#এক্স_ওয়াই_জেড
তৃতীয় অংশ
সকালে আম্মু টাইনা উঠাইল।
-এই নিতু ওঠ ওঠ! শাফকাতের মা ফোন দিছে। বলল ওর নাকি তোরে অনেক পছন্দ হইছে। আলহামদুলিল্লাহ আমি তো নামাজ পইড়া ফেলছি দুই রাকাত৷ কী ভালো ছেলেটারে পাইছোছ তুই৷ এখন ভালোয় ভালোয় বিয়াটা হইলে হয়। আল্লাহ দেইখো।
আমি ব্যাক্কলের মতো তাকায় আছি। বলে কী! ওই বেদ্দপটা সত্যি বাসায় বলছে আমারে তার পছন্দ। একশোটা এক্সওয়ালা লোকের সাথে আমি সংসার করব? এ আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারব না!
শেষ লাইনটা জোরে বইলা ফেলছি। আম্মু অবাক হইয়া বলল, কী মানতে পারবি না?
– না কিছু না।
-তুইও দুই রাকাত নামাজ পইড়া ফেল। সব জানি ঠিক থাকে৷ এত ভালো পাত্র তোর মতো গাধির কপালে জুটছে এইটা আল্লাহর অশেষ রহমত।
– হ তা আর বলতে। এত ভালোর লোড নিতে পারলে হয়।
– তুই এসব ফালতু কথা কোত্থেকা শিখছোছ? কত বলছি ওই অরুনা মাইয়াটার সাথে মিশবি না। ও এসব কথা শিখাইছে না?
– আমি কি বাচ্চা যে আমারে শিখাবে?
– ওঠ এখন। আজকে থেকা সব কাজ করবি। কিছু শিখা না গেলে শ্বশুরবাড়ি থেকা দুইদিন পর ফেরত দিয়া যাইব।
-আমি সব পারি।
-আন্ডা পারোছ। তোর আব্বু মুরগি আনছে। তুই কাটবি আজকে।
– এহ আমি মুরগি কাটতে পারি না।
– তুই না মাত্র কইলি তুই সব পারোছ?
– ধুরো!
দিনটাই খারাপ।
দুপুরবেলা শুইয়া আছি তখন ফোন দিছে,
– কখন দেখা করবা? চারটায় আসো?
-কই আসবো?
– কালকে যেখানে দেখা করেছি।
– আচ্ছা।
– ঠিক চারটায় কিন্তু। আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে যাব আগে আগে।
-ওকে।
আমি উইঠা রেডি হইলাম৷ একটু সাজলামও। কী মনে কইরা ঠোঁটে ভালোমতো ওইদিনের লিপস্টিক ঘষলাম। অথচ করার কথা ছিল উল্টাটা। ‘হিউম্যান সাইকোলজি বড়ই অদ্ভূত।’ কে জানি বলতো কথাটা! মনেও নাই!
আমিও কম খারাপ না। সারাটা জীবন বেহুদা মানুষগুলার লাইগা সময় নষ্ট করছি। যতই বলি আমার কোনো এক্স নাই, আসলে কি নাই? একটা তো ছিল৷ যদিও তার কথা আমি স্বীকার করি না নিজের কাছেও। কাকপক্ষীও জানে না সেই কথা। বেস্ট ফ্রেন্ডরাও না। অবশ্য জানবে কেমনে, রিলেশন তো ছিল ফেসবুকে। ফেসবুকেই শেষ হইছে। কোনোদিন দেখাসাক্ষাৎ হয় নাই। এমনকি পোলারে আমি নিজেও দেখি নাই।
জোচ্চোরটার নাম ছিল রাজ। আসল নাম কী আল্লাহ জানে। আমারে কত মিষ্টি মিষ্টি কথা কইয়া পটাইছিল! কত স্টাইল কইরা ছবি ছাড়ত! আমারে বলত আমি নাকি কাজলের মতো দেখতে। আর সে শাহরুখ খান৷ হু আমি নিব্বি ছিলাম স্বীকার করতে লজ্জা নাই।
চার মাস তারে জানপ্রাণ দিয়া ভালোও বাসছিলাম৷ তার ছবি রাখছিলাম ওয়ালপেপারে। একদিন পাশের বাসার এক আপু দেইখা ফেলল। আমি তো ভয়ে শেষ৷ কিন্তু সে বিরাট হাসি দিয়া কইল, এই মডেলটারে আমার অনেক পছন্দ।
আমি তো ভ্যাবাচ্যাকা।
-মডেল মানে?
-এইযে ওয়ালপেপার দিয়ে রাখছ যে ওর কথা বলতেছি। রণদীপ ভাট। ওর একটা মিউজিক ভিডিও আছে না, ‘সুনো না তুম’ গানে? আমার তো হেব্বি পছন্দ।
সেদিন আপু চইলা যাওয়ার পর গুগলে সার্চ দিয়া জানতে পারছিলাম এতদিন যেই চেহারার লগে প্রেম করছি সে ইন্ডিয়ান মডেল। ইচ্ছামতো গালি দিছিলাম তখন। তারপর ব্লক।
কিন্তু আজকের দিনে ওইটার কথা মনে পড়ল কেন? ছাতা! আজকের দিনটা কুফার কুফা।
তখনও জানতাম না কুফা তো মাত্র শুরু…
রওনা দেয়ার সময় আম্মু জিজ্ঞেস করল, কই যাস? এখন এত ঘুরাঘুরি বন্ধ।
– আম্মু ইলার সাথে দেখা করতে যাই।
-ওহ। আচ্ছা যা।
ইলা হইল আমার স্কুলজীবনের বেস্ট ফ্রেন্ড। অতিমাত্রায় ভদ্র আর ভালো স্টুডেন্ট। এখন পড়ে মেডিকেলে। ওর সাথে মিশলে আম্মু খুব খুশি। কতবার ইলার নাম ভাঙাইয়া ঘুরতে গেছি হিসাবও নাই।
যাইতে যাইতে বাজল চারটা পনেরো। গিয়া দেখি সে বসে আছে। টাইমিং এর দিক দিয়া সে পারফেক্ট! ফরমাল ড্রেস। সাদা শার্ট, নেভি ব্লু টাই, ক্লিন শেইভ, চোখে একটা চশমাও লাগাইছে। ভাইরে ভাই, আমি নিজের হার্টরে বুঝাইলাম কন্ট্রোলে থাকতে। কখন জানি গইলা যায় এই আগ্নেয়গিরির কাছাকাছি থাকলে।
ফোনে যতই পার্ট দেখাই না কেন, সামনাসামনি আমি ভোম্বল দাস হইয়া যাই। এত উল্টাপাল্টা করি যে কিছু বলার থাকে না৷ সে দেখি ওদিনের টেবিলেই বসছে। আমি গিয়া মুচকি হাসি দিয়া বসতে নিলাম। তারপরেই জীবনের সবচেয়ে দুর্বিষহ কান্ডটা ঘটল! কেমনে জানি চেয়ারটা সইরা গেল, আর আমি চিৎপটাং!
ব্যথার চেয়ে অনেক বেশি পাইলাম লজ্জা। চোখ বন্ধ কইরাও জানি পুরা রেস্টুরেন্টের মানুষ আমার দিকে তাকায় আছে। কয়েকজনের হাসির শব্দও পাইছি। ছি.!
সে তাড়াতাড়ি আইসা আমারে টাইনা তুলল। বলল, ব্যথা পেয়েছ নিতু?
– না।
– জানি পেয়েছ। এসো এদিকে এসো। হাঁটতে পারবে?
– কোথায় যাব?
– সোফাগুলোতে গিয়ে বসি। মাত্র একটা খালি হলো। শক্ত চেয়ারে বসা লাগবে না। ব্যথা করবে।
রেস্টুরেন্টে আবার এক সাইডে কতগুলা ছোট ছোট কেবিনের মতো, পর্দা দেয়া। যদিও বাইরে থেকা সব দেখা যায় তাও এই লোকের সাথে যাইতে মন চাইতেছিল না। সে জোর কইরা টাইনা নিল।
গিয়া বসলাম। বসার সাথে সাথেই বুঝলাম ব্যথা ভালোই পাইছি। কাঠের চেয়ারে বসতে পারতাম না। কিন্তু এই ব্যাডা কেমনে জানল যে জায়গামতোই ব্যথাটা পাইছি!
সে আর আজকে আমারে কিছু জিজ্ঞেস করল না। নিজেই দুই গ্লাস লাচ্ছি আর পিজ্জার অর্ডার দিল।
বলল, তুমি ঠিক আছ?
– হুম।
– জানো, কালকে তোমার সাথে দেখা হওয়ার পর দুটো গুড নিউজ পেয়েছি। তুমি আমার জন্য লাকি!
-তাই নাকি? কী গুড নিউজ?
-একটা হলো আজকে আমার প্রমোশন হয়েছে।
– অভিনন্দন।
-থ্যাংক ইউ সো মাচ! তোমাকে স্পেশাল ট্রিট দিব একদিন। তুমি মিষ্টি পছন্দ করো?
– না।
– ওহ আমি আবার রসমালাই অনেক পছন্দ করি৷ এখান থেকে বের হয়ে পরের ব্লকে একটা দোকানে যা মজার রসমালাই বিক্রি করে! তোমার পছন্দ হলে যেতাম সেখানে।
– ওইটা দেখা যাবে। আরেকটা গুড নিউজ কী?
তার ফোনে দেখলাম একটা ফোন আসছে। Madhobilota দিয়া সেইভ করা৷ এইটা আবার কয় নাম্বার এক্স? নাকি প্রেজেন্ট?
সে ফোন ধরার আগে বলল, এইটা হলো দুই নাম্বার গুড নিউজ।
মানে কী! আমি সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকায় রইলাম তার দিকে।
ফোন ধইরা কী সব প্যাচাল পাইরা বলল, এটা হলো আমার সেই ছয় বছরের এক্স। কালকে ফোন দিয়ে হঠাৎ মাফ চাইল। বলল আমার সাথে নাকি অনেক অন্যায় করেছে। এখন আবার ফিরতে চায় আমার কাছে।
আমি একটা চিৎকার দিতে যাইয়া কোনোমতে নিজেরে আটকাইলাম।
-ফিরতে চায় মানে? ওর না বিয়ে হইছে?
– হুম। কিন্তু ওর হাজবেন্ডের নাকি এক্সট্রা ম্যারেটাল অ্যাফেয়ার আছে। তাই ও ও সেটাই করতে চায়।
– মানে পরকীয়া?
– হ্যাঁ।
– নাউজুবিল্লাহ। আপনি করবেন?
– আরে না। আমি বলেছি আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ওর চেয়ে অনেক ভালো মেয়ের সাথে। ওকে ছবিও পাঠাব বলেছি ।ক্যান আই টেক আ সেলফি উইথ ইউ?
বলতে বলতে মোবাইল উঁচা কইরা টুস কইরা সেলফি তুইলা ফেলল। আমারে নিশ্চিত বান্দরের মতো দেখা যাইতেছে, যেই এক্সপ্রেশন দিয়া ছিলাম তখন। কিন্তু কিছু কইতে পারলাম না।
লাচ্ছি দিয়া গেল৷ খাইয়া মন প্রাণ জুড়ায় গেল৷ আহ ঠান্ডা!
– শোনো বলেছিলাম একটু কথা বাকি আছে? এবার তোমাকে জেডের কাহিনী শোনাব।
– জেডটা কী জিনিস?
– আরে একটা এক্স, আরেকটা ওয়াই তো অন্য একটা তো জেডই হবে না? তোমার থিওরি ছিল…
– ও হু তাই তো! কিন্তু আমি শুনতে চাই না। একটুও না।
-একটু শোনো। আমার ফেসবুকের গার্লফ্রেন্ড যে ছিল, নিতু নাম, তার কথা বলব।
– আমি সত্যি শুনতে চাই না।
সে ভেঙচি দিয়া বলল, না চাইলে নাই। খাও পিজ্জা খাও।
আমি খাইয়া বাসায় চইলা আসলাম। তেমন কথা হয় নাই আর। ব্যথায় আর কোনো হুশ নাই আমার।
রাত দশটার দিকে আম্মু চিল্লাইতে চিল্লাইতে দৌড়ায় আসছে।
– ওই তুই কই গেছিলি আজকে?
– কেন আম্মু?
– এই দ্যাখ।
আব্বুর মোবাইল নিয়া আসছে সে। দেখি ফেসবুকে জ্বলজ্বল করতেছে আজকের আমাদের সেই সেলফি! আমার মনেই ছিল না আব্বু যে খুঁইজা খুঁইজা ওই ফাজিলটার সাথে অ্যাড হইছে৷ তারচেয়ে বড় কথা এই ছবি ফেসবুকে দিবে কেন! জঘন্য লোক!
আম্মু চিল্লাইতেই আছে, তুই যাবি তো আমারে বইলা গেলে কী হইত? এখনই এত! মিথ্যা কথা কইয়া দেখা করা লাগব? বিয়ার আগেই এত পরিতি ভালো না। এখন দুনিয়ার মানুষ জাইনা যাইব৷ বিয়াতে ভাঙতি দেয়ার মানুষের অভাব আছে! এই পোলাপানের আক্কেল হইল না? এক্ষন ওরে ফোন দিয়া কবি ছবি ডিলেট করতে। এক্ষনই।
– আচ্ছা।
মহারাজ ফোন ধরল না একবারে। পাঁচবার দেয়ার পর ধইরা বলল, এই নিতু! তুমি দেখি আমার জন্য পাগল হয়ে গেছ! এতবার ফোন! অ্যাম সো হ্যাপি! ফাইনালি তুমি আমাকে ফিল করতে পারছ।
– মিথ্যাবাদী! এক্সরে দেখাইবেন বইলা ছবি তুইলা ফেসবুকে দিছেন কেন?
ওপাশ থেকে পিন ড্রপ সাইলেন্স৷ আমার মন চাইল ওইটারে তুইলা আছাড় দিতে। শালা তোর সেলফির গুষ্টি কিলাই! হাতি! হনুমান! উল্লুক!
ত
সুমাইয়া আমান নিতু