#এক_পশলা_প্রেম
#পর্ব_৪
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
অক্টোবরের শহুরে সকাল যেন এক ধোঁয়াশাচ্ছন্ন স্বপ্নের মতো ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। রাতের গাঢ় আঁধার কেটে গেলেও, কিন্তু ভোরের হালকা কুয়াশা এখনো মাটির ওপর গা ঢেকে রেখেছে।
ডাইনিং টেবিলে নাস্তা পরিবেশন করছেন তানিয়া শেখ। সামনে চেয়ারে বসে আছে সত্তার শেখ। অনিমার জন্য বরাদ্দকৃত চেয়ারের দিকে তাকিয়ে দু’জনেই তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললো বারকয়েক। মেয়েটা শ্বশুর বাড়ি গিয়েছে মাত্র একটা রাত পেরিয়েছে সবে। অথচ মনে হচ্ছে কতগুলো দিন অনিমা বাড়িতে নেই। বাবা-মায়ের মন কেমন খাঁ খাঁ করছ।
” খাবার সামনে নিয়ে বসে না থেকে খাও এবার। বেলা তো বসে রইবে না। ”
স্ত্রী’র কথায় নড়েচড়ে উঠলেন সত্তার। তানিয়াও বসেছেন।
” ভালো লাগছে না তানিয়া। ”
” কেন? তোমার ভালো লাগবে না কেন? একেবারে জোরাজোরি করে মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিলে, এখন খারাপ লাগছে কেনো? ”
হঠাৎ করে এভাবে বিয়ে হওয়ার বিষয়টা তানিয়া মেনে নিতে পারেনি। স্বামীর উপর তীব্র অভিমান জমেছে তার হৃদয়ে। সেজন্য কিছুটা রেগে গিয়ে বললো কথাগুলো। সত্তার শেখ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে খেতে শুরু করলেন।
” শোনো তানিয়া, আয়ান ভালো ছেলে। তাছাড়া ভালো প্রফেশনে জব করে। অনিমার ভার্সিটিরই তো শিক্ষক! সেভাবে বলতে গেলে দু’জন দু’জনার পরিচিত। মেয়ের বিয়ে তো একদিন না একদিন দিতেই হতো! সবচেয়ে বড়ো কথা হলো তকদিরে যা থাকে তাই হয়। এটা নিয়ে অহেতুক মন খারাপ করে থেকো না। পারলে মেয়েকেও বোঝাও, ভালো করে সংসার করতে বলো। ”
সত্তার শেখ খাবার রেখে উঠে গেলেন। তানিয়া বসে বসে ভাবতে লাগলেন, বিয়ে যেহেতু হয়ে গেছে অহেতুক এসব ভেবে আর কোনো লাভ নেই। তারচে মেয়েটা যেনো ভালো করে সংসার করতে পারে সেটাই প্রার্থনা করা উচিত।
সকাল সকাল চোখেমুখে পানির ছিটে লাগায় কপালে বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলো আয়ান। চোখ মেলে তাকাতেই অনিমার দাঁত কেলানো হাসি দেখে মেজাজ আরো বিগড়ে গেল আয়ানের। অনিমার পরনে সাদা রঙের শাড়ি , ভেজা চুলগুলো থেকে টপটপ পানি ঝরছে। হাতে সোনার চুড়ি, গলায় চেইন, কানে ছোটো দুল, চোখে হালকা কাজল।
” এটা কী হলো অনিমা? ”
আয়ানের প্রশ্নে মুচকি হাসলো অনিমা। বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলো সে।
” ঘুম ভাঙানোর নিনজা টেকনিক প্রয়োগ করা হয়েছে স্বামী স্যার। ”
আয়ানের অসহায় লাগছে। স্যারের রাগান্বিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে যে মেয়ে এভাবে হেসে হেসে কথা বলছে, সেই মেয়ে আরো কতকিছু করতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
” স্বামী স্যার কেমন ডাক!”
” অনিমা স্পেশাল ডাক এটা, স্বামী স্যার। ”
আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ফের বললো,
” এরপর থেকে এভাবে আর ঘুম ভাঙাবে না। ”
” তাহলে কী অন্য কোনোভাবে ঘুম ভাঙাব? ”
” নাহ! তোমাকে কে বলেছে আমার ঘুম ভাঙানোর দায়িত্ব নিতে? এত বছর যখন একা একাই ঠিক সময় ঘুম থেকে উঠতে পেরেছি এখনো পারবো। তোমাকে আর সাহায্য করতে হবে না। প্লিজ!”
অনিমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে। বেচারা স্যারের কী অবস্থা! ইশ ভার্সিটির সবাইকে যদি এই দৃশ্যটা দেখাতে পারতো! গম্ভীর হাবভাব করা স্যারের কী করুন দশা হয়েছে আহ…
” এতো বছর যা করেছেন, করেছেন। কিন্তু এখন তো আমি এসে গেছি। সুতরাং স্বামীর প্রতি আমার কিছু দায়দায়িত্ব আছে। ”
নিজের মাথায় নিজেই ফাটিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে আয়ানের। এটা কে? কোথা থেকে এলো!
সারাজীবন আইবুড়ো থেকে কাকে বিয়ে করলো শেষে?
” ঠিক আছে দায়দায়িত্ব পরে পালন করবে। এখন সরো, ফ্রেশ হয়ে আসি। ”
আয়ান বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমের দিকে এগোলো। অনিমাও উঠে দাঁড়ালো।
” ঠিক আছে। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেতে আসুন। আমি ডাইনিং রুমে যাচ্ছি। ”
” ওকে। ”
আয়ান ইচ্ছে করেই সবকিছুতে হ্যাঁ বলে যাচ্ছে। তর্ক, ঝগড়া একদম অপছন্দ তার। আর যেখানে প্রতিপক্ষ এমন আধ-পাগল সেখানে ঝামেলা করার প্রশ্নই আসে না।
এতগুলো বছর পর চৌধুরী বাড়িতে বউয়ের হাতে রান্নাবান্না হয়েছে। তা-ও কি-না চা এবং পাউরুটি উইথ জ্যাম! সাকিন হাতে পাউরুটি নিয়ে বসে আছে। আতিক চৌধুরী চা হাতে অনিমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। অনিমা একগাল হেসে সাকিনকে বললো,
” কী হয়েছে সাকিন? খাচ্ছ না যে? ”
সাকিন কেশে উঠলো। অনিমা পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো তার দিকে। পানি খেয়ে শান্ত হয়ে লম্বা নিঃশ্বাস ফেললো সাকিন।
” খাচ্ছি না কে বললো ভাবিজান? গাপুসগুপুস করে খাচ্ছি তো। ”
” হ্যাঁ হ্যাঁ মা, আমিও খাচ্ছি। ”
আতিক চৌধুরী বললেন। এরমধ্যে আয়ান এসে বসলো চেয়ারে। অনিমা হেসে এগিয়ে গেলো ওর দিকে। চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে সাথে বিস্কুট দিলো। তারপর পাউরুটি আর জ্যাম! ওহ হ্যাঁ সাথে আমের জুস।
” এসব কী! বাবা? স্যান্ডউইচ, ডিম, টোস্ট কোথায়? ”
আয়ানের বাবা পিটপিট করে অনিমার দিকে তাকিয়ে বললো,
” অনিমা ভালোবেসে যা তৈরি করেছে আজকে সেগুলো খেয়ে নে আয়ান। কাল থেকে সাকিনই নাস্তা তৈরি করবে । ”
আয়ান অনিমার দিকে দৃষ্টিপাত করলো। এই মেয়ে যে রান্নাবান্না কিচ্ছু পারে না আয়ান সেটা আগেই ভেবেছিল।
” গুণী মেয়েকে বিয়ে করেছি, নাস্তায় তো এইসবই খেতে হবে। বাহ আয়ান! বাহ! ”
আয়ান রাগে ফুঁসছে। আতিক চৌধুরী পড়েছেন উভয় সংকটে। না পারছে ছেলেকে কিছু বলতে আর না পারছে পুত্রবধূকে কিছু বলতে।
” এতো বলার কী আছে হুহ্? সবাই কি সব কাজ পারে? রান্না পারি না তো কী হয়েছে? শিখে নিবো। আর আমি কি জানতাম এভাবে বিয়ে করতে হবে! আশ্চর্য! ”
অনিমার একনাগাড়ে বলা কথাগুলো শুনে আয়ান কী বলবে সেটাও ভুলে গেছে। কিছু বলবে না ভেবে চায়ের কাপে চুমুক দিতেই জোরেশোরে কেশে উঠলো। চোখ বন্ধ করে ফেললো সাকিন সাথে আতিক চৌধুরীও। চায়ে অতিরিক্ত লিকার দেওয়ার ফলে সব তেঁতো হয়ে গেছে। এজন্য চা পান করার উপযোগী হয়নি। কপাল গুণে পাউরুটি তৈরি করতে হয়নি বলে সেটা ঠিকঠাক মতো খাওয়া যাচ্ছে।
” এটা চা হয়েছে? বাবা এই চা খাচ্ছো কীভাবে! ”
আয়ান ডাইনিং টেবিলে থেকে উঠে হনহনিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগোলো। অনিমা এবার সত্যি মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে। আয়ানের জন্য ওর খারাপ লাগছে না কিন্তু সাকিন আর আতিক চৌধুরীর জন্য একটু খারাপ লাগছে বটে।
” বাবা সরি! আমার জন্য আপনাদের খাওয়া নষ্ট হলো। আমি কথা দিচ্ছি আস্তে আস্তে সব শিখে ফেলবো। ”
” ততদিন তোমাকে আর কিছু করতে হবে না ভাবি। তোমার এই হ্যান্ডসাম দেবর সাহেব সব রান্না করে নিবে, ওকে? ”
সাকিনের কথায় আয়ানের বাবা ও অনিমা হেসে উঠলো।
সন্ধ্যা নেমেছে। সূর্যটা যেন একটু তাড়াতাড়িই ক্লান্ত হয়ে পশ্চিম আকাশে লাল-কমলা আঁচল মেলে বিদায় নিলো আজ। সারা দিন ধরে শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হচ্ছে। রাস্তায় লোকজনের ভিড় কমে এসেছে, বাতাসে এক ধরনের প্রশান্তি মিশে আছে, যেন দিনের সব ব্যস্ততা, হট্টগোল—সবই থেমে গেছে। হঠাৎ হালকা একটা ঠাণ্ডা বাতাস বইল, সেই সঙ্গে ধুলোমাখা গাছের পাতা কাঁপতে শুরু করল। বাতাসে শীতের আগমনী বার্তা, যেন প্রকৃতি তার পোশাক বদলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আকাশটা গভীর নীল, তার ওপর লাল আর সোনালি আলোর ছটা, যা সন্ধ্যার সাথে মিশে চারপাশে এক মায়াময় আবহ তৈরি করেছে। রাস্তায় ঝুলন্ত ল্যাম্পপোস্টের নিচে পড়া হলুদ আলো যেন কোনো এক পুরনো দিনের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাখিরা ফিরে গেছে তাদের নীড়ে, গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া চাঁদও ধীরে ধীরে তার জায়গা নিতে শুরু করেছে। এই শহরের কোলাহলময় দিন শেষ হয়ে আসছে, আর প্রকৃতি যেন নিজের মতো করে এক গভীর নিশ্বাস নিয়ে নতুন রাতের অপেক্ষায় আছে।
চলবে,