এক পশলা প্রেম পর্ব-০১

0
311

#এক_পশলা_প্রেম
#পর্ব_১
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

❝ প্রিয় আয়ান স্যার,
ভালোবাসিইইইই! আপনাকে বহুত ভালোবাসি! কেনো ফাসিইইইই? আপনার প্রেমে বারবার ফাসি! এখানে একটা হতাশামূলক ইমোজি ইমাজিন করে নিবেন। আপনি জানেন, যখন ক্লাসের বদ মেয়েগুলো আপনাকে চোখ দিয়ে গিলে খায় তখন আমার কত্তো কষ্ট হয়? না কীভাবে জানবেন? আপনি তো কিছুই জানেন না, বোঝেন না। একেবারে অবুঝ শিশু! রাগ হচ্ছে? আহ রাগ করে না। অনেক আবেগ মিশিয়ে চিঠি খানা লিখলাম। তবে আফসোস হাতে লিখে দিলাম না, কম্পিউটারে কম্পোজ করেই দিতে হলো। কেনো বলুন তো? পারলে মাথা খাটিয়ে বের করবেন। ওক্কে স্যার?
ইতি
আপনার একান্ত বাধ্যগত ছাত্রী ❞

চিঠি খানা পড়া শেষে চুপ করলো আয়ান চৌধুরী। ক্লাসরুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। ভার্সিটির চুপচাপ, গম্ভীর স্বভাবের আয়ান স্যার আজ ক্ষেপে গেছে। তার চোখেমুখে লেপ্টে আছে একরাশ বিরক্তি আর ক্রোধ। সুদর্শন যুবক আয়ান চৌধুরীর বয়স ত্রিশ ছুঁইছুঁই প্রায়। দেখতে বেশ আকর্ষণীয় ক্লাসিক ট্যাপার স্টাইলে চুলগুলো কাটা আয়ানের, পরনে সাদা ফর্মাল শার্ট, প্যান্ট। পায়ে ফরমাল ব্লাক জুতো। সবমিলিয়ে মেয়েদের মনে ভালোলাগা সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট হ্যান্ডসাম।

আয়ান চৌধুরী হাতের কাগজটা টেবিলে রেখে সবার দিকে তাকিয়ে ফের বলতে লাগলো,
” ভালো করে বলছি, চিঠিটা কে দিয়েছ বলে দাও। ডেয়ার ছিলো নিশ্চিত! কিন্তু এতো বড়ো দুঃসাহস কার সেটাই দেখতে চাচ্ছি আমি। হয় নিজের ইচ্ছেতে ধরা দিবে নয়তো আমি খুঁজে বের করবো। বাট খুঁজে আমি পাবোই! ”

স্যারের কথায় বেশ ভড়কে গেছে সবাই। কিন্তু আরো একবার সবাই জানিয়েছে, কেউ এই কাজ করেনি। কিন্তু চিঠি তো এই ক্লাস থেকেই পেয়েছে আয়ান! অন্য ক্লাসের স্টুডেন্ট হলে এই ক্লাসে চিঠি কেনো রেখে যাবে? ঈশিতা রঞ্জিতকে ইশারা করলো। রঞ্জিত ভ্রু নাচিয়ে বোঝাতে চাইলো, ” কী হয়েছে? ”
ঈশিতা ফিসফিস করে বললো,
“ কোন শালী আমাদের ঝামেলায় ফেললো রে রঞ্জিত? আমাদের ক্লাসের কার এমন সাহস যে স্যারকে চিঠি দিবে? ”
রঞ্জিত ফোঁস করে ওঠে। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে,
” এসব আলোচনা স্যার যাওয়ার পরেও তো করতে পারবি ঈশু! এখন আমাদের এরকম ফিসফিস করতে দেখলে নির্ঘাত সন্দেহ করবে। একদম চুপ করে থাক। ”

রঞ্জিতের কথা ফেলে দেওয়ার মতো না। ঈশিতা চুপ করে গেলো। আয়ান সবার দিকে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো একবার। কাজটা যেই করেছে ভীষণ ধুরন্ধর। নয়তো হাতের লেখা বুঝে ফেলতে পারে ভেবে কেউ কম্পিউটারে কম্পোজ করে দেয়? সানজিদা ভয়ে ভয়ে বলে,
” স্যার আমরা আবারও বলছি, আমাদের ক্লাসের কেউ করেনি। হয়তো অনার্সের কোনো স্টুডেন্ট করেছে আমাদের বকা খাওয়াবে বলে। ”

সানজিদার কথার সাথে আরো কয়েকজন ছাত্রছাত্রী এক কথা বললো। মৃদু ধমকে উঠলো আয়ান।
” তোমাদের বকা খাইয়ে তাদের লাভ কী? তোমরা ওদের থেকে ছোটো, আগামী বছর এইচএসসি দিবে! তোমাদেরকে বকা খাওয়াতে কেউ এমন কেন করবে? অদ্ভুত লজিক তোমাদের। ”

আয়ানের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে ক্লাসের জন্য নির্দিষ্ট সময়ও শেষ হয়ে গেলো। আয়ান একমিনিটও না দাঁড়িয়ে হনহনিয়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে যেতেই সব হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।

ভার্সিটির ক্যাম্পাসে বসে আড্ডা দিচ্ছে অনিমা, প্রিয়ন্তি, অর্ষা, আলিফ ও প্রণয়। ক্লাসের থেকে আড্ডা দেওয়াই ওদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনিমা শেখ, অনার্স তৃতীয় বর্ষে ইংরেজি সাবজেক্ট নিয়ে পড়ালেখা করছে। প্রিয়ন্তি আর অর্ষা আছে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে আর আলিফ আর প্রণয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়ছে।

” মামা আমার কিন্তু ভয় লাগছে। ধরা পড়লে তোর সাথে আমরাও কেস খাবো। ”

প্রণয় কাচুমাচু ভঙ্গিতে বললো অনিমাকে। খোলা চুলগুলো হাত দিয়ে খোঁপা করার ভঙ্গিতে উপরের দিকে তুলে ক্লিপ লাগিয়ে নিলো অনিমা। হাই তুলে বললো,

” কেস খেলে খাবি একটু। দ্যাখ, স্যার যে একটা আস্ত বুড়ো খাটাশ সেটা তো তোরাও জানিস! একটা প্রেমপত্রই না হয় দিয়েছি রে বাবা তাতে অমন করতে হবে? ”

” ঠিকই বলেছিস অনিমা। এমন ভাব করছেন উনি যেনো প্রেমপত্র না পারমাণবিক বোমা পাঠিয়েছিস হুহ্। ”

অর্ষা ফোনের স্ক্রিনের দিকেই তাকিয়ে বললো। প্রিয়ন্তি আস্তে করে পিঠে একটা চড় মারলো অর্ষাকে। আলিফ বলে,
” শোন আফারা তোদের এসব প্রেমপত্রের চক্করে আমার ব্রেকআপ হোক সেটা আমি চাচ্ছি না। তানিয়া ওয়েট করছে আমার জন্য, আসছি আমি। ”

আলিফ বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। সবাই হৈহৈ করে উঠেছে ওর কথায়। অনিমা চোখ টিপ্পনী কাটে আলিফকে।
” আরে ভাই তোর মতো একটা পাগলা প্রেমিক থাকলে লাইফ ইজ ঝাকানাকা। ”

” হ আর তোর মতো একটা প্রেমিকা যে পাবে সে এমনি পাগল হয়ে যাবে। গেলাম আমিইই….”

আলিফ আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো। অনিমা ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ফোঁস ফোঁস করছে। এভাবে অপমান করে গেলো? তাতে কী! আসতে তো হবেই আবার। তখন এটার মজা বোঝাবে আলিফ লায়লাকে হুহ্। মনে মনে এটা ভেবে নিজেকে সামলে নিলো অনিমা। প্রিয়ন্তিও বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

” আমিও যাবো রে। তোরা থাক৷ ”
“আমরাও বসে থেকে কী আর করবো! চল সবাই বাসায় যাই। ”
প্রণয়ের কথায় সবাই যে যার বাড়ির পথে এগোয়।

টিচার্স রুমে বসে আছে আয়ান, পাশে অন্যান্য টিচার্সরা। শ্রেয়ান আয়ানের কলিগ, একসাথে কলেজ লাইফ থেকে লেখাপড়াও করেছে। আয়ানের অবস্থা দেখে মিটিমিটি হাসছে শ্রেয়ান। আয়ান কিছুতেই বিষয়টা হজম করতে পারছে না। কোন মেয়ে এমন অদ্ভুত চিঠি দিলো ভেবে তার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। শ্রেয়ান আয়ানের দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বললো,

” ভাই একটু শান্ত হয়ে বস। আমার তো মনে হয় তোকে জ্বালা দিতেই কেউ দুষ্টমি করেছে। তোর যে প্রেমে এলার্জি সম্ভবত সেটা চিঠি দাতা জেনে গেছে। ”
শ্রেয়ানের কথায় থতমত খেলো আয়ান। প্রেমে এলার্জি কেমন কথা? শ্রেয়ান কি জানে না আয়ানের কেনো প্রেম বিষয়ক কথাবার্তায় এতো সমস্যা?
” তুই থাম শ্রেয়ান। না থামলে বল পাঁচ টাকা দেই। তবুও চুপ থাক। ”
” দিলে হাজার পাঁচেক দে, বউ নিয়ে সিনেমা দেখে আসি৷ ”
” তোর আর তোর বউয়ের প্রতিদিনের কাহিনি তো এক একটা আস্ত সিনেমা রে। অযথা টাকা খরচ কেন করবি? ”

আয়ান চিবিয়ে চিবিয়ে বললো কথাগুলো। শ্রেয়ান মুখ গোমড়া করে ফেললো। হুট করে মনে পড়লো শ্রাবন্তী আজ চটপটি নিয়ে যেতে বলেছে। বউকে ভীষণ ভয় পায় বেচারা শ্রেয়ান। মাঝে মধ্যে দু’জন মারামারিও করে। কিন্তু কেউ কাউকে ছাড়া আবার থাকতেও পারে না। প্রেমের বিয়ে বলে কথা! আয়ানের খোঁচা মার্কা কথা উপেক্ষা করে মুহুর্তেই আবার শ্রেয়ানের মন চনমনে হয়ে গেছে। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো সে।
” ভালো কথা বললি রে। যাই বউ আমার অপেক্ষা করে আছে, একসাথে ভাত খাবো। বাই! ”

শ্রেয়ানের প্রস্থানে আয়ানের ভাবনার কোনো হেরফের হলোনা। সে বসে রইলো নিজের জায়গায়।

ভর দুপুরবেলা। ডাইনিং টেবিলের দুইপাশে বসে আছে বাবা-মা। অনিমার মা তানিয়া শেখ বাবা-মাকে খাবার পরিবেশন করছেন।

” তোমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করো তো, লেখাপড়া কি করছে না-কি শুধু হৈহৈ রৈরৈ করেই দিন কাটাচ্ছে? ”

সত্তার শেখ আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে স্ত্রীকে শুধলেন। অনিমা কাঠকাঠ গলায় বলে উঠে,

” ওভাবে জিজ্ঞেস না করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেই তে হয়! মাঝে মধ্যে এমন করো মনে হয় আমি তোমার সৎ মেয়ে আর মা তোমার আপন বউ। সব কথায়, তোমার মেয়ে! তোমার মেয়ে! ”

” তানিয়া শোনো শোনো!”

সত্তার শেখ মেয়ের দিকে তানিয়া শেখকে বললেন। ভদ্রলোকের কথায় বিশেষ পাত্তা দিলেন না উনার স্ত্রী।
” ঠিকই তো বলেছে। সব সময় তোমার মেয়ে কেন বলো? মেয়েটা কি আমার একার? ”

” ইয়া মাবুদ! আমার ভুল হয়েছে। ”
” মাফ না চাইলে হবে না বাবা। ”
অনিমা হেসে বললো। সত্তার শেখও দাঁত কেলিয়ে হেসে বললেন,
” খালি মুখে মাফ চাইলে হবে জননী? না-কি হাজারখানেক টাকাও দিতে হবে? ”

” বাবা! শোনো না একটা জরুরি কথা আছে। ”
“জরুরি কথা?”
ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সত্তার। অনিমা নম্র হয়ে বলে,
” হ্যাঁ। বন্ধুদের সাথে কক্সবাজার যাবো, হাজার দশেক টাকা দিবা? ”

চলবে,