এক পশলা প্রেম পর্ব-০৯

0
190

#এক_পশলা_প্রেম
#পর্ব_৯
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত।

” অর্ষার বাসায় সম্ভবত কোনো ঝামেলা হয়ে গেছে। গতকাল থেকে ফোনেও পাচ্ছি না মেয়েটাকে।”

প্রিয়ন্তি বলল, বাকিরা বেশ দুশ্চিন্তা করছে। ওঁরা পাঁচজন একে অন্যের বিপদেআপদে, সব সময় পাশে থাকে। একজনের কিছু হলে সবাই অস্থির হয়ে যায়। প্রিয়ন্তির কথা শেষ হতেই অনিমাও ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছে। আলিফ দূর থেকে ওর দিকে দৃষ্টিপাত করে দেখল, দ্রুত হেঁটে এদিকেই এগিয়ে আসছে অনিমা ।

” কী হয়েছে কিছু জানিস? ”
” না রে প্রণয়। ”
” তবে আমি যতদূর জানি ওর রিলেশনশিপ নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। ওর কাজিন ব্রাদারের সাথে রিলেশন তো সেজন্য। ”
অনিমা প্রিয়ন্তির পাশে বসে বললো । অনিমার কথায় সবাই একটু হলেও নিশ্চিত হয়েছে, অর্ষার শরীর খারাপ হয়নি। এমনিতে ঠিকঠাক আছে।

ওদের কথাবার্তার চলাকালীন সময় আগের দিনের মতো আয়ান আজকেও দূর থেকে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে। কী মনে করে যে দাঁড়িয়ে আছে সেটা নিজেও বুঝতে পারছে না আয়ান।

” গুড মর্নিং স্যার। ”
” মর্নিং! ”
ছাত্রছাত্রীদের কথায় হুঁশ ফিরলো আয়ানের। এদিকে অনিমার নজর পড়ার আগে সরে যেতে হবে ভেবে আর দাঁড়াল না আয়ান। কিন্তু অনিমার সাথে প্রণয়ের কথা বলার বিষয়টা একটুও ভালো লাগে না ওর। কেমন মেজাজ খারাপ খারাপ লাগে। অথচ প্রণয় যে অনিমার খুব ভালো বন্ধু সেটা আয়ানের অজানা নয়।

দু’দিন পেরিয়ে গেছে। এরমধ্যে ফালাক মল্লিক তার বোন ফাতিমাকে আবরিশাম ও অর্ষার সম্পর্কের কথা বলেছেন। যদিও আবরিশাম আগে থেকেই ওর মা’কে সবটা বলে রেখেছিল। অর্ষাকে অপছন্দ করার কোনো কারণ নেই। আবরিশামের বাবা-মা অর্ষাকে খুব ভালোবাসেন। সেজন্য ফাতিমা নিজেও ভাইয়ের কাছে ছেলের ভালোবাসার জন্য অনুরোধ করেছে। প্রথম প্রথম অর্ষার বাবা একবাক্যে “ না” করছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে স্ত্রী ও বোনের জোড়াজুড়িতে রাজি না হয়ে আর পারেননি। পরিশেষে, অর্ষা ও আবরিশামের বিয়েতে রাজি হয়েছেন ফালাক। দুই পরিবারের সম্মতিতে শীঘ্রই বিয়ে হবে ওদের।

প্রিয় বান্ধবীর বিয়ের খবর শুনে খুব খুশি হয়েছে অনিমা। রাতের খাওয়াদাওয়া শেষে রুমে বসে ফোনে কথা বলছে ও।
” হে হে! অর্ষা এবার তোরও ব্যান্ড বাজবে। ”
” তা ঠিক বলেছিস। জানিস আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, বাবা বিয়েতে রাজি হয়ে গেছেন! ”

ঘরে ঢুকে অনিমাকে ফোনে কথা বলতে দেখে কপাল কুঁচকে ফেললো আয়ান। কার সাথে কথা বলছে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছে। অনিমা অর্ষার কথায় হেসে বলে,
” অবিশ্বাস্য হলেও তো এটা সত্যি! এই শোন, তোর বিয়েতে কিন্তু আমি আয়ান স্যারকে নিয়েই যাবো। ”

আয়ানের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ্পনী কাটল অনিমা। ফলশ্রুতিতে বিষম খেলো আয়ান। স্যারের অবস্থা দেখে অনিমা ঠোঁট টিপে হাসছে। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে অর্ষা হেসে বললো,

” অবশ্যই! স্যার স্যার না ডেকে এখন থেকে জামাই বলে ডাক, বুঝলি? ”
” হু কচু! ”
” আচ্ছা এখন রাখছি। কাল দেখা হবে। ”
” ওকে, টাটা। ”
” টাটা! ”

অর্ষা কল কাটতেই আয়ান অনিমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললো,
” এরকম চোখ টিপ্পনী দেওয়া কী ধরণের অসভ্যতা? ”
অনিমা হুট করে আয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল। নাকে নাক ছুঁইয়ে বললো,
” স্বামীস্ত্রী’র মধ্যে আবার অসভ্যতা কী, হ্যাঁ? ”
” কেউ মনে হয় আমাকে স্বামী বলে মানে! ”

অনিমা মুচকি হাসলো। আয়ান মুখ গোমড়া করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

” আচার-আচরণেও কি বোঝেননা মানি না-কি মানি না? ”
” এতশত বুঝি না আমি। প্রণয় হয়তো বোঝে। ”

অনিমা আয়ানকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসলো। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে আছে আয়ান। অনিমা গলা জড়িয়ে থাকলেই তো হতো! ছাড়ল কেন?

” সব সময় প্রণয়কে নিয়ে টানাটানি কেন করেন? এতো জেলাস!”
” জেলাস! ”
” অবশ্যই জেলাস। ”

আয়ান আরেকটু এগোল অনিমার দিকে। দু’জন দুজনার খুব কাছাকাছি বসে আছে ।

” জেলাস হচ্ছি সেটা বুঝতে পারছ, কেন হচ্ছি সেটা বুঝতে পারছো না? ”

অনিমা ভেংচি কেটে অন্য দিকে ঘুরতে গেলে আয়ান ওর কাঁধে হাত রেখে নিজের দিকে টেনে বসালো।
” উত্তর না দিয়ে অন্য দিকে ফিরছ কেন? ”

” যে প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই জানেন সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কি কোনো প্রয়োজন আছে স্যার? ”

আয়ান এক ঝটকায় অনিমাকে ধরে কোলে বসাল। চমকাল, থমকাল অনিমা। লজ্জায় আড়ষ্ট হলো কিছুটা।

” ভার্সিটিতে স্যার ডাকো ঠিক আছে কিন্তু বাসায় বসেও ডাকতে হবে? ”
” কী করছেন! ছাড়ুন। ”
কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বললো অনিমা। আয়ান ওর লজ্জা মাখা মুখটা দেখে হাসছে। এক হাত অনিমার কোমরে রেখে অন্য হাত ওর থুতনিতে রেখে মুখটা একটু উঁচু করে ধরলো আয়ান।

” এমনিতে তো নিজে থেকেই কাছে আসো, এখন আমি কাছে টানলাম বলে লজ্জা পাচ্ছ! নট ব্যাড! একটু লজ্জা থাকা ভালো। ”

অনিমার অস্থির লাগছে। কেমন জানি সবকিছু এলোমেলো লাগছে। এই প্রথম কোনো পুরুষের এতে কাছাকাছি এসেছে ও। তা-ও সেই পুরুষ যার ওপর পূর্ণ অধিকার আছে। হঠাৎ লোডশেডিং হওয়ায় চমকে উঠল অনিমা। কারেন্ট এখুনি যেতে হলো? অনিমার নীরবতায় আয়ান আরেকটু এগোল। তমসার মাঝেই ওষ্ঠে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো সে। কেঁপে উঠল অনিমা। কিন্তু বাঁধা দিলো না। কিছুক্ষণ পর হাঁপাতে লাগলো মেয়েটা। আয়ান এই ফাঁকে প্রিয়তমার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়েছে। অন্ধকার রুমে দু’জন নরনারীর ভারী নিঃশ্বাস ব্যতীত অন্য কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। রাতের নিস্তব্ধতা যত গভীর হচ্ছে দুজনের নিঃশ্বাসের ঘনত্বও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শুক্রবার দিন। সকাল গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলো তবুও আয়ানের ঘুম শেষ হলোনা। বারোটায় ঘুম থেকে উঠে কোনোরকমে ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে এসে দু’টো খেয়ে আবার ঘুম! আসরের আজান দিচ্ছে। অনিমা বারান্দায় বসে বই পড়ছে। সকালবেলা অর্ষার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। পনেরো দিন পর ওদের বিয়ে। পরশু থেকেই কেনাকাটা শুরু করবে। অর্ষা বারবার করে বলে দিয়েছে অনিমাকে ওর সাথে থাকতেই হবে।

” রাত হয়ে গেছে? ”
ঘুম ঘুম চোখে শোয়া থেকে উঠে বসে শুধালো আয়ন। অনিমার ভাবনার অবসান ঘটেছে ওর কথায়।
” না। তবে আর দেড় ঘন্টা ঘুমালে রাত হবে। ঘুমাবেন? ঘুম পাড়িয়ে দেই? ”
অনিমার কথায় ফিক করে হেসে উঠলো আয়ান। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা থেকে উঠে অনিমার দিকে এগোচ্ছে সে।
” আরেকটু মিষ্টি দাও, খাই। রাতে যে মিষ্টি দিলে! ঘুমের আর দরকার নেই। ”
অনিমাও বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
” আমি কি মিষ্টি বিক্রি করি? ”
” নাহ। তুমি নিজেই তো আস্ত একটা মিষ্টি। ”
” হয়েছে, হয়েছে। এতো বলতে হবে না। যান নামাজ পড়ে আসুন। ”
আয়ান অনিমার কোমরে হাত রেখে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেললো। চোখে চোখ রেখে বললো সে,
” সে তো যাবোই আগে একটা…… ”
আয়ান ঠোঁটের দিকে ইশারা করে বললো। অনিমা মুখ ভেংচি কাটলো শুধু।
” কী হলো? দাও…..”
” উঁহু! ”
” ঠিক আছে। আমিই নিয়ে নিচ্ছি। ”
অনিমা কিছু বলতে যাবে তার আগেই ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো আয়ান। বেচারি অনিমা আর কথা বলার ফুরসত পেলো না।

” তারপর? কেমন লাগছে আবু ভাই? ”

আবরিশাম কল দিয়েছে। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে অর্ষা ।

” তুই আগে আবু ভাই বলা বন্ধ কর প্লিজ!”

অর্ষা শব্দ করে হাসলো। আবরিশাম চোখমুখ কুঁচকে ফেললো তাতে।

” আগে তোমার চেহারার নকশা ঠিক করো। নিশ্চিত এখন বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে আছো। ”

অর্ষার কথা শুনে চোখমুখ স্বাভাবিক করে ফেললো আবরিশাম। ও কীভাবে বুঝলো?

” হুঁশ! পিপীলিকার পাখা গজায় কীসের জন্য জানিস তে? যত পারিস উড়তে থাক। বিয়েটা হোক, মজা বোঝাবো। ”

” ওমা! মজা কি আমি একা বুঝবো? তুমি বুঝবে না? ”
” আরে বোকা এটা অন্য মজা। বিয়ের প্রথম রাত? হাহাহা। ”

আবরিশাম এটুকু বলেই জোরে হাসতে লাগলো। দ্রুত কল কেটে দিলো অর্ষা। মেয়েটা বিব্রতবোধ করছে । মনে মনে বেজায় বকাবকি করছে আবু ভাইকে। লোকটা কী বজ্জাত! কী বজ্জাত! আবরাশিম বিষয়টা বুঝতে পেরে আরো বেশি করে হাসছে। প্রিয় মানুষকে নিজের করে পাওয়ার মতো সুখ সবার কপালে থাকে না। আবরিশামের কপালে সেই সুখ আছে বলেই তার এতে আনন্দ।

চলবে,