এই অবেলায় তুমি পর্ব-১৮+১৯

0
552

#এই_অবেলায়_তুমি
#পর্ব_১৮
লেখিকা #Sabihatul_Sabha

আদিবার সামনে ওর মামা-মামী দাঁড়িয়ে আছে। আদিবা ভয়ে মাহির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো। মাহি চমকে নিজের হাতের দিকে তাকালো।

আদিবার মামী দৌড়ে গিয়ে আদিবা কে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলো।
~মা কেমন আছিস? মামার সাথে রাগ করে কেউ বাসা ছেড়ে চলে আসে বুঝি।মামীর কথা একবার ও মনে পরলো না। আমি তকে কোথায় কোথায় না খুঁজেছি।এই কয়টা দিন ঠিক মতো খাবার খেতে পারিনি, ঘুমাকে পারিনি তোর টেনশনে। এত অভিমান তোর।

মাহি রাগে হাতটা মুঠ করে তাকিয়ে আছে। কতটা অভিনয় করতে পারে এই মহিলা। ঠাটিয়ে দুইটা থাপ্পড় মারতে পারলে ও শান্তি পেতো। কিন্তু উনি গুরুজন তাই চাইলেই কিছু করতে পারবে না।

আদিবার অবাক হয়ে ওর মামীর কথাগুলো শুনছে।
ওর মামী আবার ফিসফিস করে বললো, ” চুপচাপ আমার সাথে বাড়ি চল।কোনো তাল বাহানা শুনবো না আমি। ”
আদিবাকে ছেড়ে দাঁড়িয়ে বললো, ” মা চল আমাদের সাথে। তুই বাড়িতে নেই বাড়িটা কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছে।”

আদিবা চোখ তুলে আবিরের আম্মুর দিকে তাকালো। উনি চুপচাপ দাড়িয়ে আছেন। আনিতা বেগম এগিয়ে আসলেন কিছু বলতে। তখনি দরজা থেকে শুনা গেলো,” আরে এতো তারা কিসের!! এই প্রথম ভাগ্নির শশুর বাড়িতে এসেছেন!! খাওয়া দাওয়া করেন। তারপর না হয় যাওয়ার কথা ভাববেন!!

——

“দেখুন ভাইয়া,আমি আপনাকে এর থেকেও বেশি সুন্দর একটা শো পিস কিনে দেবো। তাও আমাকে বেলকনি থেকে নিচে ফেলবেন না!!….

রুদ্রঃ আজব তো আমি কখন বললাম যে তোমাকে বেলকনি থেকে নিচে ফেলবো।আমি অফিস থেকে এসেছি খুব ক্লান্ত। একটা কাজ করে দিলে কিছু করবো না।
নূরঃ কি কাজ!..?
রুদ্রঃ আমার এখন পায়েস খেতে ইচ্ছে করছে। আমার জন্য পায়েস করে নিয়ে আসো। টাইম দশ মিনিট।
নূরঃ কিইই!! আমি পারবো না। আর মাত্র দশ মিনিটে কিভাবে!? আর আমি তো পায়েস রান্না করতেও পারি না।
রুদ্রঃ দেখো তুমি আমার এতো সুন্দর,গিফট এর শো পিসটা ভেঙে ফেলেছো।আবার আমাকে না বলে আমার রুমে এসেছো।এখন যদি আমার কথা না শুনো তাহলে,…
নূরঃ হি হি হি ভাইয়া আমি তো মজা করে ছিলাম। এখনি যাচ্ছি। দরজাটা খোলে দেন,…

——

সবাই দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো। আবির দাঁড়িয়ে আছে। আবিরকে দেখে আবিরের আম্মু মুচকি হাসলেন।[উনি যখন শুনলেন বাসায় আসা পুরুষ আর মহিলাটি আদিবাকে নিতে এসেছে। সাথে সাথে আবিরকে ফোন দিয়ে সব বললেন। আবির বললো ও আসছে ]
আদিবার মামী বললো,” না আজ আর বসা যাবে না। আজ খুব জরুরি একটা কাজ আছে। অন্য কোনো দিন আসলে না হয় বসবো। আপনাদের কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের মেয়েকে দেখে রাখার জন্য। চল আদিবা বলে আদিবার হাতটা শক্ত করে ধরলেন।
আদিবার মন চাচ্ছে ওর মামীকে কয়েকটা করা কথা শুনাতে। কিন্তু সে চায় না মানুষের সামনে ওর মামী অপমানিত হোক।

আবির আদিবার সামনে এসে। আসতে করে ওর মামীর হাত থেকে হাতটা ছাড়িয়ে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো।

আদিবার মামী কটমট করে আদিবার দিকে তাকালো। তারপর আবার নিজেকে নিজেই বুঝালো এখানে রেগে গেলে চলবে না। শান্ত থেকে আদিবা কে নিয়ে যেতে হবে। বাড়িতে নিয়ে এমন হাল করবে আর কোনো দিন বাসা থেকে বের হওয়ার কথাও মুখ দিয়ে বলবে না। শুধু একবার বাসায় নিয়ে যেতে পারলেই হলো।

শালেহা বেগম এসে বললেন,”আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেনো বসুন.. আর ছোটো যা গিয়ে উনাদের জন্য খাবার রেডি কর।”

~না! আমরা এখানে খেতে আসিনি। ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরিয়ে নিতে এসেছি।চল আদিবা গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো আদিবার মামা।

আবিরের আম্মুঃ কিন্তু সে তো এখন আর আপনাদের ঘরের মেয়ে নেই। আদিবা এখন আমাদের বাড়ির বউ!!..

আদিবা চমকে উঠলো “বউ”

আবিদার মামী এতক্ষন চুপ থাকলেও এবার রেগে বলে উঠলো, ” ফাজলামো করছেন আমাদের সাথে। আমাদের মেয়ে আমরা ফিরিয়ে নিতে এসেছি। আপনাদের এতো সমস্যা কিসের!!?

শায়েলা বেগমঃ আপনি হয়তো ভালো করে শুনেন নি!! মেঝো কি বলেছে? আদিবা এই বাড়ির বউ। ওকে আপনারে চাইলেই নিয়ে যেতে পারেন না!!

~ বউ মানে!!? আমাদের কে কি আপনাদের বোকা মনে হয়। যা বলবেন বিশ্বাস করে নিবো। তা জামাই কই!!?

আবিরের দিকে ইশারা করে। আবিরের আম্মু বললেন। আমার ছেলে আবির, ইন্সপেক্টর আবির চৌধুরী।

আবির গিয়ে আদিবার মামা কে জড়িয়ে ধরলেন। কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললো,” যদি নিজের ভালো চান!! বেশি কথা না বলে চলে যান। আর যদি বেশি বারাবাড়ি করেন আমি কিন্তু অতীত নাড়া দিতে দু বার ভাববো না!!

ভয়ে আদিবার মামার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরছে।

আদিবার মামী কিছু বলতে যাবে এমন সময় উনার স্বামী অনাকে বললেন,” শুনছোই তো বিয়ে হয়ে গেছে ঝামেলা করে লাভ কি।ছেলে ভালো আর কি চাই। আমার একটা দরকারি কাজ আছে। অন্য একদিন এসে আবার দেখে যাবো। বলে উনার হাত ধরে বেরিয়ে গেলেন।

উনার হঠাৎ এই আচরনে আদিবা অবাক হয়ে গেলেন। ও অর মামাকে খুব ভালো করে চিনে। ওকে না নিয়ে যাওয়ার মতো লোক না ওর মামা। তাহলে আজ হটাৎ কি হলো।
উনাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আবির একটা শয়তানি হাসি দিলো।

আদিবার মামা গেইট থেকে বের হচ্ছে আর মনে মনে ভাবছে,” ঠিক দশ বছর আগে যেটা করে ছিলো। এখন আবার সেটা করবে। রাস্তায় কাটা রাখতে নেই সরিয়ে ফেলতে হয়।”

আবির আদিবার দিকে তাকিয়ে রেগে গেলো। ওই দিন রাতে তো পটাপট ওকে অনেক কিছু বলে দিলো। আর আজকে মামা মামী কে দেখে কিছু বললো না। অন্ততপক্ষে একটা থাপ্পড় তো মারতে পারতো। মামীর গালে।

আবিরঃ আম্মু!! রাতে আব্বু আসলে সবাইকে বলে দিও। আমি কালকেই বিয়ে করতে চাই। বেশি কোনো মানুষ হবে না। পারিবারিক ভাবেই এখন বিয়ে করে রাখবো। পরে তোমার মন চাইলে অনুষ্ঠান করা হবে।

আদিবা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ওর কথার কোনো দাম নেই। ও তো বললো বিয়ে করবে না। তাও এই লোক বিয়ের কথা বলে দিলো তাও কালকেই!!!

——

পায়েস প্রায় রান্না হয়ে গেছে। সামনে মোবাইল ইউটিউব থেকে দেখে দেখে রান্না করছে।
আবির নিজের রুমে যাওয়ার সময় রান্না ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখলো নূর কি যেনো করছে। কৌতুহলের বসে রান্নাঘরে গেলো। গিয়ে দেখে নূর খুব মনযোগ দিয়ে রান্না করছে। সামনে মোবাইল ইউটিউবে ভিডিও চলছে কিভাবে পায়েস রান্না করবে।

আবিরঃ কি করতেছিস পেত্নী!!
নূরের আর বুঝতে বাকি নেই রান্না ঘরের দরজায় কে। আজকে আর নূর রেগে গেলো না। খুশি হয়ে বললো,” দেখো ভাইয়া আমি পায়েস রান্না করছি। ”

আবির অবাক হয়ে বললো,”বাব্বাহ্ তুই পায়েস রান্না করছিস। সবার আগে আমাকে দিবি কিন্তু!!

নূর খুশি হয়ে বললো, ” এই নও ভাইয়া। ”

আবির নূরের হাত থেকে মুচকি একটা হাসি দিয়ে বাটিটা নিলো।এক চামচ মুখে দিয়ে চোখ মুখ খিঁচে নূরের দিকে তাকিয়ে আছে।

নূরঃ কি হয়েছে ভাইয়া!! ভালো হয়নি?

আবিরঃ তোকে কে বলেছে পায়েস বানাতে?

নূরঃ রুদ্র ভাইয়া।

আবির এবার একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো, ” বাহ্ খুব মজা হয়েছে নূর। আজ তো রুদ্র তোর হাত শুদ্ধ খেয়ে ফেলতে চাইবে। এতো মজা করে কিভাবে রান্না করলি বইন!!?
নূরঃ ধন্যবাদ ভাইয়া.. বলে খুশিতে রুদ্রের জন্য নিয়ে উপরে গেলো।

নূরঃ রুদ্র ভাইয়া আসবো!
রুদ্রঃ হুম আসো..
নূরঃ এই নেন ভাইয়া..
রুদ্র ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো একদম ঠিক টাইমে এসেছো, বলে এক চামচ মুখে দিয়ে নূরের দিকে তাকিয়ে বললো এটা কি তুমি বানিয়েছো!!?
নূরঃ জ্বি ভাইয়া! কেমন হয়েছে?
রুদ্রঃ হুম ভালো। খুব ভালো হয়েছে। কে দেখিয়ে দিয়েছে?
নূরঃ ইউটিউব থেকে দেখে দেখে রান্না করছি ভাইয়া..
রুদ্র আর কিছু না বলে চুপচাপ খেয়ে বাটিটা নূরের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, ” কাল কেই যেনো আমি আরেকটা সুন্দর শো পিস আমার রুমে দেখি!!”…

——

মাহি রুহির রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় রুমে উঁকি দিয়ে দেখলো রুহি খুব সুন্দর করে সাজগোজ করছে। হয়তো এখন বাহিরে যাবে।মাহির মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেলো। নিজের কাজ শেষ করে শান্তির একটা হাসি দিয়ে নিজের রুমে চলে গেলো।

ঘর থেকে বের হতে গিয়ে আচমকাই সাবান পানিতে পিছলে পড়লো।রুহির মনে হলো এই বুঝি ওর কোমর একবারে গেলো। তিন তিন বার একি জায়গায় ব্যথা পেলো।রুহি ব্যথায় ছটফট করতে লাগলো।সে বুঝতে পারছে না একটু আগেও তো দরজায় পানি ছিলো না। এখন কে সাবান পানি রাখলো।উঠতে চেষ্টা করেও পারছে না। তখনি মনে হলো এটা নূরের কাজ নয়তো। ও আর আদি ঘুরতে যাবে তাই নূর আবার ওর সাথে এমন করলো। রাগা চোক মুখ লাল হয়ে উঠলো। ছাড়বে না ও নূরকে!!..

———

সন্ধ্যা থেকে বসে বসে পড়েই যাচ্ছে নূর।আজ ভয়েও রুদ্রের রুমের সামনে যায় নি। বেচারা পায়েস খেতে চেয়েছে নূর ওকে স্পেশাল পায়েস খাইয়েছে। চিনির জায়গায় লবন দিয়ে পায়েস বানিয়েছে। ও বুঝে পাচ্ছে না রুদ্র এই পায়েস কিভাবে খেলো। যেখানে ও মুখেও নিতে পারেনি!! নিশ্চয়ই সাদা হনুমানের মাথায় সমস্যা আছে না না মাথায় না!! মুখে সমস্যা আছে! না হলে এতো লবন দেওয়া পায়েস কিভাবে খেলো আর আবির ভাই ও ওকে একবার বললো না! মন খারাপ করে আবার পড়ায় মন দিলো।কিন্তু না পড়তে আর ভালো লাগছে না। বাসার সবাই আদিবা আপুর বিয়ে নিয়ে আলোচনা করছে। এদিকে ও নিজে রুমে বসে পড়ছে। বাহিরে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না। যদি রুদ্র ভাই সামনে পরে সেই ভয়ে।এরি মধ্যে মাহি আসলো নূরের রুমে।

মাহিঃ সবাই ছাঁদে তুই রুমে বসে বসে পড়তেছোস। এত পড়লে শহিদ হয়ে যাবি।

নূরঃ আপু একটু এইটা বুঝাই দাও না..
মাহি অনেক সুন্দর করে নূরকে বুঝালো তারপর বললো, এটা লিখে দেখা।

নূর অঙ্কটা করে মাহিকে দিলো। মাহি অবাক হয়ে খাতার দিকে একবার আরেক বার নূরের দিকে তাকিয়ে ঠাস ঠাস খাতা দিয়ে ওর মাথায় তবলা বাজিয়ে রেগে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

———

আদিবা এশার নামাজ পড়ে মোনাজাতে আল্লাহর কাছে বলছে,”আল্লাহ মানুষটা একদম আমার অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে দিনদিন।আমি একদম ডুবে যাচ্ছি তার মায়ায়।যতই মুখ দিয়ে বলি আপনাকে বিয়ে করবো না। কিন্তু যখন প্রথম শুনে ছিলাম আমার প্রিয় মানুষটির সাথেই আমার বিয়ের কথা চলছে।কি যে খুশি হয়ে ছিলাম। যখন মনে হলো ওরা আমাকে দয়া করছে। আমার পরিবার নেই , এই নিয়ে কখনো আবির আপসোস করবে। তখনি সিদ্ধান্ত নেই আমি ওর আপসোস এর কারন হবো না। আর আমি আমার মামা কেউ খুব ভালো করে চিনি।উনি নিজের স্বার্থের জন্য সব কিছুই করতে পারে!!। আল্লাহ আমার আর আবিরের মাঝে যেনো কেউ না আসতে পারে।তুমি তো জানো আমি ঠিক কতটা উনাকে ভালোবাসি।আদিবা কথাগুলো বলছে আর চোখ থেকে টপরপ করে পানি পরছে।

——

মাহি আর আদিবা ছাঁদে বসে আছে।
মাহি বলে উঠলো, ” আজকের রাতের আকাশটা খুব সুন্দর তাই না?
আদিবাঃ হুম.. তার চেয়ে বেশি আমার এই জান্সটার মন সুন্দর। আচ্ছা মাহি একটা কথা বলি!?

মাহিঃ একটা কেনো দশটা বল।

আদিবাঃ তুই কি রুদ্র ভাইয়াকে ভালোবাসিস!!?

চলবে…..

#এই_অবেলায়_তুমি
#পর্ব_১৯
লেখিকা #Sabihatul_Sabha

“কি রে এভাবে মন মরা হয়ে বসে আছিস কেনো…?? ”
নূর ইরিনের দিকে তাকিয়ে তারপর আবার ওর থেকে চোখ সরিয়ে ভাবলেশহীন ভাবে আগের মতোই চুল করে বসে আছে।
ইরিনঃ কি হয়েছে বলবি তো!? এভাবে চুপ করে আছিস কেনো??
নূরঃ কিছু হয়নি।
ইরিনঃ তাহলে মুখের এক্সপ্রেশন ঠিক কর। আশেপাশের সবাই কেমন করে তাকিয়ে আছে। তকে দেখে মনে হচ্ছে জামাই মরছে।
নূরঃ চুপ থাক বেয়াদব মাইয়া!! আমার জামাই মরবো কা!! আজকে আবির ভাইয়ার বিয়ে…
ইরিনঃ তাহলে তো অনেক খুশির খবর। কিন্তু তুই এমন পেঁচার মতো মুখ করে আছোস কা!!
নূরঃ হরিণের বাচ্চা তুই বোঝস না কেরে মুখ এমন করে আছি…? আজকে ভাইয়ার বিয়ে আর আমি কলেজে ক্যান্টিনে বসে আছি!!
ইরিন রেগে বলে উঠলো, ” এই একদম হরিণ বলবি না। তোরে আসতে কে বলছে কলেজে।আসছোস কেনো!!??
নূরঃ আমার সখ যে বেশি তাই আসছি। ওই সাদা হনুমান আমারে অপমান করলো সবার সামনে তাই আমি রেগে চলে আসছি৷
ইরিনঃ সাদা হনুমান এইডা আবার কেডা??

নূর কিছু না বলে চুপ করে আছে। তখনি মনে হলো পাশে কেউ বসেছে।পাশে তাকিয়ে দেখে নীল এক গাল হেসে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।
নূর দেখেও না দেখার মতো অন্য দিকে ফিরে গেলো।

“এই হরিণ!! কেমন আছো..??”

ইরিনঃ দুই ভাই বোন এই পাগল। একদম হরিণ বলবেন না বলে দিলাম!!। কাটা চামচ নীলের সামনে ধরে বললো।হরিণ বললে মুখ একদম সেলাই করে দিবো।

নীলঃ কাটা চামচ দিয়ে মুখ সেলাই করে কিভাবে হরিণ !!??

ইরিন রেগে দাড়িয়ে গেলো। [বেটা কানা (নীল সব সময় চশমা পড়ে তাই ওকে কানা ডাকে) তরে যদি এখন এই দুইতলা থেকে টুস করে নিচে ফেলে দিতে পারতাম ]”
নীল ইরিনের দিকে তাকিয়ে আছে।ইরিন নীলের তাকানো দেখে গটগট করে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে গেলো।

নীলঃ এভাবে মুখ ফুলিয়ে না রেখে চল।
নূরঃ তুই যা আমি যাবো না।
নীল অবাক হয়ে বললো,”কেনো সারাজীবন কি এখানেই থাকবি নাকি!!?”
নূরঃ নীলের বাচ্চা তোকে কখন বললাম যে সারাজীবন এখানে থাকবো। এক লাইন বেশি কেনো বুঝিস…
নীলঃ বইন আমি তো এখনো বিয়ে টাই করিনি৷ তুই আমার বাচ্চা পেইলি কই?? আর তুই বাসায় না গেলে আমি চলে যাই। বাসায় কিন্তু তোর জন্য অনেক বড় একটা সারপ্রাইজ আছে। এখন তুই না গেলে তো আর জোর করে নিয়ে যেতে পারবো না।
নূর সারপ্রাইজ এর কথা শুনে লাফিয়ে বলে উঠলো, ” আরে আমি তো এমনি বলছি চল তারাতাড়ি বাসায় যাই।[ওই সাদা হনুমান এর ওপর রাগ করে আর যাই হোক সারপ্রাইজ মিস করতে পারবো না। আর ওই বেটার কি আমার যা ইচ্ছে আমি তাই করবো]

নূর রেগে বলে উঠলো, “এটা কি বাইক চালাচ্ছিস নাকি ঠেলা গাড়ি!!”
নীলঃ কিইইই!! এতো বড় অপমান্স এটা মেনে নেওয়া যায় না!!।নূর তুই এভাবে বলতে পারিস না। আমি যথেষ্ট স্পিডে চালাচ্ছি। এর বেশি স্পিডে চালানো যাবে না।
নূরঃ ওই তুই বাইক ব্রেক কর।
নীল বাইক ব্রেক করতেই নূর বললো,” এবার নাম”

নীল নূরের কথা মতো নামলো।

নূর গিয়ে বাইকে বসে নীল কে বললো পিছনে বসতে।

বেচারা নীল ভয়ে একদম জমে গেছে।
নীলঃ বইন প্লিজ নাম। পাগলামি করিস না। আমার এতো তারাতাড়ি মরার সখ নাই। এখনো বিয়ে, বাচ্চা কোনো টাই হয় নাই!!
নূর বিরক্ত হয়ে বললো,” তুই বসবি নাকি তকে এখানে রেখে চলে যামু!..
নীলঃ তুই কি চাস বিয়ের আগেই আমার বউ বিধবা হোক,কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো।
নূরঃ ওকে! তুই থাক আমি গেলাম।
নীলঃ আরেহ্ না। বসতাছি তো।
নূরঃ সাবধানে বস।
নীলঃ আর সাবধান করে কি হইবো। আগে বলতি হরিণের কে আরেকটু জ্বালায়ে আসতাম ইসস আমি মরে গেলে ওই হরিণ কে জ্বালাবে কে??
নূরঃ ড্রামা শেষ…বলে বাইক স্টার্ট দিলো।

নীলঃ আ….আ…আ আস্তে আস্তে নূর।বাইকের স্পিড স্লো কর।

নূরঃ চুপ থাক। মেয়েদের মতো আ আ আ করবি না। এনজয় কর।

নীলঃ বেঁচে থাকলে জীবনে অনেক এনজয় করতে পারমু। স্পিড কমা বইন।
নূরঃ তুই চুপ করবি নাকি আরো স্পিড বাড়িয়ে দিমু।

নীল বুকে এক হাত দিয়ে, আরেক হাত মুখে দিয়ে রেখেছে। যদি বেঁচে ফিরে আর কোনো দিন এই ডেঞ্জারাস মাইয়াকে কোনো দিন বাইকে উঠাবে না। মবে মনে আল্লাহরে ডাকতেছে।

বাইক গিয়ে থাকলো বাসার সামনে। নূর নেমে নীলের দিকে ভালো করে তাকালো। এখনো চোখ বন্ধ করে বুকে হাত দিয়ে আছে।
নূর শব্দ করে হেসে দিলো নীলের অবস্থা দেখে।
নীল চোখ খুলে দেখলো না ও এখনো বেঁচে আছে।

তারপর রেগে নূরের দিকে তাকালো।
নীলঃ বেয়াদব মেয়ে।আর কোনো দিন আমার বাইকের দিকে চোখ তুলেও তাকাবি না।আরেকটু হলে বউয়ের মুখ দেখার আগেই উপরে চলে যেতাম। বেচারা তোর জামাইটার জন্য খুব মায়া হচ্ছে। জীবনে কতো ভালো ভদ্র মেয়ে পেতো।কিন্তু তার কপালে পরবে একটা ডাইনী পিশাচিনী।
নূরঃ আমার জামাই নিয়া তুই ভাবতে হবে না নিজের চরকায় তেল দে। তোর ভাইকে তো আর বিয়ে করছি না।
নীলঃ আমার ভাই আসলো কই থেকে!! আর ভাই থাকলেও তোর মতো ডাইনীর হাতে তুলে দিতাম না।
নূরঃ একদম ডাইনী বললে ঘার মটকিয়ে দিমু।
নীলঃ আরেকটু হলে তো জান টাই নিয়ে নিতি।
নূরঃ এখন আফসোস হচ্ছে কেনো নেইনি।
নীল নূরের দিকে তাকিয়ে রেগে বাসার ভেতর চলে গেলো।

———

আদিবা কে খুব সুন্দর করে শাড়ি, চুরি,আর আবিরের আম্মুর সব গহনা দিয়ে সাজিয়ে রেডি করালো মাহি,মিম,শুভ্রতা ভাবি আর রিয়া।(রিয়া হলো ওর মেঝো আম্মুর বোনের ছোট মেয়ে।আবিরের বিয়ে তাই ওরা সবাই এসেছে)
নূর মুখ ভার করে রুমে ঢুকলো।ওকে ছাড়াই সবাই রেডি হয়ে গেলো।
মন খারাপ করে গিয়ে ঠাস করে রিয়ার মাঠায় তবলা বাজিয়ে ওর পাশে বসে পড়লো।
রিয়া রেগে বলে উঠলো, ” নূরির বাচ্চা আসতে না আসতেই তোর শুরু।”
নূর ভালো করে রিয়ার দিকে তাকালো। শাড়ি পড়েছে লম্বায় ৫,৩ ফর্সা শরীরে নীল শাড়ি খুব সুন্দর মানিয়েছে।তারপর সবার দিকে তাকিয়ে হা হয়ে গেলো। সবাই নীল শাড়ি পড়েছে কিন্তু এই শাড়ি আনলো কোন সময়? ওকে ছাড়া মার্কেট ও করে চলে আসছে। মুখ ফুলিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে আছে। সব হয়েছে ওই বেয়াদব সাদা হনুমানের জন্য।

শুভ্রতা নূরের সামনে এসে বললো,” কি হয়েছে ছোটো ননদী মন খারাপ কেনো? ”
নূর অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিলো।
শুভ্রতা নূরের হাত ধরে রুম থেকে বেরিয়ে নূরের রুমে আসলো৷ নূরকে খাটে বসিয়ে আবার রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
কিছুক্ষন পর হাতে একটা নীল শাড়ি নিয়ে আসলো। পিছু পিছু মাহি ও আসলো মেকআপ এর সব জিনিস নিয়ে।
তারপর সুন্দর করে শাড়ি পড়িয়ে সাজিয়ে দিলো।

মাহিঃ বাহ্ নূর তোকে তো একদম ছোটো মনে হয় না। খুব সুন্দর লাগছে চল কয়েকটা সেলফি তুলি। ফেসবুকে পোস্ট করমু।তখনি হৈচৈ করে সবাই এসে নূরের রুমে ঢুকলো।
রিয়াঃ নূর রে আমার যদি ভাই থাকতো তোরে ঠিক ভাবি বানিয়ে নিতাম। কতো সুন্দর লাগতাছে। তোর থেকে একটু হাইট আমাকে দিয়ে দে না!!
রিয়ার কথা শুনে সবাই শব্দ করে হেঁসে উঠলো।

নূর নিজের রুমে বসে আছে। সবাই আদিবার কাছে চলে গেছে। নূরও যাবে এমন সময় দরজায় ঠকঠক আওয়াজ শুনে তাকালো।
নূরঃ দরজা খোলাই আছে।
রুদ্র দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো।, ” ভেতরে আসবো”?
নূরঃ জ্বি ভাইয়া আসেন…[এই বেটার আবার আমার রুমে কি কাজ। নাকি কালকে পায়েস এ চিনির বদলে লবন দিয়ে পায়েস খাইয়ে ছিলাম তাই এসেছে]

রুদ্র সকালের ব্যাবহারের জন্য সরি বলতে এসেছিলো।কিন্তু নূরের দিকে তাকিয়ে মেজাজ গেলো খারাপ হয়ে।শাড়ি পড়েছে কিন্তু আঁচল সরে গেছে। রুদ্র রেগে বলে উঠলো,”শাড়ি পড়তে কে বলেছে..?

হঠাৎ রুদ্রের এভাবে রেগে যাওয়াই নূর বোকে বনে গেলো। ও তো রেগে যাওয়ার মতো কিছু করেনি।

নূরঃ কেনো?? বাসার সব মেয়েরাই তো শাড়ি পড়েছে।
রুদ্রঃ সবাই শাড়ি সামলাতে পারে। তাই পড়েছে।তারাতারি শাড়ি পাল্টে অন্য ড্রেস পরো।
নূরের মন চাচ্ছে রুদ্রের মাতা ফাটিয়ে দিতে।কেনো রে তোর সমস্যা কি আমি শাড়ি পড়লে।খুলবো না আমি তুই কি করবি।এখন কি কাপড় পড়তে গেলেও তোরে জিজ্ঞেস করে পড়তে হব!!।কিন্তু না এই একটা কথাও ওর মুখ দিয়ে বের হলো না।মনের কথাগুলো মনেই রেখে বলে উঠলো, ” কেনো ভাইয়া!! শাড়িতে সমস্যা কি…?
রুদ্রঃ এই, বেয়াদব মেয়ে তুমি কি আমার কথা শুনবে।নাকি অন্যকিছু করবো!!পাঁচ মিনিটে তুমি শাড়ি চেঞ্জ করে গাউন পড়ে রুম থেকে বের হবে।
নূরঃ একদম না। ভাবি সখ করে শাড়িটা পড়িয়ে দিয়েছে।আর সবাই বলেছে শাড়িতে আমাকে খুব সুন্দর লাগছে। তাহলে শুধু শুধু আপনার কথায় আমি কেনো এটা খুলতে যাবো।
রুদ্র রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, ” শাড়ির আঁচল ঠিক করো। আর একবার যদি চেঞ্জ করবো না শুনি। এক থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিবো!!”

নূর তারাতারি নিজের আঁচলের দিকে তাকালো।শাড়ির আঁচল সামনে থেকে অনেকটা সরে গেছে। ইসস কি লজ্জা!! কি লজ্জা। লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বললাম,” ঠিক আছে ভাইয়া আমি চেঞ্জ করে নিবো..”

———

বিয়ে পড়ানো অনেক আগেই শেষ। সব চেয়ে মজার বেপার হলো আবির ভাইয়ার বিয়েতে ফায়াজ স্যার ও এসেছেন। ভাইয়া কল দিয়ে এনেছে। আসার পর থেকেই নূর চোখে চোখে রাখছে। স্যার হয়তো সেটা বুঝে গেছেন। তাই নূরকে পাহাড়া দিয়ে দুই বার মাহির কাছে কথা বলতে গিয়ে ছিলো। কিন্তু বেচারার কপাল ভালো না দুইবার নূর গিয়ে মাহির পাশে দাড়িয়ে গেলো।

সেই বিকেলে এসেছে এখন রাত নয়টা বাজে। এখনো মাহির সাথে কথা বলতে পারেনি। তবে কথা বলার কম চেষ্টা করেনি।হয়তো মনে মনে নূরকে শ’খানেক বকা দেওয়া ও শেষ ফায়াজের। নূর ফায়াজের অবস্থা দেখে মনে মনে খুবি আনন্দ পাচ্ছে। আহা্ প্রিয় মানুষের আশেপাশে থেকে তার সাথে কথা না বলতে পারা এটা যে এক অসহ যন্ত্রণা।

সবাই খাওয়া দাওয়া শেষ করে ছাঁদে আড্ডা দিচ্ছে।

কি আজব বিয়ে!! বিয়ের দিন বউ থাকবে লম্বা এক ঘোমটা দিয়ে খাটের মাঝখানে। স্বামী ঘরে প্রবেশ করলে ভয়ে বুক কেঁপে উঠবে, ধুকপুক করা শুরু হবে, অজানা ভয়ে শিউরে উঠবে।কিন্তু এখনে তো বউ আর জামাই সব ছাঁদে। অবশ্য ওদের কি দোষ। ওদের কে জোর করে ছাঁদে এনে বসিয়ে রেখেছে।

আবির আর আদিবা পাশা পাশি বসে আছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে আবির আর ওর দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে আদিবা।

ফায়াজ বার বার চেষ্টা করছে মাহির সাথে একটু কথা বলতে কিন্তু মাহির নজর রুদ্রের মাঝে আবদ্ধ।

রুহি খুব রেগে আছে নূরের উপর। আজ ওর কারনে সে শাড়ি পরে একটুও মজা করতে পারেনি। কোমরের জন্য ভালো করে হাঁটতেও পারছে না। খুব বেশি ব্যথা পেয়েছে কাল কে।আদি বিরক্ত হয়ে অন্য দিকে ফিরে একটা সিগারেট ধরালো। এখন এই সিগারেটের ধোঁয়া তার নিত্য দিনের সঙ্গি।

আবির বলে উঠলো, ” নূর একটা গান হয়ে যাক..”

নীল এনে নূরের হাতে গিটার দিয়ে বললো,” শুরু করেন আফা”
নীলের কথা শুনে নূরে হেসে গিটার নিলো,

“🎶কথা হবে দেখা হবে,প্রেমে প্রেমে মেলা হবে
কাছে আসা আসি আর হবে না।
চোখে চোখে কথা হবে,ঠোঁটে ঠোঁটে নাড়া দেবে
ভালোবাসা-বাসি আর হবে না।

শত রাত জাগা হবে, থালে ভাত জমা রবে
খাওয়া দাওয়া কিছু মজা হবে না।
হুট করে ফিরে এসে,লুট করে নিয়ে যাবে
এই মন ভেঙে যাবে জানো না।

আমার এই বাজে স্বভাব,কোনোদিন জাবে না
আমার এই বাজে স্বভাব,কোনোদিন যাবে না।

গান গাওয়ার মাঝেই সবার দিকে তাকালো। আদিবা মুগ্ধ হয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। ফায়াজ চোখ আবদ্ধ মাহির দিকে। মাহি আর চোখে বার বার রুদ্রের দিকে তাকাচ্ছে। রুহি মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। আদি সিগারেট খাচ্ছে আর ধোঁয়া আকাশের দিকে ছাড়ছে।নীল মোবাইল রেখে নূরের দিকে তাকালো। নূর মুচকি হেসে আবার গাওয়া শুরু করলো,

ভুলভাল ভালোবাসি
কান্নায় কাছে আসি
ঘৃনা হয়ে চলে যাই থাকি না
কথা বলি একা একা,
সেধে এসে খেয়ে ছ্যাঁকা
কেনো গাল দাও আবার বুঝি না….

চলবে…..

ভুলত্রুটি মার্জনীয়।