ইলেকট্রিক্যাল মন পর্ব-৩৫+৩৬+৩৭

0
289

#ইলেকট্রিক্যাল_মন
#Arishan_Nur (ছদ্মনাম)
Part–35

আয়না অনিচ্ছায় এক লোকমা খেতেই কেমন গা গুলিয়ে আসে, সে দ্রুত বাথরুমে চলে যায়।ডাইনিং টেবিলে বসা সবাই হা হয়ে যায়।

বাথরুমে পৌঁছেই আয়না হড়বড় করে বমি করে ফেলে। বেসিন ধরে দাঁড়িয়ে পরে৷ মনে হচ্ছে সেন্সলেস হয়ে পড়ে যাবে৷ সমুদ্র উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত আয়নার দিকে ছুটে’।

ফ্যানের নিচে বসিয়ে ওকে জিরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিলো। সমুদ্রও পাশে উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়ায় থাকে। বাসার সবাই খাওয়া ছেড়ে উঠে আসে আয়নাকে সামলানোর জন্য।

ও ছোট্ট করে বলে, ” এখন ভালো লাগছে। তোমরা সবাই খেয়ে নেও। আমি কিছুক্ষণ রেস্ট করি।”

খাওয়ার মাঝে খাবার ফেলে ছুটে’ এসেছে সবাই। আয়না তাড়া দিয়ে বলে, ” তোমরা যাও, খাও প্লিজ। আমি ঠিক আছি এখন।”

খাওয়ার টেবিলে সবাই গেলেও সমুদ্র দাঁড়িয়ে থাকে। আয়না তির্যক দৃষ্টি ফেলে বলে, ” আপনাকে আলাদা করে বলতে হবে?”

সমুদ্রর চেহারা বাংলার পাঁচের মতো ভোতা হয়ে আসে। সে তার এটো হাতে আয়নাকে ধরতে গেলে,আয়না দূরে সরে এসে বলে, ” যান এখান থেকে৷ আপনার গা থেকে খাসির গন্ধ আসছে। প্লিজ সরুন৷ আমার নাহলে আবার বমি হবে।”

আয়না ওর ওড়না দিয়ে নাক চেপে ধরে যেন সত্যি সমুদ্রের গা থেকে স্মেল আসছে। সে একবার নাক নিয়ে শার্টের স্মেল নেয়। পারফিউমের গন্ধই ভকভক করেছে তাও যে কেন তার গায়ে স্মেল পাচ্ছে ও৷

সে বলে উঠে, ” আমার গা থেকে ছাগলের মতো গন্ধ আসছে? ”

–” হুম। রুম ছেড়ে যান৷ পুরো রুম খাসির গন্ধে ভরে যাবে।”

সমুদ্র বেশ অপমানিত বোধ করে, ঝগড়া হয়েছে তাই বলে এভাবে গা দিয়ে খাসির গন্ধ পায় বলে অপমান করবে?

সে রুম ছেড়ে বেরিয়ে খাওয়ার টেবিলে বসলো। আয়োজন অনেক করা হয়েছে। তার শ্বশুড় ফাহাদ সাহেব অতিথি আপ্যায়ন করতে খুব ভালবাসে। আর সেক্ষেত্রে যদি অতিথি মেয়ে-জামাই হয় তাহলে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যান উনি। আজও ব্যতিক্রম নয়। সমুদ্র খাবার নিয়ে নড়াচড়া করে৷ খাওয়া গলা দিয়ে নামছে না৷ অস্বস্তি লাগছে তার৷ রাতের ঝগড়াঝাঁটি আর আজকের করা আয়নার ইউশাকে জড়িয়ে বেখাপ্পা কর্ম-কাণ্ড তাকে ভাবিয়ে তুলছে। খাওয়ার টেবিলে আয়নাকে নিয়েই আলোচনা চলছে৷ ওকে ওর বাসার সবাই আয়ু বলে ডাকে৷

আয়নার দাদী সালেহা বানু বলে উঠে, ” আয়ু বুবু কিছু ই মুখে দিতে পারছে না।সব বমি করলো। আয়ু পো য়াতি হলো নাকি?”

সমুদ্র এক লোকমা খাওয়ার মুখে দিয়ে খাচ্ছিলো৷ ওর খেতে খেতেই কাশি উঠে যায়৷ খাবার গলায় গিয়ে বাজে ওনার কথা শুনে৷ দ্রুত ফাহাদ সাহেব ওর পিঠে হাত দিয়ে বুলাতে থাকে আর জিজ্ঞেস করলো, ” কি হলো? বাবা, ঠিক আছো?”

সমুদ্র কাশতে কাশতে জবাব দিলো, ” জি।”

এরপর কিছু পল সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে ফেলে। ও ভাবে শ্বশুড় মশাই যদি জানত সমুদ্রের তার মেয়ের সঙ্গে এমন বাজে ঝগড়া হয়েছে তাহলে মাটন খাওয়ার পরিবর্তনে তাকেই খা সি ভেবে জবা ই করে দিতো।

সমুদ্র স্বাভাবিক হলে দাদী ফের জিজ্ঞেস করলেন, ” দিদাভাই, কোনো খুশির সংবাদ আছে?”

সমুদ্র ভ্যাবাচেকা খায়। শ্বশুরের সামনে দাদী এসব কি বলেন? লাগাম টানেন না কেন উনি? ভারী লজ্জা লাগে সমুদ্রের। বমি করা থেকে কোন ভাবনায় পদার্পণ করলেন উনি। কতো রুগী বমি করছে, সবাই কি প্রেগন্যান্ট হয় নাকি। কি আজব থ্রট।

সে নম্র গলায় বলে, ” না। না দাদী। ওর শরীর ভালো না।কাল থেকে আজে-বাজে ফাস্টফুড বেশি খেয়েছে। আজকে আবার ঠিকমতো খায় নি। গ্যাস্ট্রিক হচ্ছে মনে হয়। আমি ঔষধ দিচ্ছি। তখন বাচ্চা চলে যাবে, না মানে গ্যাস্টিক চলে যাবে। ঠিক হয়ে যাবে আরকি।”

এক নাগাড়ে খুব এলোমেলো ভাবে কিছু মিথ্যা বলে সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করে। তাছাড়া তার ধারণা এমন কিছু ই না। তারা এখনো ফ্যামিলি প্লানিং এর পরিকল্পনা করেনি। আয়না কাল থেকে কান্নাকাটি করছে। নিশ্চয়ই প্রেশার ফল করে এ ‘অবস্থা। আয়না আবার কাঁদতে পারেনা। কাঁদলেই নাকি ওর মাথাব্যথা, অসুস্থতা বোধ হয়। এসব জানার পরও সমুদ্র ওকে কষ্ট দেয়!

খাওয়ার পর সমুদ্র ডাইনিং রুমেই বসে থাকে।ফোন চালায় বসে। বাড়ির পুরুষরা খেয়াল না করলেও শায়লা চৌধুরী বুঝে সমুদ্র আর আয়ুর মধ্যে বেশ ঝামেলা যাচ্ছে। সমুদ্রের চোখ-মুখ আর অভিব্যক্তি দেখেও ধারণা করা যাচ্ছে৷ তবে আগ বাড়ায় কিছু বলবে না সে। এ’বাসায় এসে বুঝেছে, ফাহাদ থেকে শুরু করে প্রতিটি সদস্য আয়নাতে চোখে হারায়। আয়নার সঙ্গে ঝামেলা বাড়ানো মানে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। একটু পর সালেহা বানু হাতে অনেক কিছু নিয়ে ফিরলেন। আয়ুর রুমে যাওয়ার আগে সমুদ্রকেও ডাকেন। সমুদ্র তাকে অনুসরণ করে রুমের ভেতর আসে৷ উনি দুটো ছোট ছোট কাঁথা আর ছোট্ট বাচ্চাদের দুই’সেট জামা এনেছেন। সাথে একটা ফিডার। একটা লাল রঙের খেলনা গাড়ি।

আয়না দাদীর হাতে বাচ্চাদের জিনিসপত্র দেখে হতভম্ব হয়। সে বুঝে পায় না কি বলবে? দাদী সব বাচ্চার জিনিসপত্র আয়নার হাতে তুলে দিলো।

দাদী বলে উঠে, ” এইগুলো খুব তাড়াতাড়ি কাজে লাগবে, তাই না বুবু?”

আয়না লজ্জায় লাল হয়ে যায়। মুখ দিয়ে কিছু বের হতে চায় না। সমুদ্র তার দিকে তাকিয়ে আছে৷ তাদের সম্পর্কের এমন টানপোড়ন যাচ্ছে আর দুনিয়ার মানুষের কতো শখ তাদের নিয়ে! হাহ!

আয়নার হাতে খেলনা গাড়ি আর ফিডার দেখে সমুদ্রর বুকের মধ্যে উত্থাল-পাতাল শুরু হয়৷ কোথায় জানি চিনচিন ব্যথা অনুভব লাগে।

দাদী চলে গেলে সমুদ্র বলে, ” বাচ্চাদের জিনিসপত্র দেখতে খুব কিউট তো! যত্ন করে রেখে দেও কাজে আসবে৷”

আয়না এতোক্ষণে ওর সাথে কথা বললো। বলে উঠে, ” আপনার তো বাচ্চা এনোয়িং লাগে?”

সমুদ্র আমতা-আমতা করে বলে, ” হ্যাঁ, তা লাগে৷ কিন্তু…. ”

আয়না না শুনেই উঠে দাঁড়ায়। আলমারির দিকে আগায়। সমুদ্র বুঝে না, কোথা থেকে শুরু করবে। কিছু ভাবতে চাইলে সে সবার আগে সিগারেট ধরায়। প্রথমই রঙ্গনের বিষয়টা ক্লিয়ার করতে হবে৷ রঙ্গন ওর কলেজ জুনিয়র। নটরডেমের জুনিয়র। নটরডেমের পোলারা মাক্সিমাম বুয়েট-ঢাবিতেই যায়। তার আরেক জুনিয়রও ঢাবিতে আছে সেই সুবাদে ওর মাধ্যমে জানতে পেরেছিলো ওদের ব্যাচে নাকি সবাই আয়নাকে রঙ্গনের হাফ গার্লফ্রেন্ড বলে ডাকত। কেন ডাকে বা ডাকত এটা জানতে পারেনি সে। তবে রঙ্গন আয়নার বাসায় এসেছিলো এটা খেয়াল ছিলো। কোনোদিন জিজ্ঞাসা করেনি আয়নাকে এ নিয়ে। কারণ তার নিজেরও অতীত আছে৷ কিন্তু কাল রাতে আয়না অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করছিলো। ইতিমধ্যে তাকে চরিত্রহীন বানায় দিচ্ছিলো। আয়নার ধারণা সমুদ্র অফিসের নাম করে সবটা টাইম মেয়েদের সঙ্গে কাটাচ্ছে।

আয়নাকে টাওয়াল হাতে নিতে দেখে ও বলে, ” এ সময় গোসল করো না। পরে ঠান্ডা লেগে যাবে। এমনিতেই গ্যাস্টিকের জন্য বমি করছো। আমি গ্যাস্টিকের ঔষধ দিচ্ছি।”

–” আমার গ্যাস্টিকের সমস্যা হয়েছে এটা আপনাকে কে বললো?”

–” আমাকে কে বলবে? আমি ভালো বুঝি।”

সমুদ্র কাজ থামায় না। সাদা কাগজে কলম দিয়ে সময় নিয়ে কিসব লিখে।এরপর আয়নার হাতে দিয়ে দেয়। আয়না পড়েও না। সে সিগারেট হাতে নিতে ধরলেই আয়না বাঁজখাই গলায় বলে, ” আমার রুমে সিগারেট ধরাবেন না। তাহলে পাঁচতলা থেকে ফেলে দিবো।”

সমুদ্রের আর সি গারেট ধরানোর সাহস হয় না। সে বলে উঠে, ” তাহলে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি। তোমার সাথে কিছু কথা আছে৷ লেট আস টক এন্ড গিভ মি টাইম ফর এক্সপ্লেনেশন।”

আয়না টাওয়াল ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ” আপনি গোসল করে আসেন। পুরা রুম গোয়াল ঘর গন্ধ করছে।”

–” এখনো গা থেকে খাসি-খাসি গন্ধ আসছে?”

আয়না জবাব না দিয়ে নাক চেপে ধরে কাগজের লিখা পড়তে শুরু করে। সমুদ্র একটু হেসে গোসলে চলে যায়৷ এই রাতের বেলাও গোসল করলো। ইচ্ছামত গায়ে ডলে ডলে সাবান মাখে যেন গায়ে কোনো গন্ধ না থাকে। সে বেরিয়ে এলো। রুমে তখন আয়না বাদেও দাদী ছিলেন সঙ্গে শায়লা চৌধুরীও। সে বিরক্ত হলো। বারবার একাকী সময় চাচ্ছে কিন্তু একটু পরপর কেউ না কেউ এসে ডিস্টার্ব করছে। কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে না কেউ।

সমুদ্রকে এই রাতে গোসল সেড়ে বেরিয়ে আসতে দেখে দাদী আর শায়লা চৌধুরী একে অপরের দিকে তাকায়।
এরপর মুচকি হাসেন। সমুদ্র ওনাদের কীভাবে বুঝাবে তাদের দু’জনের মধ্যে রোমান্টিক কিছু ঘটেনি বরং আয়নার অভিযোগ তার গা থেকে নাকি বিশ্রী গন্ধ আসছে। আয়নার জন্য এক গ্লাস দুধ রেখে ওনারা চলে গেলে, সমুদ্র বলে উঠে, ” শুনো, আমি কয়েকদিনের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া…… ”

আয়না পুরাটা অব্দি শোনে না। তার আগেই চিৎকার দিয়ে বলে, ” এতোক্ষণ আপনার গা থেকে খাসির গন্ধ আসছিলো। এখন গরুর গন্ধ আসছে।”

সমুদ্র চোখ গোল গোল করে তাকালো। কি বলবে ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। আয়নার চিৎকারে বাসার সবাই চলে এসেছে। উঁকিঝুঁকি মারছে। অসুস্থ মানুষ দাদাও এসেছেন। ফাহাদ সাহেব ভ্রু কুচকে দাঁড়িয়ে আছেন। সবার দৃষ্টি সমুদ্রের দিকে যেন সে জেলখানার পালানো আসামী।

সমুদ্র আমতা-আমতা করে বলে, ” আমার গা থেকে নাকি গরুর মতো গন্ধ আসছে। বাবা, টেনশন করবেন না৷ আমি আবার শাওয়ার নিয়ে আসছি।”

সে ফের বাথরুমে ঢুকে। মনে মনে আয়নাকে একগাদা গালি দিলো। বাসার সবাই তাদের দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে যেনো সোজা পাগলা গারদ থেকে ছাড়া পেয়েছে৷ সবার সামনে ইজ্জতের বারোটা বাজায় দিলো।

রাতের বেলা সমুদ্র জিজ্ঞেস করলো, আয়না, সাদা কাগজটা পড়েছো?”

আয়না অন্যদিকে ফিরে বলে, ” হ্যাঁ। ”

–” তারপরও কথা বলবে না? তোমার নীরবতা আমাকে কষ্ট দিচ্ছ? কাগজটা কোথায়?”

আয়না ভ্রু কুচকে থেকে বলে, ” ওটা দারোয়ান কে দিয়েছি।”

–” হুয়াট! তুমি এতোকিছু করার পরও আমি আগ বাড়ায় ইগো বিসর্জন দিয়ে সর‍্যি লিখে দিলাম। আর ওটা কোন আক্কেলে দারোয়ান কে দাও তুমি? ”

আয়না বলে, ” আমি ভেবেছি ওখানে কোনো মেডিসিনের নাম লিখা আছে। এজন্য ফার্মেসী গিয়ে কিনে আনতে পাঠিয়েছি।”

সমুদ্র রাগে নিজের চুল ছিঁড়তে মন চাইলো। ও বলে, ” আমি সর‍্যি লিখে দিলাম আর তুমি সেটা ফার্মেসী পাঠালে?”

–” প্রেশক্রিবশন ভেবেছিলাম।”

সমুদ্র থ হয়ে যায় তবে আয়না তাকে আরোও অবাক করে দিয়ে বলে, ” আপনাকে নিয়ে আমি বেডে শু’বো৷ আপনি সোফায় শুয়ে পড়েন নাহলে দাদার সঙ্গে ঘুমান।”

সমুদ্র হা হয়ে যায় পুরা। আয়না একটা বালিশ ছুঁড়ে মারে তার গায়ে। কিন্তু সমুদ্র তোয়াক্কা করে না৷ একদম আয়নার গা ঘেঁষে বসে বলে, ” খবর শুনেছো?”

আয়না নিশ্চুপ থাকলে সমুদ্র বলে উঠে, ” আমি একটা কনফারেন্সের জন্য সিলেক্ট হয়েছি৷ আমার ব্যাচ থেকে মাত্র দু’জনকে সিলেকশন করেছে তার মধ্যে আমি একজন। আগামী সপ্তাহেই যেতে হবে অস্ট্রেলিয়া। আয়না, এই সেমিনার এটেন্ড করা আমার জন্য অনেক জরুরি। ট্রাস্ট মি, এক মাস আগে জানলেও আমি তোমার জন্য ভিসার কাজের প্রোসেস শুরু করতাম। মাত্র একমাস থাকবো।”

আয়না ওর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলে, ” আমাকে বলছেন কেন?”

–” অনুমতি নিচ্ছি। তুমি রাজী থাকলে, আমি যাবো। মানা করলে যাবো না।”

আয়না আবারো নিশ্চুপ থাকলে, সমুদ্র ওর ভেজা চোখ জোড়ায় চুমু একে দিয়ে বলে, ” এম সর‍্যি। অন্য কাউকে নিয়ে তোমাকে খোটা দেওয়া খুব বড় অপরাধ আমার। অনেক বড় ভুল হয়েছে। অনেক রেগে ছিলাম ওই সময়।”

কিন্তু আয়না ওর সর‍্যি গ্রহণ করে না। মাঝখানে একটা বালিশ দিয়ে বেরিগেড দিয়ে শুয়ে পরে৷

সমুদ্র বলে, ” ধরে নিবো রাজী আছো?”

আয়না মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি দিলো। উনি বলে উঠে, ফ্লাইট বুক করে ফেলবো।”

সমুদ্র গিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ে। তার মতো লম্বা মানুষের পক্ষে সোফায় শোয়া বিশাল কঠিন কার্য। সে মনে মনে ঠিক করে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরত আসার আগ অব্দি আয়না বাপের বাড়ি থাকলে থাকবো। সম্পূর্ণ তার ইচ্ছা। তার নিজের পরিকল্পনা ছিলো ইউশাকে নিয়ে সব ক্লিয়ার করার কিন্তু আয়না অসুস্থ তার উপর এতো পরিমাণ জেদ যে কিছু শুনতে চাইছে না৷ মাথা ঠাণ্ডা হলে বুঝাতে হবে ইউশার সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো কিন্তু অনেক বড় কারণে সম্পর্কে ইতি টেনেছে সে।

__________________

সমুদ্রর তিনদিন পর ফ্লাইট ছিলো। এ তিনদিনের মধ্যে আয়না একবারও সমুদ্রের বাসায় আসেনি। সমুদ্রের আজকে দুপুর ফ্লাইট। বের হবে, রেডি হয়েছে। কালো রঙের টি-শার্ট পরেছে৷ শায়লা চৌধুরী আসবেন তাকে বিদায় জানাতে তখন আয়নারও আসার কথা। যাওয়ার আগে শেষ বার দেখা করে নিবে। কিন্তু শায়লা চৌধুরী একাই এলেন। সঙ্গে আয়নাকে আনেন নি।

সমুদ্র জিজ্ঞেস করলে জানালেন আয়না আসবে না। সমুদ্রের ভীষণ রকমের রাগ হলো। সে বলে, ” লাগেজ গাড়িতে করে এয়ারপোর্টে পাঠায় দিও। আমি সোজা এয়ারপোর্টে যাব।”

কথাটা বলেই বেরিয়ে যায় ও আয়নার বাসার উদ্দেশ্যে। সে যখন আয়নার রুমের সামনে গিয়ে উপস্থিত হলো তখন আয়না পড়ছিলো। সমুদ্র বইটা হাতে তুলে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয় এবং বললো, ” আমি বিদেশে যাচ্ছি। তুমি আমার সঙ্গে দেখা করা বাদ দিয়ে পড়ছো কেন?”

আয়না ভাবলেশহীন থাকে। সমুদ্র রাগান্বিত গলায় বলে, ” সমস্যা কী মেয়ে তোমার? তোমার পাল্লায় পরে আমার নিজেকে মানসিক ভারসাম্যহীন লাগে।”

আয়না বই কুড়িয়ে নিতে ধরলে সমুদ্র ওর বাহু চেপে ধরে বলে, ” সেদিন নিজেই অনুমতি দিলে আর আজকে এমন নাটক কেন করছো? এজ ইফ আমি তোমার থেকে সম্মতি না নিয়েই যাচ্ছি?”

–” আমি আপনাকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিয়েছি। ”

–” কিহ?”

–” হ্যাঁ। আপনি অস্ট্রেলিয়া ইউশার কাছে যাচ্ছেন তাই না? যান। আর কষ্ট করতে হবে না৷ সেকেন্ড ম্যারেজ করার অনুমতি দিয়ে দিলাম।”

আয়নার ভাবমূর্তি দেখে মনে হচ্ছে ও ভীষণ সিরিয়াস। সমুদ্র অবাক নয়নে তাকিয়ে বলে, ” আমি তো ভীষণ সৌভাগ্যবান। আমার বউ আমাকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিচ্ছে। ওয়াও!”

আয়না তাকে ইগনোর করে পড়ার টেবিলে বসলে, সমুদ্র রাগে গজগজ করতে করতে বলে, ” ঠিক আছে। তোমার এতো ইচ্ছা সতীন দেখার। তোমার ইচ্ছাটা পূরণ করি।”

চলবে।

#ইলেকট্রিক্যাল_মন
#Arishan_Nur (ছদ্মনাম)
Part–36

আকাশ পরিষ্কার৷ আরামদায়ক ও প্রশান্তিকর প্রভাতের কিরণ উঁকি মারছে বারান্দার দরজার কোল ঘেঁষে। নাম না জানা নানারকমের পাখির কিচিরমিচির শব্দে চারপাশ মুখরিত। আজকাল ভোরে খুব শীত পরে৷ ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার মতো৷ উষ্ণ কম্বল মাস্ট নিতে হয়। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েদার বরাবরই বেশ আদুরে। সোয়েটার পড়ে শীতের আমেজ উপভোগ করতে হবে। সমুদ্র ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এক কাপ কফি নিয়ে বসে। বারান্দা থেকে খুব সুন্দর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। দূর-দূরান্ত শুধু সবুজ ঘাস আর গাছ-গাছালিতে ভরপুর। একতলা বাড়ি দিয়ে লোকালয় সাজানো। একটা বাড়ি থেকে আরেকটা বাড়ির মধ্যকার দূরত্ব কয়েক মিটার। কফিতে চুমুক দিয়ে জিড়িয়ে নিলো। আসলে এতো মনোমুগ্ধকর পরিবেশে কেউ উদাস থাকতেই পারে না। চারপাশে সবাই খুব হাসি-খুশি। সমুদ্রের মনে হচ্ছে আয়নাকে এখানে আনা দরকার। দেখানো উচিত মানুষ কতো খুশি থাকে আর মহারানী সারাদিন গোমড়া মুখ করে কিছু হলেই ভ্যা ভ্যা করে কাঁদবে।

সে কফি শেষ করে শাওয়ার নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্য রেডি হয়। হাতে এপ্রোন ছিলো। আপাতত একমাসের জন্য সে তার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমান বাসায় আছে। ডর্মে থাকার কথা ছিলো কিন্তু আমান থাকতে দেয়নি। নিজের বাসায় জোর করে এনেছে। আমান আর নয়নতারা দু’জনই তার মেডিকেলের। বন্ধু বলা চলে। তাদের মেডিকেলে টোটাল সব রার্নিং ব্যাচ মিলিয়ে চারজন বাঙ্গালী ছিল। এরমধ্যে আমান আর নয়নতারা প্রেম করে বিয়ে করল। টানা একমাসের কাছাকাছি নবদম্পতির সঙ্গে থেকে সে রিয়ালাইজ করেছে তার নব বিবাহিত জীবন খুব বাজে রকম নিরামিষ ছিলো। আমান আর নয়নতারার প্রেম যেন ফুরায় না। আজকেও ওরা ঘুরতে যাবে।

আমান প্রায় বউয়ের জন্য ফুল আনে। ক্যান্ডেল নাইট ডিনারে যায়। লং ড্রাইভিং এ যায় ওরা। সমুদ্রের ওদের সুন্দর-সুখী বিবাহিত জীবন দেখে আনন্দ লাগে আবার নিজের জন্য খুব দুঃখ অনুভব হয়। তার নব বিবাহিত জীবনও এমন সুন্দর হতে পারত। ওদের প্রেমময় সময় কাটাতে দেখে নিজেরও এমন সুন্দর মুহুর্ত অনুভব করতে ইচ্ছা করে। আয়নার কথা খুব মনে পড়ে। দূরে থাকার ফলে যেন মায়া বেড়েছে ওর জন্য। কিন্তু আয়না খুব বাজে ভাবে তাকে ইগনোর করছে। সেদিন অনেক কষ্টে ভিডিওকলে কথা বলায়, ও দু’মিনিটের মধ্যে কল কেটে দেয়৷ কিন্তু ওই দুই মিনিটের মধ্যে সমুদ্রের মনে হয় আয়না ভালো নেই। ওর কিছু একটা হয়েছে। চোখের নিজে ডার্ক সার্কেল। শুকিয়ে গেছে। আমানের সঙ্গে নিজেকে মাপলে, সে বরাবরই লুজার৷ স্বামী হিসেবে লুজার। আমানের ওয়াইফ নয়নতারা সারাদিন মুক্তা ছড়ানো হাসি হাসে। তার আয়নাও একদা হাসতো এমন করে। অফিসে দেখেছে তো সবার সঙ্গে কতো সখ্যতা করে হাসত। সমুদ্রের ওর হাসি ভালো লাগত। তবে কি এমন হলো যে আয়না আর হাসে না৷ সেও জিজ্ঞেস করে না কেন ও আর আগের মতো হাসলো না? আয়নার জন্য মন কেমন ব্যাকুল হচ্ছে৷ নাহ দেশে ফিরেই আয়নাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে হবে। জড়িয়ে ধরে বলতে হবে, “সর‍্যি দীপান্বিতা।”

আচ্ছা,দূরত্ব কী ভালোবাসার সমানুপাতিক ধ্রুবক? বাই এনক চান্স, দূরত্ব বাড়লে ভালোবাসারা বৃদ্ধি পায়? এমন কোনো ফর্মুলা আছে কী?

__________________________

ক’টা দিন যাবত আয়নার খুব দুর্ভোগ যাচ্ছে৷ জীবনটাকে নরক সম লাগছে। হুট করে এতো পরিমাণ সিক হয়ে গেছে। ভাগ্য ভালো সেমিস্টার ফাইনাল শেষ। নাহলে ক্লাস-এক্সাম সব মিস যেতো। খুব দুর্বল লাগে তার। রুমেই শুয়ে বসে কাটাচ্ছে। তবে কিছু ই ভালো লাগছে না তার। প্রচুর মুড সুয়িং হচ্ছে ওর। খাওয়ার রুচিও নেই। মাছ-মাংস কিছুই ভালো লাগে না খেতে। সমুদ্র বললো গ্যাস্টিক। এন্টাসিড রেগুলার খেলো তাও বমি ভাব যায় না। গায়ে জ্বরও ছিলো।কাল রাতে কিছু ই খায়নি। কাল রাতেই শায়লা চৌধুরী বলছিল একবার সরাসরি ডাক্তার দেখাতে।

সকালে ব্রেক ফাস্ট করতে ইচ্ছা করছে না৷ আজকে বাসায় কেউ নেই। সে একাই। হালিমা বুয়া সহ দাদা-দাদী গ্রামে গেছেন। কয়েকদিনের মধ্যেই ফিরে আসবেন। সে বিছানা থেকে উঠে মাথা তুলতেই মনে হচ্ছে মাথা ঘুরায় পরে যাবে। উফ! এতো বিরক্ত লাগে সবকিছু। চোখ বুজে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকে। কেমন ছটফট লাগে। মনে হচ্ছে কোথায় কি যেন অনেক কিছুই তার অজান্তেই হয়ে যাচ্ছে।

ঘণ্টা খানেকের মধ্যে, তার রুমে নক করলো কেউ। নিশ্চয়ই শায়লা চৌধুরী। উনি লাঞ্চ টাইমে খেতে আসেন বাসায়৷ আজ অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি। নক করেই দরজা খুলে ভেতরে এসে জিজ্ঞেস, ” ভাত খাবে? তোমার আব্বু বলেছে তোমার চিকেন পছন্দ। চিকেন ফ্রাই খাবা?”

আয়না চিকেন ফ্রাইয়ের কথা শোনামাত্র মুখ বাকিয়ে বলে, ” চিকেন ফ্রাই আমি এই মুহূর্তে মারা-ই যাবো বমি করতে করতে।”

শায়লা চৌধুরীর আয়নার লক্ষন দেখে অনেককিছুই মনে হয়৷ কিন্তু আধুনিক যুগের বাচ্চা-কাচ্চা এসব লক্ষণ দেখেই যাচ-বিচার করে না। সমুদ্র তো বলেই দিয়েছিল গ্যাস্টিক সমস্যা। জামাই-বউ যা বলবে সেটাই সই। ওনি আয়নাকে পরখ করে একটু চিন্তা করে বলে, ” আমি তো এসব চিকেন-মুরগি খাই না৷ নিজের জন্য ঝাল-ঝাল কচু ভর্তা করছি। সঙ্গে লেবুর রস। কচু ভর্তার সঙ্গে লেবুর রস আর গরম ভাত৷ খাবে নাকি?”

কচুর ভর্তা আইটেমের নাম শুনেই আয়নার খাওয়ার ক্রেভিংস হলো। এতোদিনে এই প্রথম তার খাওয়ার খেতে ইচ্ছা জাগলো। সে চোখ উজ্জ্বল করে তাকালো। সত্যি বলতে তার এই টাইপ খাওয়ার খেতেই মন চাচ্ছিলো। কিন্তু বাসার কেউ বুঝছিলোই না। সবাই চিকেন, বার্গার, পিজ্জা, রামেন এনে দিচ্ছিলো, যেগুলো দেখলেই ওর বমি পায়। সে দ্রুত হেটে রান্নাঘরে চলে যায়। নিজেই ভাত বেড়ে কচুর ভর্তা দিয়ে খাওয়া শুরু করলো৷ আসলেই তো! গরম ভাত আর কচুর ভর্তা, ভাতের উপর লেবুর রস কচলিয়ে খেতে এতো মজাব।সে অনেকদিন পর আরাম করে পুরো এক প্লেট ভাত খেলো। এক বাটি কচুর ভর্তা সে একাই শেষ করলো। এতো ক্ষুধা ছিলো পেটে সে কল্পনাও করেনি।

শায়লা পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলো। আয়নার খাওয়া শেষ হতেই উনি বলে উঠে, ” একবার ডাক্তার দেখাও, আয়না। তোমার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ইউ আর সিক।”

আয়না একবার ওনার দিকে তাকালো। শায়লা চৌধুরী বলে উঠে, ” সাইক্রিয়েসিস্ট দেখাতে চাইলে সেটাও দেখাও।”

আয়না ভ্রু কুচকে তাকালো ওনার দিকে এরপর বলে, ” সাইক্রিয়াসিস্ট কেনো দেখাবো?”

শায়লা একটু চমকে উঠে বলে, ” আমরা তো আর ছোট না। বয়সের সঙ্গে অভিজ্ঞতাও আছে। সবটাই বুঝছি, দেখছি। তোমার আর সমুদ্রের মধ্যে সমস্যা চলছে। প্রবলেম সলভ করার চেষ্টাও নেই তোমাদের মধ্যে।কেমন সব ধোঁয়াশার মধ্যে রাখছো। অনির্দিষ্ট সবটা। কিছু ক্লিয়ারও করছো না। রোদেলা ভাবীও চিন্তায় অতিষ্ঠ। তোমাদের দু’জনের চিন্তায় সবার ঘুম হারাম হচ্ছে। তুমি সম্পর্কের টানপোড়নটা সামলাতে পারছো না। ইউ নিড মেন্টাল পিস।”

আয়না বলে, ” বাবাও চিন্তা করছে নাকি?”

–” হ্যাঁ। তোমার বাবা তো সরাসরি সমুদ্রের সঙ্গে বসতে চাচ্ছে। সমুদ্রের উপর রেগেও আছে মনে হয়। তোমার আব্বু সমুদ্রের সঙ্গে বসলে, ওকে প্রচুর কথা শোনাবে। এজন্য, আমি বারং করছি তোমার আব্বুকে। বারবার বলছি, ওরা ছোট মানুষ। দু’জনই একটু খামখেয়ালি। বাড়ির বড় সন্তান। রাগ-জেদ বেশি৷ এডজাস্ট করতে একটু টাইম লাগবে। তোমাদের মধ্যে ম্যাচুরিটিও কম। সংসার বুঝো কম। আয়না, পারসোনালি আমরা কেউ তোমাদের মধ্যে ইন্টারফেয়ার করতে চাই না।”

আয়না উঠে দাঁড়াতে চাইলে মাথা যেন ঘুরে উঠে। মুহুর্তের মধ্যে সব ঘোলা লাগে। দু’দণ্ড পর আজ কয়েকদিনের ব্যবধানে ফের হড়বড় করে বমি করে দেয়। বেশ ক্লান্ত লাগে ওর। ডাইনিংরুমে বসেই শায়লাকে বলে, ” আমি একটু পর বের হবো।”

–” এই অবস্থাতে।” ( বেশ হতভম্ব হয়ে উনি জিজ্ঞাসা করলেন।)

–” হাসপাতালেই যাবো।”

_____________________________

নীল রঙের মতো রঙিন বিকেল৷ আকাশে ধূসর মেঘের আধিপত্য আজ যেন চড়া। স্বচ্ছ, নির্মল মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে আকাশে। প্রকৃতি ঘিরে বিশুদ্ধ বাতাস সঙ্গে আর্দ্রতার ছোয়া। নির্বিশেষে আজকের আবহাওয়া আর প্রাকৃতিক রুপ স্মৃতির মানসপটে আটকে রাখার ন্যায় অধিকতর সুন্দর। আলো ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। সন্ধ্যা নামতে আর বেশি দেরি নেই৷ অস্ট্রেলিয়ার বিকেলের সময়টা বেশ সুন্দর। আজ সমুদ্রের সেমিনারের শেষ দিন ছিলো। সে অর্গানাইজার কমিটি লিডার হয়েছিলো। এমনকি সেমিনারের বেস্ট পার্ফমারও সে। অনেক স্টুডেন্টকে টপকে বেস্ট এর এওয়ার্ড জিতে নিয়েছিলো। বিভিন্ন দেশের বড় বড় ডাক্তার- প্রোফেসারের সঙ্গে সবাই মিলে ফটোশুটেও করেছে। মজার বিষয় হলো কম্পিটিশনে ইউশাও ছিলো। হ্যাঁ! ইউশা। ইউশাকে তার সঙ্গে সিলেক্ট করেছে৷ ইউশাকে রেজাল্টের জন্য মনে হয় সিলেক্ট করেছিল। সমুদ্রের জানা ছিলো না, সেমিনারে তাদের মেডিকেল কলেজ থেকে ইউশাও জয়েন করছে।যদিও বা সেমিনারে ওর সাথে সাক্ষাৎ হলেও সমুদ্র রাস্তা পরিবর্তন করত। তাদের মাঝে কথা-বার্তা হয়নি।

তার দৃষ্টি সামনের রোডের দিকে। পরিষ্কার ফকফকা পিচঢালা রাস্তার ধারে বেশ যত্ন নিয়ে একটা অচেনা গাছ উঁকি মারছে। আজকে বাসার জন্য শপিংয়ে যাবে৷ এখন সে একদম ফ্রি। এ’কয়েকদিন দম ফেলবারও সময় ছিলো না। আজ মনমতো শপিং করে নিবে। তার ফেরার কথা আরোও পনের দিন পর কিন্তু চেষ্টায় আছে দ্রত রিটার্ন টিকিটে ফিরে যাওয়ার। জরিমানা দিয়ে হলেও। এম্বাসিতে তার এক ফ্রেন্ড আছে, তাকেও বলে রেখেছে আবার অনলাইনেও আপডেট রাখছে। এখানে আর মন টিকছে না। একটা দিনও অতিরিক্ত থাকতে ইচ্ছা করছে না। আয়নাকে দেখার জন্য অস্থির লাগছে। বাসা থেকেও অনবরত মা ফোন দিয়ে ঝারি মারছে। প্রথম দিকে কেউ বুঝতে পারেনি তাদের সম্পর্কের অস্বাভাবিকতা কিন্তু সমুদ্রকে সি অফ করতেও আয়না এলো না আবার, শ্বশুরবাড়িও একবারও যায় নি। আবার পিউয়ের মুখে শুনেছে ও নাকি ভার্সিটির হলে উঠে যাচ্ছিলো৷ পরে ওর বাবা আর আলিয়া বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ওদের বাসায় ফেরত এনেছে৷ মেয়েটার এমন পাগলামো ওকে আরোও মরিয়া করে তুলছে। সে ফোঁস করে দম নেয়। কবে ফিরবে সে আয়নার কাছে? আয়নাকে দায়িত্ব ভাবা উচিত হয়নি তার। দায়িত্ব তে একদা তিক্ততা আসে। মানুষ হাপিয়ে যায়। বোঝা ভাবা শুরু করে। যেমনটা সে ভাবছিল। আয়নার কোনোকিছুরই দাম ছিলো না তার কাছে। বিয়ের পর পর কয়েকদিন ও সুন্দর করে সেজে তার জন্য অপেক্ষা করত। কিন্তু সমুদ্র লেইটে আসত। কখনো শুধুমাত্র প্রাকৃতিক আদিম নিয়মের তাড়নায় কাছাকাছি যেতো বা ওকে রেখেই ঘুমিয়ে যেতো। আয়না অবশ্য অভিযোগ করতো না। তবে, আয়না নিশ্চয়ই কারো জন্য বোঝা হওয়া ডিজার্ভ করে না। সি ডিজার্ভস মাচ্ বেটার।

বিশাল বড় শপিংমলে নিজের জন্য একজোড়া এডিডাসের জুতা ছাড়া আর কিছুই কিনলো না। এরপর সোজা লেডিস জোনে চলে যায়৷ হরেক রকম মেয়েলি জিনিস দেখে কনফিউজড হয়ে যায় সে। কি কিনবে আয়নার জন্য? ওর কী পছন্দ ভাবতে গিয়ে খানিক চমকে। আসলে সমুদ্র জানেই না আয়না কি পছন্দ করে। কোন জিনিস নিলে ও খুশি হবে। আরেক দফা নিজের প্রতি ধিক্কার জানালো সে। জামা-কাপড়ের কর্ণার এ গেলে সেলসম্যান জিজ্ঞেস করে, ” কেমন ড্রেস লাগবে? কার জন্য নিচ্ছো? উনি দেখতে কেমন? তাহলে হেল্প করবো।”

গটগট ইংলিশে সমুদ্রকে জিজ্ঞেস করলো।

সমুদ্র বলে, ” আমার ওয়াইফের জন্য কিনবো। ও দেখতে খুব সুন্দর। সব রকম ড্রেসেই ওকে মানাবে।”

সেলসম্যান সুন্দর কয়েকটা টপস সাজেশন দিলো। সেগুলো কিনে ও হেঁটে হেঁটে আনমনে কিডস জোনে যায়। কিডস জোনের পাশে খেলার কৃত্রিম সুবিধা আছে। অনেক বাচ্চাকেও দেখা গেলো বাবা-মায়ের সঙ্গে এসেছে। একটা বেবি ওর মায়ের কোল থেকে পাপা পাপা করে ওর বাবাকে ডাকছে।

পাপা ডাক শোনামাত্র সমুদ্রের মধ্যে কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি জাগ্রত হয়। ইশ বেবিটার মা-বাবা কতো লাকি! এটাই তো জাগতিক নিয়ম। একসময় সবারই বাবা হতে ইচ্ছা জাগবে। ওই বাচ্চার বাবা কতো হ্যাপি। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে কতো আদর করছে।

কিডস জোন সম্পূর্ণ টা বাচ্চাদের টয়স আর কাপড় দিয়ে ভর্তি। তার চোখ গেলো সুন্দর একটা লাল গেঞ্জির উপর। ওটা কেনার লোভ সামলাতে পারলো না। আনমনে কিনে ফেলে জামাটা। শপিং শেষে খাওয়া বাইরেই সারলো। খাওয়ার সময় ওর ফ্রেন্ড ম্যাসেজে দিয়ে জানালো অস্ট্রেলিয়া টু বাংলাদেশ। ট্রান্সজিট চীনে হবে, আগামীকাল বিকেলের একটা ফ্লাইটের টিকিট পাওয়া গেছে। বাট ইকোনমি ক্লাস এর। ডাবল পেমেন্ট করতে হবে। সমুদ্র জীবনেও বিসনেজ ক্লাস ছাড়া ফ্লাই করে না। সেই সমুদ্র বাড়তি টাকা খরচ করে ইকোনমি ক্লাসে যেতে রাজী হয় কেবল দ্রুত বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে।

___________________

আয়না বসে আছে গাইনোকোলজি ডিপার্টমেন্টের চেম্বারে। ডক্টর সোনিয়া বেগমের রুমে। সমুদ্র যেই হাসপাতালে জব করেছিল, সেখানেই এসেছে সে। ম্যাডাম খুটে-খুটে আয়মার কাছ থেকে ডিটেইলসে হিস্ট্রি শুনছে। চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা লাগানো। ভদ্রমহিলার বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে। যখন শুনলো তাদের হাসপাতালের একজন ডক্টরের ওয়াইফ আয়না। তখন নাম জানতে চাইলো।

আয়না নাম বলতেই উনি দু’মিনিট ভেবে বলে উঠে, ” ওহ আচ্ছা। ডক্টর সমুদ্র। জুনিয়র ডক্টর তো চিনতে দেরি হলো। নীল চোখ ওর মনে পড়েছে।”

ডক্টরের ওয়াইফ শুনে সে আরোও কিছু প্রশ্ন করে বলে, ” কেমন ডক্টরের বউ তুমি! হ্যাঁ? পনের-বিশ ধরে অসুস্থ। আমার কাছে আগে আসো নি কেন?”

আয়নার থেকে বয়সে বড় হওয়ায় ধমকের সুরেই কথাগুলো বলে উঠে এরপর একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলে, ” যাও, এক্ষুনি টেস্ট করিয়ে,এক ঘণ্টা পর রিপোর্ট নিয়ে আমার কাছে আসবে৷”

–” কিসের টেস্ট ডক্টর?”

–” কিসের আবার? প্রেগ্ন্যাসির টেস্ট দিয়েছি।”

আয়না হতভম্ব হয়ে যায়। আসলেই সে প্রেগন্যান্ট! কিভাবে সম্ভব। তার তো কিছু অসুখ আছে। ট্রিটমেন্ট ছাড়া কিভাবে প্রেগন্যান্ট হলো সে? তবে কিছু বললো না ডক্টরকে। এগিয়ে গিয়ে কাউন্টার থেকে বিল পরিশোধ করে টেস্ট করতে যায়। তারপর ওয়েটিং রুমে বসে অপেক্ষায় থাকে। অপেক্ষা করতে করতে হুট করে শরীর খারাপ লাগে তার। একঘন্টা অপেক্ষায় থেকে সে কাহিল হয়ে পড়ে। রিপোর্ট নিয়ে ডক্টরের চেম্বারে গেলে উনি আগেই জিজ্ঞেস করলো, ” তোমার তো শরীর খারাপ। সঙ্গে কেউ আসেনি?”

–” না।”

–” সমুদ্র কোথায়?”

–” দেশে নেই।”

–” তাই বলে একা আসবে নাকি! বাসার কাউকে কল দিয়ে আসতে বলো।”

তখনই আয়নার ফোনে শায়লা চৌধুরীর কল আসে। ডক্টর সোনিয়া বেগম আয়নার অনুমতি নিয়েই শায়লাকে হসপিটালে আসতে বলে। আয়নার খুব টেনশন হচ্ছিলো না জানি রিপোর্টে কি এসেছে। সে মা হতে চলেছে? অনুভূতি আটকে রাখতে না পেরে দু’চোখ ভরে আসতে ধরে তার।

সোনিয়া ম্যাডাম কোথায় জানি গেলেন, রুগী এসেছে জন্য কেবিন ছেড়ে ওয়ার্ডে গেল। ফিরে এসে দেখে শায়লা চৌধুরী পৌঁছে গেছে। আয়নার পাশে দাঁড়িয়ে আছে৷ ডক্টর সোনিয়া বেগম নিজের কেবিনেই থাকতে বলেছিল আয়নাকে৷ রিপোর্টও দেখেনি আয়নার। এখন দেখবেন৷ ইমার্জেন্সি ছিলো জন্য যেতে হয়েছিল তখন৷

শায়লা চৌধুরীকে দেখে জিজ্ঞেস করে, ” পেশেন্ট এর কে হন আপনি? ”

শায়লা একবার আয়নার দিকে চেয়ে থেকে বলে, ” আমি আয়নার স্টেপ মাদার৷”

সোনিয়া বেগম রিপোর্ট একবার দেখেই হেসে বলে, ” কংগ্রাচুলেশনস, আয়না। ইউ আর প্রেগন্যান্ট।”

আয়নার বাক্যটা শোনামাত্র চোখে আনন্দের জল চলে এলো৷ ওর নিজের পেটে হাত বুলিয়ে দেয়৷

শায়লা ওকে জড়িয়ে ধরে বলে, ” আলহামদুলিল্লাহ খুবই খুশির সংবাদ।”

আয়না নিজেও মুহুর্তের মধ্যে সব বিষাদ ঝেড়ে ফেলে দেয়। ক্ষণেই কিছু একটা চিন্তা করে বলে, ” কিন্তু আমি তো কিছুই বুঝতে পারি নি। কীভাবে সম্ভব।”

সোনিয়া বেগম বলেন, ” প্রথমবার কনসিভ করেছো তো তাই সিমটমস গুলো বুঝো নি।”

আয়না জিজ্ঞেস করেই ফেলে, ” আমার তো সমস্যা আছে। পিসিওএস আমার।”

সোনিয়া বেগম বলেন, ” পিসিওএস হলেই যে তুমি বন্ধা এটা ভুল ধারণা। আগে ডাক্তার দেখিয়েছো? বিয়ের আগে বা পরে?”

আয়না জবাব দিলো ও বিয়ের আগে থেকেই প্রোপার ট্রিটমেন্ট নিত। কয়েক কেজি ওজনও কমিয়েছিলো।

সোনিয়া বেগম বলেন, ” তুমি লাকি যে কনসিভ করতে ঝামেলা হয় নি৷ কিন্তু অনেকেরই কনসিভ করতে সমস্যা হচ্ছে। তুমি রেস্টে থাকবে। সাবধানে থাকবে।”

উনি ঔষধ লিখে দিলেন আবার সাতদিন পর আসতে বললেন আর এরমধ্যে অসুবিধা ফিল করলে যেকোনো সময় যেন চলে আসে। এবং পইপই করে এক্সট্রা সাবধান আর কেয়ারে থাকতে বলে দিলেন৷

শায়লা চৌধুরী বের হয়েই একগাদা মিষ্টি কিনলেন। বাসায় ফিরে আয়নাকে রেস্ট নিতে বলে, উনি হাল্কা খাবার আনতে যান।

উনি যখন নুডুলস রান্না করছিলেন, আয়না রান্নাঘরে আসে। তা দেখে বলে উঠে, ” তুমি রান্নাঘরে কেন? কি খাবে বল? তোমার আব্বুকে কল দিয়ে এখুনি আসতে বলো।”

আয়না থমথমে গলায় বলে, ” একটা রিকুয়েষ্ট ছিলো।”

–” কি?”

–” আপনি এখনি সবাইকে নিউজটা দিয়েন না। এমন কি বাবাকেও না।”

শায়লা চোখ বড় করব তাকিয়ে বলে উঠে, ” কি বলছো এসব?”

আয়নার মুখের প্রতিক্রিয়া বদলে যায়, বাদনখানি জুড়ে বিষন্নতার ছায়া ফুটে উঠে। কেঁদে ফেলে বলে, ” সমুদ্র এখুনি বাচ্চা চাচ্ছিলো না৷ বাচ্চা পছন্দও করে না।ওর জন্য নিশ্চয়ই আমার বাবু এক্সিডেন্টাল ইস্যু। ওর জন্য আমরা খুশির নই বরং আগাছা।”

শায়লা বলে, ” এভাবে বলো না আয়ু। সমুদ্র তো ফ্যামিলি পার্সন। ও ঠিক খুশি হবে শুনে৷”

আয়না মাথা ঝাকিয়ে বলে, ” উহু। ওনাকে আমি চিনি। উনি মোটেও খুশি হবে না।”

শায়লা বলে উঠে, ” এতোবড় খুশির সংবাদ হাইড করবে?”

–” উনি দেশে ফিরলে সরাসরি জানাবো। ততোদিন গোপন রাখতে চাই।”

–” তুমি এবার্শনের চিন্তা মাথায় আনছো নাতো?”

আয়না নিজের পেটে হাত রেখে বললো, ” না৷ আমি এতো অসহায় মা নই। উনি বাচ্চার দায়িত্ব না নিলেও আমার কিছু যায়-আসে না। উনি বাচ্চার রেসপনসেবলিটি না নিলে, আমার বাচ্চার জন্য আমি একাই ইনাফ। আমার বাচ্চা অসহায় না৷ ওর মা ইঞ্জিনিয়ার। ওকে সিকিউর লাইফ দেওয়ার সামর্থ্য আছে আমার।”

–” আমার মনে হয় তুমি বেশি ওভার থিং করছো। রেস্ট নেও। ঠিকমতো খাও। আর হাসি-খুশি থাকো। সমুদ্র আসলে দেখবে আমরা সেলিব্রেশন করবো।”

আয়না কোমল গলায় বলে, ” বাবাকে এখুনি বলবেন না, প্লিজ।”

–” তোমার বাবা যদি জানে আমি এতোবড় খুশির সংবাদ লুকিয়েছি আমার উপর খুব রাগ করবে। তাছাড়া তোমার এক্সট্রা যত্ন দরকার। ”

–” বাবার সঙ্গে আমি কথা বলবো পরে। নিজের যত্নও নিজেই নিবো।”

রাতের বেলা ও মেডিসিন ঠিকমতো নিলো। ডাক্তার বলছিল আরোও আগে থেকেই আন্ডার কনসালট্যান্ট এ থাকা উচিত ছিলো। প্রেগ্ন্যাসি কনফার্ম হতে একটু দেরি করে ফেলেছে। সেদিন রাত আটটাতেই ঘুমিয়ে যায় ও। প্রোপার গাইডলাইন মানা শুরু করে দেয় ও।আর হেলাফেলা করা যাবে না৷

শায়লা চৌধুরী সমুদ্রকে ফোন করে জানতে পারলেন সমুদ্র আগামীকাল ফ্লাইট ধরবে আর আয়নাকে না জানাতে। ওকে নাকি সারপ্রাইজ দিবে। শায়লা চৌধুরী ভাবে দু’দিনেরই তো ব্যাপার। কিছু হবে না৷ দুই’ দিন পর সবাই তো জানবেই আয়নার প্রেগ্ন্যাসির বিষয়টি।

পরদিন যথারীতি সবাই অফিসের জন্য বের হবে। ফাহাদ সাহেব নাস্তা কর‍তে বসলেন। আয়নাও এলো। অল্প একটু খাওয়া-দাওয়া করলো। আজকে ওকে হাসি-খুশি দেখাচ্ছে। ফাহাদ সাহেব আয়নাকে ডাইনিং টেবিলে খেতে দেখে খুব খুশি হন। আলিয়ার এক্সাম চলছে। এজন্য ব্যস্ত একটু। ও বোনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। শায়লা চৌধুরী দুপুরে আসবে এটা বলে সবাই যে যার মতো অফিসে চলে গেলো।

বারোটার পর থেকে আয়নার মনে হলো ওর প্রেশার আপ-ডাউন করছে। মাথা ভার লাগছে। সে বেডে শুয়ে ফোন হাতে নেয়। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে নজর এলো সমুদ্রকে ট্যাগ করে এক ডক্টর ছবি পোস্ট দিয়েছে৷ ওদের সেমিনারের ছবি গুলো। সমুদ্রের পাশে সাদা শার্ট পরে ইউশা দাঁড়ানো। ছবিটা দেখামাত্র আয়নার যেন দুনিয়া এলোমেলো হয়ে যায়। সেমিনারে ইউশাও আছে! বাহ কি দারুণ মানিয়েছে দু’জনকে। একদম পার্ফেক্ট কাপল যেন!

ও যেন চোখে আঁধার দেখে। সমুদ্রর সঙ্গে গতকাল থেকে ফোনে কথা হয়নি। তবে কি সমুদ্র? সে ভাবতে পারেনা এর বেশি। পেটে প্রচুর চাপ অনুভব করে। ভাবে ওয়াশরুম যেতে হবে। বেড থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়াবে এমন সময় কি হলো জানে না সে, কেবল বুঝলো, খুব কষ্ট হচ্ছে তার। মুখ-চোখ উলটে আসে। চিৎকার দিয়ে উঠে। ফাঁকা বাসায় কেউ তার ডাকে সাড়া দেয় না। সে হাঁটার শক্তি পায় না। কোনো কিছু ধরার চেষ্টা করে কিন্তু আশেপাশে কোনো আসবাবপত্র বা দেয়াল না থাকায় সে পা পিছলে পরে যায়। সাদা ফ্লোর ক্ষণেই লাল রাঙ্গা হয়ে ফুটে উঠে। টকটকে লাল। লাল রক্ত দেখেই তার মুখ রক্ত শূন্য হয়ে পরে। ব্যথায় কুকরে উঠে সে। চোখ দিয়ে টপাটপ পানি গড়াতে থাকে।

আয়না সেন্স হারাতে থাকে। দূর থেকে মনে হয় কেউ খুব সুন্দর ভয়েজে বলে উঠে, ” আম্মু।”

কণ্ঠস্বরটা যার ও বুঝি জীবনে বেদনার স্বাদ পায় নি। বেদনার স্বাদ পাবে কীভাবে? মাতৃগর্ভ আর জান্নাতে কোনো দুঃখ থাকে না। দুঃখ কেবল পৃথিবীর উপাদান।

চলবে।

#ইলেকট্রিক্যাল_মন
#Arishan_Nur (ছদ্মনাম)
Part–37

আয়নার মনে হচ্ছে মাথার উপর এক হাজার’ ভরের পাথর দিয়ে কেউ তাকে আ’ঘাত দিচ্ছে৷ অসহ্য রকম ব্যথায় সে চোখ বুজে ফেলে। অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে, যদিও সে চাচ্ছে কেউ আসুক, বাঁচাক তাকে, না তাকে না, তার বাচ্চাটাকে! সৃষ্টিকর্তার কাছে আকুল মিনতি করে সে। কেউ কী নেই পৃথিবীতে যে উছিলা হয়ে এসে তার বাচ্চাটাকে বাঁচাবে? সমুদ্র কোথায় তুমি?

এমন সময় বেল বাজার আওয়াজ ভেসে আসে। সে মনে মনে অনেক প্রার্থনা করে কেউ আসুক। বেল বাজার আওয়াজ কানে বাজতেই থাকে। মনে হচ্ছে অন্ততকাল ধরে কেউ বেল বাজিয়ে যাচ্ছে। সব অস্পষ্ট লাগে। এ যেন অস্পষ্টতার জগৎ। চারিদিকে ধুধু আন্ধার দেখে সে। এমন আঁধারে তলিয়ে যেতে চায় নাহ সে!

শায়লা চৌধুরী আজ একটু আগেই দুপুরে লাঞ্চ করতে বাসায় ফেরেন। একটানা বেল বাজিয়েও যখন আয়না দরজা খুলছিলো না, ফোন লাগায় সে। ফোনও যখন রিসিভ করে না, সে ভাবলো অফিস ফিরে যাবে। এক পা পিছিয়ে লিফট কল দিল। লিফট গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে পাঁচতলায় আসতে সেকেন্ড সময় নিচ্ছে।

তৎক্ষনাৎ স্মরণ হলো তার কাছে এক্সট্রা চাবি আছে। অফিস থেকে এসেই ফিরে যেতে মন চাইলো না। সে চাবি দিয়ে দরজার লক খুলে বাসার ভেতর প্রবেশ করে। অফিসের ফাইল আর ব্যাগটা টেবিলে রেখে এক গ্লাস পানি খেয়ে ভাবে আজ পাবদা মাছের ঝোল করবে৷ পরমুহূর্তেই মনে হলো, একবার আয়নার কাছ থেকে শুনে নিক ও কি খাবে। আয়নার রুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে উনি দরজার নব ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই যেন স্তম্ভিত হয়ে যান। গা থরথর করে কাঁপতে থাকে। চোখের সামনে এমন ভয়ংকর দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিলো ওখানেই জ্ঞান হারাবেন। আয়না ফ্লোরে উপর হয়ে শুয়ে আছে। রুমের সাদা ফ্লোরে যেন লালের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। ওনার সময় লাগে সবটা বুঝছে। ব্রেইন সময় নেয় এমন প্রস্তুতি মোকাবেলার আগে! তবে উনি ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। তার চিৎকারের মাত্রা এতো বিকট ছিলো সম্পূর্ণ বিল্ডিংয়ের মানুষ বোধহয় শুনে ফেলেছে। তার পা এগিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন, আয়নার কাছে যায়। আয়নাকে তুলে উঠাতে চেষ্টা করে।

গালে হাত চাপড়িয়ে সেন্সে আনার চেষ্টা চালায়। আয়না একটু নড়ে উঠে অল্প চোখ খুলে, এরপর খুব আস্তে করে, ” আমার বাচ্চা!”

আর কিছু বলতে পারেনা মেয়েটা। চোখ বন্ধ করে ফেলে। পাশের বাসা থেকে লোকজন ও দারোয়ান এসে ভীড় জমায়। অন্যদের সহায়তায় দ্রুত আয়নাকে হসপিটালে নেওয়া হলো। শায়লা একবিন্দু সময় পায় না অন্য কাউকে কল করার। বাসার কাছে ভালো উন্নত মানের হাসপাতাল বলতে সমুদ্রের জব করা হসপিটালটাই ভালো। ক্যান্টনমেন্ট পাড় হলেই রাস্তার কাছেই পরে। সময় নষ্ট না করে গাড়িতে করে ছুটে চলে তারা। আজ রাস্তা যেন ফুরায় না। এক একটা পল যেন এক যুগের সমান। শায়লার জানা নেই সামনে কি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। আদৌ আয়না ও তার বাচ্চা সুস্থ থাকবে তো? গাড়ির সীট কভার অব্দি ভিজে উঠছে র ক্তে। ভয়ে তার গা ঠাণ্ডা হয়ে আসে।

_________________

উড়োজাহাজের ছোট্ট জানালা ভেদ করে একটুখানি রোদের লুকোচুরি খেলা চলছিলো তখন। সফেদ, ধবধবে সাদা, নরম-শুভ্র মেঘগুলো যেন আয়েশ করে ঘুরছে। ওগুলো ভেদ করে উড়োজাহাজ আরোও উপরে অবতরণ করে। জানালা বেয়ে কেবল সাদা আকাশের রাজ্য। চোখ জুড়িয়ে যায় দৃশ্য দেখলে। ফ্লাইটে সার্ভ করা স্যান্ডউইচ খেয়ে নিলো সমুদ্র। আর মাত্র একঘণ্টা বাকি পৌঁছাতে। সীটের সামনে সেট করে রাখা স্ক্রীনে লোকেশন সো করছে। রুট ওয়াইজ ম্যাপ দেওয়া আছে। ওখানেই দেখা যাচ্ছে আর মাত্র এক ঘণ্টার পথ বাকি। উফ এই প্লেন জার্নি আর ভালো লাগছে না। অনেক বেগে দৌড়ানো প্লেনের স্পীডকেও তার স্লো লাগছে! ডিস্টেন্স তো আর বদলাতে পারবে না তবে বেগ বাড়িয়ে দিক না।

জীবনে চলার পথে কখনো কারো সাথে দূরত্ব বেড়ে গেলে ইফোর্ট দেওয়ার বেগ বাড়াতে হয় তাহলে তৈরিকৃত দূরত্ব পেড়িয়ে কম সময়ে সেই ব্যক্তির মনে পৌঁছানো যায়। আয়নার সাথে তৈরিকৃত ডিস্টেন্স মিটাতে চাইলে স্পীড তো বাড়াতেই হবে।

প্লেন ল্যান্ড করার পর, সে এয়ারপোর্ট থেকে নিজের লাগেজ কালেক্ট করে সীম এক্টিভেট করে নেয়। অফিসের ড্রাইভারকে জানিয়ে রেখেছে। গাড়িতে বসেই আদেশ দিলো মিরপুরের দিকে যাওয়ার।

ড্রাইভার ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে, স্যার কী বিদেশ থেকে আইসা-ই শ্বশুরবাড়ি যাইতেছেন?”

ড্রাইভারকে আয়নার বাসার এড্রেস চিনিয়ে দেওয়া হয়েছে, জানে মিরপুর যাওয়া মানে স্যারের শ্বশুরবাড়ি৷
ও মুচকি হেসে বলে উঠে, ” হ্যাঁ।”

সমুদ্র বেলা চার’টার দিকে আয়নার বাসায় গেলো। ড্রাইভার কে লাগেজ নিজের বাসায় রেখে আসতে বলে লিফটে করে পাঁচতলা চলে যায়। একবার, দু’বার কলিং বেল বাজিয়েও যখন কেউ দরজা খুললো না সে অবাকই হলো সামান্য। পকেটে থেকে মোবাইল ফোন বের করতেই মা আর শায়লা আন্টির নাম্বার থেকে কল মিসড কল আসার নোটিফিকেশন আসে। ফোন সাইলেন্টে ছিলো জন্য রিসিভ করতে পারেনি৷ এদিকে বেল বাজিয়ে গেলেও, কেউ গেইট না খুললে, সে মাকে কল দিলো সরাসরি। আম্মু জানে সে বাংলাদেশে ফেরত আসছে।

ও’পাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে মিসেস রোদেলা কল রিসিভ করলেন যেন তার ফোন কলের অপেক্ষায় ছিলো। আম্মুর গলার স্বর শুনেই সমুদ্রের কেমন জানি খটকা লাগে৷

ও কল রিসিভ করে বলে, ” আম্মু, আমি একটু আগেই ল্যান্ড করলাম। আয়নার বাসায় এসেছি৷ কেউ গেইট খুলছে না।”

মিসেস রোদেলা বলে, ” ওরা কেউ বাসায় নেই।”

–” তুমি জানলে কীভাবে?”

–” ফাহাদ সাহেব আমার সাথেই আছেন।”

–” তোমরা কোথায় আম্মু? আমাদের বাসায়! আমি আসছি।”

মিসেস রোদেলা কাঠকাঠ গলায় বলে, ” সমুদ্র বাবা, তুই হসপিটালে আয়। যতো দ্রুত পারিস। সময় নষ্ট করিস নাহ। আয় বাবা।”

এরপরে কেঁদে দিলেন উনি। সমুদ্রের যেন মাথা ভোভো করে উঠে। হসপিটালে কেন যেতে বলছে মা? বাসার কারো কোনো কিছু হলো নাকি? বাবা? বাবা ঠিক আছে তো? সে ভাবতে পারে না। লিফটের অপেক্ষায় না থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায়। গাড়ি নিয়ে সোজা হসপিটাল পৌঁছে। লবিতে অপেক্ষা করছে মা। সে লবিতে পৌঁছে চোখ গেলো বাসার সবাই ওয়েটিংরুমে বসে আছে। শুধুমাত্র ফাহাদ সাহেব নেই।

সমুদ্র একপা, দু’পা করে এগিয়ে নিজের মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। রোদেলা ওকে টেনে বসিয়ে বলতে থাকে, ” আয়না….. ”

সমুদ্র উত্তেজিত হয়ে বলে, ” কি হয়েছে আয়নার? মা, বল? আয়না ঠিক আছে তো? মা প্লিজ বলো কিছু! ”

রোদেলা একপ্রকার কেঁদে ফেলেন, কীভাবে ওতোবড় দুঃখ সংবাদ দিবেন ছেলেকে? ও সহ্য করতে পারবে!

সে নাক টেনে গলা খাকিয়ে বলে, ” আয়নার মিসক্যারেজ হয়ে গেছে। গতকাল ওকে ইমার্জেন্সিতে নেওয়া হয়।তারপর গতকাল সন্ধ্যায় ওকে এইচডিইউ শিফট করেন ডক্টররা। তখন ও ঘুমাচ্ছিলো। জ্ঞান ছিলো না।”

সমুদ্র আর শুনতে পারে না৷ কেবল কানে বেজেই চলে, মিসক্যারেজ শব্দটা। তার আয়না প্রেগন্যান্ট ছিলো? আয়না মা হতে যাচ্ছিলো? সে বাবা হতে যাচ্ছিলো? সমুদ্রের পা আসাড় হয়ে আসে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা। সোফায় ধপ করে বসে পরে। দু’চোখে পানি আপনা-আপনি চলে আসে তার। তার বাচ্চার এই সুন্দর পৃথিবীতে আসার কথা ছিলো অথচ সে কিছুই জানতো না! তার বাবু এখন কোথায়?

শায়লা ওর কাঁধে হাত রেখে বললো, ” ট্রাস্ট মি, সমুদ্র, আয়না নিজেও দুইদিন আগেই টেস্ট করে কনফার্ম হয়েছিলো ও প্রেগন্যান্ট। আমাকে জানাতে বারং করছিল। আমি ওর কথা শুনে কাউকে জানাই নি। আই নেভার থিংক একদিনের ব্যবধানে এতোবড় ক্ষতি হয়ে যাবে।”

সমুদ্রর কাছে সবটা ঝাপসা লাগে তবে সে শায়লা চৌধুরীর উপর চরাও হয়ে বলে, ” ও বারং করেছে বলে আপনি ওর কথা শুনবেন কেন? ও বললেই এতোবড় সেনসিটিভ ইস্যু চেপে যাবেন? কেন আন্টি আগে জানালেন না?”

শায়লা এক প্রকার ক্লান্ত সুরে বলেন, ” আমি সত্যি বুঝতে পারিনি এমন পরিস্থিতি আসবে। সমুদ্র, আমি সত্যি কল্পনাও করিনি এমন কিছু হবে। আমাকে ভুল বুঝো না প্লিজ।”

সমুদ্র ভেজা চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলে। তার বাবা হওয়ার সুখের সংবাদ কানে আসার আগে কেন সেটা দুঃখ সংবাদ হয়ে গেল? কেনো বিধাতা এতোবড় শাস্তি দিলো। তার ছোট্ট ছোট্ট নরম একটা বাচ্চা হওয়ার কথা ছিলো? এতোবড় ট্রমা কীভাবে সহ্য করবে আয়না? ও এমনিতেই নাজুক। নিতে পারবে তো এই কষ্ট? নিজেকে কেমন শূন্য শূন্য লাগে তার। কী জানি খালি খালি লাগে। চোখের পানিও স্তদ্ধ যেনো!

সমুদ্র তার মাকে ঝাঁকিয়ে বলে, ” আয়না কোথায় আম্মু? এতোক্ষণে সেন্স আসার কথা। আমি ওকে এক্ষুনি দেখতে যাচ্ছি। সি নিডস মাই সাপোর্ট রাইট নাও।”

সমুদ্র উঠে দাঁড়ালো এবং যাওয়ার তাড়া করলে রোদেলা ওর হাত ধরে ফেলে বলে, ” ওর অবস্থা দেখলে তুই সহ্য করতে পারবি না। ও ভালো নেই।”

সমুদ্রর কলিজা কেঁপে উঠে। আয়নার কন্ডিশন খুব বাজে? রক্তক্ষরণ বেশি হয়েছে? তাহলে এইচডিইউ তে কেন নিলো? কেমন আছে আয়না এখন?

সমুদ্র বলে, ” কি হয়েছে ওর?”

মিসেস রোদেলা এবারে কাঁদলেন তারপর থেমে থেমে বলে, ” ও মিসক্যারেজ ট্রমাটা নিতে পারিনি। মেন্টালি ট্রমায় ছিলো আগে থেকেই। মিসক্যারেজ এর ধকল সহ্য করতে পারেনি। জ্ঞান ফেরার পর থেকে মেন্টালি সিক হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে আপাতত কাউকে চিনতে পারছে না। নিজের বাবাকেও চিনছে না। খুব এবনর্মাল বিহেভিয়ার করছে৷ ডক্টর দেখছে। ট্রিটমেন্ট শুরু করছেন। ইনভেস্টিগেশন করবেন। তোমার অপেক্ষায় ছিলাম আমরা।”

সমুদ্রর মনে যেন বিশাল বড় কোনো ঝড় আছড়ে পড়ে। সে ঠায় দাঁড়িয়ে একদণ্ড সময় নিলো সবটা মানতে, বুঝতে! এরপর মাথায় হাত রেখে আস্তে করে বলে, ” আয়না…… ”

সে এক সেকেন্ডও অপচয় না করে দৌড়ে লাগায় কেবিনের দিকে। এ হাসপাতালের সব রাস্তা চেনা তার। তবুও ঝাপসা দেখার ফলে পুরা হাসপাতাল অচেনা লাগে। দুনিয়াদারি অপরিচিত লাগে। আচ্ছা খুব আপন কেউ অসুস্থ থাকলে কী দুনিয়া থেমে যায়? তার তো মনে হয় নিশ্বাস ও থমকে গেছে। চার’শ বারো নাম্বার কেবিনে ঢুকতে গিয়ে ভুলে এগারো তে ঢুকে ফের বারো নাম্বার কেবিনে এসে সে চমকে উঠে। চোখের পানি বাঁধ মানে না।

আয়না হসপিটাল বেডে বসে আছে, সাদা পেশেন্ট গাউন পড়া। তবে খুব চিল্লা-পাল্লা করছে। একজন নার্স ওর হাত ধরে আছে, আরেকজন ঔষধ খেতে বলছে৷ কিন্তু ও খাচ্ছে না। বারবার নড়াচড়া করছে৷ হাত দিয়ে সরাচ্ছে। চেচামেচি করছে। ওর চেহারার হাল দেখেই সমুদ্রের জুড়ে হুহু কান্না ভেসে আসে। বুক যখন কাঁদে তখন চোখ রিক্ত শূন্য রয়। চোখের নিচের কালি আর শারীরিক যন্ত্রণার ছাপে ওর চেহারার লাবন্য কোথায় জানি হারিয়ে গেছে। হাতে ক্যানোলার দাগের চিহ্ন।

সমুদ্র সামনে এসে দাড়াতেই ওর অস্থির হওয়ার মাত্রা বেড়ে যায়। আরোও হাইপার হয়ে উঠে। আরোও জোরে চিৎকার করে বলে, ” ও কে? কে এইটা? ওকে যাইতে বলো এখান থেকে।”

সমুদ্র ওর এলোমেলো সুরে বলা কথা শুনে শোকে যেন পাথর হয়ে যায়। আয়না হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সমুদ্রের দিকে ঔষধ আনার বক্সটা ছুড়ে ফেলে। বক্সটা এসে সমুদ্রের গায় লাগে। আয়না এমন সিরিয়াস অবস্থাতেও জোরে জোরে নড়াচড়া করে বলে, ” ও যাইতে বলো। এক্ষুনি বের করে দেও।”

নার্স এসে বলে, ” এক্সিউজ মি, আপনি প্লিজ কেবিনের বাইরে যান। পেশেন্ট পরিচিত মানুষ দেখলে বেশি হাইপার হচ্ছে। ওনাকে বেশি উত্তেজিত করলে সব আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে পড়বে৷ আপনি যান।”

সমুদ্র আয়নার দিকে তাকালো ও এখনো চেচিয়েই যাচ্ছে৷ সমুদ্র আর সইতে পারলো নাহ!

চলবে।