এ শহরে বৃষ্টি নামুক পর্ব-১৪+১৫

0
1356

#এ_শহরে_বৃষ্টি_নামুক❤️
#লেখিকা_মালিহা_খান❤️
#পর্ব-১৪

রাত্রির ঠোঁটজোড়া থরথর করে কেঁপে উঠলো।চোখের কোঁণ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা বিশ্রি অনুভূতি।এত যন্ত্রনা কেনো ছিলো এই কন্ঠটায়?সে তো বলেনি ভালোবাসতে।তবে কেনো এত দায়ভার?কেনো সে অভিযুক্ত হবে অন্যের ভালো না থাকার কারণ হিসেবে।গলাটা না চাইতেও ভিজে গেলো।কম্পমান কান্নাদের নিয়েই সে ব্যাথায় ফেটে পড়া কন্ঠে বললো,
—“কেনো এমন করছেন?”

নিভ্রান তখনো অবিচল,স্হির দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে রাত্রির নতজানু মুখের দিকে।চোখের পানিরগুলোর আঘাতে ভেতরটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলেও বাইরে সে শক্তপাথর।কি ভেবেছে মেয়েটা?তাকে কষ্টে রেখে,তার থেকে পালিয়ে বেরিয়ে দুদন্ড চোখের পানিতেই অভিমান গলে যাবে।না তো,এতো সোজা না।আগের মতোই দাম্ভিকতায় মোড়ানো কন্ঠ,”আমি করছি না আপনি করছেন?”

রাত্রি একহাতে পানিটা মুছে নিলো।নাকের ডগা টকটকে লাল।ঠোঁট ফুলে গেছে অনেকটা।নিভ্রানের চোখে চোখ রাখতেই যেন সাজানো গোছানো কথাগুলো চট করে কন্ঠনালি থেকে ধুলিসাৎ হয়ে গেলো।কি আশ্চর্য!এ কেমন মায়া?কেমন ছলনা?নেতিয়ে গেলো সে।ছলকে উঠা ক্রদনে সিক্ত হয়ে বললো,
—“দয়া করুন,সবাই তাকিয়ে আছে।”

নিভ্রান আশেপাশে তাকালো।ফুটপাতের চায়ের দোকান থেকে দুটো লোক হাসাহাসি করছে।বাকিরা চুপটি করে মজা দেখছে।চোখগুলো জ্বলজ্বল।একমূহুর্ত না ভেবে সে পরিষ্কার গলায় হাঁক ছাড়লো,
—“আমার বউ চাচা,রাগ করে রাতের বেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে।”

লোকগুলোর যেনো ভরা আড্ডায় ভাটা পড়লো।এতক্ষণ হয়তো ঠাট্টা লুটছিলো।কোনরকমে চোখ লুকিয়ে তারা নিজেদের কাজে মনোযোগী হলো।রাত্রি চাপা স্বরেই চেঁচিয়ে উঠলো,
—“আপনি তামাশা পেয়েছেন?”

নিভ্রান প্রশ্নের উওর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না।ভূত গ্রস্থ গতিতে রাত্রিকে টানতে টানতে সামনে এগিয়ে চললো।কপালের রগগুলো ফোলা কমেনি।হাতের বাঁধনটা আবারো তীব্র হয়ে যাচ্ছে প্রতি মূহুর্তে।

পার্কটা এখন বন্ধ।তবে একটা পাশ সবসময় উন্মুক্ত থাকে।দুইজোড়া লোহার বেন্চি পাশাপাশি।একটার মধ্য
রাত্রিকে ধপ করে বসিয়ে দিলো নিভ্রান।নিজেও পাশে বসে হাত ছেড়ে দিতেই তৎক্ষনাৎ উঠে দাড়াতে গেলো রাত্রি।নিভ্রান ধমকে উঠলো।রাশভারি কন্ঠে বললো,
—“খবরদার!উঠবেন না।”

রাত্রি একসেকেন্ড কিছু একটা ভাবলো।তারপর চুপ করে বসে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখলো।নিভ্রানের চোখের ভাষা এবার ভিন্ন।গলার স্বরটাও মোলায়েম,
—‘বলুন,কেন এড়িয়ে যাচ্ছেন আমাকে?”

—“তো কি করবো?আবারো অপমানিত হতে আপনার সামনে মাথা পেতে দিবো?”রাত্রির কাঁটা কাঁটা উওর।লোকটার পাগলামি আর বাড়তে দেয়া যাবেনা।
নিভ্রান একটু স্বাভাবিক হতে যেয়েও পারলোনা।মেয়েটার কথা কোরোসিন ঢেলে দিলো শুকনো আগুনে।থমথমে গলায় সে বললো,
—“আমি কখন অপমান করেছি আপনাকে?উল্টো আমি যে তখন এতটা সময় আপনার জন্য অপেক্ষা করলাম আর আপনি কি করছিলেন?দরজার আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন।কি মনে করেছেন?আমি দেখিনি?আমি সবটাই দেখেছি।আপনার কি মনে হচ্ছেনা আমাকে এভাব এড়িয়ে আপনি এখন আমার অপমান করেছেন?”

ঘুমিয়ে থাকা কথাগুলো যেনো নিমিষেই জাগ্রত হয়ে উঠলো।দু’দিন যাবত চেপে রাখা ক্ষোভটার নগ্ন বহি-প্রকাশ উন্মাদিনী করে তুললো রাত্রিকে।উঠে দাড়িয়ে গলা কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো সে,
—“আপনার মা আমাকে যা নয় তা বললো সেদিন।এসব অপমান না?আমি আপনার রাত কাটানোর মেয়ে?আমি বলেছিলাম আমাকে আপনার ঘরে নিয়ে যান?আশ্রয় দেন।বলেন?বলেছিলাম?বলেছিলাম,সেদিন মাঝরাস্তায় পাগলামি করতে?আমি কিছু বলিনি তবু সব আমাকেই কেনো শুনতে হলো?আমাকেই কেনো আপনার ভোগের বস্তু হিসেবে দেখলো আপনার মা?আমি কি..”

—“রাত..”নিভ্রান ঠাঠানো ধমকে থামানোর চেষ্টা করলো।

রাত্রি থামলোনা।বরং দ্বিগুন জোরে চিল্লালো,”সবসময় ধমকাবেননা।কি ভেবেছেন?আপনার মা আমাকে অপমান করবে আর আপনি এসে ধমকে দিলেই ভয়ে পানি হয়ে যাবো?এতটা তুচ্ছ ভাবেন?এত সস্তা আমি?এত সস্তা?”বলতে বলতেই কন্ঠ আটকে গেলো।আবছায়া অন্ধকারেও ভেজা গালের অবিরাম অশ্রুপাত স্পষ্ট চিকচিক করে উঠলো।নিভ্রান একমূহুর্ত হতভম্বের ন্যায় চেয়ে থেকে জোরজবরদস্তি করে মেয়েটাকে বুকে টেনে নিলো।রাত্রি প্রচন্ড অভিমানে পাগলের মতো নিভ্রানের বুকে থাপড়ালো।হাত পা ছোঁড়াছুড়ি করলো নিজেকে ছাড়ানোর উদ্দেশ্যে।ঘাড়ে,গলায় খামছে দিলো।কাঁদতে কাঁদতেই চিৎকার করলো,
—“ছাড়ুন,লাগবেনা আমার কাউকে।ছাড়ুন বলছি।”

নিভ্রান ছাড়েনি।খুব খুব শক্ত করে ধরে রেখেছে।উন্মাদ রাত্রি একসময় থেমে গেলো।চুপটি করে লেপ্টে থাকলো বুকের সাথে।শার্ট ভিজিয়ে দিলো ছিন্নবিচ্ছিন্ন হৃদপিন্ডের জলরঙের রক্তে।আহাজারি করে বললো,
—“আপনি কেনো বুঝতে পারছেন না?আপনার এই দামি দুনিয়ায় আমার মতো কমদামি মেয়ের জায়গা হবেনা।এ অসম্ভব!”

কথাটা শোনার পর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো নিভ্রান।তারপর অতি নরম স্পর্শে রাত্রির চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে বললো,
—“আমার কাছে সবচেয়ে দামি ‘আপনি’।”

রাত্রি থমকে থমকে ডুঁকড়ে উঠলো।বললো,”সে তো শুধু আপনার কাছে।অন্য সবাই কি আর আপনার মতো?তাদের চোখে তো আমার মতো মানুষ সর্বদাই উচ্ছিষ্টের সমতূল্য।একটু আর্থিক সমস্যা হলেই তাচ্ছিল্যর চোখে তাকায় তারা।”
অত্যন্ত গোপনে একটা দীর্ঘ:শ্বাস ফেললো নিভ্রান।অত:পর খুব কায়দা করে জিজ্ঞেস করলো,
—“আমি কার?”

ছোট্ট বাচ্চাদের কথা শিখিয়ে দিলে তারা যেমন মুখস্তের মতো উওর দেয়,ঠি ক তেমন করেই রাত্রি উওর দিলো,”
—“আমার।”

মনে মনে প্রান উজার করে হাসলো নিভ্রান।গলা খাদে নামিয়ে উত্তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললো,”তবে আমার কাছে দামি হওয়াটাই কি আপনার জন্য যথেষ্ট না?”

রাত্রি নিশ্চুপ,নির্বাক।লোকটা তাকে কথার জালে ফাঁসাচ্ছে।কি ধূর্ত!

সময় গাঢ় হয়েছে।নিভ্রানের বুক থেকে একটু আগে ছাড়া পেয়েছে রাত্রি।এখন সে একদম শান্ত,নিষ্প্রভ।হাঁটতে হাঁটতে ওড়না দিয়ে ভেজা চোখমুখ মুছে নিচ্ছে বারবার।নিভ্রান মলিন হাসলো।রাত্রি তার হাসি দেখে শুকনো গলায় বললো,
—“আপনি আর পাগলামো করেন না।”

নিভ্রান উওর দিলোনা।গলা বাড়িয়ে রিকশা ডাকলো।রাত্রিকে উঠিয়ে দিতে দিতে তার অগোচরে রিকশাওয়ালার মামার হাতে ভাড়াটা ধরিয়ে দিলো।রাত্রি ঘুনাক্ষরেও টের পেলোনা।ওড়নার আঁচলটা কাঁধ গলিয়ে রাস্তা ছুঁইছুঁই।নিভ্রান রিকশার হুট তুলে দিলো।ওড়নাটা কোলের উপর গুছিয়ে দিয়ে রাত্রির তখনকার কথাটার উওর দিলো,”এসব ভুলে যান রাত।আমার আপনাকে লাগবেই।আপনার যদি এটাকে পাগলামি মনে হয় তবে আমি পাগলামিই করবো।”

রাত্রি কাতর চোখে তাকালো।বললো,”প্লিজ..।”

নিভ্রান যেনো তার কথাটা শুনেও শুনলোনা।ঘাড় বাকিয়ে রিকশাওয়ালা মামার দিকে চেয়ে বললো,”ওকে সাবধানে নামিয়ে দিবেন মামা।আমার নজর কিন্তু এই রিকশার উপরই রইলো।”
রিকশাওয়ালা মামা ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালেন।নিভ্রান এবার রাত্রিকে বললো,
—“ভয় পাবেন?আমি আসবো সাথে?”তারপর একটু অন্যগলায় বললো,”আমি আসলেতো আবার আপনার সমস্যা হয়।”

রাত্রি ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে একপাশে চেপে বললো,”আসুন,তবে এই শেষ।”
নিভ্রান ঠোঁট বাকিয়ে উঠে বসলো।রাত্রির একহাত নিজের দু’হাতের মাঝে চেপে ধরে বললো,”এই শুরু।”

রাত্রি গমগম করলো,”একদম না।”

—“মায়ের ব্যাপারটা আমি সামলে নিবো রাত।চিন্তা করবেন না।”

রাত্রি বিরস গলায় কোনরকম প্যাঁচ ছাড়াই বললো,”আপনার মা হয়তো আপনার কথায় আমাকে মেনে নিবে।কিন্তু ভেতরে ভেতরে উনি কখনোই আমাকে পছন্দ করবেন না।একবার চোখে খারাপ লেগে গেলে তা কখনোই ভালো হয়না।”

—“আর একবার মনে ধরে গেলে যে বের করা যায়না।আমি কিভাবে বের করবো আপনাকে?”

—“বাদ দিন,কথা বাড়বে।”বলে চুপ করলো রাত্রি।এই লোকের সাথে তাল মেলালে তার চলবেনা।হাজার সমস্যায় ঘেরা জীবনে তিক্ততা আরো বাড়াতে চায়না।কোনোভাবেই না।
_________________

সাত দিন পরের কথা…
বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে আছে রাত্রি।চোখদুটো খোলা।মনটা একনাগাড়ে ভেবে চলেছে সেই লোকটার কথা।এই একটা সপ্তাহ নিভ্রানের সাথে দেখা হয়নি।হয়েছে তবে একদম সরাসরি হয়নি।রাত্রি তাকে রাস্তায় দেখলেই চোরের মতো পালিয়ে গেছে।কতবার ফোন দিয়েছে নিভ্রান।রাত্রি তুলেনি।শুধু গতপরশু বাসার নিচে এসেছিলো তখন ফোনে শুধু একবার বলেছিল,”চলে যান।”নিভ্রান দিরুক্তি করেনি।তখনই চলে গিয়েছিলো।এরপর আর ফোন আসেনি ওই নাম্বার থেকে।না এই দুদিন একবারো তার আশেপাশে দেখেছে।চোখ বুজলো রাত্রি।কোঁণ দিয়ে গড়িয়ে গেলো দহনের আঁচ ওয়ালা তপ্ত পানি।

রাত তখন গভীর।ঘড়ির কাঁটা প্রায় দুটো ছুঁইছুঁই।রাত্রি সারাদিনের ক্লান্তিতে বুঁদ হয়ে ঘুমোচ্ছে।আকাশে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে।সেই গর্জন কান অবধি গেলেও মস্তিষ্ক ছুঁতে পারছেনা।সারাদিন খুব ব্যস্ততায় কেটেছে।শরীর ভেঙে ঘুম দিয়েছে সে।ঠি ক তখনই বিকট শব্দ তুলে ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো।আরামের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় প্রচন্ড বিরক্ত হলো রাত্রি।পরমূহুর্তেই চমকে উঠলো।এতো রাতে কে ফোন দিলো?তাকে তো শুধু মা ই ফোন দেয়।তাছাড়া ভার্সিটির বান্ববীরা?নাহ্,ওরা তো এতো রাতে ফোন দিবেনা।ধরফরিয়ে উঠে বসলো সে।দরদর করে ঘাম ছুটে গেছে।ফোনটা পড়ার টেবিলের উপর রাখা।এলোমেলো পা ফেলে দ্রুত ফোনটা হাতে তুললো।স্ক্রীনে আননোন নাম্বার।ওদিক থেকে একটা চাপা রুদ্ধ কন্ঠ ভেসে আসলো,

—“আপু?আপু দয়া করে একটু বাইরে আসুন।আমি আপনার দরজার বাইরেই অপেক্ষা করছি।দয়া করুন আপু,ভাইয়ার অবস্থা ভালোনা।আপনাকে আমার সাথে যেতেই হবে।প্লিজ..।”

~চলবে~

#এ_শহরে_বৃষ্টি_নামুক❤️
#লেখিকা_মালিহা_খান❤️
#পর্ব-১৫

বুকটা ধড়াম ধড়াম করে লাফাচ্ছে।শ্বাস ভারি হয়ে আসছে।ভয়ে কন্ঠ তোতলাচ্ছে।ওপাশের ছেলেটা অনুরোধ করেই যাচ্ছে।একটাবার বের হবার জন্য,তার সাথে যাবার জন্য।প্রলম্বিত শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো রাত্রি।এমন উদ্ভট পরিস্থিতিতে সে ইহজন্মেও পড়েনি।গলা যেন কেও চেপে ধরেছে।আওয়াজ বের করা বড় দুষ্কর।একঝলক ফোনটা নামিয়ে নাম্বারটা পুনরায় দেখে নিলো সে।নাহ্,চেনেনা।অচেনা একটা ছেলের সাথে কোনরকম বাছবিচার না করে এই রাতের বেলা বেড়িয়ে পড়াটা কি উচিত হবে?ছেলেটা ‘ভাইয়া’ ‘ভাইয়া’ বলে কি আসলেই নিভ্রানের কথা বলছে?চোখ খিচলো রাত্রি।অভিসঙ্কিত কন্ঠে বললো,
—“আপনি কে?”কন্ঠ কেঁপে গেছে।ছেলেটা কি তার ভয়টা টের পেয়ে গেলো?সর্বনাশ!বললো তো দরজার বাইরেই দাড়িয়ে আছে।এখন যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়।আচ্ছা,ছেলেটা কি আসলেই সত্যি বলছে?নাকি অযথাই বানোয়াট কথাবার্তা?যাচাই করা দরকার।অযথা ভয় পেয়ে লাভ নেই।নিশব্দে রুম থেকে দৌড়ে মেইন দরজার কাছাকাছি যেয়ে দাড়ালো রাত্রি।ওপাশের লোকটা নিশ্চুপ।হয়তো কিছু ভাবছে।রাত্রি দরজায় কান পাতলো।ঠি ক তখনই ফোনে আর দরজার ওপাশ দুদিক থেকেই স্পষ্ট স্বর শোনা গেলো,
—“আমি নিভ্রান ভাইয়ার ছোট ভাই।”

ভয়টা কমার কথা হলেও তা উল্টো কয়েকগুন হারে বৃদ্ধি পেলো।উত্তেজনার বশে ভুল করা যাবেনা।এত রাত!বাড়ির সদর দরজা আটকানো।ছেলেটা ঢুকলো কি করে?সন্দেহজনক বিষয়!রাত্রি একটু সরে গেলো দরজার পাশ থেকে।স্হির কন্ঠে বললো,
—“আপনি আপনাকে বিশ্বাস করবো কি করে?”

ওপাশের ছেলেটার অধৈর্য নিশ্বাসপ্রবাহ।রাত্রি স্পষ্ট টের পেলো।দু’সেকেন্ড ভেবে ছেলেটা বললো,”আপনি জানালা দিয়ে দেখুন।আমি ভাইয়ার গাড়ি নিয়েই এসেছি।গাড়ি মিলিয়ে দেখুন।আমার বড় ভাই না হলেতো এমনি এমনি গাড়ি নিয়ে আসতে পারতাম না?তাইনা?”

রাত্রি দেরি করলোনা।ফোনটা কানে ধরেই রুমে গেলো।বহুকষ্টে ক্যাঁড় ক্যাঁড় আওয়াজে বন্ধ জানালাটা খুললো।সাথে সাথেই বাতাসের ঝাপটা চুল এলোমেলো করে দিলো।বৃষ্টি নামবে বোধহয়।পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।হেডলাইটের আলোয় নিভ্রানের গাড়ি দেখা যাচ্ছে।ছাইরঙা চকচকে গাড়িটা রাস্তার উল্টোপাশে অগোছালো ভাবে পার্ক করা।বোঝা যাচ্ছে ছেলেটা খুব তাড়ায় আছে।মনটা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো রাত্রির।সে চাচ্ছিলো না এটা সত্যি হোক।লোকটার কি হয়েছে যে তার ভাই এভাবে ছুটে এলো?
ওপাশ থেকে ছেলেটা বললো,
—“আপু?দেখেছেন?”

রাত্রি নিচু স্বরে উওর দিলো,
—“জি।”

—“এবার আসুন প্লিজ।”

রাত্রি আর ভাবলোনা।বেশি দেরি করলে পরে না আফসোস করতে হয়।ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড ভাবে ভেঙে পরলেও কোনরকমে নিজেকে সামলালো সে।এলো চুল গুছিয়ে মাথায় ওড়না টানতে টানতে বললো,
—“আসছি।একটু দাড়ান।”

বেশ আস্তে করে দরজাটা খুলে গেলো।ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো অল্পবয়সী একটা মেয়ে।নিশাদ একপলক দেখেই চোখ নামিয়ে নিলো।এতক্ষণ কথা শুনে মনে হচ্ছিলো কত বড় একটা মেয়ে।কেমন ধারালো কথাবার্তা।কিন্তু এ তো দেখি নিতান্তই ছোট্ট একটা মেয়ে।তার এত বড় ভাই এই মেয়ের জন্য সব উথাল পাথাল করে দিচ্ছে।বেশ অবাকই হলো নিশাদ।রাত্রি অসস্তি তে কুঁকড়ে যাচ্ছে।নিভ্রানের ছোট ভাই হলেও ছেলেটার বয়স তার দিকে বড় হবে।না জানি কি ভাবছে।নিশাদ মাথা নিচু করেই একটু সাইড দিয়ে বললো,

—“আসুন আপু।”

রাত্রি চুপচাপ সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো।নিশাদ পিছে পিছে আসছে।নিচ পর্যন্ত যেয়েই এককদম দাড়ালো সে।সন্ধিহান কন্ঠে বললো,
—“আপনি ভেতরে এলেন কিভাবে?কেউ দেখেনি?দারোয়ান কোথায় ছিলো?”

—“আমি দেয়াল টপকে এসেছি আপু।”

রাত্রি আৎকে উঠলো।ছেলেটা যেহেতু ওভাবে এসেছে তারমানে এখনো সেভাবেই যেতে হবে।চোখ বড় বড় করে তাকাতেই হেসে ফেললো নিশাদ।অভয় দিয়ে বললো,
—“ভয় পাবেন না।আমি সাবধানের নামিয়ে দিব আপনাকে।আপনার গায়ে একটা ফুলের টোঁকা পরলেও ভাইয়া নিশ্চিত জানে মেরে ফেলবে আমাকে।এমনেই ভয়ে আছি।”

রাত্রি লজ্জা পেলো।অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো।লোকটা কি না কি বলেছে কে জানে।

দেয়ালের পাঁচিল থেকে খুব যত্ন করে রাত্রিকে নামালো নিশাদ।রাত্রি রাস্তায় দু’পা ফেলে দাড়াতেই হাত ছেড়ে সরে দাড়ালো সে।রাত্রি ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।কেউ দেখে ফেললো নাতো?নাহ্,কেউ নেই।রাস্তা ফাঁকা।নিশাদ যেয়ে গাড়ির দরজা খুললো।বিনীত স্বরে রাত্রিকে ঢোকার ইশারা করে বললো,
—“আপু দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

রাত্রি চুপটি করে সিটে বসলো।নিশাদ ড্রাইভিং সিটে বসে একমূহুর্ত দেরি না করে গাড়ি স্টার্ট দিলো।বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে ড্রাইভ করছে সে।স্পিড হাই।চোখেমুখে তাড়াহুড়ো।রাত্রি ফাঁকা ঢোক গিললো।আমতা আমতা করে বললো,
—“এত ভয় পাচ্ছেন কেনো?”

—“আপনাকে না দেখলে ভাইয়া অনর্থ ঘটিয়ে ফেলবে।দোয়া করুন যাতে জলদি পৌছাতে পারি।”

____________
নাহিদার মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ।চেহারা থমথমে।নিভ্রানের রুম থেকে এখন আর কোনো শব্দ আসছে না।পাশের সোফায় চোখ বন্ধ করে বসে আছে নিভ্রানের বাবা নওশাদ সাহেব।তার চোখমুখ একেবারেই স্বাভাবিক।যেনো বাসায় ঘটে যাওয়া ঘটনা কোনো প্রভাব ফেলেছি মস্তিষ্কে।

নিশাদ ঢুকলো তখনই।তার পিছু পিছু রাত্রি।
—“আপুকে নিয়ে এসেছি মা।ভাইয়া আর কিছু করেছে?”

নাহিদা শীতল চোখে চাইলেন রাত্রির দিকে।রাত্রির নত দৃষ্টি মেঝের দিকে।এই মধ্যরাতেও বাসাটা একেবারেই সজাগ।লোকটা নিশ্চিত ভয়ার্ত কান্ড ঘটিয়েছে।নাহিদার মাথার ব্যান্ডেজ সেটার জলজ্যান্ত প্রমান।
নিশাদ বুঝলো মায়ের নিশ্চুপ ইশারা।রাত্রিকে বললো,
—“আপু ভাইয়ার রুমে চলুন।”

তারা রুমের সামনে যেয়ে দাড়াতেই উঠে আসলেন নাহিদা।রাত্রি বিচলিত ভঙ্গিতে সাইড দিলো তাকে।নিশাদ লক ঘুরালো।দরজা খুলতেই প্রকাণ্ড একটা শোপিস এসে ঝংকার তুলে চুরমার হয়ে গেলো পায়ের কাছে।ছিঁটকে গেলো ওরা তিনজনই।নিভ্রান বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করলো,
—“কাউকে আসতে মানা করেছিনা?”

নিশাদ ধড়াম করে দরজাটা আটকে বুকে থুথু ছিটালো।রাত্রি হতভম্ব।এই শান্তশিষ্ট লোকটাও এভাবে চিৎকার করতে পারে?নাহিদা চুপচাপ।কোনোকিছু যেন তাকে চমকে দিতে পারছেনা।নিশাদ ঢোক গিলে দরজাটা আবার একটু ফাঁক করলো।নিভু নিভু কন্ঠে বললো,
—“তোর রাতকে নিয়ে এসেছি ভাইয়া।ও কে তো আসতে দিবি।”

“রাত” শব্দটা কানে যেতেই যেনো বিদ্যুৎ খেলে গেলো নিভ্রানের চোখেমুখে।তার ভাই অত্যন্ত এই সময় মিথ্যা বলবেনা।এত সাহস নেই!বিছানা থেকে নিজেই নেমে গেলো সে।নিশাদের অর্ধেক খোলা দরজাটা ভেতর থেকে সজোরে টেনে রো খুলে নিলো।রাত্রি ভয়ে দরজার পাশের দেয়ালে কাঁধ ঠেকিয়ে দাড়িয়ে ছিলো।নিভ্রান তাকে তৎক্ষণাৎ দেখতে না মূহুর্তেই হুঙ্কার ছাড়লো,
—“কোথায় রাত?”

নিশাদ আবারো থতমত খেলো।নাহিদা নিস্পৃহ নয়নে চেয়ে রয়েছে ছেলের মুখের দিকে।নিশাদ আলতো করে রাত্রির হাত ধরে তাকে নিভ্রানের সামনাসামনি দাড় করালো।নিভ্রান একমূহুর্ত ভাবলো না।তাদের সামনেই শক্তহাতে রাত্রিকে টেনে নিলো নিজের কাছে।একহাতে কোমড় পেচিয়ে আরেকহাতে মাথাটা চেপে ধরলো বুকের মাঝে।লজ্জায় জবুথবু হয়ে গেলো রাত্রি।নিশাদ চোখ নামিয়ে ফেললো।তার সাদামাটা ভাইযে এভাবে কাউকে ভালোবাসে বিষয়টা একেবারেই হজম হচ্ছেনা।ঘরটা অন্ধকার হলেও ড্রইংরুমের আলোর ঝলকানিতে সবই দেখা যাচ্ছে।লজ্জাটা যেনো আরো ভালোভাবে আঁকড়ে ধরলো রাত্রিকে।মা,ভাইয়ের সামনে এভাবে ধরে রেখেছে লোকটা।তারা কি ভাববে!
নিভ্রান অনড়।রাত্রিকে যেনো নিজের সাথে মিশিয়ে ফেলবে।রাত্রি কাঁচুমাচু করলো,
—“শান্ত হন,আমি কোথাও যাচ্ছিনা।একটু ছাড়ুন..”

নাহিদা বললেন,”মেয়েটাকে…”কথা শেষ করতে দিলোনা নিভ্রান।চোখ গরম করে হাত উঠিয়ে থামার ইঙ্গিত করতেই চুপ হয়ে গেলো নাহিদা।নিশাদ তোতলালো,”ভাইয়া,রেগে গিয়ে আপুকে আবার কিছু করোনা।”
পেছন থেকে নওশাদ সাহেব ঠান্ডা গলায় বললেন,
—“তোমরা চলে আসো,ওদেরকে একা থাকতে দাও।”

নিভ্রানের নিরবতাই নওশাদ সাহেবের কথার সাথে সম্মতি জানালো।নিশাদ বিনাবাক্য দরজা ভিড়িয়ে বেরিয়ে গেলো।একহাতে রাত্রির কোমড় জড়িয়ে রেখেই অন্যহাতে দরজা লক করে দিলো নিভ্রান। সুইচ চেপে আলো জ্বালালে।মেঝের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাঁচগুলো পরখ করে অস্থির হতে হতেও থেমে গেলো সে।রাত্রির পায়ে স্যান্ডেল আছে।কাঁচ ঢোকার কথা নয়। এতদিনের ক্ষোভটা আচমকা মেয়েটার দেখা পেয়ে একটু শান্ত হলেও এখন যেনো তা গলিত লাভা-র ন্যায় গড়িয়ে পড়লো রাত্রির উপর।কোমড়ের বাঁধনটা লোহার মতোন শক্ত করে ধরে ধমকে উঠলো সে,

—“কেন এমন করছেন রাত?”বলুন,কি লাভ হচ্ছে আমাকে অবহেলার ধারালো করাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে?”

রাত্রি কেঁপে উঠলো।বুক থেকে মুখ তুলে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়েই যেন স্তব্দ হয়ে গেলো।লোকটার এ কি অবস্থা!চোখদুটো টকটকে লাল।চুল অগোছালো।সবসময়ের সুসৃঙ্খল আবেশটা হারিয়ে গেছে কোথায় যেনো।
হুঁশ ফিরলো।চোখ লুকাতে মেঝের দিকে দৃষ্টি পড়তেই আতঙ্কিত হয়ে গেলো সে।সাদা টাইলস এ রক্তের ফোয়ারা।হাত পা কাঁপুনি ধরে গেলো।এলোপাথারি কাঁচ বিঁধে নিভ্রানের দু’পা ক্ষতবিক্ষত।অথচ লোকটা অনুভূতিশূন্য।রাত্রি শ্বাস আটকে আটকে বললো,
—“আপনার..আপনার পা দিয়ে এত রক্ত….আল্লাহ!কি করেছেন?দেখি বসুন।”

নিভ্রান পায়ের দিকে তোয়াক্কা করলোনা।রাত্রিকে ছেড়ে বিছানায় ধপ করে বসে পড়লো।অসহ্য করুণ গলায় বললো,
—“আরে মানুষের তো পশুর উপরও মায়া জন্মে যায়,আপনার আমার জন্য মায়া হয়না?মায়া বাদ দিন একটু দয়াই করুণ নাহয়।দয়া করেই আমার হন।”

রাত্রি সেই হৃদয় ঝাঁঝড়া করা কথাগুলো শুনেও কোনরকমে হজম করলো।নিভ্রান ড্রিংক করেছে।হাল্কা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।কথাবার্তায় ও কেমন ঘোলাটে ভাব।হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়লো সে।নিভ্রানের এক পা কোলের উপর তুলে নিয়ে নিশ্চিত হাতে ছোট্ট টেবিলের ড্রয়ারটা খুলে ফাস্ট এইড বক্স বের করলো।তুলা বের করতেই নিভ্রান তাচ্ছিল্য করে হাসলো।খাপছাড়াভাবে বললো,

—” বাদ দিনতো এসব।কতশত রক্তক্ষরণ হচ্ছে অথচ আপনি টেরও পাচ্ছেন না।”

রাত্রি ধরা গলায় বললো,
—“চুপ করে থাকুন,আমি বলেছি আমার জন্য রক্তাক্ত হতে?”

নিভ্রান চুপ করলো।রাত্রি দু’পায়ে ব্যান্ডেজ করে উঠে দাড়ালো।সাবধানে পা ফেলে দরজা পর্যন্ত যেয়ে লাইট নিভিয়ে ফিরে এলো।মাথার বালিশ ঠি ক করে দিয়ে বললো,
—“আপনি ঘুমান তো একটু।”

নিভ্রান শুলো ঠি ক।কিন্তু পরক্ষণেই হাল্কা,তেজ হীন গলায় বললো,
—“আমি ঘুমালেই আপনি চলে যাবেন তাইনা?নিশাদ জোর করে নিয়ে এসেছে আপনাকে?থাক,আর থাকা লাগবেনা।আমি ঠি ক আছি।আপনি চলে যান।নিশাদ কে বললেই আপনাকে নামিয়ে দিয়ে আসবে।”

—“কোথাও যাবোনা আমি।”দৃঢ় কন্ঠে কথাটা বললেও অজান্তেই চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো রাত্রির।টপটপ করে পানিও গড়ালো কয়েক ফোঁটা।নিভ্রানের বুকের উপর পড়লো সেই পানি।রাত্রি ঠোঁট কামড়ে ধরলো।কান্নার শব্দ যেনো নিভ্রান না শুনে।কোনোভাবেই না।সেভাবেই দ্রুত গলা পর্যন্ত ব্ল্যাঙ্কেটটা টেনে দিয়ে নিভ্রানের মাথার কাছছায় বসলো সে।বাইরে আজও বৃষ্টি নেমেছে।মুষুলধারে বৃষ্টি।
নিভ্রান একদৃষ্টে চেয়ে থাকলো ব্যালকনির কাঁচের দরজার দিকে।বৃষ্টির জল কাঁচে এসে বাড়ি খাচ্ছে।তারপর বক্ররেখায় এলোমেলো হয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে।বেশ কিছুক্ষণ মত্তের মতো চেয়ে সে আবিষ্ট স্বরে বললো,

—“কাঁচটা সরিয়ে দিন রাত,ঘরে বৃষ্টি আসুক।একরাতে এই বৃষ্টির সাথেই প্রেম এসেছিলো।এবার নাহয় একটু ভালবাসাও আসুক।ভালবাসার মানুষটাও আসুক।”

~চলবে~