#এক_পশলা_প্রেম
#পর্ব_৭
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
ভোরের কোমল আলোয় ভার্সিটির ক্যাম্পাস যেন এক মায়াবী স্বপ্নপুরী। গাছের পাতায় শিশির ঝিকমিক করছে, আর পাখিরা মিষ্টি সুরে গান গাইছে। চারপাশে হালকা কুয়াশা আর সবুজের মিশেলে এক শান্তির আবহ। অক্টোবরের সকালের এই সৌন্দর্য কখনোই উপেক্ষা করা যায় না। ক্যাম্পাসের ভেতর অল্প কিছু ছাত্রছাত্রী ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে, তাদের পদক্ষেপে সকালের নির্জনতার সুর। ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে সোনালী আলো ঢুকে পড়ছে, আর সেই আলোর ছোঁয়ায় ক্যাম্পাস যেনো এক নতুন দিনের গল্পে জেগে উঠেছে।
আয়ানের কথামতো একদিন থেকেই বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর সাথে চলে এসেছে অনিমা। তাছাড়া আয়ানের দিকে ভার্সিটি বন্ধ করে এভাবে শ্বশুর বাড়ি বেড়ানোও তো কাজের কথা নয়। ভার্সিটির গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে আয়ান। অনিমা এরমধ্যেই ক্যাম্পাসে পৌঁছে গেছে। দু’জন একসাথে ভেতরে ঢুকলে কারো নজরে পড়তে পারে ভেবেই এই দূরত্ব অবলম্বন করা। অনিমাকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেখে প্রণয়, অর্ষা ও প্রিয়ন্তি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে।
” কী রে বান্ধবী ললিতা? কালকে কোথায় ছিলিস? ”
” বাবার বাড়ি গেছিলাম। ”
হুট করে কথাটা বলায় ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছে অনিমা। ওর চোখমুখের অবস্থা দেখে বাকিদের একটু খটকা লাগছে। অর্ষা হেসে বলে,
” বাবার বাড়ি? তারমানে কি এখন শ্বশুর বাড়ি থাকিস নাকি? হাহা! ”
অর্ষার কথায় অনিমাও হাসলো কিঞ্চিৎ। বিয়ে হয়েছে সেটা জানাজানি হলে সমস্যা নেই কিন্তু স্যারের সাথে বিয়ে হয়েছে কথাটা জানাতে চায় না অনিমা। আয়ানও এক কথাই বলেছে।
” আরে মজা করেছি। তোদের খবর কী? ”
ঘাসের ওপর বসলো চারজন। প্রিয়ন্তি বললো,
” আমাদের খবর ভালো। কিন্তু তোর কী হয়েছে বল তো! আমরা সবাই খেয়াল করছি, ক’দিন ধরে তুই অন্য রকম হয়ে গেছিস। ”
” কীসব বলছিস ভাই? অন্য রকম মানে কী? আমার কি এক্সট্রা হাত-পা গজিয়েছে? না-কি চোখের জায়গায় মুখ চলে গেছে? ”
অনিমা হেসে হেসে বললো কথাগুলো। এরমধ্যে আলিফও চলে এসেছে। প্রণয় বেশ গম্ভীর হয়ে বলল,
” কী হয়েছে সেটা আমাদের থেকে তুই ভালো জানিস অনিমা। দেখ, আমরা তোর ভালো চাই। তুই হাসিখুশি থাকলে আমাদেরও ভালো লাগে। কিন্তু ইদানীং কেমন লাগে তোকে। মনে হয় কিছু একটা লুকিয়ে যাচ্ছিস। মানুষ কোনোকিছু তখনই লুকায় যখন সেই বিষয়টা নিয়ে সে কারো সাথে বলতে চায় না। যা বললে তার সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে এমন কিছু। আর লুকিয়ে রাখা মানেই মানসিক অশান্তি। ”
দীর্ঘশ্বাস ফেললো অনিমা। সত্যি বলতে আয়ানের সাথে বিয়ে করে অসুখী না হলেও সুখীও হয়নি। কারণ এভাবে জোর করে বিয়েতে কেউ খুশি হয় না। হ্যাঁ সময়ের সাথে সাথে সঙ্গীর সঙ্গে এক ছাদের নিচে থাকলে হয়তো সম্পর্কে প্রাণ সঞ্চার হয়, তবে সেটা তো পরের বিষয়।
” অনিমা! বল না কী হয়েছে? ”
প্রিয়ন্তি আবারো জিজ্ঞেস করলো। অনিমা লম্বা নিঃশ্বাস ফেললো।
” বিষয়টা তেমন কিছু না। আমার বিয়ে হয়ে গেছে।”
” কী!”
ওরা সবাই প্রায় একসাথে বলে উঠলো। অনিমা মুচকি হাসলো।
” অবাক হতে হবে না। আমি নিজেও জানতাম না আমার বিয়ে হবে। ”
” বিষয়টা একটু ক্লিয়ার করে বল ভাই। সবকিছু ঘেঁটে যাচ্ছে। ”
” বলছি!”
সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অনিমা একটু থেমে আবার বলতে লাগলো,
” বাবার বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে যাবো বলেছিলাম না? ওখানে গিয়েই আমার জীবনটা তেজপাতা হয়ে গেছে। কনে পালিয়ে গেছিল বলে সুযোগ্য পাত্র পেয়ে আমাকে তার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন আমার বাবা। উনার বন্ধু খুব করে অনুরোধ করেছিলেন। ছেলে বিয়ে না করে গেলে বিষয়টা কেমন না-কি দেখাতো। কী অদ্ভুত কথাবার্তা তাই না? যাকে বলে পাগলের কাজকর্ম!”
” সবই বুঝলাম কিন্তু তোর বরটা কে?”
অর্ষার প্রশ্নের উত্তরের আশায় সবাই অনিমার দিকে তাকিয়ে আছে। দূরে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। ক্লাস না করে গোল হয়ে বসে আড্ডা দেওয়ার বিষয়টা মোটেও ভালো লাগছে না তার। আজকে বাড়ি ফিরুক তারপর অনিমাকে মজা বোঝাবে ভেবে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো আয়ান।
” এই অনিমা বল? ”
অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো প্রণয়। সবাই যেনো উত্তরটা জানেই। তবুও শিওর হতে চায়।
” ওই যে ভদ্রলোক গটগট করে হেঁটে যাচ্ছে? আয়ান চৌধুরী! উনিই সেই লোক যে পাত্রীর মুখ না দেখেই বিয়ে করে বড়সড় একখানা বাঁশ খেয়েছে। ”
অনিমার কথায় ওঁরা চারজন নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। বিষয়টা হজম করতে মিনিট পাঁচেক সময় লাগলো সবার।
” কী ঝটকা দিলি মামা! তলে তলে টেম্পু চালাচ্ছিস আর আমাদের বললিও না? ”
প্রণয়ের কথায় হাসল সবাই। অনিমা মুখ ভেংচি কেটে বলে,
” ওই টেম্পু চালাচ্ছি কোথায়? আমি কি প্রেম করতেছি? বেটা বিয়ে করে ফেলেছি। বোঝেও না, সবগুলো আহাম্মক। ”
” হ হ আমরা আসলেই আহাম্মক। নয়তো স্যার আর ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেল আর আমরা বেচারারা টেরও পেলাম না। ”
অর্ষার কথায় সবাই হাসতে লাগলো……..
বাসায় আসা থেকেই অনিমার কাছে আয়ানকে বেশ অন্য রকম গম্ভীর লাগছে। কথাবার্তা বলছে না সাথে কেমন করে তাকাচ্ছে। দুপুরে গড়িয়ে বিকেল হলেও আয়ানের আচরণের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না দেখে সরাসরি কথা বলবে বলে ভাবে অনিমা।
” সাকিন তোমার ভাই কোথায়? ”
বসার ঘরে সোফায় বসে ফোনে ফ্রি ফায়ার গেমস খেলছে সাকিন। অনিমার আগমনে নড়েচড়ে উঠলো সে।
” ভাইয়া তো একটু আগেই বের হলো। ”
” বের হলো? কোথায় গেল? ”
” ভাবি! তোমার বর কোথায় যায় কাউকে কি বলেকয়ে যায় বলো? তুমিই কল করে জিজ্ঞেস করে নাও, কোথায় আছে। ”
সাকিন কথা শেষ করে আবার ফোনের স্ক্রিনে মনোযোগ দিলো। অনিমা আয়ানের কথা ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরেই গেলো আবার। কল করবে কি-না সেই নিয়ে দোটানায় আছে। রুমে ঢুকে হাঁটতে হাঁটতে জানালার পাশে দাঁড়িয়েছে অনিমা। পরনে তাড কালো রঙের থ্রি-পিস, এলোমেলো খোলা চুলগুলো জানালা থেকে আসা মৃদু বাতাসে একটুআধটু নড়ছে। কানে ছোটো সোনার দুল, নাকে খুব ছোটো একটা ডায়মন্ড কাট নাকফুল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে গিয়ে হঠাৎ সামনের কনস্ট্রাকশনের সামনের খোলা জায়গায় দৃষ্টিপাত করলো অনিমা। কিছু ছেলেপেলে ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত। সব ছেলেদের মধ্যে সাদা রঙের টি-শার্ট পরা আয়ানকে দেখে চমকাল মেয়েটা। এমনিতে আয়ান কখনো ক্রিকেট খেলতে যায় না। আজ হঠাৎ গেলো ভেবেই অবাক হচ্ছে অনিমা। আনমনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ করে মনে হলো আয়ানও ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখল আসলেই আয়ান জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। বিষয়টা বুঝতে পেরে জানালার পাশ থেকে সরে দাঁড়াল অনিমা। কী হলো বুঝতে পারছে না। আয়ান কি কোনো কারণে ওর ওপর অভিমান করলো? না-কি রাগ করেছে? নিজের ভাবনার ওপর বিরক্ত হচ্ছে অনিমা। আয়ানের সাথে ওর তেমন কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়নি যেখানে মান-অভিমানের প্রশ্ন আসতে পারে। তারমানে লোকটা রাগ করেছে। কিন্তু কেনো?
” আবু ভাই! কী করছো? ”
ঘরে ঢুকে আচমকা দরজা আঁটকে দেওয়ায় চমকে উঠে বললো অর্ষা। আবরিশাম অর্ষার ভয় পাওয়া দেখে মুচকি মুচকি হাসছে। অর্ষা বিছানায় বসে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
” তোকে কতবার বলেছি আমাকে আবু ভাই বলে ডাকবি না? কল মি জান, সোনা অর আবরিশাম। ওকে বেবস? ”
আবরিশাম অর্ষাকে শুইয়ে দিয়ে নিজেও পাশে শুয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বলল। অর্ষা ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে বললো,
” তুমি যে কেন এমন করো বুঝি না আবু ভাই। কবে জানি বাবা-মা সবকিছু বুঝে ফেলে। ”
” বুঝলে সমস্যা কী? এমনিতেই তো কয়েকদিন পর বলে দিবো। তুই ওসব বাদ দে আর একটা গরম গরম চুমু দে এখানে। ”
ঠোঁটে ইশারা করলো আবরিশাম। অর্ষা চোখ পাকিয়ে তাকাল তারপর শোয়া থেকে উঠে বসলো। সম্পর্কে মামাত ফুপাতো ভাইবোন। প্রায় বছরখানেক পর আবরিশাম মামার বাড়ি বেড়াতে এসেছে। আগে অবশ্য ঘনঘন আসাযাওয়া করতো। কিন্তু অর্ষার সাথে সম্পর্কে যাওয়ার পর থেকে এ বাড়িতে যাতায়াত কমিয়ে দিয়েছে সে।
” আরে কোথায় যাচ্ছিস? বললাম কী? ”
অর্ষা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালে আবরিশামও উঠে ওর হাত ধরে ফেললো। অর্ষা পিটপিট করে তাকিয়ে আছে।
” বললে গরম গরম চুমু দিতে। সেজন্য তো আগে ঠোঁট গরম করতে যাচ্ছি আবু ভাইইইই! ”
অর্ষা ফিক করে হেসে উঠলো। আবরিশাম হেঁচকা টানে ওকে কোলে বসিয়ে ফেলে বলে,
” গরম করার দরকার নেই। তুই এমনি যথেষ্ট গর….”
আবরিশাম কথা শেষ করার আগেই দরজায় কেউ নক করে। চমকে উঠে ওরা দুজন। অর্ষা ভয়ে আমতা আমতা করে বললো,
” কতবার মানা করি, এভাবে দরজা আঁটকে ঘরে ঢুকবে না! কে শোনে আমার কথা? এখন দেখো কী হয়। ”
চলবে,