#এক_পশলা_প্রেম
#পর্ব_৫
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
” সন্ধ্যাবেলা এরকম ভূতের মতো মুখ করে বসে আছেন কেনো স্যার? ”
নিজের ঘরে অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে আয়ান। পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা করছিল। এরমধ্যে আচমকা অনিমার কথায় নড়েচড়ে উঠলো সে।
” তুমি আমাকে ভূত বললে? আর স্যার বলে ডাকছ কেন? ”
অনিমা ঠাস করে আয়ানের পাশে বসে পায়ের উপর পা রেখে বললো,
” ভূত না হলেও খবিশ লোক বটে। আর স্যার বলে না ডাকলে কি জানু বলে ডাকবো? ”
বিরক্ত লাগছে আয়ানের। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো সে। কিছুটা দূরে সরে গিয়ে বললো,
” স্যার বলে ডাকলে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো স্যার বলে ডাকছ অথচ বিন্দুমাত্র সম্মান করতেছ না। ”
” ওহ সরি! আপনি যে আমার স্বামী সেটা ভুলে গেছিলাম। ওকে ওকে আজ থেকে আপনাকে মন থেকে সম্মান করবো। ”
অনিমা বসা থেকে উঠে আয়ানের দিকে এগোতে এগোতে কথাটা বললো। আয়ান শুকনো ঢোক গিলে অন্য দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
” থাক! আমার সম্মান দরকার নেই। কাল থেকে ক্লাস আছে, ক্লাসে বসে অন্তত এরকম করবেনা। ”
অনিমা মিটিমিটি হাসছে। আয়ান এরমধ্যে বেডরুমের দিকে চলে গেছে। লোকটা খারাপ না! ভালোবাসা যায় সাথে সংসার করলেও মন্দ হয় না। আনমনে এসব ভেবে মুচকি হাসে অনিমা। বিয়ে একটি পবিত্র সম্পর্ক। তিন কবুল বলার পর স্বামীস্ত্রীর মধ্যে এমনি একটা অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়ে যায়। অনিমা ও আয়ানের মধ্যেও তেমনই এক অদৃশ্য বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে হয়তো।
রৌদ্রময় দিন। সূর্যের আলো যেন পৃথিবীকে নিজের সোনালি আভায় ঢেকে দিয়েছে। আকাশে কোনো মেঘ নেই; শুধু নিখুঁত নীল আর সূর্যের ঝলমলে হাসি। চারদিকে এক উজ্জ্বল আলো, গাছের পাতাগুলোতে আলো পড়ে ঝিকমিক করছে। অনেকদিন পর ভার্সিটির ক্যাম্পাসে পা রেখেছে অনিমা। আলিফ, প্রণয়, অর্ষা, প্রিয়ন্তি সবাই এসেছে। এতদিন কারো সাথে যোগাযোগ পর্যন্ত হয়নি। কথা বললেই নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো। হুট করে বিয়ে হওয়ার বিষয়টা সবাই জানেও না। শুধু জানে কিছু একটা হয়েছে যার ফলে অনিমা ভার্সিটিতে এতদিন আসেনি । আয়ান অনিমাকে ক্যাম্পাসে দাঁড়ানো দেখে দ্রুত পা চালিয়ে টিচার্স রুমের দিকে এগোচ্ছে। না জানি মেয়েটা আবার এখানে বসে পাগলামি শুরু করে!
” এই অনিমা! কী খবর তোর? বিয়ে খেতে গিয়ে একেবারে লাপাত্তা হয়ে গেলি! ”
পাঁচ বন্ধু গোল হয়ে ক্যাম্পাসে ঘাসের উপর বসেছে। আলিফ অনিমার দিকে তাকিয়ে আছে সাথে বাকিরাও। দেখে মনে হচ্ছে কোনো কয়েদিকে জেরা করা হচ্ছে।
” আরে তেমন কিছু না। এমনি! তোদের খবর কী বল। ”
” আমাদের খবর বরাবর জোশ। আচ্ছা আরেকটা খবর আছে, শুনেছিস? ”
অর্ষা বেশ আগ্রহ নিয়ে শুধালো। অনিমা বাকিদের দিকে তাকিয়ে বললো,
” আমি তো বাড়িতে ছিলাম এতদিন, কী হয়েছে কীভাবে জানবো বল? ”
অর্ষা বললো,
” তা-ও কথা। আচ্ছা শোন, আয়ান স্যার না-কি বিয়ে করেছে। ”
অনিমা কী বলবে বুঝতে পারছে না। এদেরকে কি বলবে, বিয়েটা স্যারের ওর সাথেই হয়েছে?
” এই অনিমা! কোথায় হারিয়ে গেলি? আচ্ছা চল ক্লাস আছে। বহুদিন ক্লাস করা হয় না। আজ না হয় একটু ক্লাস করলাম। ”
প্রণয়ের কথায় ওরা সবাই একসাথে হেসে উঠলো। ভার্সিটিতে আসে না-কি মামার বাড়ি বেড়াতে বোঝা দ্বায়।
ক্লাস চলছে। অনিমা অন্যমনস্ক। আয়ানের লেকচারের দিকে ওর কোনো খেয়াল নেই। বিষয়টা আয়ান খেয়াল করছে। কিন্তু কিছু বলছে না। কী নিয়ে অনিমা এতো ভাবুক হয়ে আছে সেটাই ভাবছে আয়ান৷ কিন্তু যখনই বুঝল সে অনিমার জন্য ভাবছে তখনই মনকে কড়া শাষণ করলো। আর সাথে সাথেই নিজের শিক্ষক সত্তায় ফিরে গেলো।
” অনিমা! ক্লাসে অন্যমনস্ক থাকলে ক্লাস করার দরকার নেই। তারচে বাইরে গিয়ে ক্যাম্পাসে বসে থাকো। ”
আয়ানের গম্ভীর কথায় সবাই চুপচাপ অনিমার দিকে তাকিয়ে আছে। অনিমাও চুপ করে আছে। হঠাৎ করে এভাবে আয়ান যে ওকে কিছু বলবে বুঝতে পারেনি। বিষয়টা বুঝতে একটু সময় লাগলেও নিজের স্বরূপে ফিরে এলো অনিমা। একগাল হেসে বললো,
” আমি ক্লাসরমে না থাকলে আপনার কি সুবিধা হবে স্যার? না মানে ক্লাস করাতে সুবিধা হবে? ”
অনিমার প্রশ্নে সবাই থতমত খেয়ে তাকিয়ে আছে। আয়ান তো ভেতর ভেতর ফুঁসছে। আজকে বাসায় যাক অনিমার একদিন কী আয়ানের একদিন।
” হ্যাঁ অবশ্যই সুবিধা হবে। এই মুহুর্তে ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে যাও। ”
আয়ান বেশ রেগেমেগে বললো কথাটা। ফলশ্রুতিতে অনিমা একপ্রকার বাধ্য হয়েই ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেলো। যেহেতু এটা ভার্সিটি এখানে বসে আয়ানের সাথে পেরে উঠবে না সেটা ভালো করেই জানে অনিমা। তাই আপাতত দাঁতে দাঁত চেপে সবকিছু সহ্য করতে হচ্ছে।
” কী হয়েছে? না খেয়ে বসে রইলে যে! ”
দুপুরের খাবার খেতে বসেছে সত্তার শেখ। তানিয়া শেখ খাবার পরিবেশন করা শেষে নিজেও বসলেন মাত্র।
” ভাবছি বিকেলে একবার অনিমাকে দেখে আসবো। মেয়েটা তো অভিমান করে কল পর্যন্ত করে না। কল দিলেও ধরে না। তোমার সাথে কি কথা হয়েছে? ”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন সত্তার।
” নাহ! আমার কলও ধরে না। মেয়েটার এতো অভিমান, কবে ভাঙবে জানি না। একবার নিজে ওর জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবো তো! আমাদের সাথে কেউ এমন জোর করলে কেমন লাগতো? ”
স্ত্রী’র প্রশ্নে চুপ করে রইলেন সত্তার। যতই মেয়ের ভালোর জন্য ভালো পাত্র বুঝে বিয়ে দিক কিন্তু এভাবে অমতে বিয়ে দেওয়া অনুচিত। বিয়ে কেবল দু’টো পরিবারের মধ্যেকার বিষয় না। বরকনের মানসিক প্রস্তুতির একটা ব্যাপার আছে। সেদিক থেকে অনিমা এসবের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। তাছাড়া চঞ্চল, অভিমানী স্বভাব তার। বাবা-মাকে এখনো ক্ষমা করতে পারেনি সে। বিয়েই করেছে শুধু, সংসারের কোনো কাজকর্ম শেখা হয়নি কখনো। নিশ্চয়ই শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে সেই নিয়ে বেশ বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় তাকে। মনে মনে এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তানিয়া শেখ। অনিমার বাবা ক্ষীণ কণ্ঠে বলতে লাগলেন,
” তানিয়া আমার ভুল হয়েছে। এরকম হুট করে মেয়েটাকে বিয়ে নামক বেড়াজালে আঁটকে দেওয়া ঠিক হয়নি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আয়ান ভালো ছেলে। ওরা ঠিক সুখী হবে। ”
” আয়ান খারাপ ছেলে সেটা তো অনিমাও বলেনি। কিন্তু সবকিছুর একটা সময় আছে। অনিমার আরেকটু সময় দরকার ছিলো। যাইহোক, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন সবকিছু মানিয়ে নিয়ে চললেই ভালো হয়। আমরা বরং অনিমাকে না জানিয়েই ওর শ্বশুর বাড়ি চলে যাবো। ”
” সত্যি যাবে? ”
খুশিতে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সত্তার শেখের। তানিয়া হেসে বললেন,
” হ্যাঁ সত্যি! এখন খেয়ে নাও। খালি হাতে তো আর মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যাওয়া যায় না। ”
” সেসব নিয়ে তুমি ভেবোনা। সবকিছু কিনে ফেলবো আমি। ”
তানিয়া মুচকি হেসে খেতে লাগলেন, সাথে সত্তার শেখও। আসলে বাবা-মা সব সময় সন্তানের ভালো চান। তবে মাঝে মধ্যে সেই ভালো সন্তানের মনমতো হয় না। ফলশ্রুতিতে মা-বাবার সাথে সন্তানের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। আদতে সব বাবা-মা তাদের নিজেদের মতো করে সন্তানের মঙ্গল করতে চান।
বাসায় ফিরেই গোসল করতে ওয়াশরুমে ঢুকে বসে আছে অনিমা। বেলা চারটা ছুঁইছুঁই তবুও বের হওয়ার নামমাত্র নেই। আয়ান বেচারা কখন থেকে গোসল করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই মেয়ে তো বের হওয়ার নামই নিচ্ছে না! এমনিতেই অনিমার ওপর বেজায় বিরক্ত আয়ান তারপর এতক্ষণ ওয়াশরুমে ঢুকে বসে থাকায় মেজাজ খারাপ লাগছে ওর।
” অনিমা! এই অনিমা! এতক্ষণ লাগে গোসল করতে? ”
” এইতো হয়ে গেছে। আর পাঁচ মিনিট! ”
আধঘন্টা ধরে পাঁচ মিনিট, পাঁচ মিনিট করে যাচ্ছে অথচ পাঁচ মিনিট আর হচ্ছে না!
” তোমার পাঁচ মিনিট কি পঞ্চাশ মিনিটের সমান? তাড়াতাড়ি বের হও নয়তো…. ”
” কী করবেন? দরজা খুলে ভেতরে ঢুকবেন? আসুন, আসুন একসাথে গোসল করবো না হয়। ”
অনিমার কথায় চুপসে গেলো আয়ান। মেয়েটা মাঝে মধ্যে কীসব যে বলে! ধ্যাৎ!
” আমি দশ মিনিট পর আসছি। ততক্ষণে যা ইচ্ছে করে নাও। ”
চলবে,