এক পশলা প্রেম পর্ব-০৮

0
209

#এক_পশলা_প্রেম
#পর্ব_৮
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

জীবনে প্রথম আয়ানের জন্য অপেক্ষা করছে অনিমা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল তবুও বাসায় ফিরলো না লোকটা। কী এমন হলো যে এতো মানঅভিমান! ঘরে পায়চারি করছে অনিমা। এরমধ্যেই দরজা খুলে রুমে ঢুকল আয়ান। অনিমা তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে তার দিকে এগিয়ে গেলো।

” আজকে আপনার কী হয়েছে স্যার? কেমন হুতুম পেঁচার মতো মুখ করে রেখেছেন! ”

অনিমার দিকে তাকাল আয়ান। মেয়েটা কী অবলীলায় বলল কথাগুলো। কোনো ভয়ডর নেই!

” আমি হুতুম পেঁচা? ”
” না মানে…..”
” তোমার বন্ধু কী জানি নাম? ওহ হ্যাঁ প্রণয়! তার সাথে ফোনে কথা হয়? ”

” প্রণয় আসলো কোথা থেকে! ”

আয়ান তোয়ালে হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগোলো। অনিমা পেছন পেছন যাচ্ছে।

” কী হলো? বলুন। ”

” কিছু না। সরো ফ্রেশ হবো। ”

আয়ান অনিমার দিকে না তাকিয়েই বললো। অনিমা হুট করে ওর সামনে দাঁড়িয়ে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,

” আপনার আজ কী হয়েছে বলুন তো! কেমন পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি মনে হচ্ছে। ”

আয়ান অনিমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলো। কিন্তু অনিমা আবারও পথ আটকে দাঁড়িয়েছে।

” মোটেও না! তুমি কি পণ করেছো আমাকে ওয়াশরুমে যেতে দিবে না?”
” চলুন একসাথে যাই!”
” হোয়াট! ”
” ইয়েস স্যার। ”
আয়ান অনিমার হাত ধরে সরাতে গেলে অনিমা চট করে আয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে। লোকটা চমকাল, থমকাল তার স্ত্রী’র আচরণে।
” কী করছো? ”
” গলা জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছি। ”
” সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। ”
” রাগ করেছেন কেনো? ”
” কই! ”
” আমি কি বাচ্চা না-কি? ”
” না বুড়ি। ”
আয়ান একটু বিরক্ত হচ্ছে। সারা শরীরে ঘাম সেঁটে আছে। এই অবস্থায় শাওয়ার না নিলে কিছু ভালো লাগবে না। তাই একপ্রকার জোর করেই অনিমাকে ছাড়াল।
” আমি কিন্তু রাগ করবো। ”
অনিমা মুখ গোমড়া করে বললো। আয়ান হেসে বললো,
” যে রাগ করে সে বলেকয়ে করে না। গোসল সেড়ে আসি তারপর কথা হবে। ”

কী হলো কে জানে? আয়ানের হাসি মুখটা দেখে অনিমা চুপ করে গেছে। ওয়াশরুমে ঢুকে দীর্ঘশ্বাস ফেললো আয়ান। কী হয়েছে ওর? অনিমার সাথে ওর বন্ধু কথা বলেছে বলে কেনো রাগ হয়েছিল? আর এখন অনিমার কথা বলার পর মনটা এমন উড়ুউড়ু কেন করছে? অদ্ভুত!

বসার ঘরে কাচুমাচু ভঙ্গিতে এককোনায় দাঁড়িয়ে আছে অর্ষা। আবরিশাম বসে ওর মামা অর্থাৎ অর্ষার বাবার সাথে কথা বলছে। কিছুক্ষণ আগে বন্ধ দরজার ভেতরে দু’জনকে দেখে ফেলেছে অর্ষার মা। তারপর থেকে ঝামেলা। যদিও অর্ষা বলেছিল এমনি কথা বলছিল ওরা, তবে সেসব কেউ বিশ্বাস করেনি। আবরিশাম নিজে থেকেই সবকিছু বলে দিয়েছে। ছেলে হিসেবে আবরিশাম পারফেক্ট। সমস্যা হলো অর্ষার বাবা আত্মীয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্কে যেতে চাননা। তবুও আবরিশাম সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। অর্ষা বাবা-মায়ের বড়ো মেয়ে। মা-বাবা, আর একটা ছোটো ভাই নিয়ে অর্ষার পরিবার। অন্যদিকে, আবরিশাম বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে।

” মামা প্লিজ ট্রাই টু বি আন্ডারস্ট্যান্ড, আমি তো বাইরের কেউ না! তোমার কি মনে হয় অর্ষাকে আমি ভালো রাখতে পারবোনা? ”

অর্ষার বাবা ফালাক মল্লিক বেজায় বিরক্ত হচ্ছেন। বোনের ছেলে বলে কিছু বলতেও পারছে না। অন্য কোনো ছেলে হলে এতক্ষণে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিতেন।

” দেখো আবরিশাম, আমি চাচ্ছি না এসব নিয়ে আর কথা হোক। আমি খুব শীঘ্রই অর্ষার বিয়ে দিবো। আশা করি তুমি কোনো ঝামেলা সৃষ্টি করবে না। ”
” বিয়ে? মামা! শোনো, তুমি চাইলেই অর্ষা অন্য জায়গায় বিয়ে করে নিবে। কিন্তু ওর মুখে হাসি থাকবে না। আমিও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবোনা। তোমার চোখের সামনে আমরা অসুখী হয়ে ঘুরবো, সেটা সহ্য করতে পারবে বলো? ”

অর্ষার মা ফরিদা এরমধ্যে মেয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সত্যি বলতে ওদের সম্পর্ক নিয়ে ফরিদার কোনো আপত্তি নেই। শুধু অর্ষার বাবাই বেঁকে বসে আছেন।

” তুমি এখন এসো আবরিশাম। আমি এ বিষয় কোনো কথা বলতে চাচ্ছি না। তোমার মা’কে বলবে দ্রুত তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করতে। যে যার মতো সংসারী হয়ে গেলেই সব সমস্যা মিটে যাবে। ”

ফালাক মল্লিক এক মুহুর্ত কালবিলম্ব না করে বসার ঘরে থেকে চলে গেলেন। আবরিশাম রাগে সোফায় ঘুষি মারলো। অর্ষার চোখ ছলছল করছে। ফরিদা আবরিশামের কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললেন,

” তুমি এখন বাড়ি যাও। তোমার মামার মাথা গরম এখন। ”

আবরিশাম হুট করে মামির হাত ধরে অনুনয় করার ভঙ্গিতে বললো,
” মামি তুমি প্লিজ মামাকে বোঝাও। অর্ষার দিকে খেয়াল রেখো। আমি আসছি। ”

ফরিদা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। আবরিশাম অর্ষার দিকে একনজর তাকাল। তারপর বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো।

” সারাক্ষণ ফোন টেপা ছাড়া অন্য কোনো কাজ নেই তোর? ”
রাতের খাওয়াদাওয়া শেষে বসার ঘরে বসেছে আয়ান। পাশেই সাকিন বসে গেমস খেলছে। অনিমা এঁটো থালাগুলো জড়ো করে রাখতে ব্যস্ত। মোটামুটি সংসারী হয়ে গেছে সে। আতিক চৌধুরী খাওয়া শেষে নিজের ঘরে চলে গেছেন।
” তুমি থাকতে আমার আবার কীসের কাজ বলো তো? ”
সাকিন ফোনের স্ক্রিনে তাকানো অবস্থায়ই প্রশ্নের জবাবের বদলে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বসলো। আয়ান সাকিনের কান ধরে টান দিতেই ” আউচ” জাতীয় শব্দ করে উঠলো সাকিন।
” বিয়েটা তো আমি করবোনা। ফোনের স্ক্রিনে না তাকিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখ, কোনো মেয়ে পছন্দ হয় কি-না। ”
” উফ ভাইয়া! লাগছে তো। ”

” কী হয়েছে এখানে? স্যার আপনি সাকিনের কান ধরে আছেন কেনো! ”

অনিমার আগমনে নড়েচড়ে উঠলো আয়ান। সাকিনকে ছেড়ে দিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
” সেটা সাকিন ভালো করে জানে। বাই দ্য ওয়ে, আমি রুমে গেলাম। ”
আয়ান চলে যাওয়ার পর সাকিন জোরে জোরে হাসতে লাগলো।
” বুঝলে ভাবি কুচ কুচ হোতা হ্যে….”
” এটা তো একটা গান। ”
” কিছু না। আমিও রুমে যাচ্ছি শুভ রাত্রি ভাবি। ”

সাকিনও চলে গেলো। শুধু অনিমা বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলো। এদের দুই ভাইয়ের হাবভাব বোঝা মুশকিল!

” বাতি অফ করো। ”

বিছানায় শুয়ে ফোন টিপছে আয়ান। অনিমা বই পড়ছে। একাডেমিক বই নয়, উপন্যাস।

” আপনার ঘুম পেয়েছে? ”
” না। তবে আলো সহ্য হচ্ছে না। ”
” তা হবে কেন? আপনি তো রাক্ষস, ভ্যাম্পায়ার এসবই৷ ”

আয়ান ফোন বিছানায় রেখে বিছানা ত্যাগ করে হুট করে ঘরের বাতি নিভিয়ে দিলো। অনিমা অবাক হয়ে ওর কাজকর্ম দেখছে।

” কী হলো এটা? ”

বই পড়ায় বিঘ্ন ঘটায় অনিমা ফের কথা বলতে লাগলো। আয়ান তেড়ে এসে অনিমার সামনে কিছুটা ঝুঁকে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
” বই পড়তে হলে প্রণয়ের বাসায় গিয়ে পড়ো। আমি ঘুমাবো। সো এখন ঘরে কোনো বাতি জ্বলবে না। ”

” সবই বুঝলাম। কিন্তু এরমধ্যে প্রণয় আসলো কোথা থেকে? ”

আয়ান বিছানায় শুয়ে আবারও হাতে ফোন নিলো। শান্ত কণ্ঠে বললো,

” কিছু না। ঘুমাচ্ছি। ”

ফোন রেখে বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে ফেললো আয়ান। অনিমা কিছুতেই বুঝতে পারলো না সব কথার মধ্যে প্রণয় কীভাবে ঢুকল?

ভোরের আলো ফুটেছে চারদিকে। ব্যস্ত শহরের মানুষগুলোও তাদের দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। অর্ষা আজ ভার্সিটিতে আসেনি। সেই নিয়ে আলোচনা করছে প্রণয়, প্রিয়ন্তি, আলিফ। অনিমা এখনো এসে পৌঁছেনি। তবে প্রিয়ন্তি কল দিয়ে জেনেছে , পথে আছে ও।

” অর্ষার বাসায় সম্ভবত কোনো ঝামেলা হয়ে গেছে। গতকাল থেকে ফোনেও পাচ্ছি না মেয়েটাকে।”

প্রিয়ন্তি বলল, বাকিরা বেশ দুশ্চিন্তা করছে।

চলবে,