এক পশলা প্রেম পর্ব-০৩

0
228

#এক_পশলা_প্রেম
#পর্ব_৩
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

” তোমার সাথে বিয়ে হয়েছে আমার? ও মাই গড! এতটুকু সময়ই এই রকম পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করছো! ভবিষ্যত তো ডার্কনেসে ভরপুর আমার। ”

আয়ানের কথায় কপট হাসল অনিমা। সদ্য বিয়ে করা বউয়ের আচরণে আয়ানের অবস্থা দেখার মতোই। মেয়েটা অকারণে কেনো হাসছে সেটাই বুঝতে পারছে না আয়ান।

” এই মেয়ে! তোমার কি মাথার স্ক্রু ঢিলা? এভাবে হাসছ কেন? ”

অনিমা বসা থেকে উঠে সামনাসামনি দাঁড়াল। আয়ানের চোখগুলো অনিমার কাছে আসাতে ইয়া বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কোটর ছেড়ে এখুনি বাইরে বেরিয়ে আসবে তারা।

” আমার নাম অনিমা! এই মেয়ে বলে কেন ডাকছেন? যদি নাম ধরে বলতে সমস্যা হয় জানু, সোনা বলে ডাকবেন তবুও এসব মেয়েটেয়ে বলে নয়। আর রইলো কথা মাথার স্ক্রু ঢিলার কথা? হুহ্! এখন তো আমার স্ক্রু ঢিলে আছে, আমার সাথে কয়েকদিন থাকলে আপনার সব স্ক্রু-ই ঢিলে হয়ে যাবে । ”

আয়ান চমকাল, থমকাল অনিমার কথায়। একপা পেছনে এগিয়ে চোখ বন্ধ করে ফের দৃষ্টিপাত করলো অনিমার দিকে। নাহ! সবকিছু সত্যি! এই পাগল মার্কা মেয়েই জুটেছে কপালে।

” অনিমা কথা কম বলো। যাও গিয়ে শুয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়েছে ঘুমাতে হবে। ”

আয়ান অনিমাকে পাশ কাটিয়ে বিছানার একপাশে বসলো। এই মেয়ের সাথে অযথা তর্ক কিংবা কথা বলতেও দম লাগে। আপাতত সেই দম নেই আয়ানের। মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। শেষে তুলকালাম বাঁধবে ভেবে চুপচাপ শুয়ে ঘুমানোর প্ল্যান করছে বেচারা। অনিমা চুপচাপ আয়ানের কাজকর্ম দেখছে। কিছু বলছে না। মনে মনে ভাবছে আজ থেকে এই লোকটাই ওর বর! বাহ! চমৎকার লাগছে ব্যাপারটা। আগে জানলে তো বিয়েতে অমত করতোনা সে।

কিছুক্ষণ আগে….

বিয়ের দাওয়াত খেতে এসে নিজেকেই বিয়ে করতে হবে শুনে অবাক হয়েছে অনিমা। এসেছিল বাবার বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে। কিন্তু মেয়ে গেছে তার প্রেমিকের সাথে পালিয়ে। শেষে বাবার বন্ধু অনিমার বাবাকে এমনভাবে ধরলো যে নিজের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলো সত্তার শেখ। অবশ্য অনিমার বাবার ক্ষেত্রে আয়ানের বিষয় সবকিছু শুনে বিয়েতে রাজি না হওয়ার মতো কিছু ছিলো না। বেচারা অনিমার অবস্থা তখন শোচনীয় হয়েছিল। কোথায় ছেলেরা বিয়ে করতে এসে আঁটকে যায়, অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ে করে বাড়ি চলে যায়, সেখানে অনিমার সাথে ঘটেছে উল্টো!

বর্তমান….

আয়ানের সুখ সহ্য হচ্ছে না অনিমার। কেনো ঘুমাবে সে? বিয়ে করেছে, আজ বাসর রাত! তাহলে কেন ঘুমোচ্ছে?

” উঠুন! এখুনি উঠুন। ”
কেবলই চোখটা লেগে এসেছিল আয়ানের। হঠাৎ অনিমার বাজখাঁই আওয়াজে নড়েচড়ে উঠলো সে। চোখ মেলে তাকাতেই দেখল অনিমা ওর পাশে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কেমন অস্বস্তি লাগছে আয়ানের। কখনো কোনো মেয়ে এতটা কাছাকাছি আসেনি বলেই হয়তো এই জড়তা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে বসল আয়ান। অনিমা আরেকটু এগোল ওর দিকে। আয়ান শুকনো ঢোক গিলে বললো,
” কী হচ্ছে এসব? এভাবে এগিয়ে আসছ কেনো? লাজলজ্জা কি নেই! ”
” কীসের লজ্জা? আপনি আমার বর! তাছাড়া আমি কি খারাপ কিছু বলেছি না-কি করেছি? ”

” অনিমা! প্লিজ দূরে সরে বসো। ”

অনিমা শুনলো না আয়ানের কথা। ওকে অস্বস্তিতে ফেলতে মহা আনন্দ লাগছে। আয়ানের কাচুমাচু মুখখানা দেখে ভীষণ হাসি পাচ্ছে অনিামর।

” আচ্ছা স্যার, আপনার মনে আছে? ওই যে চিঠি? প্রিয় আয়ান স্যার! ”

আচমকা অনিমার মুখে চিঠির কথা শুনে অবাক হলো আয়ান। চিঠির বিষয় কেনো বলছে মেয়েটা? আয়ান লম্বা নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললো,
” তারমানে তুমিই চিঠি দিয়েছিলে? ”
অনিমা আয়ানের দিকে আরেকটু ঝুঁকে চোখে টিপ্পনী কেটে বললো,
” ইয়েস! খুশি হয়েছিলেন? ”
আয়ান দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বললো,
” তোমার মতো একটা অসভ্য মেয়ে কীভাবে আমার বউ হলো বুঝতে পারছি না। বাবা কীভাবে তোমাকে পছন্দ করেছিলেন! ”

অনিমা হাসলো। আয়ানের একটা হাত নিজের হাতের উপর রেখে বললো,
” আপনি জানেন না? ”
” না! হাত সরাও বলছি। ”
আয়ান নিজের হাতটা সরিয়ে নিলো। অনিমা চুপ করে রইলো। একটু থেমে বললো,
” পাত্রী বদল হয়েছে বর মশাই! আপনার বিয়ে তো অন্য কোনো মেয়ের সাথে হওয়ার কথা ছিলো। দূর্ভাগ্যবশত বিয়েটা আমার সাথে হয়ে গেছে। ”
অনিমা কপালে হাত দিয়ে হতাশ হওয়ার ভঙ্গিতে বললো কথাগুলো। আয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
” তোমাকে দেখে মোটেও মনে হচ্ছে না তুমি হতাশ হয়েছ। উল্টো মনে হচ্ছে চিঠি দেওয়া থেকে সবকিছু ই প্ল্যান মাফিক করেছো। ইচ্ছে করেই বিয়েটা করেছো ঠিক না? ”

অনিমা কিয়ৎক্ষণ চুপ করে রইলো। দু’জনের চোখাচোখি দেখে মনে হচ্ছে দু’জন মারামারি করবে। অথচ সেসব কিছুই করলোনা অনিমা। উল্টো আয়ানের দিকে আস্তে আস্তে এগোতে লাগলো। আয়ান ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। যখন আয়ানের চোখেমুখে অনিমার নিঃশ্বাস আঁচড়ে পড়লো তখনই নড়েচড়ে উঠলো সে।
‘ এই অনিমা! কী করছো? ”
” ইচ্ছে করে বিয়ে করেছি আপনাকে। আপনার মতো সুদর্শন পুরুষ দেখে বিয়ে না করে পারি? সুদর্শন পুরুষ তো শুধু দেখলে হবে না! একটু…..”

অনিমা কথা শেষ না করেই আবারও এগোতে লাগলো। আয়ানের দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। জীবনে প্রথম কোনো মেয়ে এতটা কাছাকাছি! তা-ও বিয়ে করা বউ। যতই হোক বুকের ভেতর কেমন একটা ধুকপুক করছে। আয়ান যখন চোখটা বন্ধ করে ফেললো অনিমা তখনই শব্দ করে হেসে ওঠে। বিষয়টা কী হলো বোঝার জন্য চোখ মেলে তাকাল আয়ান। অনিমা ওর থেকে অনেকটা দূরে সরে বসে হাসছে। বিষয়টা বুঝতে একটু সময় লাগলো আয়ানের। মেয়েটা ওকে ভয় দেখাতে চাইলো! একরত্তি মেয়ের এতে বড়ো সাহস! আয়ান চট করে এক অঘটন ঘটিয়ে দিলো। অনিমাকে জড়িয়ে ধরল সে। অনিমা ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গেছে। যখনই বুঝলা পারলো আয়ান ওকে এভাবে জড়িয়ে ধরে আছে তখুনি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য নড়াচড়া করতে শুরু করলো ও।

” কী হলো? সুদর্শন পুরুষ শুধু দেখলে হবে অনিমা? অন্য কিছু… হুম হুম? ”

অনিমা বুঝতে পারছে বদের হাড্ডি আয়ান স্যারটাও যথেষ্ট পাজি। ওপর ওপর গম্ভীর একটা হাবভাব দেখায় শুধু। কিন্তু এখন কী করবে? কীভাবে নিজেকে মুক্ত করবে আয়ানের থেকে!

” কিছু না স্যার। প্লিজ ছাড়ুন! ”

অনিমাকে কাবু করতে পারছে ভেবে খুব সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে আয়ানের। সে হেসে বললো,

” মোটেও ছাড়বোনা। বউ আমার, ঘর আমার। আমি তো ধরে বসেই থাকবো। ”

” সবই ঠিক আছে। তবুও বলছি ছেড়ে দিন। নয়তো পরে যা ঘটবে তারজন্য আমি দায়ী নই। ”
” যা ঘটবার ঘটুক আজ। তবুও ছাড়ছি না। ”
” ওকে। ”

অনিমা কথা শেষ করে অনিমার ঘাড়ে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। আয়ান বিস্ময়ে নড়াচড়া পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে। শরীর বরফের ন্যায় জমে গেছে তার। মনে হচ্ছে এভাবেই বসে থাকতে হবে সারারাত। অনিমা মুচকি হাসলো। আয়ান এখনো জড়িয়ে ধরে আছে ওকে।
” এখনও জড়িয়ে ধরে থাকবেন স্যার? ”

আয়ানের কানের কাছে গিয়ে এভাবে বলার ফলে হকচকিয়ে উঠলো বেচারা। তৎক্ষণাৎ অনিমাকে ছেড়ে দিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো সে।

” বড্ড বেহায়া মেয়ে তুমি। ধ্যাৎ! ”

আয়ান আরকিছু না বলে হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। অনিমা নিজের জায়গায় বসে হাসছে। লোকটাকে কাবু করা ব্যাপার না।

অক্টোবরের শহুরে সকাল যেন এক ধোঁয়াশাচ্ছন্ন স্বপ্নের মতো ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। রাতের গাঢ় আঁধার কেটে গেলেও, কিন্তু ভোরের হালকা কুয়াশা এখনো মাটির ওপর গা ঢেকে রেখেছে। আকাশ ধূসর নীল, সূর্যের প্রথম কিরণ ইমারতগুলোর শীর্ষে এসে পড়ছে। শহরের ইট-কাঠের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে চলেছে, যেন আসন্ন শীতের আগমনী বার্তা জানিয়ে দিচ্ছে।

রাস্তায় এখনো সে অর্থে ভিড় জমেনি, কিন্তু শহরের হৃদপিণ্ড যেন ধীরে ধীরে স্পন্দিত হতে শুরু করেছে। দূরে কোনো পাখির কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, যা আধুনিক কোলাহলের মাঝে এক প্রাকৃতিক সঙ্গীতের মতোই শোনাচ্ছে । শহরের মানুষগুলো, যারা সারা দিনের ব্যস্ততায় ডুবে যাবে, তারা এখনো কিছুটা মন্থরতায় আচ্ছন্ন। অক্টোবরের এই সকালের হাওয়ায় এক ধরনের নীরবতার শীতল পরশ মিশে থাকে, যা শহুরে কোলাহলের অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা।

শহরের পাশের গাছগুলো বাতাসের সঙ্গে নড়ে, যেন তারা নিজস্ব কোনো গল্প বলছে। গাড়িগুলো রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে, কিন্তু তাদের শব্দ এখনো কোলাহল হয়ে ওঠেনি। এই মুহূর্তটা যেন প্রতিদিনের ব্যস্ততার আগে প্রকৃতির শেষ নিঃশ্বাস, যখন শহর আর প্রকৃতি দুজনেই একে অপরকে অনুভব করতে চায়।

চলবে,