এক পশলা প্রেম পর্ব-০৬

0
247

#এক_পশলা_প্রেম
#পর্ব_৬
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

ঠিক দশ মিনিট পর আয়ান ফের আসলো রুমে। কিন্তু ওয়াশরুমের দরজা এখনো বন্ধ! এতক্ষণ মন, মেজাজ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখন লাগামহীন হচ্ছে আয়ান।

” অনিমা? এই অনিমা? কী শুরু করলে তুমি? ”

আয়ানের কণ্ঠস্বর শুনে অনিমা দাঁত কেলিয়ে হাসছে। কী যে সুখ সুখ লাগছে। লোকটাকে জ্বালাতে জোশ লাগে। কিন্তু কতক্ষণ ওয়াশরুমে বসে থাকবে? এবার বের হতেই হবে। অনিমা এসব ভাবতে ভাবতে ওয়াশরুমের দরজা খুলে দিলো। আয়ানের রক্তচক্ষু দেখে অনিমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে। তবে সে খুব কষ্ট করে হাসি নিয়ন্ত্রণ করে নিলো। এই মুহুর্তে হাসা উচিত হবে না।

” ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছিলেন কেন? ”
আয়ান রাগ সামলাতে না পেরে অনিমাকে দেয়ালের সাথে ঠেসে ধরলো। আচমকা এমন ঘটবে ভুলেও ভাবেনি অনিমা। ভয়ে শুকনো ঢোক গিললো অনিমা। আমতা আমতা করে বললো সে,

” কী করছেন স্যার?”
” আমি ষাঁড় না?”
” জি না। মজা করেছি আমি। আপনি তো স্যার, নট ষাঁড়! ”
” মজা করেছ? আমি কি মজার পাত্র? জোকার মনে হয় আমাকে! ”
” না মানে না…. আসলে…..”

অনিমার হৃৎস্পন্দনের হার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওর চোখেমুখে আয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাসের আঁচ পড়ছে। দুই হাতে আয়ানের হাতের স্পর্শে কেমন এলোমেলো লাগছে। লজ্জায় চুপ করে গেছে মেয়েটা। অনিমার নীরবতায় কিঞ্চিৎ অবাক হলো আয়ান। যে মেয়ে উল্টো ওকে বিব্রত করার জন্য কাছাকাছি আসে, সে লজ্জা পাচ্ছে? আশ্চর্যজনক ব্যাপার। বিষয়টা বুঝতে কিঞ্চিৎ সময় লাগলো আয়ানের। ততক্ষণ এভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো দু’জন। মেয়েটা খুব দুষ্ট তবে নির্লজ্জ নয়। আয়ানের রাগ উবে গেছে। অনিমাকে কাবু করার পদ্ধতি পেয়ে গেছে সে।
” কী আসলে? আর করবে এমন? ”
” কী করছে..ন! ”

আয়ান ধীরে ধীরে অনিমার ঠোঁটের দিকে এগোচ্ছে। কী ঘটতে চলেছে ভেবে ওর চোখগুলো বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। আয়ানের ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসির ঝিলিক। অনিমা চোখমুখ খিঁচে দাঁড়িয়ে আছে।
” এরপর যদি আমাকে বিরক্ত করো তাহলে পরিণাম ভালো হবে না। ”

আয়ান এতটুকু বলে আচমকা অনিমাকে ছেড়ে দিলো। সহসাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল সে। ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেললো বারকয়েক। লোকটা তো মিচকে শয়তান! পেটে পেটে মহা শয়তানি। অনিমার দৃষ্টি উপেক্ষা করে আয়ান চটজলদি ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা আঁটকে দিলো। আপাতত অনিমাকে জ্বালানোর থেকে গোসল করা বেশি জরুরি।

পড়ন্ত বিকেল। বসার ঘরে সোফায় বসে ফোনে গেমস খেলছে সাকিন। এমন সময় কলিংবেলের শব্দে নড়েচড়ে উঠলো ও। গেমস খেলার সময় কোনো প্রকার বাধাবিঘ্ন ঘটলে মেজাজ খারাপ লাগে সাকিনের। আয়ান বাসায় নেই, অনিমা ঘরে বসে বই পড়ছে। আয়ানের বাবা গেছেন নিজস্ব কাজে। সেই হিসেবে আপাতত বাসায় সাকিন আর অনিমা ছাড়া কেউ নেই । তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোন রেখে বসা থেকে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো সাকিন।

” আঙ্কেল! আসুন, আসুন! ভেতরে আসুন আপনারা। ”
অনিমার বাবা-মাকে দেখে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটেছে সাকিনের। সত্তার ও তানিয়া মুচকি হেসে ঘরে প্রবেশ করলেন।

” এতো ব্যস্ত হতে হবে না। ”
” ব্যস্ত কোথায় হচ্ছি আঙ্কেল। আন্টি বসুন। কেমন আছেন আপনারা? ”

সোফায় বসলেন তানিয়া, সত্তার শেখ সাকিনের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন।

” আলহামদুলিল্লাহ বাবা। তুমি কেমন আছো? সবাই কি বাড়িতে নেই? কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। ”

অনিমার মায়ের প্রশ্নে সাকিন মুচকি হেসে বলে,

” আমি ভালো আছি। ভাবি আর আমি ছাড়া আপাতত বাসায় কেউ নেই আন্টি। ভাইয়া আর বড়ো আব্বু নিজেদের কাজে গেছে। আপনারা বসুন আমি ভাবিকে ডেকে আনছি৷ ”

সাকিন এ কথা বলে বসার ঘর থেকে প্রস্থান করলো। অনিমার বাবাও বসলেন সোফায়। আপাতত অপেক্ষা!

হুমায়ূন আহমেদের লেখা “ছেলেটা” উপন্যাস পড়ছে অনিমা। সাকিন দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে।
” ভাবি? আসবো? ”
সাকিনের গলা শুনে বইয়ের পাতা থেকে মুখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে দৃষ্টিপাত করলো অনিমা।
” হ্যাঁ এসো। তোমার আবার ঘরে ঢুকতে পারমিশন লাগে? ”
” না ভাবলাম বই পড়ছো সেজন্য। আঙ্কেল, আন্টি এসেছে। বসার ঘরে বসেছেন উনারা। ”
সাকিন ঘরে ঢুকে বললো। বাবা-মা আসার খবর শুনে খুশিতে বই ছেড়ে ছুঁড়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো অনিমা।
” ভালো করেছো। চলো যাচ্ছি আমি। ”
সাকিনের আগেই বসার ঘরে গিয়ে পৌঁছল অনিমা। বাবা-মা’র প্রতি মেয়েট যতই অভিমান থাকুক, চোখের সামনে দেখে সবকিছুই ভুলে গেছে সে। অনিমার বাবা-মাও মেয়েকে দেখে ভীষণ খুশি।

দুপুরবেলা। চারদিকে রোদের তাপে খা খা করছে। গতকালই বৃষ্টি তুমুল বৃষ্টি ছিলো অথচ আজ!

” যাই বলিস, অনিমা আমাদের থেকে কিছু একটা লুকচ্ছে। ”
অর্ষার কথায় সবাই বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। প্রণয় কিছু একটা ভাবছে। আলিফ অর্ষার কথার বিপরীতে বলল,
” আসলেই? ”
” কেন তোদের মনে হচ্ছে না, বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পর একটু অন্য রকম আচরণ করছে ও? ”
প্রিয়ন্তি মাথা নেড়ে বলল,
” হ্যাঁ ঠিকই বলেছিস। অনিমা তো আজ কলেজেও এলোনা। ”
” আয়ান স্যারও তো আসেননি কলেজে। ”
মাঝখানে কথা যোগ করলো আলিফ। অর্ষা বলে,
” ডাল ম্যে কুচ কালা হ্যে দোস্ত। ”
” হুম। কাল আসুক ভার্সিটিতে তারপর দেখি কী হয়েছে ওর! ”
প্রণয়ের কথায় সবাই চুপ করে রইলো। সবার মনেই তীব্র কৌতুহল জমেছে।

শ্বশুর শ্বাশুড়ির কথা রাখতে অনিমাদের বাসায় এসেছে আয়ান। গতকাল সত্তার শেখ আয়ানকে বারবার করে বলে এসেছিলেন। সেজন্য সকাল হতেই অনিমাকে নিয়ে এ বাড়ি এসেছে। কিন্তু আসা থেকে ঘরে বসে বসে বিরক্ত হচ্ছে। এভাবে ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগে?
” কী হয়েছে স্যার? দেখে তো মনে হচ্ছে বাড়িতে আরেকটা বউ রেখে এসেছেন। সেজন্য চোখেমুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট! ”
ঘরে ঢুকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েছে অনিমা। আয়ান চোখমুখ কুঁচকে অনিমার দিকে তাকিয়ে আছে। এই মেয়েটা কি একটু ঠিকঠাক মতো কথা বলতে পারে না?
” সোজা কথা বলতে পারো না তুমি? একটা বউ নিয়েই জীবন তেজপাতা তারপর আরেকটার প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে! ”
অনিমা মুচকি মুচকি হাসছে। আয়ান বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
” আচ্ছা বুঝলাম। খেতে চলুন। অনেক বেলা হয়েছে। মা ডাকছে খাওয়ার জন্য। ”
” আচ্ছা। বিকেলে একটু বাইরে বের হবো। আর হ্যাঁ কালকে কিন্তু বাসায় যাবো আমি। তুুমি কিছুদিন এখানেই না হয় থেকে যেও। ”

আয়ানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুধালো অনিমা,

” স্বামী যেখানে থাকবে স্ত্রী ও সেখানেই থাকবে। একা একা কোনো থাকাথাকি চলবে না। ”

আয়ানের হাসি পেলো ওর কথায়। এমন করে বলছে যেনো আর পাঁচটা স্বামীস্ত্রী’র মতো স্বাভাবিক সম্পর্কে আছে ওরা।

” বুঝলাম। চলো খেতে যাই। ”
” হ্যাঁ চলুন।”

দুপুরের খাবারের তালিকায় আছে ভাত, মুরগির মাংসের ঝোল, গরুর মাংস ভুনা, ইলিশ মাছ ভাজা, করলা ভাজি, মুসুরি ডাল। আয়ান নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে বসেই আছে। এতো খাবার একসাথে কীভাবে খাবে সেই নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে। এমনিতে আয়ান খাবার কম খায়। মেয়ে জামাইকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে তানিয়া শেখ সহাস্য মুখ করে বললেন,
” কী হয়েছে বাবা? খাবার সামনে নিয়ে বসে আছো কেনো? কোনো সমস্যা? ”
আয়ান নড়েচড়ে উঠলো একটু। মুচকি হেসে বললো,
” না আন্টি। এইতো খাচ্ছি। ”
আয়ান ধীরে ধীরে খেতে শুরু করেছে। অনিমার বাবা বললেন,
” এখনো আঙ্কেল, আন্টি বলে না ডেকে বাব-মা বলে ডাকা শুরু করো। ”
শ্বশুরের কথায় কিছুটা বিব্রত হলো আয়ান। আসলে হুট করে বাবা-মা ডাকটা আসেনি ওর। সেজন্য একটু সময় নিচ্ছিল। কিন্তু এখন যখন অনিমার বাবা বলেই ফেললেন আর তো সময় নেওয়া যাবে না।
” ঠিক আছে বাবা। ”
সত্তার শেখ মুচকি হাসলেন। অনিমা খাবার খাচ্ছে আর বাকিদের কথাবার্তা শুনছে৷ আপাতত কিছু বলবে না সে।

চলবে,