#ইতি_নিশীথিনী
#৪৯তম_পর্ব
নিশী নির্বিকার৷ সে স্থির চাহনীতে তাকিয়ে আছে বাহিরের দিকে। প্রণয় তখন তার কাধে থুতনী ঠেকিয়ে নরম কন্ঠে বললো,
❝আধারে ঘেরা নিশিতে তুমি আলোর বাণ,
তুমি চোখ সরালেই আমি বিমূঢ়, নিরব ম্লান!
হৃদয়ে বয়ে চলা জলের কলধ্বনি,
বয়ে চলো হৃদ মোহনায় নিরবধি তুমি!
আমার আধার ঘেরা শহরজুড়ে তোমার বাস,
তোমায় পেলেই মিটে মনের আশ!
আমি শুক্লপক্ষের চাঁদের ধরনী,
হবে কি তুমি আমার নিশীথিনী?❞
প্রণয়ের প্রগাঢ় কন্ঠ হৃদয় ছুয়ে গেলেও মুখে কুলুপ এঁটেই দাঁড়িয়ে রইলো নিশী। নিখাঁদ প্রেমের আহ্বান ও নাকোচ করলো সে। তার অভিমান হয়েছে, বড্ড বেশি অভিমান। মানুষটি কি জানে সে কতোটা ভয় পেয়েছে! মানুষটি কি জানে স্বপ্ন ভাঙ্গনের বিশ্রী টলমলে ভয় কতোটা ভয়ংকর হয়। নিশী তো তাকে ভালোবাসতে চায় নি। সে বাধ্য করেছে! বাধ্য করেছে এই প্রণয়ের শিকলে আবদ্ধ হতে। তবে আজ কেনো এমনটা করলো সে! একটি বার কি সত্যি জানানো যেতো না! কাজ কি এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ! তার দৃষ্টি কালো আকাশে নিবদ্ধ। প্রণয় বুঝলো নিশীর অভিমানের গাঢ়ত্ব। তাই তো বাহুবন্ধনটা আরোও শক্ত করলো, বিনয়ী কন্ঠে বললো,
“ক্ষমা করবে না?”
“যদি না করি?”
শীতল কন্ঠে কথাটা বললো নিশী। তার কন্ঠ অকম্পিত। সে ঘুরে প্রণয়ের চোখে চোখ রাখলো। তার কাজলকালো ঠান্ডা টলমল চাহনীতে অভিমানের ঢেউ বহমান। প্রণয় তার কপালে আলতো করে কপাল ছোঁয়ালো। প্রগাঢ় কন্ঠে বললো,
“তাহলে অপেক্ষা করবো। জানোই তো আমার অপেক্ষা করে ভালো লাগে। আর সেই অপেক্ষাটি যদি হয় আমার নিশীথিনীর জন্য তবে তার থেকে সমধুর আর কিছুই নেই। নিশীথিনীর জন্য আমরণ অপেক্ষা করতে রাজী আমি”
প্রণয়ের বিনা ভনীতায় বলা কথাগুলো চুপ করে শুনলো নিশী। আগুণের স্পর্শে মোম যে রুপ গলিত হয়, তার অভিমানগুলো ধীরে ধীরে প্রণয়ের উষ্ণতায় গলছে। আর রাগ করে থাকতে পারছে না। মানুষটির চোখজোড়া যেনো শান্ত দিঘী। অবর্ণনীয় অনুরাগ তাতে। তলিয়ে যেতে সময় লাগে না। নিজের উপর বিরক্ত হলো নিশী। যে নিশী কিনা ভালোবাসার নাম শুনলেই দু ক্রোশ দূর ছুটতো আজ সেই নিশী প্রণয়ের নরম বুলিতেই গলে যাচ্ছে। হৃদয়ের কোনে প্রবল ঝড় উঠছে। চেপে রাখা আবেগগুলো শীতল বারি রুপে নেমে আসছে অতৃপ্ত বুকে। নিশী দৃষ্টি সরালো না, মেকি কঠিন কন্ঠে বললো,
“এতোই ব্যাস্ততা যে ফোন অবধি করা যায় না। ভয় কি হয় না? জানেন হারানোর ভয় থেকে বিশ্রী কাটা দেওয়া ভয় কি? হৃদয় ভাঙ্গনের ভয়। এক মূহুর্তের জন্য কত দুশ্চিন্তা মাথায় জট পাকিয়েছিলো জানেন। জানেন না।”
“যে ভয়কে স্বচক্ষে দেখেছি, সেটা জানবো না? আমি জানি নিশীথিনী তুমি ভয় পেয়েছিলে। সত্যি বলতে দোষটা আমার ই। ওই মূহুর্তে একটু ভড়কে গিয়েছিলাম”
“কেনো? কি হয়েছিলো?”
প্রণয় শুষ্ক ঠোঁটখানা সামান্য ভিজালো। তারপর গাল ফুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কিছুটা রয়ে সয়ে বললো,
“আমি তোমার সাথে কথা বলেই নীরাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। তখন মোস্তাক সাহেবের কল আসে। স্বাভাবিক, রফিকের ক্রস*ফা*য়ারের বিষয়টা নিয়ে বেশ গানাবাজানা হচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম সেই ব্যাপারেই। কিন্তু আসলে উনি অন্য কারণে ফোন দিয়েছিলেন। আমি উনাকে একজনকে খুঁজতে বলেছিলাম। তার খোঁজ দিতেই ফোন দেওয়া”
“কে?”
“তাহমিনা আক্তার”
“তাহমিনা আক্তার” নামটি শুনতেই থমকে গেলো নিশী। নরম মুখশ্রীর চোয়ালখানা হয়ে উঠলো কঠিন, শক্ত। চাহনী স্থির। গম্ভীর স্বরে বললো,
“তাকে খোঁজা কেন?”
“তোমার জন্মদাত্রী সে, খুঁজবো না? আমি এখন তাকে খুঁজি নি। যেদিন তুমি তার কথা বলেছিলে সেদিন থেকেই তাকে খুঁজছিলাম। মানুষ তো হাওয়া হয়ে যায় না। আমি জানি তোমার জীবনে তার অস্তিত্ব নেই এর কাছাকাছি কিন্তু তবুও তার সম্পর্কে জানার অধিকার তো আছে তোমার। জানি অনধিকারচর্চা করেছি। তবুও কাজটি করেছি”
নিশী চুপ করে শুনছে কেবল। কেনো যেনো অসহ্য লাগছে তার। যে নারী তার অবুঝ বাচ্চাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে তার প্রতি বিন্দুমাত্র মায়া তার নেই। তবে আগ্রহ নেই কথাটা ভুল। কৌতুহল তার সর্বদাই মহিলাকে ঘিরে রয়েছে। শুধু সেই কৌতুহলটি প্রকাশ করার স্থান বা কাল কিছুই তার নসিবে হয় নি। এই যে প্রণয় তাকে নিয়ে কথাটা বলছে সেখানেও তার বিশাল কৌতুহল। নিশী থেকে সাড়া না পেলেও প্রণয় স্বগোতক্তির স্বরে বললো,
“আমি জানি তুমি আমার উপর অসন্তুষ্ট তবুও কাজটি ভুল করি নি। আর তোমার তার প্রতি আগ্রহ না থাকলেও তার খোঁজ আমি তোমাকে দিবো। এটা আমার স্বামী হিসেবে দায়িত্বের মাঝে পড়ে বলে আমি মনে করি”
“বেঁচে আছে সে?”
বেশ কঠিন কন্ঠে কথাখানা বললো নিশী। প্রণয় মাথা দুলিয়ে বললো,
“নাহ, নেই। উনি ইন্তেকাল করেছেন বছর দেড়েক হবে। একটা ছোট্ট সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। নারীদের অধিকার নিয়ে তার কাজ ছিলো। কবরটি যশোরে। আমি বেশ অবাক হলাম জানো উনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি। উনার সাথে তোমার বাবার ছাড়াছাড়িও হয় নি। তবে উনি আর সংসার করেন নি। উনার খোঁজ যিনি দিলেন এখন তিনি ওই সংগঠন চালান। আমি তো কেবল ই একজন বাহিরের ব্যক্তি। তাই তাকে জিজ্ঞেস করি নি। তবে উনি ই আমায় বললেন তোমার মা নাকি মৃত্যুর পূর্বেও তোমাকে দেখার ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন”
“এতোই ভালোবাসা যখন তবে ছেড়ে কেনো গিয়েছিলো?”
নিশী কন্ঠ কাঁপছে। তার চোখ টলমল করছে। প্রণয় তাকে আলতো করে বক্ষস্থলে চেপে ধরলো। আলতো পরশে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
“তোমার অভিমান আমি বুঝতে পারছি নিশী। কিন্তু এখানে একেবারেই যে তার দোষ তা কিন্তু নয়। তোমার ছোটবেলায় একটি ঘটনা ঘটেছিলো মনে আছে? একজন মহিলাকে তুমি ছেলেধরা ভেবেছিলে?”
“আপনি জানলেন কি করে?”
“তাহমিনা বেগমের সহকর্মী আমাকে বলেছে। মহিলাটি ই তাহমিনা বেগম ই ছিলেন। যেহেতু মায়ের স্মৃতি তোমার কাছে ঝাপসা তাই তুমি তাকে চিনো নি। এর পর থেকে তোমাকে কেবল দূর থেকেই দেখতেন তিনি। নিজের জেদের বসে তিনি সংসার করেন নি বটে। তবে সেই আফসোস তাকে মৃত্যু অবধি পুড়িয়েছে। তুমি যদি চাও আমি তোমাকে তার কাছে নিয়ে যেতে পাড়ি”
“আমি যাবো না”
নিশীর দৃঢ় কন্ঠের সামনে প্রণয় আর কথা তুললো না। নিশীর জেদের পরিমাপ তার জানা। তাই জোর করা অনর্থক। প্রণয় হাতি*য়ার নামিয়ে দিলো। নরম স্বরে বললো,
“বেশ, তোমার ইচ্ছে”
নিশী এখনো প্রণয়ের প্রশস্থ বুকে মাথা এলিয়ে রয়েছে। প্রণয় তাকে আলতো করে জড়িয়ে রেখেছে। কিছু সময়বাদে অনুভব করলো তার পাঞ্জাবি ভিজে যাচ্ছে। মেয়েটি কাঁদছে। নিঃশব্দে তার বুক ভেজাচ্ছে জমা বিষাদসিন্ধুর ঢেউ এ। আগে নিশীথিনীর অশ্রু তাকে অস্থির করতো। তবে আজ প্রণয়ের কেনো যেনো শান্তি লাগছে। শান্তি লাগছে এই ভেবে, তার নিশীথিনী নিজের দূর্বল অংশটুকুও শুধু তার কাছেই মেলে ধরেছে। প্রণয় তার চুলে বিলি কেটে কপালে গভীর চুম্বন এঁকে বললো,
“আমি আছি নিশীথিনী। তুমি একা নও”
নিশীথিনী তার পাঞ্জাবী খামছে ধরলো। হুহু করে স্বশব্দে কেঁদে উঠলো সে। প্রণয় কারণ শুধালো না। নিশীকে কাঁদতে দিলো। রাত গভীর হচ্ছে। শীতল সমীরের বেগ কম। আঁধারের আলোছায়ায় নিশী প্রণয়ের নতুন কাব্য______
সূর্যের তেজে ব্যস্ত দিনের সূচনা হয়েছে অনেক সময়। আগুনের তাপে ঘাড় বেয়ে নেমে গেলো নোনা ঘাম। শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুজে চুলার সামনে কাজ করছে নিশী। একটু পর নীরার স্কুল। প্রণয় বের হবে আদালতের উদ্দেশ্যে। তাই নাস্তা বানাচ্ছে নিশী। বিয়ের আজ দশ দিন। দশটি দিনে সবকিছুই বদলে গেছে। এখন অগোছালো প্রণয়কে গোছানোর দায়িত্ব নিশীর। পুরোদস্তর গিন্নি সে।
আয়নার সামনে টাই বাঁধছে প্রণয়। আজ একটি কেস রয়েছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ। টাই এর প্যাচটা তাই গন্ডগোল বাঁধছে। প্রণয় তাই গলা উঁচিয়ে হাক দিলো নিশীকে। অস্থির কন্ঠে এক দুবার ডাক দিয়ে যখন সাড়া পেলো না তখন ডাকের মাত্রা বাড়লো। ফলে ভেজা হাত আচলে মুছতে মুছতেই ঘরে এলো নিশী। বিরক্ত কন্ঠে বললো,
“কি হয়েছে? এতো কিসের ব্যস্ততা?”
“টাই টা বেঁধে দাও না?”
“ঢং, এটুকু পারেন না নাকি?”
“পারি তবে ইচ্ছে হচ্ছে না। বউ টাই বেঁধে দিবে এটা যে আমার বহুকালের শখ”
নিশী চোখ গরম করে তাকালো। কিন্তু লাভ হলো না। ফলে এগিয়ে এসে টাই এ হাত দিলো সে। প্রণয় সেই সুযোগে তার নরম কোমড়ে ছোয়ালো উষ্ণ স্পর্শ।
“কি হচ্ছে?”
“ভালোবাসা”
“আদিক্ষেতা”
“হলে হবে”
বলেই তার পাতলা ঠোঁটে নিজের উষ্ণ অধরের গভীর চুম্বন এঁকে বলল,
“পুরোদস্তর মানুষটি আমার। তাই এসব এখন থেকে অভ্যেস করে দেও। জানো ই তো আমার প্রণয় শিকল সর্বদাই অসহনীয়”
নিশী হাল ছেড়ে দিলো। শুভ্র গালজোড়ায় জমলো রক্ত। মানুষটির বেসামাল স্পর্শ আজকাল তাকে সর্বদাই ঘিরে রাখে। লজ্জা লাগে, আবার ভালোও লাগে। হয়তো ভালোবাসাগুলো এমন ই।
নীরা তার মায়ের মুখে একখানা চুমু একে দিলো। নিশী তাকে বলল,
“সাবধানে থেকো”
সে ঘাড় নাড়ালো। তার এতোটা অগ্রগতি নিশীর মনে শীতল পরশ দেয়। আধো বুলিতে অস্পষ্ট “মা” ডাকটি যেনো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর একটি ডাক। মাঝে মাঝে নিজের মার কথাটাও মনে পড়ে। তাই ভেবেছে, শেষ দর্শন না হলেও একটিবার ক*বর খানা দেখবে। যতই হোক মা সে। প্রণয় এবং নীরা বেড়িয়ে গেলো। নীরাকে স্কুলে দিয়ে প্রণয় গেলো আদালত।
সারাদিনের কর্মব্যস্ততা সেরে প্রণয় চেম্বারে পৌছালো। নতুন এসিস্ট্যান্ট সাব্বিরকে নিয়ে অনেক ঝামেলা। ছেলেটা একেবারে বুঝে না কিছু। কেসের ফাইল দিতে বললেই তার মুখ শুকিয়ে যায়। বুঝেই না, কোনটা দিবে। ফলে প্রতিদিন তার উপর বেশ কথা ব্যয় হয় প্রণয়ের। প্রণয় তাই রেগেই বললো,
“কফি আনো, কালো কফি”
সাব্বির বেরিয়ে যেতেই তার মোবাইল বেঝে উঠলো। স্ক্রিনে “মোস্তাক” নামটি ভেসে উঠেছে। বেশ কৌতুহল নিয়ে ফোনটি ধরলো প্রণয়। সাথে সাথেই মোস্তাকের চিন্তিত স্বর কানে এলো,
“খারাপ নিউজ প্রণয় সাহেব, মাহাদী শেখ তো জেল থেকে পালিয়েছে”…….
চলবে