এক পশলা প্রেম পর্ব-০২

0
211

#এক_পশলা_প্রেম
#পর্ব_২
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

” বাবা! শোনো না একটা জরুরি কথা আছে। ”

“জরুরি কথা?”

ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সত্তার। অনিমা নম্র হয়ে বলে,

” হ্যাঁ। বন্ধুদের সাথে কক্সবাজার যাবো, হাজার দশেক টাকা দিবা? ”

” বলি টাকা কি গাছে ফলে মা? ”

বাবার হাসিমুখে বলা উস্কানিমূলক কথায় মেজাজ বিগড়ে গেল অনিমার।
” লাগবে না তোমার টাকা যাও!”

তানিয়া শেখ কিছু বলতেই যাবেন তার আগেই অনিমা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো আর সোজা হনহনিয়ে নিজের রুমের দিকে এগোলো। মেয়ের চলে যাওয়া দেখে মুখ গোমড়া করে বসে রইলেন সত্তার শেখ।
” কিপটে লোক একটা! ”

তানিয়া গেলেন মুখ ঝামটি দিয়ে চলে!

” জটিল বিষয় ব্রো! তোমাকে এরকম চিঠি তো ভাবি ছাড়া আর কেউ দিতে পারে না। ”

বসার ঘরে মুখোমুখি সোফায় বসে আছে দুই ভাই। সাকিনের কথায় চোখ বড়সড় করে ফেললো আয়ান। ভাবি? ভাবি মানে কী? এই সাকিন ছেলেটা বড্ড পাজি। আয়ান সাকিনের কাঁধে কয়েকটা হালকা চড় মারলো।
” তুই কি মানুষ হবি না সাকিন? ”
” মানুষ? সিরিয়াসলি ভাইা তোমার আমাকে শিম্পাঞ্জি মনে হচ্ছে! দেখো দেখো তুমি আমি একেবারে সেইম সেইম। তার মানে কি তুমিও মানুষ না? ”
সাকিন কথাটা বলে রুম থেকে একপ্রকার দৌড়ে বেরিয়ে গেলো। আয়ান ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে। ধরার আগেই পালিয়ে গেলো ছেলেটা!

সাকিন সম্পর্কে আয়ানের চাচাতো ভাই। বছর পাঁচেক আগে একটা গাড়ি এক্সিডেন্টে সাকিনের বাবা-মা নিহত হয়েছিলেন। সেই থেকে আতিক চৌধুরী নিজের ভাইয়ের ছেলেকে নিজেদের সাথে রেখেছেন। মজার বিষয় হলো চৌধুরী বাড়িতে কোনো নারী সদস্য নেই। আয়ান আতিক চৌধুরীর একমাত্র ছেলে এবং আয়ানের মা নেই। আয়ান যখন খুব ছোটো ছিলো, তখনই তিনি পরলোকগমন করেন। দুই ভাইয়ের কথোপকথন শেষে বসার ঘরে ঢুকলেন মধ্যবয়সী আতিক চৌধুরী। এতক্ষণ নিজের রুমে বসে জরুরী কথা বলছিলেন কারো সাথে।
” আয়ান ফ্রি আছো? একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে। ”
আচমকা বাবার কথায় বেশ নড়েচড়ে উঠলো আয়ান। হাতের কাগজটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে মৃদু হেসে বললো,
” হ্যাঁ বলো বাবা। ”
আতিক চৌধুরী ছেলের কাছাকাছি এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে বলেন,
” তোমার বিয়ে ঠিক করেছি। যেহেতু তোমার কোনো পছন্দ নেই এবং বিয়ের জন্য যথেষ্ট বয়স হয়েছে তাই বিয়ে করতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। ”

বাবার সব কথা স্থির হয়ে শুনলো আয়ান। আতিক চৌধুরীর কথায় কোনো ভুল নেই। কিন্তু এরকম কিছু না জানিয়ে বিয়ে ঠিক করেছে মানেটা কী?

” কিন্তু বাবা এভাবে হুট করে বিয়ে ঠিক করলে কেন? তা-ও আমাকে না জানিয়ে!”

ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন আতিক চৌধুরী। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

” না জানানোর জন্য দুঃখিত আয়ান। তবে হঠাৎ করে মনে হলো আমার এক বন্ধুর একটি মেয়ে আছে! যে ছোটোবেলায় তোমার বউ হতে চেয়েছিল। আর তখন আমরাও বলেছিলাম বন্ধুুত্বের সম্পর্ককে আরো গভীর সম্পর্কে রূপ দিবো আমরা। ”
আয়ান বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আরকিছুই বলতে পারলোনা। হেসে বললো শুধু,

” ঠিক আছে বাবা। তুমি আর সাকিন যা চাইবে তাই হবে। ”

ছেলের মতামতের অপেক্ষায় ছিলেন আতিক চৌধুরী। এবার একটু প্রাণখুলে হাসলেন।

” আচ্ছা। ”

বাবার থেকে টাকাপয়সা না পেয়ে বেজায় মন খারাপ হয়েছে অনিমার। কিন্তু মন খারাপ বেশিক্ষণ অনিমাকে ঘায়েল করতে পারে না। হরিণের মতো চঞ্চল মেয়েটা নিজেকে সব সময় হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করে। আজ ভার্সিটির ক্যাম্পাসে একাই বসে আছে ও। বাকিরা এখনো আসেনি। এরমধ্যে আয়ান স্যারের দিকে দৃষ্টিপাত করলো অনিমা। মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করে আয়ান স্যারকে গিয়ে কিছু একটা বলতে। সব সময় এমন চুপচাপ হয়ে থাকার ভান করে কেন? এমনিতে তো ভালোই কথাবার্তা বলে!

” এই মেয়ে ওভাবে তাকিয়ে কী দেখছিস? ”
হুট করে প্রণয়ের কণ্ঠস্বর শুনে চমকাল অনিমা।
” তোর কল্লা দেখেছি। এভাবে কেউ পেছন থেকে কথা বলে? ”
প্রণয় তার সবগুলো দাঁত বের করে হাসল তারপর এক লাফে অনিমার সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
” তাহলে কি এভাবে সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে আপা? ”
” ধ্যাৎ! বদের হাড্ডি তোরা। যাগগে, বাকি মালগুলো কোথায় রে? ”
” প্রিয়ন্তি আর অর্ষা আসতেছে, পথে। অন্য আহাম্মকটা আসবে না। ”
” হইলো। চল ওদিকে গিয়ে বসবো। ”
অনিমা একটা গাছের দিকে ইশারা করে বললো প্রণয়কে।
” ওকে। ”
প্রণয়ও রাজি হলো। দুই বন্ধু একসাথে হাঁটতে লাগলো।

এরমধ্যে কেটে গেছে আরো কয়েকদিন। চিঠির মালিকের কথা ভুলে গেছে আয়ান। অবশ্য ভোলারই কথা! নিজের বিয়ে নিয়ে দারুণ ব্যস্ততা জেঁকে বসেছে তাকে। আজ আয়ানের বিয়ে! একটু পরেই বিয়ের কাজ শুরু হবে। পাত্রীপক্ষ ও বরপক্ষ একসাথে বিয়ের জন্য অপেক্ষা করে আছে। পর্দার আড়ালে হবু বউ বসে আছে। সাথে তার বান্ধবী ও আত্মীয়স্বজনও আছে। বাড়িতে একটাও মেয়েমানুষ না থাকার কী অসুবিধা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে চৌধুরী বাড়ির লোকজন। গতকাল থেকে খুব পেরেশানি পোহাতে হয়েছে তাদের। এই যে একটু পর বউ নিয়ে বাড়িতে ফিরবে তা-ও অন্য আত্মীয়স্বজনের ভরসা করতে হবে। আতিক চৌধুরীর একমাত্র বোন হালিমা এসেছেন বিয়ে উপলক্ষে। হালিমা, তার মেয়ে হেলেনা, ছেলে রাসেল আর স্বামী জয়নাল আয়ানের বিয়েতে যথেষ্ট খাটছে।

” বিবাহ শুরু করছি তাহলে! ”
কাজী সাহেবের কথায় সবাই নড়েচড়ে উঠলো। আয়ান চুপচাপ বসে আছে। সাকিন অবশ্য এদিকওদিক তাকাতে ব্যস্ত! বিয়ে শুরু হবে শুনে হবু বউয়ের হাসফাস লাগছে। সবকিছু যেনো ঝড়ের গতিতে হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিয়ে সম্পন্ন হলো দু’জনের। এবার বউ নিয়ে বাড়িতে যাওয়ার পালা!

মাঝে মধ্যে মানুষের জীবনে সবকিছু এতো দ্রুতভাবে ঘটে যায় যে ঠিকমতো উপলব্ধিও করতে পারে না, কী হয়েছে কিংবা কী হচ্ছে! আয়ানের জীবনেও বিয়েটা সেভাবেই হলো। আজ তার বিয়ের প্রথম রাত! অথচ এখনো অবধি বউয়ের মুখটা পর্যন্ত দেখেনি সে। নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছে আয়ান। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। আজকে নিজের ঘরটায় নিজেকে বেশ অপ্রস্তুত লাগছে ওর। রজনীগন্ধার সুভাসে ঘরটা ম-ম করছে। সাথে কিছু লাল গোলাপ ফুলও আছে। আয়ানের উপস্থিতি টের পেয়ে নতুন বউ একটু নড়েচড়ে বসলো। যদিও ঘোমটা দেওয়া নেই মুখে তবে মাথা নিচু করে বসে থাকায় চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। আয়ান বিছানার দিকে তাকিয়ে ভাবছে, নতুন বউ বসা থেকে উঠে তে সালাম দিবে! সালাম তো দূরের কথা স্বামী যে ঘরে প্রবেশ করেছে সেদিকে পর্যন্ত খেয়াল নেই মেয়েটার। আয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলো। মেজাজ খারাপ হচ্ছে ওর। যাকে বলে শিক্ষকের মেজাজ! কেমন বেয়াদব মেয়ে কপালে জুটিয়ে দিলো তার বাবা?

” এই মেয়ে! বুঝতে পারছো না ঘরে আমি এসেছি? ”
মেজাজ হারিয়ে কথাটা বলেই ফেললো আয়ান। আর ওমনি মাথা উঁচিয়ে চোখ পাকাল অনিমা। বউয়ের জায়গায় অনিমাকে দেখে আকাশ থেকে পড়লো আয়ান। অনিমার অবস্থাও একই!

” আয়ান স্যার! ”

অস্ফুটে স্বরে বলে ফেললো অনিমা। আয়ান তো পুরাই শকড!
” এই মেয়ে তুমি না আমাদের ভার্সিটির স্টুডেন্ট! ”

” কীসের স্টুডেন্ট? এই মুহুর্তে আমি আপনার স্ত্রী। ভার্সিটিতে গেলে স্টুডেন্ট। ”

অনিমা চোখগুলো এদিকসেদিক ঘুরিয়ে বললো। দেখে মনে হচ্ছে আয়ানকে বাগে পেয়ে সে দারুণ খুশি। অথচ একটু আগেই বিয়ে করবে না বলে মহা জেদ ধরেছিল। কিন্তু এখন আয়ান স্যারকে দেখে ওর ভিতরে থাকা চঞ্চল স্বত্বা জেগে উঠেছে। অনিমার এহেন আচরণে আয়ান রাগ করাও ভুলে গেছে। বড়ে বড়ো চোখ করে কেবল অনিমার দিকে তাকিয়ে আছে সে। অনিমা ওর অবস্থা দেখে ফিক করে হেসে উঠলো। আর তাতেই ধ্যান ভাঙলো আয়ানের।

” তুমি তো খুব বেয়াদব! জানো না বড়দের সাথে কীরকম আচরণ করতে হয়? আমাদের ভার্সিটিতে এমন অদ্ভুত প্রাণী পড়াশোনা করে! ”

” এই! এই! অদ্ভুত প্রাণী কী হ্যাঁ? কীসের বেয়াদবি? আপনার এই স্যারের মতো মেজাজ দেখাবেন ক্লাসে গিয়ে, আমার সাথে না। ঘরে বসে আপনার কোনো হম্বিতম্বি চলবে না। ”

” তোমার সাথে বিয়ে হয়েছে আমার! এতটুকু সময়ই এই রকম পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করছো। ভবিষ্যত তো ডার্কনেসে ভরপুর আমার। ”

চলবে,