#ইলেকট্রিক্যাল_মন
#Arishan_Nur (ছদ্মনাম)
Part–2
সমুদ্র গাড়িতে এসে ড্রাইভিং সীটে বসতেই আয়নার অস্থিরতা বৃদ্ধি পেল। সমুদ্রের ঠ-ক করে দরজা লাগানোর আওয়াজে সে ছোট করে ঢোক গিললো। ওনার শরীর থেকে একটা অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে। নিশ্চয়ই কোনো সুন্দর পারফিউম মেখে এসেছে সে। আয়না আড়চোখে একবার তাকে পরখ করে নেয়। খুব সুন্দর করে চুলগুলো গোছানো। কপালের দিকে কিছু ছোট চুল বড় অযত্নে পরে আছে। পরনে সাদা ফর্মাল শার্টটার হাতা গুটানো। গুটানো শার্টের হাতের সামন দিয়ে দামী হাত ঘড়িটা উঁকি মারছে।
সমুদ্র একটানে গাড়ি টান মেরে বললো, ” কি দেখছেন এতো?”
আয়না যেন মুহুর্তের মাঝে ভীমড়ি খেল। সে বড় করে শ্বাস নিয়ে বলে উঠলো, ” কই কি দেখব আবার? ”
সমুদ্র সুন্দর করে হেসে বলে, ” আমাকে দেখছিলেন নাকি?”
আয়না ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। উনি কিভাবে বুঝলো আয়না একবার আড়চোখে তাকিয়ে ছিল তার দিকে? এতো নজরদারি রাখে কেমনে? সে আমতাআমতা করে বলে, ” না না আপনাকে দেখার কি আছে৷ আমি একবারও তাকায় নি আপনার দিকে। ”
— ” ওয়েল, আমাকে দেখার অনেক কিছু আছে। বুঝেছেন?”
–” না।”
–” না? ইউ সিউর?”
আয়না বলবে না বলবে না ভেবেও ভুল করে বলে দিলো, ” আপনার শুধু চোখ দুটিই সুন্দর।”
সমুদ্র যেন প্রশংসা পেয়ে সামান্য খুশি হলো। পুরুষও প্রশংসা পেলে খুশি হয় জানা ছিল না আয়নার।
সে মোড়ে বাক নিতে নিতে জবাব দেয়, ” তাহলে আমার চোখের দিকেও নজর যায়? ”
আয়না তার মুখে এমন কথা শুনে ভীষণ লজ্জা পায়। বেফাঁস কথা বলা একদম ঠিক হয় নি তার। আয়না ভাবলো কোনো স্যাভেজ উত্তর দিবে কিন্তু লজ্জায় তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো নাহ। এই বদমেজাজি ছেলেটাকে শায়েস্তা সে করতে পারবে বলেও মনে হয় না৷ তবে, তবে এটা চিরন্তন সত্য যে লোকটার চোখের দিকে অবশ্যই নজর যায়। যাবেই বা না কেন? এতো এক্সট্রা অর্ডিনারি চোখের অধিকারী কয়জনই বা? ওনার বুঝি এজন্য অহংকার বেশি। ওনার ওই নীলচে চোখের মণির দিকে তাকালে যে কেউ তার অদ্ভুত প্রশান্ত চোখ দুটির সৌন্দর্যের ঈর্ষায় বশীভূত হবে! আয়নার মনে হয়, তার চোখ দুটির দিকে তাকিয়েই তার নাম সমুদ্র রেখেছে কেউ। এই লোকটার সুন্দর চোখজোড়ার মতো সেইম টু সেইম যদি আয়নার হবু বাবুদেরও চোখ হতো। ইশ তাহলে কি সুন্দর হবে। এটা মাথায় আসতেই আয়না নিজের চিন্তায় নিজেই ভীষণ বিব্রত হলো। বারবার ইন্টারের জিনতত্ত্ব অধ্যায়ের কথা স্মরণ হচ্ছিল আর লজ্জায় চোখ-মুখ গরম হয়ে আসছিল।
এমন সময় হুট করে জোরে ব্রেক কষে একটু বামদিকে গাড়ি ছিটকে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে আয়না সীটবেল না বাঁধার ফলে সামনের দিকে জোরে এগিয়ে এসে মুখ থুবড়ে পরতে ধরলে একটা পুরুষালি হাত এসে তার কপালের দিকে ঠেকে দেয় ফলে ব্যথা পাওয়া থেকে রক্ষা পায় সে।ওনার হাতের উপর নিজের কপাল-মুখ স্পর্শ পাওয়ায় বেশ অস্বস্তি লাগে আয়নার।
সমুদ্র বিরক্ত মুখে বলে, ” বাংলাদেশে গাড়ি চালানো মানে রোলার কোস্টারের উপর বসে থাকা।” তারপর আয়নার দিকে তাকায় এবং নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলে,” এ দেশের একজনও যদি কোনো রুলস মানে!”
সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের দিকের জানালায় টোকা পড়লো। তিন-চারজন লোক জোড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কাঁচ সামান্য খুলতেই একজন লোক বলে উঠে, ” কি ভাই, গাড়ি চালাতে পারেন না?”
–” নিয়ম মানেন আপনারা? ”
লোকটা কাঁচের জানালা ভেদ করে গাড়ির ভেতরের দৃশ্য দেখলো। পাশে মেয়ে বসে থাকতে দেখে যেন মজা পেল সে এবং বলে, ” মেয়ে নিয়ে ফ–স্টি-ন– স্টি করে মজা নেন আর গাড়ি চালানোর সময় মানুষের উপর পারলে উঠায় দেন। মেয়ে নিয়ে থাকলে তো ভাই হুশ থাকে না! ”
সমুদ্রের যেন রাগ উঠে যায় কিন্তু শান্ত থেকে বলে, ” রঙ সাইড দিয়ে যাচ্ছে। সেটা দেখলেন না?”
–” আপনি গাড়ি চালান, আপনি দেখবেন কিন্তু আপনি তো মৌজমস্তি নিয়ে ব্যস্ত। দেখার আর সময় কই? জরিমানা দেন।”
সমুদ্র বলে,” মাইন্ড ইউর ল্যাংগুয়েজ।”
কিন্তু পথচারীদের মধ্যে তার সঙ্গে ঝগড়া করার চেয়ে জরিমানা নেওয়ার তাড়া বেশি৷ অগত্যা এক হাজার টাকার নোট এগিয়ে দিতেই তারা গাড়ি ছাড়লো। এবারে সমুদ্র স্পিড তুলে জায়গা দ্রুত ত্যাগ করলো। একটু সামনে যেতেই আয়না বলে উঠে, ” গাড়ি থামান। আমি নামব।”
–” আপনি কি ভয় পেয়েছেন? রিল্যাক্স! আপনাকে এক্সি–ডেন্ট করিয়ে মা—রবো না আমি।”
আয়না বলে উঠে, ” সামনের গলিতেই আমার বাসা।”
–” ওহ।”
সে দ্রুত বামে গাড়ি থামায়। আয়না কোনো কথা না বলেই নেমে পরে। সমুদ্র মনে মনে ভাবে একটা ধন্যবাদ অব্দি দিলো না। তবে সে গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। আয়না সামনে না গিয়ে, পিছনে গিয়ে দোকান থেকে অনেক গুলো বোনরুটি কিনলো। সমুদ্র কিছুটা বিষ্ময় নিয়ে ফ্রন্ট মিরর দিয়ে পেছনের দিকে চোখ রাখে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একটা রুটির প্যাকেট খুলতেই দুটো রাস্তার কুকুর এসে তাকে ঘিরে ফেলে। আয়না ওদের রুটি খুলে খাবার দিতে থাকলো। কুকুর গুলো এসে এসে তার পাশে জোড়ো হয়ে রুটি খাচ্ছি। কুকুর গুলো বুঝি আয়নাকে চেনে। সমুদ্র একবার পেছনে ঘুরে তাকিয়ে সরাসরি আয়নার কাণ্ড দেখে নেয়।
কিছু দৃশ্য বা দৃশ্যপট সরাসরি দেখতে ইচ্ছে করে। ক্যামেরা কিংবা আয়নার প্রতিচ্ছবিতে সম্পূর্ণ সৌন্দর্য ধরা পড়ে না। দেখার স্বাদও পুরাপুরি মেটে না। তা নাহলে কেউ আর সমুদ্রপাড়ে যেত ই না। কিছু চোখের তৃষ্ণা প্রত্যক্ষদর্শী দর্শনেই কেবল মেটে।
______________________
সমুদ্র যখন বাসায় ফেরে তখন রাত এগারোটা অতিক্রম হয়েছে । আজ একটু বেশিই দেরি করে ফেলেছে। শুধু শুধু দু’ঘন্টা নষ্ট করেছে আজ সে।
বাসায় সবাই খাওয়া-দাওয়া করে ফেলেছে নিশ্চয়ই। এখন ঘুমাচ্ছে সবাই। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে তার মা মিসেস রোদেলা ঠিক ডাইনিং টেবিলে তার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন৷ সমুদ্র মুচকি হেসে বলে, ” আম্মু জেগে আছো কেন? ঘুমাও নি কেন?”
–” তোর জন্য অপেক্ষায় ছিলাম।”
–” কেন মা?”
–” আমি ঘুমালে, তো তুই না খেয়ে খালি পেটে শুয়ে পড়বি।”
–” তোমার কিন্তু প্রেশারের সমস্যা। সময়মতো ঘুম দরকার।”
মিসেস রোদেলা দুঃখী দুঃখী চেহারা করে বললেন,” ঘরে আমার বউমা আসলে দেখতি আমাকে এই হাই প্রেশার নিয়ে তোর জন্য রাত জাগতে হতো না। বউমা ই সব গরম করে তোকে খাওয়াত।”
–” বউ মা না আসলেও তোমার রাত জাগার প্রয়োজন নেই।”
সমুদ্র খেতে বসে। সে বুঝলো মা আসলে তার খাবার বেড়ে দেওয়ার অপেক্ষায় বসে নেই। বিশাল বড় ফাঁদ পেতে রেখেছে। ইমোশনাল ট্রাডেজি এপ্লাই করছেন উনি।
মিসেস রোদেলা ভাত বেড়ে দিয়ে বলে, ” তোর আব্বু কিন্তু তোর উপর ভীষণ রেগে আছে বাবু।”
–” আব্বু গত ছ’বছর ধরেই রেগে আছে।”
–” এবার আর বাবা কে কষ্ট দিস না বাবু, তোর বাবা তোদের কতো ভালোবাসে একবার ও তুই সেসব নিয়ে ভাবিস না। মানুষটা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে, আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছি।”
–” ডাক্তার তো ঘরে আছেই।”
–” অসুখ হলে ঔষধ লাগে।”
–” তোমাদের অসুস্থতার ঔষধ কী তবে? ”
–” একটা মিষ্টি বউমা আর দুইটা নাতি-নাতনি।”
সমুদ্র অবাক নাহয়ে পারলো না! কি সাবলীল স্বীকাতোক্তি তার মায়ের৷ সামান্য হাসলো সে।
–” বাবু এতো কম ভাত নিয়েছিস কেন? আরোও নে।”
–” না, ভাত দিও না। ডাল দেও।”
মিসেস রোদেলা ভাত বেড়ে দিয়ে বললেন,” ভর্তায় লবন ঠিক আছে?”
— ” হ্যাঁ। ”
–” কালকে কিন্তু শুক্রবার। মনে আছে তো?”
সমুদ্র খাওয়া থামিয়ে দিলো। সে কিছুটা শীতল গলায় বলে, ” মনে আছে।”
–” এবার কোনো ঝামেলা করিস না বাবা।”
সমুদ্র এবারে বলে, ” আমি ঝামেলা করি না।”
–” তোর বাবা এবারে ভীষণ আশাবাদী। এবার তাকে কষ্ট দিস না। এবার তুই ঝামেলা করলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব৷”
সমুদ্র বিষ্মিত হয়ে বলে, “এসব কি আজব কথাবার্তা বলো। বলেছি তো ঠিক আছে। বারবার ঘ্যানঘ্যানানি ভালো লাগে না৷”
–” প্রমিজ কর বাবাকে আর কষ্ট দিবি না, অপমানিত করবি না।”
–” বাবা আগ বাড়ায় কষ্ট টেনে আনেন, এখানে আমার কিছু করার নেই। আর অপমান আমি আমার পরিবারের হতে দিতে চাই না৷ তোমাদের আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। কিন্তু আমাকেও তো বাধ্য করো। এতো জোড়াজুড়ি ভালো লাগে না।”
বলেই সে উঠে দাঁড়ালো। পাতে পরে রইল আধপ্লেট ভাত। রোদেলা বলে উঠে, ” খেয়ে নে ঠিকমতো।”
–” খেয়েছি মা। আমি রাতে কম খাওয়ার ট্রাই করছি।”
মিসেস রোদেলা চুপচাপ বসে রইলেন মন খারাপ করে। ছেলের জন্য সুজির হালুয়া করেছিলেন কিন্তু ছেলে তার একটু বেশি হেলথ কনসার্ণ। বাপ-দাদার ডায়বেটিস আছে জন্য এই অল্প বয়স থেকে সুগ্যার খাওয়া বাদ দিয়েছে৷ অথচ ছেলের মিস্টি জাতীয় খাবার সবচেয়ে প্রিয়। ছেলেটাকে তার সব প্রিয় জিনিস কেন বাদ রেখে জীবনে আগাতে হয়?
রোদেলা কারো জড়িয়ে ধরার স্পর্শে চমকে উঠে। দেখলো সমুদ্র তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরেছে। ক্ষণেই হাসি ফুটে উঠে তার মুখে। সমুদ্র বিচলিত গলায় বলে উঠে, ” মা, আমি তোমাকে কি বলেছিলাম?”
–” কি?”
–” তোমার যেটায় সুখ, আমি সেভাবেই আগাবো। আর কষ্ট দিবো না তোমাকে আম্মু। প্লিজ একটু হাসো, নাহলে আমার প্রচুর গিল্ট ফিল হয় ”
মিসেস রোদেলা, সমুদ্র মা, তাকে খুব সুন্দর একটা হাসি উপহার দিলো।
নিজের রুমে ফিরে আসতে আসতেই বারোটা বেজে গেছে। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ফের উঠে যায়৷ কিছু ফাইল চেইক দেওয়া বাকি। অফিসে ইদানীং কাজের প্রেশার যাচ্ছে। তিনটা বড় বড় প্রোজেক্টের কাজ চলছে ।এরমধ্যেই তাদের আগের ম্যানেজার দশ লাখ টাকা নিয়ে ভেগে গেছে। নতুন ম্যানেজার সাহেবকে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করতে হচ্ছে। সে ড্রাফট চেইক দিলো। মোট সাতটা ফাইল চেইক দেওয়ার কথা। কিন্তু ফাইল সংখ্যা অনলাইনে শো করছে ছ’টা। একটা ফাইল কম। নিশ্চয়ই কেউ একজন ফাইল গুগল ড্রাইভে আপলোড দিতে ভএ গেছে। দুমিনিট চেইক দিয়ে দেখলো আয়না নূর জাহান এর ফাইল নেই৷
সে বলে উঠে, ” আপনি ছাড়া এই অকাম কে-ই বা করবে?”
ফোন লাগানো আয়নার নাম্বারে। একবার রিং বাজলো। কেউ ধরলো না৷ সমুদ্র প্রতিজ্ঞা নিল আজ যতোক্ষণ আয়না ফোন ধরবে না সে কল দিয়েই যাবে৷
_____________
আয়না কেবল রান্নাঘর থেকে গরম গরম রামেন বানিয়ে বোলে করে নিয়ে রুমে আসলো। রাত গভীর হলেই তার ঝাল ঝাল রামেন, কাপ নুডুলস খাওয়ার মিড নাইট ক্রেভিংস উঠে। এজন্য অবশ্য বাবা বকাও দেয়৷ গ্যাস্ট্রিকে সমস্যা হবে জন্য। সে ফোন হাতে নিতেই দেখলো বসের ফোন থেকে আটটা মিসড কল৷ তার তো ভয়ে হাত-পা কাঁপা শুরু হলো। না জানি আবার কি ভুল করে এসেছে সে। দ্রুত কল লাগায় সে। একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো। খুব শান্ত কণ্ঠে উনি বলে উঠে, ” আয়না, ঘুমাচ্ছিলেন? ডিস্টার্ব করি নি তো?”
তার বলার ধরণে আয়না আকাশ থেকে পড়লো। উনি এতো সুন্দর করে কথা বলতে জানেন?
সে বলে উঠে, ” না স্যার। জেগে ছিলাম।”
–” কি করছিলেন?”
–” রামেন খাচ্ছি।”
আয়নার বুঝি সত্য কথা বলাটা ভুল হলো। সমুদ্র তাকে পেয়ে বসলো। বলে উঠে, ” রামেন যেহেতু খাচ্ছেন , তাহলে ঘুম তো দেরি আছে। ভিডিও কল দিচ্ছি। রিসিভ করেন।”
আয়না হতভম্ব হয়ে বলে উঠে, ” ভিডিও কল কেন?”
–” নিশ্চয়ই৷ আপনাকে দেখার জন্য না।”
সঙ্গে সঙ্গে কল আসে। সে রিসিভ করেই মেকি হাসি দিলো। বুঝাই যাচ্ছে অনিচ্ছাকৃত হাসি এটা৷ সমুদ্রের পানে একবার তাকালো। এখনো সকালের শার্ট গায়ে দেওয়া। চেঞ্জও করেনি৷ আহারে সারাদিন কাজ করলে এই দশাই হবে৷
সমুদ্র বলে, ” সবাই ফাইলের পিডিএফ ড্রাইভে আপলোড দিয়েছে৷ আপনার টা পাই নি। এখনি ল্যাপটপ নিয়ে আপলোড দেন৷ আমি ইন কলে আছি। চেইক দিয়ে কারেকশন গুলো বুঝিয়ে দিব৷ কেমন? ”
আয়নার কিছুতেই বসের মিষ্টি মিষ্টি ব্যবহার হজম হচ্ছে না। যেকোনো মুহূর্তে বদহজম হবে এ ব্যবহার গুলো নিশ্চয়ই!
সে দ্রুত ফাইল আপলোড করে দেয়। সমুদ্র রিসিভ করামাত্রই বলে, ” আমি চেইক দিচ্ছি৷ আপনি আরাম করে খাওয়া-দাওয়া করেন।”
আয়না ফোন এক পাশে রেখে রামেন খেতে লাগলো। এটা অফিস আওয়ার না যে খাওয়া বাদ দিয়ে ব্যাটার কাজ করে দিতে হবে। সে আরামসে খাচ্ছে। কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই। আজকের রামেনটা মজাও হয়েছে৷ তবে ঝাল বেশি একটু।
সমুদ্র ফাইল ল্যাপটপ এ দেখতে দেখতে ফোনের ক্যামেরার দিকে তাকাচ্ছে বারবার । ইশ, কি মজা করে মেয়েটা দুনিয়া ভুলে খাচ্ছে যেন দুঃখ ওকে কোনোদিন ছুঁ’তে পারেনি। কাজে কিছুতেই মন দিতে পারছে না। ক্যামেরার স্ক্রিনে যা দেখার তার চেয়ে একটু বেশি দেখে ফেলছে সমুদ্র। আয়না বেবি পিংক কালারের একটা গেঞ্জি পরে আছে। গেঞ্জির মাঝে হ্যালো কিটি কার্টুন। চুল গুলো কাটা ক্লিপ দিয়ে আটকানো। টানা এক মিনিট, ষাট টা সেকেন্ড নির্বিকার চিত্তে তাকিয়ে থেকে ফাইলে চোখ দিলো সে। তিনটা নতুন ভুল বের করে সমুদ্র সেগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করলো৷ তখন আয়না ফের ঝালে একদম নাজেহাল। ছোট হা করে বাতাস ছাড়ছে তো পানি খাচ্ছে৷ ঠোঁট দুটি আবারো টকটকে লাল গোলাপের মতো বর্ণ ধারণ করেছে৷ সমুদ্রর ইচ্ছা করলো ওর ঠোঁট খানা ক্যামেরা পাড়ি দিয়ে ছুঁয়ে দিতে। সঙ্গে সঙ্গে পিলে চমকে উঠে সে। নাহ রাত বারোটার পর মাথা খারাপ হয়ে যায় মানুষের। পুরুষের বুঝি একটু বেশিই হয়!
সে একনাগাড়ে বলে যায়, ” আপনি কস্ট প্রাইজ সহ লিখে দিয়েছেন৷ আমরা ক্লাইটকে কখনো বেসিক কস্টের ডাটা সাবমিট করি না। এটা কারেকশন হবে৷”
–” আমি করে দিচ্ছি। ”
সমুদ্র নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ফের স্ক্রিনে চোখ দেয়৷ মেয়েটা মনে হয় ভুলে ওড়না পড়তে ভুলে গেছে। সমুদ্রের মাথা ব্যথা শুরু হলো। সে ছোট দম ফেললো। এরপর টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে পুরাটা পান করলো তারপর পুনরায় তাকায় এবং বললো, আমি করে দিব।
আয়না তখন একটা চকলেট খুলে খাচ্ছে তার সামনে।
ও বললো, ” ঝাল লাগলে চকলেট খাই। আপনি খাবেন?”
–” চকলেট খেতে হলে তো আপনার বাসায় যেতে হবে। আসব এখন?”
আয়না ফের আকাশ থেকে পড়লো যেন। বলে উঠে, ” না না খাওয়ার দরকার নেই আপনার। আপনি এমনি চকলেট, এরমধ্যে চকলেট খেলে মানুষ আপনাকে চকলেট ভেবে ভুলে খেয়ে ফেলবে?”
সমুদ্র সামান্য চমকে উঠে বললো,” আপনি ছাড়া এই ভুলে কেউ করবে না।”
–” মানে?”
–” মানে আমাকে খে–লে আপনি-ই চকলেট মনে করে খাবেন।”
আয়না যেন ফের ভীমড়ি খায়। এই লোকের কাজই কথা ঘুরায়-প্যাচায় পয়তাল্লিশ ডিগ্রি এংগেলে এনে লজ্জা দেওয়া!
সমুদ্র এবার তার দিকে দৃষ্টি থামালো। দুইজনেই ফোনের স্ক্রিনে একে অপরকে দেখলো।
সে বলে উঠে, ” আরোও ছয়টা ফাইল দেখা বাকি। এরপরে কানাডার ক্লাইটের সাথে মিটিং আছে। আজকে আর কল ডিউরেশন বাড়াতে পারছি না। আপনি ঘুমিয়ে পড়েন । কালকে কিন্তু ধকল যাবে অনেক। প্লিজ আবার অসুস্থতার অযুহাত দিয়ে আমার প্যারা বাড়াবেন না। শুভরাত্রি। ”
খট করে ফোন কাটার শব্দ হলো। আয়না বুঝে পেল না কালকে তো শুক্রবার। তাহলে কেন কালকে তার উপর কাজের ধকল যাবে? কি আজগুবি কথা বলছেন উনি? নিশ্চয়ই সস্তা পানি খেয়ে এই দশা ওনার। হুহ। তার মনে পড়লো, আয়নার প্লান ছিল, সে রামেন খেতে খেতে তার ফেভারিট কে-ড্রামা দেখবে। তাহলে তার সব নার্ভাসনেজ আর স্ট্রেস গায়েব হয়ে যাবে। এই ওয়েট, ওয়েট, উনি কীভাবে জানলো? কালকের ব্যাপার নিয়ে আয়না ভীষণ রকম নার্ভাস আর দুশ্চিন্তায় মগ্ন? এটা তো তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়!
উনি কি মন পড়তে জানেন? মানুষ দেখলেই তার ভেতরে কি হচ্ছে বুঝে যান? নাকি কালো ম্যাজিক ট্যাজিক করে এসব ক্ষমতা আয়ত্তে এনেছে?
চলবে।