#ওয়ান_ফোর_থ্রি
– Sidratul Muntaz
১.
” দয়া করো, দয়া করো আমার উপর! আমাকে মেরে ফেললে আমার মেয়েটা একা হয়ে যাবে। ওর আমি ছাড়া এই পৃথিবীতে কেউ নেই। প্লিজ, আমি প্রাণ ভিক্ষা চাইছি, প্লিজ।”
লোকটির বুকভাঙা আর্তনাদ শুনে ট্রিগারে পুশ করতে নিয়েও থেমে যায় হাসান। সামান্য দয়াময় দৃষ্টিতে আমীরের দিকে তাকালো। হাতলযুক্ত চেয়ারে বেশ আয়েশ করেই বসে আছে আমীর। তার মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে না সে কোনো মানুষ খু*ন করছে। মনে হচ্ছে যেন সামান্য খাসি জবা-ই হওয়া দেখছে। শীতল স্বরে জানাল,” আমারও পৃথিবীতে কেউ নেই।”
লোকটি ব্যাকুলচিত্তে কাতর হয়ে বলল,”আমার কষ্টটা তোমার বোঝা উচিৎ। আমাকে মা-রলে আমার মেয়েটা এতিম হয়ে যাবে। আমাকে মে-রো না।”
আমীরের কণ্ঠে দৃঢ় প্রত্যয়,” কিন্তু আপনাকে ম-রতেই হবে! ”
” সবারই মৃত্যুর আগে শেষ ইচ্ছে থাকে। আমার শেষ ইচ্ছে হলো.. আমার মেয়েকে ইটালি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। সেখানে আমার একমাত্র বোন রেশমা থাকে। আমার ওয়ালেটের নোটবুকে রেশমার ঠিকানা লেখা আছে।”
” ঠিকাছে। ব্যবস্থা করা হবে। আপনার এতিম মেয়ের দায়িত্ব আমার উপর দিয়ে আপনি এবার নিশ্চিন্তে ম-রতে পারেন, মিস্টার জাবিদ।”
জাবিদের চোখের কার্ণিশ ভরে উঠল। এতিম মেয়ে! শব্দটায় এতো বিষাদভরা! তীব্র হাহাকার টের পেল সে বুকে। শেষবারের মতো মেয়েটির কণ্ঠ শুনতে পেল।মায়া বলছিল,” একটা ভালো ফোন লাগবে বাবা।” জাবিদ সাহেবের ব্যাগেই মেয়ের জন্য কেনা নতুন ফোন। সেই ফোন হাতে দিয়ে একমাত্র মেয়ের হাস্যোজ্জ্বল মুখ উপভোগ করার সৌভাগ্য তার হলো না। আর কোনোদিন সে মেয়েটিকে দেখবে না। হায়, নিয়তি এতো নিষ্ঠুর!
গোলাবর্ষণের তীক্ষ্ণ শব্দে কেঁপে উঠল ভূমি। জাবিদ লোহার মতো শক্ত দেহ নিয়ে লুটিয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগমুহূর্তে তার চোখের পাতায় ভেসে উঠে, মায়ার নিষ্পাপ, স্নিগ্ধ মুখ।
______
দুঃস্বপ্নটা শেষ হতেই ঘুম ভাঙে তোহার। যখন সে তাকাল তখনি বুঝতে পারল, আদতে কোনো দুঃস্বপ্নই দেখছে না সে। বরং বাস্তবটাই দুঃস্বপ্নে এসে কড়া নেড়েছে। দরজায় ধাম ধাম কড়াঘাতের শব্দ৷ ক্ষুধার্ত খ্যাঁকশেয়ালের মতো চিৎকার করছে ছেলেগুলো। তোহা ভাবতেও পারেনি তারা বাড়িতে চলে আসবে এভাবে৷ ভয়ে কণ্ঠমণি শুকিয়ে এলো তার। এদের মধ্যে একজন হলো বাড়িওয়ালার ছেলে মাসুদ। চায়ের দোকানে বসে একদিন তোহাকে শিষ দিয়েছিল। তোহা তখন বলেছিল তাকে জেলের ভাত খাওয়াবে। তোহার বাবা পুলিশ। তাই সবসময় তার মধ্যে একটা পিতৃগরিমা কাজ করে এমনটাই সবার ধারণা। তার হুমকি শুনে মাসুদের আঁতে ঘা লাগে।
এরপর থেকে প্রতিদিনই তোহাকে বিরক্ত করতে লাগল আরও বেশি। সে কাউকে ভয় পায় না এমনটাই বোঝাতে চাইল। তোহাও তাকে শিক্ষা দিতে বাবার কাছে নালিশ করে। জাবিদ সাহেব এদের একদিন থানায় নিয়ে গেল। কিন্তু উপরমহল থেকে নোটিশ এলেই তারা ছাড়া পেয়ে যায়। সেদিনের প্রতিশোধ নিতে মাসুদ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
তোহা দ্রুত ছোট্ট একটা টেবিলের কোণায় গিয়ে বসে পড়ে। মোবাইল হাতে নিল বাবাকে ফোন করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু হায়, বাবার মোবাইল সুইচড অফ দেখাচ্ছে কেন? এবার ভয়ের মাত্রা আরও বেড়ে যায় তোহার। কপাল ঘামতে শুরু করে। ছেলেগুলো বিশ্রী ভাষায় গালা-গাল দিচ্ছে। তোহা নিজের কান চেপে ধরল। হৃৎস্পন্দন তখন উর্ধ্বগতিতে। তারা ধাক্কাতে ধাক্কাতে দরজাই ভেঙে ফেলল একসময়। ভয়ে এবার তোহার মূর্ছা যাওয়ার দশা। মুখটা চেপে ধরে শ্বাস আটকে পড়ে রইল সে। সামান্য নড়াচড়াচুকুও করল না। তাও ছেলেগুলো হৈহৈ করে উঠে। তোহাকে তারা দেখতে পেয়ে গেছে।
মাসুদ একদম তোহার কাছে এসে তার চোয়াল চেপে ধরল,” আজকে তোকে কে বাঁচাবে মা*? আমাকে জেলে ঢুকানো? এমন অবস্থা করবো যে তোর পুলিশ বাপ কপাল চাপড়েও কূল পাবে না। শালী বে*!”
অকথ্য গালাগাল দিতে দিতে মাসুদ তোহাকে একটা ঘরে এনে দরজা দিয়ে ফেলে। ধা-ক্কা মেরে তাকে বিছানায় ফেলল। তোহার ছোট্ট শরীর থরথর করে কাঁপছে তখন। বাকিরা বাইরের পাহারাদার। চারপাশ থেকে অন্ধকার ঘিরে ধরল তোহাকে। মাসুদ কাঁধ খামচে কামিজ ছিঁড়ে নিতেই তোহা চোখ বন্ধ করে বাবাকে ডাকল। তার গলা ফাটানো চিৎকারে বাবা এলো না। কিন্তু হঠাৎ বাইরে থেকে চিৎকার ভেসে এলো। বিকট গর্জনের আওয়াজ পেতেই চমকে উঠল তোহা। মাসুদ উঠে দরজার কাছে গেল বাইরে কি হয়েছে দেখার জন্য। তোহা দ্রুত বিছানার চাদরে নিজেকে গুটিয়ে নিল। বিধ্বস্ত, অসহায়ত্ব দৃষ্টি মেলে সে দেখল একজন যুবককে। বিশালদেহী, শ্যামসুন্দর, চশমা পরিহিত মানুষটি তীব্র আক্রোশে মাসুদকে আঘাত করল।
তারপর কি হলো তার কিছুই তোহা খেয়াল করেনি। সে কেবল দেখতে পায় স্বর্গীয় দূতের মতো সুদর্শন যুবকটি তার দিকে হাত বাড়িয়ে বলছে,” উঠে এসো মায়া।”
তোহা তখন প্রস্তুরীভূত। থমথমে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ভাবছে, কে এই লোক? মায়া বলে তাকে কেবল তার বাবা ডাকতো। দলা পাকানো কান্নায় তোহার বুক ভেঙে আসে। ছেলেটি তোহার সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায় থাকল না। আচমকা তাকে কোলে তুলে নিল বিছানার চাদরটি সহ। তোহার পুরো শরীর আবৃত। ছিন্নভিন্ন পোশাকের উপর এমন বিছানার চাদর গায়ে দিয়ে একটি অপরিচিত পুরুষের কোলে চড়ে আছে ভাবতেই অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে গেল। আমীর বিরবির করে বলছে,” ভয়ের কিছু নেই। আসলে তোমার বাবা একটা জরুরী কাজে আটকে পড়েছেন। তাই তোমাকে রেসকিউ করতে আমাকে পাঠানো হয়েছে। আমি তোমার বাবার বন্ধু।”
তোহা বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইল। কথা বলার অবস্থায় সে নেই। কিন্তু এমন একজন যুবক তার বাবার বন্ধু কি করে হয়? তোহার মস্তিষ্ক চিন্তা করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ক্লান্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ল। তার ঘুম ভাঙে একটি অপরিচিত বাড়ির আলিশান বিছানায়!
চলবে