখনো মা*রে নি সেটুকু নিশ্চিত ছিলাম। মা*রতে হলে ও তোমাদের ওখানেই মে*রে ফেলতো। কি অদ্ভুত তাই না! যে মানুষটিকে চোখ বুজে বিশ্বাস করেছি সেই আমার সবথেকে বড় শত্রু বের হলো।”
“বুঝলেন কিভাবে সেই মির্জা হাফিজ”
“নুশরাতের মৃত্যুর দুদিন আগে স্লোভাকিয়া থেকে একটা ফ্লাইট এসেছিলো। সেখানেই একজন প্যাসেঞ্জারের হাতের আঙ্গুলে সমস্যা ছিলো। যদিও একবছরে এমন মোট দশ-বারোজন পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু কারোর সাথেই ডিটেইলিং মিলছিলো না। নীরার ছবির সাথে শুধু একটা মানুষের ই পুঙ্খানুপুঙ্খ মিল ছিলো। সেই ব্যাক্তি আর কেউ নয় রফিকুল ইসলাম। আমার মনে হয়েছিলো হয়তো আমার ভুল হচ্ছে। আমার যে বন্ধুটি আমাকে সহায়তা করছিলো, ও খোঁজখবর নেয়। অবশেষে ভাগ্যবশত মির্জা হাফিজের একটি কিশোর বয়সের ছবি আমরা পাই। আমার বন্ধু শফিক তার সোর্স খাটিয়ে একটা ছবি বানায় যা ওই কিশোর ছবিটার আদলে তৈরি একটি পঁচিশ বছরের যুবকের চিত্র। অদ্ভুত ব্যাপার রফিকের সাথে ছবিটি অনেকাংশেই মিলে। শফিক মির্জা শাহরিয়ারের বড় ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রথমে সে অস্বীকার করলেও অবশেষে স্বীকার করে যে রফিক ই তার ভাই। তার ছোট বেলার অপরাধ থেকে বাঁচাতে মির্জা শাহরিয়ার তাকে পর্তুগাল পাঠায়। সেখান থেকে সে স্লোভাকিয়াতে চলে যায়। বাবার জেলে যাবার খবর পেতেই সে দেশে আসে। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন পরিচয়ে। আমার মনে হচ্ছিলো এতোদিনের সাজানো আয়নাটা যেনো হুট করেই ভেঙ্গে গেছে। মানতেই পারছিলাম না আমি যাকে নিজের ভাইয়ের মতো দেখতাম সেই আমাকে ধোঁকা দিবে। বিশ্বাস ভাঙ্গলে এতোটা কষ্ট হয় জানা ছিলো না। অবশ্য এই বিশ্বাস ভঙ্গের কষ্ট স্থায়ী হলো না। আমার মনে পড়লো একটা আকাম করে ফেলেছি। ওকে বলে দিয়েছি নীরা নুশরাতের খুনের সাক্ষী। শফিককে বলতেই ও গা*লির বর্ষণ করলো। তারপর খুলনার সদরে ইনফর্ম করে দিলো। ওরা রফিকের ঠিকানায় গেলো, কিন্তু ওকে পেলো না। আমিও দেরি না করে ছুটলাম খুলনার দিকে। আমি এবং পুলিশ একই সময় ই তোমার বাড়ির ওখানে পৌছাই। পুলিশ আশেপাশের মানুষদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু ফলাফল শুন্য। হেডকোয়ার্টার জানানো হয়। সব ট্রাফিক পুলিশে ইনফর্ম করা হয়। হাইওয়ে তে পুলিশের টোল বের হয়। তবুও রফিকের খোঁজ পাওয়া যাওয়া যায় না। থানায় আমার সাথে দেখা হয় জসীম সাহেবের। উনি ওখানে একটা কেসের ব্যাপারে এসেছিলেন। কথায় কথায় আমি খুলে বলি ঘটনা। ভাগ্য খুব অদ্ভুত জানো তো। উনি বহু পূর্ব থেকেই মির্জা শাহরিয়ারের ছেলে মির্জা হাফিজকে নিয়ে বেশ রিসার্চ করছিলেন। মির্জা হাফিজের ছোট বেলার ক্রাইম নিয়ে তিনি বেশ ঘাটাঘাটি করছিলেন। চাইল্ড ক্রিমিনাল সাইকোলজি নিয়ে তার নাকি বই বের হয়েছে। ওই যে আংটি, আংটিটাও উনি মির্জা হাফিজের জন্য কিনেছিলেন। রিসার্চের দরুন উনি আংটিটি কিনেন। উনার ভাষ্যমতে ক্রিমিনালদের ব্যবহৃত জিনিসগুলোও তাদের আচারণের একটি অংশ। যাক গে! উনি নিজ থেকে আমাকে সহায়তা করতে চান। উনার ধারণা মির্জা হাফিজ যেখানে তোমাদের নিয়ে যাবে সেখানে ও নিজেকে আবিষ্কার করেছিলো। যেখানে ও রফিক নয়, মির্জা হাফিজ হতে পারবে। শহরের বাহিরে কোথাও নিয়ে যেতে পারবে না। কারণ উপায় নেই৷ পুলিশ তাকে তন্নতন্ন করে খুঁজছে। আর এই জেলায় একটিমাত্র জায়গা আছে তা হলো মির্জা শাহরিয়ারের বাগানবাড়ি, ঘের। যা এখন পরিত্যাক্ত। মির্জা শাহরিয়ারের ঘেরের খোঁজ আমার কাছে ছিলো। বিংগো, জসীম সাহেবের আন্দাজ ঠিক। রফিক সেই পরিত্যাক্ত বাড়িতেই তোমাদের নিয়ে গিয়েছিলো। সেখানে পৌছাতেই রফিকের ভারসাম্যহীনতার পরিচয় পেলাম। সে তোমাকে….”

প্রণয় থেমে গেলো। তার কন্ঠ ধরে এসেছে। শরীর ঈষৎ কাঁপছে। চোখ টলমল করছে। নিশী সাথে সাথেই তার হাতটা ধরলো। কাঁপনী ক্ষীন হলো। প্রণয় গা ফুলিয়ে অন্তস্থলে চেপে রাখা তপ্ত নিঃশ্বাসটি ছাড়লো। ধরা গলায় বললো,
“মৃত্যু খুব হালকা একটা শাস্তি। ওকে যদি আরোও কঠোর শাস্তি দেওয়া যেতো৷ তাহলে হয়তো নুশরাতের আর্তনাদগুলো আজ এতোটা যন্ত্রণাদায়ক লাগতো না। কিন্তু পরিস্থিতি ই এমন ছিলো, নীরব গুলি চালাতে বাধ্য হয়। আমার মনে হচ্ছিলো ওকে যদি বাঁচিয়ে আবার মা*রতে পারতাম”
“সবকিছুই আগ থেকে সাজানো থাকে প্রণয়। হয়তো ওর মৃত্যু এভাবেই ছিলো। আনন্দের ব্যাপার নুশরাতের খু*নী শাস্তি পেয়েছে। এখন সে আর মুক্ত আকাশে নিশ্বাস নিচ্ছে না। শাস্তি তো পেতেই হতো ওর। সেটাই যেভাবেই হোক না কেনো! ভুলে যান। অতীতে পরে থাকার সময় নয়। আমাদের জন্য একটা সুন্দর ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে”

নিশীর হাতটা শক্ত করে দুহাতের ফাঁকে নিলো প্রণয়। আলতো করে উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়া দিলো তার নরম হাতুর উপর পৃষ্টে। কন্ঠে নরম করে বললো,
“এইজন্য ই তোমাকে ভালোবাসি নিশীথিনী। ভঙ্গুর আমিকে এতো সহজে কিভাবে আগলে নাও তুমি?”
“আমি জানি না প্রণয় সাহেব। আমি সত্যি জানি না। শুধু এতোটুকু জানি আপনাকে খুব ভালোবাসি আমি। এই নিশীর হৃদয়ে শুধু একটি পুরুষের ই বসবাস। সেই পুরুষটি কেবল মাত্র আপনি। কথাগুলো একটু সেকেলে শোনাচ্ছে। তবে এতোদিন এই কথাগুলোই বুকের মাঝে চেপে রেখেছিলাম। আজ মুক্ত করে দিলাম। আমার মাঝে প্রেমরস নেই, আমি ভালোবাসতে জানি না। তবুও একটা অবাধ্য ইচ্ছে, আপনার সকল কাব্যে “ইতি নিশীথিনী” হয়ে থাকতে চাই। মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসে ইচ্ছেটা যেনো আরোও প্রবল হয়ে গেছে”

নিশী চোখ নামিয়ে নিলো। তার কন্ঠ কাঁপছে। প্রণয় কিছু সময় দেখলো তার প্রণয়িনীকে, তার নিশীথিনীকে। ঠোঁট প্রসস্থ হলো অজানা শান্তিতে। হৃদয় জুড়ে জমে থাকা প্রণয়ের মেঘ বারি হয়ে বর্ষিত হলো। হাতটা কপালে ঠেঁকিয়ে বললো,
“আমি চাই না তুমি ” ইতি নিশীথিনী” হও। তুমি যে আমার প্রিয় নিশীথিনী”

******

কোর্টের সুনানির দিন ঘনিয়ে এসেছে৷ মাহাদীর এতোদিনের সাজানো খেলার আজ অন্তিম ক্ষণ। মোস্তাকের টিম মাহাদীর মিথ্যের ইটে বানানো মহল ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে। তাকে অবশেষে দাঁড় করালো কাঠগড়ায়। নিশী ঘৃণ্য চোখে তাকিয়ে রইলো কিছুসময় মাহাদীর দিকে। আজ অবশেষে মানুষের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পশু তার শাস্তি পাবে। মাহাদী রক্তিম চোখে দেখলো নিশীর স্থির মুখশ্রী। একটি নারীর জন্য তার ভবিষ্যত এভাবে জ্বলে যাবে সেটা যেনো অকল্পনীয় ছিলো। নারী তো অবলা, তাদের পিষলে তারা পিষে। সে ভুলে গিয়েছিলো যে নারী জীবনের সঞ্চার করতে পারে, সে তার অত্যাচারেরও উত্তর দিতে পারবে। বিচারক তার বিচার শোনালেন,
“সকল সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মাহাদী শেখকে নিশী হকের ধ*র্ষণের চেষ্টা, খু*নের চেষ্টা, তার চরিত্রহ*ত্যা, সুহা জামানের হ*ত্যার প্রচেষ্টা এবং আদালতকে বিভ্রান্ত করার জন্য যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হলো। সোলাইমান শেখ এবং ইমাদ রহমান কে ওসি মোস্তাক আহমেদ এবং এস আই মোসাদ্দেক রহমানকে খু*নের চেষ্টার দায়ে চৌদ্দ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হলো”

মাহাদী শেখের হাতে পড়ানো হলো হাতকড়া। কোর্টের বিচারপর্ব শেষ হলো। নিশীর মুখে ফুটে উঠলো প্রশান্তির স্নিগ্ধ হাসি। সে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে প্রখর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মাহাদীর যাবার পানে। অবশেষে শাস্তি পেলো একটি পশু। এমন প্রতিটি পশু শাস্তি পেলে হয়তো এই সমাজটি নারীদের বসবাস, চলাফেরার জন্য নিরাপদ হতো। কিন্তু আফসোস, বিত্ত, ক্ষমতার জোড়ে তারা পার পেয়ে যায়। নিঃশ্বাস নেয় মুক্ত আকাশে। আর এই অসহায় মেয়েগুলো হয় নিথর হয়ে পড়ে থাকে নর্দমায় নয়তো সমাজের লাঞ্চনার স্বীকার হয়। তবুও আমরা গর্বের সাথে বলি আমাদের বসবাস একাবিংশ শতাব্দীতে_______

*******

আজ প্রণয় এবং নিশীর বিয়ে। কাজী অফিসের বাহিরে অপেক্ষা করছে নিশী। অপেক্ষা প্রণয়ের। মানুষটি আসবে। নিশী আজ পড়েছে আট হাজার টাকার লাল জামদানী। এতো দামী শাড়ী পড়ার অভ্যেস তার নেই। কিন্তু তবুও পড়েছে কারণ শাড়িটি প্রণয়ের দেওয়া। সাক্ষী রুপে জামশেদ সাহেব, নিহিতা এবং সুহা রয়েছে। প্রণয়ের ইচ্ছে ছিলো ধুমধাম করে বিয়ে করবে। কিন্তু নিশী বারণ করলো। পরিবার বিহীন ধুমধাম বিয়েতেও কি আদৌও শান্তি আছে! তাই তো কাজী অফিসে বিয়ে। বাড়ি থেকে বের হবার সময় প্রণয় ফোন করেছিলো। সে বলেছে তার আসতে দশ মিনিট লাগবে। কিন্তু এখন আধা ঘন্টা হতে চললো। মানুষটার দেরি হচ্ছে কেনো!……

চলবে

#ইতি_নিশীথিনী
#৪৮তম_পর্ব

বাড়ি থেকে বের হবার সময় প্রণয় ফোন করেছিলো। সে বলেছে তার আসতে দশ মিনিট লাগবে। কিন্তু এখন আধা ঘন্টা হতে চললো। মানুষটার দেরি হচ্ছে কেনো! নিশী চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। তার চোখজোড়ায় স্পষ্ট প্রতীক্ষা। এর মাঝেই জামশেদ সাহেব এসে বললেন,
“প্রণয় তো এখনো এলো না, কাজী সাহেবের সিরিয়াল তো চলে এসেছে”

নিশী কথাটা শুনলো। চুপকরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলো মিনিট পাঁচেক। তারপর শান্ত কন্ঠে বললো,
“সে আসবে চাচা, চিন্তা করবেন না”
“তুমি কি ভেতরে যেয়ে বসবে? আজ রোদ বেশ কড়া। শরীর খারাপ করবে।”

নিশী চোখ সরালো না। শান্ত প্রতীক্ষিত চাহনী তার এখনো স্থির সেই কালো কুচকুচে পিচের রাস্তায়। তার গরম লাগছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। একেই শাড়ি উপর থেকে সুহা জোর করে কিসব ছাইপাস দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে। বারণ করেছিলো নিশী বহুবার। কিন্তু সে কি শোনবার পাত্র! সব কিছুতেই সে অতিউৎসাহী। তাও ভালো পার্লারে নিয়ে যায় নি। সুহার বিশ্বাস নেই। ও পারলে পার্লার তুলে আনে। তার কাঠকাঠ উত্তর,
“বিয়েতে না সাজলে বিয়ে বিয়ে মনে হয় নাকি! বউ মানেই সাজগোজ। নয়তো মানুষ বুঝবে কি করে তোর বিয়ে। এমন কাজের বেটি রহিমা হয়ে সারা জীবন থাকতে পারবা! তবে আজ নয়”

নিশী বুঝে গেলো ওর সাথে তর্ক জুড়ে লাভ নেই। তাই বাধ্যমেয়ের মতো সেজেছে। সেই সাজার জন্য এখন গরমটা যেনো একটু বেশি ই লাগছে। পাটাও ব্যাথা করছে। বসতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু ভেতরে যাবে না নিশী। সে অপেক্ষা করবে। অপেক্ষা করবে প্রণয়ের আগমণের। জামশেদ সাহেব বুঝলেন, নিশী ভেতরে যাবে না। সে এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে। তাই তিনি ধীর কন্ঠে বললেন,
“একটা ফোন দাও না, দেখো কোথায় আছে?”

নিশী মাথা দোলালো। প্রণয়ের নাম্বারটি বন্ধ। পর পর চার পাঁচ বার ফোন দিলো নিশী। কিন্তু, “কাঙ্ক্ষিত নম্বরটিতে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না”—- ছাড়া কিছুই শুনতে পেলো না সে। নিশীর ভেতরটা হাসফাঁস করছে। অশান্তি লাগছে। কেনো যেনো মস্তিষ্কটা অসাড়তায় ঘিরে ধরে ধরেছে। হৃদয়ের ভেতরে অশান্ত মেঘগুলো ক্ষণে ক্ষণে গর্জে উঠছে। জামশেদ সাহেব নিশীর মুখোপানে চেয়ে আছে উত্তরের অপেক্ষায়। কিন্তু নিশী উত্তর দিলো না। সে বারবার ই বন্ধ নম্বরটিতে ফোন লাগাতে ব্যস্ত। জামশেদ সাহেব অধৈর্য হয়ে বললেন,
“ফোন ধরছে না?”
“বন্ধ বলছে”

খুব ধীরে কথাটা বললো নিশী। কথাটা শুনতেই কপালে ঘন ভাজ পড়লো জামশেদ সাহেবের। চিন্তারা মস্তিষ্কে জেকে বসেছে। ছেলেটি কি তবে বিয়ে করতে আসবে না! এভাবে প্রতারিত হবে নিশী! এতোদিনের প্রণয় কি কেবল ই নাটক ছিলো! হয়তো ছিলো। আজকাল তো প্রেম শুধু মুখের বুলি। দুদিন হেসে কথা বললেই তারা মনে করে দুনিয়াটা সুন্দর। জামশেদ সাহেব কিছু বলতে চাইলেন কিন্তু নিশীর মুখশ্রী দেখে ইচ্ছে হলো না। মেয়েটির মুখটায় বিষন্নতার কালো মেঘ নেমেছে। কিছুক্ষণ পূর্বের উজ্জ্বল মুখখানা এখন মিয়ে গেছে। তবুও বারবার বন্ধ নাম্বারটিতেই ফোন দিচ্ছে সে। যদি মানুষটা নাম্বারটা খোলে, হয়তো কোনো কারণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে! হয়তো কোনো বিপদ হয়েছে! বিপদের কথা ভাবতেই হৃদয়ের ভেতরের টলমলে ভয়টা উঁকি দিলো চোখজোড়ায়। চোখজোড়া প্রচন্ডভাবে জ্বলছে। নোনাজল এসে ভিড় করেছে চোখের কোনে। বারবার একটা প্রশ্নই ঘুরছে, “প্রণয় আসছে না কেনো? আসছে না কেনো?”

*****

দিনের পাঠ চুকিয়ে নিগূঢ় আঁধার ধীর পায়ে নামছে ধরণীর বুকে। সূর্য ডুবে গেছে বহুক্ষণ হয়েছে। নীল আকাশ ধীরে ধীরে কৃষ্ণরুপ নিচ্ছে। শীতল সমীরে বইছে। রাস্তার লাইটগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। কাজী অফিসের বাহিরের কাঠের বেঞ্চিতে শুকনো মুখে বসে রয়েছে নিশী। জামশেদ সাহেব এবং নিহিতার মুখে বুলি নেই। তারা শুধু নির্বাক দর্শকের মতো তাকিয়ে আছে। সুহা একটি মাম পানির বোতল এগিয়ে দিলো নিশীর দিকে। নিশী টলমলে চোখে তাকালো তার দিকে। থমথমে স্বরে বললো,
“পানিটা খেয়ে নে, ভালো লাগবে”
“বাসায় গিয়েছিলি?”
“তালা দেওয়া”

সুহার কথাটা শুনে ছোট করে “অহ” বললো নিশী। অনেক দুশ্চিন্তা মাথায় আসছে। অবিশ্বাসের সুঁচালো সুই বারবার দৃঢ় বিশ্বাসটিকে ভাঙ্গার প্রচেষ্টা করছে। কিন্তু সেগুলো আমলে নিচ্ছে না নিশী। কারণ প্রণয় বলেছিলো,
“নিশীথিনী, অপেক্ষা করো আমার জন্য। আমি তোমাকে নিজের করতে আসবো ঠিক”

সেই কথাটা যে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে নিশী। সুহা ব্যগ্র স্বরে বললো,
“অফিস বন্ধ করে দিবে হয়তো। কি করবি?”
“আরেকটু দেখি!”

শান্ত কন্ঠে কথাটা বললো নিশী। সুহার চোখে মুখে বিরক্ত ফুটে উঠলো। মেয়েটি সেই সকাল থেকে চাতক পাখির মতো বসে রয়েছে। একটু নড়েও নেই। খাওয়া দাওয়ার পাঠ চুকিয়ে শুকনো মুখে বসে রয়েছে। কারণ প্রণয় বলেছে সে আসবে। অথচ মানুষটি আমাবস্যার চাঁদের মতো উবে গেছে। বাসায় গিয়েছিলো জামশেদ সাহেব এবং সুহা৷ বড় একটা তালা ঝুলছে। যদিও প্রণয় নিশীকে ধোঁকা দিয়েছে কথাটা মানিতে ইচ্ছে হচ্ছে না, তবুও তিন-চার মাসের প্রণয়কে আর কতই বা বিশ্বাস হয়! আবার তার বিপদ ও হতে পারে! তাহলে পুলিশে জানাতে হবে। তার আগেও চব্বিশ ঘণ্টা তো দেখতে হবে। কিন্তু নিশী তো নড়ছে না। সে মূর্তির মতো বসেই আছে। কারণ তার ধারণা প্রণয় আসবে। সুহা নিজেকে সংযত রাখতে পারলো না। ক্ষিপ্র কন্ঠে বললো,
“আর কত? সাড়ে ছ’টা বাজে। সেই সকাল থেকে এখানে। সে আসবে না। আসার হলে এতো সময় ই চলে আসতো। সাতটার দিকে তো অফিস ও বন্ধ হয়ে যাবে। তখন কি বসে ডুগডুগি বাজাবি? উঠ, বাসায় যাবি। খাবি। তারপর ঘুম দিবে। তারপর তোর উকিল বাবুর ওকালতি ছোটাবো। কি এমন তোপ হয়েছে দেখা যাবে”
“এভাবে বলছিস কেনো? আমি জানি, প্রণয় আমাকে এভাবে অপেক্ষা করাবে না। নিশ্চয় কিছু হয়েছে। আচ্ছা থানায় গেলে হয় না?”
“কি করবি থানায় গিয়ে?”
“উনি উকিল মানুষ, বিপদ আপদ তো হতে পারে”
“নিশী, তুই কবে থেকে এমন অন্ধবিশ্বাস করা শুরু করেছিস? ঘুম থেকে উঠ, আশপাশ টা দেখ”
“আমি তাকে বিশ্বাস করি সুহা, সে আমার বিশ্বাস ভাঙ্গবে না। মিলিয়ে নিস”

এবার জামশেদ সাহেবও চুপ করে রইলেন না। গম্ভীর স্বরে বললেন,
“নিশী মা, বাসায় চলো। অনেক হয়েছে”
“চাচা, আপনিও”
“হ্যা, আমিও। যদি বিপদ আপদ হয় এখান থেকে জানা যাবে না। তুমি বাসায় গেলে আমি খোঁজ লাগাবো। চল মা”

জামশেদ সাহেবের সাথে তর্ক করলো না নিশী। তার চোখজোড়া টলমল করছে। পা জোড়া জমে আছে। চলার শক্তি নেই। কেমন যেনো লাগছে, মনে হচ্ছে সুখের ঝুড়িটা হাতে পেয়েও হারিয়ে ফেললো। নিঃস্ব হয়ে গেলো নিশী। স্বপ্নগুলো কাঁচের মতো ভেঙ্গে যাচ্ছে। চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে বিশ্বাসের সেই শ্বেতমহল। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হলো। কোন মতে উঠে দাঁড়ালো নিশী। ঠিক তখন ই একজোড়া কচি হাত ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো তার কোমড়। বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নিশী। তার সম্মুখে লাল শাড়ি পড়ে নীরা দাঁড়িয়ে আছে। ঘ্যাড়ঘ্যাড়ে কন্ঠে বললো,
“ম..মা”

মস্তিষ্কে “মা” ডাকটি ধারণ করতে সময় লাগলো। হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো সে। আরোও বিস্মিত হলো, যখন মোটা পুরুষালী হাফধরা কন্ঠ শুনতে পেলো,
“অফিস কি বন্ধ হয়ে গেছে?”

কন্ঠটি শুনেই সামনে তাকালো। হালকা ক্রিম রঙ্গের পাঞ্জাবী পরিহিত শ্যাম বর্ণের পুরুষটি যে আর কেউ নয়, প্রণয়। সুহা এবং জামশেদ সাহেব ও বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রণয়ের দিকে। প্রণয় কিঞ্চিত লজ্জিত কন্ঠে বললো,
“ক্ষমা করবেন, একটা কাজে আটকে গিয়েছিলাম। ফোনটাও ভেঙ্গে যাওয়ায় বিপদ বেঁধেছে। অফিস কি বন্ধ হয়ে গেছে?”
“নাহ, এখনো হয় নি তবে হবে! আপনি সাক্ষী এনেছেন?”
“হ্যা এনেছি”

প্রায় সাথে সাথেই সেখানে উপস্থিত হলো অসি মোস্তাক এবং ঈশান। ঈশানকে দেখে বেশ অবাক ই হলো নিশী। আসলে পরপর অবাককর ঘটনায় সে দিশাহীন হয়ে যাচ্ছে। এদিকে ছোট্ট নীরা এখনো তাকে জড়িয়ে রেখেছে। সে শুধু ওই একটি শব্দ ই শিখেছে। “মা”। নিশীর শুষ্ক, মিয়ে যাওয়া মুখখানার দিকে একনজর তাকালো প্রণয়। সাথে সাথেই হৃদয়টা তীব্র ব্যাথায় ছেয়ে গেলো। মেয়েটিকে এভাবে অপেক্ষা করানোর গ্লানি তাকে ভেতরে ভেতরে দূর্বল করে দিলো। কিন্তু তবুও চোখ সরালো না। লাল জামদানীতে সত্যি সুন্দর লাগছে তার শুভ্র জ্যোৎস্নাকে। প্রণয় এগিয়ে যেয়ে আলতো করে হাতটি ধরলো নিশীর। নরম স্বরে বললো,
” খুব অভিমান হয়েছে? খুব কষ্ট দিয়ে ফেলেছি? এই কান ধরলাম আর হবে না”
“দেরি হলো যে”
“সব বলবো, আগে বলো ক্ষমা করেছো”

নিশী কিছু বললো না। তার অভিমান হচ্ছে, অনেক অভিমান হচ্ছে। প্রণয়ের প্রণয়সিক্ত কথাতে গলতে ইচ্ছে করছে না। সে নীরার হাত ধরে কাজী অফিসের ভেতরে চলে গেলো। প্রণয় বুঝলো তার প্রেয়সী রেগে আছে। জামশেদ সাহেব ভেতরের কাজীর সাথে কথা বললেন। ফলে সব কাজ সেরে দুজনের ডাক পড়লো। সুহা নিয়ে আসা বরমালা দুটো বাক্স থেকে খুললো। অবশেষে বিয়ে হল প্রণয় নিশীর। খুরমা, মিষ্টি খেলো সকলে। নিশী সকলের সাথে কথা বললেও প্রণয়ের উপর অভিমানটা বজায় রাখলো। সুহা এবং নিহিতাকে গেট ধরা, জুতো বাবদ দশ হাজার টাকা দিলো প্রণয়। শালিকাদের খুশি রাখা দরকার। বিয়ের পর ঈশান এবং মোস্তাকের যাবার পালা। ঈশান একটু ফাঁক পেয়ে নিশীর সাথে আলাদা করে শুধু এতোটুকুই বললো,
“ভালো থেকো। তোমাকে সুখী দেখার প্রবল ইচ্ছেটা আমার আজও জীবন্ত। জানি তুমি আমাকে পছন্দ করো না। জানি আমি তোমার জীবনে কেউ নই। তবে তুমি আমার জন্য অনেককিছু। সারাটাজীবন তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী হয়েই না হয় থাকলাম”
“একটা প্রশ্ন করবো?”
“করো!”
“কেনো এমন করেন আপনি?”
“উত্তরটা দিবো না। তোমার শুনতে ভালো লাগবে না। কিছু কথা না বলাই থাক। সবার মঙ্গল এতেই। আসি”

ঈশান চলে যাচ্ছে। নিশী বিস্মিত নয়নে দেখলো তার যাওয়া। কেনো যেনো মায়া হচ্ছে, বিনাস্বার্থে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে কে এতোটা করে!

****

প্রণয়ের ঘরটি সাদা গোলাপে সাজানো হয়েছে। নিশী এই প্রথম প্রণয়ের ঘরে পা রেখেছে। এর পূর্বে তার সীমানা ছিলো শুধু নীরার ঘর। ঘরটি সিমসাম, অতিরিক্ত আসবাব নেই। একটা বড় বুকশেলফ আছে আইনি বই এ গাদা। কি অদ্ভুত! লোকটি এতো পড়তে পারে? নিশী শুধু মুগ্ধ নয়নে দেখছে প্রণয়ের ঘর। ঠিক সেই সময় ই আগমণ ঘটলো প্রণয়ের। নীরার ঘুমন্ত মুখখানা দেখেই সে এসেছে ঘরে। নিশী তাকে একনজর দেখলো। তারপর বারান্দায় চলে গেলো। অভিমানটা যে এখনো অক্ষত। প্রণয় নিঃশব্দে হাসলো। তারপর পিছুপিছু গেলো সে নিশীর। আজ কোনো বাঁধা নেই। তার নিশীথিনী কেবল ই তার। তাই বিনা সংকোচে তাকে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করলো প্রণয়। নিশী নির্বিকার৷ সে স্থির চাহনীতে তাকিয়ে আছে বাহিরের দিকে। প্রণয় তখন তার কাধে থুতনী ঠেকিয়ে নরম কন্ঠে বললো,
❝আধারে ঘেরা নিশিতে তুমি আলোর বাণ,
তুমি চোখ সরালেই আমি বিমূঢ়, নিরব ম্লান!
হৃদয়ে বয়ে চলা জলের কলধ্বনি,
বয়ে চলো হৃদ মোহনায় নিরবধি তুমি!
আমার আধার ঘেরা শহরজুড়ে তোমার বাস,
তোমায় পেলেই মিটে মনের আশ!
আমি শুক্লপক্ষের চাঁদের ধরনী,
হবে কি তুমি আমার নিশীথিনী?❞ (জান্নাতুল মিতু)…….

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি