ওয়ান ফোর থ্রি পর্ব-০২

0
871

#ওয়ান_ফোর_থ্রি
২.
জানালা গলে আলো এসে পড়েছে। বাহিরটা সবুজাভ। তোহা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই মন ফুরফুরে হয়ে উঠল। মনে হচ্ছে সমাজ থেকে একেবারে বিচ্ছিন কোনো স্বর্গরাজ্য এটা। দরজায় টোকা পড়ল। তোহা বারান্দা থেকে বের হয়ে দেখল, ফরসা করে একটা ছেলে এসে দাঁড়িয়েছে। খুব অনুগত কণ্ঠে বলল,” ম্যাডাম, গুড মর্ণিং। আপনার কি কিছু লাগবে?”

তোহা বিছানায় বসতে বসতে বলল,” হ্যাঁ। একটা ফোন লাগবে।”

হাসান সাথে সাথেই তার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা মোবাইলের বাক্সসহ বের করল। তারপর তোহা দিকে এগিয়ে দিতেই তোহা চমকে যাওয়া কণ্ঠে বলল,” আরে, এটা কি?”

” আপনার জন্যই আনা হয়েছে।”

” কিন্তু এটা দিয়ে আমি কি করব? এটায় নিশ্চয়ই সিম নেই। আমার কাউকে ফোন করতে হবে।”

” আপনি কাকে ফোন করতে চান? আমাকে বলুন। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এখন থেকে আপনার যা কিছু দরকার হবে সব আমাকে বলবেন।”

” আমি আমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাই।”

হাসানের চেহারা গুমোট হয়ে গেল। হালকা কেশে কণ্ঠ পরিষ্কার করে সে স্পষ্ট ভাষায় বলল,” সেটা এই মুহূর্তে সম্ভব না। আপনার বাবা জরুরী কাজে এমন জায়গায় আছেন যেখান থেকে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না।”

তোহার ভ্রু কুচকে গেল। সামান্য রেগে বলল,” কি এমন জরুরী কাজ? কালকে থেকে বাবার সাথে আমার কথা হচ্ছে না। আমি এখনি কথা বলতে চাই৷ আপনি বাবাকে ফোন করে আমার কথা বলুন। আমার বাবার কাছে আমার থেকে জরুরী আর কিছু হতে পারে না।”

তোহা ঝলমল করে হাসল। নিজের বাবাকে নিয়ে একটু বেশিই আত্মবিশ্বাস তার। হাসান দৃঢ়স্বরে বলল,

” এটা সম্ভব না।”

তোহা এবার কঠিন হলো,” আপনি আমাকে মোবাইল দিন। আমিই কথা বলবো।”

হাসান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তোহার হাতে মোবাইল তুলে দিল। তোহা ফোন করতেই ওই পাশ থেকে কৃত্রিম স্বর ভেসে এলো,” আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে ব্যস্ত আছে।”

তোহা অবাক হয়ে গেল। বাবা তার ফোন কেটে দিচ্ছেন কেন? অবশ্য তিনি তো জানেন না যে এটা তোহার নাম্বার। জানলে কখনোই কাটতেন না। তোহা ম্যাসেজ করল,” ফোন ধরো বাবা। তোমার সাথে কতক্ষণ ধরে কথা হচ্ছে না। কোথায় আছো তুমি?”

একটু পর রিপ্লাই এলো,” ব্যস্ত আছি। ফ্রী হলে ফোন করবো।”

আরে, বাবা তো কখনও এমন নিরস হয়ে কথা বলেন না! তোহা মনখারাপ করে হাসানের কাছে মোবাইল ফিরিয়ে দিল। আদেশের স্বরে বলল,” আমার বাবা যে-কোনো সময় ফোন করবেন। তখন সাথে সাথে ফোনটা আমাকে এনে দিবেন কিন্তু।”

” জ্বী ঠিকাছে। আপনি ব্রেকফাস্টে কি খাবেন ম্যাম?”

” আমি কিছু খাবো না। বাবা এলে বাবার সাথে খাবো। আপনি এখন যান।”

হাসান বিব্রতমুখে বের হয়ে গেল। তোহা পিছু ডেকে বলল,” এটা নিয়ে যান। আমার নতুন ফোন লাগবে না।”

” কিন্তু এটা আপনার কাছেই থাকবে ম্যাম। জাবিদ সাহেব এটা আপনার জন্য কিনেছিলেন।”

” এটা বাবার কেনা?” তোহা হেসে উঠল। উল্টে-পাল্টে মোবাইলটা দেখতে শুরু করল। তার পছন্দের মডেলটাই তো! বাবা সব মনে রাখেন। একটু আগে বাবার উপর তৈরী হওয়া অভিমানটা নিমেষেই উঁবে গেল। তোহা ঠিক করল, বাবার সঙ্গে দেখা হলেই জড়িয়ে ধরে বলবে,” আমার বেস্ট বাবা তুমি, আই ডু লভ ইউ।”

দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করল তোহা। কিন্তু বাবার ফোন এলো না। এতোক্ষণ তো বাবা কখনোই যোগাযোগ না করে থাকেন না। খুব হাঁসফাঁস লাগছে কেন জানি। তোহা রুম থেকে বের হয়ে হাসানকে খুঁজল। এই বাড়িটা ট্রিপ্লেক্স। তোহার অবস্থান দুইতলার একটি কোণার রুমে। তোহা করিডোর দিয়ে হেঁটে নিচে যাওয়ার সময় দেখল বিশাল একটি কাঁচের কনফারেন্স রুমে আমীর দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে লম্বা টেবিল। অসংখ্য কালো কোর্ট পরিহিত মানুষ বসে আছে টেবিল জুড়ে। কেবল আমীরের গেটাপ ক্যাজুয়াল। ধূসর রঙের পোলো টি-শার্ট তার গায়ে। সহজেই তাকে সবার থেকে আলাদা করা যাচ্ছে। সে হাত নেড়ে নেড়ে বক্তৃতা দিচ্ছে। মুখভঙ্গি অত্যন্ত সিরিয়াস। তোহা মানুষটির চোখের দিকে লক্ষ্য করল। চোখের দৃষ্টি দেখে মানুষের অনেক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা যায়। গতকাল তোহা আমীরের চোখ অনেক কাছ থেকে দেখেছিল। তার মনে হচ্ছিল, বুদ্ধিদীপ্ত ওই চোখে লুকিয়ে আছে ভারী রহস্য। যেন গভীর কোনো অরণ্য। কিছু একটা আছে এই চোখে, যা গা ছমছমে অনুভূতি দেয়। আকর্ষিতও করে, হারিয়ে যেতে হয়। হঠাৎ আমীরের নজর তোহার দিকে পড়ে গেল। তোহা প্রায় থতমত খেয়ে উঠল। সে এমনভাবে মন দিয়ে আমীরকে দেখছিল যে আচমকা চোখাচোখি হওয়ায় একটু লজ্জা লাগছে এখন। এই মানুষটাকে তার থ্যাংকস জানানো উচিৎ। সে না থাকলে গতকাল তোহার কি হতো?

হাসান বাইরে এলো,” ম্যাডাম, আপনার কি কিছু লাগবে?”

তোহা ভুলেই গেছে সে এখানে কেন এসেছিল! এক আঙুল দিয়ে ভ্রু চুলকাতে লাগল। তারপর হঠাৎ মনে পড়তেই বলল,” আমার বাবা কি ফোন করেছে?”

” না ম্যাডাম। আমি তো বলেছি, তিনি অনেক ব্যস্ত।”

তোহা অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল,” মিথ্যা বলছেন আপনি। বাবা যত ব্যস্তই থাকুক, আমাকে ফোন করতে কখনও ভুলবেন না।”

” আমি আপনার সাথে মিথ্যা কেন বলবো? এতে আমার কি লাভ?”

তোহা শান্ত হয়ে বলল,” একটু আগে কনফারেন্সরুমে ছিলেন না আপনি? নিশ্চয়ই আপনার ফোন সাইলেন্ট তাই টের পাননি। এখন একবার চেক করে দেখুন, বাবা অবশ্যই ফোন দিয়েছেন।”

হাসান অগত্যাই মোবাইল বের করে বলল,” আপনিই দেখে নিন।”

মোবাইলটা হাতে নিয়ে হতাশ নিঃশ্বাস ছাড়ল তোহা। কেউ ফোন করেনি। কিন্তু এটা কিভাবে হতে পারে? শত ব্যস্ততার মাঝেও বাবা তাকে লাঞ্চের সময় ফোন করেন। আর আজকে একবারও ফোন করছেন না। তোহা ঠিক করেছে বাবার ফোন না আসা পর্যন্ত সে খাওয়া-দাওয়া কিছুই করবে না। তার অনশন চলবে। নিরবচ্ছিন্ন অনশন।

___________
তোহার বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিছুক্ষণ আগে বড় একটা ব্যাগে ভরে এনে দেওয়া হয়েছে। গতরাতের ওই ঘটনার পর ওই বাড়িতে তোহার ফিরে যাওয়া ঠিক হবে না৷ তাই তাকে এখানেই থাকতে হচ্ছে৷ তোহাও মেনে নিয়েছে। যেহেতু বাবার আদেশ, তাকে তো থাকতেই হবে। অবশ্য গতরাতের ঘটনাগুলো কিছুতেই ভুলতে পারছে না সে। যখনই মনে পড়ছে, নিজেকে তার অশুচি লাগছে। গোসলের সময় কাঁধে নখের আঁচড়টা দেখে তোহা একচোট কেঁদে ফেলল। মাসুদকে সে কখনও ক্ষমা করবে না৷ একবার শুধু বাবা ফিরে আসুক, তোহা মাসুদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করবে৷ ফ্রেশ হয়ে তোহা দেখল তার পুরনো মোবাইলটা বাজছে। বৃষ্টির ফোন।

” হ্যালো বৃষ্টি!”
” তোহা, কোথায় তুই? আমি সকালেও তোর বাড়ি এসে ঘুরে গেলাম। তুই কি বাড়িতে আসবি না?”
” আমি তো অন্য একটা জায়গায় আছি। আসলে কালরাতে একটা দূর্ঘটনা ঘটেছিল…”
” কি দূর্ঘটনা?”
” তুই এক কাজ কর। এখানেই চলে আয় না! আমি এমনিতেও খুব বোর হচ্ছি। দাঁড়া তোকে এড্রেস পাঠাই।”

বৃষ্টি খুব বিস্ময়ের স্বরে বলল,” তোহা, তুই কি জানিস? মাসুদকে যে পুলিশে ধরেছে!”

” তাই নাকি? খুবই ভালো হয়েছে। এটাই তার প্রাপ্য।”

” এর মানে আবার তোর সাথে কিছু হয়েছে।”

” হ্যাঁ। তুই এলে সব বলবো। দাঁড়া তোকে এড্রেসটা ম্যাসেজ করছি।”

তোহা এই বাড়ির এড্রেস জানে না। তাই হাসানকে ডেকে জিজ্ঞেস করল,” এই বাড়ির ঠিকানাটা বলুন তো ভাই? আমার বান্ধবীকে আসতে বলবো।”

” আপনার বান্ধবী ছেলে না মেয়ে?”

তোহা এই প্রশ্ন শুনে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো। উত্তর দিল,” অবশ্যই মেয়ে! বান্ধবী ছেলে কেন হবে?”

” স্যরি, তাহলে তিনি এখানে আসতে পারবেন না।”

” আমার সঙ্গে দেখা করতেও আসতে পারবে না?”

” জ্বী না।”

” কেন?”

” কারণ এই বাড়িতে মেয়ে নিষেধ। ”

চলবে